পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ১৮

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ১৮ · ২৮ পর্বের মধ্যে ১৮

ঠিক দুপুর ১২টা। বাসার সবাই গোসল করে রেডি হয়েছে পাশের বাসায় দাওয়াতে যাবে। কুরেশি বাড়ির সবাই রেডি হলেও চিশতি এখনো রেডি হয়নি। তার মুখে শুধু একটাই কথা "আম্মি! আম্মি! আম্মি আমার নূরীকে এনে দাও নাহ। আম্মি তুমি তোহ জানো আমি নূরীকে কতটা ভালোবাসি। আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো নাহ। তোমরা কেউ কিছু করো নাহ! আমার নূরীকে ফিরিনে এনে দিচ্ছো নাহ কেনো তোমরা।" এমন পাগলামি করছে আর বাচ্চাদের মতো কান্না করছে। কোনো কিছুতেই তার আর আগের মতো আগ্রহ নেই। চারিদিকে শুধু পাগলের মতো নূরীকে খুঁজতে থাকে। নাওয়া খাওয়া দিকে কোনো খেয়াল থাকে নাহ, একা একাই বিড়বিড় করতে থাক। আবার একা একাই কান্না করে। এক কথায় নূূরীকে হারানোর কষ্টটা মেনে নিতে পারেনি চিশতি। নূূরী চলে যাওয়া এতগুলো দিন হয়ে গেলো তারপরও সে নূরীর পথ চেয়ে থাকে। দিন দিন তার পাগলামি বেড়েই চলেছে। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এত সুন্দর রূপের অধিকারী মানুষটার অবস্থা কি হয়েছে নিজের চোখে নাহ দেখলে কেউই বিশ্বাস করবে নাহ। কথায় আছে নাহ, প্রেমের মরা জলে ডোবে নাহ! হয়তো চিশতির বেলায়ও তাই হয়েছে। নাকী এর পিছনেও রয়েছে কারো ষড়যন্ত্র। বাকিরা সবাই যে যার মতো দাওয়াতে চলে গেলেও আমিনা বিবির কিছুতেই মন টানছে নাহ সেদিকে। তার কেবো মনে হচ্ছে আজ যদি সে এখান থেকে যায় কিছু নাহ কিছু অনর্থ ঠিকই ঘটতে পারে। কিন্তু চিশতি জোর করে আমিনা বিবিকে দাওয়াতে পাঠায় এই বলে "আম্মি তুমি যাও! আমি! আমি! আমি একটু একা থাকতে চাই। তোমরা সবসময় আমাকে পাহাড়া দিয়ে রাখো, আমার অনেক বিরক্ত লাগে। বলো তোহ আম্মি আমি কি পাগল যে আমাকে এভাবে কড়া পাহাড়ায় রাখতে হবে" এই কথাগুলো বাচ্চাদের মতো করে বলেই আমিনা বিবিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয় চিশতি। আমিনা বিবিও চিশতিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়। এরপর ছেলের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য তাকে একা বাড়িতে রেখে দাওয়াতে চলে যায়। যাদের বাসায় দাওয়াতে যাবে তাদের বাসা বেশি দূরে নাহ। কুরেশি ভিলা থেকে ৫মিনিটের রাস্তা। আমিনা বিবিকে পাঠিয়ে দিয়ে এক গাল সয়তানি হাসি দিয়ে চোখের পানি মুছলো চিশতি। কুকুরের মতো হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে জিহ্বা গলা অব্দি করে কিসের যেনো গন্ধ শুঁকতে আরম্ভ করে চিশতি। চার হাত পা কুকুরের মতো করে চলতে থাকে চিশতি। এভাবে চলতে চলতে একটা গাছের সামনে গিয়ে থামে। সয়তানি হাসি দিয়ে গাছের উপরে তাকায়। একটা মোটা দড়ি ঝুলছে গাছের ডালে। হাত পা মটমট করে শরীরের পিছনে নিয়ে গেলো চিশতি। উল্টো হয়ে গাছে পিঠ ঠেকিয়ে পিঠ দিয়ে গাছে চড়ে গেলো। এই কাজগুলো চিশতির পক্ষে করা একদমই অসম্ভব। কিন্তু চিশতিই করছে এই কাজগুলো। গাছের ডাল থেকে দড়ি নামিয়ে আনলো চিশতি। দড়িটা কামড়ে ধরে কুকুরের মতো চলতে চলতে রুমের ভিতরে চলে গেলো। রুমের ভিতরে যাওয়ার সাথে সাথে স্বাভাবিক মানুষের মতো দড়িটা হাতে নিয়ে রুমের এক কিনারা থেকে টুল নিয়ে খাটের উপর উঠে গেলো। টুলটা সুন্দর করে খাটের উপর বসিয়ে তার উপর চড়ে দাঁড়ালো চিশতি। এরপর দড়িটা সিলিংফ্যানে বাঁধে। সিলিংফ্যানে বাঁধা শেষ হলে দড়ির বিপরীত অংশটুকু নিজের গলায় বাঁধে। দূর থেকে সেই পঁচা গলা অবয়বটা হাসছে আর হাত তালি দিচ্ছে। গম্ভীর কণ্ঠে হাসতে হাসতে বলে "ফেলে দে! টুলটা ফেলে দে! তারপর তোকে আমার সাথে করে তোর নূরীর কাছে নিয়ে যাবো। ফেলে দে! হা!হা!হা! ফেলে দে! দেরি করিস নাহ" গলায় দড়ি বাঁধা শেষ হলে এক সয়তানি হাসি দিয়ে অবয়বটার দিকে তাকিয়ে পায়ের নিচ থেকে টুলটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। নিচতলা থেকে সেই সাদা বিড়ালটা দৌঁড়ে আসছে। বিড়ালটা দৌঁড়ে চিশতির রুমে গিয়ে দেখে চিশতি ফ্যানের সাথে ঝুলছে। বিড়ালটাও সাথে সাথে এক লাফে চিশতির উপর ঝাপিয়ে পরলো। চিশতির উপর ঝাপ দেওয়ার সাথে সাথে বিড়ালটা উধাও হয়ে যায়। দাওয়াত শেষ করে ছেলের জন্য খাবার নিয়ে বাড়িতে ফিরলেন আমিনা বিবি। বাড়ির গেইটে তালা দিয়ে গেছে যাতে চিশতি বাসা থেকে কোথায় যেতে নাহ পারে। গেইটের তালা খুলে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠছেন আমিনা বিবি। দোতলায় উঠে ছেলের রুমের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিলেন। কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সারা শব্দ পাচ্ছেন নাহ আমিনা বিবি। মনে কু ডাকতে থাকে আমিনা বিবির। কি নাহ কি হয়েছে ভিতরে কে জানে। আলতো করে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়। দরজা খোলার পর যে দৃশ্য চোখের সামনে ভাসলো তা দেখার পর আমিনা বিবির পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো। "আল্লাহ গোহহহহহহ! আমার এ-কি সর্বনাশ হলো" ভাতের থালা হাত থেকে ফেলে দিয়ে দুই হাতে মাথা থাবড়াতে থাবড়াতে মাটিতে বসে কান্নায় লুটিয়ে পরলো আমিনা বিবি। আমিনা বিবির চিৎকার শুনে সবাই দৌঁড়ে দোতলায় এসে দেখে চিশতির নিথর দেহ ফ্যানের সাথে দুলছে। এই দৃশ্য দেখে বাসায় কান্নার রোল পরে গেলো। সবার হাতে পায়ে কাঁপুনি উঠে গেছে কি থেকে কি হয়ে গেলো। মহল্লার লোকেরা কান্নার শব্দ পেয়ে ছুটে আসে কুরেশি ভিলায়। ছুটে আসে দাওয়াতে আসা লোকজনেরাও। সবাই এসে দেখে কুরেশি ভিলার সকল লোকেরাই হা-হুতাশ করছে কিন্তু কেউই চিশতির দেহটা নামাচ্ছে নাহ। মহল্লার কিছু সাহসী ছেলেপেলে এসে দড়ি কেটে ফ্যান থেকে চিশতির নিথর দেহটা নামায়। বেঁচে আছে নাহ মারা গেছে এখনো বুঝা যাচ্ছে নাহ। হয়তো মারা গেছে। নিঃশ্বাস তোহ পরছে নাহ। এই মুহুর্তে কারো মাথা কাজ করছে নাহ্। কিভাবে সবাইকে জানাবে চিশতি মারা গেছে। মনকে শান্তনা দিয়ে মহল্লার লোকেরাই গাড়িডেকে এনে চিশতির লাশ গাড়ি তুলে নিয়ে হসপিটালে নিয়ে গেলো।

-----------------------

সিলিংফ্যানে ঝুলে আছে চিশতি। বাঁচার জন্য ছটফট করছে। হাত দুইটা যেনো অবশ হয়ে আসছে। সারা শরীর নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে সমানে ফেনা বের হতে লাগলো। "এ কি করলে চিশতি? সয়তানের ধোঁকায় পরে নিজের মূল্যবান জীবনটা শেষ করে দিচ্ছো!" বিড়ালটা মুহুর্তেই এক সুন্দরী মেয়ের রূপ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে চিশতির উদ্দেশ্যে বললো । মেয়েটার ফর্সা গায়ের রঙ থেকে যেনো চকচকে আলো বের হচ্ছে। চারিদিক আলোকিত হয়ে গেছে তার রূপের আলোয়। চিশতি যে এত ফর্সা তাও যেনো এই মেয়ের উজ্জ্বলতার কাছে তার শরীরের ফর্সা ত্বক ফিকে। লম্বা গোলাপি গাউন পড়নে, মাথার উপরে ভাসমান তারার মুকুট। গোল চেহারার অধিকারী, গোলাপের পাপড়ির মতো গোলাপি তার ঠোঁটের রঙ। হরিণী চোখগুলোতে যেনো লেপ্টে আছে উষ্ণ মায়ার ছাপ। সবুজ নয়না চোখে চিশতিকে নিয়ে চিন্তা করার মুহুর্তটা ছিলো এক অপার সৌন্দর্যময় দৃশ্য। তার চাহনি, তার অঙ্গিভঙ্গি যে কারো মন জয় করে নিতে পারে এক মুহুর্তেই। মেয়েটার কণ্ঠস্বর মনে হয় চিশতির কান অব্দি পৌঁছে ছিলো। কাতরাতে কাতরাতে মেয়েটার দিকে তাকায় চিশতি। কিন্তু কিছুই বলতে পারে নাহ। "আ-আমার হাতটা ধরো চিশতি! আমার হাতটা ধরো আর টু-টুলটা উঠাও। তুমি পারবে। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে। সয়তানকে হারিয়ে দাও চিশতি। সয়তানকে জিততে দিও নাহ। তোমার৷ যে এখনো অনেক কাজ বাকি। এভাবে হেরে যেও নাহ চিশতি। তোমাকে জিততে হবে। আ-আমার হাতটা ধরো" চিশতির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো মেয়েটা। নিঃশক্তি শরীরে একটুও বল পাচ্ছে নাহ চিশতি। কিভাবে হাতটা ধরবে চিশতি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে চিশতির। "চিশতি! চিশতি! আমার দিকে দেখো। চোখ বন্ধ করবে নাহ একদম। নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রাখো। তুমি পারবে। আমার হাতটা ধরো। আমার হাতটা ধরো চিশতি, চিশতি আমার হাতটা ধরো" কান্না করতে করতে বলছে মেয়েটা। এবার চিশতি নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রেখে শরীরে শক্তি সঞ্চার করার চেষ্টা করে। অনেক করে চেষ্টা করছে যাতে সে চোখ বন্ধ নাহ করে। জীবনকে উপভোগ করার জন্য দ্বিতীয় বার তাকে লড়াই করতে হবে। মনোবল শক্ত করে আলতো করে হাতটা এগিয়ে দেয় সেই মেয়েটার দিকে। অল্প স্পর্শ লাগতেই মেয়েটা শক্ত করে চিশতির হাত ধরে। মেয়েটা চিশতির হাত ধরায় যেনো চিশতি নতুন করে শক্তি ফিরো পেলো। পা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া টুলটা খুঁজতে থাকে। ভাগ্যক্রমে টুলটা খাটের উপরেই পরেছিলো এজন্য পা দিয়ে তুলতে সুবিধা হয়েছে। তাড়াতাড়ি করে পা দিয়ে টুলটা তুলে সেটার উপর পা দু'টো ভার দিয়ে গলার ফাঁস খুলে। ফাঁস খোলার সাথে সাথে চিশতি যেনো এক নতুন জগতে চলে গেলো, সাথে সেই মেয়েটি। এক বিশাল ফুলের বাগান। চারিদিকে কি সুন্দর সুঘ্রাণ। মুহুর্তেই মন চাঙ্গা হয়ে গেলো চিশতির। মনে হতে লাগলো এক নতুন জগতে নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছে সে। এখনো চিশতি আর ওই মেয়েটা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রয়েছে। এটা লক্ষ করতেই চিশতি হাত ছেড়ে দিয়ে ঢোক গিলে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। "দেখেছো, জীবন কত সুন্দর। আর তুমি কি-না সয়তানের ধোঁকায় পড়ে এত সুন্দর জীবনটাকে শেষ করতে যাচ্ছিলে। এমন ভুল আর কখনো করবে নাহ। আজ যদি আমি সময় মতো নাহ পৌঁছাতাম কি হতো ভাবতে পারছো।" চিশতিকে শাসন করতে করতে বললো মেয়েটা। "আপনাকে তোহ....." চিশতিকে থামিয়ে দিয়ে মেয়েটা বললো "আমাকে চিনতে পারছো নাহ তাই তোহ? মনে আছে বেশ কিছুদিন আগে তুমি নূরীর জন্য ফুচকা আর ঝালমুড়ি আনার জন্য রাত ১২টা নাগাদ বের হয়েছিলে?" চিশতি অবাক চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে "হ্যাঁ! এই দিনটা কি আর ভোলার মতো।কিন্তু....?" আবারও চিশতিকে থামিয়ে দিয়ে মেয়েটা বললো "কিন্তু আমি জানলাম কিভাবে তাই তোহ?" জিজ্ঞাসা ভঙ্গিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো চিশতি।

---------

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। মহল্লাবাসী এখনো ঘুমায়নি। দিন দিন জায়গাটা জমজমাট হয়ে যাচ্ছে। আগে রাত ৮টার পর পুরো মহল্লা শুনশান হয়ে যেতো আর এখন রাত ১টা আর ২টা নেই যার যখন দরকার তখনই বাইরে বের হতে পারে এবং নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারে। রাত সাড়ে এগারোটা বাজে চিশতির ইচ্ছা হলো নূরীকে তার পছন্দের ফুচকা আর ঝালমুড়ি খাওয়াবে। চিশতি প্রতিদিনই মহল্লার শাহাদাত ভাইয়ের দোকান থেকে ফুচকা আর ঝালমুড়ি খায়। আজকে নূরীর কাছে সেই গল্পই করছিলো। এক কথায় দুই কথায় চিশতি বলে উঠলো নূরীকেও সেই দোকানের ফুচকা আর ঝালমুড়ি খাওয়াবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে সেই দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা হয় চিশতি। এত রাতেও শাহাদাত ভাইয়ের দোকান খোলা পেয়ে চিশতির খুশি দেখে কে। চিশতিকে এত রাতে দোকানে দেখে শাহাদাত প্রশ্ন করলো "কি ব্যাপার রাজাকার মশাই, এত রাতে গরীবের দোকানে" চিশতি মৃদু হেসে জবাব দিলো "শাহাদাত ভাই! রাজাকার নামটা নাহ বললে কি হয়? পাকিস্তানে জন্ম হয়েছে বলে কি আমি বাঙালী নই?" হাতের কাজ করতে করতে এক গাল হেসে শাহাদাত আবারও বললো "তুমি আমাদের একমাত্র ছোট ভাই তোমার সাথে মজা করবো নাহ তোহ কার সাথে করবো বলো তোহ। যাগগে তোমার যদি খারাপ লাগে তাহলে আর বলবো নাহ। বিদেশি ভাই বললে তোহ আর রাগ করবে নাহ নাকী?" চিশতি খক করে হেসে দিয়ে বললো "নাহ! নাহ! রাগ করবো কেনো। আপনাদের যেভাবে খুশি সেভাবে ডাকবেন। যাই ভাই শুনুন, জলদি জলদি ফুচকা আর ঝালমুড়ি প্যাকেট করে দিন বাসায় নিয়ে যাবো।" শাহাদাত এক প্লেট ঝালমুড়ি চিশতির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো "আগে এটা শেষ করো। বাড়ির জন্য বানাচ্ছি।" চিশতিও খুশি মনে প্লেটটা হাতে নিয়ে মুড়ি খেতে খেতে বললো "ভাই! আপনার হাতে সত্যি জাদু আছে। এত সুস্বাদু ঝালমুড়ি আমি আগে কখনো খাইনি। বাংলাদেশে নাহ আসলে এটা মিস করতাম। হা!হা!হা!" পার্সেল প্যাক করতে করতে শাহাদাত বললো "কি জানি, সবাই বলে আমার হাতের ঝালমুড়ি আর ফুচকা নাকী অনেক সুস্বাদু কিন্তু তোমার ভাবি একদমই পছন্দ করে নাহ" চিশতি আবারও খক করে হেসে দিয়ে বললো "সমস্যা নাই ভাইয়া, আপনি ভাবিকে তার পছন্দের খাবার খাওয়াবেন তাহলেই তোহ হলো" কথা বলতে বলতে চিশতির খাওয়াও শেষ ওদিকে শাহাদাতের পার্সেল প্যাক করাও শেষ। বিল পরিশোধ করে পার্সেল হাতে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে এগোতে লাগলো চিশতি। শাহাদাতের দোকান থেকে চিশতির বাসায় যাওয়ার আগে একটা মাদ্রাসা পরে। মাদ্রাসার পক্ষান্তরেই একটা মাঠ। মাঠের অপর প্রান্তে একটা সিঁড়িঘাট। চিশতির মন খারাপ থাকলে মাঝে মাঝেই এই সিঁড়িঘাটে এসে বসে থাকে। অনেক সময় সিঁড়িঘাটে বসে বসে মাদ্রাসার বাচ্চাদের খেলা দেখে। মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ চিশতির চোখ যায় সিঁড়িঘাটের দিকে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে একটা মেয়ে। এত দূর থেকে তার ফর্সা শরীরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নাহ, মনে হচ্ছে তার রূপের আলোয় পুরো সিঁড়িঘাট আলোকিত হয়ে গেছে। নিচ দিকে তাকিয়ে দুই হাতে গাউন উঁচু করে ধরে সামনে এগিয়ে আসছে মেয়েটা। পড়নে ছিলো গোলাপি রঙের গাউন। এতটুকুই স্পষ্ট দেখতে পেলো চিশতি। এত রাতে যে কেউই হতে পারে এটা ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছিলো চিশতি কিন্তু পরক্ষণেই মেয়েটার চোখে চিশতির চোখ পরতেই মনে হলো চিশতি অস্বাভাবিক ভাবে লম্বা হচ্ছে। এই অস্বাভাবিক কাহিনী দেখে জীবন হাতে নিয়ে দৌঁড়ে পালায় চিশতি। বাসায় গিয়ে কাউকে কিছুই জানায়নি। এটা ভেবে যে সবাই ভয় পাবে অথবা অযথা দুশ্চিন্তা করবে। ওইদিন রাতেই শরীর কাঁপিয়ে চিশতির শরীরে ধুম জ্বর উঠে। টানা এক সপ্তাহ জ্বরে ভোগে। এক সপ্তাহ পর সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে ওইদিন রাতের কথা ভুলে যায়।

--------------

"কি ভাবছো" চিশতির মুখের সামনে তুড়ি মেরে ঘোর ভাঙ্গিয়ে জিজ্ঞেস করলো সেই মেয়েটা। "ও-ওইদিন রাতে সিঁড়িঘাটে.....?" আবারও চিশতিকে থামিয়ে দিয়ে মেয়েটা বললো "আমিই ছিলাম। প্রথম দেখায় তোমাকে ভালো লেগেছিলো, ভালো লেগেছিলো বলতে ভালাবাসার কোনো চক্কর নাহ। এমনি বন্ধু হিসেবে তোমার পাশে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এতদিন তোমার সামনে যাইনি এই ভেবে তোমার আর আমার বন্ধুত্ব ভিত্তিহীন। তারপর যখন জানতে পারি তোমার জীবনে বিপদের খড়া তখন আর নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি।" মেয়েটার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে চিশতি। মেয়েটা আসলে কি? মানুষ নাকী ভুত, অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়েই আছে চিশতি। "আমি আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি নাহ, আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন প্লিজ। আমার মাথাটা কেমন কেমন করছে। দেখুন তোহ আমি কি বেঁচে আছি? আমার মনে হচ্ছে আমি মারা গেছি" মেয়েটা হেসে দিয়ে বললো "তুমি বেঁচে আছো আর একদম সুরক্ষিত আছো। আমি তোমাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলছি, আমি “নিমু”। আর এটা হলো জ্বিনের জগৎ।" চিশতি ভেবাচেকা খেয়ে বললো "এ্যাহ্!! শেষমেশ এই দেখার বাকি ছিলো। মানুষের সাথে অনেক বন্ধুত্ব করেছি এবার নাকী জ্বিনের সাথেও বন্ধুত্ব করতে হবে। আমার মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি। আমার কেমন তিতা তিতা লাগছে!!!! আআআআ! সবকিছু উল্টাপাল্টা লাগছে আমার কাছে" চিশতির দিকে আড়দৃষ্টি তাকিয়ে রইলো নিমু। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো "নাটক কম করো পিও!" মিটি মিটি হেসে চিশতি আবারও বললো "নাটক কই করলাম পিও" নিমুও হাসতে হাসতে বললো "এইযে তুমি যে ঢং শুরু করছো এগুলো তোহ নাটকের চেয়ে কোনো অংশে কম নাহ। ড্রামা কিং!" চিশতি নিমুর দিকে আড়দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো "শুনেও শুনলাম নাহ" নিমুও চিশতির দিকে তাকিয়ে বললো "জাস্ট ইগ্নোর" চিশতি অবাক হয়ে নিমুর দিকে তাকিয়ে রইলো। চিশতিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিমু প্রশ্ন করলো "কি দেখছো অমন করে?" চিশতি সাথে সাথে নিমুর দিক থেকে চোখ নামিয়ে বললো "তুমি কি সত্যি সত্যি পরী?" নিমু চিশতির মাথায় আলতো করে থাপ্পড় দিয়ে বললো "হাঁদারাম! পরী বলতে কোনো শব্দ নেই! আমরা হচ্ছি জ্বিন জাতি। মানুষের মধ্যে যেমন নারী ও পুরুষ আছে আমাদের জ্বিন জাতিতেও তেমনই নর ও নারী আছে। আর তাদেরকেই তোমরা মানুষরা জ্বিন ও পরী বলে চিনো। সাধারণত সৌন্দর্যের দিকে মানুষের তুলনায় জ্বিন জাতি অধিক ফর্সা কারণ তারা আগুনের তৈরী এজন্য মানুষরা নারী জ্বিনদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের পরী নামে ডাকে। এছাড়া আমরা সবাই জ্বিন জাতি।" অপলক দৃষ্টিতে নিমুর দিকে তাকিয়ে রইলো চিশতি। "বুঝলাম! তা সুন্দরী জ্বিন সাহেবা আমার কাছে কি চান আপনি" নিমু উঠে দাঁড়িয়ে চিশতির প্রশ্নের জবাবে বললো "তোমার জীবন সংশয়ে আছে, তোমার বন্ধু হয়ে তোমাকে সাহায্য করতে চাই" চিশতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বললো "কে বা কারা আমার ক্ষতি করতে চায় তুমি কি জানো?" চিশতির প্রশ্ন শুনে নিমু হাঁটতে হাঁটতে জবাব দিলো "তা জানি নাহ। তবে এতটুকু জানি, তুমি যতক্ষণ আমার সাথে থাকবে ততক্ষণ কোনো কালোশক্তি তোমার ক্ষতি করতে পারবে নাহ। তবে........?" জানার অধীর আগ্রহে দুই কদমে নিমুর সামনে গিয়ে প্রশ্ন করলো চিশতি "তবে কি..?" নিমু আবার অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জবাব দিলো "তবে তোমাকে আমার সাথে জ্বিনের জগতে আসতে হবে। আর এখানে কোনো মানুষ সশরীরে আসতে পারে নাহ। আমি যদি তোমাকে এখানে আনি তাহলে শুধু তোমার রুহ্'টাইি আনতে পারবো। তোমার দেহ মানব সমাজেই পরে থাকবে" চিশতিও অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো "আমি তোমার সাথে এখানে আসতে চাই নাহ। তুমি কি আমার সাথে ওখানে গিয়ে দেখা করতে পারবে নাহ..??" নিমু চিশতির দিকে তাকিয়ে বলে "আমি তোহ প্রতিদিনই তোমাকে দেখতে যাবো! চিশতি তোমাকে এখন তোমার শরীরে ফিরতে হবে। এখানে এক ঘন্টা মানে মানুষদের ওখানে একদিন। মানব সমাজের সময় অনুযায়ী তুমি গোটা একটা দিন আমার সাথে এখানে আছো।" অবাক দৃষ্টিতে নিমুর দিকে তাকিয়ে রইলো চিশতি। নিমু মৃদু হেসে চিশতির হাতটা শক্ত করে ধরলো।

-------------

হসপিটালে আজ দ্বিতীয় দিন। চিশতির এখনো জ্ঞান ফিরেনি। ডাক্তার বলেছে ৬০ ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান নাহ ফিরলে চিশতিকে বাঁচানো সম্ভব নাহ। চিশতির পাশে ওর বাবা আর হাসমি ছাড়া কেউই আসতে পারেনি। বাড়িতে পুরুষ বলতে এখন আব্রাহাম আর হাসমিই আছে। বাড়ির মহিলারা তোহ চিশতির এই হাল দেখে নিজেরাই যায় যায় অবস্থা। আব্রাহাম আর হাসমির কাছ থেকে মাঝে মাঝে চিশতির খবর নিতে শাহাদাত আসে। ইছামতী কল করে জানালো আমিনা বিবি নাকী কিচ্ছু খাচ্ছে নাহ। মাকে দেখভাল করার জন্য হাসমি বাসায় চলে গেলো। আব্রাহাম গিয়ে চিশতির বেডে বসলো। অশ্রুচোখে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আব্রাহাম। চোখ মুছতে মুছতে উঠে চলে আসছিলো আব্রাহাম তখনই নিস্তেজ চিশতি বাবার আঙ্গুল ধরে। ছেলের জ্ঞান ফিরছে ভেবে পিছন ঘুরতেই চিশতির শ্বাসকষ্ট আরম্ভ হয়। আব্রাহাম অস্থির হয়ে ডাক্তারকে ডাকার জন্য বেড থেকে বেরিয়ে যায়। ডাক্তার নার্স এসে তাড়াতাড়ি করে অক্সিজেন মাস্ক লাগায়। আরো কি কি ইনজেকশন লাগে তা দিলো। মিনিট দু-এক পর শান্তিতে ঘুমিয়ে পরলো চিশতি। আব্রাহাম ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলে উনারা জানায় চিশতির জ্ঞান ফিরেছে। ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ ঘুমোলে ঠিক হয়ে যাবে। আর দুই-তিন দিন হসপিটালাইজড থাকতে হবে তারপর চিশতি একদম আগের মতো সুস্থ হয়ে যাবে।