প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৪২
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৪২ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৪২
মাসের বেশ কিছুদিন হাতে থাকতেই ইয়াসির পরিবারের স্থানান্তর ঘটে। পুরো মাসের ভাড়া দিয়েই জায়গা ত্যাগ করে তারা। মাহিবার কাছে টাকার উৎস জানতে চাইলে আহমাদের প্রশ্নের উত্তরে নীরব থাকে সে। কথা বাড়ায় না আহমাদ। পরেও জানা যাবে এই বিষয়ে। সংকটের সময় ইফাদের প্রস্তাব একদম যুগোপযোগী লাগে আহমাদের কাছে। পরিচিত জায়গা ছেড়ে মায়াবাড়ির দুই কক্ষে সংসার পাতে মাহিবা। আজহার উদ্দিন এবং নাজমা বেগম বেজায় খুশি। প্রত্যহ তাদের মানিক এবং তার বউকে সামনা-সামনি পাওয়া তাদের কাছে চাঁদ হাতে পাওয়ার সমান। মাহিবার মা-বাবা এসকল খবরই জানেন। তাদের বাড়িতে থাকার আহ্বান জানালেও ইয়াসির পরিবার যে সেটা এক বাক্যে নিষেধ করবে সেটাও ভালোই জানতেন। মেয়েকে পইপই করে বলে দেন যেনো কোনোভাবেই স্বামীর দুঃসময়ে তাকে হেয় না করে।
আর কিছুদিন পরেই আহমাদের চেকআপ। পরবর্তী করণীয় জানাবেন চিকিৎসক। ছেলেটার যথাসাধ্য যত্নের চেষ্টা করছে মাহিবা। তবে অর্থাভাবের চিহ্ন প্রতি পদে পদে স্পষ্ট।
• • •
নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত দুই রুমের এক রুমে থাকে আহমাদ মাহিবা এবং অপর আরেক রুমে সালেহা বেগম দুই মেয়ে নিয়ে থাকেন। তবে আয়িশার স্থান কোথাওই নির্দিষ্ট নয়। মেয়েটা মন মর্জি মতো থাকছে, ঘুরছে। সমবয়সী মেয়েদের পেয়ে তার আনন্দের সীমা নেই। আবার ইদানিং মাহিবা তাকে পড়াশোনা করতে মোটেই দেখছে না।
একদিন সকালের কথা। আয়িশাকে কুরআন পড়াতে বসেছে মাহিবা। সাথে ছোট্ট একটা লাঠি। নতুন বাড়ির বাগান ঘুরে ঘুরে এটা পেয়েছে মাহিবা। পড়ানোর সময় মেয়েটা পুরোদস্তুর শিক্ষক বনে যায়। মাঝে মাঝে ভয় পায় আয়িশা। একটা মানুষ কিভাবে হুট করে এমন রূপ বদলে ফেলতে পারে!
এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে মাহিবা দেখতে পায় আয়িশার সমবয়সী একটা মেয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। না দেখার ভান করে মেয়েটার উপর নজর রাখে মাহিবা। যখন আয়িশাকে পড়ানোর সময় মেয়েটা কেমন তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে! আয়িশার দিকে মগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকা মেয়েটা মায়াবাড়ির অন্যতম একজন সদস্য। ধীর স্বরে তাকে ডাকে মাহিবা,
- আশা! এদিকে এসো।
চমকে ওঠে মেয়েটা। এভাবে ধরা পড়ে যাবে ভাবেনি।
- এসো!
গুটি গুটি পায়ে মাহিবার কাছে এগিয়ে আসে আশা। তার হাত ধরে নিজের কাছে বসায় মাহিবা।
- তুমি কি দেখছিলে?
- আপনি আয়িশাকে পড়াচ্ছিলেন তাই।
- কেমন লাগছিলো?
- ভালো।
জড়তা ভরা মেয়েটা মিনমিন করে উত্তর দেয়। মাহিবা বলে,
- তুমি পারো পড়তে?
না সূচক মাথা নাড়ে মেয়েটা। তাকে আরো চমকে দিয়ে মাহিবা বলে,
- আমার কাছে পড়বে?
চকচক করে ওঠে আশার চোখ। এমন প্রস্তাব তো সে আশাই করেনি।
- আপনি আমাকে পড়াবেন!
- তুমি পড়লে পড়াবো।
হাস্যোজ্জ্বল মাহিবার দিকে তাকিয়ে আশার মনে হয় তার মনে বুনে রাখা আশার বীজ থেকে নিরাশার আবরণ সরিয়ে দিতে এসেছে এই মেয়েটা।
- আমি পড়বো।
- আচ্ছা। তাহলে সকালে নামাজ পড়ে চলে আসবে। এখানে আয়িশুর সাথে একসাথে পড়াবো। উঠতে পারবে তো?
- পারবো।
- ইনশাআল্লহ্। বেশ তাহলে কাল থেকে এসো।
- আমার তো কোনো বই নেই।
- সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে ইনশাআল্লহ। তোমাকে সেট নিয়ে ভাবতে হবে না।
মনের ভেতর বাজতে থাকা সুখের দামামা নিয়ে লম্বা বারান্দাটায় এসে আশা। আকাশে ফুটে ওঠা লাল আভা দেখে মনে হয় এই পৃথিবীতে তার রক্ত সম্পর্কের কেউ না থাকলেও তার জন্য কোথাও কেউ একজন আছে। যে তার মনের সকল সুপ্ত বাসনা একে একে পূরণ করে চলেছে। খুব ধীরে!
আশার সাথে সাথে পুরো মায়াবাড়িতে এই ঘটনা প্রচার হয়ে যায়। সকল বয়সের মেয়েরা মাহিবাকে ঘিরে ধরে তাদের শেখানোর জন্য। মায়াবাড়ির দায়িত্বে থাকা ইফাদ কিছু নিয়ম বেধে দেয়। তিনটা গ্রুপ করে দেওয়া হয়। সকল ব্যাচের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়। মাহিবার হাজার নিষেধ সত্ত্বেও এই শিক্ষকতার বিনিময়ে তার জন্য সম্মানীর ব্যবস্থা করে ইফাদ। আহমাদ না করে না। এমন একটা কাজে না করা সাজে না।
•• •• ••
বার্ষিক পরীক্ষার পর আয়িশাকে নতুন স্কুলে ভর্তি করানো হয়নি। এই ব্যাপারে নির্বিকার দেখাচ্ছিলো সালেহা বেগমকে। কিন্তু একদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে একই বয়সী মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণীর ভর্তি কার্যক্রমের জন্য অভিভাবক ইফাদ সকলের সাথে কাছের এক বালিকা বিদ্যালয়ে আয়িশাকে ভর্তি করে দেয়। আফিয়ার ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অবলম্বন করতে চাইলে বাঁধ সাধে সে। মাহিবা আপাতত পড়াশোনা থেকে কিছু দূরেই আছে। তবে কারণটা সে সকলের চোখের আড়ালে রাখার চেষ্টা করছে।
•• •• ••
আহমাদের তলবে ঘরে আসে ইফাদ। এর মাঝে তার চেকআপ করানো হয়ে গেছে। চিকিৎসকের পরবর্তী পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটার চলা করতে হচ্ছে তাকে। অর্ধাঙ্গিনী একজন প্রকৃত রূপেই অর্ধেক অনকগের দায়িত্ব পালন করছে। বন্ধুর কাছে যেয়ে আরাম করে বসে ইফাদ।
- বল কি বলবি।
- আমি একটা কথা ভাবছিলাম।
- কি?
- শেয়ারটা কেনার কথা ভাবছিলাম।
তড়াক করে উঠে বসে ইফাদ।
- সত্যি!
- হ্যাঁ।
- তাহলে তাড়াতাড়ি কর। যতো দেরি হবে ওরা ততো দাম কিনবে।
- কিন্তু আমার সব সেভিংস দিয়েও তো পুরোটা হবে না। এটাই সমস্যা।
ভাবুক হয়ে যায় ইফাদ। শেয়ার কেনার পর তার হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ কম। যেটুকু আছে সেটা খরচ হয়ে চলেছে মায়াবাড়ির পেছনে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহমাদ বলে,
- দেখি চাচ্চুর সাথে কথা বলতে হবে। দরকার হয় ঐ জমিটুকু বিক্রি করতে হবে।
- ঐটা বিক্রি করে দিবি? এছাড়া তো আর কোনো জায়গা জমি তোর নেই!
- এছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। আমার হাতে তো আর কোনো টাকা নেই। মা'র সাথেও কথা বলতে হবে একবার।
- আচ্ছা বলিস। আমি ওদের সাথে কথা বলে দেখি কতদূর প্রসেস আগানো যায়।
• • •
ইফাদের সাথে করা পরিকল্পনার সার সংক্ষেপ সালেহা বেগমের কাছে তুলে ধরে আহমাদ। সেখান উপস্থিত মাহিবা নিজেও। সব কথা শুনে চিন্তিত হন সালেহা বেগম। কিভাবে কি করা যায় ভেবে পান না। সেই ক্ষণে মাহিবা বলে,
- আমি আপনাকে দুই লাখ টাকা দিতে পারবো।
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে আহমাদ বলে,
- আমি শ্বশুর বাড়ি থেকে কোনো ধরণের সাহায্য চাচ্ছি না।
মনে মনে তাকে ভেংচি কাটে মাহিবা। "কেনো? শ্বশুর বাড়ি থেকে সাহায্য নিলে কি চামড়া খসে যাবে!" মনের কথা মনে চেপে সে বলে,
- ওটা আমার নিজের টাকা। সেটা নিতে নিশ্চয়ই সমস্যা নেই?
আরো অবাক হয় আহমাদ।
- এতো টাকা তুমি কই পাবে?
- ঐ আছে।
- আসলেই তো। কোথায় পাবি তুই?
বলতে না চাইলেও শাশুড়ির প্রশ্ন উপেক্ষা করার মতো কোনো উত্তর পায় না মাহিবা।
- দেনমোহরের টাকা।
- ওটা আমি নেবো না।
তড়িৎ উত্তর দেয় আহমাদ।
- কেনো?
- অসম্ভব! আমি নিতেই পারবো না।
- কেনো?
- জানি না। এমনি।
- বলুন তো মা! কারো না কারো থেকে তো টাকা ধার নিতেই হবে। তাহলে আমার থেকে ধার নিলে কি হবে?
সালেহা বেগম মুখ খোলার আগেই আহমাদ বিস্মিত কণ্ঠে বলে,
- তুমি আমাকে একেবারে দিয়ে দেবে না?
- ওমা! একেবারে দেবো কেনো? ধার দেবো। পরে আপনার টাকা হলে সব হিসাব করে ফেরত নেবো।
মুখটা কিঞ্চিৎ হা হয়ে যায় আহমাদের। মিটিমিটি হাসে সালেহা বেগম। মেয়েটা ছেলেটাকে ভালো জব্দ করেছে তো!
চলমান.