পুনর্জন্ম (The Another Love Sory) — পর্ব ০৮
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৮ · ২৩ পর্বের মধ্যে ৮
আরিয়ান:- অরিন তোমাকে আরো একটা কথা বলার ছিলো.?
অরিন:- হ্যাঁ! বলো.?
আরিয়ান:- আমি যেদিন পাহাড়িতলা গ্রাম থেকে শহরে ফিরে গিয়ে আবারও এখানে আসছিলাম সেদিন এবং যেদিন আমার গাড়িতে রোকসানা আন্টির এক্সিডেন্ট হয় সেদিন ভুজঙ্গপুর গ্রামে এক পাগল মহিলা আমার রাস্তা আটকে দাঁড়ায়।
প্রথম দিন আমাকে সাবধান করেছিলো আমমি যেনো দ্বিতীয় বার পাহাড়িতলা গ্রামে ফিরে নাহ আসি, যদি আবারও ফিরি তাহলে আমার বিপদ হবে আর সত্যি সত্যি সেটাই হলো। আশ্চর্য করা বিষয় দ্বিতীয় বার যখন ওই পাগল মহিলার সাথে আবারও দেখা হয় সেদিন সে বলেছিলো আমাকে আবারও এই গ্রামে ফিরতে হবে, এবারও তার বলা কথা সত্যি হলো। আমি সত্যি সত্যি আবারও পাহাড়িতলা গ্রামে ফিরে এলাম।
অরিন:- কি! তো-তোমাকে ভুজঙ্গপুর গ্রামে এক পাগল মহিলা সাবধান করেছিলো.?
আরিয়ান:- হ্যাঁ!
অরিন:- এবার সত্যি সত্যি আমি সব গুলিয়ে ফেলছি! তার মানে তুমি রাজকন্যা ইলাহ্'কে দেখেছো.?
আরিয়ান:- তোমার কথা মতো তোহ তাই মনে হচ্ছে! কারণ তুমি বলেছিলে রাজকন্যা ইলাহ্ নাকী এক পত্রিকায় বলেছিলো তাকে পাগল রূপেই মানুষ দেখতে পারবে!
অরিন:- হ্যাঁ! তুমি জানো! রাজকন্যা ইলাহ্ বলেছিলো শুধুমাত্র সেই ব্যক্তি তাকে পাগল রূপে দেখতে পারবে যার মধ্যে "Holey Power" অর্থাৎ শুভশক্তি আছে। এর মানে তোমার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো "Holey Power" আছে।
আরিয়ান:- কি জানি! হবে হয়তো.?
অরিন:- দাঁড়াও! দাঁড়াও! আমাকে একটু ভাবতে দাও।
আরিয়ান:- আবার কি ভাববে তুমি.?
অরিন:- এটা তোমার পুনর্জন্ম! তুমি অবিকল তোমার পার দাদার মতো দেখতে, মানে কেনান খান আর তুমি একজনই। গত জন্মে কেনান খানের অভিশাপে হানা এক ভয়ংকর প্রেতাত্মায় পরিণত হয়েছিলো এবং তুমি সেই ভয়ংকর প্রেতাত্মাকে মেরে এই গ্রামকে অভিশাপ মুক্ত করেছো। মানে, তুমি একটা ভালো কাজ করেছো। ভালো কাজ করেছো সেটা বড় কথা নাহ, বড় কথা হলো এটা তোমার পুনর্জন্ম!
আমার৷ মনে হচ্ছে, তোমার পুনর্জন্মের কারণেই তুমি রাজকন্যা ইলাহ্'কে দেখতে পেয়েছো! কারণ তুমি সাধারণ কেউ নাহ!
আরিয়ান:- হ্যাঁ! আমারও এটাই মনে হয়। তাছাড়া আমি আরো একটা কথা ভাবছি!
অরিন:- আবার কি ভাবছো.?
আরিয়ান:- আমার মধ্যে নাহয় "Holey Power" আছে যার কারণে আমি রাজকন্যা ইলাহ্'কে পাগল বেশে দেখেছি। কিন্তু, তুমি কোন শক্তির গুণে রাজা এলাহাবাদের প্রাসাদ থেকে এত ভয় কাটিয়েও ইবাদত সম্পূর্ণ করে ফিরলে.?
অরিন:- হয়তো তোমার মধ্যে থাকা "Holey Power" এর গুণে আর আমাদের অজানা ভালোবাসার টানেই আমি ওখান থেকে ভয় কাটিয়েও ইবাদত সম্পূর্ণ করে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছি।
আরিয়ান:- তাই যেনো হয়! কিন্তু আমি আর একটা কথা ভাবছি..
অরিন:- কি.?
আরিয়ান:- আমার কেনো জানি নাহ, মনে হচ্ছে রাজকন্যা ইলাহ্ আমাদের সাহায্য করতে চায়!
অরিন:- এটাও তোহ হতে পারে সে আমাদের কাছ থেকে সাহায্য চায়.?
আরিয়ান:- মানে!
অরিন:- জানি নাহ! আমার শুধু মনে হলো! কারণ ওইদিম রহস্যজনক ভাবে রাজকন্যা ইলাহ্ ও তার লিখা শেষ বইটাও উধাও হয়ে গিয়েছিলো।
আরিয়ান:- আচ্ছা! এসবের বাইরেও আর একটা কথা কথা!
অরিন:- কি.?
আরিয়ান:- সরদার!
অরিন:- হ্যাঁ! কে এই সরদার.?
আরিয়ান:- সেটাই তোহ খুঁজে বের করতে হবে! কিবরিয়া চৌধুরী সরদারের কাছে রোকসানা আন্টির খবর দিচ্ছিল, এর মানে রোকসানা আন্টির সাথে সরদারের কোনো নাহ কোনো যোগসূত্র আছে।
অরিন:- সেটা নাহয় বুঝলাম! কিন্তু রিশা আপুর সাথে সরদারের কি সম্পর্ক.?
আরিয়ান:- অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে! এই সরদারকে খুঁজে বের করতে পারলে সব রহস্যের জট খুলবে।
অরিন:- আরিয়ান!
আরিয়ান:- হ্যাঁ! বলো....
অরিন:- রিশা আপু আর রোকসানা আন্টির মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই তোহ.?
আরিয়ান:- মানে.?
অরিন:- নাহ! সেভাবে বলতে চাইনি! কিন্তু আমার মনে হলো, দেখো, রোকসানা আন্টির পিছনেও সরদার নিজের লোক ভেজিয়ে রেখেছে এখন আবার রিশা আপুর আত্মাকে নিজের বশে নিয়ে তোমার উপর আক্রমণ করাচ্ছে আবার এটাও বলছে যে রিশা আপুর আসল পরিচয় খুঁজে নাহ পাওয়া অব্দি তাকে মুক্তি দিবে নাহ!
আরিয়ান:- এটা তোহ ভেবে দেখিনি! হয়তো থাকতে পারে। তোমার বুদ্ধির জবাব নেই।
অরিন:- ভুলে যেওনা আমি একজন পুলিশ অফিসার!
আরিয়ান:- তা কি ভোলার মতো!
অরিন:- আরিয়ান! আজ এখান থেকে ফিরে তোমাকে নিয়ে আমার বাবা মায়ের কাছে যাবো আমাদের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে! তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি তোহ...?
আরিয়ান:- হ্যাঁ! সবসময় তোমার পাশে আছি। শুধু এই পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক হোক। আমরা নাহয় কাল তোমার বাবা মায়ের সাথে কথা বলবো।
অরিন:- ঠিক আছে! রাশেদ আঙ্কেলের আসতে আর কতক্ষণ সময়য় লাগবে.?
আরিয়ান:- জানি নাহ! ওয়েট, একটা কল দিয়ে দেখি...
কল দিতে যাবো তখনই রাশেদ আঙ্কেল এসে হাজির।
"আর কল দিতে হবে নাহ! আমি চলে এসেছি!"
অরিন আর আমি একসাথে রাশেদ আঙ্কেলকে সালাম দিলাম।
রাশেদ আঙ্কেল:- ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আরিয়ান! মেয়েটা কে.? আগে তোহ কখনো দেখিনি.? রিশা ও বাকি সবাই কোথায়.?
আরিয়ান:- আঙ্কেল ওর নাম অরিন! আর বাকি কথা সব বলবো একটু ধৈর্য ধরুন।
রাশেদ আঙ্কেল:- আচ্ছা! আচ্ছা! তুমি ধীরে স্বস্তিতেই বলো। কিন্তু তার আগে আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও...
আরিয়ান:- হ্যাঁ! হ্যাঁ! বলুন....
রাশেদ আঙ্কেল:- রিশা কোথায়.? কি হয়েছে ওর.?
আরিয়ান:- আঙ্কেল! হঠাৎ এসব বলছেন কেনো.? কি হয়েছে.? মনে হচ্ছে আমি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত.?
রাশেদ আঙ্কেল:- শুধু চিন্তিত নাহ বাবা, আমি খুব ভয় পাচ্ছি!
আরিয়ান:- কি! কি হয়েছে আঙ্কেল.? আমাকে সবটা খুলে বলুন...
রাশেদ আঙ্কেল:- বলছি!
ওইদিন মাঝরাতে হঠাৎ করেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভাবলাম ঘুম যেহেতু ভেঙ্গেই গেছে তাহলে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসি। তারপর ওয়াশরুমের লাইট অন করে ভিতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করতে নাহ করতেই ওয়াশরুমের লাইট অফ হয়ে যায়। ভাবলাম লোডশেডিং হয়েছে তাই সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে যেনো আমি আকাশ থেকে পরলাম।
আরিয়ান:- কেনো আঙ্কেল.? কি হয়েছিলো.?
রাশেদ আঙ্কেল:- ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখি বাইরে থেকে কে যেনো ওয়াশরুমের লাইট অফ করে দিয়েছে! অথচ পুরো বাড়িতে আমি ছাড়া আর কেউই ছিলো নাহ। এই ফাঁকা বাড়িতে কে ওয়াশরুমের লাইট অফ করবে। হয়তো চোর এসেছে ভেবে রুম থেকে বেরিয়ে সব জায়গায় খুজতে থাকি কিন্তু কাউকেই খুঁজে পাইনি। পুরো বাড়ি খুঁজেও যখন কাউকেই পাইনি তখন আবারও আমার রুমে ফিরে গেলাম। কিন্তু....
অরিন:- কিন্তু কি আঙ্কেল...?
রাশেদ আঙ্কেল:- কিন্তু! আমি রুমের সামনে গিয়ে দেখি রুম ভিতর থেকে লক করা! অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করার পরও দরজা খুলছিলো নাহ। এবার মনে মনে শিওর হতে থাকি হয়তো রুমের ভিতর চোর ঢুকেছে! মনে কৌতুহল নিয়ে দরজা ভেঙ্গে রুমে ঢুকে দেখি আমার পুরো ঘর এলোমেলো হয়ে আছে অথচ রুমের ভিতরে আমি ছাড়া অন্য কেউই ছিলো নাহ।
এরপর মনে হচ্ছিল আমার পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, আস্তে আস্তে ঘাড় নেড়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি সাদা কাফনে মোড়ানো একটা লাশ, মাথা ও পায়ের দিকে শক্ত করে বাঁধ দেওয়া আর ওর চোখগুলো থেকে সবুজ আলো বের হচ্ছিল। হঠাৎ করে লাশটা লাফিয়ে লাফিয়ে আমার দিকে আসতে শুরু করে। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে একটা চিৎকার দি! যখন চোখ খুলি তখন আমার আশেপাশে কিছুই ছিলো নাহ।
ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো তখন। পানি খাওয়ার জন্য কিচেনে গেলাম, পানি খেয়ে যখন আবার পিছন ফিরলাম তখন দেখি প্রথম বারের মতো এবারও সেই কাফনে মোড়ানো লাশটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভয়ে আবারও চিৎকার দিলাম কিন্তু এবার লাশটা আমার কাছে এসে কানে কানে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো "বাবা! কি আমার পরিচয়.? আমি মুক্তি চাই!"
আরিয়ান:- আঙ্কেল!
রাশেদ আঙ্কেল:- হ্যাঁ বলো.?
আরিয়ান:- তারপর কি হলো.?
রাশেদ আঙ্কেল:- লাশটার মুখে এমন কথা শুনে আমার মনটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠলো! কে এই কাফনে মোড়ানো লাশ! মনে কিছুটা সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "ক-কে তুমি.?" লাশটা প্রত্যুত্তরে বললো.."বাবা! আমি রিশা! দয়া করে আমাকে মুক্তি করো। আমি ওই সয়তান সরদারের গোলাম হয়ে থাকতে চাই নাহ! বাবা! বাবা! দয়া করে আমার আসল পরিচয় কি বলে দাও নয়তো ওই সয়তান সরদার আমাকে কিছুতেই মুক্তি দিবে নাহ!" ওর কথা শুনে আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরতে শুরু করে। যে স্মৃতি ১৭ বছর আগে দফন করে এসেছি সেই স্মৃতির আবারও পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
আরিয়ান:- মানে.? কোন স্মৃতির কথা বলছেন আপনি.? ১৭ বছর আগে কি হয়েছিলো.?
রাশেদ আঙ্কেল:- সব বলবো বাবা! তার আগে তুমি বলো আমার রিশা কোথায়.?
রাশেদ আঙ্কেলকে কাঁদতে দেখে আমরাও কাঁদতে থাকি! আর কাঁদবো নাহ কেনো, যে মানুষটাকে এত ভালোবেসেছি সে মানুষটা এভাবে আমাদের একা করে চলে গেলো! আর এখন সে এক সয়তানি শক্তির কবলে বন্দী হয়ে আছে।
নিজের মনে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে রাশেদ আঙ্কেলকে সবকিছু খুলে বলি, এখানে বেড়াতে আসার পর থেকে আমি কোন কোন ভয়ংকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছি এবং কি কি হারিয়েছি। আমার সব কথা শুনে রাশেদ আঙ্কেল বললো...
"১৭ বছর আগে এখান এসে আমিও আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারাই কিন্তু সেদিনই আমি রিশাকে পেয়েছিলাম"
রাশেদ আঙ্কেলের মুখে এসব শুনে আমার অনেক কৌতুহল হতে শুরু করে, কি হয়েছিলো সেদিন.? মনের মধ্যে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো! এক পর্যায়ে রাশেদ আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করে বসি...
আরিয়ান:- মানে..? রিশাকে পেয়েছিলেন মানে.?
রাশেদ আঙ্কেল:- এতগুলো বছর তোমাদের কাছ থেকে সত্যিটা লুকিয়েছিলাম বাবা! আসলে, রিশা আমার আপন সন্তান নাহ! ওকে এই পাহাড়িতলা গ্রাম থেকে এক মহিলার কাছ থেকে আমার সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন ভূমিকম্পের কারণে আমি ইশানাকে হারাই। ওর কথায়ই আমি রিশাকে ওই মহিলার কাছ থেকে নিয়েছিলাম কিন্তু আফসোস ইশানা নিজের দত্তক নেওয়া সন্তানকে মন ভরে আদর করার আগেই উপরওয়ালা ওকে তার কাছে নিয়ে যায়।
আরিয়ান:- আঙ্কেল! আমার মাথায় সত্যি কিছুই ঢুকছে নাহ একটু বুঝিয়ে বলুন নাহ প্লিজ।
রাশেদ আঙ্কেল:- তাহলে শুনো বাবা, রিশা আমাদের নিজের সন্তান নাহ! আমরা ওকে দত্তক নিয়েছিলাম। প্রায় ১৭ বছর আগে যখন তোমাদের সাথে আমরা এই গ্রামে বেড়াতে আসি তখন আমার আর ইশানার কোনো সন্তান ছিলো নাহ। আমাদের বিয়ের ৬ বছর হয়ে গিয়েছিল কিন্তু কোনো সন্তান হচ্ছিল নাহ। আমাদের দু'জনকেই এই বিষয়টা খুব কষ্ট দিতো, একদিন ইশানা নিজে থেকেই বলেছিলো আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা কিন্তু আমি ইশানাকে অনেক বুঝাই। তারপর ওর মন ভালো করার জন্য ওকে নিয়ে আসিফ আর আছিয়া ভাবির সাথে এখানে বেড়াতে আসি।
দিনটা সুন্দর ভাবেই কেটে যায়। তারপর যখন সন্ধ্যা নেমে আসে তখন আমি আর ইশানা একসাথে সময় কাটানোর জন্য বাইরে বের হই হঠাৎ চারিদিকে সোরগোল পরে যায় গ্রামবাসীরা কাকে যেনো মারার জন্য একজোট হয়। সবার হাতে মশাল জ্বলছিল। কারো কারো হাতে লাঠিও ছিলো। সবাই বলাবলি করছিলো, গ্রামে নাকী কোনো ডাইনীর প্রকোপ পড়েছে আজ সেই ডাইনীকে গ্রামবাসীরা খুঁজে বের করে তাকেসহ তার সন্তানদের পুড়িয়ে মারবে।
আমি আর ইশানা পরিস্থিতি বুঝতে একটু রাস্তার পাশে এসে দাঁড়াই, তখন একজন মহিলা ছুটে এসে আমাদের সাথে ধাক্কা খায় এবং তার কোলে থাকা একটা বাচ্চা মাটিতে পরে যায়। বাচ্চাটা মাটিতে পরেই কান্না করতে শুরু করে, মহিলাটি তার বাচ্চাকে নিজের কোলে নাহ নিয়ে আমার পায় জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলতে থাকে....
"এই নিষ্পাপ শিশুটাকে বাঁচান সাহেব, ওরা ওকে মেরে ফেলবে!"
মহিলাটিকে কাঁদতে দেখে ইশানা উনাকে জিজ্ঞেস করলো....
"কে আপনি! আর এই বাচ্চাটিই বা কার.? কারা মারবে এই নিষ্পাপ শিশুটাকে.?"
"আ-আমি রোকসানা! দয়া করে আমার মেয়েকে বাচান! আমার জমজ সন্তান হয়েছে। আমি একজনকে আপনাদের দিয়ে গেলাম ওকে সাবধানে রাখবেন কোনোদিনও ওকে মা বাবার অভাব বুঝতে দিবেন কথা দিন!"
সেদিন ছোট্ট রিশাকে দেখে যেনো আমাদের মধ্যে এক অন্য রকম মমতা কাজ করছিলো যার কারণে আমরা রোকসানাকে দ্বিতীয় বার কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি। মহানন্দে রিশাকে কোলে তুলে নি। রোকসানাও রিশাকে আমাদের কোলে তুলে দিয়ে কোথায় যেনো পালিয়ে যায়। কিন্তু কে এই রোকসানা আজও খুঁজে বের করতে পারিনি।
যাই হোক, রোকসানা ওখান থেকে চলে যাওয়ার পর পরই ভূমিকম্প শুরু হয় এবং সেখানেই ইশানা মারা যায়।
ইশানার মৃত্যুর পর আমি রিশাকে নিয়ে বগুড়া শহর থেকে অনেক দূরে চলে যাই।
আরিয়ান:- কোথায় গিয়েছিলেন আঙ্কেল..?
রাশেদ:- মুন্সিগঞ্জ!
আরিয়ান:- মুন্সিগঞ্জ কার কাছে গিয়েছিলেন.?
রাশেদ আঙ্কেল:- আমার এক বন্ধুর কাছে। ওওর কাছেই ৮ বছর থেকেছিলাম। কিন্তু একটা অবাক করা বিষয় কি জানো.?
আরিয়ান:- কি.?
রাশেদ আঙ্কেল:- রিশা প্রতি বছর ওর বয়সের তুলনায় দুই গুণ বেশি বৃদ্ধি পেতো। ৮ বছর পর যখন ওকে নিয়ে৷ আমি আবারও বগুড়া শহরে ফিরে যাই তখন ওকে দেখতে প্রায় তোমার সমবয়সী মনে হচ্ছিল।
আরিয়ান:- কি! তার মানে রিশা আমার সমবয়সী ছিলো নাহ.? কিন্তু আপনি যে বলেছিলেন রিশাকে ছোট থেকেই বোর্ডিং-এ রেখে এসেছিলেন.?
রাশেদ আঙ্কেল:- হ্যাঁ! সেটা তোমাদের কাছে মিথ্যা বলেছিলাম। রিশা নিজেও জানতো নাহ ওর বয়সের তুলনায় দুই গুণ বেশি বৃদ্ধি পেতো।
আরিয়ান:- আঙ্কেল আপনি রোকসানা আন্টিকে দেখলে চিনতে পারবেন.?
রাশেদ আঙ্কেল:- অনেক বছর আগে চাঁদের আলোয় চেহারাটা দেখেছিলো অত স্পষ্ট মনে নেই কিন্তু দেখলে চিনতে পারবো...
আরিয়ান:- অরিন!
অরিন:- হ্যাঁ! বলো.?
আরিয়ান:- উনাকে রোকসানা আন্টির ছবিটা দেখাও তোহ!
রাশেদ আঙ্কেল:- কোন রোকসানা.? তোমরা কি রোকসানাকে খুঁজে পেয়েছো.? আর তোমরা তোহ রিশার আসল সত্যিটা জানতে নাহ তাহলে কিভাবে রোকসানাকে খুঁজে বের করলে.?
আরিয়ান:- সব বলছি! আপনি আগে এই ছবিটা দেখে বলুন তোহ ইনিই সেই রোকসানা কি নাহ.?
রাশেদ আঙ্কেল:- উমম! হ্যাঁ! এটাই সেই রোকসানা! কিন্তু কি হয়েছে ওর.? ওর মুখে এত আঘাত কেনো.?
আরিয়ান:- আসলে আঙ্কেল! আমরাও জানতাম নাহ এই রোকসানাই সেই রোকসানা! আমি যেদিন সবকিছু হারিয়ে শহরে আবারও ফিরে যাচ্ছিলাম সেদিন উনি আমার গাড়িতে এক্সিডেন্ট করেন এবং সেখানেই উনার মৃত্যু হয়। উনার খোঁজ করতে করতে আমরা উনার মেয়ের কাছে গিয়ে পৌঁছাই! তারপর উনার মেয়েকে সাথে নিয়ে উনার দাফন কার্য শেষ করি। কিন্তু আশ্চর্য করা বিষয় হলো, হসপিটালে যেদিন উনার পোস্টমর্টেম হচ্ছিল সেদিন ওখানকার এক লোক সরদার নামে কাউকে কলে বলছিলো যে রোকসানা আন্টিকে মৃত অবস্থায় পেয়েছে কিন্তু এখনো তার সন্তানকে খুঁজে পায়নি।
তাছাড়া আমিও রিশার আত্মাকে দেখেছি। ঠিকই একই ভাবে যেভাবে আপনি দেখেছেন। রিশাও আমাকে বলেছিলো ওকে সরদার নামে কেউ নিজের বশে করে রেখেছে।
রাশেদ আঙ্কেল:- কিছুই বুঝতে পারছি নাহ! আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবে এখন৷ আমাদের কি করা উচিৎ.?
অরিন:- আআ! আমি একটা কথা বলবো.?
আরিয়ান:- হ্যাঁ! বলো?
অরিন:- বুঝতে পারছি নাহ, আমি যে কথাটা বলতে চাইছি সেটা কোনে প্রশ্ন নাকী অন্য কিছু।
আরিয়ান:- আচ্ছা! তুমি আগে বলো...
অরিন:- প্রথমত, রিশা আপু রাশেদ আঙ্কেলের আপন সন্তান নাহ! রিশা আপু রোকসানা আন্টির সন্তান। এর মানে, হরিণী আর রিশা আপু জমজ বোন.?
রাশেদ আঙ্কেল:- হরিণী! কে এই হরিণী.?
আরিয়ান:- আঙ্কেল! হরিণীই হচ্ছে রোকসানা আন্টির মেয়ে যার কথা কিছুক্ষণ আগে আপনাকে বললাম।
রাশেদ আঙ্কেল: ওহ্! আচ্ছা! আচ্ছা! এবার বলো আমরা কি করবো.? রিশাকে কিভাবে মুক্তি দিবো.?
অরিন:- আর একটা কথা.?
আরিয়ান:- বলো.?
অরিন:- রিশা আপু আর হরিণী যদি সত্যি সত্যি আপন বোন হয়ে থাকে তোহ সরদার রিশা আপুর সাহায্যেই হরিণীর কাছে পৌঁছে যাবে। কারণ, সেদিন কিবরিয়া ভাই সরদারকে ফোনে বলেছিলেন যে তারা খুব শীঘ্রই রোকসানা আন্টির সন্তানদের খুঁজে বের করবে।
আরিয়ান:- জানি নাহ! এখন আমাদের এসবের একটা সমাধান করতে হবে। এখন আমাদের একটাই লক্ষ সরদারকে খুঁজে বের করা।
অরিন:- কিন্তু কিভাবে.?
রাশেদ আঙ্কেল:- হ্যাঁ! বাবা, কিছু তোহ একটা করতেই হবে। আমার মেয়েটা মরার পরও শান্তি পাচ্ছে নাহ আমি বাবা হয়ে কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছি নাহ।
আরিয়ান:- আঙ্কেল! অরিন! চলো আমার সাথে.?
অরিন:- কোথায়.?
আরিয়ান:- মাওলানা আলতাফ সাহেবের কাছে!
অরিন:- উনার কাছে গেলে কি সব সমস্যার সমাধান হবে.?
আরিয়ান:- তোমাদের বললাম নাহ! প্রথম বার যখন আমি বিপদে পরেছিলাম তখন উনিই আমাকে সাহায্য করেছিলো।
রাশেদ আঙ্কেল:- যেখানে গেলে আমার মেয়েটা মুক্তি পাবে সেখানেই চলো।
আরিয়ান:- হ্যাঁ! চলুন।
এরপর অরিন ও রাশেদ আঙ্কেলকে নিয়ে মাওলানা আলতাফ সাহেবের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই।