প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৪৪

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৪৪ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৪৪

দুঃসহ দিনের নিষ্ঠুরতার মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আহমাদের জন্য বোধ করি সেটা আরো কঠিন। অসহায় মানুষ সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথম প্রকার মানুষেরা তাদের অবস্থার কথা মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার যারা তাদের বুক ফাঁটে তো মুখ ফোটে না। পেটের দায়ে অস্থির হয়ে এদিক সেদিক ঘোরে তবুও মানুষকে বলতে পারে না তাদের দুরাবস্থার কথা। আহমাদ পরিবার এই দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। তাই তাদের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন। না পারে সইতে না পারে কইতে। বাস্তবতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যাচ্ছে নিষ্ঠুর সব করাঘাত।

শেয়ার কেনার মাস পেরিয়েছে। আহমাদ এখন সুস্থ। তবে বৈষয়িকভাবে সে সর্বশান্ত। জমি বিক্রি হয়ে গেছে। বাবার রেখে যাওয়া স্মৃতিটুকু টাকার বিনিময় হিসেবে দিয়ে দিতে হয়েছে। চাকরী তো কবেই গেছে। এর মাঝে দুই জায়গায় ডাক পড়লেও সমাপনী নির্বাচনে কোনোটাতেই সে টিকতে পারেনি। মায়াবাড়ির মেয়েদের পড়িয়ে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়েই চলতে হচ্ছে পাঁচ সদস্যের এই পুরো পরিবারকে। তার মাঝে থেকেই কিছু টাকা আবার বাড়ি ভাড়া হিসেবে ইফাদের হাতে তুলে দেয় আহমাদ। ছেলেটা নিতে চায় না। খুব সামান্য হলেও এখানে আহমাদেরও একট ভাগ আছে। কেউ না জানলেও সেটা তার জানা। তাহলে কেনো নিজের জায়গায় নিজেই ভাড়া দেওয়া? কঠোর বাক্যের বিপরীতে সেই টাকা ফেরত দেয় সে। সেই টাকা হাতে নিয়ে ঘরে ফেরে আহমাদ।

তাকে দেখেই ত্রস্ত হাতে কিছু লুকায় মাহিবা। আহমাদ খেয়াল করলেও সেটা না দেখার ভান করে। বলতে চাইলে নিজে থেকেই তাকে জানাবে। এখন যখন লুকোতে চাইছে তখন যেচে না শোনাই উত্তম।

- মাহি! টাকাটা রাখো তো।

শুয়ে পড়ে আহমাদ। বাস্তবতার ভারে সে বড্ড ক্লান্ত।

টেবিলে রাখা টাকা হাতে নিয়ে মাহিবা বলে,

- কিসের টাকা এটা?

- ভাড়ার।

- নিয়ে এলেন যে?

- ইফাদ নিলো না।

- ইফাদ ভাই তো আমাদের খুব ঋণী করে ফেললো।

আহমাদের পাশে বসে মাহিবা। জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে বলে,

- আচ্ছা, এই বাড়িতে তো জনসংখ্যা অনেক! এতগুলো মানুষ ইফাদ ভাই একা চালায় কিভাবে? মানে উনি তো এখনও তেমন কিছু করে না। তাহলে?

- ইফাদের পুরো পরিবার কানাডা থাকে। আংকেলের ওখানে বড়ো বিজনেস আছে। সেখানে ইফাদেরও ভাগ আছে। এখানে থেকে যতটা সম্ভব দেখাশোনা করে। আর কয়েকজন ডোনেশনও দেয়। তারা অবশ্য ওর পরিচিত। আমার সাথে তেমন যোগাযোগ নেই।

- উনার বাবার এতো বড়ো ব্যবসা তাহলে আবার উনি এখানে কেনো? আবার নাকি শেয়ার কিনেছেন নিজে নাকি কি করবেন..

- ওর কানাডা যাওয়ার কোনো শখ নেই। এখানে থেকেই নিজে কিছু করার ইচ্ছা। ওর কথা বাদ দিয়ে একটু মাথায় হাত দাও তো।

ভাবুক মাহিবার কোলে শুয়ে পড়ে আহমাদ। চিন্তার ঘুড়িতে লাগাম টেনে ঘরের এক কোণায় লুকিয়ে রাখা ছোট্ট একটা বক্সের দিকে তাকায় মাহিবা। সাদা কাগজে মোড়ানো এই বাক্সটা খুব যতনে আগলে রেখেছে গতো চার বছর ধরে। হাতে কিছু টাকা পয়সা এলেই অল্প কিছু হলেও ওখানে রাখার চেষ্টা করে সে। এই মাসে কিছু রাখতে পারেনি ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলো। খুলে দেখছিলো নতুন করে শেষ কবে কতোটা টাকা রাখা হয়েছে। সেই সময় ঘরে আহমাদ আসলে বিব্রত বোধ করে সে। মানুষটাকে এখনও এই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। বলার যথাযথ সময় এটা না। আর কিছুদিন যাক। মানুষটার চিন্তা একটু কমুক। তারপর বলা যাবে। এই বক্সের লক্ষ্য কবে পূরণ হবে কে জানে! কোলে শুয়ে থাকা অর্ধাঙ্গের দিকে তাকায় মাহিবা। লোকটা তার অন্তঃপুরে বয়ে যাওয়া ঝড়ের আভাস পেতে দেয় না। কিন্তু অস্তিত্বে মিশে যাওয়া মানুষটার ভেতর বাহির পুরোটাই সে পড়তে পারে। পুরোটা!

• • •

কামিজের এক জায়গায় বেশ বড়ো একটা অংশ ছিঁড়ে গেছে। ওড়না দিয়ে ঢেকে ঢুকে রাখলেও মাহিবা সেটা দেখে ফেলে। দেখেই নিজের বিয়েতে উপহার পাওয়া থ্রি পিস নিয়ে হাজির হয় মেয়েটা। পাঁচটা নিজের জন্য রেখে বাকি পাঁচটা আফিয়ার মাপে কেটে ফেলে। নাজমা বেগমের একটা সেলাই মেশিন ছিলো বলে বাঁচা। নতুবা এখন নতুন জামাকাপড় সেলাই করার সুযোগ কই? খারাপ লাগে আফিয়ার। মা, ছোটো বোন, ভাই সকলেই কষ্টে ভুগছে। সেখানে কি নতুন জামা পড়ে ঘোরা যায়? কিন্তু মাহিবা এতো আয়োজন করে বানাতে বসেছে যে মুখের উপর নাও করা যাচ্ছে না। ভাবুক আফিয়ার ধ্যান ভাঙিয়ে মাহিবা বলে,

- আফি! ভাবছি আর দুটো শাড়ি কেটে আয়িশুর জন্য ফ্রক বানাই। কেমন হবে বলো তো? একটা শাড়ি দিয়ে দুটো বানানো গেলে ভালো হবে। তাইনা?

ভাবনা নদীর কিনারে মাহিবাকে পৌঁছাতে দেখে চমকে যায় আফিয়া। কিছু বলে না। হাত চালাতে চালাতে মাহিবা আবার বলে,

- আমার কাছে দুটো শাড়ি আছে। রং দুটো অতো চকচকে না। মা কে দেবো ভাবছি। আর তোমার ভাইয়ের কাপড় চোপড় আছে। বিয়ে উপলক্ষ্যে পাওয়া কাপড় এখনও বেশ কিছু তোলা আছে। হয়ে গেলো না!

নিজের ভাবনার সাথে মাহিবার ভাবনা মিলে যাওয়ায় বিস্মিত হয় আফিয়া। নিজের পরিবারকে নিয়ে সে যেভাবে ভাবছে মাহিবাও কি সেভাবেই ভাবছে? এই পরিবারটাকে কি সে নিজের ভেবেছে? একদম নিজের?

•• •• ••

রাতের অর্ধ খসিত চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে আহমাদ। লম্বা বারান্দার অন্ধকার তার সাথী হয়েছে। মাহিবা আর সালেহা বেগম রাতের রান্নার জোগাড় করতে নাজমা বেগমের সাথে কাজ করছেন। নিঃশব্দেরা চিৎকার করে যেনো আহমাদকে তার অসহায়ত্ব জানান দিচ্ছে। আজও একটা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে সে। হবে বলে মনে হচ্ছে না। কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা সেখানে দরকার যেটা তার নেই। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আহমাদ। পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়ালে তার শুণ্যতা বুকে বিধে। আজকাল আর যখন তখন মানিব্যাগ বের করা হয় না। করে কি হবে? সেটা তো ফাঁকা পড়ে আছে আজ কতোদিন! হুট করে আসা এক দমকা হওয়া অনুভব করে আহমাদ। শেয়ারের কথা চিন্তা করে। সেটার কি খবর জানেনা। ইফাদ বলতে পারবে। তামিম নাকি শেয়ার কিনেছে বেশ কয়েকদিন আগে। বাকি বন্ধুরাও কম বেশি চাকরির খোঁজ করছে। তাকে স্বান্তনা জানিয়েছে। তবে সত্যি বলতে এখন তার স্বান্তনার থেকে বেশি প্রয়োজন টাকা। মাঝে মাঝে মনে হয় শেয়ার কেনার পুরো টাকাটাই কি অপচয় হয়ে গেলো? তখন এক ভয়ঙ্কর অনুভূতি হয়। হৃদস্পন্দন যেনো থেমে যায়। তেমনটা হলে সে হবে যাযাবর। কিছু থাকবে না তার আর। কিচ্ছু না! আর কিছু ভাবতে পারে না আহমাদ। কে যেনো দৌড়ে এদিকে আসছে। চোখ খুলে দেখতে ইচ্ছে করছে না। দমকা হওয়ার মতো যদি জীবনের মোড়টা হুট করে ঘুরে যেতো? একটা ব্যবস্থা যদি হয়ে যেতো?

- আহমাদ! আহমাদ!

হাপাতে হাপাতে আহমাদের কাছে এসে দাঁড়ায় ইফাদ। চোখ খুলে বন্ধুর দিকে ঘুরে তাকায় আহমাদ। কোমড়ে হাত রেখে দম নিয়ে ইফাদ বলে,

- ঘটনা তো ঘইটা গ্যাছে দোস্ত!

- কি হইসে?

আহমাদের কণ্ঠস্বর শান্ত। যেনো নতুন কিছু ঘটার আশা সে ছেড়ে দিয়েছে। মোবাইল বের করে সম্প্রতি প্রচার হওয়া একটা ব্যবসা সম্পর্কিত খবর আহমাদকে দেখায় ইফাদ। একটু অনিচ্ছা নিয়েই সেদিকে তাকায় আহমাদ। দুইদিন আগেই নিজের অ্যান্ড্রয়েড ফোনটা সে বিক্রি করে দিয়েছে। তার বদলে কিনেছে ছোট্ট একটা বাটন ফোন। যদিও কেউ খেয়াল করেনি বিষয়টা। খেয়াল না করলেই ভালো। তার টাকা নেই তাই সে ফোন বিক্রি করে দিয়েছে এটা তো আর জনে জনে বলে বেড়ানোর বিষয় না। কিন্তু ইফাদের ফোনে অন করা ভিডিওর বিষয়বস্তু স্নায়ুকোষে আঘাত করতেই স্থির হয়ে যায় ছেলেটা। বুকের কাছে ভাঁজ করে রাখা হাত দুটো শক্তির অভাবে বন্ধনহীন হয়ে যায়। গভীর মনোযোগ ভিডিওতে নিবদ্ধ রাখার কারণে ভুলে যায় চোখের পলক ফেলতেও। বার্তা শেষ হলে ইফাদ কিছু বলার আগেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে সে। ইফাদ প্রথমে ভয় পায়। চমক নিতে না পেরে কি বন্ধু জ্ঞান হারালো? কিন্তু না। হু হু শব্দের কান্নায় তার ভুল ভাঙ্গে। সিজদায় পড়ে কাদঁছে আহমাদ। মন খুলে, গলা ছেড়ে। আশেপাশে কেউ নেই। তাই এই শব্দে কারো ছুটে আসার সম্ভাবনাও নেই। প্রতি পদে পদে পদে থাকতে চাওয়া বন্ধুর এই কাজেও সে সায় দেয়। অহর্নিশি নির্ঘুম থাকা বন্ধুর চোখ থেকে নির্গত হওয়া সুখাশ্রু সে থামায় না। বন্ধুর পাশে যেয়ে, কাছে থেকে সেও লুটিয়ে পড়ে সিজদায়। চোখ বন্ধ করে শুকরিয়া জানায় ঐ মহামহিমের যার দয়ায় এতো গুনাহ করার পরেও সে সুস্থ, জীবিত।

তিন মিনিটের ভিডিওর বার্তাটুকু ছোটো হলেও সেটা আহমাদের জন্য ছিলো বিশাল কিছু। সালেহা বেগমের কাছে যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে চায় আহমাদ। তবে সংকোচ কাটিয়ে উঠতে পারে না। জলে মাখা চোখ নিয়ে জানায় ঘটনা। তার কেনা এমনকি ইফাদ এবং তামিমের কেনা সেই অল্প কিছু শেয়ারের দাম এখন আকাশ ছুঁয়েছে। কিভাবে হয়েছে, কবে হয়েছে সেটা সে জানার চেষ্টা করেনি। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে তার অংশের শেয়ার এখন বিক্রি করলে নতুন কিছু করার টাকা অনায়াসে পেয়ে যাবে সে। আরো কিছু করতে পারবে বলেও ধারণা করে আহমাদ। মায়ের শিয়রে বসে স্বপ্ন দেখে অগোছালো এই জীবনটা গুছিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপের নীল ছবি। মাহিবা চেয়ে চেয়ে দেখে অর্ধাঙ্গের অর্ধসিক্ত সুখী চোখ।

চলমান.