প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১৯

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১৯ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১৯

হাত মুখ ধুয়ে নিজেকে বেশ ঝরঝরে লাগে মাহিবার কাছে। ডান হাতে মুখের পানিটা ঝেড়ে বাম হাত সিটকিনিতে দেয়। দরজা খুলে মুখ থেকে হাত নামাতেই চমকে ওঠে মেয়েটা। হিমেল ওয়াশরুমের দরজার দিকে পেছন ঘুরে বসে আছে। বিছানায় উপবিষ্ট ব্যক্তিকে না চিনলেও এটা যে আহমাদ নয় সেটা মস্তিষ্ক বুঝতে সময় নেয় সেকেন্ড খানেক। সাথে সাথেই দুম করে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে সেথায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। এক্ষুনি এটা অঘটন ঘটে যাচ্ছিলো! কিন্তু ছেলেটা এখানে কেনো!

দরজার শব্দ পেতেই পেছন ঘুরে তাকায় হিমেল। একটু আগে স্পষ্ট পানির আওয়াজ শুনেছে সে। এখন আবার তাহলে দরজা বন্ধ করলো কেনো? বের হবে না নাকি! আর কতক্ষণ বসে থাকবে সে! অধৈর্য্য হয়ে দরজার সম্মুখে যায় ছেলেটা। ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,

- কতক্ষণ লাগে বের হতে? তাড়াতাড়ি করো না!

ভ্রু জোড়া জড়ো হয়ে কপালের মাঝে এক ছোট্ট এক বিভাজন সৃষ্টি করে। এমন কথার মানে কি? ছেলেটা কি মাহিবার জন্য অপেক্ষা করছে? কিন্তু কেনো!

অধৈর্য্য হিমেল আর বসেনা। ঘুরতে থাকে পুরো ঘর জুড়ে। একসময় বিছানার এক প্রান্তে চোখ যেতেই কৌতূহল সৃষ্টি হয়। বোরখাটা হাতে তুলে নিয়ে খুব সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে। তার কৌতূহল নিবারণে বাঁধ সাধে এক গমগমে আওয়াজ।

- এখানে কি?

আহমাদের দৃষ্টি হিমেলের হাতে ধরে থাকা বোরখার দিকে। না আছে কোনো রাগ, না আছে কোনো জিজ্ঞাসা। শান্ত, শীতল সে দৃষ্টি। ঝড়ের পূর্বের শীতলতা নিতে পারেনা হিমেল। সন্তর্পনে বোরখাটা রেখে দেয় তার জন্য নির্ধারিত স্থানে। লোকটাকে সে কেমন যেনো ভয় পায়। তাকে যে কখনও বকেছে এমনও না। কিন্তু এ বাড়ির মানুষের মুখে শুনেছে এই ছেলে নাকি খুব একগুঁয়ে। আবার কোনোদিন হাসতে দেখেছে কি না সন্দেহ। কেমন যেনো গম্ভীর গম্ভীর ভাব!

- এখানে কি চাই?

আবার সেই আওয়াজ! ধ্যান ভাঙ্গে হিমেলের। ছোটো করে বলে,

- আম্মু।

- তিনি এখানে নেই। যেখানে গেলে তাকে পাওয়া যাবে সেখানে যাও।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় হিমেল। এখানে এলেই তার মা ঘাঁটি গাঁড়ে এ ঘরে। যেনো হেনার থেকে তার শাশুড়ির প্রতি মহিলার টান বেশি। চিরাচরিত সে ঘটনার সূত্র ধরেই মা কে এ ঘরে খুঁজতে এসেছে। জানে এখানে এলেই পাওয়া যাবে।

- কি বলছি বুঝতে পারছো না?

আহমাদের কণ্ঠে কি একটুখানি রাগের আভাস পাওয়া গেলো? বুঝলো না হিমেল। এই লোকের সামনে আর বেশিক্ষণ দাঁড়াতেও চায় না সে। কখন আবার এক ধমক দিয়ে বসে। কোনো নিশ্চয়তা নেই, দিতেও পারে। ইতঃস্তত কণ্ঠে বলে,

- আম্মু ওয়াশরুমে। একটু কথা বলেই চলে যাচ্ছি।

- তোমার আম্মু তোমার বোনের ঘরে।

পাল্টা আওয়াজে আহমাদের মুখের দিকে তাকায় হিমেল।

- তাহলে এখানে কে?

- সেটা তোমার না জানলেও চলবে।

পরপরই হিমেলের দিকে তাকিয়ে দরজার দিকে দৃষ্টি দেয় আহমাদ। যেনো নীরব নির্দেশ, "বের হও!" সেটা বোধয় ধরতে পারে হিমেল। সুড়সুড় করে বেরিয়ে যায়। বাইরে যেয়ে দম ফেলতেই যেনো বাঁচে। উফ! বাঘের গুহা! সেই ক্ষণে কেঁপে ওঠে দরজা লাগানোর শব্দে। লোকটার রাগ হয়েছে নিশ্চিত। তো সেটা বেচারা দরজার উপর দেখতে হবে কেনো? দরজার দিকে এক অসহায় দৃষ্টি দিয়ে যেনো তার দুঃখ বোঝার চেষ্টা করে হিমেল। "আহা বেচারা! কষ্ট পেওনা! এ জগৎ বড়োই নিষ্ঠুর। দুর্বলদের উপর তার যতো শক্তির খেলা।" স্বান্তনা বাণী আওড়াতে আওড়াতে বোনের ঘরের দিকে যায়। পর্দা সরাতেই দেখতে পায় এ ঘরের দরজাও বন্ধ। এ বাড়িতে কি দরজা লাগানোর প্রতিযোগিতা চলছে নাকি! আজব তো!

• • •

দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে ছিলো মাহিবা। ছেলেটা যায় নাকি সেটা বোঝার জন্যেই এত কসরত। সেই সংকটময় মুহূর্তে আহমাদের ভারী কণ্ঠের গম্ভীর আওয়াজটা যেনো তার কাঠ হয়ে যাওয়া শুষ্ক গলায় পানি আনে। কিন্তু লোকটার কণ্ঠ যেনো একটু বেশিই ভারী লাগে! দুজনের কথায় বুঝতে পারে ওটা হেনার ভাই এবং সে মায়ের ঘরে এদিকে এসেছে। তখনই মাহিবার খেয়াল হয় আয়িশা যাওয়ার পর সে দরজা লাগায় নি। নিজ ভুল খেয়াল হতেই নিজেকে কষে দুটো থাপ্পড় লাগাতে মন চায়। কল্প দৃশ্যে সে কাজ সমাধা করে দোর লাগানোর আওয়াজে মন শান্ত করে। বড়ো বড়ো দুটো দম নিয়ে দরজা খুলে উকি দেয়। আহমাদ বিছানায় বসে আছে। আস্তে করে বের হয়ে আহমাদের সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। ধীর কণ্ঠে সালাম জানায়।

আহমাদ সেভাবেই বসে আছে। হাতে তার ফোন। মনোযোগ সেদিকেই। মাহিবা বোঝে না লোকটা সালামের উত্তর নিয়েছে নাকি। অদ্ভুত জড়তার কারণে এর পর কোনো প্রশ্নও জিজ্ঞেস করতে পারে না। দৃষ্টি ফোনে নিবদ্ধ রেখেই আহমাদ বলে,

- নিজের দায়িত্ব নিজের উপর। নিজেকে নিরাপদে রাখার দায় আপনার। নিজ গণ্ডিতে আপনি যেমন কাউকে অনুমতি দেন না, সেই গণ্ডির দরজাও আপন দায়িত্বে বন্ধ করে দিতে হবে যেনো অনাহুত প্রবেশ সেখানে না হয়।

কোনো রাগ নেই, কোনো শ্লেষ নেই। কিন্তু অদ্ভুত কিছুর অস্তিত্ব সেই কণ্ঠ জুড়ে। না বলার কোনো জায়গা নেই, উপায়ও নেই। ইঙ্গিত বুঝতে কষ্ট হয় না মাহিবার। কোনরকম অজুহাতও সে দেখায় না। বাধ্য মেয়ের মতো নীরবে উপদেশ গ্রহণ করে।

স্ক্রিন লক করে ফোনটা পাশে রেখে আহমাদ। কথা বলতে বলতেই ঘাড় উচিয়ে তাকায়।

- মা বললো আপনি এখনও নাকি খাননি? কার অপেক্ষায় বসে...

ভারী কন্ঠটা রোধ হয়ে আসে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রানী গোলাপী শাড়ি পড়ে রানীর বেশে এক মেয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটাকে দেখতে রানীর মতোই লাগে আহমাদের কাছে। কার রানী? তার! অদ্ভুত ঘোরে আবদ্ধ হয়ে এতক্ষণের কাঠিন্যের খোলস যেনো ভেঙে যায়। কিন্তু এই কাঠিন্য তো দরকার ছিলো! অবশ্য দরকার ছিলো! সদর দরজা পার হয়ে এসেই সে দেখতে পায় সকলের খাওয়া শেষ। মায়ের সাথে কথা বলতেই তিনি জানান মাহিবার অভুক্ত থাকার কথা। মুখে মেকী রাগ দেখালেও অভ্যন্তরের প্রশান্তি সে টের পায়। তার অপেক্ষায় মা ব্যতীত কেউ বসে আছে! দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট এক নিমিষেই যেনো হওয়ায় উড়ে যায়! সেই মুখটুকু দেখতে লোভ জাগে। সকলের সাথে সৌজন্য আলাপ শেষ করতেই ঘরের পথ ধরে। মা নাকি মেয়েটাকে খালামণির ঘরে বসিয়েছে। সেদিক পানে যেতেই দেখা হয় হেনার মায়ের উদ্দেশ্যে। ভদ্র মহিলা কথা বলে মেয়ের ঘরে যান। উদ্দিষ্ট ঘরের খোলা দরজা দেখতেই আহমাদের ভ্রু গুটিয়ে চায়। আর ভেতরের দৃশ্য দেখতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি জেঁকে ধরে তাকে। মাহিবার বোরখা চিনতে একটুও সময় লাগে না ছেলেটার। সেটা কোনো পুরুষের হাতে দেখতেই যেনো চমক এবং রাগের মিশ্রণে তৈরি এক নতুন অনুভুতির শিকার হয় সে। হিমেলের সাথে কথা বলে মেয়েটাকে একটা কঠিন ধমক দেওয়ার ইচ্ছে জাগে। এতো বেখেয়ালি কেনো হবে সে! আশ্চর্য!

কিন্তু এই ক্ষণে মেয়েটার এই রূপ তার কণ্ঠরোধ করে। যেনো তার রাগান্বিত স্বরকে গলা টিপে হ"ত্যা"র প্রয়াস। গলা খাঁকারি দেয় ছেলেটা। কিন্তু শেষ কথাটা মাথায় ঘুরতেই নিজেকে শান্ত করতে পারে না।

- বসুন।

নিজের পাশে জায়গা দিয়ে বলে আহমাদ। মাহিবা চমকে যায় আহমাদের ভারী কণ্ঠস্বরে। তক্ষুনি আবার গমগমে সেই স্বরে ছেলেটা বলে,

- বাসায় যেয়েই এই বোরখা ধুয়ে দেবেন। আজকেই!

রাগের মাথায় নাকি মানুষের বোধ বুদ্ধি লোপ পায়? সেটাই মনে হয় মাহিবার। কিন্তু রাগটা কীসের জন্য? কৌতূহল হলেও জিজ্ঞেস করে না। আবার ধমক টমক দিলে!

•• •• ••

যাবার কালে এক চোট গল্পের আসর হয়ে যায়। শেফালী বেগমের কাজই যেনো কথায় কথায় মাহিবাকে খাটো করে দেখানো। বড়ো বোন বলে সালেহা বেগমও তেমন কিছু বলছেন না। কিন্তু আহমাদ যেনো এসব সহ্য করতে পারে না।

- হ্যাঁ রে আহমাদ! তোর বন্ধুরা বাড়ি এলে তো তোর বউ ঘরের দুয়োর আটকে বসে থাকবে। তখন তাদের রান্না বান্না কে করবে? তুই নাকি তোর মা?

মহিলার মিটিমিটি হাসির আড়াল স্পষ্ট তাচ্ছিল্য এবং খোঁচা। সালেহা বেগম বিরক্ত হন। এসব নিয়ে সবসময় কথা বলার মানে কি! তবে এটা যেনো আহমাদের ধৈর্য্যে শেষ মাত্রা যোগ করে। হাতে রাখা পায়েসের বাটির শেষ চামচ মুখে দেয়। ধীরে সুস্থে খেয়ে বলে,

- আমার বউ আমার বন্ধুদের সাথে গায়ে পড়ে কথা বলবে এটা আমার পছন্দ না। আমার বন্ধু শুধু আমারই বন্ধু। তারা যেমন আমার বউয়ের জন্যে বাইরের মানুষ তেমনি আমার বোনেদের জন্যেও। তাই সেসব মানুষদের আপ্যায়নের জন্যে তাদের সৌন্দর্যের পসরা খুলে বসতে হবে না। সমস্যা হলে ঘরের দুয়োর‌ যে কেউ দিতে পারে। আর বন্ধু যেহেতু আমার তাদের খাওয়ানোর দায়িত্বও আমার। তোমার এতো টেনশন না নিলেও চলবে খালামণি।

শেফালী বেগমের ঠোঁটের কুটিল হাসি মিলিয়ে গেলেও হাসি ফোঁটে সালেহা বেগমের ঠোঁটে। আবরণের আড়ালের আরেকটা হাসিমুখও অন্তরালে থেকে যায়।

- যতো যাই বল! তোর কিন্তু..

- আসি খালামণি। এখন বের না হলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে।

কথার পৃষ্ঠে এমন জবাব হয়তো আশা করেননি শেফালী বেগম। মুখটা তার দেখার মতো হয়। ছেলেটা বেশ ত্যাদোড় আছে। বড়ো ছোটো মানে না। উহ!

•• •• ••

সবার চোখে ঘুম নামলেও সে রাতে হিসেব মেলাতে ব্যস্ত আফিয়া। পুরো দিনের পর্যবেক্ষণে নিজেকে তার বড্ড গোলমেলে লাগে। এতদিনের চিন্তা চেতনায় যেনো কেউ কুঠারাঘাত করেছে। নিজ পর্যবেক্ষণই এই ছোট্ট জীবনে তার ভারী পড়ে।

চলমান.