পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ২১

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২১ · ২৮ পর্বের মধ্যে ২১

সবেমাত্র ভোর হলো। পুরো মহল্লা বাসী এখনো ঘুমের দেশে নিজ স্বপ্ন খুঁজতে ব্যস্ত। "চিশতি! চিশতি! উঠোওও! চিশতি!" কর্কশ গলায় কেউ চিশতির নাম ধরে ডাকছে। ঘুম ঘুম চোখে কাঙ্ক্ষিত শব্দের দিকে তাকিয়ে দেখে সেই পঁচা গলা অবয়বটা চিশতির নাম ধরে ডেকে চলেছে অনবরত। অবয়মটার ডাক শোনা মাত্রই চিশতি নিজের মধ্য থেকে হারিয়ে গেলো এক অন্য জগতে। নেই সে নিজের মধ্যে। অপলক দৃষ্টিতে সেই অবয়বকে দেখছে চিশতি। "চিশতি, ওখান থেকে সবগুলো ঔষধ খেয়ে নাও। সবগুলো ঔষধ খেলে তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে, নূরীও ফিরে আসবে। ঔষধ খাও! ঔষধ খাও! ঔষধ খাও!" কর্কশ গলায় চিশতিকে ঔষধ খাওয়ার কথা বলছে অবয়মটা। চিশম্তিও তার কথা মতো সম্মোহিত অবস্থায় উঠে দাঁড়িয়ে সবগুলো ঔষধ একসাথে খেয়ে নিলো। অবয়মটা এক কোণে দাঁড়িয়ে খিটখিট করে হাসছে। "শুয়ে থাকো এবার, চুপচাপ শুয়ে থাকো। হা!হা!হা!" অট্টহাসিতে মেতে উঠলো অবয়বটা। চিশতিকে শুয়ে থাকার উপদেশ দিয়ে উধাও হয়ে গেলো কোথায় যেনো। চিশতিও ভদ্র ছেলের মতো শুয়ে রইলো। কতক্ষণ শুয়ে ছিলো মনে নেই চিশতির। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠেই কেমন পাগল পাগল লাগছিলো তার। তার মনে হচ্ছে সে নিজ ইচ্ছায় ঘুমের ঔষধগুলো খেয়েছে। তার স্পষ্ট মনে আছে সে নিজ হাতে সবগুলো ঔষধ খেয়েছে। অথচ তার মধ্যে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে নাহ। চিশতির মাথায় শুধু একটাই চিন্তা যেভাবেই হোক তাকে আত্মহত্যা করতে হবে। সেদিন ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় আসার পর যখন আমিনা বিবি চিশতিকে বলেছিলো "এবার তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে। টাইম টু টাইম ঔষধ খেতে হবে নয়তো সুস্থ হবে নাহ" তখন আমিনা বিবিকে উদ্দেশ্য করে চিশতি বলেছিলো "আমি তোমার সব কথা শুনবো কিন্তু আমার একটা আবদার আছে" ছেলের মুখে আবদারের কথা শুনে আমিনা বিবি হকচকিয়ে গিয়ে বললো "কি আবদার বাবা! বলো আমি তোমার সব আবদার রাখবো" মায়ের মুখে আশ্বাসবাণী শুনে চিশতি খুশিতে পঞ্চমুখ হয়ে বললো "আমাকে আর ঘর বন্দী করে রাখবে নাহ প্লিজ! আমি আগের মতো মুক্ত হয়ে থাকতে চাই" ছেলের এমন আবদার ফেলে পারলো নাহ আমিনা বিবি। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আশ্বাস দিলো সে আজ থেকে মুক্ত ভাবেই চলাফেরা করবে। কেউ তাকে বাঁধা দিবে নাহ। হঠাৎ করে এই কথা মনে পরলো চিশতির সে তো এখন সম্পূর্ণ মুক্ত। যেখানে খুশি সেখানেই যেতে পারবে। হঠাৎ সেখানে আচমকা এক হাওয়া এলো। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো সেই অবয়বটা আবারও তার সামনে এসে হাজির "চিশতি! রান্নাঘরে যাও। এখন ওখানে কেউ নেই। রান্নাঘরের ডান পাশে রাখা রেকের তৃতীয় থাকে ইদুর মারার ঔষধ আছে ওগুলো নিয়ে এসো" অবয়বটার কথা যেনো চিশতির অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেই হবে। কোন মায়ায় বাঁধা আছে চিশতি নিজেও জানে নাহ। নিষ্পলক চোখে এগিয়ে যাচ্ছে রান্নাঘরের দিকে। রান্নাঘরের সামনে গিয়ে একবার ডানে একবার বামে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই আশপাশে। সোজা ভিতরে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় হাত দিয়ে সেখান থেকে ছয় প্যাকেট ইদুর মারার ঔষধ নিয়ে চুপিসারে নিজের রুমে চলে এলো চিশতি। ইদুর মারার ঔষধগুলো হাতে নিয়ে বসে আছে চিশতি। আবারও সেখানে হাওয়ার বেগে সেই অবয়ব এসে হাজির। "হা!হা!হা! সাব্বাশ!! সাব্বাশ!! ওই গ্লাসটাতে সবগুলো ঔষধ একসাথে গুলিয়ে খেয়ে ফেলো! খেয়ে ফেলো! খেয়ে ফেলো!" এবারও অবয়মটার কথায় লিপ্ত হয়ে গেলো চিশতি। বশীভূত হয়ে গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক এক করে সবগুলো ঔষধের প্যাকেট চিঁড়ে গ্লাসে ঢাললো। এরপর সল্প পরিমাণে পানি ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। "হা!হা!হা! আমি জানতাম তুমি নূরীর জন্য সব করতে পারো। আমার বিশ্বাস তুমি খুব শীঘ্রই নূরীকে ফিরে পাবে। আমি চললামমমমমমমম হা!হা!হা!" সায়তানি হাসিতে মেতে গিয়ে লাফাতে লাফাতে সেখান থেকে উধাও হয়ে গেলো অবয়মটা।

সারাদিন ছেলে কিচ্ছু খায়নি। সকালে এত করে খাবার সাধলেন আমিনা বিবি অথচ চিশতি কিচ্ছুটি খেল নাহ। মায়ের মন কোনো বিপদ আসার আগেই টের পেয়ে যায়। দুপুরের রান্না শেষ করে সাথে সাথে ছেলের জন্য খাবার নিয়ে চলে গেলেন দোতলায়। "চিশতি বাবা! দেখো মা তোমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। এসো খাবে" নরম সুরে ছেলেকে ডাকলেন আমিনা বিবি। "নাহ আম্মি, আমি এখন খাবো নাহ। তুমি খাবার নিয়ে চলে যাও" বাচ্চাদের মতো বায়না করে বললো চিশতি। "এমন করে নাহ বাবা! সকালেও কিছু খাওনি। এবার অন্তত কিছু খাও" এক লোকমা ভাত জোর করে চিশতির মুখের সামনে নিয়ে বললেন আমিনা বিবি। "কতবার বলবো আমি খাবো নাহ। তুমি চলে যাও এখান থেকে।" মায়ের উপর চেঁচাতে চেঁচাতে বললো চিশতি। "ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি" মন খারাপ করে চলে আসছিলেন আমিনা বিবি। তখনই চিশতি ডেকে বলে "আচ্ছা আম্মি, যদি কেউ অনেকগুলো ঘুমের ঔষধ আর ইদুর মারার ঔষধ একসাথে খেয়ে নেয় তাহলে কি সে মারা যাবে?" ছেলের মুখে এমন কথা শুনে আমিনা বিবি হকচকিয়ে গিয়ে বললো "এগুলোর যেকোনো একটাও যদি মানুষের পেটে যায় তাহলে মানুষ মারা যেতে পারে। কারণ এই দুইটা উপাদানই বিষাক্ত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন যাতে আমরা জেনে শুনে কখনো এসব নাহ খাই। আর যদি কেউ জেনে শুনে এসব খেয়ে আত্মহত্যা করে তাহলে সে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করি আমরা যেনো উনার ইচ্ছা মতো মৃত্যু বরণ করতে পারি এবং জান্নাবাসী হই। তাই বলছি বাবা, এসব উল্টাপাল্টা চিন্তা কইরো নাহ। এদিকে এসো মা তোমাকে খাইয়ে দি তুমি খাবার খেয়ে একটু ঘুমাও।" চিশতি দাঁত কামরে বললো "আমি এখন খাবো নাহ, তুমি যাও তোহ!!" এই বলে চিশতি ওয়াশরুমের দরজা খুলে ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ করেই মাথা ঘুরে পরে যায়। আমিনা বিবি হাতের প্লেটটা টেবিলের উপরে রেখে দৌঁড়ে গিয়ে ছেলেকে ধরে। ছেলের মাথা নিজের কোলে তুলে বাসার সবাইকে ডাকতে থাকে। আমিনা বিবির চিৎকারে বাসায় উপস্থিত সবাই দোতলায় ছুটে আসে। ইছামতী, হালিমা, হাজেরা, হাসমি, আব্রাহাম সবাই এসে দেখো আমিনা বিবির কোলে মাথা রেখে চিশতি ফ্লোরে শুয়ে আছে। "ক-কি হয়েছে আমিনা?" জিজ্ঞেস করলো আব্রাহাম। "চৈতীর বাবা! চিশতি মাথা ঘুরে পরে গেছে। মুুখ থেকে সমানে ফেনা বের হচ্ছে। কি করবো বুঝতে পারছি নাহ" কান্না করতে করতে জবাব দিলো আমিনা বিবি। হাসমি এবং আব্রাহাম দুজনে মিলে চিশতিকে ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দিলো। ইছামতী জলদি জলদি ওয়াশরুমে থাকা বালতি ভরে পানি নিয়ে এলো। হাজেরা ছুটে নিচে চলে গেলো। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল আনতে। আমিনা বিবি রুমের এক কোণে বসে বসে কান্না করছে। ইছামতী পানির বালতিটা রেখে আমিনা বিবিকে শান্তনা দিচ্ছে। হালিমা চিশতির মাথায় পানি দিচ্ছে। হাসমি গ্লাসে করে পানি নিয়ে চিশতির চোখে মুখে পানির ছিটা দিচ্ছে। চোখে পানি পরতেই চিশতির জ্ঞান ফিরে। "ত-তোমরা আমার রুমে কি করছো??" সল্প আওয়াজে প্রশ্ন করলো চিশতি। তক্ষুনি হাজেরা ঠান্ডা পানি নিয়ে হাজির। "এই নাও বাবা! আগে পানিটুকু খাও পরে সব কথা।" চিশতির হাতে ঠান্ডা পানি দিয়ে বললো হাজেরা। চিশতি পানি খেয়ে বললো "এখানে ভীড় নাহ করে তোমরা তোমাদের কাজে যাও। আমি একটু ঘুমাবো, আমার প্রচুর ঘুম পাচ্ছে" ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে গিয়েও ধপাস করে আবারও বিছানায় লুটিয়ে পরে চিশতি। আব্রাহাম আর হাসমি ধরতে চাইলে হাত উঁচিয়ে ধরতে মানা করে চিশতি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক ভেবে সবাই রুম থেকে চলে যায়। সবাই চলে গেলে চিশতি ঘুমানোর অনেক চেষ্টা করে কিন্তু কিছুতেই ঘুমাতে পারছে নাহ। হাসফাস করছে, কেমন অজানা অস্থিরতা ঘিরে রেখেছে চিশতির সারা শরীরকে। চোখ ভর্তি ঘুম অথচ ঘুমাতে পারছে নাহ। লাল টকটকে টকটকে হয়ে গেছে নির্ঘুমো চোখগুলো। যেনো শতবছর ধরে ঘুমায় নাহ চিশতি। বিছানায় পরে ছটফট করছে একটু ঘুমানোর জন্য। একবার এই পাশ আরেকবার ওই পাশ করছে তাও ঘুম হচ্ছে নাহ। এভাবে কতক্ষণ ছটফট করেছে জানে নাহ চিশতি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো। শরীর ক্লান্ত। ঝিম ঝিম করছে সারা শরীর। মাতালের মতো টালমাটাল অবস্থা চিশতির। হয়তো ঔষধের কাজ শুরু হয়েছে। মাথা তুলে তাকানোর ক্ষমতাটুকু পাচ্ছে নাহ। ভেতরে অশান্তি কাজ করছে, কি করলে শান্তি পাবে সেই শান্তি খোঁজার চেষ্টা করছে চিশতি তবুও কোত্থাও এক ফোটা শান্তি পাচ্ছে নাহ। হঠাৎ করে পুরো রুম দুর্গন্ধে ছেয়ে যায়। এতটা বাজে দুর্গন্ধ যে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো চিশতির। ক্লান্ত শরীরে মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে হাত দিয়ে নাক টিপে ধরলো। এক মুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছিলো সে মারা যাবে এই বাজে দুর্গন্ধের কারণে। পরক্ষণেই প্রবলবেগের হাওয়া বইতে শুরু করে করে বাইরে। বাইরের শীতল হাওয়ার কিছুটা আভাস রুমের ভিতরেও আসছিলো। স্বচ্ছ হাওয়ার কারণে সেই দুর্গন্ধটা কিছুটা হলেও কমেছে। মৃদু হাওয়ার স্পর্শে জানালার পর্দাগুলো দুলছে। বাইরের অন্ধকার ভেদ করে জানালা দিয়ে চিশতির রুমে প্রবেশ করলো এক বিসৃ কালো ধোঁয়া । কালো ধোঁয়াটুকু রুমের ভিতরে প্রবেশ করেই সেই পঁচা গলা অবয়মটাতে রূপান্তরিত হলো। "চিশতি! চিশতি! যাওও! রান্নাঘরে যাও! রান্নাঘরে গিয়ে দেখবে চুলার পাশেই কেরাসিন তেলের বোতল রাখা আছে। ওই বোতলটা নিয়ে এসো। যাও! যাও! যাও" চিশতিকে কেরাসিন তেলের বোতল আনতে বলে অট্টহাসি দিয়ে উধাও হয়ে গেলো সেই অবয়মটা। আগের বারের মতো এবারও সম্মোহিত হয়ে অপলক দৃষ্টিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে চিশতি। রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই রান্নাঘরের দরজা নিজে নিজে খুলে গেলো। আপন মনে রান্নাঘরে প্রবেশ করলো চিশতি। চুলার সামনে যেতেই দেখতে পেলো কেরাসিন তেলের বোতল। আদেশ কায়েম করতে তেলের বোতলটা হাতে দিনে নিজের রুমে চলে এলো চিশতি। "হা!হা!হা! আমি জানতাম তুমি পারবে। এবার নাও, তাড়াতাড়ি কেরাসিন তেলটুকু খেয়ে নাও। কিছুক্ষণ পরেই আমরা নূরীর কাছে যাবো। খাও! খাও! খাও!" কেরাসিন তেল খাওয়ার আদেশ করা মাত্রই বোতল খুলে ঢকঢক করে কেরাসিন তেল খেয়ে নিলো চিশতি। গলা বেয়ে তেল নামার সঙ্গে সঙ্গে কাশি শুরু হলো চিশতির। "হা!হা!হা! আমার কাজ শেষ। আমি চললামমমমমমমমম!!" এই বলে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো অবয়মটা। অবয়মটা চলে যাওয়ার সাথে সাথে চিশতি সজ্ঞানে ফিরে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাশতে কাশতে পা বাড়ায় চিশতি। টলতে টলতে একবার এদিক একবার সেদিন মুখ থুবড়ে পরছে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় পায়ের সাথে পা লেগে গড়াতে গড়াতে সিঁড়ি থেকে নিচে পরে। মাথায় প্রচন্ড আঘাতও পায়। নির্ঘুম শরীর নিয়ে কাশতে কাশতে আমিনা বিবির রুমে যায়। "আআআআ-ম্মি! আআআ-ম্মি! কোথায় তুমি" আমিনা বিবি নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ শেষ করে সালাম ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখে চিশতি তার বিছানায় লুটিয়ে আছে। অস্থির হয়ে ছেলের সামনে গিয়ে বসলেন তিনি। মাকে নিজের পাশে দেখে চিশতি অঝোরে কেঁদে দিয়ে কাশতে কাশতে বলে "আম্মি! আমি মনে হয় আর বাঁচবো নাহ। আমার ভিতরে সব পুড়ে যাচ্ছে আম্মি!" ছেলেকে এমন অস্বাভাবিক ভাবে কাশতে দেখে আমিনা বিবির মনে কু ডাকতে থাকে। "এ-এমন অলক্ষুণে কথা বলতে নেই বাবা" এই বলে ছেলের মাথাটা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন আমিনা বিবি। "এ- এ কি চিশতি!! তো-র মুখ থেকে ক-কেরাসিন তেলার গন্ধ আসছে কেনো? ত-তুই কি কেরাসিন তেল খেয়েছিস??" ছেলের মুখ থেকে কেরাসিন তেলের গন্ধ পেয়ে নিশ্চিত হলেন নিশ্চয়ই ছেলে কেরাসিন তেল খেয়েছে। "ইছামতীঈঈঈঈঈঈঈঈঈঈঈ! ইছামতী কই রেহহহহহহহহ! হাসমিকে কল করে তাড়াতাড়ি একটা গাড়ি নিয়ে আসতে বলো। আমার চিশতিকে হাসপাতালে নিতে হবে" কাঁদতে কাঁদতে ইছামতীকে ডাকছেন আমিনা বিবি। এদিকে চিশতি একদম হাল ছেড়ে দিছে। মুখ দিয়ে ফেনা পরছে। আমিনা বিবির চিৎকার শুনে বাসার মহিলারা ছুটে আসে উনার রুমে। এসে দেখে চিশতির এই করুন হাল। ইছামতী হাসমিকে কল করে তাড়াতাড়ি একটা গাড়ি নিয়ে আসতে বলে। "ইছামতী! ইছামতী যাও তোহ মা রান্নাঘর থেকে তেঁতুল গুলিয়ে আনো। আররর হ্যাঁ! আলাদা একটা গ্লাসে সোডাও গুলিয়ে নিয়ে এসো" বাম হাতের উল্টো পাশ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললো আমিনা বিবি। ইছামতী ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে একটু লবণ দিয়ে তেঁতুল চটকালো আর একটা গ্লাসে সোডা গুলিয়ে দুই হাতে দুই গ্লাস নিয়ে আমিনা বিবির রুমে চলে গেলো। ইছামতীর উপস্থিতি দেখে আমিনা বিবি চিশতির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো "বাবা এটা খাও দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে" এই বলে তেঁতুলের টকটা চিশতির মুখের সামনে নেয়। চিশতি হুংকার দিয়ে তাকায়, সবাই হা করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। কি ভয়ংকর ছিলো সেই চাহনি। টকটকে লাল চোখ। বড় বড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সবার দিকে। নাক দিয়ে ঘন ঘন ঠান্ডা নিঃশ্বাস পরছে। মুখ দিয়ে লালা ঝড়ছে। এ যেনো চিশতির মধ্যে কোনো নরখাদককে দেখতে পেলো সবাই। নিস্তেজ শরীর কিভাবে মুহুর্তেই চাঙ্গা হয়ে গেলো। হালিমা, হাজেরা আর ইছামতী শক্ত করে ধরেও যেনো চিশতির নিস্তেজ শক্তির কাছে হার মানছে তারা। এক ঝটকায় সবাইকে ছিটকে ফেলে দিলো চিশতি। আমিনা বিবির হাতে থাকে তেঁতুল আর সোডার গ্লাসটাও পরে গেছে। হাক তুলতে তুলতে বিছানায় বসলো চিশতি। কেউ ওর সামনে ঘেঁষতে পারছে নাহ। যে-ই ওর সামনে যাচ্ছে তাকেই আক্রমণ করছে। এভাবে শান্ত হয়ে বসে রইলো চিশতি। তার সাথে শান্ত বাসার সবাই। কিছুক্ষণ পরেই হাসমি আর আব্রাহাম অটো নিয়ে হাজির। অটো গেইটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এবার চিশতিকে ধরাধরি করে অটোতে তুলতে হবে। হাসমি, আব্রাহাম আর অটো ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করে চিশতিকে গেইটের বাইরে আনে। কিন্তু কিছুতেই গাড়িতে তুলতে পারছে নাহ। গাড়ির সামনে নিতেই এক লাফে গাড়ির উপরে উঠে যায়। আবার সবাই ধরাধরি করে গাড়ির উপর থেকে নামায়। ছেলের এমন উদ্ভট আচরণে আমিনা বিবি হয়তো কিছু আঁচ করতে পারে। "হাসমি, তুই আয়াতুল কুরসি পড়ে দম কর ওর শরীরে" চিৎকার করে বললো আমিনা বিবি। চিশতির কানে আমিনা বিবির কথা পৌঁছাতেই চোখ মুখ আঁধারে ছেয়ে গেলো। হাসমি সময় নষ্ট নাহ করে জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে আরম্ভ করে।

"বিসমিল্লাহির রহমা-নির রহি-ম।

আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তা'খুযুহু সিনাতুওঁ ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ। মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ইন্দাহূ ইল্লা বি ইযনিহ। ইয়ালামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খলফাহুম। ওয়া ইয়ুহীতুনা বিশাইইম মিন এলমিহি ইল্লা বিমা শা'আ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। ওলা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা ওয়া হুয়াল আলিইউল আজীম।" আয়াতুল কুরসি পড়া শেষে যখনই চিশতির শরীরে দম করে সাথে সাথে সেখানেই চিশতি অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর সবাই মিলে ধরাধরি করে ওকে অটোতে তুলে। আমিনা বিবি, আব্রাহাম আর হাসমি যাবে ওর সাথে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই নিয়ে যাবে। কেরাসিন তেল খেয়েছে ওখানে গেলেই সুস্থ হয়ে যাবে। চিশতিকে অজ্ঞান অবস্থায়ই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। মাঝপথে একটু একটু নড়ে উঠে চিশতি। আবারও অজ্ঞান হয়ে যায়। আমিনা বিবি নিজের বুকের সাথে ছেলের মাথাটা শক্ত করে ধরে রেখেছে যেনো ছেলে এতটুকুও আঘাত নাহ পায়। হাসপাতালের সামনে গিয়ে গাড়ি থামলো। হাসমি ছুটে ভিতরে গিয়ে স্ট্রাকচার সিট নিয়ে এলো। সবাই ধরাধরি করে চিশতিকে স্ট্রাকচার সিটে শুইয়ে দিলো। হসপিটালের একজন কর্মকর্তা আর হাসমি স্ট্রাকচার সিট ঠেলে ভিতরে নিয়ে গেলো। নিয়ম অনুসরণ করে ৫টাকা দিয়ে একটা টিকিট কেটে ইমার্জেন্সি ক্যাবিনে নিয়ে নিয়ে গেলো চিশতিকে। "পেসেন্টের কি হয়েছে?" ডিউটি ডাক্তার জিজ্ঞেস করলো। "কে-কে-কেরাসিন তেল খেয়েছে" জবাবে বললো হাসমি। "কি বলছেন? কেরাসিন তেল খেয়ে কোনো পেসেন্টের এমন হাল হয়?" ইতস্তত সুরে বললো ডাক্তার। হাতের পালস চেক করলো। মিনিটে ১৭ বার ড্রপ করলো। "পেসেন্টের অবস্থা তোহ ক্রিটিকাল! আপনারা শিওর তোহ, শুধু কেরাসিন তেলই খেয়েছে?" আবারও জিজ্ঞেস করলো ডাক্তার। "হ্যাঁ! হ্যাঁ! কেরাসিন তেলই খেয়েছে।" জবাব দিলো হাসমি। এরপর চিশতির দুই চোখের মাঝ বরাবর নাকের হাড়ে চাপ দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হয়। হসপিটাল থেকে একটা সিরাপ তৎক্ষনাৎ চিশতিকে খাইয়ে দিয়ে বললো "আমরা আপনাদের ভাষ্যমতের উপর বিবেচনা করেই চিকিৎসা করলাম কিছুক্ষণ পর হাল্কা বমির সাথে কেরাসিন তেল বেরিয়ে যাবে। বাকিটা আল্লাহ ভরসা। পেসেন্টের অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল আপনাদের ভালোর জন্য বলছি উনাকে ঢাকা নিয়ে যান।" এই বলে নিজেদের চিকিৎসা শেষ করলো ডিউটি ডাক্তার। পরিবারের লোকেরা চিশতিকে আবারও গাড়িতে তুলে। গাড়িতে তুলে গাড়ি স্টার্ট দিলো। কিছু পথ চলার পর গাড়ির ঝাঁকুনির কারণে মাঝ পথের বমি হয়ে গেলো চিশতির। পেট থেকে শুধু কেরাসিন তেলই পরলো। চিশতি কাঁদো কাঁদো গলায় গুঙিয়ে গুঙিয়ে আমিনা বিবিকে জড়িয়ে ধরে বললো "আ-ম্মি আ-মি স-কা-লে অ-নে-ক-গু-লো ঘু-মে-র ঔ-ষ-ধ খে-য়ে-ছি তা-র-প-র রা-ন্না-ঘ-রে য-ত-গু-লো ই-দু-র মা-রা-র ঔ-ষ-ধ ছি-লো স-ব-গু-লো খে-য়ে-ছি" চিশতির কথা শুনে গাড়ির মধ্যেই আমিনা বিবি কান্না শুরু করে দেয়। "হাসমি গাড়ি থামা বাপ! এক খাঁচা ডিম আন বাপ! তোর ভাই মনে হয় আর বাঁচবে নাহ!! আল্লাহ গোহহহহহহহ! রহম করো! আল্লাহ!" ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আমিনা বিবি। হাসমি ছুটে গিয়ে ডিম কিনে আনে। দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চিশতিকে নিয়ে বাড়ি চলে আসে তারা। রাত তখন সাড়ে আটটার কাছাকাছি। বাড়ির মেইন গেইটেরই সামনেই চিশতিকে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মহল্লার মানুষ জন ভীড় করে জমা হয়ে আছে। হাসমির হাঁটুতে চিশতির মাথা রেখে শুইয়ে রেখেছে। পাশেই আব্রাহাম আর শাহাদাৎ। হাসমি এক এক করে ডিম ভাঙ্গে আব্রাহাম চিশতির মুখ হা করায় আর হাসমি ডিম মুখে পুড়ে দেয়। ডিম গেলার সাথে সাথে শাহাদাৎ মুখে পানি দেয়। এভাবে প্রায় ছয়টা ডিম খাওয়ানোর পর চিশতি বমি করে। আশেপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিলো তারা সবাই দূরে সরে যায় কারণ বমির সাথে ভেসে আসছিলো এক বিশৃ দুর্গন্ধ। সবাই নাকে কাপড় চেপে ধরেছে। কেউ কেউ থুথু ফেলছে। কিন্তু ওই তিনটা মানুষ কোনো প্রকার ঘৃণা নাহ করে চিশতির সামনে বসে আছে। এক এক করে সবগুলো ডিম খাওয়ানো হয়। অনেকবার বমি করানোর পর ডেবডেব করে চোখ খুলে তাকায় চিশতি। সবকিছু তার কাছে ঝাপসা মনে হচ্ছে। যেনো বেঁচে থেকেও সে মারা গেছে। কারো কথাই চিশতির কানে পৌঁছাচ্ছে নাহ। সবার কণ্ঠ কেমন ভারি লাগছে চিশতির কাছে। হঠাৎ এতশত ভারি কণ্ঠের ভীড়ে এক শীতল কণ্ঠ তার কানে এসে পৌঁছায়। "চিশতি!!!" খুব চেনা এই কণ্ঠ। অনেক স্মৃতি জমে আছে কণ্ঠের সাথে। কতশত হাসি মজা আড্ডা আছে এই কণ্ঠে। মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে দেখে যাকে ভেবেছিলো সেই। চিশতি জানতো ওর এই অবস্থায় ও নাহ এসে থাকতেই পারবে নাহ। আর তাই হলো। "দেখো চিশতি! আমি এসে গেছি। আর কষ্ট করতে হবে নাহ তোমাকে। চলে এসো আমার সাথে!!" অতিপরিচিত কণ্ঠস্বরটি হাওয়ার মতো হয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো চিশতির দিকে। চিশতির শরীর থেকে চিশতির মতো দেখতে এক ধোঁয়া রশ্মি সেই হাতটির উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিলো। "নাহ! এবার তোমার রুহ্ নাহ তোমাকে সশরীরে নিতপ এসেছে।" হাওয়ার মতো হাতটি নিজ শরীরে এসে মুচকি হেসে বললো। চিশতি নিস্তেজ শরীরে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো "নিমু! আমার হাতটা শক্ত করে ধরো। ছেড়ে দিও নাহ" মিনমিনে কণ্ঠে বললো। নিমু শক্ত করে চিশতির হাতটা ধরলো। "উঠে এসে! চলো যাই বহুদূরে!" এক প্রকার ঝাড়া দিয়ে শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো চিশতি। শাহাদাৎ, আব্রাহাম, হাসমি তিনজনই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো। টকটকে লাল চোখে সবার দিকে তাকিয়ে রইলো চিশতি। হঠাৎ উঠে দৌঁড় দিলো। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে চিশতি কেউ জানে নাহ। মহল্লার লোকেরাও ওর পিছু পিছু ছুটছে কিন্তু কেউ ওর নাগালে যেতে পারছে নাহ। বাকিদের এক কদম চিশতির চার কদম। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে একটা ছোট্ট বিলের সামনে এসে দাঁড়ালো। সবাই ভাবলো এবার হয়তো চিশতি থেমে যাবে। কিন্তু সবার ভাবনা ভুল প্রমাণ করে চিশতি সেই বিলের উপর দিয়ে দৌঁড়ে চলে যায়। মহল্লার লোকেরা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে নাহ। কি দেখলো তারা? "হা!হা! চিশতি! কেমন লাগছে?" মৃদু হেসে বললো নিমু। "আমি কি হাওয়ায় ভাসছি?" প্রশ্ন করলো চিশতি। "হ্যাঁ! এখন তুমি বিলের উপর দিয়ে ভাসছো। ওইতো মেইন রোড। আমরা মেইন রোডে উঠবো এক্ষুনি" চিশতিকে বলতে বলতেই ওরা মেইন রোডপর গিয়ে পৌঁছয়। মেইন রোডের মাটির পথ বরাবর চিশতি ভেসে চলেছে। হঠাৎ কিছুটা সামনে যেতেই চিশতি অজ্ঞান হয়ে পরে যায়। মহল্লার লোকেরাও অন্য পথ ধরে মেইন রোডে এসে দেখে চিশতি অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। পাশে আমিনা বিবি আর মূসা হুজুর দাঁড়িয়ে আছে। পরমুহূর্তেই মূসা হুজুর চিশতির কুইনি আঙ্গুলের নখের ডগায় চিমটি দিয়ে ধরে জোরে জোরে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি আর সূরা আল-জ্বিন এর প্রথম পাঁচ আয়াত পাঠ করলো।

"বিসমিল্লাহির রহমা-নির রহি-ম।

আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আ -লামি-ন।

আররহমা-নির রাহি-ম।

মা-লিকি ইয়াওমিদ্দি-ন।

ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কা নাসতাই’-ন

ইহদিনাস সিরাতা’ল মুসতাকি’-ম

সিরাতা’ল্লা যি-না আনআ’মতা আ’লাইহিম গা’ইরিল মাগ’দু’বি আ’লাইহিম ওয়ালা দ্দ-ল্লি-ন।[আমিন]

বিসমিল্লাহির রহমা-নির রহি-ম।

আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তা'খুযুহু সিনাতুওঁ ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ। মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ইন্দাহূ ইল্লা বি ইযনিহ। ইয়ালামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খলফাহুম। ওয়া ইয়ুহীতুনা বিশাইইম মিন এলমিহি ইল্লা বিমা শা'আ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। ওলা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা ওয়া হুয়াল আলিইউল আজীম।

বিসমিল্লাহির রহমা-নির রহি-ম।

কুলঊহিয়া ইলাইইয়া আন্নাহুছতামা'আ নাফারুম মিনাল জিন্নি ফাকা-লূইন্না-ছামি'নাকুরআ-নান'আজাবা। ইয়াহদীইলাররুশদি ফাআ-মান্না-বিহী ওয়া লান নুশরিকা বিরাব্বিনাআহাদা। ওয়া আন্নাহহূতা'আ-জাদ্দুরাব্বিনা-মাত্তাখাযা সা-হিবাতাওঁ ওয়ালা-ওয়ালাদা। ওয়া আন্নাহূকা-না ইয়াকূলুছাফীহুনা-'আলাল্লা-হি শাতাতা। ওয়া আন্না-জানান্নাআল্লদন তাকূলাল ইনছুওয়াল জিন্নু'আলাল্লা-হি কাযিবা।"

হুজুরের আয়াত পাঠের শব্দ চিশতির কানে পৌঁছাবার সাথে সাথে চিশতির জ্ঞান ফিরে আসে। জ্ঞান ফেরার পরেই যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো। "ছেড়ে দে আমার আঙ্গুল! আআআআ!! মেরে ফেলবো। ছেড়ে দে বলছি" ছটফট করতে করতে বলছে চিশতি। এক হাতে চিশতির আঙ্গুল চেপে ধরে অন্য হাতে একটা গ্লাসে পানিতে কিছু আয়াত পাঠ করে দম ফুক করলো। তারপর সেই গ্লাসটা আমিনা বিবির হাতে দিয়ে বললো "চিশতির চোখে মুখে এই পানি ছিটিয়ে দিন" আমিনা বিবিও মূসা হুজুরের কথা মতো গ্লাসের পানি হাতে নিয়ে চিশতির চোখে মুখে ছিটিয়ে দিলো। তৎক্ষনাৎ সেখানেই চিশতি শরীরের সকল ভার ছেড়ে দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। "আমার যতটুকু কাজ করার ছিলো আমি করে দিলাম। আপনারা এখন ওকে বাসায় নিয়ে যান। ওর একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। বাকিটা পরে দেখবো!" বললো মূসা হুজুর। মূসা হুজুরের কথা মতো চিশতিকে বাসায় নিয়ে আসে। জ্ঞান ফেরার পর চিশতির আত্ম চিৎকার "আআআ! আমার ভিতরে জ্বলে যাচ্ছে। আম্মি আমার পেটের সব নাড়িভুঁড়ি ছিড়ে যাচ্ছে। আমি বোধহয় আর বাঁচবো নাহ!! আআআ! আম্মি! আ!হা!আআআ! আল্লাহহহহহহ!!" চিশতির কান্নার শব্দে কেউ একটুও স্বস্তি পাচ্ছে নাহ। কি করা যায় সেটাই ভাবছে সবাই। "কিগো! কি করবো এখন?" আব্রাহামকে জিজ্ঞেস করছে আমিনা বিবি। "কি করতে বলবো? হাতে আমার কানা কড়িও নেই এখন!" অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে বললো আব্রাহাম। "বাবা আমি দেখি শাহাদাৎ ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে আনতে পারি কি-না। ওকে বাসায় রাখাটা খুব রিস্কি হয়ে যাচ্ছে।" অভয় দিয়ে বললো হাসমি। "হ্যাঁ বাবা! দেখ কিছু ব্যবস্থা করতে পারিস কি-না" হাহাকারে যেনো প্রাণ ফিরে পেলো আমিনা বিবি। অনেকক্ষণ পর হাসমি টাকা নিয়ে এলো। চিশতিকে আবারও অটোতে তুলে মুন্সিগঞ্জ জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলো। রাত তখন প্রায় ১০টার কাছাকাছি। সামনের গেইট বন্ধ। পিছনের গেইট দিয়ে মূল দরজার সামনে যেতেই ভিতর থেকে একজন লোক ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে "কি হয়েছে?" হাসমি লোকটার প্রশ্নের উত্তরে বললো "বিষ খেয়েছে" লোকটা আবারও জিজ্ঞেস করলো "কখন খেয়েছে?" "সকালে" হাসমির উত্তর শুনে লোকটা অবাক হয়ে বললো "ভাই! একটা ভালো কথা বলি। এখানে রেখে কোনো লাভ হবে নাহ। উনাকে নিয়ে ঢাকা চলে যান। কিভাবে ছটফট করছে আহারে!" হাসমি অসহায়ের মতো বললো "ভাই একটা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন।" হাসমির অনুরোধে লোকটা একটা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে দেয়। রাত তখন ১০:৫৫। চিশতিকে নিয়ে মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো আমিনা বিবি আর হাসমি। আব্রাহাম আসতে চেয়েছিলো কিন্তু আমিনা বিবি জোর করে নিজেই এসেছে। রাত ১২টা বাজলে অ্যাম্বুলেন্স এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দরজার সামনে থামে। ভিতর থেকে দুই-তিন জন বেরিয়ে আসে। সবাই ধরাধরি করে চিশতিকে স্ট্রাকচার সিটে শুইয়ে দিলো। হাসমি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া মিটিয়ে তাদের সাথে ভিতরে যায়। ভিতরে চিশতিকে ডাক্তার চেক আপ করছে। "পেসেন্টের কি হয়েছে?" ডাক্তার জিজ্ঞেস করলো। "জ্বি স্যার বিষ আর ঘুমের ঔষধ খেয়েছে।" উত্তরে বললো হাসমি। "কখন খেয়েছে?" বললো ডাক্তার। "সকালে খেয়েছে।" জবাবে বললো হাসমি। "সারাদিন কি করেছেন? পেসেন্টকে আইসিইউ'তে রাখতে হবে। রিসিপশন থেকে কথা বলে আসুন আর ভর্তি ফর্ম নিয়ে বর্ণ পেপারে সাইন করে পেমেন্ট করে আসুন।" ডাক্তারের কথা মতো বর্ণ পেপার আর ভর্তি ফর্ম নিয়ে রিসিপশনের দিয়ে যাচ্ছিলো হাসমি। হাসমির পিছন পিছন ওখানকারই একজন কর্মকর্তা ডেকে সাইডে নিয়ে গিয়ে বললো "ভাই! আইসিইউ'তে ভর্তি করলে কাল এই রোগীর লাশ নিয়ে ফিরে যেতে হবে। তাছাড়া নরমাল আইসিইউ-র জন্যই পেমেন্ট করতে হয় ৩০ হাজার টাকা। আমি এখানে থাকি এখানকার বিষয়ে আমার সম্পর্কে ভালো আপনি জানেন নাহ। আপনি বরং পেসেন্টকে মিটফোর্ডে নিয়ে যান।" লোকটার কথায় কেনো যেনো সত্যির গন্ধ পাচ্ছিলো হাসমি এজন্য দিক পিছ নাহ ভেবে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড থেকে চিশতিকে নিয়ে আসে। এরপর ওই লোকটার সাহায্যে একটা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে। ১২টা ৩৭ মিনিটে চিশতিকে নিয়ে ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে যায় তারা। এখানে তাদের জন্য কেউই এগিয়ে আসছে নাহ। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে হাসমি ভিতর থেকে একজন লোককে ডেকে আনলো। লোকটার পিছু পিছু একজন মহিলাও এলো। ওদের কথপোকথন শুনে মহিলা কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে যে চিশতি বিষ খেয়েছে তাও আবার সকালে। "এ-তো ১২ঘন্টার উপরে হয়ে গেছে। এই পেসেন্ট বাঁচবে নাহ। শুধু শুধু টাকা খরচ করতে এসেছেন" হাসমি কিছু বলবে তার আগেই কাতরানি অবস্থায় ক্ষিপ্ত সুরে বললো চিশতি "আমি বাঁচবো! আমি বাঁচবো" ছেলেকে ছটফট করতে দেখে আমিনা বিবি চিশতির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো "হ্যাঁ বাবা তুমি বাঁচবে। আম্মি আছি তোহ। কিচ্ছু হতে দিবে নাহ তোমার।" ভিতরে গিয়ে বর্ণ পেপারে সাইন করে চিশতিকে সেখানেই ভর্তি করলো। একটা সিটও খালি নেই। ফ্লোরের এক কোণে জায়গা পেয়েছে। ১৫০ টাকা ঘুষ খাইয়ে শোয়ানোর জন্য একটা ফোমের বেড যোগাড় করেছে। একজন ডাক্তার এসে স্যালাইন দিয়ে গেলো। একটা টোকেনে বেশ কিছু মেডিসিন লিখে দিয়ে সেগুলো আনার জন্য বললো। হাসমি তৎক্ষনাৎ গিয়ে সেই ঔষধগুলো নিয়ে এলো। স্যালাইনের সাথেই একসাথে ৪টা ইনজেকশন পুশ করলো। কিছু টেস্ট করার জন্য চিশতির শরীর থেকে রক্ত নিয়ে গেলো। আর এদিকে ছটফট করতে করতে চিশতি কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানে নাহ। পরদিন ১০টার পর ইউএইচও ডাক্তার এসে রিপোর্ট দেখে বললেন "রোগীর শরীর আগের চেয়ে একটু বেটার আছে তবে এখনো বিপদ মুক্ত নয়। তিনদিন এখানেই থাকতে হবে। আরো কিছু টেস্ট করতে হবে যদি ওই টেস্টের রিপোর্ট ভালো হয় তাহলে তিনদিন পর রোগী রিলিজ করা হবে" ডাক্তারের কথা মতো তিনদিন সেখানেই থাকবে তারা। পরদিন আব্রাহাম আর সাইফ চিশতিকে দেখতে গেলো। আব্রাহাম আর সাইফকে রেখে হাসমি আর আমিনা বিবি বাসায় আসে। বিকেলে হাসমি আর আমিনা বিবি গেলে আব্রাহাম আর সাইফ চলে আসে। রাতে চিশতির বাকি টেস্টগুলোর রিপোর্ট রিপোর্ট দিয়ে যায়। পরদিন ইউএইচও ডাক্তার এসে রিপোর্ট দেখলো। "উমমম! হ্যাঁ রিপোর্ট ভালো আছে। আপনারা দুপুরেই রোগীকে নিয়ে যেতে পারেন।" ওইদিন সকালটা হসপিটালে কাটিয়ে সকল কাগজপত্র জমা দিয়ে চিশতিকে নিয়ে চলে আসে। মুন্সিগঞ্জ এসে থামতেই চিশতি বলে "আমাকে এখানে নামিয়ে দাও। আমার একটু দরকার আছে। তোমরা যাও আমি একটু পর আসছি।" হাসমি আর আমিনা বিবি বাঁধা দিতে চেয়েও বাঁধা দিলো নাহ।