প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩২
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩২ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩২
অসুস্থতা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেনি। প্রেশারের সমস্যার কারণে কয়েকদিন থেকেই মালা বেগমের শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। ঘটনা হাসপাতালে যেয়েই থামলো তবে। মাহিবা যতক্ষনে পৌঁছেছে ডাক্তার ততক্ষণে ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছেন। কিছু ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে কয়েকটা দিন বিশ্রাম করার নির্দেশ দিয়েছেন। সকল কার্যাদি শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে গেলো অনেকটাই। কোনো অপেক্ষা নেই, তাড়া নেই। তবে কোন এক অজানা অস্থিরতার জন্য বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে মাহিবা। অস্থিরতা কি অজানা? আসলেই অজানা?
ঘর বাড়ির অবস্থা দেখে মাহিবার মনে হলো এখানে কোনো নারীর বাস নেই। বাবা ভাই দুজন মিলে বাড়ির যাচ্ছেতাই অবস্থা বানিয়ে রেখেছে। দুর্বল শরীর নিয়ে মা সেসবে হাত লাগাতে পারেন নি। কোনো রকম হাত মুখ ধুয়েই রান্না বান্নার কাজে লেগে পড়লো সে। অবস্থা যেমনই হোক, পেটকে আগে ঠান্ডা রাখা চাই। ভাত বসিয়ে দ্রুত হাতে দুই পদের তরকারি রান্না করে ফেললো। মাঝে মাঝে হাঁচি আসছে। লক্ষণ ভালো না। বুকটা ক্রমেই ভারী হয়ে আসছে। সবাইকে খাইয়ে মালা বেগমের ঔষধ হাতে নিলো মাহিবা। মহিলাকে ঔষধ খাইয়ে নিজে খেতে গেলো। প্লেটে ভাত নিতে গেলেই মনের ক্যানভাসে অদৃশ্য রং তুলির আঁচড়ে ব্যক্তিগত পুরুষের চিত্র অঙ্কিত হয়ে গেলো। লোকটা কি খেয়েছে? কে জানে! রাগ করে তো বের হয়ে গেলো। কোথায় আছে সেটাও জানে না। আর খেতে ইচ্ছে করলো না মেয়েটার। ক্ষুধা যেনো মারা গেছে। মুখেও কেমন তিতকুটে স্বাদ লাগছে। কোনরকম সব গুছিয়ে নিজের ঘরে গেলো। সালেহা বেগম মনে করে ইনহেলারটা দিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা সামনে রেখে নিজের ব্যাগ থেকে বিশেষ একটা পোশাক বের করলো। কতক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজ পোশাকের বদলে সেটা গায়ে জড়ালো। বিছানায় শুয়ে কাঁথা দিয়ে অর্ধেক শরীর ঢেকে একটা বালিশ মুখে চাপা দিলো। খুব করে চেষ্টা করলো একটু ঘুমাতে। একটু বিশ্রাম দরকার।
•• •• ••
আহমাদের কণ্ঠে হতাশা ছিলো নাকি অন্য কিছু ঠাহর করতে পারে না ইফাদ। তড়িৎ বলে,
- ভালো হইসে। ঐ শালা ব্যাটারির কাজ করা লাগবে না।
- ভালো খারাপের কথা না। কথা হইলো আমি এখন বেকার।
দুশ্চিন্তার কথা। ভাবতে বসলো ইফাদ। কি করা যায়? নিজের চিন্তাকে চাপা দিয়ে ঝরঝরে কণ্ঠে বললো,
- আচ্ছা! এই টপিক আপাতত বাদ দে। আল্লাহ চাইলে কাজ হবে। তুই এখন ভাবির সাথে একটা মিটমাট কর।
ভাবনার মোড় ঘুরে যায় আহমাদের। তাইতো! মাহিবার কথা তো মাথাতেই আসে নি!
- তাইলে বাসায় যাই।
- হ! চল যাইগা।
- ভালো কথা! তামিম শেয়ার কিনছে?
- এখনও না। কিন্তু ওর আগ্রহ আছে। খোঁজ খবর করতেসিলো। মনে হয় কিনবে অতি শীঘ্রই।
- আর ইশিকা? ওর বাবা মার কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে?
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসে ইফাদ। কিন্তু সাধারণ ভাবেই একট গভীর, অর্থবহ কথা বলে ফেলে ছেলেটা,
- যে হারায় তারে খোঁজা যায়। যে ইচ্ছা করে লুকায় থাকে তারে কেমনে পাই বল?
অন্যমনস্ক হয়ে যায় আহমাদ। মেয়েটা তাহলে এতিম হয়ে গেলো?
বাড়ি ফিরে ব্যস্ত হাতে কলিংবেল চাপে আহমাদ। মাগরিব পেরিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। মাহিবা কি করছে কে জানে? প্রতিদিন তো তার অপেক্ষায় থাকে। আজ থাকবে? নিজের ভাবনায় বিরক্ত হলো আহমাদ। জানা কথা! মেয়েটা কেনো ওর অপেক্ষায় থাকবে। সে রাগ করবে, ঝগড়াও করতে পারে। প্রস্তুতি নেয় আহমাদ। মাহিবাকে মানানোর কৌশল ভাবতে থাকে। সেই ক্ষণে দরজা খুলে দেন সালেহা বেগম। বহুদিন পর দরজার ওপাশে মাকে দেখে যেমন অবাক হয় তেমনই হতাশ হয় আহমাদ। মেয়েটা এতো রেগে আছে? দরজাটাও খুলতে এলো না!
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সালাম দিয়ে চলে যেতে গেলেই সালেহা বেগমের প্রশ্নের মুখোমুখি হয় সে,
- কি রে? সকালে এগুলো পড়ে গেছিলি নাকি?
সালেহা বেগমের দৃষ্টি আহমাদের পরনের পোশাকের দিকে। ইতস্তত করে আহমাদ বলে,
- মায়াবাড়ি গিয়েছিলাম। বৃষ্টির ভিতরে ভিজে গেছিলাম তাই ইফাদের জামা কাপড় পড়ে আসলাম।
- ওহ! তা তোর ফোন কই? মানুষ মরে গেলেও তো খবর দেওয়ার উপায় নেই।
সালেহা বেগমের কণ্ঠে স্পষ্ট ক্রোধ। সংকুচিত হয়ে যায় আহমাদ।
- পানিতে ভিজে বন্ধ হয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে নাকি জানি..
- কি সুন্দর! সবাই নিজের মন মর্জি মতো চলছে! ভালো! খুব ভালো!
মায়ের উত্তপ্ত মেজাজের কারণটা ধরতে পারে না আহমাদ। হঠাৎ এমন রেগে গেছে কেনো? তার ভাবনার মাঝেই ফোন কলের শব্দে ঘরে চলে যান সালেহা বেগম। এদিক সেদিক তাকিয়ে মাহিবাকে পায় না আহমাদ। মেয়েটা গেলো কোথায়?
নিজ ঘরে গেলেও সেখানে খুঁজে পায় অন্ধকারের রাজত্ব। বাতি জ্বললে দেখতে পায় প্রতিদিনের গোছানো ঘরের অগোছালো রূপ। ঘরের আকর্ষণ নেই। মাহিবাই তো এই ঘরের প্রধান আকর্ষণ! বারান্দায় খুঁজেও না পেলে ভয় পেয়ে যায় আহমাদ। মনে ভয় বাসা বাঁধে। মাহিবা চলে যায়নি তো?
অগোছালো অনুভূতি নিয়ে মায়ের ঘরের সামনে আসে সে। ঢোকার আগেই উচ্চ কণ্ঠে ডেকে প্রশ্ন করে,
- মা! মা! মাহিবা কোথায়?
কানে ফোন নিয়েই সালেহা বেগম ইশারা করেন আস্তে কথা বলতে। অস্থির আহমাদ পড়তে থাকা আয়িশার কাছে বলে,
- এই তোর ভাবিমণি কোথায় রে?
বই থেকে মুখ উঠিয়ে নিষ্পাপ কণ্ঠে আয়িশা বলে,
- ভাবিমণি তো বাবার বাসায় গেছে।
স্তব্ধ হয়ে যায় আহমাদ। চোখের অস্থির নড়াচড়া থেমে যায় হঠাৎ করেই। বজ্রাহতের ন্যায় শোনে, "ভাবিমণি তো বাবার বাসায় গেছে"। সত্যিই মেয়েটা চলে গেলো? আর আসবে না? অদ্ভুত ভাবে ভয় পেয়ে যায় আহমাদ। কিসের ভয় সে জানেনা। জানতে চায় না। শুধু জানে মাহিবার থেকে ক্ষমা চাইতে হবে। খুব দেরি হওয়ার আগেই মেয়েটাকে ফরযে নিয়ে আসতে হবে।
- এই আহমাদ!
সালেহা বেগমের উচ্চ কণ্ঠে হুশে আসে আহমাদ। অভিব্যক্তিহীন চোখে তাকায় মায়ের দিকে।
- মাহিবার মা খুব অসুস্থ। আজকে সকালে ভাই সাহেব ফোন দিয়েছিলেন। ঐ জন্যেই মেয়েটাকে নিয়ে গেলেন।
- উনি মানে বাবা এসেছিলেন?
আহমাদের উৎকণ্ঠিত স্বর।
- না। মাহিদ এসে নিয়ে গেলো। তোর কাছে কতোবার ফোন করলো মেয়েটা। তোর সেই আক্কেল থাকলে তো! যা ওর সাথে একবার কথা বল।
আহমাদ ভুলে গেলো তার চাকরি নেই। আয় করার উৎস নেই। পরিবারের দায়িত্ব পালন করার মাধ্যম নেই। মাহিবা তাকে ফোন করেছিলো এটুকু শুনেই অন্তরে অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করলো আহমাদ। প্রশান্তির ধরণটা নির্মল। খুব শান্ত, সুন্দর।
ঘটনা কোনরকম শুনেই নিজের ঘরের দিকে ছুটলো সে। ভালো করে হাতমুখ ধুয়ে সজীব হওয়ার চেষ্টা করলো। মাহিবা তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলো। এটুকু কথা যে কি আনন্দ, কি আশা তাকে দিয়েছে সে কিভাবে বোঝাবে! জামাকাপড় পাল্টে ছুটলো সদর দরজার দিকে। সালেহা বেগম দেখে পথ রোধ করলেন।
- এখন আবার কই যাচ্ছিস?
- মাহিবার সাথে একটু দেখা করতে হবে। ওদের ওখানে কি অবস্থা কে জানে? একটু যাওয়া দরকার না?
- তা ঠিক। যাচ্ছিস যখন দুই একটা জামা কাপড় নিয়ে যা। দুই একদিন থাকতে হলে থেকে আসবি। অফিস নাহয় ওখান থেকেই করলি? কি বলিস?
- আচ্ছা।
বুদ্ধি ভালো লাগলেও শেষ কথায় ভাবুক হয়ে যায় আহমাদ। তার যে আর কোনো অফিস নেই মাকে কিভাবে জানাবে! গোছগাছ করে রওনা দেয় শ্বশুর বাড়ির পথে। সালেহা বেগমও সমর্থন করেন। মাহিবার কোনো বড়ো ভাই নেই। মাহিদ ছোটো। এখন আহমাদের দায়িত্ব ঐ পরিবারের পাশে থাকা। ছেলেটা নিজের দায়িত্ব পালন করুক।
•• •• ••
মাহিবাকে ছাড়া এই প্রথম শ্বশুর বাড়িতে। তবে আসাই তো হয়েছে মোটে একবার! কিছু নিতে হবে নাকি সেই দ্বিধা দ্বন্দ্বে অনেকটা সময় কাটায় আহমাদ। শেষমেষ ভাবে রোগী দেখতে গেলে তো অন্তত ফলমূল নিতে হয়। সেটুকুই নাহয় নেওয়া যাক। নিজ বুদ্ধিতে কয়েক প্রকার ফল কিনে শ্বশুর বাড়িতে কড়া নাড়ে। দরজা খোলে মাহিদ। তাকে দেখেই ঝকঝকে এক হাসি দিয়ে বলে,
- আরে দুলাভাই! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু!
টেনে টেনে লম্বা করে সালাম দেয় মাহিদ। শুনেই আহমাদের মনে হয় ছেলেটা কোনো ফন্দি করছে তাকে ফাঁসানোর জন্য। জোর করে হেসে সালামের উত্তর নেয়। কিছু বলার আগেই ভিতরে প্রবেশ করে। ভিতরে ভিতরে সে উত্তেজিত, উৎকণ্ঠিত। মাহিবা কোথায়?
আহমাদকে আশেপাশে চোখ বুলাতে দেখে দুষ্টু হাসে মাহিদ। কাছে এসে হাতের ব্যাগ নিয়ে বলে,
- কি এনেছেন দুলাভাই? দেখি তো!
হঠাৎ ব্যাগে টান দেওয়ায় ভড়কে যায় আহমাদ। তখনই মাহিদ কাঁদো কাঁদো সুরে বলে,
- আমার চকলেট কই দুলাভাই?
থতমত খায় আহমাদ। ছেলেটা আস্ত একটা পাজি। চকলেট না ছাই! সব আহমাদকে জ্বালাতন করার ধান্দা! আহমাদ বোঝে না মনে করেছে? সে সবই বোঝে। বেচারা শুধু কিছু বলতে পারে না।
ইতস্তত করে আহমাদ বলে,
- পরেরবার আনবো ইনশাআল্লহ। মা কোথায়? চলো দেখা করে আসি।
মালা বেগম ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠেছেন। শ্বশুর শাশুড়ির সাথে কুশল বিনিময় করেও হতাশ হয় আহমাদ। মাহিবা এখানেও নেই। আযানের সুর ভেসে এলে কথা সংক্ষেপ করে সকলে। শ্বশুরের আহ্বানে মসজিদে যেতে হয়। আশ্চর্য! মেয়েটার সাথে দেখাই হচ্ছে না!
নামাজ সেড়ে আসার পর শাশুড়ি জানান ঔষধ খাওয়ার জন্য তিনি আগে আগে খেয়ে নিয়েছেন। আহমাদ যেনো অবশ্যই খেয়ে নেন সে বিষয়ে জোর দেন। পাশাপাশি মাহিবাকে ডেকে তুলতে বলেন। মেয়েটা সেই যে ঘুমিয়েছে আর ওঠার নাম গন্ধ নেই। এতক্ষণে মাহিবার কথা ওঠায় স্বস্তি পায় আহমাদ। বুক ভরে দম নিয়ে মাহিবার ঘরের নবে মোচড় দেয়। সাথে সাথে অন্ধকারে তলিয়ে যায় দৃষ্টি। হাতড়ে হাতড়ে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দেয়। দরজা আটকে পেছন ঘুরতেই থমকে যায়। শার্ট পড়ে কেউ একজন শুয়ে আছে। অর্ধেক শরীর কাঁথার নিচে, মাথা বালিশে ঢাকা। ফিরে যেতে গিয়েও এগিয়ে যায় আহমাদ। এটা তো মাহিবারই ঘর। অন্য কেউ থাকার প্রশ্নই আসে না! শুয়ে থাকা মানুষটার অনেকটা কাছে গেলে সূক্ষ্ম একট জিনিস তার নজরে পড়ে। তাতেই চমকে ওঠে সে। সাদা রঙের শার্টের কলার ওঠানো, ভাঁজ করা হয়নি সেটা। সেই কলারের মাঝ বরাবর লাল একটা দাগ, খুবই ছোটো। কিন্তু আহমাদের চোখ এড়ায় না। কারণ এটা তো তারই শার্ট। আস্তে করে বিছানায় বসে মুখ থেকে বালিশ সরিয়ে দিতেই মাহিবার কোমল মুখশ্রী চোখের পাতায় ধরা পড়ে। অপলক তাকিয়ে থাকে আহমাদ। কাত হয়ে শুয়ে থাকা মাহিবার বাম গালে হাত নিয়ে যায়। এখানেই আঘাত করেছিলো না সে? জায়গাটা একটু ফুলে গেছে। অপরাধ বোধে ছেয়ে যায় আহমাদের মন। কতোটা ব্যাথাই না পেয়েছে মেয়েটা। যতোটা না শারীরিক তার চেয়েও বেশি মানসিক। গালে হাত বুলাতেই বুঝতে পারে শরীর অনেকটা গরম। কপালে গলায় হাত দিলে জ্বরের আক্রমন বোধগম্য হয়। মেয়েটার জ্বর এলো কিভাবে? নত কণ্ঠে, কোমল সুরে ডাকে,
- মাহি!
- মাহি? ওঠো?
বেশ কয়েকবার ডাকার পর পিটপিট করে চোখ খোলে মাহিবা। সামনে ঝুঁকে থাকা আহমাদের গালে নিজের জ্বরতপ্ত হাত ছুঁইয়ে বলে,
- আপনি আজকেও আমার স্বপ্নে এসেছেন? কেনো এসেছেন? আজকে আপনাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখবো না।
কণ্ঠস্বর ভাঙ্গা ভাঙ্গা। কথা বলতেও থেমে থেমে শ্বাস নিতে হচ্ছে। জ্বরতপ্ত হাতের ছোঁয়ায় কেঁপে ওঠে আহমাদ। ভাঙ্গা ভাঙ্গা অভিমানী কণ্ঠের বিপরীতে বলে,
- কেনো? আজ আমি কি করেছি?
- জানেন না? আমাকে মে/রেছেন। কেনো মে/রেছেন? আমি ব্যাথা পাইনি মনে হয়? এই দেখুন গাল লাল হয়ে গেছে।
কথা বলতে বলতেই আঘাত প্রাপ্ত স্থান দেখায় মাহিবা। মুখ ঘুরিয়ে নালিশ করতে থাকা সেই আদলে চেয়ে আহমাদ আরো অনুশোচনায় ভোগে। দুই হাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে নিয়ে বসায় আহমাদ। ভীষণ কোমল সুরে বলে,
- আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি মাহি! আমাকে ক্ষমা করবে না?
মাহিবা উত্তর করে না। তার চোখ বুজে আসছে। আস্তে করে মেয়েটাকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে যায় আহমাদ। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আধো ঘুম, আধো জাগরণ, জ্বরের প্রভাব সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ঘোরে ছিলো মাহিবা। চোখে মুখে পানির অস্তিত্বে সেটা হ্রাস পেতে শুরু করে। পুরোপুরি ধ্যান ফিরলে চোখ মেলে সরাসরি আয়নায় তাকায়। নিজের একদম পাশেই অতি পরিচিত পুরুষ চেহারাটা দেখে চমকে যায় মেয়েটা। হুট করে দূরে সরে যেতে চাইলে দেখে সে আহমাদের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ। লোকটা তার একদম সামনে। আসলেই?
- আপনি! আপনি সত্যিই এখানে?
বেশ স্বাভাবিক মাহিবার স্বর। এতক্ষণের জড়ানো ভাবটা নেই। মেয়েটা কি চমকে গেছে? হাসে আহমাদ।
- হ্যাঁ! সত্যিই আমি এখানে!
দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে আশেপাশে তাকায় মাহিবা। এতক্ষণের কথোপকোথন পুরোটাই তার মনে আছে। সেটা স্বপ্ন ছিলো না? লোকটা আসলেই এখানে ছিলো? লজ্জা পায় মেয়েটা। দৃষ্টি মেলাতে চায় না। মাহিবাকে নিয়ে ঘরে আসে আহমাদ। বিছানায় নিজের কাছে বসিয়ে ডাকে,
- মাহি!
নরম সুর, নতুন সম্বোধন! চমকে যায় মাহিবা। বিস্মিত দৃষ্টি অবচেতন মনেই চলে যায় আহমাদের আদলে।
কুসুম কোমল কণ্ঠে আহমাদ বলে,
- আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি মাহি। ভীষণ জঘন্য একটা কাজ করে ফেলেছি। নিজের অজান্তেই। কিন্তু যেভাবেই হোক করেছি। কাজটা করা আমার একদমই উচিৎ হয়নি। তোমার কোনো দোষই ছিলো না। সব দোষ আমার। আমাকে কি ক্ষমা করবে না মাহি?
আবার সেই ডাক। সেই হৃদয়গ্রাহী সুর, অসাধারণ মায়া মাখা সেই সম্বোধন অগ্রাহ্য করার শক্তি পায় না মাহিবা। আজ পর্যন্ত কেউ তো এভাবে ডাকেনি। কেউ না!
- আই অ্যাম রিয়েলি সরি মাহি! ক্ষমা করে দাও প্লিজ। আর এমন হবে না ইনশাআল্লহ।
চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছে মাহিবা। আহমাদ এই পর্যন্ত তার সাথে একবারে এতো কথা বলেছে কখনো? মনে পড়ে না মেয়েটার। খোলা চোখে জল জমে আসে। নীরবতায় ভয় পায় আহমাদ।
- ক্ষমা করবে না মাহি?
শ্বাস আটকে আসতে চায় মাহিবা। লোকটা "মাহি" ডেকে তাকে বাজে ভাবে জড়িয়ে ফেলছে। কি করুণ স্বরে ডেকে চলেছে। উফফফ!
বুজে আসা কণ্ঠ দিয়ে কথা আসে না। মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে ইতিবাচক উত্তর দেয়।
অস্থির আহমাদ মাহিবার হাত ঝাঁকিয়ে বলে,
- কথা বলো মাহি!
- করেছি। ক্ষ.. ক্ষমা করেছি।
- সত্যি?
উৎফুল্ল আহমাদ। সেই উচ্ছ্বসিত আদলে তাকায় মাহিবা। ছেলেটা আনন্দে উষ্ণ পরশ দেয় আঘাত দেওয়া স্থানে। পরপরই বলে,
- আমি আর এমন করবো না মাহি! কখনো না!
চলমান.