পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ২৫

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২৫ · ২৮ পর্বের মধ্যে ২৫

রক্তিম লাল রঙের সূর্যের আবির্ভাব হলো পূব আকাশে। সকালের স্বচ্ছ কিরণময় আলোয় চকচক করছে চারিদিকের পরিবেশ। স্বল্প শিশির বিন্দুতে সজ্জিত হয়েছে আশপাশের ছোট বড় ঘাসগুলো। পাখির কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো সবার। "স্যার! ওওও স্যার! সকাল হয়ে গেছে। আমাদের এবার যেতে হবে, আপনি যাবেন না?" রেস্টুরেন্টের স্টাফরা যে যার মতো ফ্রেশ হয়ে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসে চিশতিকে ডাকছে। ঘুম ঘুম চোখে শরীর ঝাড়া দিয়ে হাই তুলতে তুলতে উঠলো চিশতি। "সকাল হয়ে গেছে? আমাকে এক্ষুনি বের হতে হবে। আর তোমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ আমাকে সাহায্য করার জন্য। তোমাদের আপত্তি না থাকলে আমি এখান থেকেই ফ্রেশ হয়ে বের হতাম।" স্টাফরা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করে বললো "কি বলছেন স্যার? আমরা আপনার জন্য নাস্তা এনেছি। আমাদের সাথে নাস্তা করবেন তারপর যেখানে খুশি যাবেন" ওদের কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো চিশতি। এই মানুষগুলোর সাথে মাত্র কয়েক ঘন্টার পরিচয় আর ওর জন্য কতকিছু করছে। "ক-কি বলছো? তো-তোমরা আ-মার জন্য নাস্তা এনেছো?" আমতা আমতা করে বললো চিশতি। "হ্যাঁ স্যার! যত যাই হোক আপনি আমাদের এখানে গেস্ট হয়ে এসেছেন, আর আমরা আমাদের গেস্টকে খালি মুখে বের হতে দিতে পারি না। যান গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসেন তারপর সবাই মিলে একসাথে ব্রেকফাস্ট করবো" ওদের কথা শুনে একটা মুচকি হাসি দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো চিশতি। আধঘন্টা মতো সময় পর ওরা সবাই যে যার গন্তব্যে চলে যায়। চিশতিও ওদের বিদায় জানিয়ে পা বাড়ায় নিজ গন্তব্যে। স্টাফদের ফ্ল্যাট থেকে ইসলামাবাদ লাইফ কেয়ার অ্যান্ড সাপোর্ট গভর্নমেন্ট হসপিটাল বেশি দূরে না। কিছুটা পথ হাঁটার পরই সেখানে গিয়ে পৌঁছায়। পৌঁছাবার মাত্র ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল সাড়ে দশটা বেজে গেছে। "এইরে! আধঘন্টা লেইট হয়ে গেছে। ডাক্তার আইজা খান তোহ আরো আগেই নিজের চেম্বারে চলে গেছেন" হন্তদন্ত হয়ে ভিতরে চলে গেলো চিশতি। আজকে যেনো হৃদয়ের স্পন্দন স্পন্দিত বুকে ধকধক করছে। মন বলছে আজ কিছু একটা হতে চলেছে। এমন কোনো সত্যি সামনে আসতে চলেছে যা চিশতি কখনো কল্পনা করেনি। "উমম! হ্যালো!!" রিসিপশনের সামনে গিয়ে বললো চিশতি। "ওহ্! হাই!! আপনি এখন এসেছেন। ম্যাম তোহ সেই কখন এসেছে, আপনি ওখানে বসুন আমি ওয়ার্ড বয়কে বলছি ও যেনো আপনাকে নিয়ে যায়। আসলে অনেক সিরিয়াল আছে তো......?!!" চিশতি মেয়েটিকে থামিয়ে দিয়ে বললো "ইট'স ওকে আমি ওয়েট করছি।" মেয়েটি আর কিছু বলার সাহস পেলো না। কেমন এক সংকোচবোধ করছিলো। মেয়েটি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো চিশতির দিকে। "ইশশশ! কি মায়াবী এই মানুষটা। দেখতে যতটা মায়াবী তার চেয়েও বেশি মায়াবী উনার কণ্ঠস্বর। মন চায় পুরো দুনিয়াকে থামিয়ে দিয়ে শুধু তাকেই দেখি।" চিশতির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছিলো রিসিপশনের মেয়েটি। মিনিট দশেক পর একটা ছেলে এলো। "মিস দোয়া! ডেকেছিলেন?" ছেলেটির ডাকেও যেনো দোয়ার হুশ ফিরছে না। অপলকভাবে তখনও চিশতির দিকে তাকিয়ে আছে সে। "মিইইইস দোয়াআআআআ!" ঘোর কাটতেই শরীর ঝাঁকি দিয়ে বললো "উমম! হ্যাঁ! হ্যাঁ! বলো? ওহ্! তুমি? তোমাকে সেই কখন ডেকেছি। আচ্ছা দামের শুনো, ওইযে চেয়ারে বসা লোকটাকে দেখছো?" -দোয়া।

"হ্যাঁ! কি হয়েছে উনার?" - দামের।

"উনার কিছু হয়নি৷ উনি আইজা ম্যামের সাথে দেখা করতে এসেছেন। তুমি ভিড় সামলিয়ে উনাকে একটু আইজা ম্যামের কাছে নিয়ে যেও।" - দোয়া।

"ঠিক আছে মিস।" - দামের।

"আ-আর হ্যাঁ! উনার কাছে কোনো টিপস চেও না। টিপস লাগলে আমাকে বলবে, আমি দিয়ে দিবে।" - দোয়া।

"ঠিক আছে মিস!" -দামের।

"এক্সকিউজ মী! এইযে মিস্টার আননৌউন! এদিকে আসুন" চিশতিকে উদ্দেশ্য করে ডাকছে দোয়া। "জ্বি! আমার নাম চিশতি। চিশতি কু.....!!" কুরেশি বলতে গিয়ে থমকে গেলো চিশতি। "কু? কি কু?" অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো দোয়া। "তেমন কিছু না। বলুন কি বলবেন?" এড়িয়ে গিয়ে বললো চিশতি। "ওর সাথে যান। ও আপনাকে আইজা ম্যামের চেম্বারে নিয়ে যাবে।" বললো দোয়া। "থ্যাংক ইউ! থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো। ধন্যবাদ দিলেও আপনাকে ছোট করা হবে। যদি সাধ্য থাকতো আপনাকে কিছু দিতাম, কিন্তু..... " আইজা খানের সাথে দেখা হওয়ার খুশিতে চোখ মুখ চকচক করছে চিশতির। "সাধ্যের মধ্যে আপনার মনটাই না-হয় দিয়ে দিন!" চিকন সুরে বললো দোয়া। "এক্সকিউজ মী?" শুনতে না পেয়ে বললো চিশতি। "না! না! তেমন কিছু না। আপনি ওর সাথে যান।৷ আর আপনাকে সাহায্য করতে পেরে আমিও খুশি হলাম।" মুচকি হেসে বললো দোয়া। দামের সাথে সাথে আইজা খানের চেম্বার অব্দি গেলো চিশতি। দামের নিজ দায়িত্বে সবাইকে উপেক্ষা করে আইজা খানের চেম্বারের সামনে গিয়ে চিশতিকে দাঁড় করিয়ে ভিতরে গেলো "গুড মর্নিং ম্যাম!" আইজা খানকে সুপ্রভাত জানালো দামের। "আরে দামের তুমি! অনেক দিন পর আমার চেম্বারে এলে।" - আইজা খান। "অ্যাকচুয়ালি ম্যাম! একজন আপনার সাথে পারসোনালি দেখা করতে চায়।" -দামের। "আমার সাথে পারসোনালি দেখা করতে চায়? কে সে? কোথায় আছে?" আইজা খান। "নাম বললো চিশতি। বাইরেই দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি, আপনি পারমিশন দিলে ভিতরে আসতে বলবো।" - দামের। "ওকে! তুমি তাকে ভেরতে পাঠাও!" একটু চিন্তিত সুরে ভ্রু কুচকে বললো আইজা খান। "ওকে ম্যাম" এই বলে বাইরে বেরিয়ে এলো দামের। "হ্যালো মিস্টার! আপনাকে ভিতরে যেতে বলেছে!" দামের মুখ থেকে এই কথা শোনার পর চিশতি যেনো হাতে আসমান পাওয়ার মতো খুশি হলো। পকেট থেকে কচকচ পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে জোর বসত দামের হাতে ধরিয়ে দিয়ে উৎসুক গতিতে ভিতরে চলে গেলো চিশতি। দরজার চৌকাঠে পা রাখতেই চমকে গেলো চিশতি। "আ-আপনি?" দরজার পাশ থেকে শব্দ শুনে সেদিকে আলতো চোখে তাকাতেই চোখ আটকে গেলো ডাক্তার আইজা খানের। "তু-তুমি?" চিশতির দিকে তাকিয়ে থেকে বললো আইজা খান।

"আপনিই তাহলে ডাক্তার আইজা খান?" - চিশতি।

"হ্যাঁ! আমিই ডাক্তার আইজা খান। কিন্তু তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না? তুমি কে?" - আইজা খান।

"ম্যাম! ম্যাম আ-মার আপনার হেল্প লাগবে। প্লিজ হেল্প মী!" অস্থির হয়ে ভিতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে রইলো চিশতি। "কাম ডাউন! কাম ডাউন! এখানে বসো, এরপর বলো কিসের হেল্প লাগবে তোমার?" চিশতিকে শান্ত হতে বললো আইজা খান। আইজা খানের কথায় নিজেকে কিছুটা প্রীতিসম্ভাষণ করলো চিশতি। চেয়ার টেনে বসলো।

"এবার বলো কি করতে পারি তোমার জন্য?" - আইজা খান।

"ম্যাম! আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে লাহোর সিটি হসপিটালে ডেলিভারির সময় আমিনা বিবি নামে এক পেসেন্টের মৃত সন্তানের সাথে একটা বাচ্চার অদলবদল করে ছিলেন মনে আছে?" - চিশতি।

ডাক্তার আইজা খান চিশতির কথা শুনে পানির গ্লাসে ঢোক দিলেন "হোয়াট! কি আবোলতাবোল বকছো তুমি? তোমার মাথা ঠিক আছে তো?" ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন আইজা খান। "সেই বাচ্চাটা আমি!" শান্ত গলায় বললো চিশতি। এবার যেনো আকাশ থেকে পড়লেন আইজা খান। "হোয়াট! আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না!" বিস্মিত হয়ে বললেন আইজা খান। "হ্যাঁ ম্যাম! সেদিন রাতে কি হয়েছিলো, কেনো হয়েছিলো সবটা জানতে চাই। আ-মি আমার আসল বাবা মাকে ফিরে পেতে চাই। প্লিজ ম্যাম হেল্প মী! হেল্প মী!" আইজা খানের দিকে তাকিয়ে কান্না করে দিলো চিশতি। চিশতিকে অঝোরে কাঁদতে দেখে আইজা খান নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে চিশতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

"বছর খানেক হলো সার্জন ডাক্তারি পাস করেছি। এর আগে প্রায় তিন-চারটে ওটি সামলেছিলাম। কিন্তু সেদিন ছিলো আমার অগ্নিপরীক্ষা। নতুন এখন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চলেছিলাম কারণ, ওইদিন একসাথে দুটো ডেলিভারি অ্যাটেন্ড করতে হবে একই ওটিতে। প্রথম প্রথম নার্ভাস লাগছিলো কিন্তু পরে নিজেকে নিজেই সাহস দিলাম। তখনও ভাবিনি সামনে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে। ওটিতে যাবো ঠিক তার আগমুহূর্তে কোত্থেকে যেনো এক ভদ্রলোক এলেন, লম্বায় ছয় ফিট তো হবে না! কাছাকাছি, অতটা মোটাও না আবার চিকনও না। গায়ের রঙ ফর্সা। বড় টুপিওয়ালা একটা জ্যাকেট পড়া ছিলো। চেহারাটা সম্পূর্ণ ঢাকা ছিলো টুপি দিয়ে। কণ্ঠ শুনে মনে হয়েছিলো মাঝবয়সী। কথার বলার ধরন ছিলো একদম কোনো মাফিয়া গ্যাঙ-এর লিডারদের মতো। সে এসে তোমার জন্মদাত্রী মায়ের ছবি দেখিয়ে বললো

" ভালো করে দেখুন একে! আজ আপনার হাতেই ওর সন্তান ভূমিষ্ট হতে চলেছে। কিন্তু সাবধান ওই বাচ্চা যেনো দুনিয়ার আলো দেখতে নাহ পারে। জন্মের সাথে সাথে বাচ্চাটা যেনো মারা যায়" লোকটার কথার কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি বলছে লোকরটা!! "ক-কে আপনি? আ-আর আমাকে এসব করতে কেনো বলছেন? আ-আমি এসব করতে পারবো না! আ-আপনি চলে যান এখান থেকে" আমি মানা করার পর আমার ছোট বোনের ছবি দেখিয়ে বলে "দেখুন তো! এটা আপনারই তো বোন তাই না? আপনার একটা ভুল আপনার বোনের জীবনটা নষ্ট করে দিতে পারে। আপনি কি চান! আপনার জন্য আপনার বোনের জীবনটা নষ্ট হোক? কি? চান না তাই তো? তাহলে আমি যা বলছি তাই করুন, বিনিময়ে আপনি যা চাইবেন তাই পাবেন। আপাতত এই টাকাগুলো রাখুন প্রয়োজনে আরো দিবো।" ব্রিফকেস ভর্তি টাকা দিলো। আমিও নিরুপায় হয়ে জবাব দিলাম "আপনি একদম চিন্তা করবেন না! আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই কাজ করবো। দয়া করে আমার বোনের কোনো ক্ষতি করবেন না!" লোকটা আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেলো।"

"ম্যাম! এখন ওই লোকটাকে খোঁজার সময় নেই আমার হাতে। আমি আমার বাবা মাকে ফিরে পেতে চাই। আপনি যাদের হাতে আমাকে তুলে দিয়েছেন তারা নিজ স্বার্থে আমাকে দিনের পর দিন ব্যবহার করে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই আমি সব সত্যিটা জানতে পারি। সত্যের সন্ধানে এখানে চলে এসেছি, শুধুমাত্র আপনার ভরসায়। প্লিজ ম্যাম ফিরিয়ে দিবেন না।" - চিশতি।

"তুমি একদম চিন্তা করবে না! আমি তোমার পাশে আছি। আমি চেম্বার শেষ করেই তোমার সাথে লাহোর যাবো। ওখানে গিয়ে তোমার বাবা মায়ের ঠিকানা খুঁজে বের করবো।" - আইজা খান।

"আপনাকে যে কিভাবে ধন্যবাদ দিবো। আপনি জন্মের পর থেকেই আমার জীবন রক্ষা করছেন। এতগুলো বছর পরও যে আমাকে সাহায্য করার জন্য রাজি হবেন ভাবিনি।" - চিশতি।

"চিন্তা করো না! সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন তুমি একা নও আমিও আছি তোমার পাশে।" - আইজা খান।

The Modern Lahore City Hospital........

পরন্ত বিকেলে ধূসর-লাল আকাশ মাথার উপরে রঙের ছোঁয়া দিচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে আইজা খান ছুটে এসেছে চিশতিকে সাহায্য করার জন্য লাহোর সিটি হসপিটে। সে কেনো চিশতিকে সাহায্য করছে নিজেও জানে না। তবে এতটুকু জানে, সে যা করছে একদম ঠিক করছে। হয়তো এই কাজটা অনেক আগেই করার উচিৎ ছিলো।

"আসসালামু আলাইকুম! গুড আফটারনুন ম্যাম। অনেক দিন পর আমাদের হসপিটালে আসলেন!" রিসিপশনের সামনে এসে দাঁড়াবার মাত্র রিসিপশনের মেয়েটি সালাম দিয়ে বললো। "ওয়া আলাইকুমুস সালাম! উমমম!! গুলরিজ, ইরফান কোথায়??" সালামের উত্তর দিয়ে হসপিটালের ম্যানেজারের খোঁজ করলো আইজা খান। "স্যার? স্যার তো হসপিটালেই আছে। ওয়েট আমি কল করছি!" মুচকি হেসে বললো গুলরিজ। এরপর রিসিপশনের ল্যান্ডলাইন থেকে নাম্বার ডায়াল করে ইরফানকে কল করলো গুলরিজ। কল রিসিভ করতেই "হ্যালো স্যার! একবার একটু রিসিপশনে আসবেন প্লিজ!! আইজা ম্যাম এসেছেন আপনার সাথে দেখা করতে।" কল কেটে আবারও আইজা খানকে উদ্দেশ্য করে বললো "ম্যাম! একটু ওয়েট করুন স্যার এক্ষুনি আসছে।" গুলরিজের কথায় চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে আইজা খান আর চিশতি। মিনিট পাঁচেক পর পরই রিসিপশনে হাজির হলো ইরফান। "ওহো! আইজা খান!! আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন আপনি?" দুই হাত সামনে বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বললো ইরফান। "ওয়া আলাইকুমুস সালাম!৷ আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি। কথা না বাড়িয়ে মুদ্দা কথায় আসি, তোমার সাথে পারসোনাল কথা আছে।" আইজা খানের কথা শেষ হতেই "স্যার! আ-পনি গতকাল এসেছিলেন না? আইজা খানের খোঁজ করতে?" চিশতিকে উদ্দেশ্য করে বললো ইরফান। "হ-হ্যাঁ!" শান্ত গলায় বললো চিশতি। "হ্যাঁ! ওর বিষয়েই কথা আছে তোমার সাথে। তোমার চেম্বারে চলো" চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো আইজা খান। "অবশ্যই! অবশ্যই! আসুন! আমার সাথে আসুন" চেম্বারের দিকে পা বাড়িয়ে বললো ইরফান।

"ইয়েস ম্যাম, বলুন আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?" নিজের চেয়ারে বসে মিষ্টি সুরে বললো ইরফান। "ইরফান, পঁচিশ বছর আগে একুশে ফেব্রুয়ারীর দিনে কতজন রোগী চিকিৎসা পেয়েছেন এবং কতজন রোগীর ডেলিভারি হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাই। দয়া করে এই তথ্যগুলো আমাকে জানাতে সহায়তা করবে কি?" দুই হাত একত্র করে বললো আইজা খান। "পঁচিশ বছর আগে?" বিস্মিত হয়ে বললো ইরফান। "হ্যাঁ! স্যার প্লিজ আমাদের হেল্প করুন প্লিজ!" আকুতি সুরে বললো চিশতি। "হ্যাঁ! পঁচিশ বছর আগের সকল তথ্য জানা প্রয়োজন আমাদের।" আইজা খান। "পঁচিশ বছর আগে তো আমাদের হসপিটালে কোনো কম্পিউটার ছিলো না, আর তখন তো আমিও ছিলাম না এই হসপিটালে।" ভ্রুক্ষেপ করে বললো ইরফান। "প্লিজ ইরফান, যেভাবেই হোক আমাদের ওইদিনের ডিটেইলস জানতে হবেই।" অনুরোধ করে বললো আইজা খান। "আচ্ছা! আমাকে ভাবতে দিন, হয়তো স্টোর রুমে আগের সকল রশিদ বই৷ পাওয়া যেতে পারে।" একটু ভাবনা মগ্ন হয়ে বললো ইরফান। "ব্যাস! তাহলে দেরি কিসের। চলো স্টোর রুমে গিয়ে দেখি পাই কি-না" হকচকিয়ে বললো আইজা খান।

আইজা খান, ইরফান, এবং চিশতি তিনজন মিলে রওনা হয় বহু বছর ধরে বন্ধ হওয়া পুরনো স্টোর রুমের উদ্দেশ্যে, যা সম্পূর্ণ অন্ধকার, ধূলোময়লা এবং মাকড়শার জালে ভরপুর। স্টোর রুমটি অনেক বছর ধরে বন্ধ ছিলো এবং হসপিটালের মানুষের কাছে এটি একটি ভয়ের জায়গা হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। কথিত আছে এর ভিতর থেকে নাকী অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসে। এসব উপেক্ষা করে আইজা খান, ইরফান এবং চিশতি সেখানে গিয়ে পৌঁছায়। তাদের উদ্দেশ্য হলো সেখানে রাখা পুরনো ফাইলগুলো খুঁজে বের করা, যার মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ফাইলগুলোর মধ্যে একটি গোপন নথি রয়েছে যা তাদের মিস্ট্রি সমাধান করতে সাহায্য করবে। তারা যখন স্টোর রুমের ভেতরে প্রবেশ করে, ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর পরিবেশের মধ্যে পড়ে। প্রতিটি কোণায় থাকা পুরনো জিনিসপত্র, মাকড়শার জাল এবং অন্ধকার তাদের রহস্যময় পরিস্থিতির অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়। স্টোর রুমের কোণায় কোণায় প্রাচীন কাগজের স্তূপ, ভাঙা ফার্নিচার এবং পুরনো ওয়ার্কশিটের স্তূপ পড়ে রয়েছে। মাকড়শার জালগুলি বাতাসে হালকা ঝলক দিয়ে উঠছে, স্টোর রুমের দেয়ালগুলোতে মাকড়শার জাল এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যেন একটি অদৃশ্য জাল তাদের চারপাশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পুরনো জিনিসপত্রের স্তূপ এবং কাঁপানো ধুলার কণা বাতাসে ভাসছে, যা পরিবেশকে আরও ভীতিকর করে তুলছে

আইজা খান, ইরফান, এবং চিশতি ধীরে ধীরে স্টোর রুমের কোণার দিকে এগিয়ে যায়, এক এক করে সবগুলো ফাইল দেখতে থাকে তারা। কিন্তু একটাও পঁচিশ বছর আগের নাহ। এমতাবস্থায় তিনজনই খুবই হতাশার মধ্যে পড়ে যায়, কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না। মনোবল হারিয়ে এক পা দু'পা করে হাঁটতে হাঁটতে একটি পুরনো কাঠের আলমারির মধ্যে সামনে গিয়ে থামে আইজা খান। আলমারির দরজায় ঝোলানো আছে বিশাল এক তালা। পাশে থাকা লোহার পাত দ্বারা ইরফান তালাটি খুলে দেখে, ভিতরে একটা প্যাডেড বক্স ধুলায় ঢাকা। আলমারি খুলতেই একধরণের বিষণ্ণ শীতলতা তাদের ঘিরে ধরে। আইজা খান প্যাডেড বক্সটি খুলতেই, পুরনো কাগজের গন্ধ ও পাতাগুলোর শুকনো শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। যেনো এক যুগ পুরনো ইতিহাস তার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে চলেছে। একে একে অনেকগুলো ফাইল সরিয়ে হঠাৎ চোখ আটকালো একটি ফাইলের দিকে। মনের ডাকে সারা দিয়ে ফাইলটি খুলে "পেয়ে গেছি! এটারই তোহ অপেক্ষায় ছিলাম আমরা" আইজা খানের চোখে উদ্বেগের ছায়া ছিলো, তবে ফাইলটি হাতে পেয়ে তার মুখে স্বস্তির দীপ্তি ফুটে উঠলো। যেনো হাজারো কষ্টের পর একটিমাত্র সুখের রশ্মি পেলো।

আইজা খানের উৎফুল্ল কণ্ঠ শুনে ইরফান আর চিশতি ছুটে আসে। ইরফানের হাতের তালু ঘামাচ্ছিলো এবং চোখে অবিশ্বাসের মিশ্রণ ছিলো, চিশতির মুখে শান্তির ছাপ ধরা পড়লো। "কি পেয়েছেন ম্যাম?" প্রশ্ন করলো ইরফান। "যে ফাইল খোঁজার জন্য এখানে এসেছি" আইজা খানের মুখে এই কথা শুনে তার হাতে থাকা ফাইলের দিকে চোখ বুলাতেই দেখে পঁচিশ বছর আগের সেই ফাইল। যার সন্ধানে তারা এখানে এসেছে। তাদের চোখে স্বস্তির একটি স্নিগ্ধ আভা ফুটে উঠে। ইরফানের মুখে মুগ্ধতা ও অবিশ্বাসের মিশ্রণ দেখা যায়, কারণ ফাইলটি তাদের দীর্ঘক্ষণের অনুসন্ধানের চিহ্ন ধারণ করে। চিশতির চোখে দেখা যায় এক ধরনের অভিব্যক্তি, যা পূর্বজন্মের কষ্টের অন্তর্ভুক্ত একটি মিষ্টি মুক্তির অনুভূতি। ফাইলটি খুলে তাদের সামনে পুরনো নথিপত্রের সাথে একটি গুপ্ত বার্তা উন্মোচিত হয়, যা তাদের আগের ধারণাকে অতিক্রম করে একটি নতুন রহস্যের সূচনা করে। তারা নতুন তথ্যের শক্তি ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে, যা তাদের পূর্ববর্তী উত্তেজনা ও আতঙ্ককে এক নতুন, বিস্ময়কর আলোয় প্রবাহিত করে। অবশেষে, তারা ঐতিহাসিক এই আবিষ্কারের জন্য একে অপরকে অভিনন্দন জানায় এবং ফাইল হাতে করে স্টোর রুম থেকে বের হয়ে আশার আলো সঞ্চার অনুভব করে। অবশেষে, একটি চমকপ্রদ সিক্রেট উন্মোচিত হয় যা তাদের জীবনকে এক নতুন মোড় নিয়ে যায়।

এরপর তারা তিনজন মিলে একুশে ফেব্রুয়ারীর সকল ডিটেইলস দেখতে থাকে। ওইদিন তাদের হসপিটালে তিনটা ডেলিভারি হয়। সকাল দশ ঘটিকায় একজনের ডেলিভারি হয় এবং বাকি দু'জনের একসাথে রাত বারোটা নাগাদ হয়। তাদের মধ্যে একজনের পরিচয়ে লিখা ছিলো, "পেসেন্ট-আমিনা বিবি, গার্ডিয়ান-আব্রাহাম কুরেশি এবং এড্রেস- আহসান-এ-ইকবাল, রোড নম্বর ৪৫, লাহোর, পাকিস্তান" এবং অপর জনের পরিচয়ে লিখা ছিলো, "পেসেন্ট- গুলশিরিন, গার্ডিয়ান- ফুরকান আনসারী, এড্রেস- গুলশান-ই-রাব্বানি, রোড নম্বর ১২৩, লাহোর, পাকিস্তান" আইজা খান এবং চিশতি নির্ধারণ করলো তারা আজকেই "গুলশান-ই-রাব্বানি, রোড নম্বর ১২৩, লাহোর, পাকিস্তান" এই ঠিকানায় যাবে। সাহায্য করার জন্য ইরফানকে শুকরিয়া আদায় করে তারা তাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

তারা যখন "গুলশান-ই-রাব্বানি, রোড নম্বর ১২৩, লাহোর, পাকিস্তান" ঠিকানায় পৌঁছায়, তখন দেখতে পায় একটি পুরনো, শান্ত এলাকায় একটি ছোট্ট বাড়ি রয়েছে। বাড়িটির সামনে একটি নামফলক রয়েছে, যা গুলশিরিনের নাম উল্লিখিত। আইজা খান দরজায় নক করে, এবং এক মহিলা দরজা খুলে দেয়। মহিলার মুখ চিন্তিত কিন্তু সদয় হাসি দেখা যায়। "আমরা গুলশিরিন এবং ফুরকান আনসারীকে খুঁজছি। আপনি কি তাদের সম্পর্কে কিছু জানেন?" আইজা খান প্রশ্ন করেন। মহিলা একটু অবাক হয়ে বলেন, "আমরা গুলশিরিনকে জানি, কিন্তু ফুরকান আনসারী এখানে থাকেন না। গুলশিরিন দীর্ঘদিন আগে এখান থেকে চলে গেছেন।" আইজা খান একটু আকুতি সুরে বললো "কোথায় গেছে আপনি কি জানেন?" মহিলাটি আইজা খান এবং চিশতিকে ভিতরে ডেকে বসিয়ে বললো “তারা শেষবারের মতো ‘লাহোর সেন্ট্রাল’ এলাকায় বসবাস করতেন, সম্ভবত এখনো সেখানেই আছেন। আমি শুনেছি, ফুরকান আনসারীও সেই এলাকায় থাকতে পারেন।” তারা মহিলার কাছ থেকে এই নতুন ঠিকানার ক্লু পেয়ে, পুনরায় লাহোর সেন্ট্রাল এলাকায় রওনা হয়। সেখানে পৌঁছে তারা স্থানীয় বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, স্থানীয় অফিস, পরিচিতজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে গিয়ে গুলশিরিন এবং ফুরকান আনসারীর অবস্থান সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। লাহোর সেন্ট্রাল এলাকায় পৌঁছে আইজা খান এবং চিশতি স্থানীয় সূত্র থেকে জানতে পারে যে গুলশিরিন ও ফুরকান আনসারী ইসলামাবাদ শহরের এক মহল্লায় চলে গেছেন। তারা সেখানকার কিছু স্থানীয় মানুষ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। একজন সহৃদয় ব্যক্তি তাদের গুলশিরিন ও ফুরকান আনসারীর নতুন ঠিকানা দেয়। "মহল্লা: জামালপুর, রোড নম্বর ৭, ইসলামাবাদ, পাকিস্তান"। তারা ইসলামাবাদ শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় এবং জামালপুর মহল্লায় গিয়ে পৌঁছায়। মহল্লার পরিবেশ ও বাড়িগুলোর দিকে খেয়াল রেখে তারা ঠিকানার সাথে মেলানো একটি বাড়ি খুঁজতে থাকে। তারা মহল্লার মধ্যে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেয় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে গুলশিরিন এবং ফুরকান আনসারীর বর্তমান ঠিকানা নিশ্চিত করে নেয়। শেষে, তারা একটি বাড়িতে গিয়ে পৌঁছায়, যেখানে গুলশিরিন ও ফুরকান আনসারী বসবাস করছে।

"চিশতি তুমি ভিতরে যাও, আমি বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করছি" আইজা খান বললো। চিশতি তার বাবা-মায়ের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যাস্তের নরম আলো বাড়ির দেওয়ালে পড়ছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে এবং আকাশে গোলাপি আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। একটি ঠান্ডা, বৃষ্টির মতো বাতাস বয়ে যাচ্ছে, যা বাড়ির চারপাশে এক ধরনের অশ্রুজল ও কষ্টের অনুভূতি সৃষ্টি করছে। এটি এক অদ্ভুত অনুভূতির সময় সুখ, উদ্বেগ, এবং আশার মিশ্রণ। চিশতি দীর্ঘ সময় ধরে নিজের জীবনের সকল অতীত মনে করছিলো। সে অনুভব করতে থাকে, তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে জন্মের সময়ই তাকে আলাদা করা হয়েছিল। নানা বাঁধা ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আজ সে এখানে। এবার, সে নিজের আসল বাবা মায়ের কাছে ফিরে আসছে, তার আসল পরিচয় প্রকাশ করতে। চিশতি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, কলিংবেলের দিকে হাত বাড়ায়, তার হৃদপিণ্ড দ্রুত ধুকপুক করছে। তার চোখে জল আসছে, এবং সে মনে মনে শক্তি নিয়ে ধীরে ধীরে দরজায় নক করে। কলিংবেলের শব্দ পেয়ে ভিতর থেকে একজন মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুলে দেয়। দরজা খোলার পর মহিলার উদ্দেশ্যে চিশতি বললো "আমি গুলশিরিন এবং ফুরকান আনসারীকে খুঁজছি। তারা কি এখানে আছেন?" চিশতি বিনীতভাবে জানতে চায়। মহিলা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেন, "হ্যাঁ, তারা এখানেই আছেন। আমি তাদের ডেকে আনছি। আপনি ভিতরে আসুন" মহিলার কথামতো চিশতি ঘরের ভিতরে গিয়ে বসলো। বাসার ভিতরটা কেমন নিরিবিলি। মানুষজন যে থাকে বুঝা বড় দায়। চুপটি করে সোফায় বসে এদিক সেদিক চোখ বুলাতে থাকে চিশতি। মহিলা ঘরের ভিতর গিয়ে গুলশিরিন এবং ফুরকান আনসারীকে বলে "কে যেনো আপনাদের খোঁজ করছে, আমি ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে এসেছি" মহিলার কথায় কর্ণপাত করলো গুলশিরিন। "কে এসেছে? এই শহরে আমাদের খোঁজ করার মতো কে আছে?" চিন্তিত হয়ে ফুরকান আনসারী নিজেও। ইতস্তত সুরে বললো "চলো গিয়ে দেখি" গুলশিরিন ও ফুরকান আনসারী এসে দেখে একজন যুবক ছেলে তাদের খোঁজে এসেছে। অথচ তারা এই ছেলেকে কখনো দেখেওনি এমনকি চিনেও না। তাদের মুখাবয়বে অবিশ্বাস ও হতবিহ্বলতা। গুলশিরিন এবং ফুরকান দুইজনের চোখে মুখে হতাশার ছাপ। "কে বাবা তুমি? এখানে কেনো এসেছো?" প্রশ্ন করলো গুলশিরিন। গুলশিরিন এবং ফুরকানের উপস্থিতি টের পেয়ে উঠে দাঁড়ায় চিশতি। চিশতির হৃদয় জড়িয়ে আছে ভয় ও আশার মাঝে। তার চোখে জল জমে এসেছে। সে দীর্ঘদিনের ভেতরের অভাব, দুঃখ, এবং পুনর্মিলনের আশা নিয়ে এসেছে এখানে। মুখে একটি স্নিগ্ধ, কিন্তু উত্তেজিত হাসি রয়েছে। সে জানে, এই মুহূর্ত তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। "আ-আমি চিশতি!" একটু আমতা আমতা করে বললো চিশতি। "চিশতি? তোমাকে তো এর আগে কখনো দেখিনি? কোথা থেকে এসেছো তুমি" ভ্রুকুঞ্চন করে বললো ফুরকান। ফুরকানের প্রশ্নের উত্তর দিতে যাবে তখনই চিশতির নজরে একজনের ছবি পড়লো। "উ-উনি?" ছবির দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারা দেওয়ায় গুলশিরিন বললো "ও আমার একমাত্র ছেলে সিমন" চিশতি কিছুটা হকচকিয়ে বললো "ডাক্তার সিমন আপনাদের সন্তান?" চিশতির কথায় গুলশিরিন এবং ফুরকান দু'জনই বিভ্রান্ত হলো। "হ্যাঁ! কিন্তু তুমি ওকে চিনো কিভাবে?" বললো ফুরকান। "অনেক কথা বাবা" অন্য দিকে তাকিয়ে বললো চিশতি। "বাবা? কে তোমার বাবা?" ধমকের সুরে বললো ফুরকান। "বাবা! আমি আপনাদের সন্তান। আমাকে জন্মের সময়ই আপনাদের কাছ থেকে আলাদা করা হয়েছিলো। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস আমাকে আপনাদের কাছে নিয়ে এসেছে।" চিশতি চোখ টলমল করছে জলে। চিশতি তার পরিচয় প্রকাশ করার পর গুলশিরিন ও ফুরকানের মুখাবয়বে অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। তাদের দৃষ্টি একে অপরের দিকে চলে যায়, তাদের চোখে দুঃখ এবং হতাশার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে। "কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে যে তুমি আমাদের সন্তান?" চেচিয়ে বললো ফুরকান। “আমি সত্যিই প্রমাণ হিসেবে কিছু দিতে পারবো না… কিন্তু আমি আপনাদের কাছে আসতেই পেরেছি।” চিশতি তখন প্রমাণ হিসেবে কিছু দিতে পারছে না, চিশতি চিন্তিতভাবে, চোখে জল নিয়ে বললো। "প্রমাণ আমি!" বাইরে থেকে সজোরে বলে ভিতরে প্রবেশ করলো ডাক্তার আইজা খান। হাতে একটি কাগজের ফোল্ডার নিয়ে। ফোল্ডার উঁচু করে, দৃঢ় স্বরে বললেন আইজা খান “এখানে আপনার প্রমাণ রয়েছে। এটি একটি দীর্ঘ কাহিনী, কিন্তু আমার সাথে কথা বলার পরে আপনি পুরো সত্য জানতে পারবেন।” আইজা খান দৃঢ় এবং বিশ্বাসযোগ্য সুরে কথা বলেন, যা একটি নতুন উত্তেজনার স্তর যোগ করে। তার হাতে থাকা কাগজপত্রের দিকে চিশতি এবং গুলশিরিন-ফুরকান তাকায়, যা তাদের মনের মধ্যে নতুন আশার আলো জাগায়। আইজা খানের উপস্থিতি চিশতির পরিচয় এবং তার দাবির বৈধতা নিশ্চিত করে, একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটায়। "কিন্তু কে আপনি?" বললো ফুরকান। "আমি ডাক্তার আইজা খান, পঁচিশ বছর আগে "The Modern Lahore City Hospital"-এ আপনার স্ত্রীর ডেলিভারি হয়েছিলো মনে আছে?" জিজ্ঞেস করলেন আইজা খান। "হ্যাঁ! কিন্তু আমাদের তো মৃত সন্তান হয়েছিলো? আর এটাও জানি কে আমাদের সন্তানকে মেরেছে!" ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো ফুরকান। "মানে?" বললো আইজা খান। "মানে, আমারই মায়ের পেটের ছোট ভাই গুফরান, তখন আমরা দুই ভাই একই বাড়িতে থাকতাম, এক রাতে ওর স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠে তখন বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিলো সময় মতো ওর স্ত্রীকে হসপিটালে না নিয়ে যাওয়ার ফলে বাচ্চা গর্ভেই মারা যায়। ওর সন্তান মারা যাওয়ার কারণে ও আমাদের দোষারোপ করে এবং সেদিনই প্রতিজ্ঞা নেয় আমাদের আর কোনো সন্তান পৃথিবীতে আসতে দিবে না। এরপর যখন আমার স্ত্রীর ডেলিভারির সময় হয় তখন গুফরান ডাক্তারকে টাকা দেয় আমাদের সন্তানকে মেরে ফেলার জন্য এবং ও সফলও হয়।" এই কথা বলেই কান্নায় জড়জড়িত হয়ে গেলো ফুরকান। "আপনি শিওর কিভাবে যে আপনাদের সন্তান মারা গেছে?" ফুরকানের কাঁধে হাত রেখে বললো আইজা খান। "কারণ আমরা নিজের হাতে আমাদের মৃত সন্তানকে মাটি দিয়েছি। প্রথমে এটাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলাম কিন্তু পরে গুফরান নিজের মুখে স্বীকার করে যে আমাদের সন্তানের মৃত্যুর পিছনে ওর হাত রয়েছে। আমরা আইনিপদক্ষেপও নিয়েছিলাম।" বা হাতের উল্টো পাশে চোখ মুছে বললো ফুরকান। "আপনাদের সন্তানের কিচ্ছু হয়নি। এইযে আপনাদের সন্তান সশরীরে৷ দাঁড়িয়ে আছে আপনাদের সামনে।" মুচকি হেসে বললো আইজা খান। "কি বলছেন? ও-ও আমাদের সন্তান?" ছুটে গিয়ে চিশতির গায়ে মমতা মাখা হাতে স্পর্শ করে বললো গুলশিরিন। "হ্যাঁ আম্মি! আমিই তোমাদের সন্তান। আমাকে আপন করে নিবে না?" গুলশিরিনকে জড়িয়ে ধরে বললো চিশতি। "হ্যাঁ রে বাবা নিবো তো!" চিশতিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছে গুলশিরিন। "আয় বাবা আমার বুকে আয়" চিশতির দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডাকছে ফুরকান। চিশতি কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। এভাবেই চিশতি ও তার বাবা-মায়ের মধ্যে পুনর্মিলন এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি দৃশ্য ফুটে উঠে। এই পুনর্মিলনের পর, চিশতি এবং তার বাবা-মা একসাথে অতীতের ভুলভ্রান্তি সংশোধন এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন পরিকল্পনা করে।