পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ২০

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২০ · ২৮ পর্বের মধ্যে ২০

সুন্দর স্নিগ্ধ একটি দিন। পথপ্রদর্শক হাজারও মানুষ ছুটাছুটি করছে নিজ তাগিদে। রাস্তার যানবাহন শব্দ করে চলেছে। পুকুরে ছেলে-মেয়েরা আপন মনে গোসল করতে ব্যস্ত। ব্যস্ত শহরে কে রাখে কার খোঁজ। সবকিছু ব্যস্ত হয়ে গেলেও কুরেশি পরিবারের ছোট ছেলের মন জুড়ে আজও রয়েছে নূরীর শূন্যতা। সেই শূন্যতা কোনো ভাবেই অন্য কিছুতে ব্যস্ত হচ্ছে নাহ। দিন দিনই চিশতির পাগলামি যেনো বেড়েই চলেছে। এমন পাগলামির হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে চিশতিকে ঘর বন্দী করে রাখবে। যখন যা প্রয়োজন বাড়ির লোকেরাই দেখভাল করবে। ছোট ছেলে যে কোনো এক অপহরণ কৃত মেয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছে এই খবর যেনো ভুলেও বাইরে জানাজানি নাহ হয় সেই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো পুরো কুরেশি বাড়িতে। "মেরে তোহ ফেলতে পারবো নাহ, পাগল হলেও সে তোহ আমারই সন্তান" মজলিসে সমাবেশাবস্থায় বললো আব্রাহাম কুরেশি। "ছেলেটা এতদিন ধরে ঘর বন্দী হয়ে আছে, ভাইসাব আমার মতে ওকে একটা ভালো ডাক্তার দেখানো দরকার" সবার সামনে মুখে আঁচল গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললো হাজেরা। "হ্যাঁ! বাবা। এভাবে আর কতদিন? আমার মতে মামী একদম ঠিকই বলেছেন, এবার নাহয় চিশতি ভাইয়াকে একটা ভালো ডাক্তার দেখানো উচিৎ" হাজেরার কথায় সাহস জুগিয়ে বললো ইছামতী। "ব্যাপারটা নিয়ে আমি গত রাতেও আমিনার সাথে পরামর্শ করেছি। ছেলেকে বুঝাতে হবে যা হয়েছে সব ভুলে যাওয়ার জন্য। আসল দোষটা আমাদেরই, আমরা জানি যে, আমাদের পরিবারের একজন অসুস্থ তারপরও আমরা তাকে সময় নাহ দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকি। তাকে বুঝবো দূরের কথা তাকে ভয় পেতে শুরু করেছি।" একটু ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো আব্রাহাম। "বাবা! চিত্রার সাথে কথা হয়েছিলো, ও বললো ওর চেনা নাকী একটা ডাক্তার আছে। মানসিক রোগীদের জন্য স্পেশালিষ্ট" ভাইকে সুস্থ করার তাগিদে এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে বড় ডাক্তারের খোঁজ নিয়ে বড় ভাই হাসমিকে জানায় চিত্রা এবং হাসমি সবার সামনে বাবাকে সেই খবরই দিলো। "কোন জায়গায়?" হাসমিকে প্রশ্ন করলো আব্রাহাম। "মোহাম্মদপুর! ২/৪,হুমায়ুন রোড, ব্লক বি, ঢাকা-১২০৭। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা মানসিক ও মাদকাসক্ত হাসপাতাল। ওখানে একজন বড় অধ্যাপক আছেন, ২৫০০ টাকা ভিজিট লাগে" জবাবে বললো হাসমি। "সে যত টাকাই লাগুক। টাকা তোহ আর ওর পিছনে কম খরচ হলো নাহ, এখানে আসার পর থেকে একটার পর একটা লেগেই আছে। এখন তোহ মানসিক ভারসাম্যটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। কালকেই চিত্রার সাথে যোগাযোগ করে ওকে নিয়ে সেখানে যাবি।" দাঁতে এক কোণে গুলের গুঁড়া দিতে দিতে বললো আব্রাহাম। নিজের রুমে পাগলের মতো পরে আছে চিশতি। কি সুন্দর পূর্ণিমার চাঁদের মতো মুখখানা শুকিয়ে অমাবস্যার চাঁদের মতো হয়ে গেছে। শরীরে হাড় ব্যতীত আর কিছুই নেই। ঠিক মতো খায় নাহ, ঘুমায় নাহ, সারাক্ষণ শুধু নূরী আর নূরী বলে কান্না করে। মুখে বালিশ চেপে ধরে একা একা বিড়বিড় করছে, "তাকে পাবো বলে পাইনি তাকে আমি হারিয়েছি যাকে। সে আমার হবে বলে আমি হইনি তার যার হবার কথা ছিলো আমার। খারাপ আমি জানি সবই তুমি থেকে গেলে জমতো নাহ কষ্টের স্মৃতি। কেনো আমায় কাঁদালে, কেনো তুমি চলে গেলে। দোষ কি ছিলো আমার তোমায় ভালোবেসে? পাগল হয়ে ঘুরছি আমি দারে দারে। দেখছো কি তুমি দূরে বসে, সময় পেলে ছুঁয়ে যেও আমার কাছে এসে" কিছু মুহুর্ত পর আমিনা বিবি আসে চিশতিকে এক নজর দেখতে। জানালা দিয়ে এক পলক তাকালো ছেলের দিকে। "আহ! এটাই আমার সেই চাঁদের টুকরো? নাহ! এটা আনার চাঁদের টুকরো নাহ, আমার চাঁদের টুকরো ছিলো জ্বলন্ত শিখা। এটা তোহ নিভে যাওয়া মোমবাতির ধোঁয়া।" অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে রইলো ছেলের দিকে। আঁচল খানি দিয়ে চোখ দু'টি মুছে, আঁচল থেকে চাবির গুচ্ছটা বের করে দরজায় লাগানো তালাটা খুললো আমিনা বিবি। দরজার কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে ভিতরে থাকা চিশতি লাফিয়ে উঠে চেঁচাতে থাকে "নূরী! আমার ননূরী এসেছে। হা!হা!হা! আমার নূরী এসেছে। আমি! আমি জানতাম তুমি আমাকে ছেড়ে কিছুতেই দূরে থাকতে পারবে নাহ" নূরীর নাম নিয়ে ডাকতে ডাকতে দরজার দিকে তাকায় চিশতি। তাকিয়ে দেখে আমিনা বিবি মুখে আঁচল গুঁজে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে। "ওহ্! কেনো এসেছো? আ-আমার নূরীকে তোমরা লুকিয়ে রেখেছো তাই নাহ? কেনো এমন করছো? ফিরিয়ে দাও নাহ নূরীকে। ফিরিয়ে দাও! ফিরিয়ে দাও!" চেঁচাতে চেঁচাতে মাথার চুল টেনে ছিঁড়ছে চিশতি। আমিনা বিবি দৌঁড়ে গিয়ে ছেলেকে শান্তা করার চেষ্টা করছে৷ একা মানুষ কিছুতেই চিশতির শক্তির সাথে কুলচ্ছে নাহ। "বাবা! বাবা! এইতো মা এসেছি দেখ!! মায়ের কথা শুনবি নাহ। চিশতি বাবা, তুই মাকে ভালোবাসিস? মায়ের কথা শুনবি নাহ? তোর মা যেভাবেই হোক নূরীকে এনে দিবে। একটু শান্ত হ বাবা" চিশতির কান অব্দি যেনো আমিনা বিবির কণ্ঠ যাচ্ছে নাহ। উন্মাদের মতো চেঁচাচ্ছে। শরীরের শক্তি খাটাচ্ছে। এক পর্যায়ে আমিনা বিবিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় চিশতি। আমিনা বিবি নিজেকে সামলাতে নাহ পেরে দেওয়ালের সাথে গিয়ে ধাক্কা খায়, ফলে তার মাথায় কিছুটা আঘাত পায়। মাকে এভাবে পরে যেতে দেখেও চিশতির বিন্দুমাত্র মায়া হলো নাহ বরং সে রুম থেকে পালানোর জন্য ছুটে বাইরে চলে যেতে লাগে। তখনই দরজার সামনে এসে ইছামতী আর হাজেরা হাজির হয়। ইছামতী দৌঁড়ে গিয়ে আমিনা বিবিকে ধরে। দরজার সামনে হাজেরাকে পথ আটকে দাঁড়াতে দেখে চিশতি একদম চুপসে গিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পরলো। হাজেরা চিশতির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো "বাবা! আমার মেয়েটার জন্য তুমি নিজের ক্ষতি করো নাহ। নূরী এমন করবে জানলে কিছুতেই ওর সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করতাম নাহ। কে জানে কি হয়েছে ওর! কেউ বলছে নিজে থেকে পালিয়ে গেছে আবার কেউ বলছে অপহরণ হয়েছে। সত্যি মিথ্যা আল্লাহ ভালো জানে। তুমি ওকে নিয়ে আর ভেবো নাহ। মায়ের কথা শুনো, তোমার মা যা বলে তাই করো। উনি তোহ তোমার ক্ষতি চাইবে নাহ বাবা। একটু বোঝার চেষ্টা করো।" চিশতির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নিজের হাতে থাকা হলুদ মেশানো দুধের গ্লাসটা আমিনা বিবিকে দিয়ে বললো "ভাবি! দুধটুকু চিশতিকে খাইয়ে দিন, কিছুই তোহ খায় নাহ ছেলেটা। আব্রাহাম ভাই বললো কালকে নাকী ওকে নিয়ে বড় ডাক্তারের কাছে যাবে। ততক্ষণ সবাই মিলে ওর একটু যত্ন নেওয়া উচিৎ।" আমিনা বিবি দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে চিশতিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে খাইয়ে দিলো। দুধ খাওয়ার পর অনেকক্ষণ চিশতি চুপচাপ ছিলো। একদম নিস্তব্ধ শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। তাকিয়ে আছে ডেবডব করে। হঠাৎ খুব জোরে চিৎকার দিয়ে চুল টানতে টানতে বললো চিশতি "আমার মাথার ভিতর কেমন যেনো করছে! খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।" আমিনা বিবি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ করেই সে বুঝতে পারলো চিশতির জ্বর উঠছে। একটা কথা আছে নাহ "ঝগড়ার আগে ত্যাড়া কথা আর জ্বরে আগে মাথা ব্যথা" আমিনা বিবি ছেলের মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। ইছামতী অনেকক্ষণ আগেই চলে গেছে। হাজেরাও চুপটি করে বসে আছে ঘরের এক কোণে। "বেয়ান এখানে বসে থাকবেন কেনো শুধু শুধু! আপনি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নেন যদি কোনো দরকার হয় আমি ডেকে নেবো" বললো আমিনা বিবি। হতাশায় ডোবা চোখ নিয়ে চলে গেলেন হাজেরা। কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর চিশতি ঘুমিয়ে যায়। ছেলেকে ঘুমতে দেখে শান্ত মনে আমিনা বিবিও রুমে তালা লাগিয়ে চলে যায়।

নির্জন কোনো এক অন্ধকার জায়গা। সবকিছু কেমন লালচে-ধূসর। গোল বৃত্তের ভেতরে ছয় কোণের তাঁরা আঁকা। সেই তাঁরার ঠিক মাঝ বরাবর অসংখ্য বেগুন পাতা, বেগুন পাতার মধ্য খানে সাদা কাপড়ের তৈরী একটা পুতুল রাখা। পাশেই বসে আছে একজন মহিলা। এটা সেই মহিলা যাকে কিছুদিন আগে নিজের ওয়াশরুমের ভেতরে তন্ত্রমন্ত্র করতে দেখেছিলো চিশতি। চোখ বন্ধ করে মুখ বরাবর হাত মুষ্টি করে ধরে বিড়বিড় করে কিছু উচ্চারণ করছেন তিনি। হঠাৎ ভয়ংকর দৃষ্টিতে পুতুলটির দিকে তাকিয়ে হাতের মুষ্টিতে থাকা ভস্মগুলো ছুড়ে মারলো। ঝুলি থেকে একটা মৃত মানুষের মাথার খুলি বের সেই বৃত্তের ভেতরে রাখলো। আবারও চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে তন্ত্রমন্ত্র পাঠ করতে থাকে। তন্ত্রমন্ত্র পড়তে পরতে পাশে থাকা থালা থেকে এক খাবলা লাল রঙ নিয়ে খুলিতে মাখিয়ে দিলো। এরপর ঝুলি থেকে একটা হাড়ের অংশ বের করে সেটা খুলিটির উপরে তিন বার ঘুরানোর সাথে সাথে কাপড়ের তৈরী পুতুলটা বড় বড় চোখ করে তাকালো।

---

প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে এখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন চিশতি। হঠাৎ তার ঘুম ভেঙ্গে পানি পরার টিপটিপানি শব্দ শুনে। ঘুমন্ত চোখে এক হাতে মাথা চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে চোখ ডলতে ডলতে বিছানা থেকে উঠে বসলো চিশতি। বিছানা থেকে এক পা ফ্লোরে রাখতে সে দেখতে পেলো ঘরের বেসিনটি অন হয়ে আছে। ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নিয়েই গিয়ে বেসিন বন্ধ করলো। বেসিনটি ওয়াশরুমের সামনে থাকার কারণে সে বুঝতে পারলো ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানি পরার শব্দ হচ্ছে। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে ওয়াশরুমের দরজা খুলে দেখে ভেতরে টিপকল ও সাওয়ার দুইটাই অন হয়ে আছে। সারাদিন হয়তো ট্যাঙ্ক ট্যাঙ্কে পানি ছিলো নাহ, কল চালু করেছিলো অফ করতে ভুলে গেছে। এখন ট্যাঙ্কে পানি হওয়ায় কল অটোমেটিক অন হয়ে গেছে এটা ভেবে চিশতি এবারও কল অফ করে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পরলো। বিছানায় শোয়া মাত্রই চিশতির চোখে ঘুম ঘুম ভাব চলে এসেছে। চোখ প্রায় নিভু নিভু তখনই হঠাৎ করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায় চিশতি। নিষ্পলক চোখে শুধু তাকিয়ে আছে। হয়তো সে এখন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। কি হয়েছে তার নিজেও জানে নাহ সে। এক পা দু পা করে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটু গেড়ে বসে খাটের তলায় উঁকি দিলো। এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে খাটের তলা থেকে একটা ছুড়ি বের করলো। ছুড়িটা নিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঘেঁষে বসলো চিশতি। তখন খাটের নিচ থেকে কেউ খিটখিট করে সয়তানি হাসি হাসছে। "দেড়ি করিস নাহ! কেটে ফেল তোর হাত, কেটে ফেল! কেটে ফেল!" চুপটি করে বসে খাটের তলায় তাকালো চিশতি। সেই পঁচা গলা অবয়বটা খাটের তলা থেকে চিশতিকে উসকানি দিচ্ছে। চিশতি ওটার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে এক টানে হাতের শিরা বরাবর কেটে ফেললো। অল্পর জন্য শিরা অব্দি পৌঁছায়নি ছুড়ির টান। তরতর করে রক্ত পরছে কাটা স্থান থেকে। রক্তের দিকে লালসার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে চিশতি। যেনো এই রক্ত তার খুব প্রিয় একটা খাবার। জিহ্বা বের ঠোঁট ভেজালো। সময় বিলম্ব নাহ করে জিহ্বা দিয়ে নিজের হাতের রক্ত চাটতে লাগলো চিশতি। রক্তের স্বাদ গ্রহণ করার সাথে সাথে চিশতির হুঁশ ফিরলো। "কি করছি আমি?? আ-আমার হা-ত কাটলো কিভাবে? আ-আমি রক্ত খা-চ্ছি??" ভয়ে চিৎকার করতে করতে দরজার সামনে গেলো চিশতি। "আম্মি- আম্মি- দরজা খুলো আম্মি! আম্মি!!" দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে চিৎকার করছে চিশতি। চিশতির ভয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। কি করবে দিশা পাচ্ছে নাহ।

পরদিন সকাল..........

হাসমি চিশতিকে নিয়ে আজ ডাক্তারের কাছে যাবে। তাই সকাল সকাল খাবার দাবার রেডি করছে আমিনা বিবি, হালিমা আর ইছামতী। তাদের কাজের সহযোগিতা করার জন্য হাজেরাও আছে। "ভাবি! কিছু মনে নাহ করলে একটা কথা বলতাম!" পেঁয়াজ কাটতে কাটতে বলছে হাজেরা। "কি আর মনে করবো? বলুন কি বলবেন?" রুটি বেলতে বেলতে বলছে আমিনা বিবি। "আসলে!! চিশতি ডাক্তার দেখিয়ে আসার পর ওকে একটা ভালো হুজুর দেখাবেন। আমার মনে হচ্ছে ওর মানসিক চিকিৎসার পাশাপাশি আল্লাহ কালামেরও প্রয়োজন আছে" আমতা আমতা করে বললো হাজেরা। "হ্যাঁ! হ্যাঁ! মা আমারও কিন্তু তাই মনে হচ্ছে। ওইদিন রাতে কি হয়েছে আপনি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি?" করাই থেকে ভাজি নামাতে নামাতে বললো ইছামতী। "কি হয়েছিলো ওইদিন রাতে?" প্লেট পরিষ্কার করার জন্য হাতে নিয়ে বললো হালিমা। "নাহ! নাহ! কিছুই হয়নি" ইছামতীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললো আমিনা বিবি। "সে যাই বলো, আমারও কিন্তু মনে হচ্ছে চিশতিকে একটা ভালো হুজুর দেখানো উচিৎ। নয়তো একদম সুস্থ ছেলেটা হঠাৎ এমন পাগলামি করছে কেনো!! কালকে আবার হাত কেটে নিজের রক্ত নিজেই খাওয়া শুরু করেছে। মনে হয় কোনো জ্বিন টিনের আশ্রায় আছে।" ডাইনিং-এ প্লেট সাজাতে সাজাতে বলছে হালিমা। "আমার ছেলের জন্য কি কি করা দরকার আমি খুব ভালো করেই জানি ছোট। তোদের উপদেশ দিতে হবে নাহ" ভাজির প্লেটটা ডাইনিং-এ রেখে হালিমার দিকে তাকিয়ে বললো আমিনা বিবি।

সকালের নাস্তা করে চিশতি আর হাসমি বেরিয়ে পরলো। আশ্চর্য করা বিষয় হলো চিশতি বাড়ির ভিতরে পাগলামি করলেও তাদের বাড়ির গেইট থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে একদম সুস্থ আচরণ করতে শুরু করে। হঠাৎ ছেলের এমন পরিবর্তন দেখে আমিনা বিবি কিছু একটা আচ করতে পারে। তবে তৎক্ষনাৎ কিছু প্রকাশ করে নাহ। চিশতিকে নিয়ে সিএনজি-তে উঠে। কিছুটা পথ অতিক্রম হওয়ার পর "চিশতি! এই চিশতি! এদিকে তাকাও?? চিশতি" ফিসফিস গলায় কেউ চিশতিকে ডাকছে। আলতো করে ঘাড় ঘুরিয়ে নিমুকে দেখে অবাক হয়ে যায় চিশতি। নাম ধরে ডাকতে যাবে তখনই নিমু চিশতির মুখ চেপে ধরে। "হুশশশশ! তোমার ভাই শুনতে পাবে। তোমার কিচ্ছু বলতে হবে নাহ। তুমি শুধু মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনো! তোমার বাড়িতে এমন কেউ আছে যে জানতে পেরেছে তোমার সাথে আমার কথা হয়। যাই হোক, তোমাকে সহজ ভাবে বুঝাই। তোমাদের বাড়ির মধ্যে এমন কেউ আছে যে তোমার ক্ষতি চায়। অতঃপর সে জানতে পেরে গেছে যে আমার জন্য সে তোমার ক্ষতি করতে পারছে নাহ। এজন্য প্রথমে তোমার রুমের দরজায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করা মানুষের হাড় দিয়ে তাবিজ করেছে যাতে আমি তোমার রুমে ঢুকতে নাহ পারি এবং পরবর্তীতে তোমার বাড়ির শেষ সীমানায় যে বরই গাছটা আছে সেই বরই গাছের নিচে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করা মানুষের হাড় দিয়ে তাবিজ করেছে যাতে আমি তোমাদের বাড়ির ভিতরে ঢুকতে নাহ পারি। শুধই তাই নয়, এগুলো দু'টো কারণে করা হয়েছে, প্রথমত তুমিও যাতে আত্মহত্যা করো এতে কেউ বুঝতেই পারবে নাহ যে তোমাকে কালোজাদু করা হয়েছে। আর দ্বিতীয়ত আমি যেনো তোমাকে সাহায্য করতে নাহ পারি। ওই তাবিজগুলো যতদিন ওখানে থাকবে আমি তোমার সাহায্য করতে পারবো নাহ।" চিশতিকে সত্যিটা জানিয়ে ওখান থেকে নিমু চলে যায়। প্রায় তিন ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে হাসমি চিশতিকে নিয়ে তাদের গন্তব্য স্থানে পৌঁছায়। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট শেষে তারা আবার ওখান থেকে চলে আসে। আসার পথে হাসমি গিয়ে চিশতির ঔষধগুলো কিনে আনে। গাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে হাসমি ডাক্তারকে গালি দিতে বলে "শালা ডাক্তার নাহ অন্য কিছু! ডাক্তার হয়েছে সুন্দর মতো চিকিৎসা করবে তা নাহ করে রোগীকে খালি ঘুমের ঔষধ লিখে দিছে" হাসমিকে বিড়বিড় করতে দেখে ড্রাইভার লোকটা বললো "কি অইছে ভাই ওমন ক্ষেপছেন ক্যা?" হাসমি ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বললো "আর কি করবো বলুন? ঔষধ আনতে গিয়ে দেখি সবই ঘুমের ঔষধ দিছে। পাগলাগারদের চিকিৎসাও এর থেকে ভালো। ওরা ডাক্তার হয়ে কি করতে কে জানে? রোগীকে যদি সারাদিন ঘুম পারিয়ে রাখি তাহলে বুঝবো কিভাবে কতটুকু সুস্থ হয়েছে" হাসমিকে শান্ত হতে বলে আবারও গাড়ি চালানোয় মন দিলো ড্রাইভার লোকটা।