পুনর্জন্ম (The Another Love Sory) — পর্ব ০১

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০১ · ২৩ পর্বের মধ্যে ১

"ধর! ধর! ধর! ও একটা ডাইনী! ওকে পুড়িয়ে মারতে হবে! যেভাবেই হোক ওকে খুঁজে বের করতে হবে! কোথায় গেলে ডাইনীটা...? বিয়ের ২ দিন পরই নিজের স্বামীর জীবন নিয়ে নিলো। তার উপর বিয়ের ১ মাসের মধ্যেই গর্ভবতী হয়ে সন্তানও জন্ম হয়ে গেলো.!

এটা কোনো সাধারণ মানুষ হতেই পারে নাহ.! ও নিশ্চয়ই কোনো ডাইনী, আর এই গ্রামে ডাইনীদের একটাই শাস্তি, সেটা হলো মৃত্যু। আজ ওকে সহ ওর বাচ্চাকেও পুড়িয়ে মারবো। ডাইনীর কোনো চিহ্ন এই গ্রামে রাখবো নাহ।

এই! সবাই ভালো করে খোঁজ, দেখ কোথায় গেলো.?

ডাইনী একটা! শুধু একবার হাতে পাই ওকে"

গ্রামবাসীরা রোকসানাকে ডাইনী ভেবে মারার জন্য ওতপেতে আছে। আজ হয়তো ওকে সামনে পেলেই গ্রামবাসীরা পুড়িয়ে মারবে।

কিন্তু কে এই রোকসানা..?

১ মাসের মধ্যে কিভাবে কারো সন্তান জন্মাতে পারে..?

রোকসানা কি নিজেকে আর নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পেরেছিলো..?

১৬ বছর পর.........

"ভয় পেয়ো নাহ আরিয়ান, ওর উপর ইফরিদের ক্ষোভ নেই। ও নাভি নিয়েই জন্মেছে। ও আমার মতো হয়নি ও তোমার মতোই সাধারণ মানুষ। ও তোমার আর আমার ভালোবাসার চিহ্ন। কথা দাও ওকে সবসময় আগলে রাখবে.? ওকে সরদারের হাত থেকে রক্ষা করবে। ওই সরদারের নজর এতদিন আমার উপর ছিলো এখন আমার সন্তানের উপরেও ওর নজর পড়বে, তু-তুমি কথা দাও ওর কোনো ক্ষতি হতে দিবে নাহ।"

এই কথাটুকু বলেই আমার কাঁধে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো হরিণী।

দেড় মাস আগে.........

নিজের পরিবার আর প্রিয়জন হারিয়ে আমি যখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি তখন মাওলানা আলতাফ সাহেব আমাকে মানসিক ভাবে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যে কাছের মানুষ হারায় সে আর উপরওয়ালা ব্যতীত আর কেউই তার কষ্ট উপলব্ধি করতে পারবে নাহ।

একদিকে গ্রামের নিষিদ্ধ স্থানে ২ দিন আগে মারা যাওয়া তৌহিদ আর আব্রাহামে লাশের সাথে নতুন করে রিশা আর রনির লাশও যোগ হয়ে গেলো অপরদিকে খান ভিলায় আমার আব্বু, আম্মু আর রফিক দাদু প্রাণহীন হয়ে পড়ে আছে। এদের বাদেও মাওলানা আলতাফ সাহেবের কুটিরে তার এক সাগরেদের মাথা বিহীন লাখ দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে আছে।

আজ যেনো মৃত্যু খেলায় মেতে উঠেছে পাহাড়িতলা গ্রাম। একের পর এক প্রাণ যেনো ইচ্ছে করেই কেড়ে নিলো এই অভিশপ্ত গ্রাম নিজের অভিশাপ খণ্ডনের জন্য। এক এক করে ৮জন নিরীহ মানুষকে টেনে নিলো নিজের অভিশাপ কাটানোর জন্য। তবে কি এখানেই শেষ হবে মৃত্যু খেলা নাকী এখান থেকেই শুরু হলো মৃত্যু খেলার নতুন অধ্যায়।

প্রিয়জনদের শোকে শোকাহত হয়ে আমি কান্না মাখা গলায় আলতাফ সাহেবকে বললাম...

আরিয়ান:- আজ সবকিছু হারিয়েছি আমি। নেই কোনো আপনজন, নেই কোন বন্ধু, একদম একা হয়ে গেলাম আমি। ভাগ্যের পরিহাস যদি এতটাই নির্মম হয় তাহলে কেনো পিছনে ফেলে আসা অতীত নতুন করে উঁকি দেয়.? কি দরকার এসবে.? যেখানে এই অতীত দাফন হয়ে গিয়েছিলো সেখানেই দাফন থাকলেই তোহ হতো। কেনো আবারও নতুন করে সব শুরু করতে হবে সেই অতীতকে আর কেনোই বা হারাতে হবে প্রতিটি কাছের মানুষকে.? কেনো অচেনা হয় সব চেনা মুখগুলো..? বলতে পারেন ইমাম সাহেব..? আমার মতো এমন দুর্ভাগ্য যেনো আর কারো নাহ হয়।

আলতাফ সাহেব:- আপনি দয়া করে ভেঙ্গে পরবেন নাহ। দেখুন একবার আজ আপনি বিজয়ী হয়েছেন। সব অশুভ শক্তিকে পরাজয় করেছেন। শত বছর পূর্বের অভিশপ্ত পাহাড়িতলা গ্রামকে আজ আপনি অভিশাপ মুক্ত করেছেন। এটা কি কিছু নাহ..? শেষ হাসিটা আপনিই হেসেছেন।

আরিয়ান:- আজ আমি জিতে গিয়েও হেরে গেলাম ইমাম সাহেব। এমন জিত তোহ আমি জিততে চাইনি। এরচেয়ে ভালো হয়তো হেরে গেলেও জিতে যেতাম। শেষ হাসিটা আমি হাসিনি ইমাম সাহেব। শেষ হাসিটা হানা আর জিলানীই হাসলো কারণ ওরা হেরে গিয়েও জিতে গেছে। শুধু ওরাই মারা যায়নি, ওদের সাথে আমার প্রতিটা প্রিয় মানুষকে নিয়ে গেছে। আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেলো।

আলতাফ সাহেব:- ভাগ্যের লিখা যে কেউ খণ্ডাতে পারে নাহ। এটাই ছিলো আপনার নিয়তি। নিয়তিকে মেনে নিতে শিখুন সাহেব। উঠুন, লাশগুলো দাফন করতে হবে তোহ....

আরিয়ান:- আর নিয়তি! আমার মতো এত নির্মম নিয়তি যেনো আর কারো নাহ হয়।

আলতাফ সাহেব:- কার নিয়তি কিভাবে লিখা হয়েছে, কোথা থেকে শুরু করবে আর কোথায় গিয়ে শেষ করবে সেটা একমাত্র উপরওয়ালাই ভালো জানে। এখন এসব ভেবে ভেঙ্গে পড়লে চলবে নাহ সাহেব। আপনাকেই নিজেকে সামলাতে হবে। লাশগুলো আর কতক্ষণ এখানে এভাবে পড়ে থাকবে...? এবার তোহ দাফন কাজ শুরু করতে হবে...

আরিয়ান:- হ্যাঁ! আজ এখন এই মুহুর্ত থেকে আমি আমার নিয়তি মেনে নিলাম এবং এই পাহাড়িতলা গ্রামে প্রত্যেকটা প্রিয় মানুষের সাথে সাথে আমার অতীত ও বর্তমান দাফন করবো। আজ থেকে আমি নিজেই নিজের ভাগ্যের মোড় ঘুরাবো। আজকের পর আর কোনোদিন এই পাহাড়িতলা গ্রামে ফিরে আসবো নাহ।

আলতাফ সাহেব:- তা হবে ক্ষনে, এখন কি লাশগুলো…...

আরিয়ান:- কি লাশগুলো, লাশগুলো শুরু করেছেন আপনি! এমন ভাবে বলছেন দেখে মনে হচ্ছে লাশগুলোর জন্য আপনার অনেক বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে।

আলতাফ সাহেব:- আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন সাহেব! ওই দুইটা লাশ দেখুন, পরশু থেকে এখানেই পরে আছে আর আজ দেখুন আরো ৬টা লাশ যোগ হলো। এদের দাফন কার্য করতে হবে তোহ্। মৃত ব্যক্তির লাশ যতক্ষণ মাটির উপরে থাকবে ততক্ষণ উনাদের রুহ্ আজাব পেতে থাকবে তাই বললাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দাফন কাজ সেরে ফেললেই ভালো।

আরিয়ান:- হ্যাঁ! আপনি ঠিক বলেছেন। চলুন তাহলে ওদের দাফন কাজ শুরু করি।

এরপর আমি আলতাফ সাহেবের সাহায্য নিয়ে প্রতিটি প্রিয় মানুষদের মৃত দেহ একত্র করে তাদের দাফন কাজটুকু শেষ করলাম।

এই চেনা মুখগুলো আর কখনো দেখতে পাবো নাহ, আর কখনো এই মানুষগুলো আমাকে ডাকবে নাহ, একটি বারের মতো তাদের সাথে আর কখনো কথা বলতে পারবো নাহ। ভাবতেই আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি বেয়ে বেয়ে পড়ছিলো।

কিছুতেই যেনো প্রিয় মানুষগুলোর কবর থেকে যেতে মন চাচ্ছিল নাহ। কিন্তু আজ নিজেকে নিজে কথা দিয়েছি যত যাই হয়ে যাক আমি আর কখনোই এই পাহাড়িতলা গ্রামে আসবো নাহ। এই অভিশপ্ত গ্রাম নিজেকে অভিশাপ মুক্ত করার জন্য আমার প্রতিটি প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিয়েছে আমার কাছ থেকে। এই গ্রামকে আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছি নাহ্। যে গ্রামে আসার জন্য কিছুদিন আগেও এত বায়না এত জেদ ধরেছিলো আজ সেই গ্রামটিই আমার কাছে বিষের মতো হয়ে উঠেছে। হবেই বা নাহ কেনো, আমার জায়গায় যে কেউ থাকলে নিজের কাছে নিজে একই প্রতিজ্ঞা করতো।

সবশেষে গ্রামের উপর জ্বেদ খাটিয়ে যখন ফিরে আসতে চাইলাম তখন আলতাফ সাহেব বলেন......

আলতাফ সাহেব:- চলে যাবে সাহেব! সারাদিন কিছুই তোহ খাননি.! চলুন আগে কিছু খেয়ে নিবেন তারপর নাহয় কাল সকালে শহরের উদ্দেশ্যে বের হবেন। চলুন! চলুন আমার সাথে।

আরিয়ান:- মাফ করবেন। যে গ্রাম আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে সে গ্রামে আর এক মুহুর্তও থাকতে চাই নাহ। আমার জীবনের কালো অধ্যায়গুলো আজ এখানে দাফন করে ফিরে যাচ্ছি। আমাকে আর আটকাবেন নাহ।

আলতাফ সাহেব:- কিন্তু!

আরিয়ান:- কোনো কিন্তু নেই ইমাম সাহেব!

আলতাফ সাহেব:- আচ্ছা! সে নাহয় যাবেন ক্ষনে। আপাতত কিছু তোহ মুখে দিন।

আলতাফ সাহেব অনেক জোড় করার কারণে উনার সাথে দুপুরের খাবার খেতে রাজি হয়ে গেলাম। দুপুরের খাবার শেষ করে আবারও পাহাড়িতলা গ্রাম থেকে শহরের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লাম।

আমার বরাবরই শখ ছিলো নিউজ রিপোর্টার হওয়ার যে কারণে অনেক বার জার্নালিজম এক্সামও দিয়েছিলাম। এমনকি প্রতিবারই রিপোর্ট চ্যানেল থেকে ডাক এসেছিলো কিন্তু প্রতিবারই আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসে দাঁড়িয়েছে আমার আব্বু। আব্বুর ইচ্ছে ছিলো আমি উনার সাথে নিজেদের বিজনেস সামলাবো। সবকিছু নিয়ে জ্বেদ করতে পারলেও আমার ক্যারিয়ারের বিষয়ে আব্বুর সামনে কখনো জ্বেদ করতে পারতাম নাহ। এখন আর কোনোদিন জ্বেদ করতেও পারবো নাহ কারণ আমার ভাগ্য তাদেরকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।

গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে এসবই ভাবতে থাকি, এবার শহরে গিয়ে নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে আবারও জার্নালিজম এক্সাম দিবো। এবার যে করেই হোক আমাকে জার্নালিস্ট হতেই হবে।

নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনায় যখন মগ্ন হয়ে ছিলাম তখনই কেউ একজন গাড়ি আটকে দাঁড়ায়....

হঠাৎ করে থমকে গিয়ে গাড়ি ব্রেক করে রাস্তার এক পাশে পার্ক করলাম। গাড়ি ভিতর থেকে বেরোতেই সেই পাগল মহিলাটি খুব শক্ত করে আমার হাত ধরে বলতে থাকে....

"কোথায় পালাচ্ছিস..? ফিরে আসতে হবে তোকে! তুই আবারও এখানে ফিরে আসবি! মানা করেছিলাম এখানে আসিস নাহ কিন্তু শুনিসনি! এখন কেনো পালাচ্ছিস..? আসবি! আসবি! আবার ঠিকই আসবি! পালাতে পারবি নাহ তুই, পালাতে পারবি নাহ! তোর জীবনের আরো একটা অধ্যায় শুরু হতে চলেছে, শক্ত করে নে নিজেকে। পরে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করিস নাহ্।"

মহিলাটির এমন উদ্ভট কথাবার্তা শুনে মনে মনে ভাবতে থাকি, "আশ্চর্য, ওইদিনের মহিলাটি আজ হঠাৎ কোথা থেকে আসলো..? আরেহ্! এটা তোহ সেই জায়গাটি, যেখানে আগের বার একই ভাবে এই মহিলাটি আমাকে বাঁধা দিয়েছিলো। তাহলে কি এই জায়গার সাথে এই মহিলা বা আমার কোনো সম্পর্ক আছে..?"

নিজ মনে এসব ভাবতে ভাবতেই তাকিয়ে দেখি আমার সামনে কেউ নেই। একটু আগে যে মহিলাটি আমার হাত ধরে ছিলো সে-ও উধাও।

"কি হলো মহিলাটি আবার কোথায় গেলো..?"

আচমকা আমার নজর পড়লো নিজের হাতের দিকে, তাকিয়েই অবাক হয়ে গেলাম। কারণ আমার হাতে স্পষ্ট ভাবে কারো পাঁচটি আঙ্গুলের ছাপ কালো হয়ে বসে ছিলো।

আমি এবার কিছুটা ভয় পেতে লাগলাম। রীতিমতো আমার কপালে ভয়ের ঠান্ডা শ্রোত বইছিলো। শরীরের লোমগুলো এক এক করে দাড়িয়ে গেলো। হাত পা কেমন যেনো অবশ হয়ে আসছে, মাথাটা ঝিমঝিম লাগছে।

লাগবেই বা নাহ কেনো, চোখের সামনে জলজ্যান্ত একটা মানুষ এভাবে উধাও হয়ে গেলো, তার সাথে সাথে ওই মানুষটার আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্ট আমার হাতে ফুটে উঠেছে। আমার পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যে কারোই একই অবস্থা হতো।

ভয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে উঠে বসে পরলাম, যে করেই হোক যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জায়গা পরিত্যাগ করতে হবে। আজকের পর আর কখনো এমুখো হওয়া যাবে নাহ।

তাড়াহুড়ো করে গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ করে কেউ একজন গাড়ির সাথে ধাক্কা খায়। এবার যেনো আমার দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেলো। একেই তোহ এই পৃথিবীতে আমার আপন বলতে কেউ নেই, যদি এই এক্সিডেন্ট নিয়ে থানা পুলিশ হয় তাহলে আমদকে বাঁচানোর মতোও কেউ নেই। কিন্তু এমন অবস্থায় এই আহত মানুষটিকে এখানে একা ফেলে চলে যাওয়াটা মোটেও ভালো মানুষের পরিচয় দিবে নাহ।

আবারও একা একাই বিড়বিড় করতে থাকি "আমার যা হওয়ার হবে, এমনিতেই তোহ জীবন থেকে সবকিছু হারালাম এবার নাহয় ক্যারিয়াটাও হারাবো। তাতে কি.? আমার জন্য একটা মানুষ মরতে বসেছে উনাকে বাঁচাতে হবে এতে যদি আমাকে জেলে যেতে হয় তাহলে তাই যাবো কিন্তু এই মানুষটাকে বাঁচাবোই"

একা একা বিড়বিড় করে গাড়ি থেকে নেমেই যেনো আমার চোখ মাথায় উঠে গেলো, "একি করলাম আমি.? ইশশশ! দেখেই বুঝা যাচ্ছে মহিলাটি অনেক গরীব! হায় আল্লাহ আমার গাড়ির নিচেই আসতে হলো উনাকে। এখন কি করবো উনাকে নিয়ে..? আশেপাশে কোনো হসপিটাল আছে কিনা তাও তোহ জানি নাহ.!"

মহিলাটি মধ্যবয়স্ক ছিলো, আমার আম্মুর বয়সীই হবে হয়তো! উনিও নিশ্চয়ই কারো নাহ কারো মা.? পড়নে ছিলো অনেক পুরনো একটা ছেড়া ফাটা কম দামী কাপড়।

গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগার ফলে মহিলাটি মাথায় অনেক আঘাত পেয়েছে। মাথা থেকে অনবরত রক্ত পড়েই চলেছে। মুখের এক পাশ পুরো থেঁতলে গেছে। এমন করুন সময়েও মহিলাটা বার বার কারো নাম নিয়ে কান্না করছিলো.....

"হরিণী! আমার হরিণীর কি হব.? ওকে কে দেখবে.?"

মহিলাটির কান্নার কারণ বুঝতে নাহ তাকে প্রশ্ন করলাম, "হরিণী! এই হরিণীটা কে..? আপনার পোষা হরিণ..?"

মহিলাটি হয়তো আমার কথা শুনতে পেয়েছিলো, সে মাথা নেড়ে জবাব দিলো, "উহু! আ-আ-মার মেএএএ"

এই কথাটুকু বলতেই যেনো তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে চেষ্টা কারর পর সে এই কথাটুকু বলেই মিটিমিটি চোখে তাকায় আবার চোখ বন্ধ করে।

উনাকে নিয়ে কোথায় যাবো এখন, কিছুই বুঝতে পারছিলাম নাহ। এই মাঝপথে কে আদের সাহায্য করবে..?

আমি মহিলাটিকে শুধু এতটুকুই বলছিলাম "আ-আপনি চোখ বন্ধ করবেন নাহ প্লিজ! জেগে থাকুন প্লিজ জেগে থাকুন! দেখুন দুনিয়া কত সুন্দর। ঘুমোবেন নাহ প্লিজ! আমি আপনাকে হসপিটালে নিয়ে যাবো! আপনি প্লিজ ঘুমোবেন নাহ!"

মধ্যবয়স্ক মহিলাকে মনোবল শক্ত করতে বলে তাকে গাড়িতে তুলে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। কিন্তু গাড়ি কিছুতেই স্টার্ট হচ্ছে নাহ্।

"এটার আবার কি হলো.? এমন সময়ই খারাপ হতে হলো.? ধ্যাত! এখন কি করবো..? কপাল খারাপ হলে যা হয় আরকি! সব দিক দিয়ে একসাথে খারাবি হচ্ছে। আমার নিয়তির জন্য এই নির্দোষ মহিলাটির কোনো ক্ষতি হতে আমি দিবো নাহ! যেভাবেই হোক উনাকে হসপিটালে নিয়ে যাবো! উনি হরিণীর জন্য কান্না করছিলেন, হরিণী যদি উনার মেয়ে হয় তাহলে তোহ নিশ্চয়ই হরিণী ওর মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে.? উনি বলছিলেন উনার কিছু হলে হরিণীকে কে দেখবে.? তার মানে হরিণীর এই পৃথিবীতে হরিণীর ওর মাকে ছাড়া আর কেউ নেই.? নাহ! নাহ! যেভাবেই হোক উনাকে সুস্থ করে উনার মেয়ের কাছে পৌঁছে দিবো!"

কোনো উপায় খুঁজে নাহ পেয়ে মহিলাটাকে কোলে তুলে নিলাম। এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছি অথচ কোনো হসপিটালের সন্ধান খুজে পাচ্ছিলাম নাহ।

"হায় আল্লাহ, রহম করো তোমার এই অধম বান্দাদের উপর। পথ দেখাও"

কতক্ষণ উনাকে এভাবে কোলে নিয়ে দৌড়াবো..?

আবারও উনাকে গাড়ির কাছে নিয়ে এলাম। গাড়িতে বসিয়ে আবারও গাড়ি স্টার্ট করার চেষ্টা করলাম কিন্তু কিছুতেই স্টার্ট হচ্ছিল নাহ।

উনাকে গাড়ির মধ্যে রেখেই আল্লাহর কাছে পানাহ্ চাইতে চাইতে আবারও বেরিয়ে পরলাম হসপিটালের সন্ধানে। হঠাৎ কেউ একজন আমার কাঁধে হাত রেখে বল...

"কি ভায়া.? কাকে খুজচ্ছেন...?"

প্রথমে চমকে গেলেও কিছুটা সাহস করে বললাম...

"ভাই আমার গাড়ির সাথে একজন ভদ্রমহিলা ধাক্কা খেয়েছে কিন্তু এখানকার কিছুই চিনি নাহ আমি, উনাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন"

"কি বলছেন ভায়া! এ তোহ পুলিশ কেস.?"

"কেস কাবারি পরে দেখা যাবে, সবকিছুর আগে উনার জীবন। আগে উনাকে হসপিটাল অব্দি পৌঁছে দি তারপর যা হওয়ার হবে। আপনি দয়া করে আমাকে হসপিটাল অব্দি নিয়ে যান"

"সে নাহয় নিয়ে যাবো! কিন্তু আপনি এই ভুজঙ্গপুর গ্রামে এসেছেন কেনো..? এখানে তোহ সচারাচর কেউ যাতায়াত করে নাহ"

"আমি তোহ এই গ্রামের নামটাও প্রথম শুনলাম। আমি শহরে থাকি, কিছুদিন আগে গ্রামের বাড়ি এসেছিলাম এখন আবার শহরে ফিরে যাচ্ছি। এখান দিয়েই যাচ্ছিলাম কিন্তু হঠাৎ করে ভদ্রমহিলাটি আমার গাড়ির সাথে এসে ধাক্কা খেলো। মহিলাটি বোধহয় আপনাদের গ্রামেরই, আপনি দেখলে বোধহয় চিনবেন..!"

"কোথায় আছে এখন মহিলাটি.?"

"উনাকে আমার গাড়িতেই রেখে এসেছি! ভাই এমনিতেই অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। প্লিজ আর সময় নষ্ট করবেন নাহ। আমার গাড়িটাও নষ্ট হয়ে গেছে, চলুন দু'জনে ধরাধরি করে উনাকে হসপিটাল অব্দি নিয়ে যাই!"

"আচ্ছা! চলুন! চলুন!"

এরপর আমি আর লোকটি ধরাধরি করে ভদ্রমহিলাকে গাড়ি থেকে নামালাম। লোকটি উনার থেঁতলে যাওয়া চেহারা দেখে প্রায় জ্ঞান হারাবে হারাবে ভাব।

"এ ভায়া! উনি তোহ মারা গেছে মনে হয়! কি বিভৎস ভাবে চেহারা থেঁতলে গেছে। কি জানি কতক্ষণ রক্তক্ষরণ হয়েছে্। মনে হয় নাহ বেচে আছে বলে.?"

লোকটির কথায় আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেলো। কি বলছে লোকটি.? নাহ! নাহ! এভাবে আমার হাতে একজন নিষ্পাপ মানুষের মৃত্যু হতে পারে নাহ.!

"ভাই প্লিজ! এমন ভাবে বলবেন নাহ! উনি বাঁচবেন। উনাকে বাঁচতে হবে। আপনি চলুন আগে হসপিটালে নিয়ে যাই তারপর যা হওয়ার হবে"

"নিয়ে গেলে কি হবে.? দেখেই তোহ বুঝা যাচ্ছে উনি মারা গেছে।"

"হায়াত মওতের কথা কেউ বলতে পারে নাহ, আপনি আপনার কাজ করুন।"

লোকটির সাথে কথোপকথন শেষ করে ভদ্রমহিলাকে নিয়ে হসপিটালের সামনে চলে এলাম।

হসপিটালে আসার পর এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো সেই পাগল মহিলাটি হসপিটালের বাইরে বসে আমার দিকে নজর রাখছে।

সেই আগন্তুক লোকটি আমাকে হসপিটাল অব্দি আসতে সাহায্য করলো। এরপর আমরা দু'জন মিলে মহিলাটিকে একটা স্ট্রাকচার সিটে শুইয়ে দিলাম।

আগন্তুক লোকটি চলে যেতে চাইলে আমি বললাম....

"আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই! এই অচেনা জায়গায় কিভাবে কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম নাহ। আল্লাহ অশেষ কৃপায় আপনি আমাকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছেন। কি বলে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো ভাই! যাই হোক, আপনার নামটা..?

লোকটা এক গাক মুচকি হেসে বললো...

" আমার নাম হাসান! আর ধন্যবাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার জায়গায় যে কেউ থাকলে হয়তো একই কাজ করতো। আর আপনাকে তোহ কখনো ভুজঙ্গপুর গ্রামে দেখিনি তাই সাহায্য করলাম। আপনি চিন্তা করবে নাহ আল্লাহ ভরসা। আপমার নামটা..?"

"জ্বি ভাই! আ-আমি আরিয়ান!"

"আচ্ছা ভাই! আবার দেখা হবে"

এই বলে লোকটি চলে গেলো। কেনো জানি নাহ উনার বলা শেষ কথাটা আমার অনেক সন্দেহ হলো।

যাই হোক, উনি চলে যাওয়ার পর স্ট্রাকচার সিট'টি নিয়ে হসপিটালের ভিতরে চলে গেলাম। ভিতরে যেতেই রিসিপশনের মহিলাটি আমাকে জিজ্ঞেস করলো...

"রোগীর কি হয়েছে..?"

"এক্সিডেন্ট করেছে.!"

"আপনি পুলিশে ইনফর্ম করুন নয়তো উনাকে হসপিটালে এডমিট করতে পারবো নাহ"

"কি বলছেন! একটা মানুষ মরতে বসেছে আর আপনি বলছেন পুলিশে ইনফর্ম নাহ করলে চিকিৎসা শুরু করবে নাহ, আপনারা নাহ ডাক্তার.? এই আপনাদের ডাক্তারি.? একজন সিরিয়াস রোগীকে এভাবেই রেখে দিচ্ছেন শুধুমাত্র পুলিশে ইনফর্ম করছি নাহ বলে..?"

"দেখুন ভাই! এটা হসপিটাল। এখানে আমার মোটিভেশনাল স্পিচ কেউ শুনবে নাহ। এখানে শুধু রুলস আর ডিসিপ্লিনটাই চলে। সো, আপনি আগে পুলিশে ইনফর্ম করুন তারপর আমরা উনাকে এডমিট করবো"

রিসিপশনের মহিলাটিকে কিছু বলতে যাবো তখনই কেউ আমার পিছন থেকে কাঁধে হাত দিয়ে বললো..

"আরেহ্! আরিয়ান ভাইয়া আপনি এখানে..?"