প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২৯
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২৯ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২৯
রাত দশটার কাছাকাছি। আহমাদ তখনও বাড়ি ফেরেনি। তবে এর মাঝে একটা ভালো কাজ করেছে। মেসেজের মাধ্যমে মাহিবাকে জানিয়ে দিয়েছে তার ফিরতে দেরি হবে। ক্ষুদে বার্তার প্রেক্ষাপটে সকলকে খাইয়ে মাহিবা অপেক্ষার প্রহর গুনছে। একটা বই হাতে নিয়ে বসে আছে সে। তবে মনোযোগ বইয়ে ধরে রাখা দুষ্কর হয় পড়ছে। বই বন্ধ করে ধপ করে উঠে পড়ে মেয়েটা। বারান্দায় যেয়ে একবার সামনের শূন্য হয়ে আসা রাস্তাটা দেখে ফের ঘরে আসে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কতক্ষণ নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। এলোমেলো চুলগুলোকে চিরুনির আঁচড়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে। মুখটা ধুয়ে এসে হালকা প্রসাধনী ব্যবহার করে। সুগন্ধির মোহিত আবেশ ধারণ করে ঘরের চারি ধারে চোখ বুলায়। যাক, গোছানো আছে। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশটার ঘরে গেলে চেনা বাইকের শব্দ পাওয়া যায়। দৌড়ে সদর দরজা খুলে দাঁড়ায় মাহিবা। মুখে হাসি, চোখের তারায় কাঙ্ক্ষিত মানুষের প্রতিচ্ছবি।
বাইকে তালা দিয়ে হেলমেট হাতে নিয়ে দাঁড়ায় আহমাদ। খুব বেশি ক্লান্ত লাগছে। সিড়ির রেলিংয়ে হাত দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। পরবর্তীতে ধীর কদমে দোতলার দিকে যায়। কদমের দিকে চেয়ে হাঁটতে থাকায় খেয়াল করে না সামনের মানবীকে। তবে অন্ধকার সিড়ি ঘর ড্রয়িং রুম থেকে আসা আলোয় আলোকিত হলে সামনে চোখ তুলে তাকায় আহমাদ। হাসি হাসি মুখে দাঁড়ানো মেয়েটাকে দেখে ক্লান্তির পারদ নিচে নামতে থাকাটা বেশ বুঝতে পারে। সালামের আদান প্রদান হলে ঘরে যায় আহমাদ। চারপাশের গোছানো আবহে শান্তির পরশ পায়। মিহি সুগন্ধি নাসারন্ধ্র ভেদ করে মস্তিষ্কে জানান দেয় সুসজ্জিত ঘরের সুন্দর পরিবেশ। সেই প্রভাব পড়ে আহমাদের দেহ মনেও। বিশ্রামের উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণ বসে। মাহিবা এসে রুটিন ভাঙ্গা আহমাদকে দেখে ধীর কণ্ঠে শুধায়,
- আপনার কি অনেক ক্লান্ত লাগছে?
- হুঁ।
আর কিছু জিজ্ঞেস করে না মাহিবা। ক্লান্ত মানুষটাকে প্রশ্ন বাণে জর্জরিত না করে নিজ কাজ করতে থাকে। আহমাদের হাতের কাছে প্রয়োজনীয় সব এগিয়ে দিয়ে খাবার আনতে চলে যায়। সাজানো খাবার এনে সামনে দিতেই হাতে মুখে পানির ছটা নিয়েই খাওয়া শুরু করে আহমাদ। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন না পেয়ে অভিমান হয় মাহিবার। অভিমানী কণ্ঠেই বলে,
- আমি খেয়েছি কি না আপনি একটু শুনলেনও না!
গতিতে নড়তে থাকা চোয়াল নাড়ানো বন্ধ হয়ে যায়। মাহিবার মুখের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বুঝত পারে খুব স্বার্থপরের মত কাজ করছিলো সে। বিব্রত হয়ে বলে,
- সরি। খেয়েছো?
হৃষ্টচিত্তে মাহিবা বলে,
- না খাইনি। আপনার জন্য বসে থাকি। আপনি খেতে বসেই আমার কাছে শুনবেন আমি খেয়েছি কি না? ঠিকাছে?
- আচ্ছা। খেয়ে নাও।
তৎক্ষণাৎ নিজ খাবার নিয়ে বসে পড়ে মাহিবা। সারাদিনের জমানো গল্প উগড়ে দিতে থাকে। এক পর্যায়ে বলে,
- জানেন আজ কলেজে কি হয়েছে?
- না তো। কি হয়েছে?
ঠিক এভাবেই আয়িশার সাথে বলে আহমাদ। মেয়েটা উৎফুল্ল হয়ে কথা শুরু করে। ইচ্ছা করেই আজ একইভাবে মাহিবার কাছে বলে। একই রকম উৎসাহ দেখতে পায় মেয়েটার আদলে।
- আমার এক বান্ধবীর বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় তিন বছর হবে। বিয়েটা প্রি প্ল্যানড ছিলো না। যাই হোক ওর হাজবেন্ড ওর সাথে ভালোই ব্যবহার করতো। কিন্তু যখন ওকে নিয়ে নিজের কাজের জায়গায় থাকতে শুরু করলো তখন রুম আলাদা করে দিলো।
- আচ্ছা।
মুখের খাবার শেষ করে মাহিবা আবার বলে,
- কিন্তু স্বামী স্ত্রী কি এভাবে থাকে নাকি? তাই যখন আমার বান্ধবী বিষয়টা নিয়ে খোলাখুলি কথা বললো তখন ওর বর নাকি বলেছে ওরকম হঠাৎ বিয়ে মানতে পারছে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তো আমার বান্ধবী যখন জিজ্ঞেস করলো তাহলে এভাবে কতদিন চলবে? বা ভবিষ্যতে কি হবে তখন ওর বর বলে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে এটা যেনো কাজে লাগায় তারপর কিছুদিন গেলে ডিভোর্স হয়ে যাবে। তখন যেনো কোনো বিপদে পড়তে না হয় তাই যেনো এখন ভালো করে পড়ে।
আহমাদের খাওয়া শেষ। ক্লান্তি অনেকটা কমে গেছে। তবুও সে উঠছে না। মেয়েটা আগে কথা শেষ করুক।
- আরো নাকি ওকে বলেছে ঐ লোকের অন্য জায়গায় সম্পর্ক আছে। তারপর থেকেই মেয়েটা কেমন হয়ে গেছিলো জানেন? কেমন নির্জীব মতো। বাড়ির অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না। ওখানে ফিরে গেলে হয়তো আবার বিয়ে দিতো কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতো। মেয়েটার মনটা একদম মরে গেছিলো। কিন্তু ওর সব রাগ ও পড়াশোনার উপরে খাটায়। দুটো মানুষ এক ছাদের নিচে থাকলেও কথাবার্তা এমনকি মুখ দেখাদেখিও হতো না। ও শুধু পড়তো আর পড়তো। তারপর একদিন খুব ভালো সাবজেক্টে ভালো ভার্সিটিতে চান্স হয়ে গেলো। তারপর কি হলো বলুন তো?
- আমি কিভাবে বলি?
- আহা! গেস করুন না!
- উমম! ওদের ডিভোর্স হয়ে গেলো?
- না। রেজাল্টের পর মানে প্রায় দুই বছর পর বান্ধবীর বর ওকে বলে এতদিন নাকি মিথ্যে বলেছে যেনো ও ভালো করে পড়ে। বিয়ের পর তো মেয়েদের পড়াশোনা আর আগে মতো হয় না। তারপর আবার যদি লোকটা বলে দিতো আমার বান্ধবীকে ভালোবাসে তাহলে তো আর পড়াশোনাই হতো না। দারুন লাগলো না ঘটনাটা? একদম গল্পের মতো বলুন!
হতাশ স্বরে আহমাদ বলে,
- না।
- কি না?
- দারুন না।
- কেনো?
- তুমি একটু কমন সেন্স খাটাও। ততক্ষণে এগুলো রেখে আসো। আমিও হাত ধুয়ে নি।
সব কাজ শেষ করে আসে মাহিবা।
- আমি তো বুঝলাম না।
- এদিকে আসো। দরজা বন্ধ করে দাও।
দরজা বন্ধ করে হাত মুছে আহমাদের পাশে জায়গা করে নেয় মাহিবা। খাটে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আহমাদ বলে,
- একটা জিনিস দেখো। তোমার বান্ধবীর পড়াশোনা আই মিন মেয়েদের পড়াশোনা, এটা ডিভোর্সের উপর নির্ভরশীল হবে কেনো? পড়াশোনা তার নিজের জায়গায় থাকবে। মানুষের জীবনে ডিভোর্স না হলে কি পড়াশোনার দরকার নেই? অবশ্যই আছে। নিজেকে জানার জন্য সঠিক পড়াশোনার দরকার আছে। এমন তো না যে অনেক পড়াশোনা করলে ডিভোর্স হবে না? বা পড়াশোনা না জানলে ডিভোর্স হবে?
মনোযোগী মাহিবা বলে,
- আমার মনে হয়েছে এটা বলা হয় ডিভোর্স পরবর্তী সময়ের জন্য। মানে তখন যেনো কোনো মেয়েকে ভরণ পোষণের সমস্যায় ভুগতে না হয়। নিজেরটা নিজে করে খেতে পারে তাই জন্য।
- ডিভোর্স হয়ে গেলে সে বসে থাকবে কেনো বলো তো? তার তো উচিৎ নিজের জীবন সাজানোর চেষ্টা করা। আরো যখন তার কোনো সন্তান নেই, বয়স কম তখন কেনো সে নিজেকে আরেকবার সুযোগ দেবে না। আর কাজের বিষয়টাও আলাদা। তার ইচ্ছে হলে নিজ দায়িত্ব পালন করে কাজ করবে কিন্তু তার জন্য ডিভোর্স হতে হবে কেনো?
চুপ করে থেকে মাহিবা ভাবতে থাকে বিষয়টা। মাহিবার নীরবতার মাঝেই আহমাদ যোগ করে,
- আরেকটা বিষয় দেখো। দুজন ছেলে মেয়ে যখন তারা স্বামী স্ত্রী হিসেবে সার্টিফাইড তারা একই বাড়িতে ওভাবে আসলে থাকতে পারে না। আসলে মানুষের ন্যাচরটাই এমন। প্রথম দিকে যখন তোমাকে আমি মেনে নিতে মানে এখনকার মতো এতটা জানতে পারিনি তখন কিন্তু আমাদের মাঝেও দূরত্ব ছিলো। কিন্তু সেটা সাময়িক। আর ঐভাবে থাকতে হলে এখানে অবশ্যই কষ্ট পেতে হবে। আর বৈধ সম্পর্কে অকারণে এটাকে আমি জুলুম মনে করি। সেকেন্ডলি তোমার বান্ধবীর বরের উৎসাহ দেওয়ার সিস্টেমটা জঘন্য। সে মেয়েটাকে বলেছে তার অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে। এতে মেয়েটা পড়েছে ঠিক কিন্তু কতোটা কষ্ট পেয়েছে সেটা বুঝতে পারছো? দুইটা বছর! লিটেরালি দুইটা বছর সে নিজের মাঝে জেনে এসেছে তার হাজবেন্ডের অন্য কারো সাথে অ্যাফেয়ার আছে। তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই দুটো বছরে কি মেয়েটা মরে যেতে পারতো না?
- হুঁ।
- তখন নিজের মাঝে এই কষ্টটা নিয়ে মরতে হতো যে তার হাজবেন্ড প+রকী/য়া করে। লোকটার জীবনে তার কোনো স্থান নেই। কি রকম একটা টেরিবল সিচুয়েশন ভাবতে পারছো? আর লাস্টলি পড়াশোনা করার জন্য এমন উৎসাহই বা দিতে হবে কেনো? এটা কোন টেকনিক? ভালোবাসা তো কোনো দুর্বলতা না। এটা নিজেই একটা শক্তি। সেই শক্তির জোরে মানুষ কতো কিছু করতে পারে। তাহলে সেই লোক তো ভালোবেসেই তাকে উৎসাহ দিতে পারতো। তাই না?
- হুঁ।
- আমার তো মনে হয় তোমার বান্ধবীর উচিৎ লোকটাকে ঠাটিয়ে দুটো চড় দেওয়া। এটা কি কোনো খেলা নাকি? বাই দা ওয়ে! তোমার বান্ধবী কি করেছে?
উৎসুক আহমাদের দিকে চেয়ে শুষ্ক হেসে মাহিবা বলে,
- ও ই তো আমাকে এসব বলেছে। নাচতে নাচতে বলেছে। খুবই খুশি ও।
- হাহ্! মেয়ে মানুষের বুদ্ধি! কমন সেন্সের মাগফিরাত কামনা করে খবর ছড়াচ্ছেন উনি। ভালো!
- ইয়ে... আপনি এতো রেগে গেলেন কেনো?
- রাগ করিনি। তুমি ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো। নিজেকে তোমার বান্ধবীর জায়গায় বসিয়ে দেখো। বিষয়টা আসলে কেমন?
আহমাদের শান্ত স্বরের বিপরীতে ভাবনার নৌকা চালানো শুরু করলেও মাঝ পথে থেমে যায় মাহিবা। চমকে উঠে বলে,
- আমি কারো জায়গায় বসতে পারি না। বসতে চাইও না।
হেসে ফেলে আহমাদ। মেয়েটার অবস্থা দেখার মতো হয়েছে।
•• •• ••
নিস্তব্ধ দুপুরে কিছু দূরের বট গাছ থেকে পাখির কলতান ভেসে আসছে। মাহিদের সাথে কথা বলে স্মৃতি পাতা ওল্টাতে বসেছিলো মাহিবা। চিত্র পটে শেফালী বেগমের বাড়ি যাওয়ার দিনটা ভেসে উঠতেই এক এক করে সেদিনের সব ঘটনা মনে পড়ে। ছোট্ট একটা কথা মনে হতেই থমকে যায় সে। আরে! এতদিন এই কথাটা মনে হয়নি কেনো?
তার ঘরেই খেলছিলো আয়িশা। মেয়েটাকে ডেকে কাছে টেনে মাহিবা জিজ্ঞেস করে,
- আচ্ছা আয়িশু! স্কুলে তোমার কেমন লাগে?
- ভালো লাগে। জানো ভাবিমণি আমার পুতুলের নাম কি দিয়েছি?
মন তার হাতে থাকা পুতুলের দিকে। কি উৎফুল্ল দেখায় মেয়েটাকে!
- কি রেখেছো?
- পিনু!
- পিনু? এটা আবার কেমন নাম?
- পুতুলের নাম পিনু! সুন্দর না? শুনতেই কি কিউট কিউট লাগছে না? পিনু পিনু...
হাসে মাহিবা। কি অদ্ভুত নাম রেখেছে মেয়েটা।
- আচ্ছা। পিনু একটু ঘুমাক। তুমি আমার কথা শোনো।
- দাঁড়াও। ওর হয়ে কাঁথা দিয়ে দিই। হ্যাঁ এবার বলো।
- তোমাদের স্কুলে ছেলে আছে না?
- আছে তো।
- ছেলেরা কি বিরক্ত করে?
- সবাই করে না। দুই একজন আছে। খুব দুষ্টু। সবার সাথে দুষ্টুমি করে।
- তোমার সাথে কখনো করেছে?
- করে তো। প্রতিদিনই। এই চুল টেনে দিলো, আবার ব্যাগ ফেলে দিলো। খাতা সামনে দিলে কখনো কখনো পেছনে দিয়ে দেয়। সবগুলো বদ।
- আর কিছু করে না তো?
ভয়ে বুক কাঁপে মাহিবার। কুচিন্তা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। নিত্য ঘটে যাওয়া খবরের কাগজের ঘটনাগুলো একত্রিত হয়ে বুকে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।
- না। আর কি করবে?
এদিকে আয়িশার খেয়াল নেই। সে পিনুকে দেখতে ব্যস্ত। ওর ঠিকঠাক ঘুম হচ্ছে তো?
বুক ভরে দম নেয় মাহিবা। অযথা চিন্তা ওকে ভয়ে ফেলে দিয়েছিলো। তবে চিন্তার পুরোটাই অহেতুক নয়। আয়িশাকে কোলে নিয়ে খুব নরম সুরে সে বলে,
- ভাবিমণি এখন কিছু কথা বলবো। খুব মন দিয়ে শুনবে। ঠিকাছে?
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় আয়িশা। সে তো ভাবিমণির বাধ্য ননদ!
মাহিবা ধীর স্থির ভাবে, নরম কণ্ঠে, সরল ভাবে অনেক কিছু তাকে বোঝায়। যেকোনো ছেলের সাথে তার কতোটা দূরত্ব হওয়া উচিত, কেনো হওয়া উচিত সেটা বোঝানোর চেষ্টা করে। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ সম্পর্কিত সরল একট পাঠও পেয়ে যায় আয়িশা। মেয়েটার কৌতূহল দমিয়ে সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে মাহিবা। এক পর্যায়ে আয়িশা বলে,
- ভাবিমণি! গার্লস স্কুলে পড়লে ভালো হয় না?
- আমিও ভাবছিলাম তোমার দাদাভাইকে বলবো। কিন্তু যেখানেই পড় না কেনো সব জায়গায় সাবধানে থাকতে হবে। বুঝেছো?
- হুঁ।
•• •• ••
অক্লান্ত পরিশ্রমের পর কাল আহমাদের সেই কাঙ্খিত দিন। খুব তোরজোড় করে গোছগাছ করছে ছেলেটা। প্রত্যাশিত সাফল্যের আয়োজনে যেনো উন্মুখ হয়ে আছে সে। সব কাজে শেষ একবার চোখ বুলিয়ে সেগুলো গুছিয়ে রাখে। বিশাল এক শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়তেই মনে হয় একটা ফাইল অনেকক্ষণ ধরে দেখেনি। তড়িৎ চোখ মেলে সেটাকে খুঁজতে শুরু করে। হন্তদন্ত হয়ে খুঁজতে খুঁজতে সব উলোট পালোট করে ফেলে। সেই ক্ষণে ঘরে প্রবেশ করে মাহিবা। চোখ কপালে ওঠে তার। ঘরের এ কি হাল!
- কি খুঁজছেন আপনি?
- একটা ফাইল।
- কি রঙের? আমাকে বলুন আমি খুঁজি। দেখি সরেন তো! সব উল্টা পাল্টা করে দিলো। আল্লাহ...
- আমার বাদামি রঙের ফাইলটা কই গেলো?
- ওর তো আর হাত পা হয়নি। যেখানে রেখেছেন সেখানেই আছে।
- কোথায় রাখলাম? উফ!
- অনেক জরুরী?
- না, অনেক না। কিন্তু না পেলে কেমন লাগছে।
- আচ্ছা দুজন মিলে খুঁজি চলুন। শান্ত হোন। অতো যখন জরুরী না তাহলে এতো হাইপার হওয়ার দরকার নেই।
বেশ কিছু সময় নিয়ে খুঁজেও সেই ফাইল পাওয়া গেলো না। আহমাদের ক্লান্ত, চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে মাহিবা জিজ্ঞেস করে,
- আচ্ছা, অফিসে ওটা নিয়ে গেছিলেন?
- হ্যাঁ।
- তাহলে হতে পারে ওখানেই আছে।
- কি জানি কোথায় গেলো!
- সিসিটিভি আছে না অফিসে? কাল একটু সকাল করে যেয়ে একবার চেক করে দেখবেন কাজ শেষে কোথায় রেখেছিলেন। দেখি শুয়ে পড়ুন তো। লম্বা একটা ঘুম দিন।
শুয়ে পড়লেও আরাম পায় না আহমাদ। ছটফট করতে থাকে। অবস্থা দেখে মাহিবা আস্তে করে তার পাশে বসে ধীর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করে। কিছু সময় পার হতেই আহমাদের ঘন শ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়। যাক! ঘুমিয়েছে তবে!
• • •
সকালের সূর্য মানেই ব্যস্ততার অ্যালার্ম। যে নিজে জেগে ওঠার সাথে সাথেই পুরো ধরিত্রীকে জানান দেয় তার অস্তিত্ব। জানিয়ে দেয় ঘুমের সময় শেষ হয়েছে। কাজ শুরুর সময় হয়ে গেছে।
নির্ধারিত রুটিনের অংশ হিসেবে সকল কাজ সেড়ে অফিসের পথ ধরতে গেলেই তাকে টেনে ধরে মাহিবা। বেশ কিছু সূরা পড়ে ফুঁ দিয়ে দেয়। সাথে বলে,
- আল্লহ আপনার কল্যাণ করুক। মায়ের থেকে দুয়া নিয়ে যান। বেশি টেনশন করবেন না। ফাইল না পাওয়া গেলেও আল্লহর নাম নিয়ে শুরু করবেন। আল্লহর উপর ভরসা রাখবেন।
হৃষ্টচিত্তে মায়ের ঘরের দিকে যায় আহমাদ। দুয়ার পর্ব শেষ করে চলে যায় নিচে। বাইক চালু করে চলে যাওয়ার আগে দেখতে পায় বারান্দার কোণায় এক নারী মূর্তি। সে জানে ওটা কে। মুখে আসা রোদের মাঝেই হাসি দিয়ে হাত নাড়ে সেই নারী মূর্তির উদ্দেশ্যে। মাহিবার মনে হয় তপ্ত রোদের মাঝে আহমাদের হাসিটা যেনো ঝিলিক দিয়ে উঠলো।
• • •
নির্ধারিত সময়ের বেশ আগে হলেও কর্মক্ষেত্র আজ সরগরম। নতুন কাজের জন্য সকলেই উৎসুক। আগে আগে চলে এসেছে প্রায় প্রত্যেক ডেস্কের কর্মী। অফিসে এসেই নিজ ডেস্কে এবং আশেপাশে ফাইলটা খোঁজে আহমাদ। না পেয়ে ম্যানেজারের কাছে সমস্যার কথা উল্লেখ করলে ভদ্রলোক সিসিটিভি ফুটেজ দেখার ব্যবস্থা করে দেন। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে ফুটেজ দেখতে থাকেন। দেখা যায় কাজের এক পর্যায়ে ফাইলটা আহমাদের অগোচরে নিচে পড়ে যায়। খেয়াল না করায় সেটা আর গুছিয়ে রাখা হয়নি। বেশ পরে অফিস বন্ধ হওয়ার সময় অফিসের পরিষ্কার কর্মী ফাইলটা পেয়ে নেড়েচেড়ে দেখেন। কি ভেবে সেটা নিয়ে পুরাতন ফাইলের স্তুপের মাঝে রেখে দেন। পুরো ফুটেজ দেখে স্বস্তির শ্বাস নেয় আহমাদ। তার মানে ফাইল হারায়নি। যাক! আলহামদুলিল্লাহ। ম্যানেজার ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে চলে যেতেই চোখের পাতায় ধরা পড়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। আহমাদসহ থমকে যান ম্যানেজার নিজেও। কন্ট্রোল রুমের দায়িত্ববান ব্যাক্তি সেই ক্ষণে ঘরে প্রবেশ করলেও তারও পদচারণা থেমে যায়। হায় হায় করে উঠলে সাড়া শব্দে এদিকে চলে আসেন অফিসের সকল কর্মী। উৎসুক হয়ে দেখতে থাকেন সিসিটিভি ফুটেজ। ঘৃণায় গা গুলিয়ে ওঠে আহমাদের। তড়িৎ মুখ ফিরিয়ে নেয় সে। ছিহ!
চলমান.