প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩৯
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩৯ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩৯
মেয়েটা যেদিন তার জীবনে পা রেখেছিলো সে কি বুঝেছিলো কতোটা দখলদারিত্বের ক্ষমতা নিয়ে তার আগমন ঘটেছে? উহু, বোঝেনি তো! একই ছাদের নিচে থাকার সম্পর্কে গড়ে তোলার পর খুব যত্নে নিজেদের মাঝে দেওয়াল তুলে দিয়েছিলো সে। তবে টিকে থাকতে পারেনি নিজেই। সেদিন রাতে এক পা এগিয়েই তো মেয়েটার কাছে আটকা পড়ে গেলো। তারপর থেকে তার কথা-বার্তা, আচার-আচরণে আরো বেশি নজরে আসতে লাগলো। তারপর হুট করে একদিন মেয়েটা ভয় ধরিয়ে দিলো। তাকে অথৈ সাগরে ভাসিয়ে নিজে কি সুন্দর ঘুমিয়ে গেলো! অবাক লেগেছিলো তার। বিস্মিত হয়েছিলো প্রশ্নের ধারা অনুযায়ী সাজানো বই গুলো দেখে। মেয়েটা বোধ হয় মন পড়তে পারে। বিয়ের প্রথম সকালেই অবশ্য তার কিছু নমুনা পেয়েছিলো। কিন্তু তার চোখ থেকে তার বুকে ঘাঁটি গেড়ে যে কখন মেয়েটা বসে পড়লো সে কি বুঝেছিলো? বোঝেনি তো! প্রতিটা পদে মেয়েটা বলে না বলে বুঝিয়েছে সে আছে। সবসময় পাশে আছে, কাছে আছে।
সেই বৃষ্টির দিনের কথা মনে হলে নিজেকে আজও বড় অথর্ব লাগে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যখন অনাকাঙ্ক্ষিত কান্ডটা ঘটিয়ে ফেলেছিলো তখন মেয়েটা নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলো। একদম নিশ্চুপ! আজহার উদ্দিন না জেনেও যে বক্তব্য সেদিন দিয়েছিলেন সেগুলো তাকে গভীর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রেশ কিভাবে মেয়েটার মনে প্রভাব ফেলতে পারে চিন্তা করেই ভয়ে কেঁপে উঠেছিলো সে। সময় নষ্ট না করে নিজেকে যতটা সম্ভব উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। আজ যেনো ও কি বললো? হুট করে? না তো! এসবের কোনোটাই তো হুট করে হয়নি। তার অনুভূতি শূন্য মনে অনুভূতির রমরমা ব্যবসা করা মেয়েটা জানেই না কখন কিভাবে মন জমিনের সবটুকু জায়গা নিজের নামে লিখে নিয়েছে। সেও যে খুব জানে এমনটাও নয়। তবে দিনদিন মেয়েটা খুব আপন হয়ে উঠছিলো, বড়ো কাছের হয়ে যাচ্ছিল। তবে সেই ঘটনা নিয়ে আজ পর্যন্ত একটা বাক্য ব্যয় করেনি মেয়েটা। কিন্তু আজ? আজ বোধ হয় মেয়েটার সহ্যের সীমা অতিক্রম হয়ে গেছিলো। কেনো? কি এমন বলেছে সে? মেয়েটার বয়স কম, অনভিজ্ঞ। সে এখন পঙ্গু প্রায়। কবে ঠিকভাবে হাঁটতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজ নেই। মাথার উপরের এই ছাদটুকুও এখন অনিশ্চিত। এতোকিছু বুঝতে পেরেও সে কিভাবে এই অনিশ্চিত জীবনে মেয়েটাকে বেঁধে রাখে? কিভাবে পারবে? আজ হয়তো আবেগের বশে কতো কথাই মনে হচ্ছে। কিন্তু বেকার স্বামীর সাথে থাকতে থাকতে এই আবেগ যখন ফিকে হয়ে যাবে তখন তো নিজেই চাইবে এই বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে। তার থেকে ভালো না সম্মানজনক একটা পর্যায়ে থেকে বেরিয়ে যাওয়া? কিন্তু মেয়েটা বুঝছে না। ভাবনা নদীর পানি কখন যে নাম পাল্টিয়ে অশ্রু হয়ে তার বন্ধ চোখের কিনার বেয়ে পড়ে যায়, ছেলেটা ঠিক পায় না। নিজের ঘরটাতে আজ তার বড়ো নিঃসঙ্গ লাগে, একা লাগে। বিছানার ওপাশ হাতড়ে বুঝতে পারে কি যেনো নেই, কি যেনো নেই!
• • •
আফিয়ার প্রশ্ন দৃষ্টিকে ইশারায় নিবৃত্ত করেন সালেহা বেগম। আয়িশাকে আজ রাতে সঙ্গেই রাখতে বলেন। কান্নারত পুত্রবধূকে নিজ কক্ষে শুইয়ে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেন। দ্বিধায় ভুগতে থাকেন। ঘটনা শুনতে চাওয়া ঠিক হবে কি না বুঝতে পারেন না। তাদের মাঝে সেই নিতান্তই তৃতীয় ব্যক্তি। হাজার কথা ভাবতে ভাবতে দেখেন মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে। পায়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ক্ষতটা বড়ো গভীর!
• • •
আরেক কাত হতে গেলে কাঁটা জায়গায় টান লাগে। ঘুমের মাঝেই চেহারায় ব্যাথাতুর ছাপ ভেসে ওঠে। অভ্যাসবসত অপর পাশে হাত দিয়ে কিছু আঁকড়ে ধরতে চায়। পরিচিত কিছুর বদলে অপরিচিত জিনিসের স্পর্শে ইন্দ্রিয়ের গতি ঘুমের গভীরতা কমিয়ে দেয়। অন্ধকারে চোখ মেলে হাতড়ে হাতড়ে বুঝতে পারে সে শাশুড়ির কাছে আছে। তার মানে মানুষটা একা শুয়ে আছে? কিছু দরকার হলে তো একা উঠতেও পারবে না। তড়িঘড়ি করে উঠে মেঝেতে পা রাখতেই আঙ্গুলের কাছে টনটন করে ওঠে। ফের বসে পড়ে। সাবধানী দৃষ্টিতে চেয়ে দেখে শাশুড়ি তখনও ঘুমে। আস্তে আস্তে উঠে আঘাতের স্থানে চাপ না দিয়ে হেঁটে চলে মাহিবা। ডিম লাইটের ঝাপসা আলোয় কক্ষ পেরোলে দেখতে পারে না সালেহা বেগমের ঠোঁটের সূক্ষ্ম হাসিটুকু। ঝগড়া মারামারি যাই হোক অন্তত দূরত্ব না হোক।
• • •
ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। ডিম লাইটটাও জ্বালানো হয়নি? পরিচিত ঘরে দক্ষ হাতে হালকা বাতিটা জ্বেলে দেয় মাহিবা। চোখের পাতায় ভেসে ওঠে কঠোর পুরুষের প্রতিচ্ছবি। লোকটা কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে! সে যে নেই তাতে তার কোনো বিকার আছে? নির্বিকার সে। আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে মানুষটার কাছে যেয়ে বসে মাহিবা। তখন যা যা বলেছে সবটা সে জেনে বুঝেই বলেছে। তবে কথার সারমর্মটুকু হয়তো অন্যভাবেও তুলে ধরা যেতো। অতোটা চিৎকার না করলেও হতো। মানুষটা কি বেশি কষ্ট পেয়েছে? কিন্তু এমন অবান্তর কথা বলবে কেনো? জীবনে সুখ দুঃখ তো থাকবেই। তাই বলে কি এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে? এটা কোন বিবেচনার কথা সে বুঝে পায় না। কতক্ষণ বসে থেকে আহমাদের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। আরেকটু কাছে গিয়ে এক ধ্যানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ঘড়ির কাঁটা আওয়াজ দিয়ে জানান দেয় রাতের গভীরতা আরো একটু বেড়েছে। খুব সন্তর্পনে নিজ নামে দখল করা আহমাদের বুকে মাথা রেখে পেট জড়িয়ে ধরে। চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকে আহমাদের অযৌক্তিক চিন্তাকে কিভাবে মাথা থেকে সরানো যায়।
ঘুমের ঘোরে হাত ওঠানোর ভান করে মেয়েটাকে বুকে চেপে ধরে আহমাদ। এই তো! এখন নিজেকে পরিপূর্ণ লাগছে। একদম পরিপূর্ণ!
• • •
মাসের শুরু। সবসময় এর আগেই বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করা হয়ে যায়। তবে এবার বিলম্ব হওয়ার কারণ সবার জানা। তবে বাড়িওয়ালী মহিলা জানতেন কি না সেটা একটা প্রশ্ন। সকাল সকাল তিনি এসেছেন ইয়াসির পরিবারের আতিথেয়তা গ্রহণ করতে। সালেহা বেগম এটা সেটা অনেক কথাই বলছেন। তবে মহিলার আগমনের উদ্দেশ্য তার কাছে স্পষ্ট। কিন্তু ছেলেটাকে কি বলবেন? তিনি তো জানেনই আহমাদ কীসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে মাহিবা আসে চা নিয়ে। সে সময় ভদ্র মহিলা বলেন,
- আপা বউমা কেমন?
- আলহামদুলিল্লাহ। আল্লহ বেছে বেছে সেরাটাই আমাদের দিয়েছেন।
হেসে বলেন সালেহা বেগম। ইশারায় মাহিবাকে নির্দেশ দেন এখানেই থাকতে।
- বেশ বেশ। ভালো হলেই ভালো। তা শুনলাম ছেলে নাকি অ্যাকসিডেন্ট করেছে? এখন কি অবস্থা?
- আছে আলহামদুলিল্লাহ। এখন ভালোই। ডাক্তার এক মাসের বেড রেস্ট দিয়েছে।
- সে কি! তাহলে তো চাকরিটা বোধহয় আর থাকলো না?
- তাই আর থাকবে কিভাবে? কাজ না করতে পারলে তো আর বেতন পাবে না।
কৌশলে কথা ঘুরিয়ে নেন সালেহা বেগম। চাকরি হারানোর কথা জানলে এটা তিলকে তাল বানাতে ভাববে না। তবে এটুকু বাক্য মহিলার মনে ভয়ের জন্ম দেয়। চোখ খুলেই অদৃশ্য হিসাব কষতে বসে যান। এক পর্যায়ে ইতি উতি করে বলেই ফেলেন,
- আপা! আসলে খুব সমস্যায় আছি। ছেলে মেয়েদের নিয়েই একটু ঝামেলা। বড়ো ছেলেটাকে বিদেশ পাঠিয়েছি সে তো জানেনই। কিন্তু ও ওখানে বেশী সুবিধা করতে পারছে না। এই নিয়েই একটু সমস্যায় আছি। দেখেন এই মাসের ভাড়াটা যদি একটু তাড়াতাড়ি দিতে পারেন তাহলে ভালো হয়। বুঝতেই পারছেন..
জোর করে একটু হাসি দেওয়ার চেষ্টা করেন মহিলা। আশ্চর্য্য হয় মাহিবা। এইমাত্রই শাশুড়ির কথায় স্পষ্ট তাদের অবস্থা কেমন যাচ্ছে। সেই কথার পিঠে এমন উত্তর দিতে বাঁধলো না মহিলার? দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মিত হেসে সে বলে,
- একটু অপেক্ষা করবেন আন্টি? আমি এক্ষুনি আসছি।
কারো উত্তরের অপেক্ষা না করে ঘরে যায় মাহিবা। আলমারির দ্বার খুলে গুছিয়ে রাখা একটা জায়গা থেকে বাড়ি ভাড়ার টাকা বের করে। পুরোটা দৃশ্য দেখে আহমাদ। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে সে। আজকাল এই তো তার কাজ।
- মাহি! ওটা কিসের টাকা?
আলমারির দরজা বন্ধ করে যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই চলে যায় মাহিবা। আশেপাশে যেনো আর কেউই নেই। মহিলার হাতে টাকা দিলে কৃতজ্ঞ হাসেন তিনি। চলে যান তার পরপরই। সালেহা বেগম বলেন,
- কি রে? টাকা পেলি কোথায়?
- আমার কাছে কিছু ছিলো।
- থাকলে রেখে দে। জরুরী কাজে লাগবে। সময়ে অসময়ে বের করবি না।
- আচ্ছা।
আহমাদের খাবার হাতে ঘিরে যায় মাহিবা। সব সাজিয়ে দিয়ে ঘর গোছানোর কাজ লাগে। আহমাদ বলে,
- আমার সাথে বসো। একসাথেই খেয়ে নিই।
মাহিবা নির্বিকার। সোফার কাপড় গোছানো শেষ হলে আলমারি থেকে বেশ কিছু শাড়ি বের করে। গোছানো কাপড় আবার গোছায়। আহমাদ আবার বলে,
- কি হল? আসো।
এবার ঘর থেকে চলে যায় মাহিবা। নিজে নিজেই বলে আহমাদ,
- আশ্চর্য! হচ্ছেটা কী?
চলমান.