প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১৩

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১৩ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১৩

রাতের নির্জনতা এক অন্যরকম আবহ তৈরি করে আহমাদের মনে। চিন্তার জন্য চমৎকার সময়! সাথে উপকরণগুলোও যেনো কেউ গুছিয়ে রেখেছে। মাহিবার আনা বেশ কিছু বই টেবিলেই রাখা ছিলো এবং কাকতালীয়ভাবে এগুলো সব ছিলো পর্দার যৌক্তিকতা সম্পর্কে। মাহিবার ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে চেয়ে আহমাদ ভাবে এটা আদৌ কাকতালীয় নাকি কারো হাতে যত্নে সাজানো।

মেরুদন্ড টানটান করে ভারী এক শ্বাস ছাড়ে আহমাদ। বুকটা যেনো হালকা হলো। নিজের সাথে দ্বন্দ্ব বোধহয় এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক যু.দ্ধ। পুরোটা রাত সেই ময়দানে কাঁটায় আহমাদ। কিন্তু সেই শ্রান্তির শেষে যখন বিশ্বাসের বিশুদ্ধ বাতাস বুকে বয়ে যায় তখন যেনো স্বর্গসুখের টুকরো ছেয়ে যায় মননে। আপাতত সেই প্রশান্তি কুড়িয়ে নিতে ব্যস্ত আহমাদ। তখনই মনে হয় এই প্রশান্তিদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে অন্তরটা ঠান্ডা হবে না। সিদ্ধান্তের সুতো ধরে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নেয় ছেলেটা। রিডিং টেবিলের হলুদ বাতি নিভিয়ে ঘরের হালকা কমলা আলোটা জ্বেলে দেয়। সোফার এক পাশে থাকা ভাঁজ করা জায়নামাজ নিয়ে খুব যত্নের সাথে বিছিয়ে দেয়। মনের সবটা আকুতি ঢেলে তাকবীর দেয়। আবছায়ায় ভেসে ওঠে এক নির্মল পুরুষের চিত্র, যার চিত্ত নুইয়ে পড়ছে মহামহিমের পানে।

বাম কাঁধে সালাম ফেরাতেই ঘুমন্ত মাহিবার মুখটা নজর কেড়ে নেয়। নিজ অবস্থান পাল্টে ছেলেটা নিদ্রালু স্ত্রীর শিয়রে যেয়ে বসে। খুব আবেশে, ভীষণ যত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিজ থেকে তৈরি করা দেওয়াল না থাকলে আজ কি ঐ কেশ ছড়ানো কপালে একটা উষ্ণ পরশ দিতে পারতো না? রাতের শেষ প্রহরে ঐ ঘুম ঘুম চেহারার পানে চেয়ে থাকতে থাকতেই বুঝতে পারে এই জীবনে তার প্রাপ্তি অনেক! সেই প্রাপ্তির তালিকায় এই মেয়েটার নাম নিশ্চয়ই উপরের দিকে থাকবে!

•• •• ••

সকালের সূর্য ব্যস্ততার ঘণ্টা বাজিয়েছে ইয়াসির পরিবারে। ফজর পড়েই শাশুড়ির সাথে কাজে হাত লাগিয়েছে মাহিবা। মায়ের কড়া নির্দেশ, শাশুড়ি যখন কাজ করবে অবশ্যই তার পাশে পাশে থাকতে হবে। আর মাহিবার কাছে মায়ের আদেশ শিরোধার্য!

আহমাদের জন্য প্রস্তুতকৃত খাবার নিয়ে আসতেই ছেলেটা আটকায় তাকে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে চাইতেই আহমাদ মাহিবার ওই ঘর্মাক্ত কপাল থেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। যেনো যত্নের সাথে স্নেহের আবেশ। কি সুন্দর মিশ্রণ! ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়ে মাহিবার চঞ্চল চিত্ত। এমন কিছু সে কল্পনাতেও আশা করেনি। এহেন আদুরে আচরণে নড়বড়ে হয়ে যায় মেয়েটা। দৃষ্টি স্থির রাখা দায় হয়। চোখ নামাতেই এক শান্ত, স্থির কণ্ঠ কর্ণকুহরে আঘাত হানে।

- অনেক ধন্যবাদ মাহিবা। আমার কনফিউশন দুর করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি আল্লাহর দেওয়া বিধানকে কখনো ভুল ভাবতাম না। কিন্তু এইযে দৃঢ় বিশ্বাসটা..ভালো লাগছে।

বুঝতে কিছু সময় লাগলেও যখন ঘোরের ঘরে ডুবতে থাকা মস্তিষ্ক ইঙ্গিত ধরতে পারে চট করে চোখ তুলে তাকায় মেয়েটা। উচ্ছল, হাসিখুশি আদলে শুধায়,

- আপনি বুঝতে পেরেছেন!

- জি।

কি খুশি লাগে মেয়েটাকে দেখতে! রাজ্য বিজয়ে রাজাও বোধহয় এতো খুশি হয় না। বারবার বলতে থাকে,

- আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!

- আপনার কাছে আমার একটা বিষয়ে জিজ্ঞাসা ছিলো।

- জি বলুন।

চিকচিক করতে থাকা ঐ চোখে চেয়ে আহমাদ বলে,

- বোরখা পড়াই কি সব সমস্যার সমাধান? আপনার কি মনে হয়?

হাসি খুশি মাহিবার মস্তিষ্ক যেনো বিদ্যুৎ বেগে চলে,

- না। দুই পক্ষের অবদান না থাকলে এরকম সমস্যা একেবারে গোড়া থেকে নির্মূল হয় না। সবাইকে নিজেদের জায়গা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আর একটা কথা কি জানেন? ওষুধ খেলেই যে রোগ সেরে যায় এমন না। কিন্তু রোগ হলে কি আমরা ঐ নেতিবাচক সম্ভাবনা ধরে বসে থাকি? বরঞ্চ যতো তাড়াতাড়ি পারি ডাক্তারের কাছে দৌড়াই। এখানে আমাদের ভূমিকা প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো। এরপরেও বিপদ আসতে পারে। কিন্তু তখন অন্তত আমরা নিজেদের বিষয়ে সাফাই দিতে পারি যে আমরা চেষ্টা করেছিলাম।

না থেমেই মেয়েটা যোগ করে,

- একটা পয়েন্ট আছে। আমাদের মস্তিষ্ক অতি আশ্চর্য কিছু ধারণ করতে না পেরে যেখানে অজ্ঞান হয়ে যায় সেই দুর্বল মস্তিষ্ক দিয়ে আল্লাহর বিধান জাজ করা একট লেইম যুক্তি।

বেশ প্রসন্ন দেখায় আহমাদকে।

- উত্তরটা দারুন ছিলো! আমি নিজেও একটা উত্তর ভেবেছিলাম। কিন্তু আপনার অপিনিয়ন জানার ইচ্ছা ছিলো। আর শেষ কথাটা ঠিক বলেছেন। কিন্তু নিজের মন থেকে বিশ্বাসটা না এলে সেটা আসলে বিশ্বাস হয় না। বোঝা হয়ে যায়। আসি তাহলে।

হাতঘড়ির দিকে চেয়ে বিদায় নিতেই মাহিবার ডাকে থেমে যায় আহমাদ।

- দাঁড়ান! আমার জন্যে দোয়া করে যাবেন না!

- কীসের দোয়া?

- দোয়া করুন আল্লাহ যেন আমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম বিনিময় দেন। সেদিন না বললাম ধন্যবাদের থেকে এটা বেশি ভালো?

মনে পড়ার ভঙ্গিতে মাহিবার জন্য দোয়া করে আহমাদ। চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই শুনতে পায়,

- আমার সাথে আল্লাহ আপনাকেও দিক। আমরা দুজন তো একই!

অনাবিল এক শান্তি ঘিরে ধরে আহমাদকে। এমন দোয়া কি এপর্যন্ত কেউ তার জন্যে করেছে? উহু! মনে তো হয় না!

সদর দরজা পার হতেই পেছন থেকে এক উচ্ছল কণ্ঠ শুনতে পায়।

- আসসালামু আলাইকুম!

দৌড়ে বারান্দায় যায় মাহিবা। সাই করে চলে যায় আহমাদের বাইক। বিড়বিড়ায় মেয়েটা,

- আস্তাউদিউল্লাহ (আপনাকে আল্লাহর হাওয়ালায় দিলাম)

•• •• ••

ঘরে যেতেই আননোন একটা নাম্বার থেকে ফোন আসে। ধরবে কি না ভাবতে ভাবতেই রিং বেজে বেজে বন্ধ হয়ে যায়। পরেরবার কল আসতেই ধরে মাহিবা। গলার স্বর বেশ মোটা এবং কঠিন করে সালাম দেয়।

- ওয়া অলাইকুমুস সালাম। কি ব্যাপার কোনো সমস্যা?

মাহিবার অন্যরকম কণ্ঠস্বর শুনেই আহমাদের এই প্রশ্ন। মেয়েটা তো সবসময় উচ্ছল থাকে। তবে এখন কি হলো?

- ব্যাটা খবিশ! মেয়েদের ফোন করে শুনিস কোনো সমস্যা কি না!

রাগ, বিরক্ত ঝরে ঝরে পড়ছে মাহিবার স্বর থেকে।

ওপাশ থেকে এক হতাশ কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

- মাহিবা! আমি আহমাদ!

হতবিহ্বল মেয়েটা কান থেকে ফোন নামিয়ে স্ক্রিনে চোখ বোলায়। আনসেভ নাম্বার দেখে আবার ফোন কানে নেয়। সন্দেহী কণ্ঠে বলে,

- তাহলে নাম্বার সেভ নেই কেনো?

- আপনি আমার নাম্বার কেনো সেভ করেননি সেটা আমি কিভাবে বলবো?

চোখ মুখ খিচে ধরে মাহিবা। কি একটা বোকামি করলো! নিজের বরকে কি না খবিশ বলেছে! তার চেয়ে বড়ো কথা গলার স্বরটাই চিনতে পারেনি। এই লজ্জা কথায় রাখবে? হায় হায়! গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

- কিছু দরকার?

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আহমাদ বলে,

- আপনি ভার্সিটিতে যাবেন কি না সেটা শোনার জন্য। তাহলে আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যেতাম।

বিয়ের রাত থেকেই মাহিবার ইচ্ছা, স্বপ্ন একদিন আহমাদ তার সাথে স্বাভাবিক হবে। আর পাঁচটা দম্পতির মতো ওরাও একে অপরের সাথে মিলেমিশে থাকবে। দুদিন যেতে না যেতেই যে সেই স্বপ্ন পূরণের আভাস পাবে এ যেনো মাহিবার কাছে বহু প্রত্যাশিত জিনিসের অনাকাঙ্খিত উদয়। খুশিতে মাহিবা বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারে না। সময় নিয়ে বলে,

- আজকে স্কুল, ভার্সটি বন্ধ। আয়িশা, আফিয়া তো এজন্যই বাসায়।

- ওহ্ আচ্ছা! ঠিকাছে রাখি তাহলে।

- জি।

কল কাটতেই ফোনটা বুকে চেপে ধরে মাহিবা। হৃদপন্দনের গতি সেঞ্চুরি ছাড়িয়েছে বহুক্ষণ আগেই। ইশ! এই অসামান্য অনুভূতিটুকু যদি যত্ন করে বাক্সবন্দী করে রাখা যেতো! মন খারাপের সময় একটু খুলে দেখে নেওয়া যেতো! আহ! কি ভালোই না হতো!

চলমান.

(বি:দ্র: পেজের রিচ টাইম সকালের দিকে। চেষ্টা করবো সকালে পোস্ট করার জন্য, ইনশাআল্লহ্)