পুনর্জন্ম (The Another Love Sory) — পর্ব ০৩

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৩ · ২৩ পর্বের মধ্যে ৩

আমি আর অরিন একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে কুটিরের ভিতরে প্রবেশ করি।

কুটিরের ভিতরে যাওয়ার পর আমি আর অরিন দু'জনই একদম ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম।

মনের মধ্যে যেনো আরো শতশত প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করলো।

নির্জন গ্রামের শেষ প্রান্তে ওই মহিলাটি মুক্ত জীবনের সাথে কতগুলো কুকুর পোষে অথচ নিজের মেয়েকেই শিকল বন্দী করে রেখেছে

হ্যাঁ! আমরা কুটিরের ভিতরে ঢুকে দেখি ওই ভদ্রমহিলা নিজের মেয়েকে ঘরের মধ্যে শিকলে বেঁধে রেখে গিয়েছিলেন।

শিকল বন্দী মেয়েটি যে ওই ভদ্রমহিলার মেয়ে এটা শুধুমাত্র আমি জানি, কারণ ভদ্রমহিলা আহত অবস্থায় আমার কাছে বলেছিলো। অরিন শিকল বন্দী মেয়েটিকে দেখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আমিও অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছি....

"আরিয়ান ভাইয়া! কুটিরের ভিতরে এই মেয়েটি এলো কোত্থেকে.? কে এই মেয়ে.? এবার আবার কেমন গোলকধাঁধায় পরলাম বলুন তোহ.?"

অরিনের কথা শুনে যেনো আমি এক প্রকার হিপনোটিজ হয়ে গেলাম...

"ও হরিণী! মৃত মহিলাটির একমাত্র মেয়ে।"

"মানে! আপনি ওকে চিনেন কিভাবে..?"

"ইয়ে মানে! মহিলাটি আহত অবস্থায় আমার কাছে বলেছিলো, উনার কিছু হলে হরিণীর কি হবে.? তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম হরিণী কে.? উনি বললো, হরিণী নাকী উনার মেয়ে।"

"ওহ্! তাই বলুন। যাই হোক এখন মেয়েটিকে শিকল মুক্ত করতে হবে।"

"হ্যাঁ! কিন্তু চাবি কোথায় পাবো.?"

"চাবির দরকার নেই!"

কথার মাঝে অরিন হরিণীর দিকে ওর পিস্তল তাক করলো...

"একি! তুমি ওকে মেরে ফেলবে নাকী.?"

আমার কথা শেষ হতে নাহ হতেই অরিন হরিণীকে শ্যুট করলো। আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম, সাথে সাথে চোখগুলো বন্ধ করে ফেললাম। হঠাৎ কানে কিছু কথা ভেসে এলো....

"তুমি ঠিক আছো.? কোথাও লাগেনি তোহ.?"

আমি মিটিমিটি করে চোখ খুলে দেখলাম, অরিন হরিণীকে শ্যুট করেনি, শ্যুট করে শিকলটি ভাঙ্গলো। যাই হোক হরিণী ঠিক আছে এটাই অনেক।

হরিণী নির্বাক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, দেখে বুঝা যাচ্ছে ও খুব অবাক হয়েছে পাশে ভয়ও পেয়েছে। কিন্তু আমার কথা হলো, ও যদি ভয় পেয়ে থাকে তাহলে আমাদের কুকুরের হাত থেকে বাঁচালো কেনো.?

অরিন তখন আবারও জিজ্ঞেস করলো...

অরিন:- তুমি ঠিক আছো তোহ.?

হরিণী:- "হ্যাঁ-এ"

আরিয়ান:- হরিণী! তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে.?

আমাদের সাথে যাওয়ার কথা শুনে হরিণী ভয়, ক্ষোভ, আতঙ্কে বিস্মিত হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে সে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের উপর ঝাপিয়ে পরবে এক্ষুনি। তখন সে নাহ বোধক সুরে বললো...

হরিণী:- ক-ক-কোথায়.?

অরিন:- দেখো হরিণী! জানি নাহ ব্যাপারটা তুমি কিভাবে নিবে! কিন্তু এটাই সত্যি। তোমার মা আর বেঁচে নেই। তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। হসপিটালের কাগজপত্রে সাইন করে তোমাকেই উনার লাশ আনতে হবে।

অরিনের কথা শুনে এক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে হরিণী কান্না করতে থাকে।

হরিণীকে শান্ত করে গাড়িতে এনে বসালাম। তারপর আমরাও গাড়িতে উঠে বসলাম।

ফেরার পথে আমি নিজের অজান্তেই অরিনকে একটা প্রশ্ন করে বসি....

আরিয়ান:- অরিন!

অরিন:- হ্যাঁ! ভাইয়া বলুন

আরিয়ান:- আজ বিকেলে তুমি আমার দিকে এমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে ছিলে কেনো.? দেখে মনে হচ্ছিল তুমি আমাকে চিনেও নাহ চেনার ভান করে আছো.?

অরিন:- সত্যি বলবো নাকী মিথ্যা.?

আরিয়ান:- অবশ্যই সত্যি কথা বলবে!

অরিন:- হ্যাঁ! আমি আপনাকে চিনি বলেই ওইভাবে তাকিয়েছিলাম! তবে সেটা ভার্সিটির আরিয়ান ভাইয়া হিসেবে নয় বরং অন্য কোনো পরিচয়ে…

আরিয়ান:- মানে! তুমি আমাকে আবার কোন পরিচয়ে চিনো.?

"আমার ভয় হতে শুরু করলো, অরিন কি আমার সত্যিটা জেনে গেলো.? আমার মধ্যেই যে কেনান দাদুর পুনর্জন্ম হয়েছে এটা কি অরিন জানে.?"

অরিন:- আমি আপনাকে কোন পরিচয়ে চিনেছিলাম সেটা জানার জন্য আপনাকে প্রথমে আমার অতীতকে শুনতে হবে.!

আরিয়ান:- ঠিক আছে! তবে তুমি তোমার অতীতের সব কথাই বলো আমাকে...

অরিন:- এখন নাহ! হসপিটালে চলে এসেছি, নামুন...

আরিয়ান:- চলে এলাম! এত তাড়াতাড়ি.?

অরিন:- আপনি প্রশ্ন খুঁজতে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে সময় কখন পার হয়ে গেছে বুঝতেও পারেননি!

"আমি আবারও অরিনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম! আসলে কে এই অরিন.? ও কি সত্যিই সাধারণ কোনো মানুষ নাকী অন্য কেউ.? যেভাবেই হোক ওর রহস্য আমাকেই বের করতে হবে"

অরিন:- কি দেখছেন এভাবে!

আরিয়ান:- নাহ! কিছু নাহ! ভাবছি..

অরিন:- কি ভাবছেন.?

আরিয়ান:- সময় হলেই জানতে পারবে.

অরিন:- সে নাহয় জানতে পারবো, এখন হসপিটালে যাই চলুন!

আরিয়ান:- হ্যাঁ! চলো...

আমরা হরিণীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হসপিটালের ভিতরে চলে গেলাম। ভিতরে গিয়ে ইরিনকে খুঁজে পাচ্ছিলাম নাহ!

"আশ্চর্য! কোথায় গেলো মেয়েটা.? ওর উপরই তোহ অজ্ঞাত মহিলাটির দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম, এখন ওকেই খুঁজে পাচ্ছি নাহ! ওওওহহ শ্যাট! আগে যদি বুঝতাম ও এমন দায়িত্বহীন তাহলে কিছুতেই ওর উপর দায়িত্ব দিয়ে যেতাম নাহ!"

ইরিনের সম্পর্কে এসব ভাবতে ভাবতে দেখি ইরিন কোথা থেকে যেনো ভয়ে ছুটে আসছে...

ওকে এভাবে ভয় পেয়ে আসতে দেখে আমরা ওর কাছে গেলাম...

অরিন:- কিরে! কি হয়েছে.? এমন ভয় পেয়ে আছিস কেনো.?

ইরিন:- ওই! ওই! ওই! ওই মহিলাটির মধ্যে তোহ নিশ্চয়ই কোনো গন্ডগোল আছে!

আরিয়ান:- মানে! কিসের গন্ডগোলের কথা বলছো?? কি গন্ডগোলই বা থাকতে পারে!

ইরেনের সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ করেই আমার চোখ হরিণীর দিকে যায়, ওর দিকে তাকাতেই আমি চমকে গেলাম!

"হরিণী অস্বাভাবিক ভাবে ভয় পাচ্ছে, ওর হাত ও পায়ের নখগুলো নিজে নিজেই বড় হয়ে যাচ্ছে আর সেগুলো আমাদের কাছে লুকোনোর জন্য হরিণী নিজের দাঁত দিয়ে ওর হাত ও পায়ের নখ কামড়ে কামড়ে কাটছে"

"এ আবার কোন রহস্য! অরিন/ইরিন, হরিণী, অজ্ঞাত মহিলা, ভুজঙ্গপুর গ্রামের শুরুতে সেই পাগল মহিলা, কি এদের রহস্য! এ যেনো রহস্যের মায়াজালে আটকে গেলাম আমি!"

হঠাৎ সজ্ঞানে এলাম অরিনের ডাকে...

অরিন:- কি হয়েছে! ভাইয়া.. ভাইয়া...

আরিয়ান:- আ-হ্যাঁ!

অরিন:- ওদিকে কি দেখছেন.? এত ভয় পাচ্ছেন কেনো.?

অরিনের কথা শুনে আমি আবারও হরিণীর দিকে তাকিয়ে দেখি হরিণী একদম স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে এটা আমার মনের ভুল। এসব নিয়ে অনেক বেশিই ভাবছি এজন্যই এমন অদ্ভুত অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি।

কিন্তু যত যাই হোক, এখানে প্রতিটি মানুষ রহস্যময়। ওদের বিশ্বাস করাটা কি ঠিক হচ্ছে.? ওরা কি সত্যি আমার সাহায্য করছে নাকী.....

ইরিন:- আবার কি হলো!

অরিন:- আমার মনে হচ্ছে আরিয়ান ভাইয়া উনার কাছের মানুষগুলোকে মিস করছে...

ইরিন:- মিস করছেন তোহ কল করুন, আমার ফোনে টাকা আছে! চাইলে কল দিতে পারেন!

অরিন:- ইরিন! উনার ফ্যামিলির কেউ বেঁচে নেই!

ইরিন:- মানে.?

অরিন:- একটা দূর্ঘটনায় সবাই মারা গেছে...

ইরিন:- সরি! আমি আসলে...

আরিয়ান:- ইট'স ওকে। তুমি বলো ওই মহিলাটির মধ্যে কি গন্ডগোলের কথা বলছিলে...

ইরিন:- হ্যাঁ! চলুন আমার সাথে...

ইরিনের সাথে আমরা মর্গে চলে গেলাম ওই মহিলাটির লাশের পাশে। লাশের পাশে যেতেই হরিণী ওর মাকে দেখে কান্না করতে থাকে। অরিন আর ইরিন ওকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু সে কিছুতেই শান্ত হচ্ছিল নাহ। হরিণীর কষ্টটা আমি অনুভব করতে পারছিলাম কারণ এক দিন আগে আমিও আমার সপরিবার হারিয়েছি।

হরিণীর কান্না দেখতে দেখতে কখন যে আমিও কেঁদে ফেলি বুঝতেও পারিনি।

তখনই অরিন আমার কাঁধে হাত দিয়ে মাথা নাড়িয়ে আমাকে শান্তনা দিতে হ্যাঁ সূচক ইশারা দিয়ে বুঝায় সে আমার পাশে আছে....

"হঠাৎ করে আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে, ওদের ভার্সিটিতে হেল্প করতাম তার বিনিময়ে এত বড় প্রতিদান কেনোই বা দিচ্ছে ওরা! আসলেই কি ওরা এগুলো মন থেকে করছে নাকী এর পিছনে রয়েছে ওদের কোনো উদ্দেশ্য.? আমি কি নতুন কোনো ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি.? ইরিন আর অরিন কি সত্যি আমার ভালো চায় নাকী...."

ইরিন:- ভাইয়া! একটু পর পর কি হয় আপনার! কোথায় হারিয়ে যান একটু পর পর.?

আরিয়া:- আ-হ্যাঁ! না! তেমন কিছু নাহ! তুমি আমাদের এখানে কেনো নিয়ে এলে সেটা বলো...

ইরিন:- আপনাদের একটা জিনিস দেখাতে এনেছি, আর সাথে কিছু গোপন কথাও জানাবো যেগুলো আমি আড়াল থেকে শুনেছি।

আরিয়ান:- মানে! কার কথা আড়াল থেকে শুনেছো.?

ইরিন:- এখানে যে লোকটি পোস্টমর্টেম করে সে কারো একজনের সাথে এই মহিলাটির ব্যাপারে ফোনে কথা বলছিলো, সেগুলো আমি আড়াল থেকে শুনে ফেলি। সেজন্যই তোহ ভয় পেয়ে ছুটছিলাম।

আরিয়ান:- তোমার কথার কিছুই বুঝতে পারছি নাহ, একটু বুঝিয়ে বলো...

তখন ইরিন ওই মহিলার ডান হাতটা বের করে আমাদের দেখায়.....

ইরিন:- দেখুন!

মহিলার হাতটা দেখে একদম আঁতকে উঠলাম।

"এটা কি.? দেখে কোনো ট্যাটু মনে হচ্ছে! কিন্তু নাহ! এটা তোহ আগুনে পোড়ানো কিছু। মনে হচ্ছে আগুনে পুড়ে উনার হাতে এটা একে দেওয়া হয়েছে।"

[চিহ্নটা দেখতে কেমন জানতে চাইবে নাহ, চিহ্নটা দেখতে অনেকটা এক চোখের মতো। দেখেই বুঝা যাচ্ছিল উনাকে সয়তানের কাছে উৎসর্গ করা হয়েছিলো কিন্তু নিজের জীবন বাঁচিয়ে উনি পালিয়ে এসেছে]

মহিলাটির হাতে এমন থার্ড আই সিম্বল দেখার পর ইরিনকে জিজ্ঞেস করলাম...

আরিয়ান:- লোকটি কার সাথে কথা বলছিলো আর কি বলছিলো কিছু শুনতে পেরপছো.?

ইরিন:- হ্যাঁ! সবটা শুনতে নাহ পারলেও অনেকটা শুনেছি। অপর প্রান্তের কথাগুলো নাহ শুনলেও এই প্রান্তের কথা শুনে যা বুঝতে পারলাম, ওরা হয়তো এই মহিলা এবং উনার কোনো এক সন্তানকে ১৬-১৭ বছর ধরে খুঁজছিল।

আরিয়ান:- এত সব পরে দেখা যাবে, আগে বলো তুমি কি শুনেছো..?

ইরিন:- পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নেওয়ার জন্য যখন মর্গে আসি তখন এসে দেখি তখন অব্দি উনার পোস্টমর্টেম কমপ্লিট হয়নি। আমি রাগান্বিত স্বরে চিৎকার দিতে যাবো তখনই দেখি লোকটি কিছু৷ একটা দেখে ভয় পেয়ে নিচে পরে গেলো। লোকটিকে ভয় পেয়ে নিচে পরতে দেখে উনাকে সাহায্য করার জন্য ছুটে আসবো ঠিক ওই মুহুর্তে লোকটি কাকে যেনো কল দেয়...

লোকটিকে কল দিতে দেখে আমি আড়াল হয়ে লুকিয়ে পড়ি, তারপর লোকটি অপর প্রান্তের কাউকে বললো....

"সরদার!৷ সরদার! রোকসানা এখানে! এত বছর ধরে যাকে খুঁজে যাচ্ছি সে আমাদেরই হসপিটালে মৃত অবস্থায় শুয়ে আছে।"

"নাহ! নাহ! ওকে কোনো এক শহরে বাবু হসপিটালে নিয়ে এসেছে! ওর আশেপাশে বা ওর খোঁজে এখনো কেউ আসেনি।"

"আপনি শিওর তোহ ওর সন্তান এখনো বেঁচে আছে.? যদি বেঁচে থাকে তাহলে আপনি নিশ্চিন্তে থাকুক, রোকসানাকে যেহেতু খুঁজে পেয়েছি ওর সন্তানকেও ঠিক খুঁজে পাবো"

"হ্যাঁ! হ্যাঁ! আপনি চিন্তা করবে নাহ! কিবরিয়া থাকতে আপনাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে নাহ। আরেকটা কথা রোকসানার কি ছেলে সন্তান হয়েছে নাকী মেয়ে সন্তান.? ওহ্! আপনিও জানেন নাহ! আচ্ছা চিন্তা করবেন নাহ, আমি কিবরিয়া চৌধুরী আছি আপনার সাথে। আমিই খুঁজে বের করবো রোকসানার সন্তানকে"

এরপর কিবরিয়া চৌধুরী ভাই কল কেটে দিয়ে লাশটি পোস্টমর্টেম করতে নিয়ে যায়। আমিও ওখানেই ভয় পেয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকি।

ঘন্টা খানেক পর কিবরিয়া ভাই আমার৷ কাছে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এনে দিয়ে সে চলে যায়। আমি রিপোর্ট হাতে নিয়ে লাশটির কাছের গিয়ে লাশের হাত চ্যাক করতেই যেনো আমার চোখ কপালে উঠে যায়।

আমি ভয়ে পেয়ে মর্গ থেকে ছুটে বেরিয়ে আসি। তারপর আপনাদের সাথে দেখা।

"ইরিনের মুখে এসমস্ত কথা শুনে আমিই চিন্তায় পরে গেলাম। আবার কোন ধাঁধায় আটকে গেলাম আমি। এই মহিলাটির নাম তাহলে রোকসানা! উনাকে আর হরিণীকে কিবরিয়া আর ওর সরদার খুঁজছে.? কিন্তু কেনো.? কি উদ্দেশ্য ওদের.? আমাকে যেভাবেই হোক এর রহস্য ভেদ করতে হবে আর হরিণীকেও বাঁচাতে হবে।"

হরিণী আর ওর মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে যখন ভাবনায় মগ্ন হয়ে পড়ি তখন অরিনের ডাকে আবারও হুঁশ ফিরে...

অরিন:- ভাইয়া! আবার কোথায় হারিয়ে গেলেন??

আরিয়ান:- ভাবছি!

ইরিন:- কি ভাবছেন.?

আরিয়ান:- আচ্ছা ইরিন! ওই কিবরিয়া চৌধুরী এখন কোথায় আছে.?

ইরিন:- জানি নাহ! উনি হঠাৎ হঠাৎ ক্লিনিকে আসেন আবার হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে যান।

অরিন:- ওই কিবরিয়াকে আটক করলেই সব সত্যি সামনে আসবে.?

আরিয়ান:- এক্সাক্টলি! আমাদের এখন ২টা উদ্দেশ্য, হরিণীকে বাঁচানো আর কিবরিয়াকে খুঁজে বের করে সত্যিটা জানা।

ইরিন:- কিন্তু কিভাবে.? এটা নিয়ে লিগ্যাল কেস করতে গেলে আপনার বিপদ হতে পারে। আর যদি ইলিগ্যাল ভাবে তদন্ত করেন তাহলে অরিনের চাকরি হারাতে হবে সাথে আমারও ডাক্তারি লাইসেন্স ক্যান্সাল হয়ে যাবে।

আরিয়ান:- হুম! এমন কিছু করতে হবে যাতে সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙ্গবে নাহ।

অরিন:- কি করবেন.?

আরিয়ান:- ভাবতে হবে।

ইরিন:- আচ্ছা! শুনো তোমরা, কাল উনার লাশটা দাফন করতে হবে। তাছাড়া হরিণীকে আমাদের সাথে রাখা সম্ভব নাহ। এতে ওর পাশাপাশি আমাদেরও বিপদ হতে পারে। ওকে ওদের বাসায়ই রাখবো তবে ওর উপর সবসময় অরিনের ফোর্সদের নজর রাখতে বলবো।

অরিন:- কিন্তু! এটা তোহ লিগ্যাল ভাবে তদন্ত করা সম্ভব নাহ। আর যদি লিগ্যাল কেস নাহ হয় তাহলে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে কোনো ফোর্স নিয়োগ করা পসিবল নাহ।

আরিয়ান:- আপাতত আজ রাতটুকু একটা ভালো সেল্ট হলেই হবে।

ইরিন:- আরিয়ান ভাইয়া! আপনি চাইলে আমাদের ফার্ম হাউজে থাকতে পারেন। আর হরিণীকেও আজকের জন্য ওখানে রাখা সম্ভব তবে কাল ওর মায়ের দাফন কাজ শেষ হলে ওকে ওর কুটিরেই ফিরে যেতে হবে।

অরিন:- তাহলে আজ রাতটুকু আমিও আপনাদের সাথে ফার্ম হাউজে থাকবো।

আরিয়ান:- আর একটা কথা!

ইরিন:- কি কথা.?

আরিয়ান:- হরিণী যে রোকসানা আন্টিরই মেয়ে এটা যেনো কেউ জানতে নাহ পারে। যদি কেউ ঘুনাক্ষরেও টের পায় তাহলে হরিণীর সাথে সাথে আমাদেরও মস্ত ক্ষতি হতে পারে।

অরিন:- হ্যাঁ! আরিয়ান ভাইয়া একদম ঠিক বলেছে! আর তুই যদি এই কথাগুলো আমাদের আগে থেকে কল করে জানিয়ে দিতি তাহলে কিছুতেই আমরা হরিণীকে এখানে আনতাম নাহ।

এই কথাটুকু বলেই অরিন আমাদের সবাইকে ইশারায় চুপ করে বলে দরজার দিকে ছুটে যায়।

আমিও ওর পিছু পিছু দরজার কাছে গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলাম...

"কি হয়েছে.? এভাবে ছুটে এলে কেনো.?"

অরিন:- এখন রোকসানা আন্টি অথবা হরিণীকে নিয়ে কোনো আলোচনা নাহ করাই আমাদের জন্য ভালো।

ইরিন:- কেনো রেহ কি হলো আবার.?

অরিন:- কেউ একজন মনে হলো আমাদের কথা আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিলো।

আরিয়ান:- আমার সন্দেহই ঠিক! এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। যে বা যারা এসবের পিছনে লুকিয়ে আছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে।

অরিন:- হ্যাঁ! কিন্তু একটা প্রশ্ন তোহ থেকেই যায়.?

আরিয়ান:- কি প্রশ্ন.?

অরিন:- কিবরিয়া রোকসানা আন্টিকে কিভাবে চিনে.? আর রোকসানা আন্টির হাতে এমন থার্ড আই সিম্বলই বা কেনে.? এখন আবার রোকসানা আন্টির মৃত্যুর পর ওরা সবাই তার সন্তানকে খুঁজতে চাইছে কেনো.? কি ওদের উদ্দেশ্য.? সবচেয়ে বড় কথা কিবরিয়া কার সাথে কথা বলছিলো.? যার সাথে কথা বলছিলো তাকে সরদার বলেই বা কেনো সম্মোধন করছিলো.? ওই সরদারটা কে.?

আরিয়ান:- সব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র কিবরিয়াই দিতে পারে। এখন কিবরিয়াকে খুঁজে বের করতে হবে.? তবে কাল রোকসানা আন্টির শেষ কার্য সম্পন্ন হলে আমি শহরে ফিরে যাবো.?

অরিন:- শহরে ফিরে কি করবেন.? কার কাছে থাকেন.?

ইরিন:- হ্যাঁ! তাই তোহ! তাছাড়া আপনি আমাদের ইনভেস্টিগেশনের একজন মূল ভিক্টিম। আপনি নাহ থাকলে এসব আমরা কিছুতেই জানতে পারতাম নাহ। আর এখন যদি আপনিই চলে যান তাহলে কি করে হয় বলুন তোহ..?

অরিন:- তুই হয়তো ভুলে গিয়েছিস, তুই ডাক্তার আর আমি পুলিশ!

ইরিন:- ওহ্ হ্যাঁ! সরি ভুলে গেছিলাম। যাই হোক এসবে তোহ আমিও ইনভলভ আছি তাই নাহ। তাহলে তোহ এসবে আমিও ইনভেস্টিগেশন করবো।

অরিন:- তুই তোর ডাক্তারিতে মন দে এসব আমরা সামলে নিবো। আর আরিয়ান ভাইয়া! আপনি প্লিজ শহরে যাবেন নাহ। এই মুহূর্তে আপনাকে আমাদের প্রয়োজন।

আরিয়ান:- আচ্ছা! বেশ শহরে গেলাম নাহ। এখানে থেকেই বা কি করবো.? কার কাছে থাকবো.? এখানে তোহ আমার কেউই নেই.?

অরিন:- ওহ্! আমরা তোহ কেউ নাহ!

ইরিন:- এটা কি বললেন! আমরা থাকতেও আপনি বলছেন এখানে আপনার কেউ নেই.? আপনি আজ থেকে আমাদের ফার্ম হাউজেই থাকবেন।

আরিয়ান:- আচ্ছা! আচ্ছা! আচ্ছা! আমি থাকবো! তবে ততদিন যতদিন নাহ এই কেসটা সলভ হচ্ছে।

অরিন:- ঠিক আছে।

[এক রকম জোড় করেই যেনো আমাকে এখানে থাকতে বাধ্য করলো। কেনো জানি নাহ আমার আবারও ওদের উপর সন্দেহ হতে শুরু করলো। সেই কবে নাহ কবে ওদের হেল্প করতাম তার বিনিময়ে ওরা আমাকে নিজেদের বাড়িতে থাকতে দিচ্ছে হিসাবটা ঠিক মেলাতে পারছি নাহ্। অথচ আমার চেয়ে ওই মেয়েটার একটা আশ্রয় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো। যাই হোক এখন এসব নাহ ভেবে আমার ভাগ্য আমাকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে আমিও সেদিকেই যাই এটাই হয়তো আমার জন্য ভালো হবে]

মনের ভিতরে অগাধ সন্দেহ নিয়ে অরিন ও ইরিনদের ফার্ম হাউজে চলে এলাম।

ফার্ম হাউজটি বেশ বড়সড়ই ছিলো৷ দেখে মনে হচ্ছে এই গ্রামে খুব কম সংখ্যক লোকেরই এমন বড়সড় বাড়ি ঘর আছে।

ফার্ম হাউজের তিনটি আলাদা আলাদা ঘরে তিন জন শুয়ে পরলাম।

দোতলার প্রথম রুমটিতে আমাকে থাকতে দেওয়া হলো। দ্বিতীয় রুমটিতে হরিণী আর তৃতীয় রুমটিতে অরিন।

যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়ি।

সকালে পানির শব্দ পেয়ে ঘুম ভাঙ্গে। উঠে খেয়াল করি এখনো সকাল হয়নি। কিছুক্ষণ আগেই হয়তো ফজরের আযান হয়েছে।

পা টিপে টিপে হাঁটতে থাকি পানির শব্দের সন্ধানে। অজানা এই বাড়িতে কোথায় কি খুঁজবো বুঝে উঠতে পারছি নাহ। হাঁটতে হাঁটতে হরিণীর ঘরের দরজার সামনে এসে চোখ আটকে গেলো ওর ঘরের মেঝের দিকে।

নিচে তাকিয়ে দেখি ভেতর থেকে অনবরত পানি বয়ে বাইরের দিকে আসছে। দরজার কড়া নাড়তেই দেখি দরজাটা নিজে নিজে খুলে গেলো।

ভয়ে ভয়ে ওর ঘরের ভিতরে ঢুকে দেখি, হরিণী একটা পানি ভর্তি বালতির ভিতরে নিজের মাথা গুঁজে দিয়েছে।

আশ্চর্য! এই মেয়ে কি সুইসাইড করলো নাকী অন্য কোনো শক্তি ওকে মেরে ফেলেছে.?

ভয়ে ভয়ে ওর সামনে গিলাম এটা দেখতে যে, ও বেঁচে আছে নাকী মারা গেছে।

আস্তে আস্তে ওর কাঁধে হাত দিতে যাবো তখনই হরিণী বালতির ভিতর থেকে মাথা বের করে।

আমি ভয়ে চিৎকার দিতে যাবো তখনই হরিণী আমার মুখ চেপে ধরে, খেয়াল করলাম কাল রাতে হসপিটালে ওর হাতের আঙ্গুলগুলো যেমন রক্তাক্ত দেখেছিলাম আজকে ঠিক তেমনই রক্তাক্ত হয়ে আছে।

মাথায় প্রশ্নের উপর প্রশ্ন ঘুরপাক খেতেই থাকে কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই যেনো উত্তর আমার কাছে নেই। হরিণীকে দেখতে যতটা অস্বাভাবিক মনে হয় ও তার চেয়েও বেশি অস্বাভাবিক কিছু। কিন্তু কে ও.? কি ওর আসল পরিচয়.? ও কি আদোও কোনো মানুষ.?

কিন্তু ওকে দেখে মনে হচ্ছে ও এসবে খুব ভয় পেয়ে আছে.? ও ভয় পাচ্ছে কেনো.? এসব তোহ ও নিজেই করলো তাহলে ও কেনো ভয় পাবে.?

হরিণী ঠিক মতো কথাও বলতে পারে নাহ, ওকে এখন এসব জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে.?

যা হবার হোক, একবার জিজ্ঞেস করেই দেখি.?

নানান কথা ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করলাম....

"তুমি বালতির ভিতরে মাথা গুঁজে দিয়েছিলে কেনো.? আর তোমার হাতের আঙ্গুলগুলো এমন রক্তাক্ত কেনো.?"

প্রশ্নটা করার পরই আমার নজর গেলো ওর পায়ের দিকে, ও পা'গুলো দেখে যেনো আমি আকাশ থেকে পরলাম। হাতের আঙ্গুলগুলোর মতো ওর পায়ের আঙ্গুলগুলোও রক্তাক্ত হয়ে ছিলো.!

"কিছু তোহ গন্ডগোল আছে এই মেয়ের মধ্যে, যে করেই হোক ওর আর ওর মায়ের আসল সত্যিটা খুজে বের করতে হবে"

আমি এসব ভাবনায় যখন ডুবে ছিলাম তখন হয়তো হরিণী আমার করা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলো কিন্তু আমি শুনতে পাইনি।

"ধ্যত কি বড় ভুল করলাম, প্রশ্নটা করেও উত্তরটা জানতে পারলাম নাহ। এখন কি করবো.?"

হরিণীকে আবারও প্রশ্ন করলাম, হরিণী উত্তরে বলল...

"আ-আস-লে আ-মার নখ-গুলো ব-ড় ব-ড় হয়ে গি-য়ে-ছি-লো তাই দাত দি-য়ে-ই ন-খগু-লো কে-টে-ছি"

"ওর উত্তর শুনতে শুনতে যেনো আমারই শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল! আমার সামনে কেউ এভাবে কথা বললে আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।"

তারপর আমার রুমে গিয়ে একটা নেইল কাটার এনে হরিণীর হাতে দিয়ে বললাম...

"এরপর থেকে যখন তোমার হাত ও পায়ের নখ বড় হয়ে যাবে তখনই এটা দিয়ে কাটবে আর দাঁত দিয়ে কাটবে নাহ!"

হরিণীর হাতে নেইল কাটার দিয়ে আমি আবারও ঘুমতে চলে গেলাম।