পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ২৩

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২৩ · ২৮ পর্বের মধ্যে ২৩

পড়ন্ত বিকেল। উদয়কালের কোমলতা হারিয়ে, মধ্যদুপুরের প্রখরতা পাড়ি দিয়ে নিস্তেজ শেষ আলোটুকু আলতোভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে রক্তিমাভ সূর্যটি। তেজহীন রবিকিরণ সাথে মৃদুমন্দ বাতাসও তপ্ত দেহ শীতল করতে সক্ষম হচ্ছে নাহ। অফিস থেকে ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে ছুটছে চিশতি। পথিমধ্যে ফোনে রিং বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখতে পায় অফিসের বস কল করেছে। চিশতির অফিসের বস 'ওহাইও' একটু গুমোট প্রকৃতির মানুষ সহজে কারো সাথে কথা বলে নাহ। ফোন করা তোহ দূরের ব্যাপার। হঠাৎ বসের কল দেখে চোখ কপালে উঠে গেলো চিশতির। নার্ভাসনেস ছিলো তখন চিশতির শিরায় শিরায়। তাকে দ্বারা কোনো ভুল ত্রুটি হলো কি-না কে জানে! উল্টাপাল্টা চিন্তা করতে করতে কল রিসিভ করলো " হ্যাঁ হ্যালো!" ফোনের অপর প্রান্ত থেকে গুমোট কণ্ঠে ওহাইও বলে উঠলো "হ্যালো চিশতি! তোমার জন্য একটা বিশেষ খবর আছে!" অবাক হয়ে উৎসুক কণ্ঠে জানতে চাইলো চিশতি "বিশেষ খবর! আমার জন্য? কি এমন বিশেষ খবর স্যার?" অপর প্রান্ত থেকে ওহাইও বললো "আগামী সাত দিন পর তুমি বাংলাদেশে ছুটিতে যেতে পারবে। কোম্পানি থেকে তিনজন এমপ্লয়িকে নিজ নিজ দেশে পাঠানো হবে। যাবতীয় সকল খরচ কোম্পানি দিবে। আগামীকাল অফিসে এসে আমার সাথে এই বিষয়ে কথা বলবে কেমন?" এত বড় খুশির খবর পাওয়ার পরও যেনো চিশতি খুশি হলো নাহ। মন খারাপ নিয়ে জবাব দিলো "ওকে স্যার!" প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছে চিশতি। নিজে থেকে বাড়িতে কল নাহ দিলে কেউ আগ বাড়িয়ে চিশতির খোঁজ নেয় নাহ। অথচ প্রতি মাসে ঠিক মতো টাকা পাঠাতে নাহ পারলে আমিনা বিবির কটুকথা একটাও মাটিতে পরে নাহ।

প্রায় মাস তিনেক আগে....

"আম্মি! তিন বছরের বেশি হলো বিদেশে আছি। আমারও তোহ তোমাদের কথা খুব মনে পরে। ইচ্ছে করে তোমাদের সামনে থেকে দেখি। তা ভাবছিলাম নাহ এবার ভিসা অ্যাপ্লাই করে দেশে ফিরবো। কিছুদিন তোমাদের সাথে সময় কাটালাম" আকুল গলায় বললো চিশতি। "এই! নাহ! নাহ! একদম দেশে ফেরার নাম নিবি নাহ। বাড়িতে এখনো বহুত কাজ কাম বাকি আছে। নতুন জায়গায় বিল্ডিং তুলছি। সেই কাজ শেষ করতে হবে। এখনো প্রচুর টাকার লোন রয়ে গেছে। ওগুলো পরিশোধ করার আগ পর্যন্ত দেখে ফেরার কথা মুখেও আনবি নাহ। আর কয়েক বছর বিদেশ কর তারপর দেশে ফিরে বিয়ে-শাদি করে আবার চলে যাবি। এখন দেশে ফেরার কথা বলিস নাহ" মায়ের মুখে এমন আপত্তিকর কথা শুনে মন খারাপ করে কল কেটে দেয়। এরপর থেকে প্রায় তিন মাস হয়ে গেলো বাড়ি থেকে কেউই কল বা মেসেজ করে জিজ্ঞেস করেনি চিশতি কেমন আছে। মাঝে মাঝে ইছামতী একটু কল দিতো তাও ভয়ে ভয়ে। কে বা কারা যেনো ইছামতীকে চোখ রাঙিয়েছে সে যেনো চিশতিকে কল নাহ করে। নাম জানতে চাইলে ইছামতী লুকিয়ে গেছে চিশতির কাছে। বাড়ির কেউ খোঁজ ননাহ নিলেও নিজের দায়িত্ব চিশতি ঠিকই পালন করছে। প্রতি মাসে নিজের খরচ বাবদ কিছু টাকা রেখে ৭০-৭৫ হাজার টাকা পাঠায়। যদিও আগে লাখের উপরে পাঠাতো। বর্তমানে কোম্পানির কিছুটা লস হওয়ার কারণে সকল এমপ্লয়ি এর স্যালারি কমানো হয়েছে। নিজে থেকে কল দিলেও আমিনা বিবি নানান ব্যস্ততা বুঝিয়ে কল কেটে দেয়। হঠাৎ করে নিজের মায়ের এতটা পরিবর্তন কোনো সন্তানই মেনে নিতে পারবে নাহ। চিশতিও নিজের মায়ের পরিবর্তন মেনে নিতে পারছে নাহ। একদিকে বাড়ি ফেরার আনন্দ অন্য দিকে মায়ের সাফ কথার দোটানায় পরে গেলো চিশতি। এসব ভাবনায় মগ্ন হয়ে আনমনে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা লাগে। সামনের লোকটার হাতে থাকা একটা মোটা পুস্তক মাটিতে পরে যায়। সেদিকে চিশতির কোনো খেয়ালই নেই। "হেই! এক্সকিউজ মী!! হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুয়িং ম্যান!!" একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো চিশতি। হয়তো কোনো মেয়ের সাথে ধাক্কা লেগেছে। "সরি! সরি ম্যাম! আই এম এক্সট্রিমলি সরি! প্লিজ ফরগী মী" অনুতপ্ত হয়ে মার্জনা প্রার্থনা করছে চিশতি। বই তুলতে তুলতে বিড়বিড়িয়ে মেয়েটি বলছে "এই হচ্ছে বিদেশি লোকদের একটা মূল সমস্যা! অচেনা কারো সাথে ধাক্কা লাগলে সরি বলেই উদ্ধার হয়ে যায়। এটা যদি কোনো বাঙালি হতো তাহলে কান টেনে দিতাম এক" মেয়েটাকে দেখতে বিদেশিদের মতো হলেও ওর মুখে বাংলা ভাষা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে চিশতি। এভাবে আহাম্মকের মতো নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি বললো "হোয়াট?" চিশতি আমতা আমতা করে বললো "আপনি বাঙালি?" মেয়েটিও অবাক হয়ে মাথা উঁচু করে চিশতির দিকে তাকিয়ে বললো "আ-আপনিও বাঙালি? দেখে তোহ বিদেশি মনে হচ্ছে।" হকচকিয়ে গেল চিশতি। থতমত খেয়ে বললো "আমার জন্ম পাকিস্তানে। তবে আমার বাবা মা বাঙালি।" বিস্মিত হয়ে চিশতির দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে মেয়েটি বললো "ইন্টারেস্টিং! বাই দ্য ওয়ে! আই এম মাভিয়া উর্ফে মার্থা। এন্ড ইউ?" চিশতিও হাত বাড়িয়ে বললো "আই এম চিশতি কুরেশি। একটা জিনিস লক্ষ করেছেন?" মার্থা ভাবান্তর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো "কি?" চিশতি রোডের পাশে থাকা স্ট্যান্ড চেয়ারের দিকে এগিয়ে বললো "এখানে বসে বলছি!" মার্থাও চেয়ারে বসলো। "হঠাৎ করে যদি কেউ আমাদের দেখে তাহলে কেউই বুঝতে পারবে নাহ আমরা বাঙালি। তার চেয়েও বড় কথা হলো আমাদের চেহারার অনেকটা মিল আছে যে কেউ প্রথম দেখায় ভুল করে আমাদের জমজ ভেবে নিতে পারে" বললো চিশতি। "হ্যাঁ! বিষয়টা আমিও খেয়াল করেছি। বাংলাদেশে আপনার বাসা কোথায়?" জিজ্ঞেস করলো মার্থা। "মুন্সিগঞ্জ! আপনার?" বললো চিশতি। "নারায়ণগঞ্জ।" চিশতি জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে মার্থার দিকে তাকিয়ে বললো "নারায়ণগঞ্জ আমার বোনের বাড়ি। আমি অনেক বার ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। নারায়ণগঞ্জের কোথায় আপনাদের বাড়ি?" চিশতির প্রশ্নের উত্তর হিসেবে মার্থা বললো "জায়গায় নাম মনে নেই। তবে এতটুকু মনে আছে, নারায়ণগঞ্জে একটা পরিত্যক্ত চার্চ আছে ওটা আমাদের পূর্বপুরুষের।" চিশতি অবাক হয়ে বললো "আপনি.....?" চিশতিকে থামিয়ে দিয়ে মার্থা বললো "আমি খ্রিস্টান।" চিশতি অনেকক্ষণ চুপ থেকে আবারও বললো "নারায়ণগঞ্জে আমিও একটা পরিত্যক্ত চার্চ দেখেছি। শুনেছি ওটা নাকী প্রায় ২০০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিলো এখন হয়তো ৭০-৮০ বছর ধরে স্থগিত রয়েছে। এরপর নারায়ণগঞ্জে চার্চ সম্পর্কে আমি কিছু ঘাটাঘাটি করে জানতে পারি পুরো শহরে ওই একটাই চার্চ আছে যেটা স্থগিত।" চিশতিকে আবারও থামিয়ে দিয়ে মার্থা বললো "বাহ্! আপনি তোহ অনেক কিছু জানেন দেখছি। হ্যাঁ ওটাই আমাদের চার্চ। আমার বাবার জন্মের আগে ওটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।" চিশতি একটু নড়ে বসে জিজ্ঞেস করলো "কেনো বন্ধ হয়েছে জানতে পারি?" মার্থা নিশ্চুপ হয়ে বললো "সেই সত্যিটা জানার জন্যই আমি এখানে এসেছি।" বিস্মিত সুরে বললো চিশতি "মানে?" মার্থা কিছু বলতে যাবে তখনই তার কানে সাহায্যের ফিসফিস শব্দ ভেসে আসে।

"হে সাহায্যকারী শক্তি! আমি আপনাকে আহ্বান করছি। আপনি দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন, দয়া করে বর্তমান দুনিয়া থেকে বর্তমান প্যারালাল ইউনিভার্সে আসুন! আসুন! আসুন এবং আমাকে সয়তানের সাথে লড়াই করতে সাহায্য করুন। আল্লাহ তাআলার হুকুমে একমাত্র আপনিই পারবেন আমাকে সাহায্য করতে। এই সয়তান শুধু আমাকেই নাহ বরং আরো অনেক নিষ্পাপ মানুষের রুহ্'কে এই প্রাসাদে আটকে রেখেছে। আপনি আমাকে সাহায্য নাহ করলে আমি কিছুতেই এই সয়তানকে হারাতে পারবো নাহ আর যদি এই সয়তানকে হারাতে নাহ পারি তাহলে আমি যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি সেই উদ্দেশ্যও সফল হবে নাহ। এই প্রাসাদের অভিশাপও খন্ডন হবে নাহ। দয়া করে আসুন! আসুন! আসুন এবং আমাকে সাহায্য করুন। আসুন! আসুন! আসুন"

"আ-আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে। যদি কোনোদিন সম্ভব হয় তাহলে আমার জীবনের সব কাহিনী বলবো এবং আপনার জীবনের সব কাহিনীও শুনবো। এখন আমাকে বিদায় দিন। গুড বাই হলি স্পিরিট। টেক লাভ এন্ড বি স্ট্রং ইউরসেল্ফ" এই বলে সেখান থেকে দৌঁড়ে চলে গেলো মার্থা। কোথায় গেলো কেউ জানে নাহ। মার্থার এরূপ আচরণ এবং শেষ উক্তি শুনে চিশতি অবাক হয়।

আট দিন পর.........

পথিমধ্যে এসে হাজির হলো চিরচেনা ব্রিজের উপর। মহল্লায় যা ‘জাগাঁল’ নামে পরিচিত। আশপাশের যেকোনো লোকদের ‘জাগাঁল’ বললে তারা এই স্থানটিকেই চিহ্নিত করে দেবে নির্দ্বিধায়। ব্রিজের এই রাস্তাটি চলে গেছে বিলের মধ্য দিয়ে। বিলের নাম গাজনা। মানুষের মুখে প্রসিদ্ধ ‘গাজনার বিল’ হিসেবে। উন্মুক্ত আকাশের নিচে যতদূর চোখ যেতো শুধু মাঠ আর মাঠ। তবে এখন এই গাজনার বিল বালির নিচে চাপা পড়ে গড়ে উঠেছে উন্নতমানের মার্কেট। বছরের এই সময়ে ফসলবিহীন শুধু মাটি-গোধূলির এই বেলায় দিগন্তজোড়া ধূসরতা। তাই চাষিদের আনাগোনাও খুব বেশি থাকতো এই সময়। দু’পাশে খোলা মাঠ জনবসতিহীন এই জায়গাটি তনু-মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয় বললেই চলে। কি আফসোস! এখানে থাকা সেই খোলা মাঠ আর জনবসতিহীন জায়গাটিও দাফন হয়ে গেছে আজকের জমানায়। বর্ষাকালে যখন পানিতে কানায় কানায় ভরে উঠে বিল। পানির বুকে ভেসে বেড়ায় ছোট-বড় নৌকা তখন দর্শকমুখরিত হয়ে উঠে এই জায়গাটি। পাশাপাশি অবস্থিত ছোট-বড় উভয় ব্রিজ ভরে যায় জনসমাগমে। বিশেষ করে, ছুটির দিনগুলোতে ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। মনে আছে, একদিন রুহানি চিশতিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলো এই বিলের পানিতে। সে কি বিতিকিচ্চি কাহিনী। বর্ষার পানির হিংস্রতা ও কোমলতার নীরব সাক্ষী এই ব্রিজ। আগে যখন মাটির রাস্তা ছিল তখন প্রায় প্রতি বছরই রাস্তা ভেঙে যেত তরঙ্গাঘাতে। বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তো মেঠো পথে। রাস্তা ভেঙে গেলেও ব্রিজটি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতো নির্বিকার। এরপর কমে এলো পানির তীব্রতা রাস্তাও পাকা হয়ে গেলো। সেই বিলটাও মিলিয়ে গেলো সময়ের স্রোতে। কতগুলো বছর পর বাড়ির ছেলে বাড়ি ফিরলো। রোড ঘাট কিছুই আর আগের মতো নেই। আগের মতো নেই আর বাড়ির পরিবেশ। সেই চেনা জানা দোতলা কুরেশি বাড়িটা আজ চারতলা বাড়িতে পরিণত হয়েছে। আগে যেই বাড়ির গেইটের বাইরে এসে গাড়ি থামতো এখন সেই বাড়ির নিচে এসে গাড়ি থামে। নিচতলা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। একপাশে হয়েছে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এবং অপর পাশে হয়েছে ফার্মেসী। দোতলায় মোট ছয়টা রুম। সেখানেই থাকে পুরো কুরেশি ফ্যামিলি। তিনতলা আর চারতলা সম্পূর্ণ ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এগুলো দিয়েই তাদের ইনকাম মাসে প্রায় লাখ খানেকের কাছাকাছি। এতকিছুর মধ্যেও একটা কথা ভেবে খারাপ লাগছে চিশতির, দেশেই এত টাকার ইনকাম হওয়া হওয়া সত্ত্বেও তার মা তাকে টাকার জন্য প্রতিনিয়ত প্রেশার দিতো। তাছাড়া নতুন জায়গা কেনা হয়েছে। সেখানে পাঁচতলা বিল্ডিং এর কাজ চলছে। এই সাড়ে তিন বছরে কতকিছু পাল্টে গেছে। চারিদিকে চোক্ষু বুলিয়ে মনে মনে বললো চিশতি "পাল্টেছে শহর, পাল্টেছে মানুষ, পাল্টেছে চেনা জায়গায় প্রতিচ্ছবি শুধু পাল্টাইনি আমি।" কাউকে নাহ জানিয়ে এভাবে দেশে পা রাখাটাও চিশতির সহজ ছিলো নাহ। দেশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে শুনতে হয়েছে কটুক্তি। "কতবার করে বললাম এখন দেশে ফেরার দরকার নেই। অনেক টাকার লোন বাকি আছে এখনো। তাছাড়া নতুন বাড়ির কাজও সম্পূর্ণ হয়নি। কয়েকটা বছর পর ফিরলে কি এমন ক্ষতও হতো তোর বল তোহ? এখন আর বলে কি লাভ! এসে যেহেতু পরেছিসই তখন আর কিছু করা যাবে নাহ। ছুটি কতদিনের এনেছিস? বেশিদিন দেশে থাকার প্রয়োজন নেই, মাস খানেক থেকে আবার ফিরে যাস আর যদি পারিস ১৫দিনের মাথায় চলে যাস।" গম্ভীর মুখে বলেই যাচ্ছে আমিনা বিবি। চুপচাপ মাথা নত করে শুনছে চিশতি। বাড়ির একটা লোকও আমিনা বিবির মুখের উপর কোনো কথা বলার সাহস পায় নাহ। এত চেনা মুখটা হঠাৎ করে এরকম পরিবর্তন হয়ে যাবে ভাবতেই বুক ফেটে যাচ্ছে চিশতির। দোতলায় উঠে প্রথমেই একটা ড্রয়িংরুম। বাড়ির সবাই একত্র হয়ে চা খেতে খেতে আড্ডা দেয়। এরপর বাকি ছয়টা রুমের মধ্যে একটা হাসমি এবং ইছামতীর। একটা আমিনা বিবি এবং আব্রাহামের। একটা রান্নাঘর। একটা রুম আগে থেকেই রাত্রির জন্য গুছিয়ে রেখেছে ইছামতী। মেয়ে বড় হয়ে ওই রুমে থাকবে। একটা গেস্ট রুম আর একটা স্টোর রুম। বাড়ির যত অপ্রোয়জনীয় জিনিসপত্র আছে সবকিছু স্টোর রুমে রাখা। প্রতিটা রুমই খানদানি ফার্নিচার দিয়ে সাজানো। দেখে মনেই হবে নাহ তাদের অনেক টাকার লোন আছে। আসলেই লোন আছে নাকী নেই এটা শুধুমাত্র আমিনা বিবিই ভালো জানে। চিশতি যতদিন থাকবে গেস্ট রুমেই থাকবে। রাত প্রায় সাড়ে দশটা। চিশতি নিজের রুমে বসে বসে পছন্দের নাস্তা মুড়িমাখা খাচ্ছে। কতগুলো বছর পর আজ আয়েশ করে প্রিয় খাবার খাচ্ছে। কেউ বাঁধা দেওয়ার মতো নেই। তৃপ্ত পেটে আহার করছে চিশতি। হঠাৎ দরজায় টোকার শব্দ। "চিশতি ভাইয়া! ভিতরে আসবো" বাইরে থেকে ইছামতীর কণ্ঠ ভেসে আসছে। চিশতি উঠে দরজা খুলে ইছামতীকে ভিতরে আসতে বললো। "ভাইয়া ফিরেনি এখনো?" জিজ্ঞেস করলো চিশতি। "তোমার ভাইয়া আজকাল কি করে, কোথায় যায় কিচ্ছু বলে নাহ। জানতে চাইলেও অশান্তি করে। তাই এখন আর কিছুই জানতে চাই নাহ। ইচ্ছে হলে উনিই বলেন।" জবাবে বললো ইছামতী। "বাড়ির লোকগুলো যেনো কেমন পাল্টে গেলো। আব্বু এখন তেমন কথা বলে নাহ। একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। ভাইয়াও নিজের যা ইচ্ছে তাই করে। কারো কোনো কথা কানে নেয় নাহ। আর আম্মি! আম্মিকে নিয়ে কি বলবো! উনাকে নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই আমার।" বললো চিশতি। "চিশতি ভাইয়া তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি" জড়োসড়ো হয়ে ঢোক গিলে বললো ইছামতী। "কি কথা ভাবি?" উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলো চিশতি। "কথা দাও কাউকে বলবে। আমি যে তোমাকে এই কথাগুলো বলবো কাউকে বলবে নাহ, কথা দাও। আমি চাই তুমি তোমার অধিকার বুঝে নাও। তোমার কষ্টে কামানো টাকাগুলো যেনো বিপথে নাহ যায়।" অস্থির হয়ে চিশতির হাত নিজের দুই হাত করজোড়ের পুড়ে বললো ইছামতী। "কি কথা ভাবি? আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে নাহ। তুমি কি বলতে চাইছো?" চমৎকৃত হয়ে বললো চিশতি। "সব বলছি তুমি আগে কথা দাও কাউকে বলবে নাহ" কাঁপা কাঁপা গলায় বললো ইছামতী। "কথা দিলাম কাউকে বলবো নাহ" ইছামতীকে অভয় দিয়ে বললো চিশতি। "প্রায় চার মাস আগে মায়ের রুমে চা নিয়ে যাচ্ছিলাম। ভিতর থেকে হাসমি এবং মায়ের কথপোকথনের শব্দ পেয়ে আর ভিতরে ঢুকিনি। দরজার আড়াল থেকে তাদের কথা শুনলাম।" একটু থেমে নিঃশ্বাস নিলো ইছামতী। "যেভাবেই হোক ওকে আটকাও। ও যেনো দেশে নাহ ফিরে। ও দেশে ফিরলে আমাদের সকল প্ল্যান বানচাল হয়ে যাবে। মনে রেখো, চিশতি কিন্তু সোনার ডিম পারা হাঁস" অস্থির কণ্ঠে বলছে হাসমি। "তুই একদম চিন্তা করিস নাহ। চিশতি যেনো দেশে নাহ ফিরে সেই ব্যবস্থা আমি করছি। আর এত ঘাবড়ানোর কি আছে, ওর যত টাকা পয়সা সব তোহ তোরই। এই বাড়ির সম্পত্তি, নতুন বাড়ির সম্পত্তি এগুলোও তোহ তোর। এসব নিয়ে ভাবিস নাহ। আমি সামলে নিবো" আমিনা বিবি হাসমির পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললো। "এরা কি মানুষ? একটা মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা ইনকাম করছে আর এরা কি-না নিজের স্বার্থের জন্য সেই মানুষটার পিঠে কোপ বসাচ্ছে" হাসমি এবং আমিনা বিবির এরূপ কথা শুনে ইছামতী মনে মনে বললো। "ভাবি! এগুলা কি সত্যি?" ধপ করে বসে পরে বললো চিশতি। "হ্যাঁ! একদম সত্যি কথা। আমি নিজ কানে শুনেছি। আমি চাই নাহ তোমার কষ্টে কামানো টাকা পয়সা অন্য কেউ আত্মসাৎ করুক। আমি এই টাকা পয়সা সুখ স্বাচ্ছন্দ চাই নাহ যেখানে আমার স্বামীর কোনো অবদান নেই।" ইছামতীর কথা শুনে চিশতি দরজা খুলে বের হবে তখনই ইছামতী জিজ্ঞেস করে "কোথায় যাচ্ছো?" চিশতি প্রত্যুত্তরে বললো "আম্মির রুমে" ইছামতী চিশতির দিকে দুই পা এগিয়ে বললো "ভাই তুমি আমাকে কথা দিয়েছো এসব কাউকে বলবে নাহ" চিশতি মৃদু হেসে বললো "আমি শুধু জিজ্ঞেস করবো কেনো আমার সাথে এমনটা করলো। টাকা পয়সা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবো নাহ, হাত নাড়ালে টাকার অভাব হয় নাহ। আল্লাহ আমার পাঁচটা আঙ্গ ঠিক রেখেছেন কাজ করলে এমন অনেক টাকাই ইনকাম করতে পারবো। আম্মিকে শুধু জিজ্ঞেস করবো, আমার সাথে এমন ব্যবহার করার কারণ কি? আমিও তোহ তার সন্তান তাহলে আমি কেনল এত অবহেলিত?" ইছামতী আর কোনো বাঁধা দিলো নাহ। আমিনা বিবির রুমের সামনে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলো চিশতি। কয়েকটা ডাক দেওয়ার পর আমিনা বিবি নিজে এসেই দরজা খুলে দিলো "আম্মি! একবার আমার রুমে আসবে। কথা আছে!" আমিনা বিবি খিটখিটে মেজাাজ নিজে বললো "এত রাতে আবার কিসের কথা। যা গিয়ে ঘুমা কাল কথা হবে।" চিশতি ক্রুদ্ধ সুরে ডাকলো "দরকারি কথা! তুমি আসবে কি-না বলো?" আমিনা বিবির মনে কু ডাকছে। হয়তো বড়সড় কিছু হয়েছে। নয়তো ছেলে কখনো এমন ভাবে ডাকে নাহ। "আচ্ছা চল" আমিনা বিবিকে নিজের রুমে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো "সত্যি করে একটা বলবে?" আমিনা বিবি বিরক্তি নিয়ে জবাব দিলেন "হেয়ালি নাহ করে সরাসরি বল কি বলবি" চিশতি এক ঢোক পানি গিলে বললো "হঠাৎ তোমার ব্যবহারের এত পরিবর্তনের কারণ কি?" আমিনা বিবি আবাও বিরক্তি নিয়ে বললো "কোথায় পরিবর্তন? সব তোহ ঠিকই আছে!" এক গাল মৃদু হেসে বললো চিশতি "ওহ্! সবকিছু তাহলে ঠিকই আছে?" আমিনা বিবি ঘাড় নাড়িয়ে বললো "হুম" চিশতি আবারও বললো "তোমাদের সুখের জন্য আমাকে কেনো বলি দিলে আম্মি" আমিনা বিবি ক্ষিপ্ত হয়ে বললো "দেখ এবার কিন্তু রাগ উঠছে। কি হয়েছে বলবি?" "কি হয়েছে? কি হয়েছে আমি বলবো নাকী তুমি বলবে? তোমাদের সুখের জন্য আমাকে বলি দিচ্ছো প্রতিনিয়ত। দিনের পর দিন অবহেলিত হচ্ছি আমি। ঠিক মতো কথা বলছো নাহ। আমি কথা বলতে চাইলেও এড়িয়ে যাচ্ছো? আগে তোহ এমন ছিলে নাহ? তাহলে সব নাটক ছিলো? আমাকে ভালোবাসা আমার বিপদে আগলে রাখা এগুলো সবই কি তাহলে নাটক?" আমিনা বিবি অন্য দিকে তাকিয়ে জবাব দিলো "তুই এখন বড় হয়েছিস! এখন এসব আদর সোহাগ তোকে মানায় নাহ। মন দিয়ে রুজিরোজগার কর। ভবিষ্যতে কাজে দিবে" চিশতি পাগলের মতো হাসতে হাসতে বললো "রুজিরোজগার? ভবিষ্যৎ? রুজিরোজগার না-হয় করলাম কিন্তু আমার ভবিষ্যতে কাজে আসবে তোহ?" আমিনা বিবি চিশতির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললো "মানে?" মায়ের দিকে অশ্রুমাখা চোখ নিয়ে তাকিয়ে বললো "মানে আবার কি? আমার কষ্টে কামানো টাকা পয়সা তোহ সব হাসমি ভাইয়াই পাবে। আমার আরর ভবিষ্যতে কাজে আসবে কিভাবে ওগুলো তোহ হাসমি ভাইয়ার কাজে আসবে। কেনো করলে এমনটা আম্মি?" আমিনা বিবি রাগে চিশতির গালে চড় মেরে বললেন "আমি যা করেছি একদম ঠিক করেছি। আমার একমাত্র ছেলের কথা ভেবেই আমি ওর নামে সব টাকা পয়সা, জমাজমি করেছি।" চিশতি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো "একমাত্র ছেলে মানে? তাহলে আমি কে?" আমিনা বিবি হাসতে হাসতে বললো "তুই কে সেটা আমি কি করে বলবো? তোর তোহ কোনো পরিচয়ই নেই।" চিশতি বাম হাতের উল্টো পাশ দিয়ে চোখের পানি মুছে বললো "মানে? আ-মি তোমার সন্তান নাহ?" আমিনা বিবি মুখ ঘুড়িয়ে বললো "নাহ! তুই আমার সন্তান নাহ। তোর আসল পরিচয় আমি জানি নাহ। একমাত্র এফসিপিএস অ্যান্ড কনসালটেন্ট গাইনি স্পেশালিষ্ট ডাক্তার আইজা খানই জানে তোর আসল পরিচয়" চিশতি প্রায় ভেবাচেকা খাওয়ার মতো হয়ে গেলো কি হচ্ছে তার সাথে। "আমি কিছুই বুঝতে পারছি নাহ আম্মি!" আমিনা বিবি খাটের উপর পায়ের পা তুলে বসে বললো "এতগুলো বছর যে সত্যিটা আমার বুকের মধ্যে দাফন করা ছিলো আজ সেই দাফন করা কবর খুড়তে বাধ্য করলি তুই। পাকিস্তান লাহোর সিটি হসপিটালে আমার সাথে একই ওটিকে আরো একজনের ডেলিভারি হয়। দূর্ভাগ্যবশত আমার সন্তানটি মৃত হয়। আর ওই মহিলার সন্তানটিকে জন্মের সাথে সাথেই যেনো মেরে ফেলা হয় সেজন্য ডাক্তার আইজা খানকে টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু ওই বাচ্চাটা এতটাই সুন্দর ছিলো যে আইজা খান বাচ্চাটাকে মারতে পারেনি। আমার মৃত বাচ্চার সাথে পাল্টাপাল্টি করে দেন।" চিশতি অবাক হয়ে মায়ের সব কথা শুনছে। "এরপর আমি যখন তোকে পাকিস্তানে রেখে চলে আসছিলাম তখন কাকতালীয় ভাবে ডাক্তার আইজা খানের সাথে দেখা হয়ে যায়। আমি উনাকে চিনতে নাহ পারলেও উনি আমাকে ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন। উনিই আমাকে সব সত্যিটা বলেন। আর হ্যাঁ! তোর কাছে আমি আরো একটা সত্যি গোপন করেছি সেটা হলো, তোকে বলেছিলাম এক পাগল বলেছিলো আমার গর্ভের সন্তান হবে অসীম ক্ষমতার অধিকারী। সে বিনাশ করবে অশুভ শক্তি। হা!হা!হা! মিথ্যা বলেছি। পাগলটি বলেছিলো, তোর গর্ভে যে রয়েছে তার পরিবর্তে আসবে এক শুভ শক্তির প্রতিক। যে হবে অসীম ক্ষমতার অধিকারী। সে বিনাশ করবে অশুভ শক্তি। কিন্তু সাবধান ততদিন তুই ওই সন্তানকে নিজের কাছে রাখবি নাহ যতদিন নাহ ওকে ওর ভবিতব্য তোর কাছে টেনে আনে" কথা শেষ করে চিশতিকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো আমিনা বিবি। নিজের উপরই ঘৃণা হচ্ছে চিশতির। জানে নাহ সে তার আসল পরিচয়। কে সে? কি তার আসল পরিচয়? কে আর পিতা মাতা? অভিমান হচ্ছে আমিনা বিবির উপর আর রাগ হচ্ছে সাক্ষী আর জটায়ুর উপর কারণ তারা আগে থেকেই জানতো চিশতির আসল পরিচয় পরিচয় অথচ গোপন করেছে তার কাছ থেকে।