পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ১২

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ১২ · ২৮ পর্বের মধ্যে ১২

সময়টা যেনো ঘটা করে তৈরি হয়েছে ভালোবাসার মানুষদের এক করার জন্যই। ফুরফুরে বাতাস, বাতাসের সাথে ভেসে আসছে হাজারো ফুলের সুভাষ। নদীর টালমাটাল শব্দ উতলা করে দেয় সবার মনকে। পরিবেশটা আরো মাধুর্য লাগছে তার কারণ আকাশে আজ পূর্ণিমার চাঁদটাও আছে। আশেপাশে খেলা করছে জোনাকির দল। খেলা করছে আকাশ, খেলা করছে পবন আর খেলছে রাতের ঠান্ডা আবহাওয়া। প্রায় ১০০ বছর পর মানুষ রূপে পৃথিবীর মাটিতে পা রাখলো মিরান আর সঙ্খিনী। ১০০ বছর নাগলোক শাসন করার পর তাদের সৌভাগ্য হয়েছে মর্তলোক ভ্রমণ করার। মিরানের মর্তলোকে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো তার পিতা মাতার সাথে সাক্ষাৎ করা। মহারাজ যতন এবং মহারানী যৌথার একমাত্র সন্তান হচ্ছে মিরান। যার জন্ম হয় নাগমণির শক্তি দ্বারা। যার জন্মের উদ্দেশ্য ছিলো নাগমণি এবং নাগলোকের সুরক্ষা করা। আজ সেই শক্তি প্রথম বারের মতো মর্তলোকের সাথে সম্পৃক্ত হলো। তার অনুভূতি আকাশ সমান। পিতা মাতাকে দেখার অগাধ ইচ্ছে তার মধ্যে। কিন্তু সে তোহ আর জানে নাহ, মানুষদের জীবন নাগ নাগিনদের মতো নাহ। তাই মিরানের জানা ছিলো নাহ তার পিতা মাতা বহু বছর আগেই মারা গেছে এবং তাদের রাজপ্রাসাদ এখন আর আগের মতো সচল নেই। সেই প্রাসাদ হয়ে গেছে এখন বন্ধ। আশেপাশের জমি চলে গেছে দুষ্কৃতিদের দখলে। মিরান এবং সঙ্খিনী দুজনই পরিবেশটাকে মন দিয়ে অনুভব করছে। দুজন দুজনের হাতে হাত রেখে জোরা পায়ে তালে তাল মিলিয়ে এগিয়ে আসছে যতন রাজার প্রাসাদের দিকে। প্রাসাদের সামনে এসে যা দেখলো তার জন্য ওরা মোটেও প্রস্তুত ছিলো নাহ। রাজপ্রাসাদ এখন পরিত্যক্ত এক ভিলা। নেই কোনো লোকজন নেই আলো। আছে শুধু নিস্তব্ধতা আর রাতের কলকাকলি। মুহুর্তেই মিরানের হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে যেতে শুরু করে। চোখ টলমল করছে। চাপা কষ্ট পুষে নিয়ে সঙ্খিনীর হাত ছেড়ে দিয়ে প্রাসাদের দিকে এক পা এগোয় মিরন। মনোমুগ্ধকর হয়ে নিষ্পলক ভাবে তাকিয়ে দেখতে থাকে প্রাসাদটাকে। এই প্রাসাদেই তার জন্ম, এই প্রাসাদেই তার বেড়ে উঠা আর আজ এই প্রাসাদটা যেনো থেমে যাওয়া ঘড়ির মতো থেমে গেছে। নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে মিরানের। ডান হাতের উল্টো পাশ দিয়ে চোখ মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মিরান। হঠাৎ বেশ ভারি কিছু দিয়ে পিছন থেকে মিরানের মাথায় আঘাত করে। সাথে সাথে মাথায় হাত দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পরলো মিরান। হাতটা সামনে নিয়ে দেখে মাথা ফেটে গেছে। দরদর করে রক্ত পরছে। কে আঘাত করেছে দেখার জন্য উঠে দাঁড়ালো মিরান। পিছনে তাকানোর পর পরই আবারও কেউ ওর মাথায় আঘাত করে বসে। মুখ থেকে রক্ত ছিটকে পরে। মুখ থুবড়ে গিয়ে পরলো মিরান। মাথার যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে মিরান। মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে দেখে দুই জন লোক তার মাথায় আঘাত করেছে। মিরানকে ছটফট করতে দেখে লোক দুইটা প্রচন্ড আনন্দিত। খুশিতে আত্মহারা তারা। দেখে মনে হচ্ছে আজকের দিনটার জন্যই তারা অপেক্ষা করে ছিলো। "রমজান! ওকে হত্যা করে যেভাবেই হোক নাগমণি আমাদের হাসিল করতেই হবে।" খিটখিট করে হেসে প্রথম লোকটি দ্বিতীয় লোকটির নাম ধরে বললো। "হ্যাঁ! আজ যেহেতু সুযোগ পেয়েই গেছি কিছুতেই এটা হাত ছাড়া করা চলবে নাহ। তবে ভাই আমজাদ , আমাদের যে ডেকে আনলো সে কোথায়? তাকেই তোহ দেখছি নাহ?" আমজাদের উদ্দেশ্যে বললো রমজান

"এইইইইই!!!!" রমজান আর আমজাদের কথপোকথনের মাঝখানে সেখানে সঙ্খিনী চলে আসে। সঙ্খিনীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে মিরান কিছুটা সাহস খুঁজে পেলো। শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে৷ এক হাতে মাথা চেপে ধরে অন্য হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। খুড়াতে খুড়াতে রমজান আর সামনে দিয়েই ছুটে এসে সঙ্খিনীকে জড়িয়ে ধরলো মিরান। "সঙ্খিনী! কোথায় হারিয়ে গেছিলে তুমি! এই খারাপ লোকগুলো আমাদের হত্যা করে নাগমণি হাসিল করতে চাইছে। এই দেখো আমার কি হাল করেছে, আমি তোমাকে নিয়ে ভয়ে ছিলাম ভেবেছিলাম তোমার নাহ কিছু হয়ে........" মিরানের কথা শেষ হওয়ার আগেই সঙ্খিনী মিরানের পেটে ছুড়ির আঘাত করে। "হু!! আহ! সঙ্খিনী!! তুমিইই??" ছটফট করতে করতে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো মিরান। "হ্যাঁ আমি!! আমিও ওদেরই একজন। তুমি চাইলেও এখন কিছুই করতে পারবে নাহ, কারণ কি জানো?? কারণ হলো এই ছুড়ির মধ্যে ধুতুরাফুলের মিশ্রণ লাগানো। তুমি তোহ জানোই, ধুতুরাফুল আমাদের নাগ নাগিনদের জন্য কতটা বিষাক্ত। আমাদের বিষকেও হার মানায় এই বিষ। হ্যাঁ!! আমিই ওদের এখানে এনেই তোমাকে হত্যা করে নাগমণি হাসিল করার জন্য। বিগত ১০০ বছর ধরে এই দিনটার জন্যই তোহ আমি অপেক্ষা করছিলাম। কবে তোমাকে চিরতরে শেষ করে ওই নাগমণি আমার করবো। খুব গর্ব ছিলো নাহ তোমার এই নাগমণি আর তোমার নাগশক্তি নিয়ে। কোথায় গেলো তোমার নাগমণি আর নাগশক্তি?? আজ তুমি মারা যাচ্ছো বাঁচাবে নাহ তোমাকে?? হা!হা!হা!" মিরানের উদ্দেশ্যে এসব বলে অট্টহাসিতে মেতে উঠলো সঙ্খিনী তার সাথে রমজান আর। "সঙ্খিনী! ভুল করলে তুমি। একদিন পস্তাতে হবে তোমাকে। তোমাদের সবাইকে। এই চাঁদনী রাত, এই যতন রাজার প্রাসাদ আর যতন রাজার ঘাট সাক্ষী থাকবে তোমাদের অন্যায়ের। সঙ্খিনী, আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি, আজ থেকে তোমার এই নাগিন শক্তি আর এই রূপ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তোমার থেকে। যে শক্তির লোভে তোমরা এমন জঘন্যতম অন্যায়ে লিপ্ত হলে সেই শক্তি তোমরা কোনোদিন পাবে নাহ। আমি মারা যাওয়ার সাথে সাথে এই শক্তি কোথায় হারিয়ে যাবে তোমরা কেউই জানবে নাহ। সঙ্খিনী! তুমি সেদিনই তোমার শক্তি ফিরে পাবে যেদিন আমার এই শক্তি পূনরায় ফিরবে। আর বিনাশ করবে তোমাদের মতো সয়তানকে।" পেট থেকে এক টানে ছুড়ি বের করে কাতরাতে কাতরাতে বললো মিরান। "হা!হা!হা! নাগমণি যখন পাবোই নাহ তাহলে তোরও বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় নাহ।" এই বলে সঙ্খিনী, রমজান আর৷ আমজাদ মিলে মিরানকে হত্যা করে ফেলে। মিরান শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার সাথে সাথে কিছু একটা আলোর রশ্মি মিরানের নাভি থেকে বিদ্যুতের গতিতে বেরিয়ে কোথাও উধাও হয় যায়। সাথে মিরানের লাশটাও। কিছুদিন পর ওই গ্রামে সাপের উৎপাত বাড়তে শুরু করে। দোষী, নির্দোষ নির্বিশেষে সকলেই প্রাণ হারায় নাগ নাগিনের ছোবলে। মাঝরাতে সেই গ্রামে বিনা কারণেই আগুন লেগে মারা গেলো শত শত গ্রামবাসী। অন্য দিকে যতন রাজার প্রাসাদের কোনো এক কোনে কালো কাপড়ে নিজের মুখ লুকিয়ে কান্না করতে থাকে সঙ্খিনী।

-----------------------

পুরো বাড়ি সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। বাসায় আজকে পাত্রপক্ষ আসবে আইদার বিয়ের কথা বলতে। এজন্য চিশতি আর অলিভিয়া মিলে ডাইনিং টেবিল সাজাচ্ছে। টেবিল গোছাতে গোছাতে চিশতি অলিভিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো "জানো অলি! আইদাকে নিয়ে আমার একটাই টেনশন ও দেখতে যে একদম চন্দ্রাবতীর মতো। আমার প্রতিশোধ এখনো শেষ হয়নি। ৩০ বছর আগে ১০ জন কালোজাদুকরদের মধ্যে আমি ৮জনকে শাস্তি দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। বাকি ২জনকে আমার ফ্যামিলির জন্য শাস্তি দিতে পারিনি। আর আজ দেখো আমার ফ্যামিলি আমার সাথে কি করেছে?? আমাকে একদম নিঃশ্ব করে দিয়েছে। ভয় শুধু একটাই, বাকি ২ কালোজাদুকর যদি কোনো ভাবে আইদার হদিশ পেয়ে যায় বা কোনো ভাবে ওর কোনো ক্ষতি করে তখন আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো নাহ অলিভিয়া।" অলিভিয়া এতক্ষণ মনোযোগ সহকারে চিশতির বলা সব কথা শুনে প্রাণ ভরে একটা শ্বাস নিয়ে বললো "তুমি এসব মিয়ে ভাবো বলেই তোমার মধ্যে ভয়টা কাজ করে। তুমি টেনশন করো নাহ, আমাদের মেয়ে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। তাছাড়া তোমার মধ্যে ওই শক্তি তোহ এখন আর নেই। তাহলে এত কিসের ভয়? আর ৩০ বছরের সেই শত্রুরা কি আদৌও বেঁচে আছে কি জানি?? তুমি ওসব বাদ দাও, উৎস আর ওর মা আসবে একটু পর তুমি সেসব নিয়ে ভাবো।"

কিছুক্ষণের মধ্যেই উৎস আর উৎসের মা চলে আসে চিশতির বাসায়। সবাই একসাথে খাবার শেষ করে উৎস আর আইদার বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করছে। আলোচনা শেষে ফাইনাল হলো ২১ তারিখে রাতেই উৎস আর আইদার বিয়ে হবে।

-------------------------

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো সবে। মধ্য আকাশের সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। শান্ত পরিবেশে দুরন্ত মন নিয়ে আজরাফের কথা মতো অফিসে ছুটে এসেছে আইদা। এদিকে অনেকক্ষণ ধরে আতিশকে কফি খাওয়ানোর নাম করে বসিয়ে রেখেছে আজরাফ। "আরে আজরাফ ভাই বলবে তোহ কি জন্য বসিয়ে রেখেছো?? কফি খাওয়া তোহ সেই কখন শেষ এখন তোহ যেতে দিবে??" বিরক্তি সুরে বললো আতিশ। "আরে! ভাই! থাকো নাহ। একটা৷ জরুরি দরকারে তোমাকে এখানে বসিয়ে রেখেছি। কাজটা হয়ে গেলে তোমাকে আমার একটা ফেভার করতে হবে।" বললো আজরাফ। "ফেভার?? কিসের ফেভার?? আমি কোনো ফেভার ঠেভার করতে পারবো নাহ!!" দুই হাত উপরে তুলে হাল ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো আতিশ। সাথে সাথে সেখানে আইদা এসে হাজির। "কই আজরাফ ভাই?? আপনি নাহ বলেছেন কম্পিটিশনের জন্য মডেল ম্যানেজ হয়ে গেছে?? কোথায় সেই মডেল??" আজরাফকে প্রশ্ন করলো আইদা। "তার মানে এটাই ছিলো ফেভার??" আজরাফের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো আতিশ। আজরাফ আতিশকে চোখের ইশারায় বললো "হ্যাঁ, যেভাবেই হোক আতিশ যেনো এটা হ্যান্ডেল করে।" আতিশ ঝেড়ে কেশে বললো "এক্সকিউজ মী ম্যাডাম! আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে? আমি কি কোনো মডেল নই??" "ওহ্! হ্যালো!! আমি কোনো সার্কাসে জোকার দেখতে আসিনি। আজরাফ ভাই আমাকে যে কল করে ডেকে আনলেন মডেলের কথা বলে সে কোথায়?? দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার, উনাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলুন।" বললো আইদা। "আআআ! অ্যাকচুয়ালি আইদা, আমি আতিশকেই তোমার কম্পিটিশনের মডেল বানাতে চাইছিলাম।" আমতা আমতা করে বললো আজরাফ। "হোয়াট?? এই লোকটা হবে আমার কম্পিটিশনের মডেল?? ভাই, আপনি রেম্পওয়াল্ক করতে পারবেন? পারবে নাহ!! পারবে নাহ!! উনার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। এসব মানুষ দিয়ে রেম্পওয়াল্ক সম্ভব নাহ।" আড়দৃষ্টিতে আতিশের দিতে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বললো আইদা। "চ্যালেঞ্জ করছো??" বললো আতিশ। "হ্যাঁ! করলাম চ্যালেঞ্জ। পারলে করে দেখান।" জোর গলায় বললো আইদা। "যদি জিতে যাই তাহলে কি দিবে??" মুচকি হেসে বললো আতিশ। "যা যাইবে।" কনফিডিয়ান্টলি বললো আইদা। "বুঝে নিও। যা খুশি চাইতে পারি কিন্তু। আর এটাও মাথায় রেখো, আতিশ কখনো হারতে শিখেনি আর হারবেও নাহ। কথা দিলাম ফার্স্ট প্রাইজ তোমারই হবে।" পকেট থেকে কালো চশমাটা বের করে চোখে দিয়ে বললো আতিশ। "হয়েছে জনাব! খালি মুখে নাহ করেও দেখাতে হবে।" খোঁচা দিয়ে বললো আইদা। "হয়েছে! হয়েছে! এবার থামো তোমরা। চলো কলেজে যাওয়া যাক এমনিতেই আইদার লেইট হয়ে গেছে।" বললো আজরাফ।