প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ০৬

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ০৬ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৬

মাহিবার বাবার বাসায় চলছে জামাই আদরের পর্ব। যত আয়োজন সব যেনো আহমাদকে ঘিরে। প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও এখন খাবার দাবারের অত্যাচারে আহমাদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। এই কথা বলার মত মানুষও পাচ্ছে না সে। মাহিবাও যেনো এখানে এসে উড়ন্ত প্রজাপতি হয়ে গেছে। এসে থেকে তার টিকিটির দেখা মেলেনি। সঙ্গে জুটেছে তার বোন আয়িশা। দুটোই এক। চঞ্চল প্রজাপতি। বোনকে এক নজর দেখার জন্য ঘর থেকে বের হয় আহমাদ। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই শাশুড়ি হৈ হৈ করে উঠেন।

- তোমার কিছু লাগবে বাবা? আমাকে ডাকলেই পারতে। কষ্ট করে আসতে গেলে কেনো?

- না কিছু লাগবে না। ওই আয়িশা বিরক্ত করছে নাকি তাই দেখতে আসলাম।

- আয়িশা আর মাহিবা তো বাবুর ঘরে। তুমি যাও ওই ঘরে। ওরা তিনজনই ওখানে।

- আচ্ছা।

একা বসে বোর হওয়ার থেকে বরং বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানো যাবে এই কথা ভেবে মাহিদের ঘরের দিকে পা বাড়ায় আহমাদ। কিন্তু ঘরের সামনে এসেই তার চক্ষু চড়কগাছ।

মাহিদ শুয়ে আছে বিছানায়। ঠিক শুয়ে আছে নয়, তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আপাতত সে বড় বোনের হাতে বন্দী। ছোটার চেষ্টাও অবশ্য করেছে না। মেরে নিক দুটো দিন।

মাহিবার মুখ আর হাত দুটোই সমানে চলছে।

- কত্তো বড়ো সাহস! একদিন আমি বাড়ি নেই আর আমার গাছের দিকে তোর নজর যায়? আমার গাছের যেই কয়টা পাতা আর ফুল ছিড়েছিস তোর মাথার সেই কয়টা চুল আমি গুনে গুনে উঠাবো। বেয়াদব কোথাকার! আব্বু আম্মু কি তোরে ভাত দেয় না? আমার গাছের ফুল পাতা ছিড়িস খাইতে? ছাগল তুই? আম্মু.. আম্মু.. তুমি যদি তোমার ছেলেরে এখন না মারো আমি কিন্তু মেরে ওরে ভর্তা বানায় ফেলবো বলে দিলাম। শিগগিরই আসো। আম্মু... আম্মু....

পাশেই আয়িশা মাহিবাকে উৎসাহ জুগিয়ে চলেছে। এমন ধারার যুদ্ধ কোনোদিন সে দেখেনি। আহমাদ তাকে সে সুযোগই দেয়নি। তাই বিষয়টা তার কাছে নতুন।

- বাহ ভাবিমণি! তুমি তো সুপার উইমেন! গুড গুড! চালিয়ে যাও!

দরজার দিকে পেছন ঘুরে থাকায় আহমাদ কে দেখেনি মাহিবা। কিন্তু এদিকে আহমাদ বাকরুদ্ধ। মাহিবার চিৎকারে তার মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে দেখেন দরজায় স্তম্ভিত আহমাদ আর ভেতরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মনে মনে মেয়েকে হাজার খানেক বকা দিতে ভুলেন না,

- বিয়ে হয়ে গেছে তাও এই মেয়ের বুদ্ধিসুদ্ধি হয় না আল্লাহ! জামাইয়ের সামনে এসব কি! এমন ডাকাত রূপ দেখে আজকেই তো ওরে রেখে যাবে। বোকার হদ্দ কোথাকার!

বিড় বিড় করতে করতে এসে দুম করে কিল বসিয়ে দেন মাহিবার পিঠে। থেমে যায় মাহিবা। মা কে দেখে বলে,

- আমারে মারলা কেন? তোমার ছেলেরে মারো। ও আমার গাছের দিকে হাত দেয় কোন সাহসে?

চিৎ পটাং হয়ে শুয়েই মাহিদ বলতে থাকে,

- শোন, তোর এখন বিয়ে হয়ে গেছে। তোর বাড়ি হইলো শ্বশুরবাড়ি আর এইটা আমার বাড়ি। এখানে যা আছে তাও আমার। তুই আসছিস, মেহমানের মত থাক, খেয়ে টেয়ে বিদায় হ। গাছ টাছ সব আমার। ওইসব নিয়ে তোর চিন্তা করা লাগবে না।

এই কথা শুনে রাগে ফোস ফোস করতে থেকে মাহিবা।

এদিকে চোখ দিয়ে ইশারা করে আহমাদের উপস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করেন মালা বেগম। কিন্তু মেয়ে বুঝলে তো! মা কে চুপ থাকতে দেখে মাহিবা হায় হায় করে উঠে,

- বকবা না তো। তোমার বাবুরে বকবা কেন? আমারেই তো মারবা। ভালো মারো। আমি আর আসবো না এই বাড়ি। বিয়ে দিয়ে দিসো না? এখন থেকে শ্বশুর বাড়িতেই থাকবো। থাকো তুমি তোমার বাবুরে নিয়ে।

বিছানা থেকে উঠে দরজার দিকে যেতে যেতে আবারও বলতে থাকে,

- কেউ আমারে ভালোবাসে না। এই বাড়ির সবাই আমার পর। কারো মনে আমার জন্যে একটু দয়.....

বাকিটুকু বলার আগে আহমাদ কে দেখে থমকে যায় মাহিবা। আহমাদের চোখ মুখের অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে সে মাহিবার এইসব বিলাপ শুনে ফেলেছে। কতটা শুনেছে এটা আন্দাজ করতে না পারলেও এই মুহূর্তে আহমাদের উপস্থিতি মাহিবাকে লজ্জায় ফেলার জন্যে যথেষ্ট। স্বীয় জায়গায় জমে যায় সে। আহমাদ কিছু না বলে রোবটের মত জায়গায় পরিত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু মাহিবা তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে। কি হয়ে গেলো তার সাথে এটা! তার মান সম্মান শেষ! শেষ! আর কিছু থাকলো না। এই কথা ভেবে যেই না একটু কিছু বলবে তার আগেই আবার পিঠে পড়ে মায়ের হাতের কিল। দুম করে মেয়েকে মেরে মালা বেগম বলেন,

- হইসে না ভালো? গা আরো যাত্রাপালার গান! তোদের দুইজনের জ্বালায় আমার জীবন টা অতিষ্ট হয়ে গেলো। ভালো লাগে না আর এই সব। বিয়ে হয়ে গেসে তোর! এই বার তো মারামারি করা বন্ধ কর।

- "মাহিদ যে আমার গাছের ফুল ছিঁড়ে ফেলছে এটা তাও দেখলো না আম্মু! দেখবে কেনো? আম্মুর বাবু না ও!"

এই ভেবেই কষ্টের পাহাড় আরো উচু হয় মাহিবার মনে। কিন্তু কথা হলো এখন ওই লোকটার সামনে কিভাবে যাবে মাহিবা? বোরখা পড়ে, মুখ ঢেকে? নাকি যাবেই না? আল্লাহ! এ আবার কি দুশ্চিন্তা!

_____________________

আহমাদ হতভম্ব! মেয়েটাকে দে ভালো ভেবেছিল। কিন্তু এ তার কোন রূপ বের হলো! হায় হায়! তার বোনেদের সাথেও এমন মারামারি করবে নাকি! কল্পনায় চলে আসে সেই চিত্র। মাহিবা আফিয়াকে ওভাবে মারছে, পাশে তাকে চিয়ার আপ করে যাচ্ছে আয়িশা। কল্পনাতেই বিরক্ত হয় আহমাদ। তার ছোটবোনকে দলে টেনে ফেলেছে!

- এই দাদাভাই!

সংবিৎ ফিরে পায় আহমাদ। আয়িশা তাকে ডাকছে।

- কই হারায় গেছিলে?

- তুই এখানে কেনো? তুই না মারামারি করছিলি?

- আমি মারামারি কখন করলাম? আমি তো ভাবীকে চিয়ার আপ করছিলাম!

দু'দিকে মাথা নাড়ায় আহমাদ। কল্পনার রাজ্যে ঘুরতে যেয়ে সে পাগল হয়ে গেছে আর মাহিবার সাথে থেকে তার বোন পাগল হয়ে গেছে। বাহ! দারুন!

- ও যেটা বলতে আসলাম! শোনো।

- বল।

- দাদাভাই!

ভ্রু কুঁচকে গলায় ঝুলে থাকা বোনের দিকে তাকায় আহমাদ।

- কি?

- ও দাদাভাই!

- শুনতে পারছি। বল।

- দাদাভাই গো!

গলা থেকে দুই হাতের বেড়ি খুলে আহমাদ জিজ্ঞেস করে,

- কি চাই?

দু'পাটি দাঁত বের করে আয়িশা বলে,

- তুমি এত ইন্টেলিজেন্ট কবে হলে? একরাত ভাবিমণির সাথে থেকেই তো দেখি তুমি বুদ্ধু থেকে বুদ্ধিমান হয়ে গিয়েছ!

চোখ রাঙায় আহমাদ।

- কি বলবি বল নাইলে ভাগ!

- বলছি বলছি! রাগ করো কেন?

- ইয়ে দাদাভাই! আমাকে ভাবিমণির মত একটা বোরখা কিনে দিবে? কি সুন্দর লাগে দেখতে!

মেজাজ চটে আসে আহমাদের। যেই পোশাকের জন্য মেয়েটার প্রতি তার বিরূপ ধারণা সেই পোশাকের প্রতি তুমুল আগ্রহ আয়িশার। ক্ষেপে যায় সে,

- কারো কিছু দেখেলেই তোমার কিনতে হবে না! এরকম স্বভাব কবে থেকে হচ্ছে?

গলার স্বর পাল্টায়, পাল্টায় সম্বোধন। আয়িশা চমকে উঠে থমকে যায়। আহমাদ তাকে হয়তো কোনোদিনই এভাবে ধমক দেয়নি। বাবা মারা যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় তার জন্ম। বাবা বলতে সে এই ভাইকেই জানে। আহমাদও নিজের সন্তানের মতোই বড় করেছে তাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো ইচ্ছেই অপূর্ণ রাখেনি। সেখানে আচম্বিতে এমন ধমক খেয়ে আয়িশার গাল ভেজানোটা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় না। খানিকক্ষণ ভাইয়ের দিকে চেয়ে থেকে আস্তে আস্তে প্রস্থান নেয় আয়িশা। একটা টু শব্দও করে না আর।

বোনের প্রস্থানে হুশ ফিরে আহমাদের। চোখ বন্ধ করে কষে ধমক দেয় নিজেকে। এবার বোনের মান ভাঙাবে কিভাবে?

_____________________

বারান্দায় চুপচাপ বসে আছে আয়িশা। মাহিবা সেই কখন থেকে তাকে খুঁজছে! আহমাদের সামনা না করে ছোট্ট এই বাড়িতে চলাচল করা তার জন্য মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে বারান্দায় এলে দেখতে পায় দুই গালে হাত দিয়ে বসে থাকা আয়িশাকে।

- আমার ননদিনী এখানে কি করে? আমি তোমাকে কোথায় কোথায় খুঁজছি!

ফিরে তাকায় না আয়িশা। ভ্রু কুঁচকে সেদিকে যায় মাহিবা। আয়িশার গাল ধরে ঘুরিয়ে দেখে মুখে কান্নার ছাপ স্পষ্ট। আতকে উঠে জিজ্ঞেস করে,

- কি হয়েছে পাখি? কেঁদেছো কেনো?

মাহিবার দিকে তাকায় আয়িশা। তার কোমর জড়িয়ে ধরে চুপ করে থাকে।

আয়িশার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম কণ্ঠে মাহিবা জিজ্ঞেস করে,

- ভাবিমণি কে বলবে না সোনা? কি হয়েছে বলো।

ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করে আয়িশা। ভাবনায় মজে মাহিবা। খুঁজতে থাকে না মেলা অঙ্কের ভুল।

_______________________

শ্বশুরের সাথে ঘুরে এসে বাড়ি ফেরে আহমাদ। আজ ফিরে যেতে চাইলেও শশুড় শাশুড়ির জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে আজকের রাতটুকু থাকার সম্মতি দিয়েছে। সদর দরজা পার হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা মুখ খোঁজে। সকালের যুদ্ধের পর আসামী পলায়ন করেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে তার বোন। আয়িশাকে দেওয়ার জন্য কিছু চকলেট এনেছে। একবার সরি বলতেই হবে। মনের ভিতর খচখচ করছে। এমন একটা কাজ কিভাবে করলো সে!

ঘরে প্রবেশ করে মাহিবার পড়ার টেবিলে ঘড়ি রাখতেই চোখ পড়ে মেলে রাখা ডায়েরির পাতায়। পাশেই ফোনের স্ক্রিন জ্বলজ্বল করছে। তাকাতে না চাইলেও দেখে ফেলে একটা আনসেভ নাম্বারে কল গেছে ১৫ বার। এবং সেটা কল লিস্টের সর্বাগ্রে আসন গেড়েছে। সময়টাও দেখা হয়ে যায়। পাঁচ মিনিট আগে শেষবার কল গেছে। চোখ ঘোরাতেই দৃষ্টি থামে কালি দিয়ে তৈরি অনুভূতির পাহাড়ে,

- If you were here, our story could be different. Totally different! You removed me from your life then why am I stuck there till now. WHY!

- Yours someone

বাক্যের মাঝে তাজা অশ্রুর অস্তিত্ব অনুভূতির গভীরতা জানান দেয়। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে আহমাদের। আবার ধোঁকা!

চলমান.