পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ২৪

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২৪ · ২৮ পর্বের মধ্যে ২৪

শ্রাবণের টপটপ বৃষ্টিভেজা চারিদিক এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয় মনে। গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পরতে দেখার শখটাও সেই আগের মতোই প্রখর। তার সাথে জমে থাকা পানিতে টুপুর টাপুর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অতীত জাগরণের এক অন্যতম স্মৃতি। বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি অনুভব করছে চিশতি। কিছু একটা গভীর চিন্তায় মগ্ন। ক্লান্তিমাখা মুখটা একটু সুখ কুড়িয়ে আনার আশায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। হঠাৎ গভীর মগ্নতা কাটে কারো ডাকে "চিশতি! কি ভাবছো তখন থেকে" চিশতির কাঁধে হাত রেখে তাকিয়ে দেখলো চিশতির চোখে জল। "একি চিশতি? তুমি কাঁদছো? কি হয়েছে বলো আমাকে?" অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো অলিভিয়া। "না! না! তেমন কিছু হয়নি। একটা জিনিস হারিয়ে গেছে?" দুই হাতে চোখের জল মুছে বললো চিশতি। "কি হারিয়েছে?" ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো অলিভিয়া। "আমার মধ্যে থাকা সেই চাঞ্চল্যকর আমিটা। হারিয়ে গেছে ভালোবাসার অতীতটা। আরো হারিয়েছে আপন জনারা!" আলতো করে চিশতির মাথায় হাত রেখে মায়াবী এক চাহনিতে তাকিয়ে বললো অলিভিয়া "চিশতি! অতীত থাকা ভালো কিন্তু অতীতে পরে থাকা নয়!! হয়তো আগে তুমি অনেক চঞ্চল ছিলে কিন্তু আমার কাছে তোমার গোমট রূপটাই শ্রেষ্ঠ। তোমার গোমট চেহারার প্রেমেই তো পাগল হয়েছি আমি।" চিশতি এক হাত বাড়িয়ে অলিভিয়াকে আলতো জড়িয়ে ধরে বললো "আর বেশিদিন দেরি করতে হবে না, খুব শীঘ্রই আমাদের একটা ছোট্ট সংসার হবে। আমাদের ঘর আলো করে আসবে আমার টুকটুকে একটা মেয়ে" চিশতির কথা শুনে কাঁধ থেকে নিজের মাথা উঁচু করে চিশতিকে চিমটি কেটে বললো অলিভিয়া "আমার ছেলে চাই!" চিশতি আবারও বললো "না! মেয়ে!" এভাবেই চলে থাকতে তাদের খুনসুটি। হঠাৎ চিশতি অলিভিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বললো "তোমার আর আমার পরিচয়ের শুরুটাও ছিলো এরকমই!! সুন্দর ছিলো সেই দিনগুলো! আর ভয়ংকর ছিলো তার আগের দিনগুলো।" অলিভিয়া আড়চোখে তাকিয়ে বলে "একটু হাসিখুশি হলেই তোমার এসব বলে মন খারাপ করতে হবে? কতবার বলবো এসব আর মনে করবে না! আমি তোমাকে ভালোবাসি তোমার পরিচয়কে না।" কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো চিশতি "তুমি যতই সুখে থাকো না কেনো কষ্টের দিনগুলো ভুলতে পারবে না, চাইলেও না। এতগুলো বছর হয়ে গেলো ভুলতে পারলাম না। হয়তো মরার আগ পর্যন্ত পারবো না।" এতকিছু না ভেবে অলিভিয়া আবারও বললো "আচ্ছা চিশতি ওই বাড়ির কারো সাথে কি আর কোনোদিনও যোগাযোগ করবে না?" চিশতি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো "জানি না!"

-------------

আবছা মেঘলা রাতের আকাশ। বইছে শরীর জুড়িয়ে যাওয়ার মতো শীতল হাওয়া। নারিকেল গাছের চিরল পাতার ভাঁজে দূর আকাশে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পূর্নিমার চাঁদ সাথে মিটিমিটি ছোট তারা। ঘন কুয়াশার মতো একটু পর পর এসে চাঁদকে আড়াল করে দিচ্ছে আবছা মেঘগুলো। উড়ে যাচ্ছে আকাশ পানে নৈশ্যপক্ষি। এই চাঁদ যেনো আজ অনেক কিছু বলতে চায়। এই চাঁদ যেনো বহুকালের স্মৃতির সাক্ষী। "হে চাঁদ! তুমিও একা আমিও একা। তুমিও কোনো মেঘকে নিজের কাছে ধরে রাখতে পারো না আমিও কাউকে নিজের কাছে ধরে রাখতে পারি না। কিন্তু তোমার আর আমার মধ্যে একটা পার্থক্য আছে, সব লোকের মুখে তোমার প্রশংসা অথচ আমার সম্পর্কে কারো মুখে নেই কোনো প্রশংসা। সবাই তোমাকে নিজের ভালোবাসার সাথে তুলনা করে আর আমাকে শুধুই ঘৃণা।" হাজারো মন খারাপকে উপেক্ষা করে ওই চাঁদের কাছে মনের ভাব প্রকাশ করলো চিশতি। "আজ হয়তো আমার প্রিয় মানুষগুলোও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তোমাকে দেখবে। তাদের জানিয়ে দিও, আমি আজও তাদের আগের মতোই ভালোবাসি। তারা আমাকে ভালোবাসুক আর না-ই বা বাসুক। ওহ্ মেরে খোদায়া! আমার ভালোবাসা যদি সত্যি হয় তাহলে আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি কাছের মানুষকে ফিরিয়ে দাও। কেউ জানুক আর না জানুক তুমি তো জানো আমার ভালোবাসা কতটা সত্যি। হয়তো আমি একটু পাগল টাইপের কিন্তু যাকে আপন ভাবি তাকে মন থেকেই আপন ভাবি। আমিও তো একটু সুখ পেতে চাই! তবে কেনো সব দুঃখ শুধু আমার।" দুই হাত উর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে চিৎকার করে উপরওয়ালার নিকট নিজ ভাগ্য নিয়ে অভিযোগ করছে চিশতি। "পাঁচ বছর আগে আজকের মতোই একটা রাত এসেছিলো আমার জীবনে। সেই রাতে না চাইতেও পেয়েছিলাম পঞ্চশক্তি। পরিবারের কথা ভেবে আবার ত্যাগও করলাম সেই শক্তি। অপূর্ণ রয়ে গেলো আমার প্রতিশোধ। যেই পরিবারের জন্য এতকিছু করলাম শেষ মুহুর্তে তারাই মুখ ঘুড়িয়ে নিলো আমার থেকে। কেনো খোদায়া? কেনো? কেনো আমিই বার বার একের পর এক সত্যির মুখোমুখি হচ্ছি? কেনো? কেনো? কেনো? আর কত সত্যি লুকিয়ে আছে আমার জীবনে? এই সত্যি কি কোনোদিন ফুরাবে না? আমি যে সত্যি খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত প্রায়। কাউকে না জানিয়ে বাবা মায়ের কাছে এসেছিলাম সারপ্রাইজ দিতে অথচ সেই রাতে আমি নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম। এক অজানা সত্যির মুখোমুখি হয়ে। সেই সত্যির রহস্য উন্মোচন করার জন্য আবারও সকলের অগোচরে ফিরে এলাম আমার জন্মস্থান পাকিস্তানে। এবার আমাকে কোন সত্যি এবং নতুন কোন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে একমাত্র আপনিই জানেন প্রভু। দয়া করে আর পরীক্ষা নিয়েন না। আমি যে অধম বান্দা। এতশত পরীক্ষা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কিছুটা সহায় হোন আমার প্রতি।" অভিযোগ শেষে দুই হাতে চোখ ঢেকে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে থাকে চিশতি। চিরচেনা সেই লাহোর সিটিতে আজ প্রায় পাঁচটা বছর পরে এসে পা রাখলো চিশতি। সেই চেনা সুবাস। চোখ বন্ধ করে উপভোগ করলো। চোখ বন্ধ করে স্থির হয়ে দাঁড়ালে শোনা যায় গাছের ডালে বসে কিচিরমিচির করতে থাকা শালিকের ডাক। শোনা যায় পাকিস্তানবাসীদের উর্দু ভাষার কর্ণপাত। ভেসে আসছে রেললাইনের ঝক-ঝকা-ঝক শব্দ। আরো শোনা যায় উন্নত বিশ্বের যানবাহনে হর্ণ। দম টেনে দীর্ঘশ্বাস নিলেই পাওয়া যায় ভেজা মাটির সেই পরিচিত ঘ্রাণ। নাকে এসে খোঁচা দিচ্ছে পাশের নার্সারিতে থাকা হরেকরকম ফুলের মিষ্টি সুবাস। জন্ম থেকে বিশটি বছর এই দেশেই কাটানো মানুষটা দীর্ঘ বছর পর যখন অতিপরিচিত সেই সকল স্মৃতি অনুভব করে তখন তার ভেতরে প্রবাহিত ঝড় কেবল তারাই অনুভব করতে পারবে যারা দীর্ঘকাল প্রবাসজীবন কাটিয়েছে। অশ্রুভেজা লীলমণি আঁখি বাম হাতের উল্টো পাশ দিয়ে মুছে পা বাড়ালো নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে। যেভাবে কাউকে না জানিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে ফিরেছিলো ঠিক একই ভাবে কাউকে না জানিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান চলে এসেছে চিশতি। এক মনে ভেবেছিলো আবারও পিপির কাছে ফিরবে কিন্তু পরমুহূর্তেই মত পাল্টে ফেলে চিশতি। নিজের জীবনের সেই সত্যি উদঘাটন করতে এসেছে যেই সত্যি আমিনা বিবি আর চিশতি ব্যাতিত আর কেউই জানে না। আজ রাতটুকুু কোনো এক হোটেলে কাটিয়ে পরদিন থেকে নিজে উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে চিশতি। হোটেলে উঠার পূর্বে একটি বারের জন্য চিরচেনা সেই পুকুর ঘাটে যাওয়ার ইচ্ছে হলো যেখানে জড়িয়ে আছে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম স্মৃতি। ঘাটের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা দু'খানা নারিকেল গাছ। খাঁড়া হয়ে নিচে নেমে গেছে ঘাটের সিঁড়িগুলো। পুকুরের পানি গুলোও টলমল করছে। স্রোতত বইছে রাতের আকাশে পূর্নিমার চাঁদের আলোয় দেখানো পথে। এখানে এসেই নিজের জীবনের সকল অভিযোগ প্রকাশ করলো উপরওয়ালার কাছে। মন হাল্কা হতেই রাত্রিযাপনের জন্য বেড়িয়ে পরলো থাকার ব্যবস্থা করতে।

পরদিন...............

সূর্যোদয়ের পূর্বেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে ব্যস্ত নগরীর মানুষজনের। সাথে ঘুম ভেঙ্গে গেছে লাল ঝুঁটি মোরগটিরও। মোরগের কুকুরকুক্কু ডাকে জেগে উঠেছে চিত্তাকর্ষক হাজারো মানুষ। রক্তিম লাল সূর্য মুখ ভাসিয়েছে পূর্বাকাশ। ফুরফুরে সতেজ নির্মল বাতাস বইছে চারিদিকে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে এখনো ঘুমে বেঘোর চিশতি। রহস্য উদঘাটন করতে এসে জড়িয়ে যাচ্ছে একের পর এক রহস্যের জালে। সে জানে না কিভাবে এত রহস্য উন্মোচন করবে। তবে বিশ্বাস আছে নিজের উপর ভরসা আছে সৃষ্টিকর্তার উপর। সবকিছু ওই একজনের উপর ছেড়ে দিয়ে পা বাড়িয়েছে রহস্যের সমাধান খুঁজতে। সকাল ন'টা বাজতেই ফোনে এলার্ম বেজে উঠলো। ঘুমকাতুরে চোখগুলো ডলতে ডলতে এলার্ম অফ করে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হলো চিশতি। সাড়ে ন'টা বাজতেই কলিংবেলটা বাজালো। দরজা খুলতেই "স্যার আপনার ব্রেকফাস্ট" বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা হোটেল স্টাফ বললো "ভিতরে রেখে এসো" অনুমতি পেয়ে ব্রেকফাস্টের ট্রে'টা রুমে রেখে আপন মনে চলে গেলো হোটেল স্টাফ ছেলেটা। ছেলেটা চলে যেতেই রুমের দরজা বন্ধ করে ব্রেকফাস্টে মন দিলো চিশতি। মনে কতশত ভাবনা, অজানা ঘুর্ণিঝড় বয়েই চলেছে চিশতির মনে। ব্রেকফাস্ট শেষ করতে করতে পনের-বিশ মিনিট সময় লাগলো। খাওয়া শেষ করে বিশ্রামের জন্য বিছানায় পিঠ ঠ্যাকিয়ে ভাবতে থাকে কিভাবে কি করবে। পরমুহূর্তেই আবার কলিংবেল বাজলো। দরজা খুলতেই দুইজন লোক বললো "রুম ক্লিনার" চিশতি সম্মতি জানিয়ে তাদের ভিতরে আসতে বললো। লোকগুলো নিজেদের মতো রুম ক্লিন করছে ওই সুযোগে চিশতি জামা কাপড় পাল্টে রেডি হয়ে বের হয়ে এলো। লোকগুলো নিজেদের কাজ শেষ করে বের হওয়ার পর পরই চিশতিও কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেলো।

The Modern Lahore City Hospital........

"হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ? স্যার!" রিসিপশনের সামনে এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলো রিসিপশনের মেয়েটি। চিশতি মেয়েটিকে উর্দুতে জবাব দিয়ে বললো "আমাকে একজন ডাক্তারের ইনফরমেশন দিতে পারবেন?" মেয়েটি চিশতির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো "হ্যাঁ! হ্যাঁ! অবশ্যই। বলুন আপনি কোন ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিবেন?" শাহাদাৎ আঙ্গুল দিয়ে নাকের নিচ ঘষে বললো চিশতি "এফসিপিএস অ্যান্ড কনসালটেন্ট গাইনি স্পেশালিষ্ট ডাক্তার আইজা খান" রিসিপশনের মেয়েটি কম্পিউটার ঘেটে জবাব দিলো "অ্যাকচুয়ালি স্যার! আইজা ম্যাম তো এখন আমাদের হসপিটালে চেম্বার করেন না। গতবছরই উনি আমাদের হসপিটাল থেকে চলে গেছেন।" চিশতি অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো "উ-উনাকে কোথায় পাবো কিছু জানেন?" মেয়েটি বেশি প্রশ্ন না করে নিজের মতামত জানালো "সরি স্যার! আমি কোনো ডাক্তার সম্পর্কে তথ্য দিতে পারবো না। আপনার যদি বেশি প্রয়োজন হয় তাহলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমাদের ম্যানেজার আসলে উনার কাছ থেকে ইনফরমেশন নিতে পারবে।" চিশতি শান্ত গলায় বললো "আচ্ছা! আচ্ছা! ম্যানেজার কখন আসবে?" চিশতির প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই পিছন থেকে একজন লোক চিশতির কাঁধে হাত দিয়ে বললো "এক্সকিউজ মী! আপনি কি আমাকে খুঁজছেন?" চিশতি পিছন ঘুরে তাকায়। "আ-আপনি?" চিশতিকে থামিয়ে দিয়ে লোকটা বললো "আমি এখানকার ম্যানেজার, ইরফান জায়রার।" মুহূর্তেই চিশতির মুখে হাসি ফুটে গেলো। "ওহ্! আসসালামু আলাইকুম।" ইরফান সালামের জবাব নিলো "ওয়া আলাইকুমুস সালাম। জ্বি এবার বলুন, আমি আপনাকে কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি?" চিশতি ঘোর প্রত্যাশা নিয়ে ইরফানকে জিজ্ঞেস করলো "অ্যাকচুয়ালি স্যার! এফসিপিএস অ্যান্ড কনসালটেন্ট গাইনি স্পেশালিষ্ট ডাক্তার আইজা খানকে এখন কোথায় পাবো?" ইরফান এক গাল মুচকি হেসে বললো "উনাকে তো এখন কোনো প্রাইভেট হসপিটালে পাবেন না। উনি এখন ইসলামাবাদ লাইফ কেয়ার অ্যান্ড সাপোর্ট গভর্নমেন্ট হসপিটালের একজন নামকরা প্রফেসর। কিন্তু আপনি উনার খোঁজ করছেন কেনো? অ্যানি প্রবলেম? না মানে! আ-পনি চাইলে আমার কাছে শেয়ার করতে পারেন" চকচকে চোখ নিয়ে ইরফানের দিকে তাকিয়ে রইলো চিশতি। মুখে কোনো রাঁ নেই। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে আজ। চিশতির মনে ডুবে যাওয়া আশাগুলো নতুন আলোর মুখ দেখলো। খুশিতে ইরফানের হাত ধরে শুকরিয়া আদায় করেই বেরিয়ে গেলো হসপিটাল থেকে। "কি হলো স্যার? লোকটা কিছু না বলে এভাবে চলে গেলো কেনো?" রিসিপশনের মেয়েটি বললো "কি জানি? ভবিতব্য কখন কাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় দাঁড় করায় কেউ জানে না। যদি ভাগ্যে লিখা থাকে উনাকে হয়তো আবারও এখানেই আসতে হবে।" মৃদু হেসে বললো ইরফারন। "মানে??" অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বললো রিসিপশনের মেয়েটি। ইরফান কোনো জবাব না দিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে চলে গেলেন।

সময় প্রায় দুপুর বারোটা ছুঁই ছুঁই। উত্তপ্ত রোদের তাপ মাথায় করে ইসলামাবাদ লাইফ কেয়ার অ্যান্ড সাপোর্ট গভর্নমেন্ট হসপিটালের সামনে এসে পা রাখলো চিশতি। গাড়ি ভাড়া মিটিয়ে ডেবডেব চোখে তাকিয়ে আছে হসপিটালের দিকে। এই হসপিটাল জুড়ে জড়িয়ে আছে সকল রহস্যের জট। হয়তো এই হসপিটালই হবে সেই জট খোলার একমাত্র উপায়। মনের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় থামানোর চেষ্টায় মরিয়া হয়ে আছে চিশতি। কিন্তু কিছুতেই মন এবং নিজেকে সামলাতে পারছে না। অশান্ত মনকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা নিয়ে গেইটের গন্ডি পার করে ভিতরে প্রবেশ করলো চিশতি। সামনে থেকে একজন মাঝবয়সী মহিলা হেঁটে আসছে। এই বয়সেও তাকে দেখে মনেই হবে না সে মাঝবয়সী। মনে হয় মাত্র পঁয়ত্রিশ অতিক্রম করলো। খোলা চুলগুলো মৃদু হাওয়ায় উড়ছে। চোখে কালো সানগ্লাস। পড়নে মিষ্টি-গোলাপি রঙের গাউন। পিছনে একজন লোক তার মাথার উপর ছাতা ধরে এগিয়ে আসছে এদিকেই। মহিলাটির দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে রইলো চিশতি। উনি যখনই চিশতির পাশ কেটে গেলো হুট করে তার হাতে থাকা অসংখ্য ফাইলের মধ্যে একটি ফাইল মাটিতে পরে যায় যা উনি টেরই পায়নি। চিশতিও নিজ মনে ভিতরে ঢুকতে যাবে তখনই নজর গিয়ে পরে সেই ফাইলটির দিকে। ছুটে গিয়ে ফাইলটা হাতে তুলে নিলো। একবার ফাইলটার দিকে চোখ বুলায় আরেক বার ওই মহিলার পথপানে দৃষ্টিপাত করে। "হ্যালো ম্যামমমমমম! এক্সকিউজ মী ম্যামমমমমম!! আপনার ফাইল মাটিতে পরে গেছে?" হাঁপাতে হাঁপাতে মহিলাটির সামনে গিয়ে ফাইলটি তার হাতে দিয়ে বললো চিশতি। "থ্যাংক ইউ ডিয়ার!" চিশতির সততা ও পরোপকারীতা দেখে খুশি হলেন মহিলাটি। কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে গেলো চিশতি। "এটা কি হলে ম্যাম!" ছাতা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা বললো। "কি জানি? হয়তো ছেলেটা কারো সাথে তেমন কথা বলে না। আর নয়তো ও আমাকে চিনেই না।" মুচকি হেসে বললো মহিলাটি। "কি বলছেন ম্যাম? ডাক্তার আইজা খানকে চিনে না এমন মানুষও আছে?" আইজা খান মৃদু হেসে জবাব দিলেন "সবাই তো আর আইজা খানকে নিয়ে ভাবে না। চলো আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।" এই বলে আইজা খান গিয়ে গাড়িতে বসলেন। পরক্ষণেই আইজা খানের গাড়ি ছুটে চললো নিজ গতিতে। ওদিকে চিশতিও হসপিটালের ভিতরে প্রবেশ করলো। নিচতলা একদম শুনশান। দেখে মনেই হয় না এটাই শহরের সবচেয়ে বড় হসপিটাল। দোতলায় উঠতেই দেখতে পেলো কলেজের স্টুডেন্টদের চলাফেরা। তারমানে এখানেই মেডিকেলের স্টুডেন্টরা পড়াশোনা করে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো তিনতলায়। সামনেই রিসিপশন। রিসিপশনের সামনে গিয়ে বললো "আআআ! অ্যাকচুয়ালি এফসিপিএস অ্যান্ড কনসালটেন্ট গাইনি স্পেশালিষ্ট ডাক্তার আইজা খান কি আছেন?" রিসিপশনের মেয়েটি বললো "সরি স্যার! ম্যাম তো মাত্রই চলে গেলো।" চিশতির চোখ ছলছল করছে বেদনার অশ্রুতে। নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ মুছে ঢোক গিলে বললো "আবার কখন আসবেন?" মেয়েটি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললো "উনি প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে দুপুর বারোটা অব্দি থাকে। আপনি বরং কাল সকালে আসেন। উমমম! স্যার আপনি এক কাজ করুন, রোগীর নাম এবং আপনার ফোন নাম্বার সাবমিট করে সিরিয়াল দিয়ে যান। ম্যাম আসার পূর্বমুহূর্তে আমরাই আপনাকে কল করে জানিয়ে দিবো।" চিশতি মৃদু হেসে বললো "উনার সাথে পারসোনাল কথা ছিলো। রোগী দেখাবো না!" মেয়েটা ইতস্তত হয়ে বললো "ওহ্! আই এম সরি" এই বলে পিছুপা হলো চিশতি। মেয়েটি আশ্চর্যজনক দৃষ্টিতে চিশতির পথপানে চেয়ে রইলো। "কি আজব এই মানুষটা! দরকারি কথা ছাড়া একটা কথাও বেশি বললো না।"

বৃষ্টি ভেজা মেঠোপথ। চারিদিকে পথপ্রদর্শক ছুটছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে কেউ শখ মেটাতে ইচ্ছে করছে ভিজছে আবার কেউ কেউ ছাউনি খুঁজছে দৌড়াচ্ছে। ইসলামাবাদ থেকে লাহোর যেতে অনেকটা পথ তাছাড়া খরচও হয়ে যায় মেলা টাকা। এমতাবস্থায় কিছুতেই এদিক সেদিক টাকা নষ্ট করা যাবে না। রাতটুকুর জন্য আর লাহোর ফেরার ইচ্ছে নেই চিশতির। ছোট খাটো কোনো হোটেলে মাথা গুঁজতে পারলেই সকল চিন্তা দূর হবে। সিটি পুলিশ স্টেশনের পাশেই একটা ছোট রেস্টুরেন্ট দেখে পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই সেদিকে এগোয় চিশতি। কাক ভেজা হয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় চিশতি। নিজেকে অপ্রস্তুত অপ্রসন্নতা লাগা সত্ত্বেও এভাবেই ভিতরে গিয়ে বসলো। টেবিলেই রাখা ছিলো মেনু কার্ড। একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টাতেই চোখে পরলো ৩৬০ টাকার কম্বো প্যাকেজ। আপাতত এই দিয়েই দিন পার করতে হবে। ওয়েটার ডেকে অর্ডার কনফার্ম করলো চিশতি। পঁচিশ মিনিটের মধ্যে চলে এলো গরম গরম খাবার। দেরি না করে হাত ডোবালো খাবার প্লেটে। চিন্তামগ্ন অবস্থায় খাবার যেনো গলা বেয়ে নামছিলো না তারপর জীবন বাঁচানোর দায়ে সবটুকু খাবার শেষ করলো। "এক্সকিউজ মী ভাই! একবার এদিকে আসবেন প্লিজ!!" একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েটারকে ডাকছে চিশতি। চিশতির ডাক শোনার সাথে সাথে লোকটি টেবিলের সামনে এসে হাজির "ইয়েস স্যার! বলুন আমি আপনাকে কিভাবে হেল্প করতে পারি?" চিশতি টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো "আশেপাশে কোনো হোটেল বা থাকার জায়গা হবে। আজকের রাতটা থাকতে পারলেই হবে। কাল সকালে আবার লাহোর ফিরে যাবো?" লোকটা চিশতির দিকে চেয়ে রইলো। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো "স্যার কি এখানে নতুন এসেছেন নাকী?" লোকটা এমন প্রশ্ন শুনে চিশতি কিছুটা বিরক্ত বোধ করলেও জবাব দিলো "জ্বি! আমি এখানে নতুনই। একটা কাজের জন্য এসেছিলাম তবে কাজটা হয়নি। কাল অব্দি অপেক্ষা করতে হবে এজন্য একটা রাত থাকার জন্য কোনো হোটেল বা কোথাও ঠাঁই নিতাম আরকি" লোকটা একটু মুচকি হেসে বললো "এক রাতের জন্য আবার হোটেলে টাকা নষ্ট করবেন কেনো? আপনি চাইলে আমাদের রেস্টুরেন্টের স্টাফদের সাথেই থাকতে পারেন। আশা করছি আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। আর যদি আপনার আপত্তি থাকে তাহলে এখান থেকে বেরিয়ে ডান পাশের রোড ধরে সোজা গিয়ে একটা হোটেল দেখতে পাবেন সেখাই একটা ব্যবস্থা হবে।" লোকটা কথায় কিছুটা আশা খুঁজে পেলো চিশতি। "আ-আপনাদের অসুবিধা না হলে আমি আজকের রাতটা আপনাদের সাথেই থাকতে চাই।" লোকটা কলম দিয়ে কাগজে লেখালেখি করতে করতে বললো "স্যার বিলটা দিন! আর আপনি টেনশন করবেন না। আপনি আমাদের সাথেই থাকতে পারবেন। আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি।" মানি ব্যাগ থেকে টাকা বের করে লোকটাকে দিয়ে বললো "আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো।" লোকটা মৃদু হেসে বললো "মানুষই মানুষের বন্ধু আবার মানুষই মানুষের শত্রু" এই বলে লোকটা চলে গেলো। রাতটুকু উনাদের সাথেই থাকবে এরপর সকাল হতেই চিশতি আবারও নিজের গন্তব্যের পিছে ছুটবে।