প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২৩

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২৩ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২৩

আহমাদ পেছন থেকে ঘটনা বোঝার চেষ্টায় আছে। মাহিবা তার দিকে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে। আয়িশার চোখে মুখে কৌতূহল।

- ওটা কার ফোন?

আহমাদের প্রশ্নে উত্তর করে আয়িশা।

- ভাবিমণির ফোন।

- কে ফোন দিয়েছে বললি?

- আশ্চর্য! আশ্চর্য আবার কারো নাম হয় বলো তো দাদাভাই?

মাহিবার অবস্থা করুন। এভাবে ধরা খেতে হবে সেটা ছিলো চিন্তার বাইরে। আমাদের জীবনে বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটে চিন্তার বাইরের। একদম অপ্রস্তুত হয়ে হুট করে সেই ঘটনা আমাদের সামাল দিতে হয়।

- মাহিবা!

কণ্ঠের স্বর ভারী হয়েছে। কতোটা ভারী হয়েছে? ইশ কণ্ঠস্বর ওজন করার একটা যন্ত্র থাকলে বেশ হতো। এখন আহমাদের ভারী কণ্ঠের ওজন মাপা যেতো।

আহমাদ ঘটনা আঁচ করতে পেরেছে। সে কারণেই কল কেটে দিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। দাদাভাইয়ের এই ভঙ্গি আয়িশার চেনা। সে যখন দুষ্টুমি করে পুরো বাড়ি উথাল পাথাল করে ফেলে তখন তাকে আহমাদ এভাবেই ডাক দেয়। শান্ত চোখে, গমগমে স্বরে ডাকে। ঐ এক "আয়িশা" ডাকেই তার খেল খতম হয়ে যায়। এখন কি তাহলে ভাবিমণির খেল খতম হবে? চিন্তার বিষয় বটে!

ঘুরে তাকায় মাহিবা। দৃষ্টি এখনও মেঝেতে। যেনো তার দৃষ্টিনন্দন নকশা তার চোখ অন্য কোথাও সরতে দিচ্ছে না।

- ওটা কি আমার নাম্বার?

মুখ উঁচু করে মুখটা একবার দেখতে চায় মাহিবা। কিন্তু এটা নিয়ম বিরুদ্ধ কাজ। চোর ধরা পড়লে তাকে চোখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তড়িৎ মনে হয় সে তো চোর না! শক্তি ভর করে মনে। শ্বাস নিয়ে, বুক ফুলিয়ে আহমাদের মুখের দিকে তাকায়।

- জি

- আমি আশ্চর্য?

- জি। না।

- যেকোনো একটা বলুন।

- আপনি আশ্চর্য না কিন্তু আপনার সব শুরু হয় আশ্চর্য দিয়ে শেষও হয় আশ্চর্য দিয়ে।

- কিভাবে?

- মানুষের কথার শেষে দাড়ি কমা থাকে। আপনার কথার শেষে থাকে "আশ্চর্য"। যাকে বলে মুদ্রাদোষ। কথায় কথায় আশ্চর্য বলা আপনার মুদ্রাদোষ।

- তাহলে কেউ যদি কথায় কথায় বলে "ধুর" আপনি তার নাম্বার সেভ করবেন "ধুর" দিয়ে? স্ক্রিনে লেখা উঠবে "ধুর" is calling. বাহ! ইন্টারেস্টিং ব্যাপার স্যাপার!

মাহিবা ঠিক বুঝলো না এটা উক্তি নাকি প্রহসন। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনে সে বললো,

- আপনার নাম্বার তো কিছু দিয়ে সেভ করা লাগবে। কি দিয়ে সেভ করবো?

- আশ্চর্য! আমার বাবা-মা আকীকা দিয়ে নাম রেখেছে কি শোকেসে তুলে রেখে দেওয়ার জন্য নাকি? নাম দিয়ে সেভ করবেন।

- এই যে আশ্চর্য!

লাফিয়ে উঠলো আয়িশা। তার ধ্যান জ্ঞান দুজনার কথা বার্তার দিকে। ঘটনার সারমর্ম সে বুঝতে পেরেছে। নিজ বুদ্ধি খাটিয়ে বলে,

- আম্মুর ফোনে দেখেছি আব্বুর নাম্বার এখনও সেভ আছে। লেখা "বাবুর বাবা"। দাদাভাইকে মনে হয় বাবু বলে ডাকতো। তাহলে তুমিও লিখে দিতে পারো "বাবুর বাবা"। হয়ে গেলো!

চমৎকার সমাধান পেশ করে বিছানায় আরাম করে বসলো আয়িশা। নিজের প্রতি গর্ব হচ্ছে। এতো সুন্দর ঝামেলা মেটানো সে কবে শিখে গেলো!

স্বামীর নাম্বার নাম দিয়ে সেভ করায় মাহিবার তীব্র অনিচ্ছা। সেখানে এমন দারুন বুদ্ধির সামনে সে টিকতে পারলো না। কিছুক্ষণ পূর্বে অস্ত যাওয়া সূর্যের অবশিষ্ট লালিমা তার মুখে দেখা গেলো। পূর্বের চেয়ে দ্বিগুণ লজ্জার আবরণ তার মননে ছেয়ে গেল। ফোন হাত থেকে রেখে ছুটে পালালো। যেনো আসামী শাস্তির হাত থেকে পালাচ্ছে!

বহুদিন পর যেনো আহমাদ বেশ মজার দৃশ্য দেখলো। এমন ভঙ্গিতেই সে ঠোঁট চেপে হাসছে। সেদিন না কোন ছেলের সামনে পরিচয় করালো "আমার না হওয়া বাচ্চার বাবা"! তাহলে এখন এতো লজ্জা পাওয়ার কি হলো! আশ্চর্য!

বিছানায় চৌকস ভঙ্গিতে বসা আয়িশার কাছে গেলো আহমাদ। বোনের পাশে আয়েশ করে বসে বললো,

- বাড়ির খবর বল দেখি! সব ঠিকঠাক?

- জানো দাদাভাই! দুইটা বাড়ি পরে যে সবুজ বাড়িটা আছে না? ঐ যে কয়দিন আগে একটা মেয়ের বিয়ে হলো?

- হ্যাঁ। তাই কি হয়েছে?

- ঐ আপুর শশুর বাড়ির ওরা সবাই ফকির জানো? একটা ফ্রিজও ওদের নেই। আন্টিরা নাকি বিয়ের সময় দিয়েছে। ভালোই করেছে বলো?

আহমাদের ভ্রু কুঁচকে আসে। ঘটনার আগা মাথা সে বুঝছে না।

- কাহিনী কি? পুরোটা বল।

আসাম করে বসে, কোলের উপর ছোটো কুশন নিয়ে খুব গুরুতর ভঙ্গিতে কথা বলা শুরু করে আয়িশা। ঘটনার আদ্যপান্ত সবিস্তারে বর্ণনা করে। শেষ পর্যায়ে এসে হাসি আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে আহমাদের জন্য। হো হো করে হেসে ফেলে ছেলেটা। হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে আসে। মুখ চেপে ধরে চোখ ঢেকে ফেলে। নাহ্! হাসি থামছে না। হাসির শব্দে সালেহা বেগম উৎসুক হয়ে ঘরে উকি দেন। ছেলেটাকে কতদিন এভাবে হাসতে দেখেন না! দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর থেকেই ছেলেটা যেনো হুট করে বড়ো হয়ে গেলো। কিন্তু আজকে ছেলেটাকে একদম সেই ছোট্ট বেলার মতো লাগছে। বিছানা ভিজিয়ে দেওয়ার মতো ছোট্ট! যেনো খুবই মজার একটা গল্প শুনেছে! হাসতে দেখে বিছানা ভেজানোর কথা মনে হবে কেনো? কি অদ্ভুত!

- কি ব্যাপার? এতো হাসি কীসের? আমাকেও বল। আমিও একটু হাসি।

- দাদাভাই পাগল হয়ে যাচ্ছে আম্মু। লক্ষণ ভালো না। গুরুত্বপূর্ন কথায় হেসে দিচ্ছে। ডেঞ্জারাস লক্ষণ!

- আচ্ছা! সেই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা কি?

- বিকালের কথা বলছিলাম।

মিহি শব্দে হেসে ফেলেন সালেহা বেগমও। প্রশ্রয়ের চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,

- তোর বোন তো বিরাট বোঝা শিখে গিয়েছে রে! আমাকে আজকাল ওর থেকে বুঝ নিতে হয়।

- তাই নাকি! আমাকেও বোঝা তো কি শিখেছিস?

নিজেকে নিয়ে এমন অবান্তর আলোচনা ভালো লাগে না আয়িশার। মুখে বিরক্তির হালকা প্রলেপ নিয়ে বের হয়ে যায় মেয়েটা। সেদিক পানে চেয়ে সালেহা বেগম বলেন,

- কোথায় গেলো বল তো?

- কোথায় আবার! পেয়েছে না এক ভাবিমণি! তার কাছেই গেছে।

প্রশান্তির শ্বাস ফেলে আহমাদের কাছে আসেন সালেহা বেগম। তৃপ্ত হৃদয়ে খুব গুরুত্বের সাথে বলেন,

- আল্লাহ মানুষকে খুশি হয়ে নিয়ামত দান করেন। সেই নিয়ামতও আমাদের জন্য এক প্রকার পরীক্ষা। কেমন পরীক্ষা বল তো? আমিই বলছি। তুই যদি সেই নিয়ামতের যথাযথ যত্ন নিতে না পারিস তাহলে আল্লাহ সেটা তোর থেকে ফেরত নিয়ে নেবেন। তখন হাজার আফসোস করেও সেটা ফেরত পাবি না। তাই সময় থাকতেই সেই নিয়ামতের কদর করতে শিখ।

কথা শেষ করে প্রস্থান নেন সালেহা বেগম। আহমাদকে উল্টো কিছু বলার সুযোগটাও দেন না। আহমাদ ভাবতে থাকে মায়ের কথার গূঢ় রহস্য।

•• •• ••

মাহিবার সাথে তার ঘরে এসেছে আফিয়া। উদ্দেশ্য সে জানেনা। মাহিবা নিয়ে এসেছে তাই সে এসেছে। ঘরে এসে দেখে ভাই খাতা পত্র হাতে বসে। মাহিবা সরাসরি আলমারি খুলে একটা প্যাকেট বের করে। আফিয়ার হাতে দিয়ে বলে,

- দেখো তো এটা ভালো লাগে নাকি?

- কি এটা?

- একটা বোরখার সেট।

- আপনার বোরখার সেট আমি কি করবো?

- দেখো তোমার ঠিকঠাক হয় নাকি। হলে নিয়ে নাও। বিয়ে উপলক্ষ্যে বেশ কিছু বোরখা উপহার পেয়েছি। এতো বোরখা দিয়ে কি করবো? তোমার পছন্দ হলে রাখো। পরে সময় করে আবার নিজের পছন্দ মতো একটা কিনে নিও।

- আচ্ছা। পড়ে দেখি।

আহমাদ হতভম্ব হয়ে পুরো ঘটনা দেখলো।

- ব্যাপারটা কি হলো?

আলমারির পাল্লা বন্ধ করতে করতে মাহিবা বলল,

- কি হলো?

- ও আপনার দলে চলে গেলো কি করে?

রহস্য হেসে মাহিবা বলে,

- ইটস ম্যাজিক!

- বলুন না!

আগ্রহী দেখায় আহমাদকে। ঘটনা জানার উৎসাহে খাতা পত্র একপাশে সরিয়ে রেখেছে সে।

ওড়না মাথা থেকে সরিয়ে চুল আঁচড়ানো শুরু করে মাহিবা। সে কাজ করতে করতেই উত্তর দেয়,

- আমি আসলে তেমন কিছু করিনি। ওর মনে আমার বিষয়ে যে শক্ত একটা বিরূপ ধারণা ছিলো সেটা যেকোনো ভাবেই একটু নরম হয়েছে। বিষয়টা বুঝতে পেরে আমি ওর হাতে একটা কাজ ধরিয়ে দিয়েছি। জোর করেই। তারপর ও নিজেই সবটা বুঝেছে।

- কি কাজ দিয়েছিলেন?

আগ্রহের পারদ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আহমাদ চোখে মুখে উৎসাহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। মাহিবা হাসে আহমাদের এমন চেহারায়। কেমন বাচ্চা বাচ্চা লাগছে!

- বলেছিলাম পথ চলতে যতগুলো ছেলে বা পুরুষ দেখবে সবার দৃষ্টি যেনো পরোখ করে। তার দিকে কেমন দৃষ্টিতে ওরা তাকায় সেটা যেনো খেয়াল করে। এই তো..

- এটুকুই?

- হুঁ।

- তাতেই হয়ে গেলো?

- আলহামদুলিল্লাহ!

- আপনি তো মেয়ে সুবিধার না?

- কেনো কেনো?

- শত্রুকেও চুটকি মেরে নিজে দলে নিয়ে আসতে পারেন। মানে আপনার আশেপাশে যারা থাকবে তাদেরকে আপনি নিজের দলে টেনেই শ্বাস নেবেন। ভেরি ডেঞ্জারাস!

মলিন হেসে নিজ মনে মাহিবা ভাবে,

- আপনাকে আর টানতে পারলাম কই!

চুল আঁচড়ানো শেষ করে চিরুনির দিকে তাকাতেই মাহিবার কণ্ঠের বিষাদ সুর শুনতে পাওয়া যায়।

- যে চলে যেতে চায়, তাকে কি আর জোর করে আটকে রাখা যায়! হায়!

হাসে আহমাদ। মেয়েটা এমন এমন কথা বলে! সেই হাসিতে তাকিয়ে মাহিবা দুয়া করে এই হাসি যেনো অমলিন থাকে। চিরকাল!

- মাহিবা!

বেশ কিছুক্ষণ পরে আহমাদের আওয়াজ পাওয়া যায়। ঘর গোছাতে গোছাতেই মাহিবা উত্তর নেয়।

- জি!

- এদিকে আসুন।

ত্রস্ত পায়ে সেদিকে ছুটে যায় তার মন তবে বাহির দিয়ে সে শান্ত, ধীর।

মাহিবা বিছানায় বসলে আহমাদ বলে,

- অনেক ধন্যবাদ এবং জাঝাকিল্লাহু খয়রন। আমার পরিবারটাকে এভাবে আপন করে নেওয়ার জন্য আমি আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকবো। এর বিনিময়ে আপনি কি চান?

- কোনো বিনিময়ের আশায় তো আমি এসব করিনি। না আসলে পুরোটা ঠিক না। বিনিময় আমি চাই তবে আল্লহর থেকে, অন্য কারো কাছ থেকে না।

- তাও আমার থেকে অল্প কিছু হলেও আপনি চান। আমার ভালো লাগবে।

পলক ঝাপটে বেশ কিছুক্ষণ ভাবে মাহিবা। শেষ পর্যায়ে বলে,

- আমাকে তুমি করে বলবেন।

অস্বস্তিতে পড়ে যায় আহমাদ। কাজটা আহামরি কঠিন কিছু না তবে জড়তাপূর্ণ তো বটেই।

আহমাদের এমন অস্বস্তিতে ভরা চোখ মুখ দেখে মাহিবা বলে,

- এখনও নিশ্চয়ই আমি অপরিচিত নই?

কি যেনো একটা ছিলো মাহিবার স্বরে। কি সেটা? অভিমান?

- না না। সেটা না। আসলে হুট করে তো। সময় লাগবে।

- বেশ।

- আচ্ছা আপনাকে একটা গল্প বলি। শুনবেন?

অবাক চোখে লোকটাকে দেখে মাহিবা। রোদের আকাশে বৃষ্টি দেখলে মানুষের অভিব্যক্তি যেমন হয় মাহিবার চেহারাটাও তেমনই লাগে। সেভাবেই মেয়েটা ঘাড় কাত করে আগ্রহ প্রকাশ করে।

উৎসাহ পেয়ে তাকে "মায়াবাড়ি" সম্পর্ক বিস্তারিত বলে আহমাদ।

বর্ণনার শেষে আহমাদ জিজ্ঞেস করতে চায়, "আপনি যাবেন সেখানে?" তার আগেই মেয়েটা বলে,

- আমাকে কবে নিয়ে যাবেন সেখানে?

মেয়েটার চোখ টলমল করছে। তবে জল গড়ানোর সম্ভাবনা নেই। চোখটাকে পুকুর মনে হচ্ছে। শুধু পুকুর শুনতে কেমন যেনো লাগে! পদ্ম পুকুর! হ্যাঁ একদম পদ্ম পুকুরের মতো লাগছে। ঐ হালকা খয়েরী মনিটা যেনো একটা ফুটন্ত পদ্ম। সেই চোখে তাকালে নিজেকে হারিয়ে ফেলে আহমাদ। দিন দুনিয়া খুইয়ে বসে। কতক্ষণ যে সে নীরব থাকে!

- কবে যাবেন?

ধ্যান ফিরলে জবাব দেয় আহমাদ।

- কাল যাবেন?

- যাবো ইনশাআল্লহ।

- আচ্ছা। তৈরি থাকবেন। অফিস শেষে এসে নিয়ে যাবো।

- ইনশাআল্লহ্!

চলমান.