পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ২৮
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২৮ · ২৮ পর্বের মধ্যে ২৮
রাতের গভীর অন্ধকারে ওহাইও, লিনডা, চিশতি, এবং অলিভিয়া একসঙ্গে কান্নার উৎস খুঁজতে খুঁজতে পুরনো কবরের সামনে গিয়ে পৌঁছায়। চারপাশের অস্বাভাবিক ও রহস্যময় পরিবেশ তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে, কিন্তু তারা নিজেদের লক্ষ্যে স্থির থাকে। অবশেষে, অনেক খোঁজাখুঁজির পর, তারা কান্নার উৎস হিসবে পুরনো কবরটি খুঁজে পায়। কবরটি খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের অস্বাভাবিকতা ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করে। যে ভূতুড়ে অনুভূতি এবং অস্বস্তি তাদের পিছু ছাড়ছিলো না, তা যেনো ক্রমশ ম্লান হতে থাকে। পরিবেশ স্বাভাবিক হতে শুরু করলে, তারা সবাই বুঝতে পারে হয়তো এই কবরকে ঘিরে নিশ্চয় কোনো গভীর রহস্য রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দেখে চিশতি বললো "নিশ্চয়ই এই কবরের ভেতর কোনো না কোনো ক্লু আছে যা আমাদের সাহায্য করতে পারে। কবরটা খুঁড়ে দেখা উচিৎ!" ওহাইও কবরটির দিকে তাকিয়ে বললো "ঠিক আছে, সবাই সাবধানে থাকো। আমি কবর খুঁড়তে পারবো না, কারণ... আমি আজই নতুন জুতো পরেছি।" লিনডা হাসতে হাসতে "ওহ, কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি নতুন জুতো নিয়ে চিন্তা করছো? আমি ভাবছিলাম, তুমি ভূতের ভয় পাচ্ছো!" চিশতি মজা করে বললো "আমার মনে হয় ওহাইও স্যার এখানে কোনো ভূত দেখলে নতুন জুতো ফেলেই পালাবে!" অলিভিয়া হালকা মুচকি হাসি দিয়ে বললো "তাহলে আমিই ভূতকে জিজ্ঞেস করবো, 'হ্যালো মিস্টার ভূত, আপনার কিআমাদের কোনো সাহায্য লাগবে?'" ওহাইও হাত উঁচিয়ে হালকা কেশে বললো "ঠিক আছে, কবর খুঁড়া হবে, তবে আজকে নাহ! এই কাজ করার আগে আমাদের একে অপরের সাথে ভালো করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন কোনো বিপদ যাতে না হয়, এখন সবাই বাড়ির ভিতরে চলো" কবরটি চিহ্নিত করার পর, তারা দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করে এবং বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। সেদিন রাতটি তারা যে যার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নেয়। রাতের বাকি সময়টা আর কোনো অতিপ্রাকৃত বা অস্বাভাবিক ঘটনার সম্মুখীন হয়নি তারা। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা তাদের প্রশান্তির ঘুমের সঙ্গী হয়ে উঠে, এবং সবাই নিশ্চিন্তে রাতটি কাটায়।
পরদিন ভোরবেলা, নতুন সূর্যোদয়ের সাথে চারপাশে এক নতুন দিনের সূচনা হয়। সূর্যের প্রথম আলো ঘরের জানালার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে, রাতের অন্ধকারকে সরিয়ে চারপাশ আলোকিত করে দেয়। বাতাসে পাখির কিচিরমিচির শোনা যায়, আর তাজা ফুলের গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ওহাইও জানালার পর্দা সরিয়ে আলোর রশ্মিকে স্বাগত জানায়। তার মুখে এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠে, যেনো রাতের সব ভয়াবহতা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। লিনডা কিচেনে গিয়ে কফির কাপ তৈরি করে, বাইরের সবুজ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে যে রাতের ভয়ের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। চিশতি বাইরে বেরিয়ে সূর্যের উষ্ণতা অনুভব করে, সে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, "আজকের সকালটা সত্যিই দারুণ!" অলিভিয়া বারান্দায় বসে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বই পড়ছে, তার মুখেও এক ধরনের প্রশান্তি ফুটে উঠে।এই নতুন দিনের আলো যেনো তাদের রাতের সকল ভয়ের অবসান ঘটায়, তাদের মনকে পুনরায় শান্তি এবং স্বস্তি দেয়। তারা বুঝতে পারে যে রাতের সেই অভিজ্ঞতা ছিলো ক্ষণস্থায়ী, আর নতুন দিনের সূর্যোদয়ের মতোই তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার আলো ছড়িয়ে পড়েছে।
সকালের সতেজ পরিবেশ উপভোগ করতে করতে ওহাইও, লিন্ডা, চিশতি ও অলিভিয়া ড্রয়িংরুমে বসে গতরাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছে। এমন সময় চিশতি বললো, "কাল রাতে ঘুমতে যাওয়ার আগে আমি ডায়েরি এবং সেই প্রাচীন মন্ত্রের পাণ্ডুলিপিটি আবার দেখি। ডায়েরি এবং পাণ্ডুলিপি দুই জায়গাতেই অমসৃণ পাথরের ছবি আঁকা। এবং এটার সম্পর্কে অনেক তথ্য দেওয়া আছে, সেগুলো পরে বলছি। তার আগে বলি, পাণ্ডুলিপিতে বেশ কিছু মন্ত্র আছে, যার মাধ্যমে আমরা সেই কালো শক্তিকে আহ্বান করতে পারবো।" তখন অলিভিয়া বলে, "তুমি কীভাবে জানলে যে ওই মন্ত্রগুলোর সাহায্যে আমরা কালো শক্তিকে আহ্বান করতে পারবো?" উত্তরে চিশতি বললো, "কারণ এই ডায়েরিতে সব লেখা আছে, পাণ্ডুলিপির কত নম্বর পৃষ্ঠার কত নম্বর মন্ত্র পাঠ করতে হবে।" ওহাইও একটু অবাক হয়ে বলে, "তাহলে সময় নষ্ট না করে, আমরা সেই কালো শক্তিকে আহ্বান করি এবং তাকেই জিজ্ঞেস করি যে সে আমাদের কাছ থেকে কি চায়।" চিশতি কিছুটা ইতস্তত হয়ে বললো, "কিন্তু একটা সমস্যা আছে।" ওহাইও আবারও বললো, "সমস্যা? কী সমস্যা?" চিশতি বললো, "এখানে নিয়ম লেখা আছে ঠিকই, কিন্তু মন্ত্র আপনাদের বংশের কাউকে পাঠ করতে হবে। এবং যে পাঠ করবে তাকে হতে হবে অবিবাহিত। সেক্ষেত্রে এই মন্ত্র অলিভিয়াকে পাঠ করতে হবে।" চিশতির কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়। তখন অলিভিয়া সাহস করে বলে, "আমি মন্ত্র পাঠ করবো। বলো, কি কি করতে হবে আমায়।"
অন্ধকার রাত। বাইরের ঘুটঘুটে আঁধারে চারপাশে যেন কোনো শব্দ নেই। বাড়ির ভিতরেও অন্ধকার নেমে এসেছে। মেঝেতে ওহাইও, লিন্ডা, চিশতি, ও অলিভিয়া গোল করে বসে আছে, একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। তাদের চার জনের ঠিক মাঝখানে একটা মোমবাতি জ্বলছে, যার টিপটিপ আলোয় তাদের মুখগুলো আলতো করে উদ্ভাসিত হচ্ছে। মোমবাতির আলোতে তারা গভীর এক সত্তার উপস্থিতি অনুভব করার অপেক্ষায়। এরপর সবাই চোখ বন্ধ করে আপন মনে সেই শক্তিকে আহ্বান করছে। আর অলিভিয়া চোখ বন্ধ করে শব্দ করে মন্ত্র পাঠ করছে। ❝"Unseen power, hidden in the dark, hear my call. You who dwell within the jagged stone, reveal yourself to us. Lord of the shadows, bring your presence into our lives."
"Keeper of the darkness, whose cold touch flows like a shadow, break your secrecy. Appear in this sacred place, and fulfill your will."
"Spirit peering from behind the veil of death, hidden within the stone, I summon you. By the magic of my words, come into the light of the world, and declare your intent."❞
অলিভিয়া মন্ত্র পাঠ শুরু করার সাথে সাথে ঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে থাকে। তার কণ্ঠ যতই জোরালো হচ্ছে, ততই বাড়ির আশপাশের পরিবেশ ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বাইরে প্রবল বেগে হাওয়া বইতে শুরু করে, যার ফলে মোমবাতির টিপটিপ আলো একসময় নিভে যায়। ঘর অন্ধকারে ঢেকে যায়, আর সেই অন্ধকারের মধ্যে চারপাশের পরিবেশ আরো তীব্র হয়ে উঠে। ওহাইও, লিন্ডা, ও চিশতির মনে ভয় আর আতঙ্ক বাড়তে থাকে, যেন এই শক্তির বিরুদ্ধে তারা অসহায়। হঠাৎ, চিশতি চিৎকার করে উঠে, "খবরদার! কেউ কারো হাত ছাড়বেন না! অলিভিয়া, তুমি মন্ত্র পাঠ বন্ধ করবে না!" চিশতির নির্দেশের সাথে সাথে, ঘরের ভেতর এক ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। চারপাশে সবকিছু উলোটপালট হয়ে যেতে থাকে, যেন ঘরের ভেতরে এক অদৃশ্য শক্তি প্রলয় সৃষ্টি করছে। তারা শক্ত করে হাত ধরে থাকলেও, তাদের ভেতর আতঙ্ক এবং ভয়ের তীব্রতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। অলিভিয়া মন্ত্র পাঠ চালিয়ে যায়, আর তাদের সামনে এই ভয়াবহ শক্তির প্রকাশ কক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। অলিভিয়া মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে কালো শক্তিকে আহ্বান করার পর, হঠাৎ করে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠে। ঘরের ভেতর উতালপাতাল হাওয়ার ঝাপটা শুরু হয়, যেনো কোনো শক্তিশালী অশুভ শক্তি তাদের ঘিরে ধরেছে। পুরো ঘরটিতে শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে, যেনো চারপাশে হিম শীতলতা তাদের গিলে খাচ্ছে। চারজন একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রাখে, কিন্তু শীতল পরিবেশ যেনো তাদের শরীরে হিম স্রোত বইয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ, ঘরের বাতাস থেমে যায়, এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু স্থির হয়ে যায়। সেই নীরবতার মধ্যে কালো শক্তি রূপী ছোট্ট বাচ্চার আত্মাটা অলিভিয়ার পিছনে এসে দাঁড়ায়। অলিভিয়া কিছু টের পায়, কিন্তু পিছনে ফিরে দেখার সাহস করতে পারে না। তার শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে যায় ভয়ে। শীতল ঘাম তার কপাল বেয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ে। তার পুরো শরীর কাঁপছে, আতঙ্ক যেন তাকে চেপে ধরেছে। অলিভিয়া কিছু বুঝে উঠার আগেই আত্মাটা তার কাঁধে হাত রাখে। মুহূর্তেই অলিভিয়া সম্পূর্ণ স্থির হয়ে যায়, যেনো তার শরীর কোনো শক্তির দ্বারা স্থবির হয়ে গেছে। তার চারপাশে সবকিছু অদ্ভুতভাবে বদলে যেতে থাকে। হঠাৎ, অলিভিয়া নিজেকে সময়ের স্রোতে ভেসে বহুযুগ আগের এক দৃশ্যে দেখতে পায়। পুরনো স্মৃতি আর ভৌতিক ঘটনার ধ্বংসাবশেষ তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠে। সে দেখে, অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু ভয়ানক ঘটনা যেনো সে নিজ চোখে এগুলো প্রত্যক্ষ করছে। অলিভিয়া জানে, এই স্মৃতিগুলো তাকে সহজে ছাড়বে না। কালো শক্তির সাথে যুক্ত সেই অতীতের ভয়ানক ঘটনার রহস্য তাকে আবদ্ধ করতে শুরু করেছে।
-------------------
চার্চের বিশাল চত্বরে আকাশচুম্বী গাছের সারি, চারদিকে সবুজ ঘাসের গালিচা, আর দূরে কয়েকটা রঙিন ফুলের বাগান। সূর্যের আলো চার্চের জানালা দিয়ে এসে পড়ছে চারপাশে, পরিবেশটা মনমুগ্ধকর শান্ত আর পবিত্র। চার্চের সামনের ফোয়ারা থেকে পানি ঝরছে, আর পাখিরা মৃদু সুরে গান গাইছে। এই মনোরম পরিবেশে মারিয়া আর ম্যাথিউ কথা বলতে বলতে চার্চ থেকে বের হলো। “মারিয়া! এখন থেকে কিন্তু তোমাকে আরো সতর্ক হতে হবে। দিন দিন চার্চের দায়িত্ব দ্বিগুণ হচ্ছে,” মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ম্যাথিউ। মারিয়া মুচকি হেসে বললো, “তুমি একদম চিন্তা করো না, ভাইয়া! ঈশ্বরের সেবা করবো বলেই তো বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হইনি।” ম্যাথিউ একটা মৃদু হাসি দিয়ে গেইটের দিকে এগিয়ে গেলো, মারিয়াও তার পাশে পাশে হাঁটছে। যখন তারা দুজন গেইটের সামনে এলো, মারিয়া হঠাৎ থেমে গিয়ে বললো, “ভাইয়া! কি যেনো একটা সরে গেলো না?” ম্যাথিউ বিভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে বললো, “কই? আমি তো কিছু দেখলাম না।” মারিয়া আবার বললো, “আমি স্পষ্ট দেখলাম কিছু একটা সরে গেলো।” তারা দুজনেই দ্রুত গেইটের বাইরে বের হলো। সেখানে গিয়ে দেখে, একটা ৮-৯ বছরের ছোট্ট বাচ্চা জড়োসড়ো হয়ে মাটিতে বসে আছে, ভয়ে কাঁপছে। মারিয়া দ্রুত ছুটে গিয়ে বাচ্চাটিকে জড়িয়ে ধরে বললো, “কে গো তুমি? এখানে কিভাবে এলে?” কিন্তু বাচ্চাটা হা করে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো, একদম নিস্তব্ধ। মারিয়া বারবার প্রশ্ন করলেও বাচ্চাটা কোনো উত্তর দিচ্ছিলো না। অনেকক্ষণ এভাবে কাটার পর ম্যাথিউ বললো, “বাচ্চাটা হয়তো কথা বলতে পারে না। তুমি এক কাজ করো, ওকে আমাদের আশ্রমে নিয়ে যাও। আর হ্যাঁ! আজ থেকে ওর সব দায়িত্ব তোমার। ওর দেখভাল তোমাকেই করতে হবে।” মারিয়া বাচ্চাটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো "ভাইয়া! আজকে নিজেকে সত্যিকারে মারিয়া মনে হচ্ছে। মারিয়া যেমন কোনো পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই ঈশ্বরের কৃপায় জিশুকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন। আজ মনে হচ্ছে আমিও কোনো পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই ঈশ্বরের কৃপায় সন্তান লাভ করলাম। হ্যাঁ এটা সত্যি, আমি ওকে গর্ভে ধারণ করিনি তবে ওকে দেখার পর মনে হচ্ছে ও আমারই সন্তান। মারিয়ার জিশু। ও আমার জিশু।" মারিয়া বাচ্চাটাকে নিয়ে চার্চের ভিতরে প্রবেশ করার মুহূর্তে আকাশের রঙ দ্রুত বদলে যায়। হঠাৎ করেই দিনের স্নিগ্ধ নীল আকাশ কালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। পুরো চার্চের চারপাশে যেন এক অদ্ভুত ভয়াল আবহ তৈরি হয়। শীতল বাতাস কাঁপন ধরিয়ে দেয় চার্চের প্রতিটি জানালায়। ঠিক সেই সময়, কোথা থেকে যেনো শত শত কাক আকাশ থেকে নেমে এসে চার্চের উপরে গোল করে ঘুরতে শুরু করে। তাদের কর্কশ কা কা ডাক চার্চের পবিত্রতা ভেঙে দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কাকগুলোর ডানার শব্দ আর আকস্মিক কা কা ধ্বনি বাতাসে এক ভৌতিক অনুভূতির জন্ম দেয়। এরপর আচমকা হাওয়ার গতিবেগ বাড়তে শুরু করে। চার্চের দরজার কপাট জোরে ধাক্কা খেয়ে একবার বন্ধ হতে চায়, আবার খোলার চেষ্টা করে। গাছের ডালপালাগুলো হাওয়ার তীব্র ঝাপটায় ভয়ানকভাবে দুলছে। পরমুহূর্তেই বাচ্চাটা যখন দ্বিতীয় কদম রাখে সবকিছু শান্ত হয়ে যায়। ম্যাথিউ এবং মারিয়া সবকিছু উপেক্ষা করে বাচ্চাটাকে নিয়ে চার্চের আশ্রমের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, কিন্তু মারিয়ার মনে তখনো অদ্ভুত একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে "এই বাচ্চাটি কোথা থেকে এলো? তার আগমনে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো কেনো?"
মারিয়া ছোট্ট জিশুকে আশ্রমে নিয়ে আসার পর থেকে তার জীবন এক নতুন মোড় নেয়। আশ্রমের অন্যান্য শিশুদের মতো জিশুও সাধারণ ছিল না। তার চোখের গভীরতা, তার শান্ত ভঙ্গি, এবং নির্বাক কণ্ঠে যেনো জ্বলন্ত প্রশ্ন ছিলো। মারিয়া সবার থেকে আলাদা করে জিশুর প্রতি এক গভীর ভালোবাসা অনুভব করে। আশ্রমের অন্য শিশুদের প্রতি দায়িত্বের কোনো অভাব রাখে না, তবে জিশুর জন্য তার ভালোবাসা যেনো অপ্রতিরোধ্য। প্রতিদিনের নির্ধারিত কাজের শেষে, মারিয়া জিশুর পাশে বসে তাকে আদর করতো, তার নীরবতা ভেঙে মায়ের মমতাময়ী কণ্ঠে গল্প শোনাতো। আশ্রমের বাকি শিশুরা খেলাধুলায় মেতে থাকলেও, জিশু মারিয়ার সাথে নীরবতায় সময় কাটাতো। জিশুর নির্বাক কণ্ঠে যখন প্রথম "মা" শব্দটি ফুটে উঠে, মারিয়ার চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। এই এক শব্দই যেনো তাদের বন্ধনকে আরও মজবুত করে তুলেছিলো। জিশু মারিয়ার কোল থেকে নামতে চাইতো না। আশ্রমের সকলের কাছে এটা অদ্ভুত লাগলেও, মারিয়ার জন্য জিশুর এই নিবিড় ভালোবাসা ছিলো তার জীবনের এক অনন্য অধ্যায়। জিশুকে নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করতে গিয়ে, মারিয়া উপলব্ধি করে যে ভালোবাসা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
একদিন রাতে মারিয়া দিনের সব কাজ শেষ করে, ছোট্ট জিশুকে কোলে নিয়ে গল্প শোনাচ্ছিলো। চার্চের আশেপাশে সব ছিলো নীরব, রাতের হাওয়া বইছিলো শান্তভাবে। হঠাৎই দরজার বাইরে থেকে জোরে ধাক্কা দেওয়ার শব্দ আসে। মারিয়া প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও নিজের ভেতরের সাহসকে জাগিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খোলার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু জিশু তাকে বাঁধা দেয় মারিয়ার কাপড় শক্ত করে ধরে রাখে, যেনো বলতে চাচ্ছে, "দরজা খুলো না।" তার চোখে ছিলো অদ্ভুত ভয়ের ছায়া, যা আগের মতো সহজাত ছিলো না। মারিয়া জিশুর এই বাঁধাকে উপেক্ষা করে, তাকে শান্ত করে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খোলার সময় তার বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা খেলে যায়। দরজা খুলতেই দেখে, এক লোক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, তার চোখে ভয় এবং ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কাঁধে একটা ব্যাগ, লোকটি দেখতে বিদেশি, মুখ শুকিয়ে গেছে এবং কাঁপতে কাঁপতে বললো, "আমাকে বাঁচান প্লিজ! আমার পিছনে ছিনতাইকারীরা পড়েছে, তারা আমাকে মেরে ফেলবে। আমি একজন অস্ট্রেলিয়ান, এই দেশে ভ্রমণ করতে এসেছি। কিন্তু হঠাৎ করেই বিপদে পড়ে গেছি। আজ রাতটা আশ্রয় দিন, কাল সকালে চলে যাবো।" মারিয়া লোকটির অবস্থা দেখে তার মানবিকতা জয়ী হয়। সে লোকটিকে ভেতরে আসার আহ্বান করে। কিন্তু পিছন থেকে জিশু ভয় পেয়েছে। সে মারিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে, যেনো তার ভেতরে কোনো অজানা আশঙ্কা ফুটে উঠছে। জিশুর এই আচরণে মারিয়ার মনেও কিছুটা দ্বিধা জন্মায়। তবে লোকটির অসহায় অবস্থা দেখে সে সিদ্ধান্ত নেয় তাকে রাত্রে আশ্রয় দিতে। এই অজানা লোকের উপস্থিতি রাতের নির্জনতাকে আরও গা ছমছমে করে তুলেছিলো। জিশুর মনের মধ্যে থাকা আতঙ্ক কি কোনো পূর্বাভাস দিচ্ছিলো, নাকী শুধুই শিশুসুলভ ভয়?
মধ্যরাতে মারিয়ার হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা চারপাশে বিরাজ করছে, যেনো বাতাসেরও আওয়াজ নেই। চোখ খুলেই মারিয়া বুঝতে পারে, বিছানায় জিশু নেই। প্রথমে একটু ভয় পেয়ে যায়, কিন্তু ধীরে ধীরে উঠে বিছানা থেকে নেমে তাকে খুঁজতে শুরু করে। ঘরের জানালার বাইরে হালকা বাতাস বইছে, কিন্তু চারপাশটা কেমন যেনো অন্ধকারে ডুবে আছে, আর গা ছমছমে পরিবেশটা আরও ভারী হয়ে উঠছে। মারিয়া প্রথমে ঘরের আশেপাশে তাকায়, তারপর বাইরে বের হয়। পুরো চার্চটাই যেনো অন্ধকারে আচ্ছন্ন, কোথাও কোনো সাড়া নেই। হাতে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে মারিয়া ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। মোমের ক্ষীণ আলোয় চারপাশে ছায়া আর আলোয়ের খেলায় এক রহস্যময় অনুভূতি তৈরি হয়। মারিয়ার মনটা ভারী হয়ে আসে, অজানা আশঙ্কায় বুকটা ধুকপুক করছে। সে কিছুক্ষণ চারদিকে তাকিয়ে জিশুকে খুঁজতে থাকে, কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না। হঠাৎ, তার চোখ পড়ে ক্রসের দিকে। মোমবাতির আলোয় সে দেখতে পায়, জিশু যেনো কারও হাতের টানে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। সে আরও কাছে গিয়ে ভালো করে তাকায় এবং দেখতে পায় যে লোকটাকে সে চার্চে আশ্রয় দিয়েছিলো, যাকে সে বিশ্বাস করেছিল, সে জিশুকে টানতে টানতে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। লোকটির চোখে যেনো একটা পিশাচি দৃষ্টি, মুখে ভয়ংকর হাসি। জিশু অসহায়ের মতো টান খেয়ে যাচ্ছে তার হাতে। মারিয়ার হৃদয়ে তীব্র ভয় আর ক্রোধ একসাথে জেগে উঠে, তার পা যেনো মুহূর্তের জন্য জমে যায়। এই বিভীষিকাময় দৃশ্যের সামনে সে হিমশীতল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাতের মোমবাতির আলোও যেনো সেই ভয়কে প্রতিফলিত করে ম্লান হয়ে আসে। রাত গভীর হয়ে গেছে। চার্চের সব আলো নিভে যাওয়ার পর চারপাশে নীরবতা নেমে আসে। তবে এই শান্তির মাঝে ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে চলেছে, যা মারিয়া কল্পনাও করতে পারেনি। মারিয়া দূর থেকে তাকিয়ে জিশুকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে, কিন্তু লোকটি জিশুকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে মারিয়া চিৎকার করে উঠে, "কে আপনি? জিশুকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? ছেড়ে দিন ওকে!" লোকটি থমকে দাঁড়ায়। পিছনে ঘুরে দাঁড়িয়েই এক অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে জিশুর হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলে, "আমি ক্রিস্টোফার!" মারিয়ার মুখে বিভ্রান্তির ছাপ ফুটে উঠে। সে দ্রুত দুই পা এগিয়ে যায় এবং কঠোর স্বরে জিজ্ঞাসা করে, "আপনি যেই হোন না কেন, এখানে কেন এসেছেন?" ক্রিস্টোফার এক শয়তানি হাসি দিয়ে জবাব দেয়, "এই বাচ্চাটির জন্য!" মারিয়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, "মানে?" ক্রিস্টোফার জিশুর হাত ছেড়ে দিয়ে বলে, "ও কোনো সাধারণ শিশু না, ও হচ্ছে স্বয়ং লুসিফারের সন্তান। ওর জন্যই এতকিছু। আমি তো ওকে আমার সাথে নিয়ে যাবোই।" মারিয়ার মন ভয়ে সংকুচিত হয়, কিন্তু সে সাহসিকতার সাথে এক টানে জিশুকে নিজের আড়ালে এনে বলে, "সেই স্বপ্ন কোনোদিন সত্যি হবে না। আমি কিছুতেই ওকে তোমার সাথে যেতে দিবো না।" ক্রিস্টোফার খিটখিট করে হাসে এবং বলে, "লুসিফার কখনো নিজের বংশধরকে ছেড়ে দেয় না। নিজের বংশধরকে কাছে পেতে হলে সে পুরো পৃথিবী তছনছ করে দেবে। তুমি কি ভেবেছো, তুমি ওকে বাঁচাতে পারবে?" মারিয়া গলায় ঢোক গিলে নিচু স্বরে জিশুকে উদ্দেশ্য করে বলে, "জিশু, পালা এখান থেকে!" মায়ের আদেশ শুনে ছোট্ট জিশু এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে দৌড়ে পালিয়ে যায়। ক্রিস্টোফারের চোখে শয়তানি ঝিলিক। সে ক্ষিপ্ত হয়ে মারিয়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলে, "তুই কি ভেবেছিস, লুসিফারের বিষকে অমৃত করতে পারবি? তার শয়তানি শক্তিকে পবিত্রতায় রূপান্তর করতে পারবি? তাহলে তোকে এর শাস্তি পেতেই হবে।" এই কথা বলেই সে মারিয়ার কপালে প্রচণ্ড আঘাত করে। মারিয়ার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে, সে ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার চারপাশে চার্চের নীরবতা যেনো আরও গভীর হয়ে যায়। জিশু পালিয়ে গেছে, কিন্তু ক্রিস্টোফারের কথাগুলো মারিয়ার মনের গভীরে থেকে যায়। সে লুসিফারের সন্তান? মারিয়ার ভালোবাসা কি জিশুকে এই শয়তানি শক্তি থেকে মুক্ত করতে পারবে?
মারিয়া ধীরে ধীরে চোখ খোলে। চোখে ধাঁধাঁ লাগছে, মাথা ভারী মনে হচ্ছে। চারপাশটা ঝাপসা হলেও সে দেখতে পায়, সে এক বদ্ধ ঘরে পড়ে আছে। তার হাত পা শক্ত করে বাঁধা। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়েও সে নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। চারপাশের দেয়ালগুলো ভেজা, ঘরের মেঝেতে ধুলার আস্তর। মাথার উপর ঝুলানো ছোট একটা বাল্ব মিটিমিটি করে জ্বলছে, যা ঘরের অন্ধকার আর ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। মারিয়া কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করে। চারপাশে তাকিয়ে দেখে, ঘরের দরজাটা আলতো করে মেলে আছে। অদ্ভুতভাবে কোনো শব্দ নেই। বাইরে কি কেউ অপেক্ষা করছে? নাকী এটা পালানোর একটা সুযোগ? তার মনের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। এই মুহূর্তে তার প্রথম চিন্তা জিশুর কথা। জিশু কি পালাতে পেরেছে? সে কি নিরাপদ? ক্রিস্টোফার কি ওকে খুঁজে পেয়েছে? হঠাৎ ঘরের বাইরে থেকে পায়ের আওয়াজ শোনা যায়, ধীরগতিতে কেউ এগিয়ে আসছে। মারিয়ার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, সে তাড়াতাড়ি নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু হাত-পায়ের বাঁধন এতটাই শক্ত যে কোনোভাবেই ছাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। দরজার ফাঁক দিয়ে মারিয়া অজানা আতঙ্কে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ, ঘরের দরজার দিকে এক অদ্ভুত অনুভূতি অনুভব করে সে। তার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হতে শুরু করে। ঘরের অন্ধকারে ক্রিস্টোফার হাজির হয়, তার উপস্থিতি যেনো একটি ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। ক্রিস্টোফার কাছে আসতেই মারিয়া আতঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে, "আপনি? আপনি এখানে কী করছেন?" ক্রিস্টোফার তার ভয়ঙ্কর চোখে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, "মারিয়া, আমি জানি তুমি চেষ্টা করছো জিশুকে রক্ষা করতে। কিন্তু তুমি জানো না, এটি তোমার পক্ষে সম্ভব নয়।" মারিয়া বিস্মিত হয়ে বলে, "কিন্তু কেনো? আপনি কী চান?" ক্রিস্টোফার তার হাসিতে একটি শয়তানি ঝিলিক ছড়িয়ে দিয়ে বলে, "আমি চাই জিশুকে আমার সাথে নিয়ে যেতে।" মারিয়া শ্বাস ফেলে বলে, "কী? আপনি কি বলতে চাইছেন? জিশুকে কেনো নিতে চাইছেন?" ক্রিস্টোফার মৃদু হাসি দিয়ে বলে, "জিশু কোন সাধারণ শিশু নয়। সে লুসিফারের সন্তান। তার ক্ষমতা প্রচণ্ড। আমি তাকে আমার নিয়ন্ত্রণে নিতে চাই।" মারিয়া সজাগ হয়ে উঠে এবং ক্রিস্টোফারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো, "আপনি তা করতে পারবেন না। আমি জিশুকে রক্ষা করবো।" ক্রিস্টোফার তার চোখে আরও তীব্র দৃষ্টি দিয়ে বলে, "তুমি তো জানো না, তুমি কিছুই করতে পারবে না। যদি তুমি তাকে রক্ষা করতে চাও, তাহলে তোমাকে এখানে জিশুকে আসতে বলতে হবে।" মারিয়া হতভম্ব হয়ে বলে, "কীভাবে? আমি কীভাবে তাকে এখানে আসতে বলবো?" ক্রিস্টোফার তার কণ্ঠে ঠাণ্ডা হাসি রেখে বলে, "তোমার মন থেকে তার কাছে সাহায্য চাইতে হবে। যদি তুমি সত্যিই চাও সে আসবে। তুমি যদি সাহায্য চাও, সে আসবে।" মারিয়া মনে মনে সংকল্প করে এবং সজাগ হয়ে চোখ বুজে প্রার্থনা করতে শুরু করে। "জিশু, আমি তোমার সাহায্য চাই। দয়া করে আসো। তোমার সাহায্য ছাড়া আমি কিছুই করতে পারব না।" কিন্তু ক্রিস্টোফার ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠে এবং মারিয়ার দিকে এগিয়ে আসে। তার মুখে কুটিল হাসি, "বলো, আরো জোরে বলো। যদি তুমি চাও, তাহলে তাকে তোমার কাছে আনতে হবে।" মারিয়া আরও জোর দিয়ে বলে, "জিশু, আমি তোমার সাহায্য চাই। দয়া করে এসো।" ক্রিস্টোফার ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে বলে, "আরো জোরে! আরো জোরে বলো।" মারিয়া চিৎকার করে বলে, "জিশু, তুমি আসো! আমি তোমার সাহায্য চাই!" ক্রিস্টোফার তার চোখে এক বিষাক্ত ঝিলিক ছড়িয়ে দিয়ে বলে, "এখন তোমার সুযোগ শেষ হতে চলেছে। আমি অপেক্ষা করবো।" ক্রিস্টোফার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে এবং মারিয়া তার প্রার্থনা চালিয়ে যায়। তার চোখে জল ঝরছে এবং আতঙ্ক তার হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি আশা করেন, জিশু তার আহ্বানে সাড়া দিবেন এবং তাকে রক্ষা করবেন। একটু পরে, ঘরের মধ্যে অদ্ভুতভাবে পরিবর্তন আসে। চারপাশে আলো বিক্ষিপ্ত হতে শুরু করে এবং একটি নীরব শান্তি অনুভূত হয়। মারিয়া অবাক হয়ে দেখেন, ঘরের এক কোণে একটি আলোকময় উপস্থিতি গড়ে উঠছে। তার বুঝতে বাকি রইলো না, জিশু সত্যিই এসেছে। মারিয়া চোখের জল মুছে বলেন, "জিশু, তুমি এসেছো।" আলোকময় উপস্থিতি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে এবং এক শান্ত ভঙ্গিতে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে। মারিয়ার মনে একটি প্রশান্তি অনুভূত হয় এবং তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জিশুর মুখে একটি শান্ত হাসি দেখা যায়। জিশু তার দিকে তাকিয়ে বলেন, "মা" মারিয়া গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, "আমি জানি, তুমি আমাদের রক্ষা করবে।" আজকের রাতটি মারিয়া ও জিশুর জন্য এক ভয়াবহ রাত শুরু হয় তখন, যখন ক্রিস্টোফার তার কালো শক্তির পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে শুরু করে। ক্রিস্টোফার, তার চোখে এক ভয়ঙ্কর শয়তানি ঝিলিক নিয়ে, মন্ত্র পাঠ করতে থাকে। তার কণ্ঠস্বর গভীর এবং গম্ভীর, প্রতিটি শব্দ যেনো অন্ধকারের শক্তি ভরপুর। মারিয়া ও জিশুর সামনে দাঁড়িয়ে, ক্রিস্টোফার তার হাতে কালো যাদুর শক্তি প্রয়োগ করে, এবং পুরো ঘরটি অন্ধকারের দখলে চলে আসে। ক্রিস্টোফারের মুখে অদ্ভুত মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকে, এবং তার কণ্ঠস্বর ঘরের মধ্যে প্রলয়কারী এক শক্তি সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে, ঘরের দেওয়ালে দুইটি টকটকে লাল চোখের আকৃতি ভেসে উঠে, যা চরম ভয়ঙ্কর এবং আকর্ষণীয়। এই চোখের তীব্র আলো ঘরকে অন্ধকারের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। মারিয়া ও জিশুর মনে আতঙ্কের ঢেউ উঠে, তাদের শরীর কাঁপতে থাকে, এবং ধীরে ধীরে তারা জ্ঞান হারায়। ক্রিস্টোফার তার মন্ত্রের মধ্যে গভীরে চলে যায়, যেনো সমস্ত কালো শক্তি একত্রিত করে, এবং এক পর্যায়ে মারিয়াকে হত্যা করে। মারিয়া অচেতন হয়ে পড়ে, তার নিথর দেহ ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকে। ক্রিস্টোফার তার লাশ ওই ঘরে বন্ধ করে দিয়ে, অজ্ঞান জিশুকে নিয়ে চার্চের বাইরে চলে আসে। তার মুখে কুটিল হাসি, যেনো তার পরিকল্পনা সফল হয়েছে। চার্চের বাইরে এসে, ক্রিস্টোফার তার ব্যাগ থেকে একটি ডায়েরি বের করে। ডায়েরির শেষ পাতায় কিছু লিখতে শুরু করে। তার লেখায় কালো শক্তির মন্ত্র এবং কুফল প্রকাশ পায়, যা লুসিফারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ। শেষ পাতা পূর্ণ করে, ক্রিস্টোফার ডায়েরিটা ব্যাগে রেখে, অজ্ঞান জিশুকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দিকে রওনা দেয়।
এরপরের দিনগুলোতে, চার্চের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত পরিবেশ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকেরা জানায়, চার্চের মধ্যে লুসিফারের উপস্থিতি আছে এবং এটি একটি অভিশপ্ত স্থান। অতি দ্রুত, চার্চের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তি একের পর এক রহস্যময়ভাবে মারা যেতে শুরু করে। স্থানীয় জনগণের মধ্যে একটি বিশ্বাস তৈরি হয় যে চার্চে অশুভ শক্তি বাস করছে এবং এটি লুসিফারের বসবাসস্থল হয়ে উঠেছে। অবশেষে, চার্চটির মধ্যে অসংখ্য মৃত্যু ঘটতে থাকে, যা এক অভিশপ্ত স্থান হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে। ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষজন এড়িয়ে চলতে শুরু করে এবং শীঘ্রই চার্চ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি একটি ভীতিকর গল্প হিসেবে ইতিহাসে রয়ে যায়, যা স্থানীয় এবং বাইরের সব মানুষের মনে ভয় এবং আশঙ্কার উদ্রেক করে।
সময়ের স্রোতে ফিরে এসে, অলিভিয়া এক অদ্ভুত ভয়ের মধ্যে চিৎকার করে বলে, "ডায়েরির শেষ পাতা! ডায়েরির শেষ পাতা!" তার কাঁপা কণ্ঠ এবং ঘামানো শরীর দেখেই স্পষ্ট যে, সে খুবই আতঙ্কিত। চিশতি, ওহাইও, ও লিনডা অবাক হয়ে দেখে, অলিভিয়ার চোখে এক ভয়ের দৃষ্টি। চিশতি দ্রুত ডায়েরির শেষ পাতাটি খুলে পড়ে। পাতার উপরের দিকে বেশ কিছু লেখা রয়েছে, যা অক্ষরের সাথে সুরেলা একটি অভিশাপের মতো মনে হচ্ছে। পৃষ্ঠার এক কোণে চার্চের ঠিকানা লেখা আছে। ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠা পড়ার পর চিশতির মুখে এক তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। সে হঠাৎ করে চিৎকার করে বলে, "এই চার্চটা তো আমি চিনি!" অলিভিয়া অবাক হয়ে চিশতির দিকে তাকায় এবং প্রশ্ন করে, "মানে? তুমি কিভাবে চিনো?"৷ চিশতি কিছুটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলে, "আমি যখন পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরেছিলাম, তখন চিত্রা আপুর বাড়ির আশপাশে ঘুরছিলাম। সেই সময়ই ওই স্থগিত চার্চটি আমার নজর কারে। আরো একটি বিষয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে যাওয়ার ঠিক আগে, ওই চার্চ যার পূর্বপুরুষদের তার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো।" অলিভিয়া আরও আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়, "কার দেখা হয়েছিলো?" চিশতি দ্রুত উত্তর দেয়, "মার্থা! ওর কাছে চার্চ বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ও জানায় যে, ওই চার্চ বন্ধ হওয়ার পেছনে একটি রহস্য আছে, যা খুঁজতেই ও বাংলাদেশে এসেছেন।" অলিভিয়া মুগ্ধ হয়ে জানতে চায়, "তাহলে মার্থা কি সত্যিই ওই রহস্য জানতে পেরেছিলো?" চিশতি মাথা নেড়ে বলে, "জানি না, তবে মার্থা মূলত ওই রহস্যই জানার জন্যই এখানে এসেছে। ও জানতো যে চার্চটি বন্ধ হওয়ার পেছনে কিছু গভীর রহস্য রয়েছে, যা শুধুমাত্র অনুসন্ধানেই উন্মোচিত হতে পারে।" ওহাইও উদ্বিগ্নভাবে বলে, "তাহলে আমাদের উচিৎ, মার্থার সাথে যোগাযোগ করা। হয়তো সে আমাদের এই পরিস্থিতির সমাধান দিতে সাহায্য করতে পারবে।" চিশতি বললো, "তবে মার্থা কোথায় আছে সেটা জানতে হবে আগে।" এইটুকু বলে চিশতি আবারও ডায়েরির শেষ পাতা পড়তে লাগলো। সেই পাতার নিচের অংশে আরো লেখা রয়েছে, "যতদিন না জিশুর মৃতদেহ মারিয়ার মৃতদেহের সাথে মিলিত হচ্ছে, ততদিন এই অভিশাপ চলতে থাকবে।" এই ভয়াবহ লেখা পড়ে সবাই স্তম্ভিত হয়ে যায়। চিশতি, অলিভিয়া, ওহাইও, ও লিনডা একে অপরের দিকে তাকায়। তখন চিশতি জানতে চায়, "ক্রিস্টোফার কে? আর ওই ঘরটি এত বছর ধরে বন্ধ ছিলো কেনো? এর মধ্যে কী লুকানো ছিল?" ওহাইও মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবতে থাকে, তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে বলে, "ক্রিস্টোফার আমার বাবার দাদা, যার সম্পর্কে আমাদের খুব বেশি জানা ছিলো না। তবে আশেপাশের লোকেদের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, সে এক অশুভ শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছে।" লিনডা দ্রুত প্রশ্ন করে, "কিন্তু এই ঘরটি এত বছর ধরে কেনো বন্ধ ছিলো? এর ভিতরে কি এমন ছিলো?" ওহাইও হুঁশিয়ার হয়ে বলে, "এই ঘরটি অনেক ধরে বন্ধ ছিলো কারণ সেখানে একটি কুসংস্কার ও অদ্ভুত শক্তির আভাস ছিলো। তাছাড়া ক্রিস্টোফার ধনী হওয়ার লোভে সেই ঘরের মধ্যেই তন্ত্র বিদ্যা সাধনা করতো। এক পর্যায়ে গিয়ে সে ওই ঘরেই নিজের প্রাণ হারায়। অনেকেই বিশ্বাস করে যে, ঘরটি অভিশপ্ত। এর মধ্যে কোন অশুভ শক্তি লুকানো আছে" চিশতি চিন্তাভাবনায় মগ্ন হয়ে বলে, "তাহলে এই অভিশাপ এখন ছড়িয়ে পড়লো কেনো? ঘরটি খুলতেই কেন এই বিপদ বেড়ে গেল?" ওহাইও মাথা তুলে বলে, "এর কারণ হতে পারে যে, ঘরটি খুলে যাওয়ার সাথে সাথে কালো শক্তির মুক্তি ঘটেছে। লুসিফারের অনুসারী ক্রিস্টোফার সম্ভবত সেই শক্তির সাথে সম্পর্কিত এবং সে ঘরটি খুলে অভিশাপ ছড়িয়ে দিয়েছে।" লিনডা শঙ্কিত কণ্ঠে বলে, "এটা নিশ্চিত যে, সেই কালো শক্তির সম্মিলন এখন আরও শক্তিশালী হয়েছে। আমাদের অবশ্যই এটি থামাতে হবে, নইলে অভিশাপ ছড়িয়ে পড়বে এবং আরও মানুষের জীবন বিপন্ন হবে।" চিশতি একটু স্থির হয়ে বললো "আমি একটা কথা চিন্তা করছি!" অলিভিয়া চিশতির কাঁধে হাত রেখে বলে "কি বিষয়ে ভাবছো?" চিশতি আলতো করে অলিভিয়ার হাতের উপর নিজের হাত রেখে বললো, "আমাদের এখন জিশুর মৃতদেহ খুঁজতে হবে!" অলিভিয়া নরম সুরে বললো "গতরাতে আমরা যে কবরটি খুঁজে পেয়েছি ওই কবরটি কোনো ভাবে জিশুর কবর নয়তো?" চিশতি উঠে দাঁড়িয়ে বললো "হ্যাঁ! হতে পারে, তা নাহলে ওই কবর থেকে এমন অদ্ভুত শব্দ কেনো আসবে? আর আমরা সবাই-ই জিশুর আত্মাকে দেখেছি। তার মানে জিশুর কবর এই বাড়িতেি আছে আর সেটা হলো গতরাতে খুঁজে পাওয়া সেই কবরটি" ওহাইও, চিশতি, অলিভিয়া, ও লিনডা একসাথে ঠিক করে যে, তাদের সেই ঘরের অভিশাপ সমাধান করতে হবে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, শুধুমাত্র জিশু এবং মারিয়ার মৃতদেহকে মিলিত করে এই অভিশাপ মুক্ত করা সম্ভব। এর জন্য তাদের চার্চে ফিরে যেতে হবে এবং সঠিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। তার আগে তাদের জিশুর লাশ উদ্ধার করতে হবে।
ওহাইও, লিনডা, চিশতি এবং অলিভিয়া গভীর রাতের আঁধারে জিশুর কবরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। পুরো জায়গাটায় এক ধরণের গা শিউরে উঠা শীতলতা বিরাজ করছিলো, যেনো প্রকৃতি নিজেই তাদের কবর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাচ্ছে। তাদের হাতের শাবলগুলো অদ্ভুত এক শীতলতার আভাস দিচ্ছিলো, তাদের মনে হচ্ছিলো, কেউ যেনো তাদের লক্ষ্য করে তাকিয়ে আছে।
তারা জানতো, কবরটি জিশুর, এবং এখান থেকে জিশুর লাশ উদ্ধার করার চেষ্টা যেকোনো সাধারণ ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। তবে তারা জানতো না যে, কবরের রক্ষক হিসেবে ক্রিস্টোফারের অশুভ এবং প্রতিশোধপরায়ণ আত্মা তাদের উপর নজর রাখছে। তারা যখন কবরের কাছে পৌঁছল, চারপাশের গাছগুলোতে হঠাৎ করে ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করলো। মাটি খুঁড়তে শুরু করার ঠিক পরপরই, যেনো কোথা থেকে গভীর এক গর্জন শোনা গেলো। হঠাৎ, অলিভিয়া জোরে চিৎকার করে উঠলো, "আমাকে কেউ টেনে ধরেছে!" অলিভিয়ার পা মাটির সাথে আটকে গেছে, মাটির ভেতর থেকে কোনো এক অদৃশ্য হাত তাকে টেনে নিচ্ছে। চিশতি দ্রুত তার দিকে ছুটে গিয়ে তাকে টেনে তুলতে চেষ্টা করলো, কিন্তু তারা দু'জনেই মাটিতে পড়ে গেলো। ওহাইও তার হাতে থাকা শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়তে গেলে শাবলটি হঠাৎই তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে যায়। একটি অদৃশ্য শক্তি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়, তার শরীর ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। তার মুখ থেকে কথা বের হচ্ছিলো না, কেবল একটি তীব্র আতঙ্কের কণ্ঠস্বর তার ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। হঠাৎ, বাতাসে ভেসে উঠলো এক তীক্ষ্ণ হাসি, যা চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। সেই হাসির সাথে ক্রিস্টোফারের ভয়ানক কণ্ঠস্বর শুনতে পায় ওরা, "তোমরা এখানে এসেছো ঠিকই, কিন্তু ফিরে যেতে পারবে না। আমি তোমাদের ফিরে যেতে দেবো না।" এই কণ্ঠস্বর যেনো সবকিছু থেকে আলাদা, অদৃশ্য এক শক্তির উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছিলো। এখন ওরা বুঝতে পারলো, এটি কোনো সাধারণ কাজ নয়। ওরা যে কাজ করছে তা একটি শাস্তি বয়ে আনছে। তারা কবর থেকে জিশুর লাশ বের করার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু ক্রিস্টোফার বাঁধা দিতে ব্যস্ত। ওরা আবারও কবর খোঁড়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু যতবার মাটি সরাতে চায়, ততবারই অদ্ভুত কিছু ঘটতে থাকে। লিনডা মাটির কাছে বসে ছিলো, হঠাৎ তার মাথার পেছনে ভয়ঙ্করভাবে কিছু একটা আঘাত করে। সে চিৎকার করে উঠলো, "আমার মাথা! কেউ আমাকে আঘাত করেছে!" সবাই সেদিকে তাকায়, অথচ আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছিলো না।হঠাৎ'ই ওহাইওর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এলো, তার শরীরের উপর অদৃশ্য শক্তির আক্রমণ নেমে এলো, যেনো কেউ তাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। হঠাৎ মাটির নিচ থেকে একটি বিকৃত মুখের আবির্ভাব হলো। চোখ দুটি লাল হয়ে জ্বলজ্বল করছে, ঠোঁটের কোণায় বিকৃত হাসি ফুটে উঠছে। তাদের বুঝতে বাকি রইলো না, এটাই ক্রিস্টোফারের আত্মা। ক্রিস্টোফার ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, ক্রিস্টোফারের অশুভ আত্মা মাটি থেকে উঠে আসছে, যেনো মৃতের জগতের সমস্ত ভয়ঙ্কর অনুভূতি নিয়ে। মাটি থেকে তার শরীরের অংশগুলি বেরিয়ে এসে ওদের চারকজনকে পেঁচিয়ে ধরলো।হঠাৎ ওদের পায়ের তলার মাটিগুলো এমনভাবে সরতে লাগলো যেনো কেউ মাটির নিচ থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা প্রচণ্ড ধাক্কায় মাটিতে ছিটকে পড়লো, কিন্তু কেউই দাঁড়াতে পারছিলো না। প্রতিবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে মাটির নিচ থেকে অদৃশ্য শক্তি এসে তাদের টেনে ধরছিলো। চারপাশের গাছগুলোতে ঝাঁপিয়ে পড়া ছায়াগুলো মূর্তির মতো নড়ে উঠলো। ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে হালকা নীলাভ আলো বেরিয়ে আসতে শুরু করলো, এবং সেই আলোর মধ্য দিয়ে দেখা গেলো ক্রিস্টোফারের আত্মা ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার পায়ের শব্দ বাতাসে প্রতিধ্বনি ছড়াচ্ছে, তার চোখের গভীরতা যেনো জ্বলন্ত আগুনের শিখায় ভরা ছিলো।অলিভিয়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো, "আমরা এটা আর চালিয়ে যেতে পারবো না! আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে!" কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ক্রিস্টোফারের আত্মা তাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা কালো ছায়াগুলো তাদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিলো, আর প্রতিবার তাদের দেহ স্পর্শ করলে তারা অনুভব করে এক ভয়ানক ঠাণ্ডা আভাস। শেষবারের মতো ওরা কবর থেকে পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ক্রিস্টোফারের আত্মার আক্রমণ এতটাই তীব্র ছিলো যে ওদের কেউই সঠিকভাবে দৌড়াতে পারছিলো না। ওদের পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছিলো, মাটির ভেতর থেকে হাতের মতো কিছু টেনে ধরেছিলো ওদের। এক সময়, ওহাইওর পা মাটির নিচে ঢুকে যায়, সে যেনো কোনো ফাঁদের মধ্যে পড়ে গেছে। সে টানাটানি করে বের হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ক্রিস্টোফারের আত্মা তাকে আরো গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের চারপাশে ভয়ঙ্কর বাতাস বয়ে যাচ্ছে, অদৃশ্য মুখগুলো আকাশ থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে হাসছিল, আর ক্রিস্টোফার বারবার তাদের উদ্দেশে বলছিলো, "তোমরা ফিরে যেতে পারবে না। এখানে তোমাদের মৃত্যু নিশ্চিত।" ওদের চিৎকার যেনো রাতের গভীরে ধ্বনিত হলো, চারপাশের অন্ধকারকে ভেদ করে। আতঙ্কিত ও অসহায় মুহূর্তে চিশতি চিৎকার করে বললো, “আমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে হবে! আমি আমাদের ধর্ম অনুযায়ী তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি, আপনারাও যথাসাধ্য নিজেদের ধর্মানুযায়ী সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।” চিশতির কথা শুনে ওহাইও, লিনডা এবং অলিভিয়া তৎক্ষণাৎ জোরে জোরে প্রার্থনা করতে শুরু করলো। তারা লুসিফার এবং অন্যান্য অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মন্ত্র পাঠ করতে লাগল "The Lord will fight for you, and you have only to be silent."
"Our Father in heaven, hallowed be your name, your kingdom come, your will be done, on earth as it is in heaven. Give us this day our daily bread, and forgive us our debts, as we also have forgiven our debtors. And lead us not into temptation, but deliver us from evil."
"I can do all things through Christ who strengthens me."
"Even though I walk through the valley of the shadow of death, I will fear no evil, for you are with me; your rod and your staff, they comfort me."
"Put on the full armor of God, so that you can take your stand against the devil’s schemes. For our struggle is not against flesh and blood, but against the rulers, against the authorities, against the powers of this dark world and against the spiritual forces of evil in the heavenly realms."
এদিকে, চিশতিও ক্রিস্টোফারের আত্মার হাত থেকে রক্ষার জন্য সূরা পাঠ করতে লাগলো।
"আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া, আল-হাইয়ুল-কাইয়ূম। লা তাখুঝুহু সিনাতুন ওয়া লা নাওম। লাহুমা ফিস-সামাওয়াত ওয়া মা ফিল-আরদ। মান ধাল্লাজি ইয়াশফা 'ইন্দাহু ইল্লা বি-ইজনিহি। ইয়াআলেমু মা বাইন আইদিহিম ওয়া মা খলফাহুম। ওয়া লা ইউহিতুনা বি-শাই' ইন মিন 'ইলমিহি ইল্লা বিমা শাআ। ওয়াসিয়আ কুরসিউহু আস-সামাওয়াত ওয়াল-আরদ। ওয়া লা ইয়আউদুহু হিফধুহুমা। ওয়াহুয়াল আলী ইল-কবীর।"
"কুল আউজু বি’রাব্বিল ফালাক। মিন শাররি মা খালাক। উয়া মিন শাররি গাসিকিন ইজা ওয়াকাব। উয়া মিন শাররি নাফাসাতি ফিল উকাদ। উয়া মিন শাররি হাসিদিন ইজা হাসাদ।"
"কুল আউজু বি’রাব্বিন নাস। মেলিকিন নাস। ইলাহিন নাস। মিন শাররি আলওাসওয়াসিল খন্নাস। আল্লাজি ইউয়াসওয়িসু ফি সোদুরিন নাস।"
"কুল হুয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস সামাদ। লা ইয়ালিদু ওয়া লা ইয়ুলাদ। ওয়ালা কানা লাহু কুফুওয়ান আহাদ।"
"কুল ইয়াইয়োহাল কাফিরুন। লা আ’বুদু মা তাবুদুন। ওয়ালা অ্যানতুম আ’বিদুন মা আ’বাদ। ওয়ালা আমি আ’বিদুন মা আবাদতুম। ওয়ালাআন্তুম কাফিরুন। লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়াদিন।"
ওহাইও, লিনডা , চিশতি ও অলিভিয়া একত্রে মন্ত্র ও সূরা পাঠ করছে। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া মন্ত্র সূরার আওয়াজ চারপাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যত তীব্রতা বাড়ছে, ততই ক্রিস্টোফারের আত্মার উৎপাদ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। সে মনে করতে শুরু করে, তার চারপাশের পরিবেশ বদলাচ্ছে, এবং অজানা আশঙ্কা তাকে তাড়া করছে। একপর্যায়ে, ক্রিস্টোফার তার পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে হার মানে। সে অস্থিরতা নিয়ে চিৎকার করে বলে, “আমি এখানে থাকতে পারছি না!!” এই বলে সেখান থেকে চলে যায়। ওহাইও, লিনডা, চিশতি ও অলিভিয়া এরপরেও শান্তিপূর্ণভাবে মন্ত্র ও সূরা পাঠ করতে থাকে, মনে হচ্ছে যেনো তাদের কাজের গুরুত্ব অনেক। এরপর পরিবেশ শান্ত হয়ে এলে ওরা চারজন একসঙ্গে জিশুর কবরের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তারা কবরটি খুঁড়তে শুরু করে। মাটি সরাতে সরাতে একসময় একটি কফিন বেরিয়ে আসে। চারজন মিলে কফিনটি ধরাধরি করে উপরে তোলে। এরপর কফিনটি উন্মুক্ত করতেই তারা নিজেদের মধ্যে উত্তেজনা ও ভয়ের মিশ্রণ অনুভব করে। কফিনের মুখ খুলতেই ভিতরে একটা মৃত মানুষের কঙ্কাল দেখতে পায়। হঠাৎ তাদের চোখ কিছুটা দূরে গিয়ে আটকায়। তারা ছোট্ট জিশুর আত্মা দেখতে পায়। জিশু তাদের দিকে তাকিয়ে এক মিষ্টি হাসি দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। জিশুর হাসি যেনো শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। ওদের বুঝতে বাকি রইলো না, ওরা সত্যি সত্যিই জিশুর লাশ খুঁজে পেয়েছে।
রাতের বেলা নিরিবিলি বাড়িটি যেনো এক প্রশান্তির আবাস। চাঁদের কোমল আলো ফেলে বাড়ির জানালায়, এবং সেই আলোতে ঘরটি উজ্জ্বল হয়। চারপাশে নীরবতা, মাঝে মাঝে গাছের পাতার মৃদু শব্দ শোনা যায়। বাড়ির আঙিনায় স্নিগ্ধ বাতাস প্রবাহিত হয়, যেনো রাতের নিঃশব্দ গানের একটি অংশ। "আমাদের এখন এই কঙ্কালটা বাংলাদেশে নিয়ে যেতে হবে" বললো অলিভিয়া। "হ্যাঁ! কিন্তু তার জন্য অনেক সরকারি নিয়ম মেনে তারপর যেতে হবে।" একটু চিন্তিত হয়ে বললো চিশতি। "এসব তুমি চিন্তা করো না, সব ব্যবস্থা আমি করে দিবো" অভয় দিয়ে বললো ওহাইও। অলিভিয়া ওহাইওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে কিছু বলার আগ্রহ, কিন্তু কিছুটা দ্বিধায় বলতে পারছে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অলিভিয়া বললো "বাবা, আমি একটা কথা বলতে চাই!" সাহস করে এতটুকু বলেই থেমে গেলো অলিভিয়া। "হ্য বলো?" বললো ওহাইও। অলিভিয়া গভীর গভীর অনুভূতি নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো "বাবা! এই রহস্যের সিলসিলা উন্মোচন করার জন্য যেখানে যাচ্ছি, সেখান থেকে আর ফিরতে চাই না।" ওহাইও অবাক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে "মানে? কি বলছিস তুই?" অলিভিয়া দৃঢ়ভাবে বলে "বাবা! আমি বাকিটা জীবন চিশতির সাথে কাটাতে চাই।" এই বলে অলিভিয়া চিশতির হাত শক্ত করে ধরলো। "কি?" ওহাইও অবাক হয়ে অলিভিয়ার দিকে তাকায়। "হ্যাঁ বাবা! তুমি চিন্তা করো না। আমি এমন একটা মানুষকে বেছে নিয়েছি যে, নিজে হাজার কষ্টে থাকলেও আমাকে সবসময় আগলে রাখবে। ওর মধ্যে আমি সেই ভালোবাসাটা খুঁজে পেয়েছি যার জন্য আমি অপেক্ষায় ছিলাম" চিশতির দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো অলিভিয়া। "কিন্তু! চিশতি কি চায় সেটা তো জানতে হবে?" নরম সুরে বললো ওহাইও। "অলিভিয়া যদি মনে করে, আমার সাথে ও ভালো থাকবে তাহলে আমি ওর ভালো থাকার দায়িত্ব নিতে চাই। স্যার!" এক গাল মুচকি হেসে অলিভিয়ার হাত শক্ত করে ধরলো চিশতি। "তাহলে যাওয়া যাক আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশে?" মৃদু হেসে বললো অলিভিয়া। "হ্যাঁ চলো! আমি প্রস্তুত।" বললো চিশতি।
-------
বাংলাদেশে ফেরার অনুভূতি অসাধারণ। দীর্ঘদিন পর সেই অতিপরিচিত জায়গাগুলো, পরিচিত গন্ধ, এবং মানুষের মুখাবয়ব দেখে হৃদয়ে এক আনন্দের ঢেউ উঠেছে চিশতির মনপ। শহরের কোলাহল, রিকশার হর্ণ, এবং রাস্তার পাশে বিক্রেতাদের কণ্ঠস্বর সব কিছুতেই যেনো জীবনের রস টের পাচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বারবার মুগ্ধ করে। সবুজ ক্ষেত, নদীর ঢেউ, এবং গাছপালার ছায়ায় যেনো অতীতের সুখস্মৃতি ভেসে উঠে। আবহাওয়ার উষ্ণতা, বর্ষাকালের মিষ্টি বৃষ্টির গন্ধ, এবং শীতকালে হালকা কুয়াশা, সবই যেনো এক অন্য রকম অনুভূতি সৃষ্টি করে। "অলিভিয়া, আমরা অবশেষে জিশু কঙ্কালটি নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এলাম!" বললো চিশতি। "হ্যাঁ, এটা সত্যিই একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ছিলো।" মৃদু হেসে বললো অলিভিয়া। "ওহাইও স্যার আমাদের জন্য সবকিছু ব্যবস্থা করেছে। তার সাহায্য ছাড়া সম্ভব হতো না!" অলিভিয়ার দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বললো চিশতি। "সত্যি! বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। উনি আমাদের নতুন করে বাঁচতে উৎসাহ দিয়েছেন" চিশতির কাঁধে মাথা রেখে বললো অলিভিয়া। "এখন আমাদের নতুন রহস্য উন্মোচন করার সময় এসেছে।" অলিভিয়ার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো চিশতি। "ঠিক বলছো, এখান আমাদের আরও অনেক কিছু খুঁজে বের করতে হবে।" মুহূর্তেই চিশতির কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে নিয়ে বললো অলিভিয়া।
দিন পেরিয়ে যখন সন্ধ্যা এলো তখন অলিভিয়া এবং চিশতি তাদের গন্তব্যে পৌঁছালো। অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার উদ্দেশ্য ছিলো এই পরিত্যক্ত চার্চ। দুজনেই উত্তেজনায় ভরা, যখন তারা চার্চের দিকে পা বাড়ায় তখনই হঠাৎ, এক মহিলার উপস্থিতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। তার গায়ের রঙ দুধে আলতা, এবং পরনে ছিলো টকটকে লাল শাড়ি। চোখগুলো ছিলো হরিণের মতো, গাঢ় কাজলে ঢাকা। কোঁকড়ানো চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছিলো, হাতে ও গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ঝলমল করছিলো। মহিলার দিকে একবার তাকিয়েও তারা চার্চের গেইটের দিকে পা বাড়াতে থাকে। তখনই মহিলাটি তার গভীর গলায় বললো, "আগুনের উপর হাঁটলে পা তো পুড়বেই! এখনও সময় আছে, পথ পরিবর্তন করো।" উনার কথা যেনো এক সতর্কতা, যা অলিভিয়া এবং চিশতির মনে অস্থিরতা এনে দেয়। তারা একে অপরের দিকে তাকায়, বুঝতে পারে যে এই মহিলার উপস্থিতি এক অদ্ভুত সংকেত। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য স্থির, চার্চের রহস্য জানার জন্য তারা আর পিছিয়ে পড়বে না। ভিতরে প্রবেশ করতে চেয়েও পিছনে গেলো চিশতি ও অলিভিয়া। মহিলার মুখে এই কথা শুনে চিশতি ভাবাবেগে ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, "কে আপনি?" মহিলাটি মুচকি হেসে উত্তর দিলো, "পবিত্রা।" তার হাসি যেনো রহস্যময়, একটি প্রাচীন ইতিহাসের ছায়া নিয়ে। অলিভিয়া এবং চিশতি একে অপরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, পবিত্রা শুধুই একজন সাধারণ মানুষ নয়, তার উপস্থিতি যেনো এই চার্চের সাথে সম্পর্কিত কিছু গভীর ও গূঢ় সত্যের নির্দেশক। পবিত্রার চোখে একটি গভীর দৃষ্টি ছিলো, যা তাদের মনে এক অদ্ভুত উদ্বেগ সৃষ্টি করে। "এখনও সময় আছে" এতটুকু বলে থামলেন। তিনি আবারও বললেন, "তোমাদের যাত্রা যদি সঠিক হয়, তবে পথ খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু বিপদ আসন্ন।" অলিভিয়া সংকল্পবদ্ধভাবে বললো, "আমরা জানি, আমাদের এই রহস্যের মোকাবিলা করতে হবে।" পবিত্রা কিছুক্ষণ নিরীহ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর, তাঁর মুখে একটি রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো, যেনো কিছু বলতে চেয়েও তিনি চুপ থাকলেন। পবিত্রা আবারও বললো, "আকাশে যখন সপ্তসিমন্ডল দেখা দিবে, তখন দুই আত্মার মিলন হলেই সব সমস্যার সমাধান ঘটবে।" এই কথাগুলো শোনার পর অলিভিয়া এবং চিশতি একটু থমকে গেলো। চিশতি জিজ্ঞেস করলো, "সপ্তসিমন্ডল? এর মানে কী?" পবিত্রা গভীরভাবে বললেন, "এটি একটি প্রাচীন সঙ্কেত, যা বোঝায় দুই আত্মার শক্তি একত্রিত হলে অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তবে সেই মিলনের জন্য তোমাদের অনেক কিছু অতিক্রম করতে হবে। ভয়, সন্দেহ এবং অসম্পূর্ণতা।" অলিভিয়ার মনে হলো, তাদের যাত্রা এত সহজ হবে না। "কিন্তু আমরা কীভাবে জানবো সেই আত্মাগুলো কবে মিলিত হবে?" অলিভিয়া জানতে চাইলো। পবিত্রা মৃদু হাসলেন, "এটা তোমাদের অন্তরেই জানা আছে। বিশ্বাস এবং সাহসের সাথে যদি এগিয়ে যাও, তবে সঠিক সময় তোমরা অনুভব করতে পারবে।" মহিলার কথাগুলো যেনো তাদের মনে এক নতুন আশা তৈরি করে, সাথে ভয়ও। তারা বুঝতে পারছিলো, তাদের এই অভিযানে অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হবে। পবিত্রার কথা শুনে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে চার্চের দিকে এগিয়ে গেলো। পবিত্রাও তাদের দিকে আশীর্বাদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
চার্চের দরজা খুলতেই একটি অন্ধকার পরিবেশ তাদের স্বাগত জানায়। বাতাসে একটি মৃণাল গন্ধ, যেনো শাশ্বত হতাশার চিহ্ন। যখন তারা ভিতরে প্রবেশ করে, চারপাশে অদ্ভুত ছায়া ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্ধকারে অলিভিয়া এবং চিশতি কিছুটা ভয় পাচ্ছে। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে পড়ে এক ভয়ঙ্কর শব্দে। হঠাৎ, পিছন থেকে একটি কাঁপা কণ্ঠ ভেসে আসে "অবশ্যম্ভাবী… ফিরে যাও!" এই ডাককে উপেক্ষা করে চিশতি আর অলিভিয়া এগিয়ে যেতে থাকে। পিছন পিছন আত্মাদের ছায়া দ্রুত তাদের দিকে ধেয়ে আসে, যেনো তাদের চারপাশে থেকে ঘিরে ফেলেছে। হঠাৎ কেউ৷ অলিভিয়ার চুল ধরে টেনে মাটিতে ফেলে দেয়। মাটিতে পরতেই অলিভিয়ার ঠিক মুখের উপর এক ভয়ংকর মুখ ভেসে উঠে, চোখগুলো একেবারে লাল, যেনো আগুন জ্বলছে। চিশতি চেষ্টা করে অলিভিয়াকে রক্ষা করতে, কিন্তু চার্চের অন্য আত্মারা চিশতির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেনো তাকে নরকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। পিছন থেকে কয়েকশো আত্মা যচিশতিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে চিশতি শক্ত করে অলিভিয়ার হাত ধরে আছে। আত্মাদের মুখে অভিশাপের ছাপ, তাদের মুখ দিয়ে একটি শীতল হাওয়া প্রবাহিত হয়। যা চিশতি ও অলিভিয়ার হৃদয় কেঁপে উঠে। অলিভিয়া চিৎকার করতে চায়, কিন্তু কণ্ঠস্বর বের হয় না। আত্মারা তাদের চারপাশে তাণ্ডব চালায়। অলিভিয়ার চুল ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আর অন্য আত্মারা তাদের উদ্দেশ্যে অমানবিক হাসি হাসে। চিশতিও অলিভিয়ার হাত ছাড়তে নারাজ। "হাত যেহেতু ধরেছি শেষ অব্দি ধরে থাকবো" চিৎকার করে বলছে চিশতি। কোনো কিছু করার সাহস পাচ্ছে না চিশতি। পরিস্থিতি বুঝে আয়াতুল কুরসি পড়তে আরম্ভ করলো। মুহূর্তেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এলো। দুজনই উঠে দাঁড়ায়। এক পা দুপা করে এগোচ্ছে। চার্চের দেয়ালের ছায়া যেনো জীবন্ত হয়ে উঠেছে, ভয়ঙ্কর আকৃতিতে ভরা। অলিভিয়া এবং চিশতি শেষ পর্যন্ত নিজেদের শক্তি একত্রিত করে আত্মাদের হাত থেকে মুক্তি পেলো। কিছুটা লড়াইয়ের পর, তারা আত্মাদের কবল থেকে মুক্ত হতে সক্ষম হয়। অলিভিয়া এবং চিশতি দ্রুত এগিয়ে যায়, চার্চের ভিতরের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলতে চলতে বন্ধ রুমের দিকে। অবশেষে, তারা সেই বন্ধ রুমের দরজার সামনে পৌঁছে যায়, যেখানে মারিয়ার মৃতদেহ আটকে রয়েছে। দরজাটি ভাঙার জন্য তাদের নতুন শক্তি প্রয়োজন। অলিভিয়া ব্যাগ থেকে সেই অমসৃণ পাথরটি বের করে, যা একমাত্র লুসিফারের যাদুকে ভেঙে দিতে পারে। এরপর ব্যাগ থেকে পান্ডুলিপি বেরে একসঙ্গে প্রাচীন মন্ত্র পাঠ করে। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে যায়, দরজা খুলতেই দেখে মারিয়ার মৃত কঙ্কাল শান্তিতে শায়িত। আত্মাদের শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রা শেষ হয়, এবং তারা মারিয়াকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞা করে।
চিশতি আর অলিভিয়া যখন মারিয়ার মৃত কঙ্কালটি খুঁজে পায়, চিশতি গভীর গলায় বলে, "অলিভিয়া! আমাদের উচিত মারিয়ার কঙ্কালটা চার্চের বাইরে খোলা আকাশের নিচে নিয়ে যাওয়া।" অলিভিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "কিন্তু কেনো? বাকি কাজটা তো এখানেই করতে পারি?" চিশতি মৃদু হেসে মারিয়ার মৃত কঙ্কালের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, "পবিত্রা কি বলেছে মনে আছে? উনি বলেছেন, আকাশে সপ্তসিমন্ডল দেখা দিলেই জিশু আর মারিয়ার আত্মা মিলিত হবে। এবং এই অভিশাপও খন্ডন হবে!" অলিভিয়া চিন্তা করতে করতে বলেন, "হ্যাঁ! মনে আছে। তাহলে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে যেতে হবে।" চিশতি উত্তেজিতভাবে কঙ্কালের দিকে তাকিয়ে বলে, "এই কাজটি করতে পারলে, আমরা কেবল মারিয়াকেই নয়, বরং এই চার্চের সকল অভিশাপকে মুক্ত করতে পারব।" দুজনেই একত্রিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, কঙ্কালটিকে নিরাপদে বাইরে নিয়ে যেতে হবে। তারা কঙ্কালটি অত্যন্ত সাবধানে ধরে নিয়ে চার্চের গেইটের দিকে এগোতে শুরু করে। তাদের হৃদয়ে আশার একটি নতুন আলো জ্বলে উঠে, সপ্তসিমন্ডলের আশার আলো। এরপর চিশতি তার কাঁধে থাকা ব্যাগ থেকে জিশুর মৃত কঙ্কালটি বের করে মারিয়ার মৃত কঙ্কালের পাশে শুইয়ে দেয়। দুই কঙ্কাল একসাথে শুয়ে রয়েছে, যেনো তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য সংযোগ সৃষ্টি হয়েছে। চিশতি বললো, "এখন আমাদের একটাই আশাচ কখন সপ্তসিমন্ডল দেখা দিবে।" অলিভিয়া আকাশের দিকে তাকায়, মনকে শান্ত করার চেষ্টা করে। "পবিত্রা যে বলেছিলো, সেটাই তো আমাদের অনুসরণ করতে হবে, সে বলেছিলো আকাশে যখন সপ্তসিমন্ডল দেখা দিবে, তখনই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।" তারা একত্রে বসে থাকে, নীরবতা ঘিরে ধরে। চারপাশের পরিবেশে এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছে। অলিভিয়া আর চিশতির মনেও সাহসের এক আলো জ্বলতে থাকে, যেনো প্রত্যাশার নতুন সূর্য উদয় হচ্ছে। অতঃপর, তারা অপেক্ষা করতে শুরু করে, আকাশে সপ্তসিমন্ডলের চিহ্ন খোঁজার জন্য। এক সঙ্গে তারা বিশ্বাস করে, মিলন ঘটলে সকল দুঃখ-দুর্দশা দূর হবে, এবং নতুন এক জীবন শুরু হবে। এরপর চিশতি ও অলিভিয়ার অপেক্ষার অবসান ঘটে যখন আকাশে সাতটি গ্রহ একত্রিত হয়, অর্থাৎ সপ্তসিমন্ডল দেখা দেয়। এই মহৎ মুহূর্তে, সপ্তসিমন্ডলের আলো জিশু ও মারিয়ার মৃত কঙ্কালের উপরে পড়তে শুরু করে। চিশতি তার হাতে থাকা অমসৃণ পাথরটি দুই দেহের মাঝে রেখে দেয়, এবং অলিভিয়া প্রাচীন পান্ডুলিপি থেকে মন্ত্র পাঠ করতে শুরু করে। সে শব্দগুলো উচ্চারণ করতেই, মুহূর্তেই দুই দেহের মাঝে থাকা অমসৃণ পাথরটি মসৃণ ও জ্বলমলে হয়ে উঠে। কিছুক্ষণ পর, দুই কঙ্কাল যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সেই রহস্যময় মুহূর্তে, অলিভিয়া এবং চিশতি দেখতে পায়, কিছুটা দূরে মারিয়ার আত্মা ছোট্ট জিশুর আত্মার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখের দিকে তাকাতেই, মারিয়া আর জিশু একসাথে মুচকি হেসে বিদায় নেয়। এটি ছিলো এক অসাধারণ দৃশ্য, যেখানে প্রেম ও আত্মার মিলনের একটি নতুন অধ্যায় সূচনা হলো। অলিভিয়া এবং চিশতির মনে তখন এক গভীর শান্তি বিরাজ করতে শুরু করে, যা তাদের এই অভিযানের সার্থকতা প্রমাণ করে।
------------
ঘন কালো অন্ধকার রাত। এতটাই অন্ধকার যে কারো মুখ দেখার সাধ্য নেই। অন্ধকারে বুঝা যাচ্ছে, কেউ একজন অন্য কারো একজনকে টানতে টানতে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের পিছনে আরো একজন ছুটছে, টেনে নিয়ে যাওয়া মানুষটাকে বাঁচানোর প্রচেষ্টায়। অনেকটা পথ দৌঁড়ানোর পর, পিছনে ছুটতে থাকা মানুষটা মেয়ের কণ্ঠে চিৎকার করে বললো, "দাঁড়াও! ছেড়ে দাও ওকে! নয়তো এর পরিণাম খুব খারাপ হবে!" মেয়েটির কথা শুনে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা অপরজনের হাত আরো শক্ত করে ধরে। এই দৃশ্য দেখে মেয়েটি আবার চিৎকার করে বললো, "এর ফল তোমাকে ভোগ করতে হবে!" এই বলে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে এক বিকট শব্দে চেঁচিয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ আর আকৃতি পাল্টাতে শুরু করে। মাথার প্রতিটা চুল যেনো এক একটা বিষধর সাপে পরিণত হয়, এবং চোখগুলো জ্বলন্ত লাভার আগুনের মতো আলো ছড়াতে থাকে। অজস্র সাপের আড়াল থেকে এক বিশাল বেনী করা চুলের গুচ্ছ উড়ন্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসে। এমন ভয়ংকর দৃশ্য দেখে, হাত ছেড়ে দিয়ে ছায়া মানুষটা মেয়েলি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, "ক-কে! কে তুমি?" তার প্রশ্ন শুনে, মেয়েটি খিটখিট করে হেসে বললো, "আমি পঞ্চশক্তির অধিকারী! মহাপঞ্চী! পঞ্চরূপা।"
--
"নাআআআআআআআআআ!" ঘুম থেকে চেঁচিয়ে উঠলো চিশতি। "উফফফ! দুঃস্বপ্ন ছিলো"
--
শ্রাবণের টপটপ বৃষ্টিভেজা চারিদিক এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয় মনে। গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পরতে দেখার শখটাও সেই আগের মতোই প্রখর। তার সাথে জমে থাকা পানিতে টুপুর টাপুর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অতীত জাগরণের এক অন্যতম স্মৃতি। বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি অনুভব করছে চিশতি। কিছু একটা গভীর চিন্তায় মগ্ন। ক্লান্তিমাখা মুখটা একটু সুখ কুড়িয়ে আনার আশায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। হঠাৎ গভীর মগ্নতা কাটে কারো ডাকে "চিশতি! কি ভাবছো তখন থেকে" চিশতির কাঁধে হাত রেখে তাকিয়ে দেখলো চিশতির চোখে জল। "একি চিশতি? তুমি কাঁদছো? কি হয়েছে বলো আমাকে?" অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো অলিভিয়া। "না! না! তেমন কিছু হয়নি। একটা জিনিস হারিয়ে গেছে?" দুই হাতে চোখের জল মুছে বললো চিশতি। "কি হারিয়েছে?" ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো অলিভিয়া। "আমার মধ্যে থাকা সেই চাঞ্চল্যকর আমিটা। হারিয়ে গেছে ভালোবাসার অতীতটা। আরো হারিয়েছে আপন জনারা!" আলতো করে চিশতির মাথায় হাত রেখে মায়াবী এক চাহনিতে তাকিয়ে বললো অলিভিয়া "চিশতি! অতীত থাকা ভালো কিন্তু অতীতে পরে থাকা নয়!! হয়তো আগে তুমি অনেক চঞ্চল ছিলে কিন্তু আমার কাছে তোমার গোমট রূপটাই শ্রেষ্ঠ। তোমার গোমট চেহারার প্রেমেই তো পাগল হয়েছি আমি।" চিশতি এক হাত বাড়িয়ে অলিভিয়াকে আলতো জড়িয়ে ধরে বললো "আর বেশিদিন দেরি করতে হবে না, খুব শীঘ্রই আমাদের একটা ছোট্ট সংসার হবে। আমাদের ঘর আলো করে আসবে আমার টুকটুকে একটা মেয়ে" চিশতির কথা শুনে কাঁধ থেকে নিজের মাথা উঁচু করে চিশতিকে চিমটি কেটে বললো অলিভিয়া "আমার ছেলে চাই!" চিশতি আবারও বললো "না! মেয়ে!" এভাবেই চলে থাকতে তাদের খুনসুটি। হঠাৎ চিশতি অলিভিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বললো "তোমার আর আমার পরিচয়ের শুরুটাও ছিলো এরকমই!! সুন্দর ছিলো সেই দিনগুলো! আর ভয়ংকর ছিলো তার আগের দিনগুলো।" অলিভিয়া আড়চোখে তাকিয়ে বলে "একটু হাসিখুশি হলেই তোমার এসব বলে মন খারাপ করতে হবে? কতবার বলবো এসব আর মনে করবে না! আমি তোমাকে ভালোবাসি তোমার পরিচয়কে না।" কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো চিশতি "তুমি যতই সুখে থাকো না কেনো কষ্টের দিনগুলো ভুলতে পারবে না, চাইলেও না। এতগুলো বছর হয়ে গেলো ভুলতে পারলাম না। হয়তো মরার আগ পর্যন্ত পারবো না।" এতকিছু না ভেবে অলিভিয়া আবারও বললো "আচ্ছা চিশতি ওই বাড়ির কারো সাথে কি আর কোনোদিনও যোগাযোগ করবে না?" চিশতি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো "জানি না!"
The End...
প্রিয় পাঠকমহল,
আপনারা যেভাবে আমার গল্পগুলো পড়ার জন্য অপেক্ষা করেন, তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। আপনারা আমার লেখার জীবনের প্রাণশক্তি। আপনাদের আগ্রহ, সমর্থন এবং প্রতিক্রিয়া আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন কাহিনী তৈরিতে অনুপ্রাণিত করে। আমি জানি, প্রতিটি গল্পে আমি কিছু একটা নতুন করে উপস্থাপন করতে চাই। আপনাদের জন্য তৈরি করি সেই সব চরিত্র ও পরিস্থিতি, যা আপনাদের মন ও হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। আমি চাই, প্রতিটি পাঠে আপনারা যেন নতুন কিছু শিখতে পারেন, অনুভব করতে পারেন এবং গল্পের জগতে হারিয়ে যেতে পারেন। আপনাদের মন্তব্য ও পরামর্শ আমার জন্য অমূল্য। আমি আশা করি, প্রতিটি নতুন গল্পে আমি আপনাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারব। আসুন, একসাথে আমরা নতুন কাহিনীর পথে পা বাড়াই। আপনারা আমার লেখার জন্য যে অপেক্ষা করেন, তা আমাকে উজ্জীবিত করে। আপনারা যারা গল্পের পটভূমি, চরিত্র এবং থিম নিয়ে আলোচনা করেন, তাদের প্রতি আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ। আপনারা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গল্প বলা কেবল একটি শিল্প নয়, বরং একটি সম্পর্ক—একটি সংযোগ যা আমাদের মধ্যে গড়ে উঠে। ধন্যবাদ আপনাদের অসীম সমর্থনের জন্য। আমি অঙ্গীকার করি, প্রতিটি নতুন গল্পে আমি আপনাদের ভালোবাসা ও অপেক্ষার প্রতিফলন রাখব। চলুন, একসাথে নতুন অভিজ্ঞতা ও রোমাঞ্চের পথে এগিয়ে যাই