পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ১৭
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ১৭ · ২৮ পর্বের মধ্যে ১৭
অন্ধকার রাত। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। এতটাই আধার যে নিজের শরীরের অংশটুকুও দেখা বড় দায়। আকাশ পানে মেঘ ডাকার গুরুম গুরম শব্দ। তিন রাস্তার মোড়ের নিম গাছের ডালে "নিম-নিম, কুপ-কুপ" শব্দ করে প্যাঁচা বসে ডাকছে। একেই তোহ ভয়ংকর রাত তার উপর প্যাঁচার ডাকে রাতটা যেনো আরো ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। নিম গাছটা থেকে কিছুটা দূরেই সাদা রঙ দিয়ে গোল বৃত্ত আঁকা, সেই বৃত্তের ভেতরে হাত পা বেঁধে মুখে রুমাল গুঁজে ফেলে রাখা হয়েছে চিশতিকে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য ছটফট করছে চিশতি কিন্তু ব্যর্থ হয়ে সেখানেই পরে রইলো। টনক নড়তে নাহ নড়তেই আবারও নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টায় মগ্ন হয়ে কাতরাচ্ছে চিশতি। অনবরত গুঙিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে নাহ। অনেকটা দূরে মশাল হাতে নিয়ে কেউ চিশতির দিকে এগিয়ে আসছে। দূর থেকে ঠিক বুঝা যাচ্ছে নাহ লোকটা কোন দিকে যাবে তারপরও চিশতির মনে হচ্ছে লোকটা তার দিকেই আসছে। লোকটা যত সামনের দিকে এগোচ্ছে চিশতি তত বেশি গোঙাচ্ছ যাতে করে লোকটা তার শব্দ শুনে এসে তাকে বাঁচায়। একটা পর্যায় হয়তো লোকটা চিশতির গোঙানির শব্দ শুনতে পায়। মশাল হাতে নিয়ে এদিকে তোহ আসছে দেখা যায়। হয়তো শুনতে পেয়েছে। লোকটা একদম কাছাকাছি আসার পর চিশতি মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে দেখে এটা একটা মহিলা। পড়নে লাল রঙের শাড়ি। মাটিতে লুটিয়ে আছে তার আঁচল খানি। ছেড়ে রাখা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে এদিক সেদিক উড়ছে। মুখে গাঢ় লাল রঙে লেপ্টে মাখানো। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চিশতির দিকে। তাকে দেখে চিশতির মনে বাঁচার আশা জাগলো। হয়তো সে তাকে সাহায্য করার জন্যই এখানে এসেছে। মহিলাটি বৃত্তের বাইরেই ঠাই দাঁড়িয়ে আছে আর চিশতি বৃত্তের ভেতরে ছটফট করছে। হঠাৎ মহিলাটি আঙ্গুল মুখে দিয়ে সজোরে উলুধ্বনি দিতে থাকে। ধীরে ধীরে তার উলুর শব্দ বাড়তেই থাকে। চিশতির মনে হচ্ছে এক্ষুনি তার কান ফেটে রক্ত বের হবে কিন্তু কিচ্ছু করার নেই নিরুপায় হয়ে তাকে এই অসহ্যকর শব্দ সহ্য করতে হবে কারণ তার হাত পা বাঁধা। সে চাইলেও কিছু করতে পারবে নাহ এখন। পরক্ষণেই চিশতির চোখ কপালে উঠার মতো হাল হলো যখনই তার চোখ যায় সামনের দিকে। দূর থেকে মশাল হাতে নিয়ে বেশ কিছু লোক এদিকেই ছুটে আসছে। সবাই উলুধ্বনি দিতে দিতেই এগোচ্ছে। আহ! কি বিশৃ পরিস্থিতি। লোকগুলো যত এগোচ্ছে উলুর শব্দ ততই বেড়ে চলেছে। ছটফট করতে করতে পাগলের মতো তড়পাচ্ছে চিশতি। কিন্তু এই নির্দয় লোকগুলোর মনে চিশতির জন্য একটুও মায়া হচ্ছে নাহ। চোখের পলক ফেলতে নাহ ফেলতে লোকগুলো চিশতিকে ঘিরে দাঁড়ালো। বৃত্তের সামনে এসে জড়ো হলো সবাই। মহিলাটি নিজের বাম হাত উঁচু করতেই বাকি লোকগুলো মাথা নিচু করে সবাই মহিলাটির পিছনে গিয়ে লাইন মোতাবেক দাঁড়ালো। হঠাৎ সবাই একত্রে হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আবারও মুখে আঙ্গুল দিয়ে সজোরে উলুধ্বনি দিতে লাগলো। এরপর পিছন থেকে দুইজন লোক ছুুটে গিয়ে বৃত্তের ভেতর থেকে চিশতিকে টেনে তুললো। চিশতির হাতের বাঁধ এবং পায়ের বাঁধের ফাকে একটা বাঁশ ঢুকিয়ে তাদের কাঁধে তুলে নিলো চিশতিকে। চিশতি শুধু গোঙাচ্ছে আর মনে মনে ভাবছে আজকেই হয়তো তার জীবনের শেষ দিন। কিচ্ছু করার নেই তার! নিজেকে বাঁচাতে পারলো নাহ, কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস অব্দি চিশতি আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখবে। তিনি চাইলে এক মুহুর্তে সবকিছু পাল্টে যেতে পারে। নিজের উপর আত্মবিশ্বাস আর মনোবল হারানো যাবে নাহ। নিশ্চয়ই মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে। কিন্তু এই মুহুর্তে চিশতি কিভাবে কি চেষ্টা করবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে নাহ। লোজ দুইটাও চিশতিকে কাঁধে করে হেঁটেই চলেছে। হেঁটে চলেছে বাকি লোকগুলো তাদের পিছ পিছে। বেশ কিছুটা দূরে আসার পর তারা থামলো। চিশতিকে কাঁধ থেকে নামিয়ে উপুড় করে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে বাঁশটা সরিয়ে নিলো। আবারও সবাই লাইন মোতাবেক দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে উলুধ্বনি দিতে লাগলো। সবাইকে থামিয়ে মহিলাটি চিশতির পিঠের উপর হাঁটু গেড়ে বসে গলাায় ছুড়ি ধরে বলে "ইয়াদ করেলে তুর জীবুলের ছবচাইতে ছুন্দল দিলগুলো, আচকে তুর জীবলের ছেছ দিল বটে। তুর রক্তে রঙিল হবে মোদের কাল-লগরী। মোরা হবো আরো ছক্তিছালী। হা!হা!হা! ইয়াদ কর! ইয়াদ কর! আর ছুযুগ পাবিলা বটে।" এই কথাটুকু বলার সাথে সাথে আর সময় নষ্ট নাহ করেই মহিলাটি চিশতির গলায় ছুড়ি চালিয়ে দেয়। এক তীব্র ভয়ংকর আত্মচিৎকারের সাথে চিশতির ঘোর কাটে। "আআআআম্মিইইইইইইইইইইইইইইইই" ঘোর কাটতেই চিশতি বুঝতে পারে সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো। মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে দেখে আমিনা বিবি তার মাথার পাশে বসে আছে, হাসমি এবং হাসমির স্ত্রী ইছামতী পায়ের কাছে, চিশতির পিতা আব্রাহাম, চিত্রা, চিশতির কাকিয়া হালিমা আর হাজেরা দাঁড়িয়ে আছে ঘরের এক কোণে। চিশতিকে চোখ খুলতে দেখে সবাই অবাক হলো। এক কথায় তারা যতটা খুশি হয়েছে তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছে। আমিনা বিবি অশ্রু ভরা চোখ মুছতে মুছতে বললো "আমার বাবা! তুই একদম চিন্তা করিস নাহ আমরা যেভাবেই হোক নূরীকে খুঁজে বের করবো। কে বা কারা ওকে অপহরণ করেছে আমরা ঠিকই খুঁজে বের করবো। আমার তোহ ভাবতেও অবাক লাগছে আমার ছেলে এত বড় হয়ে গেছে। কাউকে এতটা ভালোবাসতে পারে আমার ছেলে" চোখ মুছতে মুছতে বললো আমিনা বিবি।চিত্রা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থা থেকে ছুটে এসে চিশতির পাশে বসে ওর হাতটা শক্ত করে ধরে বললো "ওইদিন আমাদের কাউকে কিছু নাহ জানিয়ে চলে গেলি। তারপর ওখানে গিয়ে নূরীর উধাও হওয়ার কথা শুনে সেই যে জ্ঞান হারালি আজ ৫দিন পর তোর জ্ঞান ফিরলো। ডাক্তার তোহ বলেই দিয়েছে তোর হয়তো আর কোনোদিন জ্ঞান ফিরবে নাহ। এক কথায় তুই নাকী কোমায় চলে গেছিস যেকোনো মুহুর্তে তোর জ্ঞান ফিরতে পারে। আর দেখ আজকেই তোকে হসপিটাল থেকে বাসায় নিয়ে এলাম আর আজকেই তোর জ্ঞান ফিরলো। আলহামদুলিল্লাহ!! এবার তুই একদম চিন্তা করিস নাহ আমরা তোহ আছি। একটা নাহ একটা ব্যবস্থা ঠিকই করবো। নূরীকে যতদিন নাহ খুঁজে পাচ্ছি হাজেরা মামী আমাদের সাথে এখানেই থাকবে। নূরী ফিরে এলে আবারও বিশাল আয়োজন করে তোদের বিয়ে দিবো। তোর আপুনি তোকে প্রমিজ করছে।" কান্না মাখা গলায় বললো চিত্রা। কিন্তু ওইদিন রাতে কি হয়েছিলো এটাই মনে করতে পারছে নাহ চিশতি। সেদিন রাতের ঘটনা মনে করার জন্য বার বার মাথায় জোর খাটানোর পর হঠাৎ সবকিছু স্পষ্ট মনে পরলো চিশতির। নূরীকে একটি পলক দেখার জন্য সেদিন রাতে বাধ্য হয়েই গাংগাইট গ্রামে থেকে গেলো চিশতি। চিশতির থাকার জন্য নূরীর মা নিজেই একটা ঘর ঘুছিয়ে দিলো। বেশ কিছুক্ষণ হলো চিশতি শুয়ে বসে রেস্ট নিচ্ছে। হঠাৎ ঘরের দরজার কড়া নাড়ার শব্দ। উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে একটা অচেনা মহিলা চিশতির জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। মহিলাটিকে এর আগে কখনো দেখেনি চিশতি হয়তো নূরীর দুঃসম্পর্কের কোনো আত্মীয় হবে। কথা নাহ বাড়িয়ে দরজা থেকে একটু সরে দাঁড়ালো চিশতি৷ মহিলাটিও চুপচাপ কোনো কথা নাহ বলে ঘরের ভিতরে খাবারের প্লেট রেখে চলে গেলো। পরন্ত দুপুরে খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো চিশতির। সারাদিনে আর কিচ্ছু খায়নি বিদ্বায় চিশতির প্রচুর খিদে পায়। এটা যেহেতু গ্রাম তাই এখানে কোনো বিল্ডিং বা ঘরের সাথে ওয়াশরুম এটাস্টও নেই। এখানে সব ঘরবাড়িই টিনের। চিশতিকে যে ঘরটিতে থাকতে দেওয়া হয়েছে এটার মেঝে ছিলো কাঠের এবং দেওয়াল [ব্যাড়া] ছিলো টিনের। আর ওয়াশরুম ছিলো ঘরের বাইরে। এখানে বাথরুম আর কলপাড় দুইটা আলাদা আলাদা এজন্য একটু অসুবিধা হয়। চিশতি ফ্রেশ হওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে কলপাড়ে গেলো। হাত মুখ ধুয়ে ঘরে চলে গেলো। ঘরে ঢুকে প্রথমেই একটা শুকনো কাপড় [গামছা] দিয়ে হাত মুখ মুছলো। এরপর খাবার খেতে বসলো। লোকমা তোলার জন্য যখনই প্লেটে আঙ্গুল ঘষে তখনই চিশতির আঙ্গুলে কিছু একটু আটকায়। মনে হলো ভাতের নিচে কিছু একটা আছে। মনে খটকা লাগায় ভাতগুলো সরিয়ে দেখে ভাতের নিচে একটি বেগুন পাতা রাখা। চিশতি দুই আঙ্গুলে পাতাটি উপরে তুলে দেখতে থাকে এটা কেনো এভাবে ভাতের নিচে রাখা হয়েছে। পাতার পিছন দিক থেকে লাইটের আলো পরায় অপর পাশ থেকে চিশতি কিছু লেখা দেখতে পারে। চিশতির বুঝতে বাকি রইলো নাহ, পাতাটার উল্টো পাশে কিছু লেখা আছে। সে তাড়াতাড়ি পাতাটি উল্টো করে দেখে পাতায় পিছনে স্পষ্ট লাল রঙের কালি দিয়ে লিখা "বাঁচতে চাইলে এখান থেকে পালিয়ে যাও, নয়তো মরতে হবে তোমাকে" ব্যাপারটা সন্দেহজনক হলেও শালক-শালিকদের মস্কারা ভেবে এতটা গুরুত্ব দিলো নাহ চিশতি। আপন মনে রাতের খাবার শেষ করে বিছানায় লুটিয়ে পরলো চিশতি। নূরীর কথা ভাবতে ভাবতে কখন চোখ লেগে গেলো টেরই পায়নি চিশতি। চিশতি যখন গভীর ঘুমে তখন হঠাৎ কারো চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় চিশতির। এত রাতে কে চিৎকার করছে দেখার জন্য আলতো গতিতে গিয়ে জানালা খুলে চিশতি। জানালার ফাঁকে কিছুই দেখা যাচ্ছে নাহ, তাহলে হয়তো চিশতির মনের ভুল হবে। এই ভেবে জানালা থেকে চোখ সরাতেই স্পষ্ট অনুভব করলো কেউ যেনো কানালার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলো। চিশতি আবারও সাথে সাথে জানালার ফাঁকে চোখ রাখে। এবার চিশতি যা দেখলো তা দেখার জন্য চিশতি মোটেও প্রস্তুত ছিলো নাহ। একটা মেয়ে লাল বেনারসি শাড়ি পরিধান করা, খোঁপা থেকে খুলে যাওয়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কোমর অব্দি এসে ঠেকছে। মাটিতে আঁচল খানি বিছিয়ে হেঁটে চলেছে সামনের দিকে। মেয়েটা কে দেখার জন্য সাহস করে দরজা খুলে তার পিছু নিতে শুরু করে চিশতি। মেয়েটা সোজা হেঁটে চলেছে। চিশতিও লুকিয়ে লুকিয়ে তার পিছু করে যাচ্ছে। মেয়েটা হাঁটতে হাঁটতে যতন রাজার প্রাসাদের দিকে এগোচ্ছে। চিশতিও একবার এই গাছের পিছনে তোহ আরেক বার ওই গাছের পিছনে লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েটার পিছু পিছু এগোচ্ছে। হঠাৎ লক্ষ করলো মেয়েটা যতন রাজার প্রাসাদের পিছনের জঙ্গলে দিকে যাচ্ছে। এবার চিশতির ভয় হতে শুরু করলো, আসলেই এটা কোনো মানুষ তোহ? কি করবে এখন এটাই ভাবতে থাকে? মেয়েটার পিছু করবে নাকী ঘরে ফিরে যাবে? নাহ! এতটা পথ যেহেতু এসেছে সে আর পিছন ফিরবে নাহ। এগিয়ে চললো মেয়েটার পিছু পিছু জঙ্গলের রাস্তায়। বাইরে যতটা অন্ধকার তার চেয়ে বেশি অন্ধকার জঙ্গলের ভিতরে। কোন চিপায় কি বসে রয়েছে কে জানে। মনে মনে আল্লাহর নাম নিতে নিতে এগোচ্ছে চিশতি। হঠাৎ বাম পাশ থেকে একটা ধবধবে সাদা বিড়াল দৌঁড়ে রাস্তা কাটলো চিশতির। ভয়ে চিৎকার দিতে গিয়েও চুপসে গেলো চিশতি। ভয়ে ঢোক গিলে আবারও সামনে তাকাতে দেখে মেয়েটা উধাও। কোথায় গেলো? এই অন্ধকারে কিভাবে খুঁজবে তাকে এসব ভাবতে ভাতবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো চিশতি। এগোতে এগোতে প্রায় মধ্য জঙ্গলে এসে পৌঁছায়। সামনে তাকিয়ে দেখে এক বিশাল পরিত্যক্ত বাড়ি। এই জঙ্গলের ভিতরে কারা বসবাস করতো। এত গহিনে কোনো সাধারণ মানুষ তোহ কিছুতেই বসবাস করার জন্য আসবে নাহ। চুপিসারে পরিত্যক্ত বাড়ির ভিতরেই এগোতে লাগলো চিশতি।৷ কেনো জানে নাহ সে এটার দিকে এগোচ্ছে। তার মন বলছে মেয়েটা এই বাড়ির ভিতরেই আছে। দরজার সামনে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার আগেই দরজা খুলে গেলো। বিষয়টাকে উপেক্ষা করে ভিতরে পা রাখলো চিশতি। ভিতরে প্রবেশ করেই কিসের যেনো শব্দ ভেসে আসতে থাকে চিশতির কাটে। শব্দের পিছু করতে করতে চিশতি গিয়ে একটা আলাদা রুমের সামনে পৌঁছায়। আশ্চর্য করা বিষয় হলো, এই ঘরের দেওয়ালে বড় করে যতন রাজার প্রাসাদের পেইন্টিং টাঙানো। পুরো একটা দেওয়াল জুড়ে শুধু যতন রাজার প্রাসাদের পেইন্টিং। পেইন্টিং'টা দেখে চিশতির মনে হতে লাগে এটা কিছুদিন আগেই আঁকানো হয়েছে। একদম জীবিত বলে মনে হচ্ছে চিশতির। সামনে গিয়ে নিজের হাতে স্পর্শ করে চিশতি। এই পাশ থেকে ওই পাশ যেখানে যেখানে ইচ্ছে হচ্ছে সেখাই স্পর্শ করছে চিশতি। যেনো সচক্ষে সেই জলজ্যান্ত প্রাসাদের পরিবেশটা উপভোগ করছে সে। হঠাৎ চিশতির চোখ পরলো পাশের দেওয়ালে, কিছু একটা সুইচবোর্ডের মতো লাগছে। এটা দেখতে ইট হলেও এটা ইট নাহ। কৌতুল নিয়ে সেখানে গিয়ে উঁচু হয়ে থাকা ইট'টাতে চাপ দিলো সাথে সাথে দেওয়ালে থাকা যতন রাজার প্রাসাদের পেইন্টিং'টা নিচে নেমে গেলো। আর চিশতির সামনে প্রকট হলো একটা নতুন দরজার। এই পরিত্যক্ত বাড়িতেই এমন গোপন দরজা থাকতে পারে ভেবেই চিশতির মাথা ঘুরতে থাকে। সাত-পাঁচ নাহ ভেবে দরজাটা খুলে ফেললো চিশতি। দরজা খুলে যা দেখলো এটা দেখে রীতিমতো ভীমড়ি খেলো সে। দরজার পেছনে অগুনিত সিঁড়ি যা বইয়ে চলেছে মাটির নিচের দিকে। এই অন্ধকার রাতে কিছুই তোহ ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে নাহ, কিভাবে এখন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামবে চিশতি। এটাই ভাবতে ভাবতে এক পা দু পা করে সিঁড়ি গুনতে গুনতে নিচে নামতে থাকে। কয়েকটা সিঁড়ি যাওয়ার পর নিজের পায়ের সাথেই হোঁচট খেয়ে পরে যায় চিশতি। নিচে পরতেই চিশতি হাতে রজনীগন্ধা ফুলের মালার ছোঁয়া পায়। মালাটা হাতে তুলে নাকে গন্ধ শুঁকে দেখে এটা একদম টাটাকা ফুলের মালা। তার মানে মাত্রই কেউ এখান থেকে নিচে গেছে। সন্দেহ যেনো আরো বাড়তে থাকে তার সাথে বাড়ছে রহস্য। এই রহস্যের কিনারা খুঁজতে হলে তাকে এই সিঁড়ির একদম শেষ অব্দি যেতে হবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও উঠে দাঁড়ালো চিশতি। একটা একটা করে আবারও সিঁড়ি পার হতে থাকে। অবশেষে তার অপেক্ষার পালা শেষ হলো। নিচে নামতেই চিশতির চোখ কপালে উঠে যায়। এখানে আলোরা আলোর সাথে খেলা করছে। পথ সাজানো হয়েছে অনেকগুলো মশাল দ্বারা। মশালগুলোকে নিজের পথের সঙ্গী মেনে তার পিছু করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে চিশতি। এক পর্যায়ে গিয়ে থেমে গেলো চিশতি। সামনেই সেই মেয়েটা বসে আছে। মেয়েটার সামনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। পাশেই একটা গামলায় রক্ত রাখা। কিসের রক্ত এটা শুধুমাত্র সেই মেয়েটাই ভালো বলতে পারবে। মেয়েটাকে বসে থাকতে দেখে চিশতি ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকে লুকিয়ে পরলো। যাতে মেয়েটা চিশতিকে দেখতে নাহ পারে। দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছে চিশতি মেয়েটা কি করে। এবার মেয়েটা কার যেনো একটা ছবি বের করে সেটা টুকরো টুকরো করলো। মাটিতে রাখা বেশকিছু বেগুন পাতার মধ্যে এক এক টুকরো ছবির অংশ রাখলো। তারপর সবগুলো বেগুন পাতা একত্র করে আগুনে ফেলে দিলো। পাতাগুলো পুড়বার সাথে সাথে আগুন থেকে একটা পুতুল উঠে এলো। মেয়েটা আগুনের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে সেই পুতুলটা বের করে পাশে রাখা রক্তের গামলায় চুবিয়ে দিলো। এদিকে চিশতিরও দম বন্ধ আসছে। এমন মনে হচ্ছে যেনো তার মাথা কেউ পানিতে চেপে ধরেছে। ছটফট করতে করতে প্রকাশ্যে চলে আসে চিশতি। চিশতিকে ছটফট করতে দেখে মেয়েটা অট্টহাসিতে মেতে উঠে। হাসতে হাসতে মেয়েটা দিকে তাকায়। চিশতি নিজের হাতে নিজের গলা চেপে ধরে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দিয়ে মেয়েটার মুখে রক্ত আর আবির একত্রে মাখানো। যার কারণে তার মুখটা দেখা যাচ্ছে নাহ। তবে এতটুকু বুঝা যাচ্ছে এই মহিলা সাধারণ কেউ নাহ। ছটফট করতে করতে প্রায় যায় যায় অবস্থা চিশতির। মেয়েটা তখন কর্কশ কণ্ঠে বলে "তুই কি ভেবেছিস! তুই আমার পিছু করতে করতে এখানে এসেছি? হা!হা!হা! আমি চেয়েছি বলে তুই আমার পিছু করতে পেরেছিস। তোকে এখানে আমি এনেছি। আমি চাইলে তোকে এক্ষুনি প্রাণে মারতে পারি কিন্তু আমি তা করবো নাহ। তোকে তিলে তিলে মারবো। আমার দলের মানুষদের তুই মেরেছিস। এর শাস্তি তোহ তোকে ভোগ করতেই হবে। দেখ কি হাল করি তোর। শুধু দেখতে থাক তোর ধ্বংস কিভাবে করি আমি। হা!হা!হা! মূর্খ, নিজেকে খুব চালাক ভাবিস তুই। এখন তোহ তোর কোনো শক্তিও নেই কিভাবে বাঁচাবি নিজেকে?" এই বলে মেয়েটা অট্টহাসিতে হাসতে হাসতে আবারও নিজের আঁচল খানি মাটিতে লুটিয়ে দিয়ে বাহিরে বেরিয়ে যায় আর চিশতিও সেখানেই দম বন্ধ হয়ে জ্ঞান হারায় তারপর কি কি হয় সেসব চিশতির কিছুই মনে নেই। কিভাবে সে ওখান থেকে নিজের বাড়ি অব্দি আসে। সেদিন রাতের সবকিছু মনে পরলেও সে কিভাবে এখানে এলো এগুলো ভাবতেই থাকে চিশতি। চিশতিকে চুপ থাকতে দেখে চিত্রা আবারও বলে "কিরে! শরীর খারাপ লাগছে নাকী?" চিশতি কিছু নাহ ভেবেই বলে "আমার দম বন্ধ লাগছে! আমাকে একটু বাইরে নিয়ে যাবে" পাশে বসে থাকা লোকগুলো কিছু বলার আগেই সেদিন রাতে দেখা ওই ধবধবে সাদা বিড়ালটা আবারও কোত্থেকে যেনো এসে চিশতির উপরে ঝাপিয়ে পরলো। বিড়ালটাকে দেখে আমিনা বিবি বিড়বিড় করতে করতে বলে "কোত্থেকে যে এটা এসেছে কে জানে? যেদিন থেকে তুই অজ্ঞান হয়েছিস সেদিন থেকে এই বিড়ালটা আমাদের বাড়িই ছাড়ছে নাহ" আমিনা বিবির মুখে এসব শুনেও চিশতি সবকিছু উপেক্ষা করলো। কারণ তার এখন শরীর খারাপ লাগছে। সে একটু নিঃশ্বাস নিতে চায়। চিত্রা আর ইছামতী চিশতিকে ধরাধরি করে নিচতলায় এনে ডাইনিং টেবিলে বসায়। পিছে পিছে বিড়ালটাও নিচে নেমে আসে। বাইরে আসার পর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছে চিশতি। অনেকক্ষণ এভাবেই আপন মনে বসে বসে ভাবতে থাকে কি হচ্ছে তার সাথে আর কেনোই বা হচ্ছে। সে চাইলেও এসব বাসায় বলতে পারছে নাহ কেনো। যখনই বলার চেষ্টা করে তখনই মনে হয় তার মস্তিষ্ক তার মনের কথা শুনছে নাহ। চিশতি যখন আপন মনেই মগ্ন তখনই পিছন থেকে কেউ এসে খপাৎ করে চিশতির ঘাড়ের মেরুদণ্ডের হাড়ে ধরলো। শক্তি খাটিয়েও চিশতি নিজেকে ছাড়াতে পারছে নাহ। কে ধরেছে এটাও দেখতে পারছে নাহ। তবে এতটুকু অনুভব করছে যেই ধরেছে তার শরীর সম্পূর্ণ বরফের মতো ঠান্ডা। নিঃশ্বাস একদম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখগুলো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার মতো বড় বড় হয়ে গেছে। জোরে জোরে শ্বাস পরছে। একটা পর্যায়ে চেয়ার থেকে ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পরে চিশতি। মাটিতে পরার সাথে সাথে সে দেখতে পেলো একটা ছায়া তার পিছন থেকে হাওয়ার গতিতে উধাও হয়ে গেলো। তার মানে যে চিশতির ঘাড় চেপে ধরেছিলো সে কোনো মানুষ নাহ। কৈ মাছের মতো কাতরাতে থাকে চিশতি। বাইরে চিশতির ছটফটানির শব্দ পেয়ে রান্নাঘর থেকে আমিনা বিবি, চিত্রা, ইছামতী আর হালিমা দৌঁড়ে আসে। ওরা আসতে আসতে চিশতি ওখানেই অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর ওরা এসে দেখে চিশতি মাটিতে লুটিয়ে আছে। মুখ দিয়ে সমানে ফেনা বের হচ্ছে। শরীর তরতর করে কাঁপছে। আমিনা বিবি তোহ চিশতির এই হাল দেখে "বাবা গোহহহহহহ" বলে নিজেই অজ্ঞান হয়ে পরে যায়। ইছামতী আর হালিমা মিলে আমিনা বিবিকে সামলায়। চিত্রা বাকিদের ডেকে এনে চিশতিকে ধরাধরি করে ওর রুমে রেখে আসে। চিশতিকে রুমে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ মাথায় পানি দিলো। কিন্তু ওর জ্ঞান ফেরার কোনো নামই নিচ্ছে নাহ। এরপর সবাই যে যার কাজে চলে যায় চিশতিকে ওর রুমে রেখে। সবার চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পর চিশতির জ্ঞান ফিরে। জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে চিশতির চোখ যায় জানালার দিকে। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে একটা পঁচা গলা বিশৃ দেখতে একটা কউ জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। চিশতি তারে দিকে তাকাতে দেখে এক গাল সয়তানি হাসি দিয়া জানালা ভেদ ভাসতে ভাসতে চিশতির সামনে চলে এলো। চিশতি একদম হতভম্ব হয়ে গেলো। চিৎকার দিতে গিয়েও চিৎকার দিতে পারছে নাহ। মুখ দিয়ে কোনো রাঁ বের হচ্ছে নাহ চিশতির। কি করবে এখন ভেবেও পাচ্ছে নাহ। মনে মনে দোয়া দরুদ পড়ারও চেষ্টা করছে কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে। সেই অবয়মটা চিশতির দিকে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে দেয়। বিছানা থেকে চিশতিকে হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে সজোরে আবারও বিছানায় ফেলে দেয়। এরপর চিশতির বুকের উপর বসে গলা চেপে ধরে। চিশতি বাঁচার জন্য ছটফট করছে। বিছানার চাদর খাবলে ধরেছে। পা দিয়ে রগরাতে রগরাতে বিছানার চাদর ঘোচ খাইয়ে ফেলেছে। এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। অসহায় দৃষ্টিতে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রয়েছে চিশতি। তখনই কোত্থেকে যেনো সেই সাদা বিড়ালটা অবয়মটার উপরে ঝাপিয়ে পরলো, সাথে সাথে অবয়মটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। চিশতিও হাফ ছেড়ে বাঁচলো। চিশতিকে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে দেখে বিড়ালটা আহ্লাদী হয়ে চিশতির শরীর ঘেঁষে বিছানায় শুয়ে রইলো।