পুনর্জন্ম (The Another Love Sory) — পর্ব ০৪

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৪ · ২৩ পর্বের মধ্যে ৪

হরিণীর হাতে নেইল কাটার দিয়ে আমি আবারও ঘুমতে চলে গেলাম।

সকালে আবারও ঘুম ভাঙ্গে অরিনের ডাকে...

"আরিয়ান ভাইয়া! উঠুন! উঠুন! আমাদের বেরোতে হবে!"

চোখ খুলে দেখি অরিন আর হরিণী আমার রুমে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের দেখে বুঝলাম আমাদের এখন বেরেতে হবে। আজকে হরিণীর মায়ের দাফন কাজ শেষ করে ওকে ওর বাসায় রেখে আসতে হবে।

ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হরিণীকে নিয়ে অরিনের সাথে বেরিয়ে পরলাম হরিণীর মায়ের দাফন কাজ শেষ করতে। পথে আমরা তিন জন একটা হোটেলে সকালের নাস্তা করলাম।

নাস্তা শেষে অরিনের ফোনে একটা কল আসে। কল রিসিভ করার পর অরিনের সাথে কিছু একটা নিয়ে কারো একজনের সাথে কথা কাটাকাটি হয়।

কল কেটে অরিন আমাকে বললো....

অরিন:- ভাইয়া! আমাকে এক্ষুনি পুলিশ স্টেশনে যেতে হবে। খুব আর্জেন্ট একটা কেস হ্যান্ডেল করতে হবে। আমি আপনার সাথে বাকি সময়টুকু থাকতে পারবো নাহ। তার জন্য আমি সরি। আপনি হরিণীকে নিয়ে হসপিটাল থেকে ওর মায়ের লাশ ডিসচার্জ করে গ্রামের মহিলা মাদ্রাসায় চলে যান।

ওই মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ নিজ দায়িত্বে হরিণীর মায়ের লাশ দাফন করে দিবে। আমাদের আর নিজে থেকে কিছুই করতে হবে নাহ।

আপনি মাদ্রাসার আন্ডারে উনার লাশ রেখে তারপর হরিণীকে ওর মায়ের কুটিরে রেখে আসবেন।

এই বলে আমার হাতে বেশ কিছু টাকা ধরিয়ে দিলো। কিন্তু আমি তোহ মহিলা মাদ্রাসা চিনি নাহ, কি করে যাবো ওখানে..?

অরিনকে এই কথা বলতে যাবো তখনই অরিন বেরিয়ে গেলো।

কোনো উপায় নাহ পেয়ে হরিণীকে নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

হোটেল থেকে বেরিয়ে একটা রিক্সায় উঠলাম। মাঝপথে হঠাৎ করে হরিণী চেচিয়ে উঠলো....

"উমমম উমমম ও-টা খা-বো"

"মানে! এই মাঝপথে হরিণী আবার কি খেতে চাইছে.? একটু আগেই তোহ নাস্তা করলাম, এখন আবার কি খাবে.?"

চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম একটা ছেলে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছিলো। ছেলেটাকে দেখে বুঝলাম হরিণী হওয়াই মিঠাই খাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে।

রিক্সা থেকে নেমে ২টা হাওয়াই মিঠাই কিনলাম। একটা আমার জন্য আর একটা হরিণীর জন্য।

হাওয়াই মিঠাই পেয়ে হরিণীর খুশি কে দেখে! কোটি টাকার বিনিময়েও হয়তো এত সুন্দর হাসি কেউ দিতে পারে নাহ।

হাসি মুখে খুব মিষ্টি লাগছিলো হরিণীর চেহারাটি।

ওর চোখগুলো দেখলেই বুঝা যায় ওর নাম হরিণী কেনো রেখেছিলো রোকসানা আন্টি। ওর চোখগুলো হরিণের চোখের চেয়ে কোনো অংশে কম নাহ।

ওকে হাসতে দেখে অবাক হয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম তখনই হরিণী আমার গালে হাওয়াই মিঠাই লাগিয়ে দেয়। মেয়েটির এমন বাচ্চামো দেখে এবার আমিও হেসে দিলাম।

আবার মনে মনে এটাও ভাবতে থাকি, মেয়েটা যদি কোলাহলে থাকতো তাহলে হয়তো সে অনেক চঞ্চল প্রকৃতির হতো। এতগুলো বছর একা একা ঘরে শিকল বন্দী থেকে নিজের কণ্ঠে ঠিক মতো কথাও বলতে শেখেনি। মেয়েটি যেই হোক নাহ কেনো ও একটা মায়াবী। যে কেউ ওর মায়ায় আটকে যাবে।

ওর মায়ের দাফন হয়ে গেলে ওকে আর ওই কুটিরে রেখে আসবো নাহ, ওকে কোনো অনাথ আশ্রমে রেখে আসবো আর নয়তো ভালো কোনো ফ্যামিলি খুঁজে অ্যাডাভট দিয়ে দিবো।

কিছুক্ষণ পর রিক্সা এসে হসপিটালের গেইটের সামনে থামে। আমি ভাড়া চুকিয়ে হরিণীকে নিয়ে হসপিটালের ভিতরে চলে গেলাম।

ইরিনের সাথে দেখা করে হরিণীর মায়ের লাশটি একটা অ্যাম্বুলেন্সে করে মহিলা মাদ্রাসায় পৌঁছে দিতে বলি কারণ আমি এখানকার কিছুই চিনি নাহ।

ইরিনও একটা অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করে দিলো।

এরপর আমি হরিণীর মায়ের ডিসচার্জ পেপারে সাইন করে লাশ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে উঠে পরি।

লাশের সাথে আমি, হরিণী আর একজন অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার ছাড়া আর কেউই যায়নি।

আর যাবেই বা কেনো, এখানে রোকসানা আন্টির মেয়ে অর্থাৎ হরিণীকে ছাড়া অন্য কেউই নেই কেই-বা আসবে উনার শেষ কার্যে সামিল হতে।

হসপিটাল থেকে মাদ্রাসা অব্দি যেতে আমাদের প্রায় ত্রিশ মিনিটের মতো সময় লাগলো।

লাশটি রাস্তার পাশে নামিয়ে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার নিজের ভাড়া বুঝে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।

আমি আর হরিণী ওর মায়ের লাশ নিয়ে মাদ্রাসায় প্রবেশ করলাম।

মাদ্রাসায় ঢোকার সময় সিকিউরিটি গার্ড আমাদের জিজ্ঞেস করলো আমরা কেনো এখানে এসেছি..?

আমরা উনাকে সবকিছু খুলে বললে, উনি আমাদের সাথে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ লোকের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। এরপর মাদ্রাসার কিছু মহিলা এসে হরিণীর মায়ের লাশটি উনাদের সাথে করে ভিতরে নিয়ে যায়।

প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টা পর মাদ্রাসার মহিলারা রোকসানা আন্টির লাশটি একটা খাটিয়ায় করে বাইরে নিয়ে এলো।

"আমি গতকাল থেকে একটা জিনিস খেয়াল করলাম, হরিণী নিজের মাকে হারিয়ে ততটা শোকাহত নাহ যতটা শোকাহত হওয়ার কথা, ও কেঁদেছিলো ঠিকই কিন্তু ওর কান্নার কোনো মানে বুঝবে নাহ কেউ। ওর কান্না বুঝা খুব দায়, একজন ছোট বাচ্চা যেমন নিজের খেলনা হারানোর পর একটু কান্না করে আবারও স্বাভাবিক হয়ে যায় হরিণীও তেমনই এক মুহুর্ত কান্নার পর আবারও স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ও হয়তো এখনো বুঝতে পারেনি ওর মা আর কোনোদিনও ফিরে আসবে নাহ"

কিছুক্ষণ পর রোকসানা আন্টির লাশের পাশে আগরবাতি মোমবাতি জ্বালানো হয়।

বাকি মহিলারা সবাই কোরআন তেলাওয়াত করতে থাকে।

হঠাৎ করেই আমার নজর পরে, হরিণী আমার পাশে নেই।

"কি হলো.? কোথায় গেলো মেয়েটা.? ও তোহ এখানকার কিছুই চিনে নাহ তাছাড়া আমি নিজেও এখানকার কিছু চিনি নাহ। কোথায় খুঁজবো ওকে.? এই মেয়েটা হঠাৎ হঠাৎ এমন কাজকর্ম করে! উফফ! আল্লাহ! কি করবো.?"

দৌড়ে মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। রাস্তার এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছি কিন্তু ওকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি নাহ। আমি আর ভাবতে পারছি নাহ! কোথায় খুঁজবো এবার.? সহ্য হচ্ছে নাহ আমার! মনে হচ্ছে আমি এক্ষুনি শহরে ফিরে যাই।

আমি আবারও মাদ্রাসায় চলে এলাম। মাদ্রাসাটা একটু খুঁজে দেখা দরকার যদি মাদ্রাসার কোথাও থেকে থাকে।

মাদ্রাসায় এসে ঢুকতেই দেখলাম বাকি সদস্যরা মিলে হরিণীর মায়ের লাশের খাটিয়া নিয়ে কোথাও চলে যাচ্ছে, পিছন পিছন সবাই কালেমা শাহাদাৎ পড়ছে, আগরবাতির ধোঁয়া আর গন্ধে মাদ্রাসার চৌকাঠ মোহিত হয়ে গেছে।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নাহয় রোকসানা আন্টিকে কবর দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু হরিণী কোথায় গেলো.?

মাদ্রাসার একজন লোককে হরিণীর নিখোঁজের কথাটা বললাম, আমি আর ওই লোকটি মিলে হরিণীকে খুঁজতে থাকি। প্রতিটা রুম খুঁজেও কোত্থাও হরিণীকে খুঁজে পেলাম নাহ।

সব জায়গায় খুঁজেও যখন ওকে খুঁজে পাচ্ছিলাম নাহ তখন হতাশ হয়ে ছাদের দিকে যাচ্ছিলাম।

কয়েকটা সিঁড়ি পার হতেই দেখি মাঝ সিঁড়িতে কানে হাত দিয়ে হরিণী বসে কান্না করছিলো।

আমি ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম....

"কি হয়েছে.? কি হয়েছে.? তুমি এমন করছো কেনো.? কোথায় কষ্ট হচ্ছে.? "

হরিণী কিছুই বলছিলো নাহ, সমানে কান্না করে যাচ্ছিল। তারপর হরিণীকে নিয়ে মাদ্রাসা থেকে চলে আসি।

আমার মন কিছুতেই হরিণীকে সেই কুটিরে রেখে আসতে সাই দিচ্ছিলো নাহ, তাই ঠিক করলাম ওকে কোনো একটা অনাথ আশ্রমে রেখে আসবো।

কিন্তু এই গ্রামে তোহ কোনো অনাথ আশ্রম নেই, এক কাজ করি সবাইকে নাহ জানিয়ে আমি হরিণীকে নিয়ে শহরে যাবো। শহরে গিয়ে ওকে একটা অনাথ আশ্রমে রেখে আসি।

যেই ভাবা সেই কাজ, আমরা বেরিয়ে পরলাম শহরের উদ্দেশ্যে। ভুজঙ্গপুর থেকে শহরে যেতে প্রায় ৪০-৫০ মিনিট সময় লাগলো। শহরে এসেই একটা অনাথ আশ্রমে চলে গেলাম। ওখানে গিয়ে কিছু অকওয়ার্ড ও উইয়ার্ড কাহিনি দেখে আমার কিছুতেই হরিণীকে এখানে রেখে যেতে মন চাইলো নাহ।

ভাবলাম ওকে একটা ম্যাস বাড়িতে রেখে আসি, ওখানে অনেক লোকজন থাকে হয়তো ওদের সাথে মিশলে হরিণীরও ভালো লাগবে।

চলে এলাম ম্যাস বাড়িতে, এখানে আসার পর ঘটে গেলো আরো একটা বাজে ঘটনা যার ফলে এখানেও আমার মন সাই দিলো নাহ।

ঘটনাটা কিছুটা এমন ছিলো...

আমি হরিণীকে নিয়ে ম্যাস বাড়িতে ঢোকার কিছুক্ষণ পর দোতলা থেকে একজন ২৩-২৪ বছর বয়সী মেয়ে এসে বললো...

"কি সাব! একে বিক্রি করতে এসেছেন বুঝি! হুমমম দেখে তোহ একদম খাসা মনে হচ্ছে ভালো দাম পাবেন! আমাদের দলে দিয়ে যেতে পারেন অনেক আপ্যায়ন করবো ওর।"

আরো একটি ঘটনা ঘটলো....

"ওই মেয়েটি আসার পূর্বে একটা ৩০-৩৫ বছর বয়সী লোক একটা মেয়েকে চুল ধরে টানতে টানতে ম্যাস বাড়ির উঠানে এনে ফেলে নিজের বেল্ট খুলে সেটি দিয়ে মারতে শুরু করে"

এমন পরিবেশে হরিণীকে রেখে যেতে মন চাচ্ছিল নাহ। তাই ওকে নিয়ে আবারও গ্রামে ফিরে আসি।

কোনো উপায় নাহ পেয়ে ওকে আবারও পর মায়ের সেই কুটিরে রেখে আসতে বাধ্য হই।

"এত সবের মধ্যে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, আমরা যতক্ষণ বাইরে ছুটাছুটি করছিলাম ততক্ষণই মনে হচ্ছিল আমাদের পিছু পিছু কেউ একজন ফলো করছিলো। অনেক বারই মনে হয়েছে কেউ আমাদের পিছু নিয়েছে কিন্তু কাউকে দেখতে পাইনি।"

"আর একটা অদ্ভুত ঘটনা হলো, সারাদিনে যতবারই আযানের সময় হয়েছে ততবারই হরিণী পাগলের মতে করে ছুটে গিয়ে আশেপাশে কোনো পুকুর খুজে তার মধ্যে নিজের মাথা চুবিয়ে দিতো"

ওর এমন আজব কর্মকান্ড দেখে আমি যে কতবার হেঁসেছি তা বলার বাহিরে।

তারপর হরিণীকে ওর মায়ের কুটিরে রেখে আমিও অরিনদের ফার্ম হাউজে চলে গেলাম।

ফার্ম হাউজে এসে ড্রয়িংরুমে বসে বসে টিভি দেখছিলাম তখনই কেউ একজন এসে দরজায় কলিং বেল চাপলো.....

"কে! কে এসেছে এত রাতে..?"

দরজার অপর প্রান্ত থেকে জবাব এলো....

"আরিয়ান ভাইয়া! দরজা খুলুন আমি অরিন!"

"তুমি এত রাতে কেনো এসেছো.?"

অরিনকে প্রশ্ন করতে করতে দরজা খুললাম। দরজা খুলে দেখি অরিন অনেক কেনাকাটা করে এসেছে। কি এমন কেনাকাটা করেছে জানার জন্য জিজ্ঞেস করলাম....

"একি অরিন! এগুলো কি.?"

অরিন:- আপনি হয়তো ভুলে গেছেন! আজ থেকে আপনি এখানেই থাকবেন। প্রতিদিন তোহ আর বাইরে গিয়ে খাওয়া সম্ভব নাহ তাই রান্নার সরঞ্জাম কিনে এনেছি আপনার জন্য।

আরিয়ান:- এসবের কি দরকার ছিলো! আছিই বা কয়দিন এরপর তোহ চলেই যাবো।

অরিন:- আছিই বা কয়দিন মানে.? আপনাকে বলেছি নাহ আপনার যতদিন খুশি ততদিন এখানে থাকতে পারেন। আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আর যেখানে আমাদেরই কোনো সমস্যা হচ্ছে নাহ সেখানে আপনার কেনো সমস্যা হচ্ছে.? আপনার কি এখানে থাকতে ভালো লাগছে নাহ.?

আরিয়ান:- নাহ! তেমনটা নাহ! আসলে কোনোদিন একা একা থাকিনি তোহ তাই!

অরিন:- আচ্ছা! আপনাকে আর একা থাকতে হবে নাহ!

আরিয়ান:- মানে!

অরিন:- এত মানে মানে করবেন নাহ তোহ! চলুন রান্না করতে হবে। আজ আমিও আপনার সাথে ডিনার করবো। ভালো কথা, রাতে খেয়েছেন.?

আরিয়ান:- নাহ!

অরিন:- তাহলে চলুন! একসাথে রান্না করে ডিনার করবো।

এরপর আমি আর অরিন মিলে রান্নাঘরে চলে গেলাম। অরিন বললো আজকে রুটি আর আলু ভাজি রান্না করবে। এই খাবারটা নাকী ওর অনেক বেশি প্রিয়।

অরিন আমাকে আলু কাটতে দিয়ে নিজে রুটি বানানোর জন্য ময়দা মাখছিলো।

আলু কাটতে কাটতে হঠাৎ চোখ গেলো অরিনের মুখের দিকে। ওর দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই হেসে দিলাম। আমাকে এমন ভাবে হাসতে দেখে অরিন প্রশ্ন করলো...

"কি হলো! আপনি হাসছেন কেনো.?"

আরিয়ান:- হা!হা!হা! হাসবো নাহ তোহ কি করবো.?

অরিন:- মানে.? কি এমন হয়েছে যে আমি এত হাসছেন.?

আমি একটা স্টিলের বাসন নিয়ে অরিনের মুখের দিকে ধরলাম।

"দেখো.! নিজের চেহারার কি হাল করেছো.? দেখতে একদম জোকার মনে হচ্ছে! হা!হা!হা!"

"এটা কিন্তু একদম ঠিক নাহ আরিয়ান ভাইয়া! রুটি বানাতে গেলে একটা আকটু ময়দা মুখে লাগতেই পারে তাই বলে আপনি এমন ভাবে হাসবেন! দিস ইজ নট ফেয়ার! আমি রাগ করেছি!"

"আরে! আরে! রাগ করার কি আছে! দাড়াও আমি ক্লিন করে দিচ্ছি!"

অরিনকে দাঁড় করিয়ে আমি আস্তে আস্তে ওর মুখ থেকে ময়দাগুলো সরিয়ে দিচ্ছিলাম। খেয়াল করলাম, অরিন আমার চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমিও ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

মনে হচ্ছে একে অপরের সাথে চোখাচোখি করছিলাম। এই অবস্থায় যদি আমাদের কেউ দেখে তাহলে যে কেউ আমাদের কাপল ভেবে বসবে।

মোহ নিয়ে দুইজন দুইজনের দিকে তাকিয়ে আছি তোহ তাকিয়েই আছি। নজর যেনো সরছিলাম নাহ। হঠাৎ করে আমি চেচিয়ে উঠলাম....

"আআহ্! আমার চোখ.!"

অরিন:- কি হলো আরিয়া ভাইয়া! দেখি দেখি!

আরিয়ান:- আহ্! আমার চোখে মনে হচ্ছে কিছু একটা গেছে।

অরিন:- দেখি! কি গেলো আবার।

অরিন ওর দুই হাত দিয়ে আমার মাথাটা চেপে ধরে আমার চোখে ফু দিচ্ছে। আস্তে আস্তে ওর ওড়নার এক কোণা আঙ্গুলে পেচিয়ে আমার চোখ থেকে একটা ছোট্ট পোকা বের করলো। পোকাটা বের করার সময় আমার চোখ আরো বেশু জ্বালা করছিলো। এজন্য অরিন আবারও আমার চোখে ফু দিতে থাকে। এক পর্যায়ে খেয়াল করলাম আমরা আবারও মোহে পরে একে অপরের সাথে চোখাচোখি করছি। বেশ কিছুক্ষণ পর আমার মোহ কাটলে কাশি দিয়ে বললাম...

"উহহহু! রান্না করার ইচ্ছে আছে নাকী সারা রাত চোখাচোখি করেই কাটিয়ে দিবে"

অরিন:- ওহ্! হ্যাঁ! হ্যাঁ! সব দোষ আপনার! আপনার জন্যই দেরি হলো।

আরিয়ান:- আমি আবার কি করলাম[আড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললাম]

অরিন:- নাহ!নাহ! এমনি, আপনি আবার কি করবেন। সব দোষ আমার। আমি যদি ঠিক মতো রান্না করতাম তাহলে এমনটা হতো নাহ।

আরিয়ান:- এইতো গুড গার্ল। চলো! চলো! তাড়াতাড়ি রান্না কমপ্লিট করো! আমি ড্রয়িংরুমে বলে টিভি দেখছি, রান্না কমপ্লিট হলে আমাকে ডাক দিও।

অরিন:- এইযে মিস্টার! আমি একা একা রান্না করবো আর আপনি বসে বসে খাবেন। নাহ! এমনটা তোহ হবে নাহ! আমার সাথে রান্না করলেই খেতে পাবেন নয়তো এগুলো আমি একাই খাবো।

আরিয়ান:- ওকে! ওকে! ওকে! ম্যাডাম আপনি যা বলবেন তাই হবে। চলুন একসাথে রান্না করি।

অরিন:- এইতো গুড বয়! এবার তাড়াতাড়ি আলুগুলো কেটে বাকি সবজিগুলোও কেটে ফেলুন।

আরিয়ান:- যথা আজ্ঞা মহারাণী!

অরিন:- হা!হা!হা! আপনি ড্রামা বেশ ভালো করতে পারেন।

আরিয়ান:- হা!হা!হা! ওই আরকি।

অরিন:- তা! এভাবে কতজন মেয়েকে ইমপ্রেস করেছেন.?

আরিয়ান:- আমার জীবনে তোহ একজনই ছিলো। ওকে নিয়েই তোহ সারাটা জীবন কাটাতে চেয়েছিলাম। যে আমাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো তাকে ছাড়া আর কাউকেই কখনো ইমপ্রেস করিনি বা করার ইচ্ছে হয়নি।

অরিন:- এত সুন্দর মোমেন্টটাতে ইমোশন করবেন নাহ প্লিজ। রিশা আপু ও আপনার ফ্যামিলির মৃত্যুর কথা শুনে অনেক খারাপ লেগেছে। যে ট্রাকটা আপনাদের গাড়ি ধাক্কা দিয়েছিলো ওই ট্রাকটা আটক করেননি.?

আরিয়ান:- যা হয়ে গেছে সেসব নিয়ে আর ঘাটাঘাটি করিনি। হয়তো ওদের মৃত্যু এভাবেই লিখা ছিলো তাই এভাবেই মারা গেছে। আমি আর এসব নিয়ে থানা পুলিশ করিনি।

অরিন:- আপনি শিওর একটা সাধারণ কোনো এক্সিডেন্ট.? নাহ মানে এটা খুনও তোহ হতে পারে.?

"এখন অরিনকে বুঝাই কি করে! ওকে যে কাহিনি শুনিয়েছিলাম সেটা মিথ্যা। আমার কাছের মানুষগুলো কোনো এক্সিডেন্টে মারা যায়নি ওরা এক ভয়ংকর ডাইনির হাতে মারা গেছে এক কথায় এক অভিশপ্ত গ্রামের অভিশাপ খণ্ডনের জন্য ওদের বলি দেওয়া হয়েছে।"

অরিন:- ভাইয়া! কি হলো.?

আরিয়ান:- নাহ! কিছু নাহ! এসব বাদ দাও, এসব এখন মনে করতে চাইছি নাহ। রান্নায় মনোযোগ দাও।

অরিন:- ভাইয়া!

আরিয়ান:- আবার কি হলো.?

অরিন:- সবাইকে খুব মিস করেন তাই নাহ.?

আরিয়ান:- হ্যাঁ! আমার জায়গায় যদি তুমি থাকতে তাহলে কি তুমি মিস করতে নাহ.?

অরিন:- আমি তোহ এখনো ভুলতে পারিনি তাকে.?

আরিয়ান:- তাকে মানে.? কাকে.?

অরিন:- ছিলো একজন! আমি বুঝি ভালোবাসার মানুষকে হারানোর কষ্ট কতখানি। সে শুধু আমার জীবনেই আসেনি সে আমার জীবনটা পুরো ধ্বংস করে দিয়েছে।

আরিয়ান:- কিভাবে.?

অরিন চোখের পানি মুছে বললো...

"বাদ দিন এসব! আরেক দিন বলবো!"

আরিয়ান:- ঠিক আছে! তোমার যখন ইচ্ছে হয় তখনই বলো।

অরিন:- হ্যাঁ! আমার রুটি বানানো প্রায় শেষ পর্যন্ত।

আরিয়ান:- আমারও আলু কাটা শেষ।

অরিন:- ভাইয়া! জানতে চাইবেন নাহ আমি আপনাকে কোন পরিচয়ে চিনেছিলাম.?

আমি থতমত খেয়ে বললাম....

"তুমি নাহ বললে আমি কিভাবে জানবো.?"

অরিন:- তা অবশ্য ঠিক! আচ্ছা! এসব বাদ দিন কালকে আপনার সাথে এই বিষয়ে কথা বলবো।

আরিয়ান:- ঠিক আছে অপেক্ষায় থাকবো। এখন আপাতত রান্না কমপ্লিট করি।

অরিন:- হা!হা! চলুন।

অবশেষে আমরা রান্না কমপ্লিট করলাম। একসাথে বসে রাতের ডিনার শেষ করলাম।

ডিনার শেষে অরিন চলে যেতে চাইলে ওকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি...

"আচ্ছা! অরিন, তোমাদের সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করতে চাই, আশা করি সঠিক উত্তর পাবো!"

অরিন কিছুটা অবাক হয়ে জবাব দিলো.....

"হ্যাঁ! হ্যাঁ! বলুন নাহ কি জানতে চান.?"

আমি স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করলাম.....

"আচ্ছা অরিন এখন তুমি কোথায় যাবে??"

অরিন:- মানে??

আরিয়ান:- মানে এখন কোথায় যাবে.?

অরিন:- অফ কোর্স আমার বাসায় যাবো.!

আরিয়ান:- তোমার বাসায় কে কে আছে.??

অরিন:- আমি যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকি ওখানে আমি একাই থাকি।

আরিয়ান:- মানে! বুঝলাম নাহ.? তোমরা ফ্যামিলির সবাই কি আলাদা আলাদা থাকো নাকী.?

অরিন:- হ্যাঁ! ওই রকমই কিছুটা। আমি আলাদা অ্যাপার্টমেন্টে থাকি আবার অন্য দিকে ইরিনও আলাদা অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। এটা আমাদের ফার্ম হাউজ যেখানে আপনি থাকছেন।

আরিয়ান:- আর তোমার বাবা মা??

অরিন:- ওরা সবাই শহরে থাকে।

আরিয়ান:- তাহলে তোমরা এখানে থাকো কেনো.?

অরিন:- জবের জন্য.!

আরিয়ান:- এত ছোট জব করে৷ গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের নামে অ্যাপয়েন্টমেন্ট কিভাবে কিনলে??

অরিন:- আমরা দুই বোন যে অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে থাকি ওইগুলো আমরা নিজেদের ইনসুরেন্স দিয়ে কিনেছি। আর এই ফার্ম হাউজ আমাদের বাবা কিনেছিলেন অনেক বছর আগে।

আরিয়ান:- বুঝেছি।

অরিন:- কিন্তু আরেকটা কথা..

আরিয়ান:- আবার কি.?

অরিন:- আমি আর ইরিন মাঝে মাঝে নিজেদের অ্যাপার্টমেন্ট এক্সচেঞ্জ করি।

আরিয়ান:- এটা কেনো করো??

অরিন:- আসলে আমাদের মধ্যে খুব ভালো বন্ড এজন্য মাঝে মাঝে এমন করি।

আরিয়ান:- খুব ভালো। যাই হোক, তুমি কি এখন চলে যাবে.?

অরিন:- হ্যাঁ!

আরিয়ান:- ড্রপ করতে আসবো.?

অরিন:- নাহ! নাহ! একাই যেতে পারবো। আর আপনি হয়তো ভুলে গেছেন আমি একজন পুলিশ অফিসার।

আরিয়ান:- হ্যাঁ! হ্যাঁ! দারগা সাহেবা আমার ভুল হয়েছে ক্ষমা করে দিন।

অরিন:- হা!হা! ওকে টেক কেয়ার! আল্লাহ হাফেজ।

এরপর অরিনও চলে গেলো। আমি ফার্ম হাউজের ড্রয়িংরুমে একা একা বসে বসে টিভি দেখতে থাকি। হঠাৎ করে বাইরে ধুম বৃষ্টি শুরু হয়। এত রাতে আবার বৃষ্টি শুরু হলো কেনো সারা দিন তোহ আকাশে একটুও কালো মেঘ দেখলাম নাহ।

যাই হোক, বৃষ্টির মধ্যে রোমান্টিক মুভি দেখার মজাই আলাদা। একা একা টিভিতে মুভি দেখছিলাম হঠাৎ করে লোডশেডিং হলো।

"যাহ বাবা! লোডশেডিং হওয়ার আর টাইম পেলো নাহ! ইশশ কত সুন্দর মোমেন্টটা এসেছিলো।"

আফসোস নিয়ে পকেটে হাত দিলাম ফোনের তালাশে। অথচ আমার পকেটে ফোন নেই। কি ব্যাপার ফোন কোথায় গেলো.?

ধ্যত তেরি পাহাড়িতলা গ্রাম থেকে ফেরার সময় তোহ ফোন আনতেই ভুলে গিয়েছিলাম। ফোনটা নিশ্চয়ই সেই নিষিদ্ধ স্থানেই পরে আছে। আর সেই নিষিদ্ধ স্থানটি এখন আমার আপনজনদের কবরস্থান।

এই অন্ধকারে এখন কি করবো.?

কি আর করার চুপ করে এখানেই বসে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

ওদিকে বাইরে ধুম বৃষ্টি হচ্ছে আর এদিকে ফার্ম হাউজে আমি একা একা অন্ধকারে ড্রয়িংরুমে বসে আছি। হঠাৎই কেউ একজন এসে দরজার কড়া নাড়লো।