প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১০

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১০ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১০

রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে সামনে তাকায় আহমাদ। আজ কতোটা দিন পরে এলো এখানে? এক মাস তো হবেই। উহ! জায়গাটাকে ভীষণভাবে মিস করেছে, সাথে সেই মানুষটাকেও। কাঠের তৈরি নেমপ্লেটে একবার চোখ বোলায় আহমাদ। খোদাই করে লেখা "মায়াবাড়ি"। পাশে তাকাতেই সত্তর ছুঁই ছুঁই বৃদ্ধ আজহার উদ্দিন মনোরম এক হাসি দেন।

- আসসালামু আলাইকুম বাজান! কি খবর তোমার? আমগো এতদিনে মনে পড়লো?

বৃদ্ধের পাশে রাখা খালি চেয়ারে বসে পড়ে আহমাদ। সালামের উত্তর নিয়ে বলে,

- আপনি আর এসব নাই বলেন চাচা! আপনার সাথে তো আমার কথা বলাই উচিৎ না। আমার অনুরোধ আপনি রাখলেন কই?

- রাগ করে না বাজান! এত্তোডি পোলাপান থুইয়া কেমনে দাওয়াতে যাইতাম কও তো? কিন্তু তোমার জইন্যে আমি আর তোমার চাচী মন ভইরা দোয়া কইরা দিসি।

- এখন কতো বাহানাই যে বের হবে আপনার আর তার!

আহমাদের দীর্ঘশ্বাসে স্নেহের হাসি হাসেন আজহার উদ্দিন। নিজের ছেলেদের মনে পরে খুব করে। যুবক ছেলেটার মাথাভর্তি চুলের মাঝে ভাঁজ পড়া হাত ডুবিয়ে প্রশ্ন করেন,

- দিনকাল ভালা যায় তো বাজান? নতুন মানুষ কেমন?

মাহিবার মুখটা চোখে ভাসতে অজান্তেই স্নিগ্ধ এক হাসি জায়গা করে নেয় আহমাদের ঠোঁটের কোণে। বৃদ্ধর কোটরে ঢুকে পড়া অভিজ্ঞ চোখ যেনো আর কিছু জানতে চাইলো না। প্রসন্ন হেসে উত্তর দিলো,

- ভালো থাকো বাজান! খুব সুখ্যে থাকো।

- ভেতরে যাই চাচা।

যেনো অনুমতি চাইলো। বৃদ্ধ লোকটা সায় জানাতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দু'পাল্লার বিরাট দরজার একটা প্রান্ত ঠেলে হালকা ফাঁকা করে ভেতরে ঢোকে আহমাদ। আজহার উদ্দিন এখন আকাশপানে চেয়ে চোখ মুছবেন। বেশ জানা আছে। কেনো যে ওইসব কুলাঙ্গারদের মনে করে কাঁদে!

ভেতরে ঢুকে একটা সদর দরজা পার হয় আহমাদ। জায়গাটা ফাঁকা। বান্দা কই? সদর দরজা পার হতেই বিশাল এক মাঠ নজরে আসে। মাঠের এক পাশে দুতলা দালান। অপর পাশে একইরকম কাঠামোর ভিন্ন রঙের আরেকটি দালান। দুপাশে সারি সারি সবুজ ঘাসের মাঝ দিয়ে তৈরি পাথুরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় আহমাদ। তাকে দেখতে পেয়েই বাম পাশের দালানের দোতলার বারান্দা থেকে একটা চিৎকার ভেসে আসে। সেদিক পানে চাইতেই চোখে রোদ এসে হানা দেয়। ডান হাতের তালু আড়াআড়ি চোখের উপরে রেখে হাসি দেয় আহমাদ। হাত নাড়তেই কেউ "দাদাভাই" বলে চিৎকার দেয়। পরপর শুনতে পাওয়া যায় বেশ কিছু উচ্ছ্বসিত স্বর, "দাদাভাই এসেছে! দাদাভাই এসেছে!" হাসি গেঁথে রয় আহমাদের মুখে। আয়িশা এখানে মাঝে সাঝেই আসে। কয়েকবার এসেই এই ডাক ওদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে। শুনতে বেশ লাগে আহমাদের। চোখের পলকেই আহমাদকে ঘিরে ধরে একটা দল। প্রাণবন্ত সেই দলকে দেখে চোখ জুড়ায় আহমাদ। কি যে ভালো লাগে এখানে এলে! কেউ শার্টের হাতা ধরে টানছে তো কেউ পাশ ধরে। কথার কিচির মিচিরে কিছুই ভালো করে শুনতে পায় না ছেলেটা। চারিপাশে সকলকে দেখতেই পায়ের উপর কিছুর অস্তিত্ব টের পেয়ে নিচে তাকায়। দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য তার পায়ের উপর দাড়িয়ে। হাসিমুখে কোলে তুলে নেয় আহমাদ। ছেলেটা এখনও স্পষ্ট করে কথা বলা শেখেনি। আহমাদের সারা মুখে নিজের লালাভরা হাত বুলিয়ে বলে,

- দাদ্দা দাদ্দা!

নিজ শার্টের হাতা দিয়ে ছেলেটার মুখ মুছে যথাসম্ভব কোমল কণ্ঠে বলে,

- কি খবর? আহনাফ কেমন আছে?

ফোকলা দাঁতে হাসে ছেলেটা। নিজের নামের সাথে মিলিয়ে ছেলেটার নাম রেখেছে আহমাদ। কি ভীষণ মায়া লাগে দেখলে। ফুলো ফুলো গালে একটা চুমু বসাতেই একজন বলে ওঠে,

- দাদাভাইরে দেখি চমলক্ক দেখা যায়!

শব্দের উৎসের দিকে তাকাতেই দেখা যায় হাসান দুপাটি দাঁত বের করে হাসছে। তার বয়সী নাফিম বন্ধুর সাথে তাল মিলিয়ে বলে,

- সবই ভাবির হাতের কামাল। চেহারায় এমনে হুইল মারসে যে আলো ছিট্টা ছিট্টা আসতাছে! এই হুইলের রহস্য কি দাদাভাই?

দাদাভাই শব্দটা টেনে টেনে বলে নাফিম। সপাটে এক ঘুষি খায় পেটে। আহমাদ মেরেছে। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেটার দিকে।

- উহ! গায়ের জোরও দেখি বাড়সে। আর কি কি উন্নতি করছেন কন শুনি!

বলতে না বলতেই আহমাদের পায়ের কাছে পনেরো বিশ জনের পুরো দল গোল হয়ে বসে পড়ে। গালে হাত দিয়ে তার দিকে তাকায়। ভাবখানা এমন যেন রাজ্যের মনোযোগ তাদের মাঝে। আহনাফ সহচরদের এভাবে বসে যেতে দেখে খুশি হয়। হাত তালি দিয়ে বলতে থাকে,

- তন তুনি! তন তুনি!

হতভম্ব আহমাদ। ফাজিলের দল! গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

- আমার সাথে ফাইজলামি করিস! আমি যে তোদের বড়ো ভাই সেইটা কি গুলে খেয়ে ফেলছিস?

তৎক্ষণাৎ কেউ দৌড়ে এসে বৃত্তের মধ্যিখানে ঢুকে পড়ে। ঝাঁকড়া চুলগুলো তখনও ঈষৎ নড়ছে। বসেই আহমাদকে উদ্দেশ্য করে ভীষণ আবেগী কণ্ঠে বলে,

- ভুলি নাই রে ভুলি নাই! তুই তো আমার জানে জিগার দোস্ত! বল না হুইলের রহস্য কি? এমন চকমক করা হুইল পাইলি কই?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে লাথি দিয়ে আহনাফকে নামিয়ে হাঁটা ধরে আহমাদ। এক ফাজিল ট্রেনিং দিয়ে সবগুলোকে ফাজিল বানিয়েছে। পেছন থেকে ইফাদ চেঁচিয়ে ওঠে,

- আরে নতুন বর দেখি লজ্জা পেয়েছে। আয় হায়!

হাসির রোল পড়ে যায় মাঠের একাংশে। কটমটে দৃষ্টিতে ওদের দেখে আবার সামনে তাকায় আহমাদ।

তিনটা দালানে সীমাবদ্ধ এই জায়গাটা কারো স্বপ্নের বাস্তব রূপ। বয়স বেশি না। এবার এই মায়াবাড়ি সাত বছরে পা রাখলো। যে ছেলেগুলোর সাথে আহমাদ দেখা করলো তারা এই মায়াবাড়িরই বাসিন্দা। অপর দিকের দালানে থাকে মেয়েরা। মাঝে সারি সরি মেহগুনি গাছ যেনো সীমানা টেনে দিয়েছে দুদলের। এই ছেলেমেয়েগুলো কারো না কারো নাড়ি ছেড়া ধন। কিন্তু রাস্তার ধুলোর আস্তরণের পর নিজ শরীরে আর পিতৃছায়া বা মাতৃমায়া কোনোটাই এদের ভাগ্যে জোটেনি। ভাগ্যের নিষ্ঠুর লিপিতে ছিলো খোলা আকাশের নিচে রাত কাঁটানো। তবে ভাগ্যের পরবর্তী কোমল রূপটুকু এই ছেলেমেয়েরা জানতো না। তাদের জানাতেই যেনো ইফাদের আগমন। ইফাদের পুরো পরিবার কানাডা প্রবাসী। জীবনের বিশাল একটা অংশ বাংলাদেশে থাকলেও পরবর্তীতে দেশান্তরিত হতে চান ইফাদের বাবা। পুরো পরিবার রাজি থাকলেও ইফাদ কোনোভাবেই সম্মতি দেয়নি। ছেলের জেদের কাছে হার মেনে তাকে এখানে রেখেই সকলে প্রবাস পাড়ি দেয়। সেসময় তাদের ওখানে যাওয়াটা বেশ দরকারও ছিলো বটে। তখন থেকে ইফাদ নিজেই নিজের অভিভাবক। আহমাদের সাথে তার বন্ধুত্ব কলেজ জীবন থেকে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও দু বন্ধু একে অপরের কাছ ছাড়া করেনি। সেই সূত্র ধরে ইফাদের স্বপ্ন সম্পর্ক ধারণা ছিলো আহমাদের। বন্ধুর স্বপ্ন পূরণে সেও সঙ্গ দেয়। এতো বড় একটা আবাস তাদের দুজনের পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব ছিলো না। ছেলের সদিচ্ছায় সায় দেন ইফাদের বাবা ইফতেখার সাহেব। এই মায়াবাড়ি তৈরিতে সিংহভাগ অবদান তার। তবে বর্তমানে ইফাদ এবং আহমাদই এই বাড়ির হর্তা কর্তা। তাদের পরিচালনায় চলছে প্রায় আড়াইশো এতিম ছেলেমেয়েদের সুশৃঙ্খল জীবন। এখন ইফাঁদের জীবন এখানেই আবর্তিত হয়। দিনশেষে সকল ক্লান্তি কাঁটাতে এখানেই ঠাই নেয় সে।

"মায়াবাড়ি" এই নামটাও যে কতো খুঁজে খুঁজে রেখেছে ওরা! এবাড়ির ভিত্তিই যে মায়া! দয়া পরবশ হয়ে তো এটা তৈরি নয়! সাধারণ কোনো এতিমখানা ওরা তৈরি করতে চায়নি। এখানকার প্রত্যেকটা শিশুকে একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত থাকা, খাওয়া, পড়াশোনার পাশাপাশি প্রত্যেককে কোনো না কোনো কাজে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। ইফাদ একটা ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তার ইচ্ছা আছে এখানকার ছেলেমেয়েদের তার ব্যবসায় কাজে লাগানোর। দেখা যাক চেতনা কতদূর আগায়...

আজহার উদ্দিননের স্ত্রী নাজমা বেগম। এই বাড়ির সকলের রান্না বান্নার দায়িত্ব তার কাঁধে। যদিও আরো বেশ কিছু লোক রাখা আছে তবে সব দিক নির্দেশনা তিনিই দিয়ে থাকেন। ছেলেমেয়েগুলো যখন তাকে আম্মা বলে ডাকে কি যে প্রশান্তি পান অন্তরে!

বিশাল রান্নাঘরে উকি দিতেই নাজমা বেগমের চেহারাটা দেখতে পায় আহমাদ। "চাচী" বলে ডাক দিতেই হুড়মুড়িয়ে আসেন নাজমা বেগম। মাথায়, গালে, কপালে হাত বুলিয়ে বলেন,

- অ মানিক! কতদিন পরে আইলা তুমি? এই চাচীরে একটুও মনে পড়ে না তুমগো?

মহিলার হাত মুঠোয় নিয়ে আহমাদ বলে,

- ব্যস্ত ছিলাম চাচী। বিয়ে টিয়ে এসব ঝামেলায় পুরো মাস চলে গেলো।

- বৌমা কই গো মানিক? তারে আনো নাই?

- না চাচী।

- ক্যান? বৌয়ের মুখ দেখাইবা না?

- আপনি বাসায় চলেন চাচী।

- সে তো পরের বিষয়। আগে তারে আনো। তোমার এই বাড়ি দেখাও।

- আচ্ছা। বলে দেখবো আসে নাকি।

- আইবো আইবো। তা মানিক! তুমি এতো শুখাইসো ক্যান? খুব খাটনি গ্যাছে বাজান?

মানিক নামের এক ছেলে ছিলো নাজমা বেগম। সে মারা গেছে বেশ ছোটবেলাতেই। আহমাদকে দেখে নাকি তার মৃত ছেলের কথা মনে পড়ে। সেই প্রথম দিন থেকে তিনি আহমাদকে মানিক বলে ডাকতে অভ্যস্ত।

আহমাদের পিছু পিছু ঘুরছে ইফাদ। ডেকে চলেছে সেই কখন থেকে। বান্দা পাত্তা দিলে তো!

- আরে শালা এমন করোস ক্যা! আমি মনে হয় ইচ্ছা কইরা বইসা ছিলাম কানাডা!

পিছু ফিরে বন্ধুর চেহারায় তাকায় আহমাদ। তার নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি দেখে এগিয়ে যেয়ে আহমাদের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরে ইফাদ।

- আম্মু অসুস্থ ছিলো তো ভাই! আমি কালকেই ল্যান্ড করসি।

- ভালো।

- কি ভালো? কথা কস না ক্যা অশান্তি? ভাল্লাগেনা আমার!

- কি বলবো?

- বৌ এর কথা ক। ওহ্ না সরি ভাবির কথা ক।

- কি?

- ধুর! কি কি করে! চেহারার চমকের রহস্য ক তো। এসব কি ভাবির হাতের জাদু নাকি!

প্রথম দিকে অতিষ্ট ভঙ্গিতে বললেও শেষে বেশ সিরিয়াস হয় ইফাদ। কিন্তু এহেন কথা কানে যেতেই তার উপর হামলে পড়ে আহমাদ। বিয়েতে উপস্থিত না থাকায় জমানো রাগের রেশ মেটায় যেনো।

______________________

আফিয়ার চিৎকার ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসে সকলে। আয়িশা মাহিবার সাথেই ছিলো। বোনের চিৎকারে বেশ ভয় পেয়েছে মেয়েটা। সালেহা বেগম ঘরে ঢুকতেই আরেক দফা চিৎকার করে আফিয়া

- আমার এই ভাস কে ভেঙেছে মা?

ভাঙ্গা ফুলদানির কিছু টুকরো তখনও মেঝেতে পড়ে আছে। বেশ অপরাধী কণ্ঠে মাহিবা বলে,

- আমি... আমার হাতে লেগে ভেঙে গেছে।

মেয়েটার দিয়ে তেড়ে আসে আফিয়া।

- তোমার সাহস কি করে হয় আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে আসার? তার উপর আবার ঘরের জিনিস পত্র ভেঙ্গেও ফেলেছো!

- আফিয়া!

ধমকে ওঠেন সালেহা বেগম।

- এসব কোন ধরণের ব্যবহার! তোমাকে নিশ্চয়ই আমি এমন শিক্ষা দিইনি।

মায়ের দিকে তাকিয়ে রাগে ফোঁস ফোঁস করে আফিয়া। মা না থাকলে আজ এই মেয়েকে বুঝিয়ে দিতো!

- সরি আফিয়া! আমি ইচ্ছে করে ভাঙিনি। বেখেয়ালে হাতে লেগে পড়ে গেছে।

- অসহ্য!

আফিয়াকে ধমকে মাহিবাকে ঘরে পাঠিয়ে দেন সালেহা বেগম। মেয়েকে ধমকের সাথে সাথে খাওয়া দাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নিজেও ঘরে যান। থেকে যায় আয়িশা।

- আপাই!

বিরক্ত চোখে আয়িশার দিকে তাকায় আফিয়া। তখনই তাকে ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করে আয়িশা।

চলমান.

(আপনাদের উৎসাহ অনেক বড় একটা বিষয়। এই যে আপনারা প্রতিদিন গল্প পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এটা আমাকে লিখতে উদ্দীপনা জুগিয়েছে। একদিন পরপর দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিদিন লেখার চেষ্টা করছি। লেখা হলেই গল্প পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লহ্। ভালবাসা জানবেন ❤️)