পুনর্জন্ম (The Another Love Sory) — পর্ব ০৭
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৭ · ২৩ পর্বের মধ্যে ৭
আমি অরিনের গালে হাত দিয়ে বললাম, তোমাকে বিশ্বাস করি বলেই তোহ তোমার এক কথায় এখানে থাকতে রাজি হয়েছি।
অরিন:- হ্যাঁ! তা তোহ দেখতেই পাচ্ছি।
আরিয়ান:- হ্যাঁ তারপর বলো[এক গাল হেসে]
অরিন:- লোকগুলো লম্বা হতে হতে এক পর্যায়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই হয়ে গেলো। আমি ভয় পেলেও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। কিছুক্ষণ পর লোকগুলোর আওয়াজ কানে ভেসে এলো...
"তুমি তোমার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছো! এখন থেকে প্রাসাদ পর্যন্ত যতগুলো বিপদের সম্মুখীন হবে সবকিছু মোকাবিলায় আমরা তোমার সাহায্য করবো"
চোখের পলক ফেলতে নাহ ফেলতে দেখি লোকগুলো ওখানে নেই। কোথায় যেনো গায়েব হয়ে গেলো। আমিও তাদের খুঁজতে সময় নষ্ট নাহ করে হাঁটতে শুরু করলাম।
হাটতে হাটতে কবরস্থানের কাছে এসে পৌছালাম। বাইরে তোহ কত সুন্দর দিনের আলো তাহলে এখানে অন্ধকার কেনো। আমার আজও মনে আছে, কবরস্থানে বাম পা দিয়ে ঢুকেছিলাম। প্রথম পা ফেলতে নাহ ফেলতেই কোনো এক অদৃশ্য হাত আমার পা ধরে ফেলে দিলো।
মনকে শক্ত করে উঠে দাড়ালাম। হঠাৎ পিছন থেকে একজন লোক বলে উঠলো...
"একি মেয়ে! তুমি এখানে কি করছো.? তুমি জানো নাহ এখানে পদে পদে বিপদ!"
আমি লোকটার কথার উত্তর দিতে যাবো তখনই লোকটার চেহারা বিভৎস হতে শুরু করে। শরীর থেকে মাংস পঁচা দুর্গন্ধ।
অতিরিক্ত দুর্গন্ধের কারণে মনে হচ্ছিল আমার পেটের নাড়িভুড়ি এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে। কোনো রকম মুখে হাত দিয়ে সামনে এগোতে থাকি। এবার যেনো কিছুতেই বমি আটকে রাখতে পারছি নাহ।
একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বমি করতে থাকি। বমি করতে করতে এতটাই ক্লান্ত হয়ে যাই যে শরীরে বিন্দু মাত্র শক্তি পাচ্ছিলাম নাহ। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটা গাছের নিচে গিয়ে বসি। বেশ কিছুক্ষণ শান্তিতেই বসে ছিলাম। একটু পর আমার কাধে টপটপ করে পানি পরলো। আমি কাধে হাত দিয়ে দেখি টাটকা রক্ত। ভয়ে একটা চিৎকার দিয়ে উঠে দাঁড়াই। চোখ গিয়ে আটকায় গাছের ডালে। একটা লাশ উল্টো হয়ে ঝুলে আছে। ভয়ে ভয়ে এক পা দু'পা করে পিছতে থাকি তখনই লাশটা নিজের চোখ খুলে আমার দিকে তাকালো। চোখগুলো একদম টকটকে লাল দেখে মনে হচ্ছিল আগুন বের হচ্ছে। আমি আবারও ভয়ে একটা চিৎকার দিলাম। চিৎকার দিয়ে দৌড়ে পালানোর সময় মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম একটা পুরনো কবরে। কবরে পরে অবাক হলাম কারণ কবরটা দেখতে পুরনো হলেও লাশটা এখনও সতেজ। আমি আর লাশটা মুখোমুখি হয়ে পরে ছিলাম কবরে। হঠাৎ করে লাশটা চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করে। চিৎকার দিয়ে কবর থেকে ঝাপ দিয়ে উপরে উঠে আসতে লাগলাম ঠিক ওই মুহুর্তেই লাশটা আমার পা খপাৎ করে ধরে ফেলে। মনে হচ্ছিল আমার পা ভেঙ্গে ফলবে। ব্যথায় কান্না করতে করতে নিজের জীবন ভিক্ষা চাইলাম। কান্না করতে করতে হাত দিয়ে চোখ ঢেকে রাখি। কিছুক্ষণ পর অনুভব করলাম আমার পা'গুলো ছেড়ে দিয়েছে। চোখ খুলে দেখি কবরে লাশটা নেই। কিছুটা আশ্বাস নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে। অনেকটা পথ হাঁটার পর কেউ একজন আমার কাঁধে হাত দেয় আমি পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। আবারও সামনে তাকাতে যাবো তখনই দেখি একটা বৃদ্ধ লোক লাঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি লোকটার কাছে যাবো তখনই লোকটা বিদঘুটে হাসি দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।
ওখানে যাওয়ার আগে যতটা ভয়ংকর ভেবেছিলাম এখন দেখি ওই জায়গাটা তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর।
ভয়ে শরীর ঘামতে শুরু করছিলো, শরীরের প্রত্যেকটা লোম লোহার পেরেকের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।
ভয়কে কন্ট্রোল করে আবারও হাঁটতে থাকি, বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর প্রাসাদের মেইন গেট দেখতে পেলাম। এবার আমার হাঁটার গতি আরো বাড়তে লাগলো। জোড়ে জোড়ে হাঁটতে গিয়ে ধপাস করে পরে গেলাম, মনে হলো কেউ আমার পা ধরে ফেলে দিলো। মাটিতে পরার পরই দেখি আমার সামনে কোনো একজনের রক্তাক্ত কাটা মাথা পরে আছে। এক চিৎকার দিয়ে পিছন ঘুরে দৌড়াতে থাকি, কিন্তু আমি তোহ প্রাসাদে যাবো আবারও রাস্তা পরিবর্তন করে প্রাসাদের দিকে দৌড়াতে শুরু করি। আমি দৌড়ানোর সময় মনে হচ্ছিল আমার পিছনে হাজারো মৃত লাশ দৌড়াচ্ছে। পিছন থেকে চিৎকার আর চিৎকার ভেসে আসছিলো। হঠাৎ হঠাৎ আমার নাম ধরেও কেউ ডাকছিলো। আবার এমনও মনে হচ্ছিল আমার বাবা, মা, এমনকি ইরিনও আমায় বাঁধা দিচ্ছিলো। কিন্তু আমি এসবে কান দিবো নাহ আমাকে প্রাসাদে পৌঁছাতে হবে।
এক পর্যায়ে প্রাসাদে গিয়ে পৌঁছালাম। বাইরে থেকে যতটা ভয়ংকর লাগছিলো প্রাসাদটা ততটা ভয়ংকর নাহ। ইবাদত করার আগে প্রাসাদটা একটু ঘুরে দেখলে কেমন হয়। এসব ভাবতে ভাবতে প্রাসাদ ঘুরতে শুরু করি। সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলাম, মনে হলো আমার পিছন থেকে কেউ দৌড়ে চলে গেলো। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই, হঠাৎ করে নিচ থেকে ডাক ভেসে আসে ইরিনের, "অরিন! আমাকে বাঁচা ওরা আমাকে মেরে ফেলবে!" কিন্তু ইরিন এখানে আসবে কি করে, নাহ! আমি কোনো সয়তানের ধোঁকায় পরবো নাহ, একটা রুমে গিয়ে ঢুকলাম, রুমের দেওয়ালে অনেক ধরনের কালো জাদুর সাইন আকা ছিলো। পাশাপাশি কালো জাদুর অনেক দ্রব্য সামগ্রীও। রুমটা দেখছিলাম তখনই দেখি দেওয়ালের এক কোণে একটা মেয়ে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে, আমি সাহস সঞ্চয় করে ওর কাঁধে হাত দিলাম, মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ংকর ভাবে একটা চিৎকার দিলো সাথে সাথে ওর চেহারা পচতে শুরু হলো। আমিও চিৎকার দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে পরলাম। এবার আর সময় নষ্ট করলে চলবে নাহ, এখন আমাকে ইবাদত করে এখান থেকে চলে যেতো হবে।
ইবাদত করার জন্য নিচে নেমে এলাম। নফল নামাজের উদ্দেশ্য নিয়ত করে দাড়িয়ে পরলাম।
আমি যখন রুকু করছিলাম তখন খেয়াল করি কেউ আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আছে। তার সারা শরীর ঠান্ডা, এমন মনে হচ্ছিল আমার শরীরে কোনো বরফ রাখা হয়েছে।
সিজদাহ্ করার আগ পর্যন্ত ওই জিনিসটা আমার কাঁধে এভাবেই ঝুলে থাকতো। এরপর আমি যখন সিজদাহ্ করছিলাম তখন মনে হচ্ছিল আমার পাশে কেউ বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সিজদাহ্ থেকে মাথা উঠাতেই আমার সামনে এক ভয়ংকর দেখতে মেয়ে এসে দাঁড়ায়, মেয়েটিকে দেখতে এতটাই কুৎসিত ছিলো যে তখনই আমার বমি চলে আসছিলো, কিন্তু আমি এসবের তোয়াক্কা নাহ করে নামাজে মন দিলাম।
সবশেষে আমি যখন শেষ রাকাআতের সিজদাহ্ করলাম তখন আমার চারিদিকের পরিবেশ একদম স্বাভাবিক হতে শুরু করলো। আমার চারিদিকে পবিত্র কুরআন শরীফের নানান লিখা ভেসে উঠতে লাগলো।
তারপর আমি যখন সালাম ফিরাই তখন......
আরিয়ান:- তখন কি! কার মুখ দেখলে.? তাড়াতাড়ি বলো.?
অরিন:- আপনার!
আরিয়ান:- কি বলছো এসব!
অরিন:- হ্যাঁ! আমি সত্যি বলছি। আমি সেদিন আপনারই মুখ দেখেছিলাম। আপনার সাথে আমার অনেক সুন্দর সুন্দর মুহুর্তের প্রতিচ্ছবি ভাসছিলো আমার চোখের সামনে যেগুলো আমরা দুজনে মিলে আগামীতে কাটাবো।
আরিয়ান:- আচ্ছা! বিশ্বাস করলাম তুমি যা বলছো সবটা সত্যি। তাহলে একটা কথা বলো... এই কারণেই তুমি আমাকে এখানে থাকে জোড় করেছো.? আর তোমার আম্মুর সাথেও আমাকে নিয়েই কথা বলছিলে.?
অরিন:- হ্যাঁ! আপনি একদম ঠিক বলেছেন। সেদিনের পর থেকে আমি আমার অতীতকে ভুলে আপনার পথ চেয়ে বসে ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিলো আমাদের ভাগ্য যে করেই হোক আমাদের এক করবেই আর দেখুন আজ আপনি সামনে।
আরিয়ান:- আর একটা কথা....
অরিন:- বলুন!
আরিয়ান:- তুমি যে বললে ওই প্রাসাদ থেকে কেউ বেঁচে ফিরতে পারেনি তাহলে আজিজ ভাই কিভাবে বেঁচে ফিরলো.?
অরিন:- আজিজ ভাই তোহ প্রাসাদের ভিতরে যায় নি, উনি তোহ কবরস্থান থেকে কোনো রকম নিজের জীবন বাঁচিয়ে পালিয়েছেন। ওই প্রাসাদ থেকে একমাত্র আমিই বেঁচে এসেছি।
এর আগে যতজন ওখানে গিয়েছিলো সবাই প্রাসাদ অব্দি যাওয়ার আগেই মারা গেছে অনেকে হয়তো প্রাসাদের চৌকাঠে যাওয়ার পর মারা গেছে। কিন্তু ওখান থেকে আসার পর যা বুঝলাম, ওখানে কেউ ইবাদত সম্পূর্ণ করতে পারলে বেঁচে ফিরা সম্ভব। আমি ইবাদত সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছি তাই নির্বিঘ্নে ওখান থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছি আর আজিজ ভাই কবরস্থান থেকেই পালিয়েছে।
আরিয়ান:- তোমার অনেক সাহস! এতকিছুর পরও কি সুন্দর ইবাদত সম্পূর্ণ করে আমার চেহারা দেখেই বেরিয়েছো। আমার মনে হচ্ছে ভুতগুলো তোমাকে ভয় দেখাতে এসে নিজেরাই ভয় পেয়ে গেছে!! হা!হা!হা!
অরিন:- কি! কি বলতে চাইলেন, আমি দেখতে ভুতের মতো.?
আরিয়ান:- আরে ইয়ার! জাস্ট ফান!!
অরিন:- নাহ! নাহ! এটা কেমন ফান, কষ্ট পেয়েছি সরি বলেন...
আরিয়ান:- আচ্ছা সরি! এইযে কান ধরলাম
অরিন:- আচ্ছা! হয়েছে! হয়েছে! এবার গাড়ি থেকে নামুন...
আরিয়ান:- এটা তোহ পাহাড়িতলা গ্রাম নাহ! এখানে নামবো কেনো.?
অরিন:- এটাই এলাহাবাদ রাজার প্রাসাদের সীমানা।
আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। চতুর্দিক কেমন শুনশান, দূর দূরান্তে কোনো লোকজনের দেখা নেই। আস্তে আস্তে কবরস্থানের দিকে পা বাড়াতে থাকি। হয়তো নিজের অজান্তেই হাঁটছিলাম। কি মনে করে এমন হিপনোটাইজ হয়ে গেলাম আজও বুঝে উঠতে পারলাম নাহ।
হঠাৎ করে পিছন থেকে ডাক এলো....
"আরিয়ান......."
আমি পিছনে তাকিয়ে বললাম.....
"কে...?"
সাথে সাথে অরিন হাঁটু গেড়ে বসে বললো....
"Will You Marry Me"
"কি বলছো এগুলা.? মাথা ঠিক আছে তোমার.?"
অরিন:- প্লিজ আরিয়ান মানা করো নাহ! তোমার জন্য অনেক অপেক্ষা করেছি। আমার বিশ্বাস ছিলো তুমি আসবে। প্লিজ
আরিয়ান:- দেখো.....
আমার কথা শেষ নাহ হতেই অরিন ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে আরম্ভ করলো।
আমিও কোনো উপায় নাহ পেয়ে ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম...
"দেখো অরিন! এখন এসবের টাইম নাহ! আমরা পাহাড়িতলা গ্রাম থেকে ফিরি তারপর নাহয় এসব নিয়ে কথা বলবো.?"
অরিন:- নাহ! নাহ! তুমি আমাকে প্রমিজ করো, আমাদের সম্পর্কটা বিয়ে অব্দি যাবে
আরিয়ান:- কিসের সম্পর্ক! কোন সম্পর্কের কথা বলছো.? আমার মনে পড়ছে নাহ তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক ছিলো কি নাহ
অরিন:- প্লিজ আরিয়ান! নিজের জীবন বাজি রেখে ওই প্রাসাদে গিয়েছিলাম। আজ যদি তোমাকে এসব নাহ বলতাম তাহলেও হয়তো তোমার আর আমার ভাগ্যে এক হওয়া লিখা ছিলো। তাহলে কি তোমার কাছে এসব বলে আমি অপরাধ করলাম। সবকিছু হয়তো ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলেই ভালো হতো। অন্তত তুমি আমাকে ইগ্নোর করতে নাহ
আরিয়ান:- তুমি ভুল ভাবছো! আমি তোমাকে ইগ্নোর করছি নাহ! আমি তোহ শুধু....
অরিন:- Any ways, leave it!! চলুন, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে
আরিয়ান:- অরিন!!!
অরিন আমার কোনো কথাই নাহ শুনে গাড়িতে গিয়ে বসলো।
"ভাইয়া! তাড়াতাড়ি আসুন এবার কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
"আমি কি কোনো ভুল করলাম! অরিন আমার জন্য কতকিছু করলো আর আমি ওকে কষ্ট দিলাম। আমার মন বলছে অরিন সবকিছু সত্যি বলেছে। আমার কি রাজি হয়ে যাওয়া উচিৎ.?"
অরিন আবারও ডাকতে থাকে...
"ভাইয়া! তাড়াতাড়ি আসুন"
ওর কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছে ও কান্না করছে....
আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম।
"ইয়ে! অরিন! তোমার বাবা মায়ের সাথে কবে দেখা করাতে নিয়ে যাবে আমাকে.?"
অরিন:- মানে.?
আরিয়ান:- এইমাত্র নাহ বললে আমাদের বিয়ের কথা, বিয়ে তোহ আর একা একা করতে পারবো নাহ, আমার বাবা মা নেই তোহ কি হয়েছে তোমার বাবা মা তোহ আছেন
অরিন:- সত্যি!
অরিন যেনো খুশিতে আকাশ থেকে পরলো। নিজের হাত দিয়ে কতক্ষণ মুখ চেপে কান্না করলো তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।
"অরিন! আমরা কি এখানেই থাকবো.?"
অরিন:- সরি ভাইয়া!
আরিয়ান:- ওয়াও! এই মেয়ের সাথে নাকী আমার বিয়ে হবে..!
অরিন:- কেনো! আমি আবার কি করলাম, হঠাৎ এভাবে বলছেন কেনো.?
আরিয়ান:- এখনো ভাইয়া বলে ডাকছো!! তাহলে বিয়ে করার কি দরকার.? স্টেম্প পেপারে সাইন করে আমাকে তোমার ভাই বানিয়ে নিলেই তোহ পারো।
অরিন:- ওহ্! সরি! সরি! আর ভাইয়া বলে ডাকবো নাহ। এবার চলুন অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর আপনি চাইলে আজকে পাহাড়িতলা গ্রাম থেকে এসেই আমার বাবা মায়ের সাথে দেখা করাতে নিয়ে যাবো আপনাকে।
আরিয়ান:- থাক! কোত্থাও নিয়ে যেতে হবে নাহ! এক কাজ করো আমাকে বিয়েই করতে হবে নাহ
অরিন:- মানে.? আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝি নাহ! এই বলছেন বিয়ের জন্য রাজি আবার এই বলছেন বিয়ে করতে হবে নাহ। আপনার সমস্যা কোথায়.? বিয়েটা কি আপনার কাছে ছেলেখেলা মনে হয়। সরি ভাই! করতে হবে নাহ বিয়ে।
আরিয়ান:- আরে!! এক লাইন বেশি বুঝলে যা হয়!
অরিন:- আমি এক লাইন বেশি বুঝি!! কি বেশি বুঝলাম বলুন...
আরিয়ান:- যে মানুষটাকে কিছুদিন পর বিয়ে করবে তাকে এখনো আপনি আজ্ঞা করছো, ভাইয়া বলে ডাকছো.? তাহলে বিয়ে করার কি দরকার বলো.?
অরিন:- ইয়ে!!!! আচ্ছা আর বলবো নাহ।
আরিয়ান:- এজন্যই আম্মু বলতো, আমার বউ দোষ করলেও যেনো আমি নিজের ঘাড়ে সব দোষ নিয়ে নি।
অরিন:- ওহ্ হ্যালো!! এখনো বিয়ে হয়নি! বউ ভাবাটা বন্ধ করো।
আরিয়ান:- আল্লাহ! আল্লাহ! একটু আগে তোহ নিজেই বিয়ের জন্য কান্না করছিলে। বাপরে এ তোহ গিরগিটিকেও হার মানাবে। মুহুর্তের মধ্যে রঙ বদলে ফেলে।
অরিন:- আরিয়া!!! এবার কিন্তু রাগ লাগছে!
আরিয়ান:- আচ্ছা! সরি মেরি মা আব তোহ গাড়ি স্টার্ট কারো!!
অরিন:- হোয়াট!! মেরি মা মানে.?
আরিয়ান:- কিছু নাহ!!
এভাবেই দু'জনে দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া করতে করতে পাহাড়িতলা গ্রামে গিয়ে পৌঁছাই। অরিনকে নিয়ে তাড়াতাড়ি করে সেই নিষিদ্ধ স্থান অর্থাৎ আমার প্রতিটা কাছের মানুষগুলোর কবরে পৌঁছে গেলাম।
গিয়ে দেখি বটগাছের এক পাশে আমার ফোনটা সমানে বেজে চলেছে। আমি ছুটে গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি ফোনে 1% চার্জ আছে। রাশেদ আঙ্কেল কলের উপর কল করেই চলেছে। আমি কল ব্যাক করবো তখনই ফোনটা বন্ধ হয়ে যায়।
পাশ থেকে অরিন বলে উঠলো....
"আরিয়ান!! এই জায়গাটা এমন নির্জন কেনো.?"
আরিয়ান:- এটা কিছুদিন আগেও এই গ্রামে নিষিদ্ধ স্থান নামে পরিচিত ছিলো।
অরিন:- মানে!!
আরিয়ান:- সব বলবো! একটু ধৈর্য ধরো!! আমাকে এখন খান ভিলায় যেতে হবে।
অরিন:- খান ভিলা মানে.?
আরিয়ান:- আমাদের পৈতৃক বিলাশ।
অরিন:- ওহ্! চলো তাহলে সেখানেই যাই।
অরিন আর আমি খান ভিলায় চলে গেলাম। আমার পৈতৃক বিলাশ দেখে অরিন থতমত খেয়ে গেলো।
"বাপরে!! এত বড় বাড়ি.?!"
আরিয়ান:- হ্যাঁ!
অরিন:- এত বড় বাড়ি রেখে শহরে কেনো চলে যাচ্ছিলে.?
আরিয়ান:- এই বাড়ি! এই গ্রাম! আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিয়েছে। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর কোনোদিন এখানে আসবো নাহ। কিন্তু আমার ভাগ্য আমাকে আবারও এখানে এনে দাঁড় করালো।
অরিন:- মানে!!
আরিয়ান:- দাঁড়াও! সব বলছি!! তার আগে আমাকে একবার রাশেদ আঙ্কেলকে কল করতে হবে।
অরিন:- রাশেদ আঙ্কেলটা আবার কে.?
আরিয়ান:- রিশার বাবা!
অরিন:- ওহ্! উনার সাথে কি দরকার।
আরিয়ান:- এখনে বসো। আঙ্কেলের সাথে কথা বলে নি তারপর তোমাকে সবটা বলছি।
ফোনটা চার্জে বসিয়ে, রাশেদ আঙ্কেলকে কল ব্যাক করলাম। কল রিসিভ করেই রাশেদ আঙ্কেল বললো....
"আরিয়ান তুমি কোথায় আছো! কাল রাত থেকে তোমাকে যে কতবার কল করেছি বলে বুঝাতে পারবো নাহ! তোমার সাথে আমার জরুরী কথা আছে। রিশা কোথায়.? ওর ব্যাপারেই কথা বলবো তোমার সাথে!"
আরিয়ান:- আঙ্কেল! আপনার সাথেও আমার কিছু জরুরী কথা আছে রিশাকে নিয়েই।
রাশেদ আঙ্কেল:- মানে!!
আরিয়ান:- আপনি কি এক্ষুনি পাহাড়িতলা গ্রামে আসতে পারবেন.?
রাশেদ আঙ্কেল:- কি বলছো.? এক্ষুনি.?
আরিয়ান:- হ্যাঁ আঙ্কেল! প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন।
রাশেদ আঙ্কেল:- ঠিক আছে! তুমি ওখানেই থাকো আমি এক্ষুনি আসছি।
আঙ্কেলের সাথে কলে কথা বলে একটু নিশ্চিন্ত হলাম। উনি এখানে আসলে অনেক কিছু থেকে পর্দা উঠবে আমি শিওর। হুট করে কেউ আমার কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলো...
"আরিয়ান! কি ভাবছো.?"
"কে!!"
"আমি! আমি! আমি! আমি অরিন! এমন ভয় পাচ্ছো কেনো.?"
"কই! ভয় পাচ্ছি নাহ তোহ! চিন্তা করছি!"
"কি নিয়ে এত চিন্তা করছো.? আর এই গ্রামে আসতে নাহ চাওয়ার রহস্য কি বললে নাহ তোহ.?"
অরিনকে আজ আর মিথ্যা বলবো নাহ। আজ ওকে সব সত্যি বলবো। প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত আমার সাথে কি হচ্ছে, রাশেদ আঙ্কেলকে কেনো আসতে বলছি সব বলবো। কিন্তু ওর কাছে একটা কথা লুকাতে হবে। হরিণীর কথা। হ্যাঁ! ও যদি হরিণীর কথা জানতে পারে অনেক কষ্ট পাবে। ওর চোখে আমার জন্য ভালোবাসা দেখেছি, ও চাইবে নাহ আমাকে হারাতে। তার উপর ওর আর আমার বিয়ের কথা পাকা হবে এখন এসব জানতে পারলে অনেক বেশি কষ্ট পাবে। হরিণীর একটা ব্যবস্থা করতে পারলে ওকে সবটা জানাবো, আপাতত এটা গোপন রেখে সবকিছু বলি।
অরিন:- কি হলো! কি ভাবছো.?
আরিয়ান:- অরিন! তোমাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছি।
অরিন:- যেমন...
আরিয়ান:- আমার ফ্যামিলির কোনো এক্সিডেন্ট হয়নি। ওদের মৃত্যু এমনি এমনি কোনো ট্রাক দূর্ঘটনায় হয়নি।
অরিন:- মানে! তাহলে কিভাবে হয়েছে.?
আরিয়ান:- এক অশরীরী আত্মা আমার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
এরপর অরিনকে সবকিছু খুলে বললাম। লক্ষ করলাম আমার কথা শুনতে শুনতে অরিনও কান্না করে দিয়েছে। অরিনকে কান্না করতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম...
"কি হলো কান্না করছো কেনো.?"
অরিন:- আপনার সাথে এমন নির্মম ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও কিভাবে এসব সহ্য করছেন.?
আরিয়ান:- ভাগ্যের কাছে এখনো নত হইনি! এজন্যই সাহস পাচ্ছি এসব মোকাবিলা করার।
অরিন:- আচ্ছা বুঝলাম! কিন্তু একটা কথা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে নাহ.?
আরিয়ান:- কি.?
অরিন:- আপনার তাহলে পুনর্জন্ম হয়েছে.? নাহ মানে! আপনি তাহলে আপনার পার দাদার দ্বিতীয় জন্ম.?
আরিয়ান:- হ্যাঁ! তাছাড়া এখনো আমার সব সমস্যা সমাধান হয়নি।
অরিন:- মানে.??
আরিয়ান:- এখনো আমার সাথে এসব ঘটনা ঘটে চলেছে। ওইদিন রিশার আত্মা আমার কাছে সাহায্য চাইছিলো।
অরিন:- কি রকম সাহায্য.?
আরিয়ান:- ও মুক্তি চায়.!
অরিন:- মুক্তি! মানে.? কিসের মুক্তি.?
আরিয়ান:- অরিন! আমি যখন রিশার আত্মার সাথে কথা বলছিলাম তখন রিশা বলেছিলো ওকে নাকী কোনো এক সরদার বন্দী করে রেখেছে।
অরিন:- কিন্তু কেনো.?
আরিয়ান:- সেটাই তোহ খুঁজে বের করতে হবে। অরিন...?
অরিন:- হ্যাঁ বলো..?
আরিয়ান:- তোমার মনে আছে, ইরিন ওইদিন হসপিটালে কি বলেছিলো.?
অরিন:- নাহ! ঠিক মনে পড়ছে নাহ.? কি বলেছিলো ইরিন.?
আরিয়ান:- ইরিন বলেছিলো যে ও কিবরিয়া চৌধুরীকে কোনো এক সরদারেের সাথে কথা বলতে শুনেছিলো..?
অরিন:- হ্যাঁ! হ্যাঁ! মনে পড়েছে। তুমি কি ভাবছো দুইজনই একজন.?
আরিয়ান:- হ্যাঁ! আমার সেটাই সন্দেহ হচ্ছে।
অরিন:- আল্লাহ! আল্লাহ! এ কেমন গোলকধাঁধা! আমার মাথায় তোহ কিছুই ঢুকছে নাহ। কিভাবে এসবের সমাধান করবে তুমি!
আরিয়ান:- দেখা যাক! অরিন তোমাকে আরো একটা কথা বলার ছিলো.?
অরিন:- হ্যাঁ! বলো.?