পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ২৭
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২৭ · ২৮ পর্বের মধ্যে ২৭
চিশতি আর অলিভিয়া মিলে ঘরটা পুরোপুরি গুছিয়ে শেষ করেছে। এখন ঘরটা একদম ঝলমল করছে, দেখে একেবারে বোঝাই যাচ্ছে না যে এই ঘরটা ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিলো। ধুলোময় আসবাব, মলিন দেয়াল, আর অন্ধকার কুঠুরি সবই এখন অতীত। এখন ঘরটায় এক নতুন প্রাণ এসেছে। বাইরে সন্ধ্যার আভা মিলিয়ে রাতের আকাশে চাঁদের আলো ঝলমল করছে। অলিভিয়া জানালার দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু হাসে। তারপর চিশতির দিকে ঘুরে বলে মুচকি হেসে বলে "এত সুন্দর করে ঘরটা সাজিয়েছো, চিশতি! কিন্তু বলো তো, এটা না করে যদি একদিন এই ঘরেই বন্ধ হয়ে থাকতে হতো, তুমি পারতে?"৷ চিশতি হেসে জবাবে বললো "হুম, যদি তোমার মতো ভালো একজন পার্টনার পাই, তাহলে নিশ্চয়ই পারতাম!" অলিভিয়া মাথা নেড়ে বলে "তুমি কিন্তু খুব চালাক! জানোই তো, তুমি একা এটা করতে পারতে না!" চিশতি দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে "ঠিকই বলেছো। তুমিই আসল কাজটা করেছো, আমি শুধু সাহায্য করেছি।" অলিভিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো "এই যে! আবার চালাকি! শুনো, আমি ঠিক করেছি, আজ থেকে আমার ঘরে ঢোকার আগে নক করতে হবে!" চিশতি মুচকি হেসে বললো "ঠিক আছে, আমি তো সবসময়ই নক করি। তবে জানো, নক করার আগে একটা শর্ত আছে!" অলিভিয়া কৌতূহলীভাবে জিজ্ঞেস করলো, "শর্ত? কী শর্ত?" চিশতি এক গাল হেসে বললো "আমাকে তোমার চকলেট এনে দিতে হবে, তাহলেই আমি নক করবো!" অলিভিয়া হেসে বলে "তুমি তো দেখি ছোট বাচ্চার মতো কথা বলছো! চকলেটের লোভী!" চিশতি হাসি ধরে রেখে বললো "ঠিক আছে, যাই বলো। আমি কিন্তু তোমার কাছ থেকে চকলেট নিবোই!" অলিভিয়া হাসি থামিয়ে বললো "ঠিক আছে, আমি আমার ঘরে যাচ্ছি। তোমাকে আর বেশি ঝগড়া করে মারবো না।"৷ চিশতি মুচকি হেসে জবাব দিলো "ঝগড়াটা কিন্তু বেশ মজার ছিলো! যাই হোক, যাও বিশ্রাম নাও গিয়ে।"৷ অলিভিয়া চিশতির দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। যাওয়ার সময় একবার ফিরে তাকায়, যেনো আরও কিছু বলতে চায়। কিন্তু চিশতির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে আর চলে যায় নিজের ঘরে। চিশতি জানালার দিকে তাকিয়ে দেখে, চাঁদের আলো ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। তার মনে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি আসে। সে বুঝতে পারে, একটা ভালো দিন কেটে গেছে, আর তাদের সম্পর্কের বন্ধনও আরও একটু মজবুত হয়েছে।
চিশতি রাতের অন্ধকারে ফ্রেশ হয়ে নিজের রুমে এসে বসে। তার মনে একটি উদ্বেগের অস্বস্তি, কারণ সে এখনও সেই রহস্যময় ডায়েরির কথা ভাবছে যা সে কেবল কিছুক্ষণ আগে এই রুমে খুঁজে পেয়েছে। সে টেবিলের উপর বসে ডায়েরিটি খুলে, চিশতি যখন ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠাটি খুললো, তার শরীরে এক শীতল অনুভূতি প্রবাহিত হলো। যেনো অদৃশ্য কোনো হাওয়া তাকে স্পর্শ করলো, তার সারা শরীর শিউরে উঠলো। ঘরের মধ্যে বাতাসের স্রোত বেড়ে গেল, আর এক মুহূর্তের মধ্যে জানালাটি নিজে থেকেই খুলে গেল। জানালার পর্দা হাওয়ার সাথে নাচতে শুরু করলো, আর ঘরের পরিবেশ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকলো। চিশতির মনে ভয় এবং কৌতূহলের মিশ্র অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। সে বুঝতে পারলো যে এই ডায়েরির মধ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্য আরও গভীর, এবং এটা কেবল শুরু। সেখানে কিছু অদ্ভুত এবং রহস্যময় তথ্য লেখা রয়েছে। পাতার মধ্যে রয়েছে একটি পুরনো সীল এবং একটি গোপন সংকেত, যা তাকে এমন কিছু নির্দেশ করছে যা অলিভিয়াকে জানানো প্রয়োজন। চিশতি তার সিদ্ধান্তে স্থির থাকে যে, তাকে এই তথ্যটি দ্রুত অলিভিয়াকে জানাতে হবে। সে ডায়েরি হাতে নিয়ে রুমের দরজার দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু হঠাৎ করে, দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায় এবং চিশতি তার সামনের দৃশ্য দেখে চমকে উঠে। রুমের বাতি অন্ধকার হয়ে যায় এবং চারপাশে অদ্ভুত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একটি গাঢ় কালো শেড ধীরে ধীরে রুমে প্রবেশ করে এবং ভৌতিক প্রতিধ্বনির মতো কিছু অদৃশ্য শক্তি চিশতির চারপাশে ঘুরতে থাকে। চিশতি অনুভব করে যে কিছু অশুভ ঘটছে এবং সে চেষ্টা করে দরজা খুলতে, কিন্তু দরজাটি একদমই খুলছে না। চারপাশের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হতে থাকে এবং একটি করুণ সুরে মনঃকষ্টের ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুরু হয়। চিশতি হতাশ এবং ভীত হয়ে যায়। সে জানে না কিভাবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাবে। চিশতি অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরও দরজাটি খুলতে পারছে না। হতাশা আর উত্তেজনা ক্রমশ বাড়তে থাকে। হঠাৎ তার দৃষ্টি সিলিং-এর দিকে চলে যায়। সিলিং-এর কোনায় একটি অস্পষ্ট অবয়ম ঝুলে আছে, যেনো কেউ উল্টো হয়ে ঝুলে আছে। অবয়মটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে, আর চিশতির রক্ত হিম হয়ে যায়। সে দেখতে পায় যে অবয়মটি তার দিকে তাকিয়ে আছে, তার উপস্থিতি বুঝতে পেরে। চিশতি ভয়ে জমে যাচ্ছে। সে দেখতে পায় যে এটি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নয়, বরং একটি ছোট্ট বাচ্চা। বাচ্চাটি সিলিং-এ উল্টো ঝুলছে, তার শরীরের রঙ অস্বাভাবিকভাবে ফেকাসে, যেনো রক্তহীন। বাচ্চাটির চোখ দুটো ধবধবে সাদা, যা চিশতির আত্মাকে নাড়িয়ে দেয়। বাচ্চাটির মুখমণ্ডল দেখে চিশতির শ্বাস আটকে আসে তাতে কোনো চামড়া নেই, শুধু পেশি ও হাড়ের কঙ্কালসার চেহারা। চিশতির ভেতরকার ভয় মুহূর্তেই দ্বিগুণ হয়ে যায়, তার সারা শরীর শীতল হয়ে উঠে। বাচ্চাটির শূন্য চোখগুলো চিশতির দিকে তাকিয়ে আছে, যেনো সে চিশতির অন্তরাত্মা ভেদ করে দেখতে পাচ্ছে। হঠাৎ, অবয়মটি হাওয়ার বেগে সিলিং থেকে নেমে জানালায় গিয়ে বসে। চিশতির শরীর শীতল স্রোতে কেঁপে উঠে, কিন্তু ভয়কে পাশ কাটিয়ে সে অবয়মটির পিছু পিছু জানালার দিকে এগিয়ে যায়। চিশতি জানালার সামনে এসে পৌঁছালে, অবয়মটি আচমকা জানালা থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে যায়, যেনো কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাবে। এক মুহূর্তের জন্য সব কিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর, রুমের দরজাটি ধীরে ধীরে কেঁপে উঠে খুলে যায়। চিশতির মনে হয় যেনো কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে বাইরে যেতে বলছে, কিন্তু তার মন জানে, এই ঘটনার পেছনে আরও বড় কিছু লুকিয়ে আছে। চিশতি সবকিছু ভেবে দেখে, যে কীভাবে এই ভৌতিক ঘটনাকে মোকাবেলা করবে এবং প্রমাণ করবে যে সেই ডায়েরিতে লুকানো রহস্য একটি বড় বিপদের পূর্বাভাস। এই বাড়ি সম্পর্কে এতগুলো রহস্য হাতে পাওয়ার পর চিশতি ঠিক করলো সবাইকে এই ব্যাপারে সাবধান করবে। যাতে কারো কোনো ক্ষতি না হয়।
অলিভিয়া গোসল সেরে নিজের রুমে এসে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে ধীরে ধীরে চুল আঁচড়াতে শুরু করে। আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখতে দেখতে তার মন শান্ত হয়। হঠাৎ, আয়নার ভেতর সে এক ঝলক দেখতে পায়, কেউ একজন তার পিছন দিয়ে ছুটে একপাশ থেকে অন্যপাশে চলে গেলো। অলিভিয়ার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে ওঠে, সে ভয়ে পিছনে তাকায়। কিন্তু সেখানে কেউ নেই, শুধু শূন্যতা। অলিভিয়া আবার ড্রেসিংটেবিলের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকায়। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি আয়নার ভিতরে আটকে যায় সেখানে একটি ছোট্ট বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চাটির শরীর ফেকাসে, চোখগুলো ধবধবে সাদা, এবং মুখে কোনো চামড়া নেই, শুধু হাড় ও পেশির ভয়ঙ্কর চেহারা। বাচ্চাটি অলিভিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে, যেনো তার আত্মাকে ভেদ করছে। এরপর বাচ্চাটি হঠাৎ এক বিকট চিৎকার করে উঠে। অলিভিয়ার মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি তীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসে। তার চারপাশের পরিবেশ দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে রুমের লাইটগুলো নিজে নিজে জ্বলছে আর নিভছে, যেনো অন্ধকার ও আলোর মাঝে কোনো যুদ্ধ চলছে। অলিভিয়া ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় গিয়ে বসে। ঠিক তখনই, অলিভিয়া অনুভব করে কিছু একটা খাটের নিচ থেকে তার পা ধরে টানছে। সে চমকে উঠে আরেকটি তীব্র চিৎকার দেয়। তার শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ভয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে, অলিভিয়া আতঙ্কিত হয়ে রুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে, তার পিছু পিছু ভৌতিক সেই চিত্রটা যেনো পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।
মিসেস লিনডা, অলিভিয়ার মা, সন্ধ্যার নৈশভোজের পর নিজের রুমে বসে টিভি দেখছিলেন। শান্ত পরিবেশে তিনি চমৎকার একটি সিনেমা দেখছিলেন, কিন্তু হঠাৎই অস্বাভাবিক কিছু ঘটতে শুরু করে। টিভির স্ক্রীনে দেখা এক চরিত্র অন্ধকারের মধ্যে ক্রমাগত এগিয়ে আসছিল এবং আচমকা সে চরিত্রটি টিভির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। লিনডা অবাক হয়ে দেখে, সেই চরিত্রটি টিভি ভেদ করে বাস্তব জগতে চলে এসেছে এবং তার চেহারার আকৃতি ভয়ংকরভাবে বিকৃত হয়ে গেছে, চোখ, মুখ, এবং গায়ের রঙ সব কিছু যেন এক বিভৎস রূপ ধারণ করেছে। মিসেস লিনডার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে থাকে এবং সে ভয় পেয়ে যায়। তার রুমের লাইট অস্বাভাবিকভাবে জ্বলছে এবং নিভছে, যেনো কোনো অদৃশ্য শক্তি লাইটের উপর প্রভাব ফেলছে। চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং কালো ছায়াগুলি রুমের মধ্যে ছোটাছুটি করতে থাকে। ছায়াগুলি মাঝে মাঝে তার চারপাশে ভাসতে থাকে এবং তাকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তোলে। লিনডা কিছুটা নড়বড়ে হয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে, এবং দেখে যে টিভির স্ক্রীনটি ক্রমশভাবে ফুটছে এবং বিকৃত হচ্ছে। স্ক্রীনে ক্রমাগত এক অদ্ভুত সিম্বল বা চিহ্ন ফুটছে যা লিনডার মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। কক্ষের এক কোণে একটি গভীর গর্জন বা আওয়াজ শুরু হয়, যা মনে হচ্ছে যেনো কোনো অশুভ শক্তি তার উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এরই মধ্যে, লিনডার নিঃশব্দ শ্বাস-প্রশ্বাস এবং আতঙ্কিত চোখের সামনে, সেই বিভৎস চরিত্রটি রুমের মধ্যে আরও কাছে চলে আসে। চরিত্রটির মুখে এক অদ্ভুত হাসি, যা ভয়ঙ্করভাবে লিনডাকে ঘিরে ধরেছে। সে চেষ্টা করে চিৎকার করতে, কিন্তু ভয়াবহ আতঙ্কের কারণে তার গলা যেনো বন্ধ হয়ে আসে। মিসেস লিনডা, এই বিভীষিকাময় দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে, তার শক্তি সঞ্চয় করে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। সে পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ঘরটির দরজা ও জানালা অদৃশ্য শক্তির দ্বারা বন্ধ হয়ে যায়, তাকে আরো বেশি চাপে ফেলছে। মিসেস লিনডা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে চোখে মেলে তাকাতেই খেয়াল করলেন, টিভির স্ক্রীনটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং কালো ছায়াগুলি যেনো এক এক করে অদৃশ্য হয়ে যেতে শুরু করে। টিভির বিভৎস চরিত্রটি ধীরে ধীরে ফেড আউট হয়ে যায় এবং লাইটগুলো স্বাভাবিকভাবে জ্বলতে থাকে। এই অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার পর, মিসেস লিনডা তার মেয়ের কাছে চলে যায় এবং তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ঘটনা জানাতে চায়।
ওহাইও অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে ফেরার পথে। তার মন অস্বস্তিতে পূর্ণ ছিলো এবং বাসায় পৌঁছানোর জন্য তার তাড়া ছিলো। হঠাৎ করে তার চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়, যেনো গাড়ির নিচে কেউ চাপা পড়েছে। চিন্তিত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে তিনি রোডে দেখে, রাস্তাটি পুরোপুরি ফাঁকা, এবং গাড়ির নিচে কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। ল্যাম্পপোস্টের নরম আলোয় তিনি পিছনের দিকে এক শিশুকে দেখতে পান, যেটি প্রায় ৮-৯ বছরের বয়সী। শিশুটি কাঁদছে এবং তার চোখের কোণে পানি জমেছে। প্রথমে তিনি শিশুটির দিকে সাহায্যের ইঙ্গিত নিয়ে এগিয়ে যান, কিন্তু যখনই তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে শিশুটির দিকে তাকান, তখন তার দৃষ্টি বিভৎস দৃশ্যের সম্মুখীন হয়। শিশুটির মুখের চামড়া ধীরে ধীরে গলে যেতে শুরু করে এবং চোখের নিচ থেকে রক্ত পড়তে থাকে। শিশুর শরীরের মাংস মেটানোর পরিবর্তে নষ্ট হতে শুরু করে, যা দেখে ওহাইওর মনে ভয়ঙ্কর ভয় ঢুকে পড়ে। শিশুটির শরীরের বিকৃত চেহারা এবং চোখ দিয়ে পড়তে থাকা রক্ত দেখে ওহাইওর হৃদপিণ্ড দ্রুত লাফাতে থাকে। অবশেষে, শিশুটি ভয়ঙ্করভাবে চিৎকার করে উঠে এক ধরনের অসহায় ও মর্মান্তিক চিৎকার যা ওহাইওর হাড়ে হাড়ে ভীতি সৃষ্টি করে। এই ভয়ংকর চিৎকার তার স্নায়ুকে কাঁপিয়ে দেয় এবং তাকে দ্রুত পালানোর জন্য তাড়িত করে। ওহাইও তার কান দুই হাতে চেপে ধরে এবং কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত বাড়ির দিকে ছুটে আসে। তার দৃষ্টি সামনের দিকে স্থির থাকে এবং পিছনে ফিরে না তাকানোর চেষ্টা করে, যেনো সেই বিভৎস দৃশ্য তার মনে স্থায়ীভাবে না বসে যায়। বাড়ির সামনে পৌঁছানোর সাথে সাথে, সে দরজা খুলে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে। ওহাইও বাড়িতে ফিরে আসে, এবং ঘরের পরিবেশে আতঙ্ক এবং উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট। ড্রয়িংরুমে চিশতি, অলিভিয়া, এবং লিনডা ভয়ের চিহ্ন নিয়ে বসে আছে। তাদের চোখে-মুখে অস্বস্তির নিদর্শন স্পষ্ট, এবং যখন ওহাইওর দিকে তাকায়, তারা বুঝতে পারে যে তার চেহারাতেও একই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চিশতি ওহাইওকে দেখে, তাড়াহুড়া করে তাকে পরিস্থিতির বর্ণনা দেয়। সে জানায়, “এই বাড়ি, ডায়েরি, এবং ওই বন্ধ রুমের মধ্যে কোনো এক গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে। ডায়েরির পাতায় স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে যে, এই বাড়ির মালিক যদি কালো শক্তির কাছে একজন মানুষকে উৎসর্গ করে, তাহলে সে এবং তার পুরো পরিবার অসীম ধনসম্পদের মালিক হবে। কিন্তু এতে এক মারাত্মক বিপত্তি রয়েছে।” চিশতি তার কথায় আরো যোগ করে, “কিন্তু এই প্রক্রিয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর, কালো শক্তির কাছে উৎসর্গ করা আত্মাটি মুক্তি পাবে। তখন সে তার প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করবে এবং সেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও বিপদে ফেলবে। তার সাথে নিজের আত্মাকেও মুক্তি করার চেষ্টা করবে, যা আমাদের জন্য বড় ধরনের বিপদের সঙ্কেত হতে পারে।” অলিভিয়া, লিনডা, এবং ওহাইওর চোখে-মুখে অবিশ্বাস এবং ভয় মিলিয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে যে তাদের সামনে একটি অতি বিপজ্জনক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। চিশতির কথায় আরো গভীরতার মধ্যে পৌঁছানোর পর, তারা এই রহস্যের সমাধান করতে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করে। ড্রয়িংরুমে, ওহাইও, চিশতি, অলিভিয়া, এবং লিনডা একত্রিত হয়ে কালো শক্তির রহস্য সমাধানের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। কক্ষের মধ্যে টেনশন এবং উদ্বেগের পরিবেশ স্পষ্ট।
“এই ডায়েরির ভিত্তিতে আমাদের বুঝতে হবে যে কালো শক্তি কীভাবে কাজ করে। সে যদি সত্যিই একজন মানুষকে উৎসর্গ করা হয়, তাহলে আমাদের কীভাবে এই বিপদ থেকে বের হতে হবে তা পরিকল্পনা করতে হবে।” - চিশতি।
“তবে, আমরা তো জানি না, কালো শক্তি বা ওই শক্তির প্রতিশোধ কীভাবে কাজ করে? আমাদের আগে জানতে হবে তার ক্ষমতা এবং লক্ষণ কী।” - অলিভিয়া।
“আমি ভেবেছিলাম যে সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যের পর, আমাদের কোনো প্রাচীন বা আধ্যাত্মিক বই বা লেখনী নিয়ে কাজ করতে হতে পারে। হয়তো সেখানে এমন কিছু নির্দেশনা আছে যা আমাদের সাহায্য করতে পারে।” - লিনডা।
“আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি দেখে৷ আমি ভয় পেয়ে গেছি, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে আমাদের এই শক্তি সম্পর্কে আরো জানতে হবে।” - ওহাইও।
“আমরা ওই রুমে ফিরে গিয়ে যা যা প্রয়োজন সেটা পুনরায় যাচাই করতে পারি। সেখানে কিছু গুপ্ত চিহ্ন বা প্রমাণ থাকতে পারে যা আমাদের সাহায্য করতে পারে।” - চিশতি।
“তাহলে আমরা আজ রাতেই ওই রুমে যাবো। আমরা সবকিছু পুনরায় গোছাবো এবং নিশ্চিত করব যে সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ থেকে গেছে কি-না।” - অলিভিয়া।
“তবে, তোমাদের দুইজনকে একা যেতে হবে না। আমি এবং ওহাইও প্রস্তুত থাকবো, যাতে কোনো বিপদ ঘটলে সাহায্য করতে পারি।” - লিনডা।
“ঠিক আছে। আমি আর লিনডা বাইরে অপেক্ষা করবো। তোমরা ভেতরে গিয়ে খোঁজ করো, আমরা বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো।” - ওহাইও।
এরপর চিশতি ও অলিভিয়া আবারও সেই রুমে প্রবেশ করে। এত সুন্দর করে পরিষ্কার করা হয়েছে ঘরটা যে, নতুন করে কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। হঠাৎ চিশতির মনে পড়ে, তারা সবকিছু গোছগাছ করলেও ঘরে এক কোণে পড়ে থাকা পুরনো আলমারিটাতে হাতও লাগায়নি।
“এই অ্যালমারির মধ্যে হয়তো কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি থাকতে পারে। আমরা এটিকে খুলে দেখতে পারি।” - চিশতি। চিশতি ধীরে ধীরে পুরনো আলমারির দরজাটি খুলে। আলমারির ভেতরে প্রচণ্ড ধুলো জমে আছে, যেনো বছরের পর বছর ধরে এটি স্পর্শহীন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটি ধুলোর মেঘ আকাশে ছড়িয়ে পড়ে, চিশতির চোখ ও নাকে ধুলো ঢুকে যায়। আলমারির ভেতরে চোখ বুলিয়ে সে দেখে অসংখ্য কাগজপত্র এলোমেলোভাবে স্তূপাকারে পড়ে আছে। প্রতিটি কাগজ পুরনো, ভাঁজে ভাঁজে হলুদ হয়ে গেছে, কিছু কিছু জায়গায় পোকায় কাটা। ধুলোর একটি মোটা স্তর কাগজগুলোর উপর জমে রয়েছে, যা তাদের আরও পুরনো ও রহস্যময় করে তুলেছে। কাগজপত্রের মাঝে কিছু অজানা লেখার অংশ, ফাঁকা নোটবুক, এবং অর্ধেক জ্বলে যাওয়া কাগজও রয়েছে। চিশতির মনে হয়, এই আলমারিতে লুকিয়ে রয়েছে বহু পুরনো ও গোপনীয় কিছু, যা হয়তো এতদিন ধরে কেউ খুঁজে বের করার সাহস করেনি। এরপর তারা পুরনো বই এবং কাগজপত্র বের করে। তাদের চোখের সামনে কিছু পুরনো পাণ্ডুলিপি, প্রাচীন লেখা এবং একটি ছোট সোনালী বাক্স পড়ে থাকে। বাক্সটি খুলে, তারা একটি অদ্ভুত ধরণের অমসৃণ পাথর এবং একটি প্রাচীন মন্ত্রের পাণ্ডুলিপি পায়।
“এটা কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্বের হতে পারে। এই মন্ত্র আমাদের সাহায্য করতে পারে।” - অলিভিয়া।
“ঠিক আছে, আমরা এই মন্ত্রের সাথে পরীক্ষা করতে শুরু করি। হয়তো এটি কালো শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে।” - চিশতি।
চিশতি যখন সোনালী বক্স থেকে অমসৃণ পাথর এবং প্রাচীন মন্ত্রের পান্ডুলিপি হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হতে চায়, তখনই আচমকা শুরু হয় ভৌতিক কর্মকাণ্ড। পুরো বাড়ি যেনো কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে পৈশাচিক অট্টহাসিতে মেতে উঠে। সেই হাসি এতটাই ভয়ঙ্কর এবং গা শিউরে উঠার মতো, চিশতির মন থেকে সাহসের শেষটুকু উবে যেতে থাকে। বাড়ির প্রতিটি জিনিসপত্র এদিক সেদিক ছিটকে পড়তে শুরু করে, যেনো কেউ বা কিছু ইচ্ছাকৃতভাবে সবকিছু তছনছ করছে। তীব্র বাতাসের ঝাপটায় কেউই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলো না, যেন তাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। মাটিও কাঁপতে শুরু করে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়ঙ্কর করে তোলে। হঠাৎ লোডশেডিং হয়, আর পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে যায়। চারিদিকে ঘনিয়ে আসে ভয়াল অন্ধকার, যা চিশতি, ওহাইও, লিনডা এবং অলিভিয়াকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তোলে। তারা চারিদিকের পরিবেশের প্রতি কান পেতে শোনার চেষ্টা করে, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য সব কিছু যেনো স্তব্ধ হয়ে যায়।ঠিক তখনই, পুরো ঘর জুড়ে এক অদ্ভুত পায়ের প্যাঁচ প্যাঁচ শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দের উৎস বুঝতে না পেরে, চিশতি, ওহাইও, লিনডা এবং অলিভিয়া সেই শব্দের পিছু করতে থাকে। তারা বাড়ির প্রতিটি কোণ ঘুরে দেখলেও, শব্দটি যেনো তাদের বিভ্রান্ত করছে। অবশেষে তারা বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ায়। বাইরে এসে তারা অনুভব করে যে, সেই প্যাঁচ প্যাঁচ শব্দটি বাড়ির পেছন থেকে আসছে। অন্ধকারের মধ্যে একটু দ্বিধায় পড়ে তারা একে অপরের দিকে তাকায়, কিন্তু সেই ভৌতিক পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে তারা চারজন একত্রে বাড়ির পেছনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বদ্ধসাহস আর কৌতূহল তাদের ধীরে ধীরে অজানা সেই বিপদের দিকে টেনে নিয়ে যায়। চিশতি, ওহাইও, লিনডা, এবং অলিভিয়া বাড়ির পিছনের দিকে এগিয়ে যায়, আর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে তাদের বুকের ধুকপুকানি বাড়তে থাকে। পেছনের পরিবেশ ছিল ভয়ংকরভাবে ভুতুড়ে গাছপালা ঘন হয়ে একে অপরের সাথে মিশে আছে, যেনো আকাশের আলো আটকে রেখেছে। সেই গাছপালার মাঝে অদ্ভুতভাবে বাতাসে একটি শীতলতা ভেসে বেড়াচ্ছে, যা তাদের রক্ত হিম করে দেয়। বাতাসে যেনো কারো কান্নার অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসছে, যা চারপাশের পরিবেশকে আরও বেশি গা ছমছমে করে তোলে। এই রাতটা ছিলো অন্য রাতগুলোর চেয়ে আলাদা একটি ভয়ঙ্কর রাত, যেখানে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে চলেছে বলে মনে হয়। তারা কান্নার শব্দ অনুসরণ করতে করতে আরও গভীরে চলে যায়, গাছের শাখাগুলো তাদের কাপড় ও চুলে আটকে পড়ে, আর পেছনে ফিরে যাওয়ার রাস্তা যেন হারিয়ে গেছে। হঠাৎ, সেই অস্বাভাবিক কান্নার শব্দ আরও তীব্র হয়ে উঠে, তাদের মনের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। কান্নার উৎস খুঁজতে তারা চারজন এগিয়ে যেতে থাকে, আর একসময় এসে পৌঁছায় একটি পুরনো কবরের সামনে। কবরটি সময়ের সাথে সাথে ভেঙে গেছে, চারদিকে গাছপালার শেকড় কবরটিকে গ্রাস করেছে। কবরের উপরে লেখা নামগুলো মুছে গেছে, আর সেখানে যেন শত বছরের অন্ধকার জমে রয়েছে। চারজনের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সেই পুরনো কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তারা বুঝতে পারে, এই কান্নার শব্দের রহস্য তাদের সামনে আসতে চলেছে। অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা অনুভব করে, তাদের পেছনে কিছু আছে কিছু এমন যা তারা চায় না, কিন্তু যা তাদের কাছে আসতে বাধ্য করছে।