প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১৭

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১৭ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১৭

শাশুড়ির নির্দেশ অনুযায়ী একটা রানী গোলাপী রঙের শাড়ি পড়েছে মাহিবা। নিজ হাতে বেশ কিছু গহনা দিয়ে মাহিবাকে সাজিয়ে দেন সালেহা বেগম। ভাবিমণির সাথে মিল করে একটা গোলাপী রঙের ফ্রক পড়ে আয়িশা। মেয়েটাকে বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে শাশুড়ির কাছে যায় মাহিবা।

- মা?

- হুঁ? ভিতরে আয়!

ভেতরে ঢুকে ইতিউতি করে মেয়েটা। অভিজ্ঞ চোখে সেই অঙ্গভঙ্গি পরোখ করে সালেহা বেগম বলেন,

- কিছু বলবি?

- মা? আয়িশাকে একটা ওড়না পড়িয়ে নেই? মাথায়?

মুচকি হাসেন সালেহা বেগম। এই কথা বেশ কয়েকদিন ধরে ভাবছিলেন তিনি। বিশেষ করে মাহিবাকে দেখার পর থেকে। সম্মতি দিয়ে একটা ওড়না হাতে ধরিয়ে দেন।

উচ্ছল মাহিবা তাড়াতাড়ি হাঁটতে গেলে সালেহা বেগম বলেন,

- আস্তে যা! কুচি খুললে আমি আবার লাগিয়ে দিতে পারবো না কিন্তু!

খুশি ধরে না মাহিবার ঠোঁটে। তার ঘরে বিছানায় বসে থাকা মেয়েটার কাছে যেয়ে অতি আদুরে কণ্ঠে বলে,

- আয়িশু!

- হুঁ!

হাতের পুতুল থেকে মুখ তুলে চায় আয়িশা।

- ভাবিমণি! ওর একটা নাম দেওয়া দরকার।

পুতুলের দিকে তাকিয়ে হাসে মাহিবা।

- আচ্ছা দিবো। আগে আসো তোমাকে আরেকটু সাজিয়ে দেই।

বড়ো হাতার একটা ফ্রক যার দৈর্ঘ্য হাঁটুর নিচ পর্যন্ত। নিচে সাদা একটা পায়জামা। মেয়েটকে সদ্য ফোঁটা গোলাপ লাগে মাহিবার কাছে।

আয়িশা জিজ্ঞাসু চোখে চাইতেই তাকে দাঁড় করায় মাহিবা। ঝুঁটি বাঁধা চুল খুব যত্নে খোঁপা করে দেয়। হাতের সাদা ওড়নাটা ছোটো বড়ো করে ধরে। ছোটো পাশ একদিকে রেখে গলার নিচে সেফটিপিন দেয়। বড়ো দিকটা মাথার উপর দিয়ে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে এসে ওড়নার এক কোনা এক কাঁধে ঝুলিয়ে দেয়। কানের কাছে ছোট্ট একটা গোলাপী ফুলের পিন গুঁজে দেয়। পেছনের দিকের ত্রিভুজ আকৃতির ওড়নার অংশ পিঠ ঢেকে কোমড়কেও বেশ খানিকটা আবৃত করে রেখেছে। পুরোটা সময় টু শব্দও করেনা আয়িশা। নিজেকে আয়নায় দেখতেই উৎফুল্ল হয়ে যায়। কি সুন্দর দেখাচ্ছে! খুশিতে ঝাপটে ধরে মাহিবাকে।

- ওয়াও! ভাবিমণি! কি সুন্দর লাগছে আমাকে!

মেয়েটার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে মাহিবা বলে,

- বলো "মা শা আল্লহ"!

- নিজেকে দেখেও বলতে হয়?

- হুঁ! বলতে হয় তো?

- মা শা আল্লহ! মা শা আল্লহ! জানো স্কুলে না একটা ছেলে শুধু আমার চুল ধরে টানে! কালকে থেকে এভাবে ওড়না পড়ে যাবো। তাহলে আর চুল টানতে পারবে না! আর ওড়না ধরতে আসলে এই পিন ফুটিয়ে দিবো! ভালো হবে না?

হাসিমুখে চিন্তার ছাপ পড়ে। মেয়েটা কি স্কুলে শান্তিতে থাকতে পারে না? তৎক্ষণাৎ এক ভাবনা মস্তিষ্কে উদয় হতেই নিজেকে শান্ত রাখে। সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকে। সেই ক্ষণে আফিয়ার আওয়াজ পাওয়া যায় ড্রয়িং রুমে। মাহিবা আয়িশা দুজনেই এগিয়ে যায় সেদিকে।

- দেখো আপাই! কি সুন্দর লাগছে না আমাকে!

আফিয়ার কাছে যেয়ে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে আয়িশা। ছোটো বোনটাকে দেখতেই আফিয়ার উত্তপ্ত মেজাজ শীতল হয়ে আসে। মেয়েটার মুখে হাত বুলিয়ে বলে,

- হুঁ! খুব সুন্দর লাগছে!

- বলো মা শা আল্লহ!

- মা শা আল্লহ!

- এই মেয়ে কি হয়েছে তোর? এমন চিল্লা পাল্লা করছিস কেনো?

মেজাজ ফের চটে যায় আফিয়ার।

- কি পড়ে যাবো আমি? আমার একটাও ভালো জামা নেই!

বিরক্ত হন সালেহা বেগম। বিরক্ত কণ্ঠেই বলেন,

- শুরু হয়ে গেছে এই মেয়ের ঘ্যানঘ্যানানি! এই তোর আলমারি ভর্তি ঐগুলো কি? হ্যাঁ! এক জায়গায় যাওয়ার কথা উঠলেই ওর আর জামাকাপড় থাকে না। যতোসব অশান্তি!

রাগে গজগজ করতে করতেই প্রস্থান নেন সালেহা বেগম। আয়িশা মায়ের পিছু পিছু ছোটে। ভালো করে আরেকবার নিজেকে দেখানো লাগবে। মা তো কিছু বললোই না!

হতাশ আফিয়াকে দেখে মাহিবা বেশ ধীরে সুস্থে বলে,

- আমি ড্রেস সিলেক্ট করে দেই?

মানুষের বাহ্যিক রূপ কি কাউকে সম্মোহন করতে পারে? মাহিবাকে এই মুহূর্তে এক স্নিগ্ধ পদ্মের মতো লাগছে। সেই শান্ত রূপের মেয়েটাকে নিষেধ করতে পারলো না আফিয়া। নীরবে সম্মতি জানিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে এলো। আফিয়ার ঘরে ঢুকতেই মাহিবার চোখ কপালে ওঠার দশা। বিছানার কোনো অংশ দেখা যাচ্ছে না! জামা কাপড়ের ঝড় যেনো ঘরটার উপর দিয়ে বয়ে গেছে। তবুও নাকি এই মেয়েটা পড়ার মতো জামা পাচ্ছে না! আহারে!

পুরো বিছানা ঘেঁটে ঘুঁটে একটা নেভি ব্লু রঙের থ্রি পিস পেলো মাহিবা। আফিয়ার সামনে ধরতেই মনে হলো মেয়েটাকে এতে খুব মানাবে!

- এটা পড়বে আফিয়া? সুন্দর লাগবে।

- এটা তো আয়রন করা নেই! বিচ্ছিরি হয়ে আছে।

- আমি এক্ষুণি আয়রন করে দিচ্ছি!

আফিয়ার উত্তরের অপেক্ষা না করেই কাজ শুরু করে মাহিবা। শাড়ির ছড়ানো আঁচল গুছিয়ে নিয়ে জামাটা আয়রন করা শুরু করে। এই দৃশ্য দেখে আফিয়ার মনে হয় মেয়েটার মাঝে কোনো অভিনয় নেই। ভেতরে যেরকম বাইরেও সেরকম। ইতিবাচক ধারণার পারদ আরেকটু উচুঁ হলো কি?

বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে মাহিবার নাকে। ঘর্মাক্ত মুখে আয়রন করা জামাটা আফিয়ার হাতে দিয়ে বলে,

- তুমি আমার ঘরে যেয়ে জামাটা পড়ে আসো, আমি এগুলো ভাঁজ করে রাখি।

- থাক! আপনাকে ভাঁজ করতে হবে না!

- আচ্ছা! তুমি যাও তো!

ঠেলে আফিয়াকে পাঠিয়ে দিয়ে বিছানা গোছানো শুরু করে মাহিবা। আফিয়াও আর কিছু বলার খুঁজে পায় না। তৈরি হয়ে আসতেই মেয়েটাকে এক পলক দেখে মাহিবা। জামাটা বেশ ঢিলেঢালা আছে। এই পায়জামাকে কি বলে? প্লাজো বোধহয়! ওড়নাটা মাথায় জড়ানোর চেষ্টা করছে আফিয়া। কাজ শেষ হতে মাহিবা দেখে এভাবে ওড়না পড়লে শরীরের বেশ কিছু অংশ দৃশ্যমান হচ্ছে।

- আমার একটা নেভি ব্লু ওড়না আছে। ওটা পড়বে?

- কেনো এটা ভালো লাগছে না?

আয়না থেকে মুখ ঘুরিয়ে মাহিবার দিকে তাকায় আফিয়া।

- না! এটাও সুন্দর। তবে ওইটা মাথায় পড়তে এটা গাঁয়ে জড়িয়ে নিতে। তাহলে বোধহয় বেশি ভালো লাগতো!

কৌশলে কথাটা বলে মাহিবা। বিয়ের পরদিনই পর্দার প্রতি আফিয়ার মনোভাব সম্পর্কে সে জানতে পেরেছে। এখন সেই কথা বললে নিশ্চয়ই মেয়েটা মানবে না?

বেশ কিছুক্ষন ভাবে আফিয়া। অতঃপর সম্মতি প্রদান করে।

- আচ্ছা দিন।

নেভি ব্লু রঙের একটা সুতির ছোট ওড়না নিয়ে আসে মাহিবা। আফিয়াকে পড়তে সাহায্য করে। থ্রি পিসের ওড়নাটা পিঠ ঠেকে দুই কাঁধে ঝুলিয়ে দেয়। সেফটিপিনের সাহায্যে আটকে দেয় দু প্রান্ত।

নিজেকে দেখে সন্তুষ্ট হয় আফিয়া। তার কোনো কৃতজ্ঞ বাণী শোনার অপেক্ষা করেনা মাহিবা। চলে যায় নিজের সর্বশেষ প্রস্তুতির জন্য।

বের হওয়ার কালে মাহিবাকে দেখে অবাক হয় আফিয়া। অমন স্নিগ্ধ পদ্মের মতো রূপটা কই? কিছুই তো দৃশ্যমান নেই। এমনকি এর ভেতরে যে রয়েছে তার বয়সটা অনুমান করাও কষ্টসাধ্য! তার মাও তো বোরখা পড়ে। কিন্তু মুখ না ঢাকার কারণে চিনতে এতো সমস্যা হয় না। কৌতূহল লুকাতে না পেরে বলেই ফেলে,

- আপনি এভাবে বোরখা পড়লেন কেনো ভাবি?

অবচেতন মনে ভাবি ডাকলেও সেটা কান এড়ায় না মাহিবা। এই প্রথম মেয়েটা সম্বোধন করলো! কি খুশি লাগে মাহিবার! খুব কৌশলে বলে,

- যার জন্য এই সাজ সে দেখলেই তো হলো! জনে জনে দেখিয়ে বেড়ালে তো সাজটা মলিন হয়ে যাবে। তাই না?

আফিয়াকে কৌতূহলের সাগরে আরেকটু ডুবিয়ে দিতে মাহিবা বলে,

- একটা কাজ করবে আফি?

এগিয়ে আসা মেয়েটার দিকে এক কদম আগায় মাহিবা। পরিবারের দেওয়া আদুরে নামে ডাকে। ডাকটা আফিয়ার হৃদয়ে লাগে! অন্য কারো মুখে এই প্রথম ডাকটা শোনা। মেয়েটা যেনো সম্মোহিত হয়ে যায়।

- কি কাজ?

- আজকে বাসায় ফেরত আসা পর্যন্ত পুরোটা সময় তোমার আর আমার দিকে একজন পুরুষের দৃষ্টি খেয়াল করবে। ঠিকাছে?

সম্মোহিত আফিয়া ভাবার সুযোগ পায় না। সম্মতি জানিয়ে গাড়িতে ওঠে।

খাবার দাবার হাতে ঢুকতেই সামনের পরিবেশ দেখে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে মাহিবার মন। সব কিছু ভালোয় ভালোয় হবে তো?

চলমান.