পুনর্জন্ম (The Another Love Sory) — পর্ব ২১

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২১ · ২৩ পর্বের মধ্যে ২১

মুহুর্তেই রিশা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো আর অরিন, ইরিন ও রাশেদ আঙ্কেলও মারা গেলো। গতবারের মতো এবারও আমি নিঃশ্ব হয়ে গেলাম। তখনই কেউ একজন পিছন থেকে আমার কাঁধে হাত রাখে......

আমি কান্না থামিয়ে উঠে দাড়ালাম। দাঁড়িয়ে পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম, একজন ফর্সা করে লম্বা লোক। প্রায় ৬ ফিট তোহ হবেই। পড়নে সাদা শার্ট - কালো প্যান্ট সাথে কালো রঙের ব্লেজার। ফ্রান্সি হেয়ার কাট, চোখে চশমা। দেখে সনামধন্য ফ্যামিলিরই মনে হচ্ছিল। কিন্তু কে উনি.? লোকটাকে আগে কোথাও দেখিনি। হাতে একটা লাগেজ, আর এমনিতেও অনেকগুলো ছোট ছোট ব্যাগ ছিলো। তাকে প্রশ্ন করতে যাবো তার আগেই সে আমাকে উর্দু ভাষায় প্রশ্ন করলো...

- কি হয়েছে ভাই.? আপনি কান্না করছেন কেনো.?

লোকটার মুখে উর্দু ভাষা শুনে বুঝতে পারলাম এটা নিশ্চয়ই ডাক্তার সিমন যার কথা ইরিন আর অরিন বলেছিলো। কিন্তু উনি কখনো এলেন আর এখানেই বা কি করে এলো.?

যাই হোক, আমিও উর্দুতেই তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম....

- কি হয়নি সেটা বলুন ভাই!৷ এই গ্রামে আসার প্রথম দিন থেকে আমার জীবনের গল্পটাই পাল্টে গেছে। একের পর এক প্রিয় মানুষকে হারিয়েছি এখানে৷ আসার পর। আমি যাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি নিয়তি তাদেরকেই আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।

- মানে.?

- ওইসব বাদ দিন! আপনি কখন এসেছেন.?

- বিকেলে এসেছি। আসার পর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল তাই বের হতে পারিনি। কিন্তু আমি এখনো শিওর নাহ যে আমি আমার গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পেরেছি কি-না। বাই দ্য ওয়ে! আপনি কি করে জানলেন যে আমার আসার কথা ছিলো...?

- আপনি ডাক্তার সিমন এম আই রাইট!

- ইয়াহ!! বাট হু আর ইউ.?

- আই এম আরিয়ান খান। আমার সাথে ইরিনের বোন অরিনের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।

- হোয়াট!! ওহ্ মাই গড। আপনাদের ব্যাপারে ইরিন আমাকে অনেক গল্প শোনাতো। তোহ ইরিন, অরিন ওরা কোথায়।

আমি মাথা নিচু করে ডাক্তার সিমনকে ইরিন এবং অরিনসহ বাকিদের নিথর দেহগুলো দেখালাম। সবার এমন অবস্থা দেখে উনি আমার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো "এগুলো কিভাবে হলো" তারপর তার কাছে সবকিছু খুলে বললাম। সবকিছু শোনার পর ডাক্তার সিমন বললেন....

- উপায় একটা আছে!

- কি উপায়.?

- রাজা এলাহাবাদের প্রাসাদ আর রাজকন্যা ইলাহ্'র সেই রহস্যময় বই।

- কিন্তু....

- কোনো কিন্তু নেই! সবকিছু শুনে যা বুঝলাম, আপনার মধ্যে শুভ আত্মার বাস রয়েছে। আপনি চাইলে সয়তানের খেলায় সয়তানকেই মাত দিতে পারেন। সেই জন্য আপনাকে রাজা এলাহাবাদের প্রাসাদে গিয়ে রাজকন্যা ইলাহ্'র লেখা রহস্যময় বই খুঁজে বের করতে হবে। আর ওই বইয়ের সাহায্যে আপনাকে রুহ্-এর জগতে যেতে হবে। রুহ্-এর জগতে গিয়ে সয়তানের সাথে লড়াই করে জিততে পারলেই আপনি আপনার প্রিয় মানুষদের আবারও ফিরিয়ে আনতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, যতটা সহজ মনে হচ্ছে কাজটা কিন্তু ততটা সহজ নাহ।

- ঠিক আছে! গতবারের মতো এবার আর কাউকে হারাতে দিবো নাহ। সুযোগ যেহেতু আছেই আমার হাতে এবার সেটা হাত ছাড়া করবো নাহ। কিন্তু এখন আমাদের কি করা উচিৎ....

------------

ইরিন, অরিন, হরিণী আর রাশেদ আঙ্কেলসহ সকলের লাশগুলো আমি আর ডাক্তার ডাক্তার সিমন মিলে রাজা এলাহাবাদের প্রাসাদের সীমানার শুরুতে এনে রাখলাম। যেখানে অরিন আমাকে প্রথম দিন প্রপোজ করেছিলো। প্রিয় মানুষগুলোর লাশগুলো ডাক্তার সিমনের দায়িত্বে রেখে আমি ভিতরে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিলাম।

সীমানার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রক্ষার্থে চার কূল ও আয়াতুল কুরসী পড়লাম।

❝কুল হুওয়াল্লা-হু আহাদ।

আল্লা-হুসসামাদ।

লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইঊলাদ।

ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহূকুফুওয়ান আহাদ।❞

❝কুল আ‘ঊযুবিরাব্বিল ফালাক।

মিন শাররি মা-খালাক।

ওয়া মিন শাররি গা-সিকিন ইযা-ওয়াকাব।

ওয়া মিন শাররিন-নাফফাসাতি ফিল-উকাদ।

ওয়া মিন শাররি হা-সিদিন ইযা-হাসাদ।❞

❝কুল আ‘ঊযুবিরাব্বিন্না-স,।

মালিকিন্না-স,।

ইলা-হিন্না-স।

মিন শাররিল ওয়াস ওয়া-সিল খান্না-স।

আল্লাযী ইউওয়াসবিসুফী সুদূরিন্নাছ-।

মিনাল জিন্নাতি ওয়ান্না-স।❞

❝কুল ইয়াআইয়ুহাল কা-ফিরূন।

লাআ‘বুদুমা-তা‘বুদূন।

ওয়ালাআনতুম ‘আ-বিদূনা মাআ‘বুদ।

ওয়ালাআনা ‘আ-বিদুম মা-‘আবাত্তুম।

ওয়ালাআনতুম ‘আ-বিদূনা মাআ‘বুদ।

লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন।❞

❝আল্লা-হু লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম। লা তা’খুযুহু সিনাতুঁ ওয়ালা নাঊম। লাহূ মা ফিস্ সামা-ওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্বি। মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ’ ই’ন্দাহূ ইল্লা বিইজনিহি। ইয়া’লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউহিতূনা বিশাইয়্যিম্ মিন ‘ইলমিহি ইল্লা বিমা শা-আ’ ওয়াসিআ’ কুরসিইয়্যুহুস্ সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্বি, ওয়ালা ইয়াউ’দুহূ হিফযুহুমা ওয়া হুওয়াল ‘আলিইয়্যুল আ’জিম।❞

তারপর প্রথমে ডান পা বাড়িয়ে দিয়ে মনে মনে পড়তে লাগলাম।

- আস্তাগফিরুল্লাহ রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিওঁ ওয়া আতুবু ইলাইহি; লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।

- লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী

কুংতু মিনাজ জোয়ালীমিন।

- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ)

- আল্লাহু আকবর! আল্লাহু আকবর! আল্লাহু আকবর! হে আমার খোদা আজ, এখন আর এই মুহুর্তে আমি এলাহাবাদ রাজার প্রাসাদে প্রবেশ করলাম। এই প্রাসাদের অতি পুরোনো রহস্য এবং ইফরিদের হাত থেকে আমার প্রিয় মানুষগুলোর রুহ্ ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছি। আপনি আমার এবং আমার প্রিয় মানুষদের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করুন। আজ যাই হয়ে যাক নাহ কেনো, সয়তান যেনো কিছুতেই জিততে নাহ পারে। শুনেছি চুড়ান্ত যুদ্ধের শেষে নাকী সত্য ও ন্যায়েরই জয় হয়। আজ সত্যের লড়াইয়ে আপনাকে আমার পাশে চাই। ইয়া আল্লাহ! ইয়া রাব্বুল আল-আমীন আজ যেনো আমি কিছুতেই সয়তানের হাতে পরাজিত নাহ হই। আজকের এই লড়াইয়ে যেনো বিজয়ী হতে পারি লিল্লাহি তাকবির আল্লাহু আকবর।।

এক কদম এগিয়ে যেই নাহ রাজা এলাহাবাদের প্রাসাদের সীমানায় পা রাখলাম সাথে সাথে আমার বাম পাশ থেকে বলে উঠলো...

- স্বাগত! স্বাগত! আপনারই অপেক্ষায় ছিলাম।

বড় বড় চোখ করে বাম পাশে তাকিয়ে দেখি কেুু নেই। আবার ডান পাশ থেকে শব্দ ভেসে এলো...

-সাবধান! এখানে পদে পদে বিপদ। একটু বিচক্ষণতায় হারাতে পারো নিজের জীবন...

আগের বারের মতো এবারও বড় বড় চোখ নিয়ে ডান পাশে তাকিয়ে দেখি কেউই নেই। মনস্থির করে সোজা চলতে লাগলাম। হঠাৎ চোখ সামনে আটকে গেলো, কিছুটা দূরে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম লাম্বা লাম্বা কিছু লোক, সবার পড়নে সাদা জুব্বা আর সবার মাথায় সাদা পাগরি।। তারা কারো লাশের খাটিয়া নিয়ে কবরস্থানের দিকে যাচ্ছে। উনাদের দেখার পর আমি কিছুটা ইতস্তত হয়ে তাদের পিছু পিছু যেতে থাকি কয়েক কদম যাওয়ার পর পরই সবকিছু উধাও হয়ে গেলো। আমার বুঝতে বাকি রইলো নাহ, আমিও এই প্রাসাদের রহস্যের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হতে চলেছি।

এই পূর্ণিমা মাখা রাতে হঠাৎ করে চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসলো। আমি পা টিপে টিপে হাঁটতে শুরু করলাম। হঠাৎ করে খেয়াল করলাম কবরস্থানের পাশে একটা বিশাল তাল গাছ। ওই তাল গাছের পাশ কাটিয়ে কে যেনো আসছে। ওইদিকে আমার চোখ পড়ার সাথে সাথে আবারও চারিদিকে চাঁদের আলোয় ভরে গেলো, চাঁদের আলোতে যতটা দেখতে পেলাম, শরীরের গঠন'টা ছিলো মহিলাদের মতো। আমি অলরেডি বুঝে গিয়েছিলাম যে আমার সাথে কি হতে চলেছে।

যাই হোক দেখলাম সেই অবয়ব আকৃতির মহিলাটি আমার দিকে দ্রুত গতিতে ধেয়ে আসছে। আমি একদম চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখতে চাইছিলাম মেয়েটা আসলে কি করতে চাইছে, আমার কাছ থেকে প্রায় ৫-৬ হাত সামনে দিয়ে অবয়ব আকৃতির সেই মহিলাটি চলে গেলো। এবার আমি স্পষ্ট দেখলাম অবয়মটি দেখতে ৭-৮ ফিট লম্বা, চুল গুলো কোমড়ের নিচে, মুখটা দেখতে পারিনি। অবয়মটি আমার সামনে দিয়ে কবরস্থানের দিকে একটি আম বাগানে চলে গেলো।

ওখান থেকে চোখ ফেরাতেই চাঁদের আলোতে দেখতে পেলাম কবরস্থানের পাশের বটগাছটিতে একজন মানুষ পা ঝুলিয়ে বসে আছে। তাকে এর আগে আমি কখনো দেখিনি এমনি চিনিও নাহ। মানুষটি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম

- ক-কে আ-আপনি.? এখনে ক-কি করছেন।

সে কোন কথা বললো নাহ, আমি মাটিতে থুতু ফেলে একটু আড় চোখে মানুষটির দিকে তাকিয়ে আবার নিজ গতিতে হাঁটতে লাগি। একটু পর আমার মনে হলো আমি যে ব্যক্তিকে একটু আগে বটগাছে বসে থাকতে দেখলাম যে ব্যক্তিটা সপ্তাহ দু-এক আগে মারা গেছে। হ্যাঁ ওটা তোহ কিবরিয়া চৌধুরী যাকে হরিণী খুন করেছিলো। আমার বুকের ধরফরানী বেড়ে গেলো আবারও চাঁদের আলোতে দেখলাম ওই মানুষটা আমার গাঁ ঘেসে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পলক ফেলতেই দেখি সেটা আমার সামনে শূন্যে ঝুলে আছে। ভয়ে ওটার দিক থেকে চোখ সরাতেও পারছি নাহ আবার দাঁড়িয়ে থাকা জায়গা থেকেও নড়তে পারছি নাহ। মুহুর্তেই শূন্যে ঝুলে থাকা লোকটি উধাও হয়ে গেলো। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এক পা আগাতেই লোকটি পিছন থেকে আমার কাঁধে ঝুলে পরে আমি ভয়ে চিৎকার দিতেই লোকটি আবারও অদৃশ্য হয়ে যায়।

আবার পা টিপে হাঁটতে লাগলাম, হঠাৎ নজরে পড়লো, দূর থেকে স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে লোকটা। আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকি, আমি তার দিকে যত এগোচ্ছি লোকটা যেনো ততই পিছিয়ে যাচ্ছে।

কিছু দূর লোকটার পিছু করার পর হঠাৎ আমার গলায় চেপে বসছে কারো নখ, আরেক হাতে চোখ খামচে ধরেছে। বুঝতে পারছিলাম সবই আমার সাথে কি কি হচ্ছে আর কেনো হচ্ছে কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম নাহ।

নখের আঘাতে গলা কেটে রক্ত ঝড়ছিলো, চোখেও প্রচন্ড যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছিল। আমি কিছুই করতে পারছি নাহ, কেউ আমার গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল...

- আরিয়ান! হি!হি!হি!

ধড়মড় করে নড়ে উঠলাম, কণ্ঠটা হরিণীর, যে কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছে। এটা কিভাবে সম্ভব। কিছু বুঝে উঠার আগেই পায়ের পাতায় টের পেলাম একটা ঠান্ডা হাতের স্পর্শ! চোখ বড় বড় করে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা পঁচা গলা হাত আমার পায়ের সাথে পেঁচিয়ে আছে। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, টপ টপ করে মাথা ঘেমে ঘাম পরছে।

কবরস্থানের উপর জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বাম পাশ থেকে একটা মেয়ে কণ্ঠ বলল....

- দেখো, আমার সাথে কে যেনো দাঁড়িয়ে আছে! আমি তাকে চিনি নাহ! ওকে চলে যেতে বলো!

আমি বাম পাশে মেয়ে কণ্ঠটি ভালো করে দেখার জন্য ঘুরে তাকালাম, বাম পাশে কোনো মানুষ ছিলো নাহ।

এতক্ষণে আমার জ্ঞান বাস্তবতায় ফিরে, আমি ভুলে গেছিলাম যে এখানে যা কিছু ঘটবে সবটাই মোহ! এই মোহে তলিয়ে গেলে চলবে নাহ। আমার উদ্দেশ্য একটাই এই কবরস্থান পেরিয়ে এলাহাবাদের প্রাসাদে প্রবেশ করা।

এবার মনের জোড় শক্ত করে জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে কিছুর সাথে হোঁচট খেয়ে পরে গেলাম। যেটার সাথে হোঁচট খেয়েছি ওইটার উপরেই পরেছি। হাল্কা করে মাথা তুলতেই দেখি আমি একটা লাশের উপর পরে গেছি। ভয়ে একটা চিৎকার দিলাম। কিন্তু দৌড় দেওয়ার সাহস করলাম নাহ। লাশটা দেখার পর কেনো জানি নাহ ওটার প্রতি মায়া কাজ করছিলো, দেখে মনে হচ্ছিল ৫-৬ দিন ধরে এই লাশটা এখানে পরে আছে, কেউ দাফন করেনি। পাশেই তোহ কবর খোঁড়া আছে তাহলে লাশটাকে কবর দিয়ে গেলে কি এমন ক্ষতি হতো লোকের। যাই হোক আমিই নাহয় কবর দিয়ে যাই।

শরীরে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে যেই নাহ লাশটার মুখ দেখলাম, আমার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠেছে। লাশটাকে দেখে যত ভয় পেয়েছি তা মনে হয় সারাজীবনে আমি কোনদিন পাইনি। এই লাশটার ক্ষেত্রে আমার দরদ কম ভয়টাই বেশি কাজ করছিলো। লোকটার মুখ দেখে বয়স আন্দাজ করলদম, প্রায় ৫০ হবে। কিন্তু চেহারায় রাগি রাগি ভাব।বেশিক্ষন লাশটার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারিনি আমি। এত বীভৎস!!

যাই হোক, লাশটাকে আলতো করে কবরে নামিয়ে দিলাম। ধীরে ধীরে কবর দেওয়া সম্পূর্ণ হলো। আমি আবারও আপন গতিতে প্রাসাদের দিকে ছুটে চলেছি। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি লাশটা আমার সামনে। আমি কিছুটা ভয় পেলাম। আবারও দৌড়ে পিছনে গেলাম। গিয়ে দেখি, মাটি খোড়া!! কি ব্যাপার!!

মাত্রই তোহ আমি তাকে পরিপাটি করে কবর দিলদম। হ্যাঁ একটু তাড়াহুরা করেছিলাম কিন্তু এভাবে রেখে যাইনি। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কেউ মাটি খুঁড়ে লাশটা বের করেছে।

এবার চারিদিক থেকে ভয়ের অনূভুতি আমাকে গ্রাস করলো। হাঁটার শক্তিও মনে হলো কেউ কমিয়ে দিয়েছে। তবুও বিকারগ্রস্থের মত আমি লাশটার দিকে এগিয়ে গেলাম। লাশটার কাছে গিয়ে যা দেখলাম তাতে মনে হলো আমি এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে পরে যাবো। কিছুক্ষণ আগে যে লাশটাকে আস্ত দেখে গেলাম, কয়েক মুহুর্তে সেই লাশটার মাথা কেউ কেটে নিয়ে গেছে।

অতি শোকে পাথর হবার মত আমি অতি ভয়ে বিহবল এখন!! হঠাৎ আমার মনে হলো এখনই বুঝি কবরের প্রত্যেকটি লাশ উঠে এসে এভাবে পড়ে থাকবে আমার সামনে। কিন্তু এমন কিছুই ঘটলো নাহ। আমার সামনে মধ্য বয়স্ক লোকটি নিথর পড়ে আছে।

আমার মনে হলো আমি গায়ে শক্তি ফিরে পেলাম হঠাৎ বা ভয়ের ঝাপটা'টা চলে গেলো আমার উপর দিয়ে। কিভাবে কেনো লাশ কবর থেকে উঠে আসলো এসব চিন্তা নাহ করে আমি ভাবলাম আবারও লাশটাকে কবর দিতে হবে। এই ভাবা মাত্রই আমি লাশটাকে কাধে তুলে নিলাম। জীবনে মনে হয় এত ভারী লাশ আমি কোনদিন বহন করিনি। ভার সামলাতে বেশ বেগ পেতে হলো আমার। ৫-৬ দিনের পুরানো লাশ আমি জোরে ধরা মাত্রই ধুমড়ে মুচড়ে গেলো। মনে হলো এখনই বুঝি হাত বা পা খুলে পড়বে। আস্তে আস্তে পা বাড়িয়ে লাশটিকে আবারও কবরে শুইয়ে দিলাম। লাশটি কবরে রাখা মাত্রই আমার চোখ কপালে উঠলো। একটু আগেও যে লাশটির কল্লায় মাথা ছিলো নাহ এখন মুহুর্তেই সেই লাশটার কল্লায় মাথা। লাশটি আমার দিকে বড় বড় হলুদ চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে আর একটা হাত দিয়ে ধরে রেখেছে আমার হাত, এত জোরে যে কারো সাধ্য নাই সেই হাত ছাড়ানোর!! টানাটানি করতেই লাশের হাত ছিড়ে গেলো। হাতটা একদম আমার হাতের সাথে লেপটে আছে। ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলাম আমি। মাথা ভনভন করছে করছে, চারিদিক থেকে হাজারটা মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদ ভেসে আসছে, আমার মাথা যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে। অপর হাত দিয়ে লাশের ছেঁড়া হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে কবর থেকে উঠার চেষ্টা করছিলাম। নিচ থেকে আবারও লাশটা আমার পা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। আমি কি করবো কিছু বুঝতে নাহ পেরে, "লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী

কুংতু মিনাজ জোয়ালীমিন।" বলে শূন্যে লাথি দিলাম সাথে সাথে চারিদিকের পরিবেশ শান্ত হয়ে গেলো। মুহুর্তেরই সবকিছু স্বাভাবিক হয়প গেলো, দেখে মনে হচ্ছিল, একটু আগে এখানে কিছুই হয়নি আর সদ্য গর্ত হয়ে থাকা কবরটাও উধাও। শরীরে যত শক্তি ছিলো সব শক্তি প্রয়োগ করে দিলাম এক দৌড়। আমার দৌড়ানোর সাথে মনে হচ্ছিল পিছনে অনেক মানুষও দৌড়াচ্ছে। হাউমাউ চিৎকার ভেসে আসছে, আবার কেউ ভালোবেসে ডাকছে। শেয়াল কুকুরের ডাক, এই রাতের বেলা কাকও ডাকছে। কোনো কিছুর দিকে মন নাহ লাগিয়ে আমি শুধুই দৌড়চ্ছিলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে মনে হলো আমি এবার পুরো কবরস্থানের মাঝখানে আছি। আমার চারিদিকে শুধু কবর আর কবর, তাকাতেই মনে হতে থাকে আগের বারের মতো এবারও চারিদিকের কবরগুলো থেকে মৃত লাশগুলো এসে আমাকে ঘিরে ধরবে। কোনো দিক নাহ ভেবে আমি সামনের দিকে দৌড়ে চলেছি। দৌড়াতে দৌড়াতে একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা খাই। মেয়েটা পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলো। মেয়েটা যখন আমার দিকে ঘুরে তাকায় তখন যেনো আমি আকাশ থেকে পরলাম। এটা আর কেউ ছিলো নাহ, এটা অরিন! অরিন আমার দিকে ঘুরে ঘুরে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বললো "মেনে নাও! সব হারিয়ে শূন্য হয়ে যাও।

শূন্য থেকে এসেছো, শূন্যে ফিরে যাও আবার শূন্যের মাঝেই নিজেকে খুঁজে পাও এক অন্য রকম হিসেবে।" এটা বলেই অরিন আমার হাত ধরে টানতে টানতে সামনের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। এত শক্ত করে ধরেছে যে আমার পক্ষে ওর হাত ছাড়ানো সম্ভব হচ্ছিল নাহ। ওর সাথে যেতে যেতে খেয়াল করি অরিনের মতো দেখতে মানুষটা যেখানে ধরেছে সেই জায়গা থেকে রক্ত বের হচ্ছে এতটাই শক্ত করে ধরেছে। ব্যাথায় ককিয়ে উঠলাম আমি, আর সহ্য করতে নাহ পেরে ❝আল্লা-হু লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম। লা তা’খুযুহু সিনাতুঁ ওয়ালা নাঊম। লাহূ মা ফিস্ সামা-ওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্বি। মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ’ ই’ন্দাহূ ইল্লা বিইজনিহি। ইয়া’লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউহিতূনা বিশাইয়্যিম্ মিন ‘ইলমিহি ইল্লা বিমা শা-আ’ ওয়াসিআ’ কুরসিইয়্যুহুস্ সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্বি, ওয়ালা ইয়াউ’দুহূ হিফযুহুমা ওয়া হুওয়াল ‘আলিইয়্যুল আ’জিম।❞ বলে হাওয়ায় ফু দিতেই চারিদিকে প্রবল বেগে বাতাস বইয়ে অরিনের মতো দেখতে অবয়মটা উধাও। আবারও মুহুর্তেই চারিদিকের পরিবেশ ঠান্ডা হয়ে গেলো। এবারও ভয়ে পাগলের মতো সামনের দিকে ছুটতে থাকি। ছুটতে ছুটতে এক পর্যায়ে আমি প্রাসাদের সাদৃশ্য দেখতে পাই। আর কিছুটা পথ বাকি তারপরেই আমি প্রাসাদে প্রবেশ করতে পারবো। দৌড়াতে দৌড়াতে একদম প্রাসাদের সামনে এসে পৌছালাম। এই তোহ আর এক-দুই কদম বাকি তারপর আমি প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করবো। অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসে ক্লান্ত হয়ে হাঁপিয়ে গেছি, হাত দুইটা হাঁটুতে ভর দিয়ে গুঁজো দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কপালের ঘাম মুছে আবারও পা বাড়ালাম। পা বাড়ানোর সাথে সাথে মুখ ধুবড়ে একটা গর্তে পড়ে গেলাম। এটা কোনো গর্ত নাহ, এটা ছিলো একটা কবর! আর এই কবরটা অন্য কারো নাহ, এটা আমার নিজেরই কবর।৷ হ্যাঁ! এই কবরের লাশটা ছিলো হুবহু আমার মতোই দেখতে। লাশটার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আমি তোহ জলজ্যান্ত মানুষ তাহলে কবরে কে শুইয়ে আছে। হুট করে কবরে শুইয়ে থাকা আমিটা ভয়ংকর এক চিৎকার দিয়ে উঠলো, এবার মনে হতে লাগলো আমার কান দুইটা ফেটে রক্ত বের হবে। আমি দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে "লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুংতু মিনাজ জোয়ালীমিন।" জোরে জোরে পাঠ করে কবর থেকে উঠলাম। কবর থেকে উঠতেই দেখি লাশটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, শরীর থেকে বাজে দুর্গন্ধ আসছিলো, এক্ষুনি বোধহয় আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো।

------------

চোখ খুলে দেখি আমি কবরে শুইয়ে আছি, চারিদিকের মাটিগুলো আস্তে আস্তে আমাকে চাপ দিচ্ছে। উপর থেকে বড় বড় সাপ আমার ছোবল দেওয়ার জন্য ফণা তুলছে। আমার সারা শরীর অবশ হয়ে আছে, আমি নড়তে পারছিলাম নাহ। কি করবো সেটাও বুঝতে পারছিলাম নাহ। তার মানে কি এটাই আমি মারা গেছি.? এখন আমি দুনিয়ায় করা পাপের শাস্তি ভোগ করছি। চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি পড়লো। এটা ভাবতে লাগলাম, সবশেষে আমি হেরে গেলাম, প্রিয় মানুষগুলোকেও বাঁচাতে পারলাম নাহ আর নিজেও বাঁচতে পারলাম নাহ। শুধু একটা আক্ষেপ কাজ করছিলো, আল্লাহ আমার কাছে জবাব চাইলে তার কাছে কি জবাব দিবো। কত শত গুনাহ করেছি। কোনোদিন ঠিক মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করিনি। ইয়া আল্লাহ! তুমি আমার মৃত্যু কবুল করে কবরের আজাব মাফ করে দাও।।

❝রাব্বি ইন্নী জালামতুনাফছী ফাগফিরলী।❞

❝আল্লাহুম্মা আসআলুকা আল ইন্নাহ।❞

❝আল্লাহুম্মা আজরিনি মিন আন নার।❞

❝আল্লাহুম্মা জাআলনা মুফনিহীন।❞

❝আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা হুসনা আল খাতিমা।❞

এগুলো পড়ার সাথে সাথে আমি নিজেকে এলাহাবাদের প্রাসাদের চৌকাঠে আবিষ্কার করি। নিজেকে জীবিত অবস্থায় পেয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললাম "আল্লাহুম্মা সুখনা হুসনাল খাওয়াতিম।" যার অর্থ হলো, হে আল্লাহ! তুমি আমার শেষটা সুন্দর করে দিও।

আল্লাহর কাছে পানাহ চেয়ে ডান পা বাড়িয়ে দিলাম প্রাসাদের ভিতরে। ভিতরে প্রবেশ করার সাথে সাথে আমার নাকে দুই রকমের দুইটা গন্ধ ভেসে আসলো। একটা ছিলো হাল্কা মৃদু মিষ্টি হাওয়ার গন্ধ আরেকটা ছিলো দুর্গন্ধময় বিচ্ছিরি গন্ধ যা একটা সুস্থ মানুষের পক্ষে সহ্য করাটা ভিষণ কষ্টের। এই বাজে গন্ধটার কাছে মিষ্টি গন্ধটা বার বার মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি নাক চেপে ধরে আস্তে আস্তে ভিতরে ঢুকতে শুরু করলাম। চারিদিক থেকে কারো ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ এসে আমার কানে বারি দিচ্ছিল। আস্তে ফিসফিসের শব্দ বাড়তে শুরু করে, একের অধিক মানুষের গলার শব্দ ভেসে আসতে থাকে। ফিসফিস শব্দটা সময়ের সাথে সাথে আওয়াজের গতিও বাড়তে থাকে। দূর থেকে ভাসতে ভাসতে এক পর্যায়ে ফিসফিস শব্দটা আমার কানের কাছে চলে আসে। হুট করে আমার পিছন থেকে কেউ দৌড়ে গেলো। আমি কাঁপা কাঁপা শরীর নিয়ে পিছন ঘুরে তাকাই। কাউকেই দেখতে পেলাম নাহ। আবারও সামনে ঘুরতেই একটা বিকৃষ্ট দেখতে মহিলা কোথাথেকে যেনো এসে জোরে এক চিৎকার দিতেই আমার সারা শরীর ব্যাথায় ছিঁড়ে যেতে শুরু করলো। মনে হচ্ছিল আমার শরীর থেকে কেউ হারগুলো আলাদা করে ফেলেছে। আমাকে সজ্ঞানে রেখে কেউ আমমার শরীর থেকে হারগুলো টেনে টেনে খুলছে। অসহ্যকর যন্ত্রণা সহ্য করতে নাহ পেরে জ্ঞান হারাই। যখন জ্ঞান ফিরে তখন নিজেকে একটা ঘরের এক কোণে পরে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করি। চারিদিকে ডেব-ডেব করে তাকিয়ে থাকি কিন্তু কিছুই করতে পারি নাহ কারণ তখনও আমি আমার শরীরে অসহ্যকর যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। এতটুকু নড়ার ক্ষমতা ছিলো নাহ আমার। ঘরটির পাশেই খেয়াল করলাম একটা উঁচু খাট রয়েছে, সেই খাটের উপরে একজন মহিলা নামাজ পড়ছে আর একটা ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চা হামাগুড়ি দিচ্ছে। বাচ্চাটা দেখতে এত সুন্দর। চোখ দুটো মায়াবী, চুলগুলো সোনালী বর্ণের, চোখের মনিগুলো সবুজ। ওকে যে দেখবে সেই ওকে কোলে নিতে চাইবে। হামাগুড়ি দিতে দিতে বাচ্চাটা এক পর্যায়ে খাটের একদম কিনারায় চলে এসেছে। এখন যদি কেউ বাচ্চাটাকে নাহ ধরে তাহলে বাচ্চাটা নিচে পরে যাবে আর অনেক ব্যাথা পাবে। আমি নামাজ পড়া মহিলাকে উদ্দেশ্য করে চেচিয়ে চেচিয়ে বলছি, "আপনার বাচ্চাকে ধরুন! ও তোহ পরে যাবে। দেখুন একদম কিনারায় চলে এসেছে যেকোনো মুহুর্তে পরে যেতে পারে। আমার পক্ষে উঠে ধারানো সম্ভব হচ্ছে নাহ, আপনি একটু তাড়াতাড়ি নামাজটা শেষ করে ওকে ধরুন নয়তো পরে যাবে" কিন্তু ভদ্র মহিলার কোনো হুঁশ নেই। দেখেই মনে হচ্ছে মহিলা অনেক নামাজী। যখন নামাজ পড়েন তখন দিন দুনিয়ার খেয়াল থাকে নাহ। আমাদের তোহ এমন নামাজী হওয়ারই দরকার কিন্তু আমরা তা নাহ করে তাড়াহুড়ো করে নামাজ আদায় করি তাও ভুলভাল। যাই হোক, বাচ্চাটা ধীরে ধীরে একদম কিনারায় চলে এসেছে এবার পরে যাবে। আমিও কিছু করতে পারছি নাহ আর মহিলারও নামাজ শেষ হচ্ছে নাহ। ইয়া আল্লাহ! আমাকে একটু শক্তি দাও আমি যেনো বাচ্চাটাকে ধরতে পারি।

❝লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হুল

আযীমুল হালীম, লা ইলা-হা

ইল্লাল্লা-হু রাববুল আরশিল

আযীম, লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু

রাববুস সামা-ওয়া- তি

অরাববুল আরদি অরাববুল

আরশিল করীম।❞

মন থেকে এই দোয়াটা পাঠ করে শরীরটা এক ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাচ্চাটার দিকে ছুটে দিলাম এক দৌড়। বজ্রের গতিতে গিয়ে বাচ্চাটাকে ধরলাম, এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো আর যাই হোক একটা বাচ্চার জীবন বাঁচাতে পারলাম। বাচ্চাটা আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে আমার গালে হাত বুলিয়ে দিলো। সাথে সাথে আমার শরীরের সকল ব্যাথা নিমিষেই গায়েব হয়ে গেলো। আরামে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। চারিদিক থেকে মিষ্টি সুভাষ আমার নাকে এসে বারি দিচ্ছিল।

চোখ খুলে নিজেকে আবারও এলাহাবাদের প্রাসাদে আবিষ্কার করি।

এবার নতুন কোনো বিপদ আসার আগেই আমাকে "The Another Dimension" বইটার উদ্দেশ্যে ইবাদত করতে হবে। যাতে ওই বইয়ের সাহায্যে আমি রুহ্-এর জগতে যেতে পারি। আর ওইখান থেকে সবার রুহ্ পুনরায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারি।

অরিনের কাছ থেকে যতটুকু শুনেছিলাম এইখানে ইবাদত করতে হয় নফল নামাজের নিয়ত করে। আমিও নফল নামাজের নিয়ত বেঁধে দাঁড়িয়ে পরলাম নামাজে। আমি যখন নামাজ শুরু করি তখন পিছন থেকে অসংখ্য মানুষের চিৎকার ভেসে আসতে থাকে। ওইসব চিৎকারের কারণে আমার নামাজে বিঘ্ন ঘটছিলো কিন্তু তাও আমি নামাজ পড়া বন্ধ করি নাহ। পিছন থেকে কেউ আমাকে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে, তার বড় বড় নখ আমার বুক ছিদ্র করে দিচ্ছিলো। আমার বুক থেকে রক্ত পরছিলো, পিছন থেকে ভেসে আসা চিৎকারে কান দিয়েও রক্ত বের হচ্ছিল।

সেজদা থেকে উঠার সময় মনে হলো কেউ একজন আমার সাথে সাথে নামাজ আদায় করছে, চারিদিক থেকে কেউ আমাকে বড় বড় চোখে দেখছে। এভাবে প্রথম রাকাআত নামাজ শেষ হলো। দ্বিতীয় রাকাআতে উপর থেকে টপ টপ করে পানি জাতীয় কিছু আমার শরীরে পরলো। মুহুর্তেই আমার শরীর গরম হয়ে গেলো, হাল্কা আড় দৃষ্টিতে দেখলাম এগুলো রক্ত। আমার বমি বমি ভাব শুরু হলো কিন্তু আমার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে যেভাবেই হোক আমাকে এই ইবাদত সম্পূর্ণ করতে হবে। দ্বিতীয় রাকাআতের প্রথম সেজদায় মনে হলো আমার সামনে থেকে কেউ দৌড়ে চলে গেলো। পিছন থেকে কেউ ফিসফিস করে আমার কানে কানে বললো "তুমি পারবে নাহ! চলে যাও এখান থেকে! চলে যাও! চলে যাও! চলে যাও!" আমি এসবে কান দিলাম নাহ! প্রথম সেজদা শেষ। দ্বিতীয় সেজদায় একই কাহিনী হলো। নামাজের শেষাংশে যখন সালাম ফেরানোর জন্য ডানে তাকাই ভয়ংকর দৃষ্টিতে আগুনে পোড়া একটা মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে আমি আতকে উঠলাম তাও মনোবল শক্ত রাখলাম। বাম পাশে সালাম ফেরানোর সাথে সাথে আমার চারিদিক থেকে অসংখ্য আলোর রশ্মি জ্বলজ্বল করতে আরম্ভ করলো। মুহুর্তেই আমার আশপাশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলো। আমার শরীরে লেগে থাকা কাঁদা-মাটি, রক্ত ও দুর্গন্ধগুলোও মুহুর্তেই উধাও। পুরো প্রাসাদ আলোকিত হয়ে উঠলো। আমার চোখের সামনে সেই রহস্যময় বই এসে হাজির। যে বইটার জন্য এতগুলো বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। যে বইয়ের জন্য শতশত মানুষ নিজের জীবন দিয়েছে। যে বইয়ের জন্য এই প্রাসাদকে অভিশপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে সেই বই আজ এখন আর এই মুহুর্তে আমার সামনে উপস্থিত।

শূন্যে ভাসছে সেই রহস্যময় বই। বইয়ের শরীর বেয়ে বের হচ্ছে অসংখ্য আলোর রশ্মি। চোখ ধাধানো আলো যা আমাদের চোখ ঝলসে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এক পা দু পা করে বইয়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। দুই হাত বাড়িয়ে দিলাম বইয়ের দিকে। ধীরে ধীরে বইটা স্পর্শ করলাম। আমার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল নাহ আমি এই বইটা নিজের হাতে ধরছি। বইটা ধরার সময় চারিদিকে মৃদু বাতাস বইলো, আমার চুলগুলো উড়ে কলাপে এসে পরলো। বইটাকে শক্ত করে ধরে রাখলা। এবার সেই অধ্যায় খুঁজতে হবে যে অধ্যায়ে আছে রুহ্-এর জগতে যাওয়ার রাস্তা। বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে যাবো তখনই আমার পিছন থেকে একজন মেয়ে কণ্ঠ বলে উঠলো...

- অবশেষে! অবশেষে আজ সেই দিনটা এসে গেছে। স্বাগতম! স্বাগতম! স্বাগতম আপনাকে পবিত্র আত্মা যে এই প্রাসাদের রহস্যে ঘোর কাটিয়ে রাজকন্যা ইলাহ্'র রহস্যময় বই উদ্ধার করেছেন।

আমি পিছনে তাকিয়ে দেখি একজন মেয়ে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স আনুমানিক ২৩-২৪ হবে। দুধে আলতা গায়ের রঙ। তবে মেয়েটার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস হচ্ছে ওর লম্বা চুল। প্রায় মাটি ছুঁই ছুঁই, চুলগুলো হাল্কা লালচে।

কিন্তু কে এই মেয়ে.? কোত্থেকে এলো সে.?