প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ০৯
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ০৯ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৯
হন্তদন্ত পায়ে ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে আসে আহমাদ। উদ্দেশ্য মাহিবাকে খোঁজা। মেয়েটা কি সত্যিই চলে গেলো? ড্রয়িং রুমে এসে খুঁজে পায় না মেয়েটাকে। রান্নাঘরে উকি দেয়। ওখানেও কেউ নেই। মায়ের ঘরে যেতে গেলে দরজা ঠেলে সালেহা বেগম নিজেই বের হয়ে আসেন। চিন্তিত ছেলেকে দেখে শুধান,
- কি হয়েছে বাবা? কোনো সমস্যা?
জড়তার সাথে আহমাদ উত্তর দেয়,
- না মা। উম.. মাহিবা কি তোমার ঘরে?
- কই না তো!
ভ্রু কুঁচকে ঘটনা ঠাহর করার চেষ্টা চালান মহিলা। ছেলে বউয়ের মাঝে ঢোকাটা ঠিক মনে করেন না। সেই ক্ষণে আফিয়ার ঘরে চোখ যেতেই বলেন,
- আফির ঘর বন্ধ কেনো? ওখানে আছে নাকি দেখ।
ঘাড় ঘুরিয়ে আফিয়ার ঘরের দুয়ার পানে চায় আহমাদ। ফের মায়ের দিকে চেয়ে বলে,
- তুমি যাও মা! কোনো সমস্যা নেই।
ছেলের আগ বাড়িয়ে বলা কথায় সালেহা বেগম বুঝলেন ছেলে তার উপস্থিতি এখানে চাচ্ছে না। সম্মতি দিয়ে প্রস্থান নেন তিনি।
আফিয়ার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে যায় আহমাদ। আবার বন্ধ করে দেয় দরজাটা। জানালা বন্ধ। ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে আসা ভাঙ্গা আলোয় দেখতে পায় খাটের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে মাহিবা। গুটিশুটি হয়ে থাকা দেহটার দিকে এগিয়ে যায় আহমাদ। অন্ধকারে চোখ সয়ে এলে বুঝতে পারে ওইটুকু দেহ খানিক পরপরই কেপে কেপে উঠছে। অনুশোচনার অন্তর্জালে জড়িয়ে পড়ে আহমাদ। ডায়েরীর লেখাগুলো চোখে ভাসে, বুকে বিধে। নিঃশব্দে মাহিবার পাশে যেয়ে বসে। টলমলে চোখ তুলে তাকায় না মেয়েটা। নিজের সাথে যুঝতে থাকা আহমাদ এক পর্যায়ে মাহিবার আধ শুকনো চুলে হাত রাখে। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে তাতে অনুশোচনার অপাংক্তেয় সুধা ঢেলে দেয়।
- মাহিবা।
মাথা উঠায় না মেয়েটা। আরো একটু গুটিয়ে যায়। সেই তালে আরো একটু এগিয়ে এসে দূরত্ব ঘোচায় আহমাদ। মাথা থেকে হাত কাধে নামিয়ে নরম কণ্ঠে বলে,
- তাকাবেন না মাহিবা?
কৃষ্ণাভ কক্ষে, ভার হওয়া মাথা তুলে লালাভ আঁখিদ্বয় আহমাদের পানে নিক্ষেপ করে মাহিবা। বুকটা কেঁপে ওঠে আহমাদের। তৎক্ষণাৎ বিনীত কণ্ঠে বলে,
- সরি মাহিবা! আ'ম রিয়েলি সরি। আমি.. আমি আসলে ওই লেখাগুলো দেখে উল্টোপাল্টা ভেবে ফেলেছিলাম। আর... আর.. আমাকে ক্ষমা করে দিন প্লিজ!
ডুকরে কেঁদে ওঠে মাহিবা। কান্না ভাঙ্গা স্বরে বলে,
- আমি দুশ্চরিত্রা নই! আমি.. আপনি আমার জীবনে প্রথম পুরুষ। বিশ্বাস করুন, আপনার আগে আমার জীবনে কেউ ছিলো না। কেউ না। আমি সত্যি বলছি।
মেয়েটার কাছে যায় আহমাদ। পাশে থেকে বলে,
- আমি বিশ্বাস করছি। আপনি কাদবেন না প্লিজ!
থামে না মাহিবা। কান্নার মাঝে ভেসে ওঠে ইশিকার মায়াবী মুখশ্রী। আহমাদের কথাকে অগ্রাহ্য করে বলে,
- ও ইশিকা। ইশিকা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমরা ক্লাস টু থেকে বান্ধবী জানেন! ও আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ছিলো। এখনও আছে। দুই বছর আগে, পাঁচ নভেম্বরে..
গলা বুঁজে আসে, কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। থামে না মাহিবা। গলায় দলা পাকিয়ে থাকা কান্নাগুলো কি ভীষণ পীড়া দিচ্ছে। আর্তনাদ করে বুকটাকে হালকা করতে চায় মেয়েটা।
- পাঁচ নভেম্বরে আমরা একসাথে কোচিংয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তা পার হওয়ার সময় আমি একটা গাড়ির মুখে চলে গেছিলাম আমাকে ঠেলে দিতে যেয়ে ও নিজেই গাড়ির সামনে পড়ে গেছিলো।
হু হু করে কেঁদে ওঠে মাহিবা। আহমাদ দিশেহারা বোধ করে। কিভাবে স্বান্তনা দিবে মেয়েটাকে? অনভ্যস্ত হাতে মেয়েটার মাথা বুকে চেপে ধরে। ঘাড়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।
- হয়েছে মাহিবা। আর কাদেনা।
স্বান্তনার বটবৃক্ষ পেয়ে সেটা আকড়ে ধরে মাহিবা। প্রথম আলিঙ্গনের সুপ্ত অনুভূতি ভুলে বলতে থাকে,
- ও ও আমাকে বাঁচাতে যেয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে গেলো। আমি কিভাবে বাঁচবো ওকে ছাড়া? ওর মতো আমাকে কেউ বোঝে না! কেউ না! ও আমাকে ছেড়ে কিভাবে চলে গেলো? ও....
আর বলতে পারে না মাহিবা। জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। মুখ নামিয়ে মেয়েটার চেহারা দেখতেই ভয় পেয়ে যায় আহমাদ।
- মাহিবা! কি হলো!
বুকে হাত দিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে মাহিবা। মুখ খুলে বুক ডলতে থাকে। কষ্টে এদিক ওদিক করতে যেয়ে খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিলের উপরে থাকা ফুলদানিতে হাত লেগে সেটা সজোরে পড়ে যায়। টুকরো টুকরো হয়ে যায় দৃষ্টিনন্দন শোপিসটা। মাহিবার এমন আচরণে ভয় জেঁকে ধরে আহমাদকে।
- কি হচ্ছে মাহিবা? শ্বাসকষ্ট হচ্ছে? কি করবো আমি! ইনহেলার! ইনহেলার আছে আপনার?
আহমাদের বাহুবন্ধনে থাকা মাহিবা খুব কষ্টে মাথা নাড়ায়। ইশারায় নিজেকে হ্যান্ডব্যাগ নির্দেশ করে। তৎক্ষণাৎ হাঁক ছাড়ে আহমাদ,
- মা! মা!
চিন্তিত সালেহা বেগম সজাগ ছিলেন। বিয়ের পরদিনই কি এমন হয়ে গেলো ছেলেমেয়ে দুটোর মাঝে না শুনতে পারছেন না সইতে পারছেন। সেই ক্ষণে আহমাদের ডাকে চমকে উঠে ছুটে যান। বারান্দার খেলতে থাকা আয়িশা নিজের পুতুলগুলো ফেলে রেখে ছুট দেয়। আফিয়ার কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত করে আহমাদের বাহুতে লুটিয়ে পড়া মাহিবার নীলচে মুখ দেখে আঁতকে ওঠেন সালেহা বেগম।
- কি হলো মেয়েটার? আল্লাহ!
- ওনাকে ধরে রাখো মা।
ছুটে যেয়ে মাহিবার হ্যান্ডব্যাগ তল্লাশি করে ইনহেলার নিয়ে ফিরে আসে আহমাদ।
মায়ের হাত থেকে খুব সাবধানে মাহিবাকে নিজের নিকটে নিয়ে এসে ইনহেলার মুখে প্রবেশ করায়। শ্বাস নিতে পেরে আস্তে আস্তে শান্ত হয় মাহিবা। আশপাশ ভুলে মেয়েটাকে বুকে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড়ায় আহমাদ।
- আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!
সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের আদলে চোখ বোলান সালেহা বেগম। তার না বলা কথাটা ছোট্ট মেয়েটা বলে ফেলে,
- ভাবিমণিকে তুমি কি করেছো দাদাভাই?
বোনের কথায় চোখ খুলে তাকায় আহমাদ। মাহিবাকে বুক থেকে সরাতে গেলে খেয়াল করে মেয়েটা দূর্বল হয়ে গিয়েছে। প্রায় ঘুম ঘুম। মায়ের সামনে মাহিবাকে এভাবে রাখতে অস্বস্তি কাজ করলেও খানিক আগের দৃশ্য মনে করে আর সরায় না তাকে।
- কথা বলছিস না কেন? ওর এমন অবস্থা হলো কি করে?
সালেহা বেগম ধমকে চোখ মেলে চায় মাহিবা। অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে থেমে থেমে বলে,
- কালকে আমার বান্ধবীর মৃত্যুবার্ষিকী মা। ওর কথা মনে করে কেঁদেছিলাম। তাই এমন হয়েছে।
নিভু নিভু চোখে চেয়ে থাকা মেয়েটার ঘর্মাক্ত আদলে দৃষ্টিপাত করে আহমাদ। মনে মনে কৃতজ্ঞতা বোধ করে মায়ের সামনে পরিস্থিতি সামলানোর কারণে।
মাহিবার কাছে যেয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন সালেহা বেগম।
- একটু রেস্ট নে মা। ঘুমা একটু।
স্নেহের পরশ পেয়ে চোখ বুজে ফেলে মাহিবা। বন্ধ চোখের কোল ঘেঁষে বেয়ে পড়ে টুকরো অশ্রু। নরম কণ্ঠ শুনতে পায়।
- ঐ ঘরে চলুন। হাঁটতে পারবেন?
মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই আহমাদ খুব যত্নে ধরে ওঠায় মাহিবাকে। আরেকপাশে আয়িশা ছোট্ট হাতে আঁকড়ে ধরে মাহিবার আরেক হাত। ঘরের সামনে পৌঁছাতেই মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে নেন সালেহা বেগম। চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলেন। খুব সাবধানে মাহিবাকে বিছানায় শুইয়ে দেয় আহমাদ। মাথায় হাত বুলিয়ে নরম কণ্ঠে বলে,
- ঘুমিয়ে পড়ুন।
ঘুমের দেশে পাড়ি জমায় মাহিবা। ক্লান্ত শরীর বেশি সময় নেয় না ঘুমে তলিয়ে যেতে। নিদ্রার গভীরে গেলে চোখের কোল ঘেঁষে অশ্রুর সাথে মুখ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে,
- ইশিকা ইশিকা....
ব্যাথাতুর সে মুখশ্রীর দিকে অনিমেষ চেয়ে রয় আহমাদ।
________________
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর মাহিবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হয় আহমাদ। উদ্দেশ্য "মায়াবাড়ি"।
সেই মুহূর্তে বাড়িতে প্রবেশ করিয়ে আফিয়া। নিজ ঘরে প্রবেশ করে চিৎকার করে ওঠে মেয়েটা।
চলমান.
(কেউ কেউ প্রতিদিন গল্প দেওয়ার আবদার করছেন। সবার কি একমত নাকি👀)