প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৪৩

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৪৩ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৪৩

অর্ধ সুস্থ পা নিয়েই ছোটো চাচার বাড়িতে হাজির হয়েছে আহমাদ। উদ্দেশ্য জমি জমা সংক্রান্ত কিছু আলাপ আলোচনা করা। সাথে সঙ্গী হয়েছে মাহিবা। অসুস্থ স্বামীকে এক মুহুর্ত একা ছাড়তে সে নারাজ।

দীর্ঘ দিন পর বাবার আদলের সাথে কিঞ্চিৎ মিল সম্পন্ন এই পুরুষের সাথে তার সাক্ষাৎ। অবশ্য ছোটো চাচা নামক মানুষটা প্রায়ই ফোন করে তার খোঁজ খবর নিয়েছে। লোকটার দিকে তাকালে এক অদ্ভুত টান অনুভব করে আহমাদ। হয়তো বাবার চেহারার সাথে মিল আছে বলে। কে জানে?

- তুই তাহলে জমি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিস?

কথা শুরু করেন ছোটো চাচা।

- জি চাচ্চু। এছাড়া আমার হাতে আর কোনো উপায় নেই।

ছোটো চাচার পাশে ছোটো চাচী এবং আহমাদের পাশে মাহিবা বসা। এই পর্যায়ে ছোটো চাচী বলেন,

- কোনো উপায় নেই এমন কিন্তু না। কতো এনজিও ঋণ দেয়! সেখানে একবার যোগাযোগ করে দেখতে পারো।

- আমার নিজের কোনো বাড়ি নেই চাচী। আবার তার উপরে এখন বেকার। যতদূর জানি এক্ষেত্রে ঋণ পাওয়া ঝামেলা হবে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা এসব জায়গায় চড়া সুদ নেয়। যেটা দেওয়ার কোনো ইচ্ছা বা সামর্থ্য কোনোটাই আমার নেই।

- দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কতকিছুই করতে হয়। তুমি এই যে আমাদের পাশের বিল্ডিংটা দেখছো না? এটা পুরো এই লোনের উপরে করা। এখন তো ওদের কোনো কাজ না করলে চলে। বাড়ি ভাড়া দিয়েই পুরো মাস বসে খেতে পারে।

মেঝের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসে আহমাদ।

- দুর থেকে কতো জিনিসই তো দেখতে সুন্দর লাগে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন লোন পরিশোধের টেনশনে ওদের শরীরে কতো রোগ বাসা বেঁধেছে। এটা একটা ফাঁদের মতো। একবার ঢুকলে আর বের হওয়ার উপায় নেই।

কথা বাড়ান না ছোটো চাচী। এসব সম্পর্কে তার জানাশোনা কম। মনে হয়েছিল এটা একটা সমাধান হতে পারে। তাই বলা।

- সে যাই হোক। বাপের ভিটা বিক্রি করে দিবি?এটা ছাড়া তো তোর কোনো জমি-টমিও নেই। যতদূর জানি ভাবিও বাপের বাড়ি থেকে তেমন জমি-জমা পায়নি। হাত একদম ফাঁকা করা কি ঠিক হবে?

- একটা রিস্ক নিয়ে দেখতে চাচ্ছি চাচ্চু। এছাড়া চাকরির জন্য বেশ কিছু জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছি। এর মাঝে একটা চাকরি হয়ে গেলে তো হলোই।

- বেশ। তাহলে আমি ব্যবস্থা করছি। পারলে আমিই তোমাকে টাকা ধার দিতাম। কিন্তু আমার অবস্থা তো জানোই। আচ্ছা আমি তোমাকে জানাবো কবে প্রসেসিং শুরু হয়।

- ঠিকাছে। উঠি তাহলে।

- না না সে কী! তোমরা আসবে বলে আমি রান্না করেছি। না খেয়ে যাবে নাকি? এই বউমা! আসো তো তুমি!

ছোটো চাচীর জোরাজুরিতে থাকতে বাধ্য হয় তারা। শেষ বিকেলের দিকে বাড়ির পথ ধরে আহমাদ-মাহিবা দম্পতি।

পথে যেতে যেতে আহমাদকে বেশ অন্যমনস্ক লাগে মাহিবার কাছে। চাচার আশঙ্কা সূচক কথা হয়তো আহমাদের বিশ্বাসের প্রাচীরে চিড় ধরিয়েছে। তেমনটাই লাগে মাহিবার কাছে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা আহমাদের বাহু ঝাঁকিয়ে বলে,

- কি ভাবছেন?

- তেমন কিছু না।

- ভয় পাচ্ছেন?

- একটু।

- ভয় পাবেন না। আল্লহ ভরসা।

বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর চলমান রিকশায় বসে চলতে থাকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আনমনে মাহিবা বলে,

- মানুষের জীবনটা একটা পাহাড়ের মতো জানেন? পাহাড়ের চূড়ার স্থায়িত্ব কিন্তু একটুখানি। এর বেশিরভাগই ঢাল। মানুষের জীবনকেও আমার তেমনই লাগে। সাফল্যের শিখরে ওঠার কি অদম্য চেষ্টা! তারপর আসে সফলতা। তারপর আবার পর্যায়ক্রমে অবনতি। সবার ক্ষেত্রে এমন না হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উন্নতির পর অবনতি আবার অবনতির পর উন্নতি এমনই হয়ে থাকে। ঢাল পেরিয়ে চূড়া, চূড়ার পরে ঢাল। তবে ডিউরেশন একেকজনের একেকরকম হতে পারে। কারো বাবা সফল তো ছেলের দুরাবস্থা আবার দেখা যায় নাতি সফল। কেউ আবার একজীবনেই সফলতা, ব্যর্থতা সব দেখে ফেলে। এটা আসলে আহামরি কোনো বিষয় না। রিজিকে বিশ্বাস করেন তো? আপনার ভাগ্যে বরাদ্দ খাদ্যের একটা ক্ষুদ্র দানাও অন্য কেউ পাবে না। তাহলে আর চিন্তা কি? আল্লহর নামে শুরু করুন। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করুন। বাকিটা আল্লহর উপর ছেড়ে দিন।

আনমনে জ্বালানো মশালটা আহমাদের মনে দুপ দুপ করে জ্বলতে থাকা আশার প্রদীপে আরো একটু শিখার জোগান দেয়। গোধুলীর লালাভ আকাশে তাকিয়ে আহমাদ স্বপ্ন দেখে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের।

• • •

এর পরের ঘটনা গুলো খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। জমি বিক্রির টাকা হাতে পেয়ে সাথে মাহিবার দেওয়া টাকা মিলিয়ে শেয়ারের একটা ছোট্ট অংশ কিনে ফেলে আহমাদ। এদিক সেদিক চাকরির খোঁজ করতে থাকে। আফিয়া, মাহিবার পড়াশোনা স্থগিতের ব্যাপারে আহমাদ জানে। তবে এক্ষেত্রে কিছু করার মতো সে পাচ্ছে না। বর্ষ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তার কাছে নেই। চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেখা যাক কি হয়।

• • •

এক বিকেলের কথা। সালেহা বেগমের পিছু পিছু আঁচল ধরে ঘুরছে আয়িশা। বারবার বুঝিয়েও যখন কাজ হয়নি তখন সালেহা বেগম মেয়েকে ওভাবেই ছেড়ে দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর একাই ঠিক হয়ে যাবে। মাহিবা তখন পড়াতে ব্যস্ত। মায়ের কাছে কাজ না হওয়ায় ভাইয়ের কাছে যায় আয়িশা।। আহমাদ তখন ইফাদের সাথে কথা বলছিলো। ঘরে যেয়ে আহমাদের কোলে উঠে ইফাদকে উদ্দেশ্য করে ভ্রু কুঁচকে আয়িশা বলে,

- সবসময় আমার দাদাভাইয়ের পিছে লেগে থাকো কেনো? তোমার আর কোনো কাজ নেই?

অবাক হয়ে ইফাদ বলে,

- আমি কি তোর ভাইকে ইভটিজিং করছি নাকি? নাকি নিজে থেকে এসেছি? তোর দাদাভাইই আমাকে ডেকেছে। ডেকে এনে এভাবে অপমান না করলেও পারতি আহমাদ।

হতাশ সুরে শেষটা আহমাদকে উদ্দেশ্য করে বলে ইফাদ। মুচকি হাসে আহমাদ। আয়িশাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

- কি হয়েছে? টেম্পার এতো হট কেনো হুম?

- ও দাদাভাই! আমাকে একটু বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাও না! কতদিন ঘুরতে যাই না।

আস্তে ধীরে আহমাদের ঠোঁটের হাসি কমে আসে। কোনো রকম শখ পূরণের মতো অবস্থায় সে নেই। একে অসুস্থতা তার উপর আবার আর্থিক সংকট। যেটুকু টাকা হাতে ছিলো সেটাও তার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে চলেছে। বোনকে ঠান্ডা করতে আহমাদ বলে,

- দাদাভাইয়ের পা তো এখনও ঠিক হয়নি সোনা। কিভাবে যাই বলো?

- তাহলে আম্মুকে বলো না একটু নিয়ে যেতে! কতোদিন কোথাও যাই না! আমার একটুও ভালো লাগছে না।

থেমে যায় আহমাদ। এর বিপরীতে কি বলা যেতে পারে?

বন্ধুর পাংশু মুখ ইফাদের নজর এড়ায় না। হৈ হৈ করে বলে,

- অ্যা'টম বো'মা! তোকে আমি ঘুরতে নিয়ে গেলে কেমন হয়? শুধু একটা শর্ত মানতে হবে।

আগ্রহী হয়ে ওঠে আয়িশা। আপাতত ঘুরতে যেতে পারলেই হলো। সেটা যেভাবেই হোক না কেনো!

- কি শর্ত?

- তুই আমার জন্য মেয়ে খুঁজবি বুঝলি? তোর ভাই আমার সামনে স্বামী সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে এসব সহ্য করা আমার জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পারবি না?

- রাস্তায় রাস্তায় মেয়ে খুঁজে বেড়াবো?

- হ্যাঁ!

- হায়রে কপাল! আন্টিকে বললেই তো হয় তার ছেলের স্বামী সাজার শখ জেগেছে। তাহলে আন্টিই খুঁজে দিতে পারে।

- অতো কথা বুঝিনা। তুই খুঁজলে চল নাহলে আমি গেলাম।

বলে উঠতে গেলেই তার সাথে যোগ দেয় আয়িশা। হাওয়ায় হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কতো কি বলে যায় মেয়েটা! সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহমাদ। চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকে পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি।

- আসবো দাদাভাই?

চোখ খুলে দরজার কাছে নাফিম এবং হাসানকে দেখতে পায় আহমাদ। অনুমতি দিলে তারা ভেতরে আসে। আহমাদের কাছে বসে দুজন।

- কি রে? কি খবর তোদের?

- কি আর খবর! মানুষরে দেখি আর আফসোস করি।

হতাশ সুরে বলে হাসান। আহমাদ জিজ্ঞেস করে,

- কেনো? কি সমস্যা?

- মানুষ পা ভেঙে বসে বসে বউয়ের আদর খাচ্ছে। আর আমরা পা ভাঙলে তিন বেলার খাবারটাও কপালে জুটবে না।

- তোরা আবার শুরু করলি!

নাফিমের আফসোসের বিপরীতে বলে আহমাদ। কণ্ঠে তার বিব্রত ভাব।

- থাক থাক নাফিম। বাদ দে। আপনা টাইম আয়েগা!

- হ সেটাই!

- দাদাভাই!

আহমাদকে ডাকে হাসান।

- বল।

- এটা নাও।

সাদা একট খাম বাড়িয়ে দেয় নাফিম।

- কি এটা?

- আরে! নিয়েই তো দেখো!

নাফিমের হাত থেকে খামটা নিয়ে খোলে আহমাদ। বেশ কিছু টাকা রাখা সেখানে। জিজ্ঞাসু চোখে ছেলে দুটোর দিকে তাকালে হাসান বলে,

- আমরা দুটো টিউশনি করছি দাদাভাই। অর্ধেক টাকা ইফাদ ভাইকে দেবো। আর অর্ধেক তোমাকে দিলাম।

আহমাদ কিছু বলতে গেলেই হাসান বলে,

- না কোরো না দাদাভাই। রাখো প্লিজ!

কথা পায় না আহমাদ। ছোট্ট দুটো ছেলের স্বচ্ছ ভালোবাসার আরো একটা নমুনা পায় সে।

চলমান.