পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ০৭
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৭ · ২৮ পর্বের মধ্যে ৭
পশ্চিম আকাশে টকটকে লাল বর্ণের সূর্যটা কিছুক্ষণ আগেই ডুবে গেলো। চারিদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। পাখিরা যে যার ঘরে ফিরে যাচ্ছে। আকাশ প্রায় গোধূলি রঙে রঙ্গিন। ঠান্ডা শীতল হাওয়া বইছে পুরো শহর জুড়ে। এদিকে বই নিয়ে পড়তে বসেও কোনো এক অজানা মন খারাপের কারণে পড়ায় মন বসছে নাহ আইদা। বই খাতা গুছিয়ে রেখে জমিয়ে রাখা বুটিকসের কাজগুলো করার জন্য মেশিনে গিয়ে বসলো আইদা। তবুও যেনো আইদার মনে শান্তি নেই। পড়ায় মন বসছে নাহ এমনকি যে কাজকে আইদা নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে সে কাজেও আজ তার মন বসছে নাহ। বিষন্ন মন নিয়ে মেশিন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের মধ্যেই একটু হাটাহাটি করতে লাগলো আইদা। কোনো কিছুতেই যেনো শান্তি খুঁজে পাচ্ছে নাহ আইদা। কি করবে কিছু ভেবে পাচ্ছে নাহ। কিছুক্ষণ পাঁচালি করার পর ভাবলো চোখে মুখে পানি দিলে হয়তো একটু ভালো লাগতে পারে। চোখে মুখে পানি দেওয়ার জন্য ওয়াশরুমে গেলো। প্রতি বারের মতো এবারও ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিজের ক্লান্তি ভরা মায়াবী মুখটা দেখলো আইদা। ইশশ! কত মায়াবী এই মুখটা। মন খারাপের ছাপ লাগার কারণ মুখটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ এভাবেই আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখে মুখে পানি দিলো। চোখে মুখে পানি দেওয়া হয়ে গেলে যখনই ওয়াশরুমের দরজা খোলার চেষ্টা করে তখন ওয়াশরুমের দরজা আর খুলে নাহ। হোস্টেলের মেয়েগুলো এতটাই অভদ্র হয়েছে যে এখন কেউ ওয়াশরুম ঢুকলেও বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। এসব ভাবতে ভাবতে রাগে ফোসফাস করছে আইদা। অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কানোর পরও কেউ দরজা খুললো নাহ। কোনো উপায় নাহ পেয়ে চিৎকার করতে শুরু করে আইদা। "তাইয়্যেবা আপু! ওওও তাইয়্যেবা আপু!! শুনতে পাচ্ছো। দরজাটা খুলো আমি ভিতরে আটকে গেছি।" কিন্তু কেউই আসলো নাহ আইদাকে সাহায্য করতে। এতক্ষণ চিৎকার করে ডাকার পরও যখন কেউ আসলো নাহ তখন নিরুপায় হয়ে দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করতে থাকে আইদা। একের পর একে ধাক্কা দিয়েই চলেছে ওয়াশরুমের দরজায় কিন্তু এই শক্তিতে কি আর দরজা ভাঙ্গা সম্ভব। অনবরত চিৎকার আর দরজা ভাঙ্গার প্রচেষ্টা করতে করতে এক পর্যায়ে নিঃশক্তি হয়ে ওয়াশরুমের ফ্লোরে হাঁটুতে মুখ গুজে কান্না করতে থাকে আইদা। হঠাৎ করে ওয়াশরুমের তাপমাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঠান্ডা হতে থাকে। এবার আইদা কিছুটা ভয় পেতে থাকে। বদ্ধ ঠান্ডা পরিবেশেও ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে আইদা। চোখের জল শুকিয়ে গেছে। বার বার ঢোক গিলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখে ওয়াশরুমের দরজা খোলা আছে। সাত পাঁচ নাহ ভেবে তাড়াতাড়ি করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে আইদা। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে রুমের মধ্যে হোস্টের তিন চারজন মেয়ে বসে বসে যে যার কাজ করছে অথচ এতক্ষণ ধরে যে আইদা চিৎকার চেচামেচি করলো কেউই ওকে সাহায্য করতে আসলো নাহ। "তো-মরা রুমে থাকা সত্ত্বেও আমাকে হেল্প করলে নাহ কেনো.? আমি ওয়াশরুমে আটকে গেছিলাম। এতক্ষণ যে ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার জন্য চিৎকার করলাম তোমরা কি শুনতে পাওনি.?" ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো আইদা। "কি বলছিস.? তুই নাহ মাত্রই ওয়াশরুমে গেলি.? আটকালি কখন! আর চিৎকারই বা কখন করলি.?" অবাক দৃষ্টিতে আইদার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো তাইয়্যেবা। তাইয়্যেবার মুখে এমন কথা শুনে রিতীমত অবাক হয়ে গেছে আইদা। তার মানে এতক্ষণ সে কল্পনার জগতে ছিলো। আনমনে এসব ভাবতে ভাবতে এক পা দু পা করে বিষন্ন মন নিয়ে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো আইদা। বাইরে বইতে থাকা শীতল হাওয়া জানালা দিয়ে এসে আইদার অশান্ত মনকে শান্ত করে দিচ্ছে। মুহুর্তেই শান্ত পরিবেশে শব্দ করে হোস্টেলের মেইন রোডে একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়ালো। অ্যাম্বুলেন্সটা দেখে আইদার মনে অনেক কৌতূহল জাগলো কাকে নিয়ে এলো অ্যাম্বুলেন্সে করে। আইদার জানা মতে হোস্টেলের কেউ অসুস্থ হয়নি তাহলে অ্যাম্বুলেন্স কেনো আসলো। জানার আকুল ইচ্ছে নিয়ে জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আইদা। কিছুক্ষণ এক পলকে তাকিয়ে থাকার পর খেয়াল করলো একটা লাশ অ্যাম্বুলেন্সে করে নামানো হলো। কিন্তু এটা কার লাশ এখনো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নাহ। সাদা চাদরে মুখটা ঢাকা। দমকা হাওয়ায় লাশটার মুখের চাদরটা সরা মাত্রই আইদার বুকটা ধুক করে উঠলো। অ্যাম্বুলেন্সে আর কারো লাশ ছিলো নাহ, এটা ছিলো আইদার নিজেরই লাশ। এভাবে নিজের লাশ দেখে ভয়ে এক চিৎকার দিয়ে নিজের বেডে গিয়ে গুটিশুটি হয়ে হাঁটুতে মুখ গুজে কান্না করছে আইদা। রুমমেটের মেয়েগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করছে আইদার কান্না থামানোর কিন্তু কিছুতেই আইদার কান্না থামছে নাহ।
----------------------------
সকালের স্নিগ্ধ বাতাসের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে হোস্টেলের জানালা ভেদ করে। সাথে ভোরের আলোয় আলোকিত পুরো শহর। হোস্টেল কর্তৃপক্ষ এসে জানিয়েছে আইদাকে এক্ষুনি নিচে যেতে হবে কারণ তার আর্জেন্ট একটা কল এসেছে। কে কল করেছে কেউ জানে নাহ। কল করেই আইদাকে জাইছে। হোস্টেল কর্তৃপক্ষ জানতে চাইলে বলেছে আইদাকেই বলবে যা বলার। তাই বাধ্য হয়ে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ নিজেই এসেছে আইদাকে ডাকার জন্য। আইদা হোস্টেলে আসার পর কখনো কোনো অচেনা নাম্বার থেকে কল করে আইদাকে চায়নি এজন্য আইদা নিজেও অবাক হয়ে কল ধরার জন্য নিচে চলো গেলো। "হ্যালো! কে বলছেন.?" কল ধরে বললো আইদা। "হ্যালো! আইদা তোমার হাতে তৈরি কিছু বুটিকসের কাজ নিয়ে 'The Fashion House' টেইলর্স শপে আসো।" বললো ফোনের অপর প্রান্ত থেকে। "কি সত্যি!! আ-আমি সিলেক্ট হয়েছি.?" কাঁদো কাঁদো গলায় বললো আইদা। "হ্যাঁ! হ্যাঁ! তোমার বুটিকসের কাজগুলোর যে ছবি দিয়েছিলে সেগুলো আমাদের ওনারের খুব ভালো লেগেছে। ১২টার আগে তোমার বানানো সবচেয়ে বেস্ট ডিজাইনগুলো নিয়ে চলে এসো।"৷ বললো ফোনের অপর প্রান্তের লোকটা। "থ্যাংক ইউ সো মাচ স্যার! আমি এক্ষুনি আসছি।" মহানন্দে আত্মহারা হয়ে বললো আইদা। সকাল সকাল এমন একটা খুশির খবর পাবে আইদা কখনোই ভাবতে পারেনি। তাড়াতাড়ি করে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজের তৈরি বেস্ট কিছু কালেকশন খুঁজে খুঁজে বের করলো আইদা।
'The Fashion House' টেইলর্স শপের সবার কাছেই আইদার বানানো ডিজাইনগুলো খুব পছন্দ হয়েছে। ছবি দেখেই তারা আইদাকে সিলেক্ট করে ছিলো এখন তোহ সরাসরি ওর বানানো ডিজাইন দেখছে। আইদা তোহ প্রসংশায় পঞ্চমুখ। এতটা খুশি কাউকে বলে বুঝাতে পারছে নাহ আইদা। পড়াশোনার পাশাপাশি হোস্টেলে বসে কাজ করার মতো ধৈর্য আর পাচ্ছিলো নাহ আইদা। এজন্য পার্টটাইম জব খুঁজছিল যাতে কারে সময়টা বেঁচে যায় আর ঠিক মতো পড়াশোনাটাও হয়ে যায়। আইদার উপর সত্যিই আল্লাহ খাস রহমত আছে নয়তো ওর যেকোনো উদ্যোগ সাথে সাথে পূরণ হয়ে যায়। প্রথম দিনই আইদাকে নিজস্ব একটা কাজ করার রুম, সেলাই মেশিনসহ যাবতীয় যা যা সবকিছুই দেওয়া হয়েছে। আইদা তোহ মহাখুশি। খুশিতে আত্মহারা হয়ে প্রথম দিনই কাজ করতে বসে পরেছে। নিজ মনে নতুন ডিজাইন বানানোর জন্য মেশিন নিয়ে বসেছে আইদা। হঠাৎ বাইরে থেকে একজন লোক আইদাকে ডাকতে আসে। "আইদা!! তোমার তোহ দেখি রাজ কপাল। কাস্টমার এসেছে, স্যুট বানাবে। যাও গিয়ে তাড়াতাড়ি মাপ নিয়ে এসো।" খুশিতে আইদার চোখ দিয়ে পানি নেমে এলো। ডান হাত দিয়ে চোখ মুখে মনে মনে ভাবলো, আজ প্রথম দিনই তার প্রথম কাজের শুরু হয়ে গেলো। আইদা ভাবতেও পারেনি কেউ ওর হাতে স্যুট বানানোর জন্য আসবে। জলদি করে ফিতা আর খাতা কলম বের করলো আইদা। দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাল্কা ইশারায় মেয়েটাকে ডেকে বললো "হাবিবা!! শুনো। আমার যে কাস্টমারটা এসেছে তাকে আমার এখানে পাঠিয়ে দাও।" হাবিবাও আইদার কথা মতো ওই৷ লোকটাকে আইদার কাছে যেতে বলে। আইদা পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে নখ কাটতে থাকে। আজ প্রথম দিন কিভাবে কাস্টমার অ্যাটেন্ড করবে ভাবছে। নতুন জায়গা নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে সময় তোহ লাগবেই। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ এসে আইদার চোখ চেপে ধরে। আইদা ভয় পেলেও তাকে বুঝতে নাহ দিয়ে অবাক কণ্ঠে বললো "আরে! কে আপনি! কি করছেন.?" এই বলে হাত ঝাড়া দিয়ে চোখ থেকে লোকটার হাত নামিয়ে পিছনে তাকিয়ে যা দেখলো তা দেখার জন্য আইদা মোটেও প্রস্তুত ছিলো নাহ। "তুমি!!! তুমি এখানেও চলে এসেছো.? সত্যি করে বলো, তুমি কি আমাকে ফলো করছো.?" রাগান্বিত কণ্ঠে বললো আইদা। "আরে! আরে! আমি তোমাকে ফলো করতে যাবো কোনো.? আমি তোহ সবসময় এখান থেকেই স্যুট, কোর্ট, ব্লেজার, তাছাড়া যাবতীয় যা যা লাগে আমার সবকিছু এখান থেকেই বানাই। আগে যখন আসতাম তখন কোনো টেইলর আমাকে এভাবে ভিতরে ডাকেনি অথচ আজ ভিতরে ডেকেছে।৷ কে সেই টেইলর জানার জন্য উঁকি দিয়ে দেখি এ তোহ আমার জানের জান পরানের পরান আইদা রানী। উফফ!! তুমি বুঝতে পারছো, নিশ্চয়ই আমাদের মধ্যে কোনো নাহ কোনো কানেকশন আছে তা নয়তো এভাবে দ্বিতীয় দেখা হতো নাহ।" মিটিমিটি হেসে বললো আতিশ। "দেখো আতিশ!! প্রথমত আমাদের মধ্যে কোনো কানেকশন নেই। আর দ্বিতীয়ত কোনো মিথ্যাবাদীর সাথে তোহ কখনোই আমার কানেকশন থাকতে পারে নাহ। তুমি চলে যাও এখান থেকে আমি তোমার স্যুট বানাবো নাহ।"এই কথা বলে আতিশের হাত ধরে টানতে টানতে রুম থেকে বের করে দিলো আইদা। আতিশও বাধ্য ছেলের মতো বেরিয়ে গেলো। আতিশকে বের করে দিয়ে আইদা কিছুক্ষণ নিজেই নিজের সাথে বকবক করলো 'ছেলেটাকে প্রথম দেখায়ই ভালো লেগে গিয়েছিল। ওর কথাগুলো শুনোও মায়ায় পরে গেছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো সত্যি কথা বলছে কিন্তু ও যে এতটা নিচ আমি ভাবতেও পারিনি। মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। এমন মানুষদের আমি অনেক অনেক অনেক অনেক বেশি ঘৃণা করি। ইয়া আল্লাহ আর কোনোদিন যেনো ওর মতো প্রতারকের সাথে আমার দেখা নাহ হয়।" একা একা কিছুক্ষণ বিরবির করে আবারও বুটিদারের কাজে মন দিলো। কিছুক্ষণ পর যে লোকটা আইদাকে কাজ দিয়েছে ওই লোকটা এসে বলে "আইদা! মিস্টার আতিশের স্যুটের মাপ রেখেছো তোহ.? একটা কথা বলে রাখি, মিস্টার আতিশের আঙ্কেল এবং আন্টি আমাদের এই 'The Fashion House' টেইলর শপের হেড এমডি। উনাদের ফান্ডের টাকায়ই কিন্তু আমাদের এই টেইলর শপ এখনো রানিং আছে। তুমি তোহ এখনো নতুন তাই তোমাকে বলে রাখলাম। আরর তুমি তোহ বুদ্ধিমতী মেয়ে আমি জানি তুমি সবদিক সামলে নিবে" বললো আজরাফ। "উমমম! আজরাফ ভাই। আমি বোধহয় একটু ভুল করেছি।" ইতস্তত হয়ে বললো আইদা। "কি ভুল করেছো.?" অবাক হয়ে বললো আজরাফ। "আতিশ স্যারের মাপে একটু ভুল হয়েছে। আপনি কি উনার নাম্বারটা একটু দিতে পারবেন তাহলে আমি উনাকে কল করে সাইজটা জিজ্ঞেস করে নিতাম!" বললো আইদা। "হ্যাঁ! হ্যাঁ! তুমি যাওয়ার সময় নাম্বার নিয়ে যেও কোনো সমস্যা নেই।" আইদাকে নিজের ভুল স্বীকার করতে দেখে খুশি হয়ে বললো আজরাফ। আজ প্রথম দিন হওয়ায় আইদা আগেই আজরাফ ভাইকে বলে রেখেছে লাঞ্চ টাইম অব্দি কাজ করে চলে যাবে। আজরাফ ভাইও রাজি হয়েছে। লাঞ্চ টাইম হওয়ার সাথে সাথে আইদা আতিশের নাম্বারটা নিয়ে শপ থেকে বেরিয়ে যায়। আশেপাশে একটা ছোট খাটো রেস্টুরেন্ট খুঁজে সেখানে চলে যায় কিছু খাওয়ার জন্য। রেস্টুরেন্টে গিয়ে মেনু কার্ড ঘাটাঘাটি করে ১৫০ টাকার মধ্যে এক প্লেট মোরগ পোলাও আর ৫০ টাকার মধ্যে এক গ্লাস কোল্ড ড্রিংক অর্ডার করলো আইদা। খাওয়া শেষে যখন বিল পে করার জন্য ওয়েটারকে ডাকলো তখন ওয়েটার যা বললো তা শুনে আইদার রাগ আগ্নেয়গিরির লাভার মতো গলে গলে পরতে লাগে। "ম্যাম! আপনার বিল তোহ পে করা হয়ে গেছে।" বললো রেস্টুরেন্টের ওয়েটার। "আশ্চর্য আমার বিল পে হয়ে গেছে মানে.? আমি কি আপনাকে টাকা দিয়েছি.?" রাগি কণ্ঠে বললো আইদা। "নাহ ম্যাম! আপনি দেননি কিন্তু ওইযে আপনার পিছনে বসে থাকা স্যার আপনার বিল দিয়ে দিয়েছে।" মাথা নত করে বললো রেস্টুরেন্টের ওয়েটার। ওয়েটারের দিকে কিছুক্ষণ বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে পিছনে তাকিয়ে যা দেখলো তাতে আইদার মাথা আরো বেশি গরম হয়ে গেলো। পিছনের লোকটাকে দেখে রাগে গজগজ করতে করতে লোকটার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে বললো "দেখো আতিশ! তোমার হয়তো টাকার অনেক গরম আছে। কিন্তু আমরা মিডল ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে আমাদের টাকার গরম না-ও থাকতে পারে কিন্তু আমাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধটা৷ আছে। আমাকে আর পাঁচটা লোভী মেয়ের সাথে তুলনা করতে যেও নাহ, আমি ওইসব মেয়েদের মধ্যে নই যারা ছেলেদের টাকায় নিজের ভরনপোষণ করে। আমি নিজের পরিশ্রম দিয়ে বাঁচতে ভালোবাসি। আর ভালোবাসি তাদের যারা আমার এবং আমার বাবার মতো নিজের পরিশ্রম দিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। তাদের নয় যারা বাবার টাকায় আয়েশ করে বেরায়। শুধু শুধু আমার পিছনে এভাবে নাহ ঘুরে সময়টাকে কাজে লাগাও। আর আমি কি একবারও বলেছি তোমাকে, আমার বিল পে করে দাও.? বলিনি তোহ, তাহলে কেনো দিলে.? কি ভেবেছো, ২০০ টাকার বিল পে করে দিলে আমি টাকার লোভে তোমার পিছনে পাগলের মতো ঘুরবো। বলো আতিশ আমি তোমাকে ভালোবাসি।" চোখ গরম করে এক দমে বললো আইদা। "আইদা! তুমি আমাকে ভুল বুঝছো। আমি তোহ জাস্ট এমনি....!" অনুতপ্ত সুরে সুরে বললো আতিশ। "চুপ! একদম চুপ! একটা কথাও বলবে নাহ! ভবিষ্যতে কোনোদিন আমার পিছু নিবে নাহ বলে দিলাম।" বললো আইদা। "তুমি জানো, কত মেয়ে আমার জন্য পাগল কিন্তু আমি বুঝি নাহ তুমি আমাকে কি জাদু করেছো। প্রথম দিন থেকে আমার সববটা জুড়ে শুধু তুমি আর তুমি। হয়তো তোমার এই রাগ, তোমার এই অ্যাটিটিউড, ইগো, এসবই আমাকে দিওয়ানা করেছো তোমার প্রতি।" বললো আতিশ। "প্রথমত, তুমি ভাবছো ওই মেয়েগুলো তোমার জন্য পাগল আসলে তা নাহ ওরা তোমার জন্য নাহ তোমার টাকার জন্য পাগল। এক দিনের জন্য পথের ভিক্ষারি হয়ে দেখো কেউই তোমার পিছনে ঘুরবে নাহ। আর দ্বিতীয়ত এসব ফিল্মি ডায়লগ অনেক শুনেছি। এই আইদার পিছনেও কম ছেলে ঘুরে নাহ, সবার মুখে একই কথা। তাই প্লিজ এভাবে নিজের সময় নষ্ট নাহ করে সময়টা কাজে লাগাও।" আতিশকে এসব কথা শুনিয়ে পার্স থেকে ২০০ টাকা বের করে আতিশের টেবিলে রেখে চলে গেলো আইদা।
--------
পূর্ণিমা মাখা রাত। চাঁদের আলোয় পুরো শহর মোহিত। জানালা ভেদ করে চাঁদের আলো এসে আইদার ঘুমন্ত মুখে লাগছে। আহ্ কি মায়াবী চেহারা এই মেয়েটার। চাঁদের আলোয় যেনো ওর চেহারাটাকেও চাঁদের মতোই লাগছে। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই আইদার ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ খুলতেই আইদার নজর পড়ে জানালার দিকে। খেয়াল করলো জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে আলোকিত করে দিচ্ছে পুরো রুম। বেড থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো আইদা। কিছুক্ষণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে ভাবছে 'ইশশশ কি সুন্দর চাঁদ! আকাশটাও কত সুন্দর। সুন্দর রাতের পরিবেশ। সুন্দর এই কলকাকলি। কেমন হয় যদি এই সময়টা ছাঁদে উপভোগ করা যায়' মনের আক্ষেপ পূরণ করার জন্য ছাঁদে চলে গেলো আইদা। অনেকক্ষণ ছাঁদের কার্নিশে বসে চাঁদ দেখার পর হঠাৎ আইদার বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে থাকা জন্মচিহ্নে আলো জ্বলতে শুরু করে। জন্ম থেকেই আইদার বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে একটা জন্মচিহ্ন আছে দেখতে অবিকল সাপের মতো। চিহ্নটা কিছুটা এমন যে, একটা লাঠি যার উপর হয়তো কোনো অমূল্য রত্ন আছে যেটাকে একটা সাপ পেচিয়ে রেখেছে রক্ষা করার জন্য। আজ হঠাৎ করে সেই জন্মচিহ্ন থেকে আলো বের হচ্ছে। নিজের মধ্যে এমন অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড দেখে আইদা নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছে। অবাক দৃষ্টিতে হা করে তাকিয়ে দুই পা পিছিয়ে এলে আইদা। হঠাৎ কোত্থেকে যেনো একটা কালো প্রজাতি উড়ে আসে ছাঁদে। প্রজাপতিটা অস্বাভাবিক ভাবে বড় হতে শুরু করে। মনে হচ্ছে প্রজাপতিটা হয়তো এক্ষুনি আইদাকে ওর ডানায় বসিয়ে উড়ে চলে যাবে। এটা দেখে আইদা যখনই পিছচ্ছে প্রজাপতিটা ততই ওর দিকে এগোচ্ছে। পিছতে পিছতে আইদার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়। প্রজাপতিটা ওর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে ছোট হয়ে এক পর্যায়ে ওর নাভিতে মিশে যায়। সাথে সাথে আইদা নাভিতে হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে নিচে বসে পরে। হাত তুলে চেয়ে দেখে নাভি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখে ভয়ে একটা চিৎকার দেয় আইদা। এই চিৎকার কোনো সাধারণ চিৎকার ছিলো নাহ। ছোট এক চিৎকারে পুরো শহর কেঁপে উঠেছিলো। শুরু হয়েছিলো ভুমিকম্প। জ্বলজ্বল করছিলো আইদার চোখ। টকটকে লাল হয়ে গেছে। পুরো মাথা জুড়ে হাজারো সাপ গিজগিজ করছে। রাগে ক্রুদ্ধ হয়ে দ্বিতীয় বার চিৎকারের সাথে বেরিয়ে আসে দুই পাশের বড় বড় দুইটা দাঁত। পিছন থেকে এক মহিলা কণ্ঠ ফিসফিস করে বলে "পঞ্চশক্তি ফিরে এসেছে।" "নাহহহহহহহহহহ! অলিভিয়া! অলিভিয়া! এ হতে পারে নাহ। আমি চাই নাহ পঞ্চশক্তির জন্য আমার মেয়ের জীবনটা নষ্ট হোক। অলিভিয়া!! " হঠাৎ ঘুম থেকে চিৎকার করে উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের স্ত্রীকে ডাকছে চিশতি। "কি হলো.? কি হলো.? এমন করছো কেনো তুমি.? কষ্ট হচ্ছে.? কোথায় কষ্ট হচ্ছে.?" বললো চিশতির স্ত্রী অলিভিয়া। "অলিভিয়া! জানো আজকে কি স্বপ্ন দেখেছি.?" কাঁপা কাঁপা গলায় বললো চিশতি। "কি দেখেছো.?" জানার ইচ্ছে নিয়ে বললো অলিভিয়া। "পঞ্চশক্তি!! পঞ্চশক্তি আইদার শরীর দখল করে নিয়েছে।" ভয়ার্ত দৃষ্টিতে বললো চিশতি। "কি বলছো.? তুমি যে বলেছিলে এই শক্তি তুমি ত্যাগ করেছো.? তাহলে আইদার মধ্যে কিভাবে...?" অবাক সুরে বললো অলিভিয়া। "পঞ্চশক্তি ত্যাগ করার সময় এক দৈববাণী বলেছিলো ঠিক ৩০ বছর পর এই শক্তি আবারও ফিরবে। আ-আমার খুব চিন্তা হচ্ছে অলিভিয়া, আমি আইদার সাথে এক্ষুনি কথা বলতে চাই। ও ঠিক আছে তোহ.?" বললো চিশতি। "তুমি কি পাগল হয়ে হয়ে গেছো.? কয়টা বাজে খেয়াল আছে.? এত রাতে হোস্টেলে কল করবে.? কাল সকালে কল দিও। তাছাড়া সামনেই তোহ ওর জন্মদিন, জন্মদিনের আগেই চলে আসতে বলো!!" অভয় দিয়ে বললো অলিভিয়া।