পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ০৫
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৫ · ২৮ পর্বের মধ্যে ৫
ঘন জঙ্গল উপেক্ষা করে দুরুদ ছুটে চলেছে আইদাকে খুঁজতে। ছুটতে ছুটতে দুরুদ এখন জঙ্গলের সেই সরু রাস্তার ধারে। দিক পিছ নাহ ভেবে সরু রাস্তা ধরেই হেঁটে চলেছে দুরুদ। অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর দুরুদ এসে পৌঁছেছে পরিত্যক্ত সেই পুরনো গ্রামে।
এদিকে আয়াত এখনো জটাক্ষীর সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। জটাক্ষী তার সমস্তটা দিয়ে আয়াতকে বুঝাচ্ছে এই যুদ্ধে আয়াত একা নাহ। শীতাক্ষীকে হারানোর যুদ্ধে জটাক্ষীও আয়াতের পাশে আছে। আয়াতও কিছুটা সাহস পেলো জটাক্ষীর সাহারা পেয়ে।
হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের ভিতরে প্রবেশ করলো দুরুদ। চারিদিক অন্ধকার নেই কোথাও আলোর দেখা। আরেকটু এগিয়ে যেতেই সামনে দেখা যাচ্ছে আলোর রশ্মি। সে জানে নাহ এই অন্ধকারে আলোটা আসছে কোত্থেকে। আলোর পিছু করতে করতে দুরুদ যেই নাহ যতন রাজার ঘাটের সামনে এসে পা রাখলো সাথে সাথে চারিদিক আবারও অন্ধকার হয়ে গেলো। মিলিয়ে গেলো আলোর দেখা। ঘন অন্ধকারে পুকুর ঘাটে শুধু একটা ছায়া মানব দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে সেই মানুষটার ফর্সা তুষার বর্ণের শরীরটা। দুরুদ হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে ওখানে কে দাঁড়িয়ে আছে। ধীর গতিতে সামনে এসে ছায়া মানবটার কাঁধে হাত দিয়ে আবেগের সুরে বললো "আইদা" হন্তদন্ত হয়ে নিজের কাঁধ থেকে দুরুদের হাত সরিয়ে দিয়ে আয়াত বললো "ক-কে আইদা.? আমি আইদা নাহ!! আমি আয়াত। আপনার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে।" এদিকে দুরুদ মরিয়া হয়ে আবারও বললো "আইদা! তুমি চাইলেও আমার কাছ থেকে সত্যিটা লুকাতে পারবে নাহ। আমি জানি তুমি আইদা। তুমি আমার আইদা। শুধুই আমার। আমার জন্যই তোমার জন্ম আর তোমার জন্যই আমার। গত জন্মের কথা ভুলে যেও নাহ আইদা।" দুরুদের মুখে এই কথাগুলো আয়াতে খুব পরিচিত মনে হচ্ছিল। নিজেকে আর আটকাতে নাহ পেরে আয়াত বললো "আতিশ..? এটা কি তুমি.? যদি এটা তুমি হও তাহলে তোমার আগের চোহারা কোথায়। এটা কার চেহারা।" দুরুদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই সেখানে মাফিয়া গ্যাং-এর বাকি দুই সদস্য এসে হাজির। "চুপচাপ হাত উপরে করে আমাদের সাথে চল। নয়তো একদম মাথার ঘিলু উড়িয়ে দিবো" আয়াত ও দুরুদের দিকে পিস্তল তাক করে দিয়ে বললো মাফিয়া গ্যাং-এর একজন। দুরুদ আয়াতকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে আয়াতের সামনে এসে দাঁড়ালো। যাতে ওই পিস্তল আয়াতের কোনো ক্ষতি করতে নাহ পারে। আয়াত দুরুদকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে কিছুটা অভিমানী সুরে বললো "এখন বাঁচাতে এসেছো কেনো.? যখন তোমার সাথে বাঁচতে চেয়েছিলাম তখন তোহ নিজের হাতে খুন করেছো" দুরুদ অসহায় দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে তাকিয়ে রইলো। ওদিকে মাফিয়া গ্যাং-এর লোক দুইটা পিস্তল হাতে ওদের দিকে তেড়ে আসছে। মাফিয়া গ্যাং-এর লোকদের আসতে দেখে দুরুদকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিলো আয়াত। দুরুদ কিছু বুঝার আগেই আয়াত চোখ বন্ধ করে ফেললো। আয়াতের এমন বোকার মতে কান্ড দেখে মাফিয়া গ্যাং-এর লোক দুইটা পিস্তল গুটিয়ে নিয়ে হাসতে লাগলো। আয়াতকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে তার ভিতরে জমিয়ে রাখা গত জন্মের ক্ষোভ, ঘৃণা, আর প্রতিহিংসা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আজ হঠাৎ সবকিছু মনে পরাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে নাহ আয়াত। জন্ম জন্মান্তরের হিংসা, প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের আগুনের কাছে আজ যে কাউকেই পুড়িয়ে মারবে আয়াত।
ওদিকে দুরুদও শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। আয়াতের মতো দুরুদও চোখ বন্ধ করলো। কিছুক্ষণের জন্য চারিদিক কোলাহল মুক্ত। কারো মুখে কোনো রাঁ নেই। মাফিয়া গ্যাং-এর লোক দুইটাও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো কি হতে চলেছে তা জানার জন্য। মাফিয়া গ্যাং-এর লোক দুইজন চোখের পলক ফেলতে নাহ ফেলতেই আয়াত ও দুরুদ চোখ মেলে তাকালো। জ্বলজ্বল করছে আয়াত ও দুরুদের চোখের মণি। টকটকে লাল হয়ে আগুনের শিখার মতো জ্বলছে দুরুদের চোখের মণিগুলো। আর জ্বলছে আয়াতের চোখের মণি গলে পরা আগ্নেয়গিরির মতো। নীল নয়না চোখে যখন আগুন জ্বলে তখন হয়তো এমনটাই লাগে। নীল চোখ দুইটা মুহুর্তেই আগুনের মতো হলদে-সোনালি রঙে পরিবর্তন হয়ে গেলো। আয়াত ও দুরুদের চাহনি দেখে তারা ভয় পেয়ে গেলো। কোনো সাধারণ মানুষ নিশ্চয়ই মুহুর্তের মধ্যে নিজের চোখের রঙ পাল্টাতে পারবে নাহ। হঠাৎ করে তাদের মনের মধ্যে ভয় কাজ করতে শুরু করে। কেনো ভয় কাজ করছে তারা নিজেরাও জানে নাহ। হয়তো মৃত্যু কাছে এলে সকল জীবই টের পায়। তাদের ক্ষেত্রেও একই হয়েছে। নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য দুইজন দুইজনের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কিছু একটা বলাবলি করে পিছন ঘুরে দু'জনেই পালাতে চাইলো কিন্তু আয়াত ও দুরুদের শক্তির কাছে টিকতে পারলো নাহ। লোক দু'টো নিজেদের জীবন বাঁচাতে ছুটেছিলো ঠিকই কিন্তু কিছুটা পথ যেতেই আয়াত ও দুরুদ তাদের ধরে ফেলে। ভয়ংকর চোখে তাকিয়ে আছে আয়াত ও দুরুদ। আয়াতকে দেখলেই বুঝা যাচ্ছে তার মধ্যে থাকা কোনো হিংস্র বাঘ জেগে উঠছে শিকার করতে। ওদিকে দুরুদকে দেখলে যে কেউ বুঝে যাবে তার শরীরে বইছে হায়েনার রক্ত। যে পারে শুধু মানুষের রক্ত পান করতে। রক্ত পিপাসু হায়েনা হয়ে উঠেছে দুরুদ। মাফিয়া গ্যাং-এর লোক দুইজন কিছু বুঝার আগেই আয়াত ঝাপিয়ে পরলো বাম পাশের লোকটার উপর। মুহুর্তেই দুরুদও ঝাপিয়ে পরলো ডান পাশের লোকটার উপর। শুনশান নীরবতা কেঁপে উঠলো দুইজন মানুষের আত্ম চিৎকারে।
-------------------------------
৩০ বছর আগে.........
পূর্ণিমার রাত। চারিদিক কি সুন্দর চন্দ্রজ্জ্বল। চাঁদের আলোয় আশপাশের ছোট বড় সবকিছুই যেনো মহানন্দে হাসছে। মৃদু হাওয়ায় দুলছে ফুলে ভরা গাছগাছালি। শহরের কোন এক প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে কারো সুমধুর সুরে গাওয়া এক সুরেলা কণ্ঠের গান। মাঝে মাঝেই শহরের আনাচে-কানাচেতে এমন গান শুনতে পাওয়া যায়। কে গায় কেউ জানে নাহ। তবে এই গান সবসময় শোনা যায় নাহ। যখন যখন আশেপাশের পরিবেশ শান্ত ও সুন্দর মুখর হয় তখনই এই গান শোনা যায়। আবার শোনা যায় যখন কারো মন ভাঙ্গে। গান গাওয়া লোকটা হয়তো মানুষের হৃদয় ভাঙ্গা শব্দ শুনতে পায়। কি জানি লোকটা কে.? কি তার পরিচয়.?
আত্মরক্ষার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছে আস্থা। জঙ্গলের ভিতরে পূর্নিমার আলোয় সবকিছু স্পষ্ট দেখা নাহ গেলেও এতটুকু ঠিকই দেখতে পাচ্ছে চারিদিকে বিশাল লম্বা লম্বা গাছ আর আশেপাশে জন্তুজানোয়ারের খাপ্পা ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু এই জঙ্গলে জন্তুজানোয়ারের ভয় কম আস্থার পিছনে যে পরে আছে তার ভয় বেশি। কোনো নাহ কোনো উপায়ে জন্তুজানোয়ারের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিলেও আস্থার পিছনে যে অর্ধ মানব পরে আছে তার হাত থেকে কিভাবে বাঁচবে আস্থা। নিজেকে বাঁচানোর জন্য পালাতে থাকে আস্থা। দৌড়াতে দৌড়াতে এক পর্যায়ে গাছের শিকরের সাথে হোঁচট খেয়ে পরে গেলো আস্থা। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে সামনেই সেই লোক দাঁড়িয়ে আছে যার কাছ থেকে এতক্ষণ ধরে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে আস্থা। পূর্ণিমার আলোয় স্পষ্ট চেহারা দেখা নাহ গেলেও লোকটার ফর্সা গায়ের রঙ একদম খাপ খাইয়ে নিয়েছে এই চাঁদনী রাতের সাথে। এত পালিয়েও শেষমেশ ধরা পরেই গেলো আস্থা। তাহলে কি আর শেষ রক্ষা হবে নাহ.? হাতে ভর দিয়ে পা দিয়ে মাটি ঠেলে ঠেলে পিছনে পালানোর চেষ্টা করছে আস্থা। আস্থা কিছু করার আগেই লোকটা বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে আস্থার দিকে তাকালো। অবাক দৃষ্টিতে আস্থা লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলো। মুহুর্তেই লোকটার চোখের রঙ পাল্টে লাল হয়ে গেলো। শরীর থেকে যেনো অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে। চোখ দিয়ে যেনো টকটকে লাল রক্ত ঝড়ছে। মুহুর্তেই একজন সাধারণ মানুষের এরূপ দেখে আস্থা ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো "আমাকে ছেড়ে দাও! আমি কি ক্ষতি করেছি তোমার.? ভালোই তোহ বেসেছিলাম তোমাকে তার প্রতিদান এভাবে দিবে। আমি৷ জানি এই শহরে যতগুলো মেয়ে মারা গেছে সবাইকে তুমিই খুন করেছো।"লোকটা কিছু নাহ বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বজোরে এক চিৎকার দিলো। এ চিৎকার কোনো সাধারণ মানুষের নাহ। শুনেই মনে হচ্ছে কোনো ক্ষুধার্ত হায়েনার চিৎকার। কোনো হায়েনা যখন শিকার করতে করতে হিংস্র হয়ে উঠে তখন ঠিক এভাবেই চিৎকার দেয়। শেষ বারের মতো নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলো আস্থা। হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়াতে গিয়েও ভয়ে পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে লোকটা ওর দিকে টকটকে লাল বর্ণের চোখ নিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে। মুখের দুই পাশে বড় বড় দুইটা দাঁত। আস্থার বুঝতে বাকি রইলো নাহ এই লোকই এতদিন সকল মেয়েদের শরীর থেকে রক্ত চুষে খেয়েছে। আর আজ তার পালা। সে চাইলেও পালাতে পারবে নাহ। এতক্ষণ সে মিথ্যে চেষ্টা করেছে। লোকটা আবারও বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে আস্থার দিকে তাকালো। আস্থা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো " আমাকে মেরো নাহ, প্লিজ। আমি বাঁচতে চাই। আমি তোমার সাথে বাঁচতে চাই। আচ্ছা আমাকে ভালোবাসতে হবে নাহ। কিন্তু প্লিজ আমাকে মেরো নাহ। আ-আমি কাউকে বলবো নাহ যে তুমিই এসব করেছো। আ-আমি এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। কাউকে কিচ্ছু বলবো নাহ। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও, প্লিজ!" চারিদিক একদম নিস্তব্ধ। হয়তো আস্থার কান্নায় লোকটার মায়া হয়েছে। হঠাৎ লোকটা আকাশের দিকে তাকিয়ে এক ভয়ংকর হুংকার দিয়ে টকটকে লাল চোখ আর বড় বড় দাঁত দেখিয়ে আস্ততাকে এটাই বুঝাতে চাইছে আজ তোর জীবনের শেষ দিন। তার মানে আস্থার এই করুন কান্নার শব্দে মন গললো নাহ লোকটার। আস্থা বার বার হাত জোড় করে নিজের জীবন ভিক্ষা চাইছে কিন্তু এই মুহুর্তে লোকটার কানে কারো কান্নার শব্দ পৌঁছাচ্ছে নাহ। এক ক্ষুদার্ত হায়েনার মতো হাঁক তুলছে লোকটা।লোকটা আবারও ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধেয়ে আসতে থাকে আস্থার দিকে। আশেপাশের পরিস্থিতি বোঝার আগেই লোকটা ঝাপিয়ে পরলো আস্থার উপর। আত্মরক্ষার এক ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো আস্থা। আস্থার ঘাড় থেকে মুখ তুলে নিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা রক্ত মুছলো লোকটা।