প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ০২
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ০২ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২
ঘরে এসেই আরেকবার চমকে যায় আহমাদ।আজ কি তার চমক পাওয়ার দিন নাকি! মাহিবা ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় বসে আছে। তার পড়নে একটা গোল ফ্রক। হিজাবে মুড়িয়ে রেখেছে শরীরের উপরিভাগ। মনে হচ্ছে মুখটাও মোছেনি। মেয়েটাকে এত ছোট্ট লাগছে কেনো? মা কি তাহলে ধরে বেধে একটা পিচ্চি মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলো! ভাবতেই রাগ বাসা বাঁধে আহমাদের মস্তিষ্কে। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার। বিয়েতে হ্যাঁ বলেছে বলে কি শেষমেশ একটা পিচ্চির সাথে বিয়ে দেবে নাকি! আশ্চর্য! কিন্তু মেয়েটার কথা শুনে তো মনে হলো সে বেশ ম্যাচিওর। স্কুলে পড়ে বলে তো মনে হলো না। কিন্তু এখন তো সেরকমই লাগছে। মনের শঙ্কা দুর করতে দ্রুত গতিতে মাহিবার সামনে যেয়ে বললো,
-আপনি কোন ক্লাসে পড়েন?
চোখ পিটপিট করে তাকায় মাহিবা। এটা আবার কেমন প্রশ্ন? বিয়ে করেছে তার সম্পর্কে কিছুই জানে না নাকি?
-অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে।
বেশ চমকে যায় আহমাদ। চমক নিয়েই প্রশ্ন করে,
- আপনি ভার্সিটিতে পড়েন?
- জি।
- মাদ্রাসায় না?
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় মাহিবা।
- না তো।
- তাহলে আপনি এমনভাবে বোরখা পড়েন কেনো?
স্মিত হাসে মাহিবা। এতক্ষণে আহমাদের চমকের কারণ ধরতে পারে মেয়েটা।
- বোরখা কি শুধু মাদ্রাসায় পড়ুয়া মেয়েদের জন্য?
প্রশ্নটা নিরেট খাঁচায় বদ্ধ আহমাদের কোমল মস্তিষ্কে আঘাত করতে পারলো কি? জানা নেই মাহিবার।
মাহিবার তাকানোর ধরনে যেনো হৃদস্পন্দনে ধাক্কা লাগে আহমাদের। মেয়েটার হুটহাট এমন চাহনি, হাসি যে তার শক্ত মনে ধাক্কা দিচ্ছে মেয়েটা কি জানে? জানে না। ধ্যান ছেড়ে বের হতে চায় আহমাদ। মেয়েটাকে সে অপছন্দ করেছিল। এক দেখায় পছন্দ করলে তো হবে না! নিজ অভিমতে অটল থাকতে হবে। প্রশ্ন এড়িয়ে নিজে প্রশ্ন যোগ করে সে,
-আপনার বয়স কত?
উদাস মাহিবা এবার আর মাহিবা আশ্চর্য হয় না। বুঝতেই পারছে এই লোক তার সম্পর্কে কিছুই জানেনা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
- একুশ প্লাস।
আহমাদ মুখের আদলের সাথে বয়স মেলাতে পারে না। তার কাছে বয়সটা বেশি লাগছে। নাছোড়বান্দা মন স্বস্তি পাচ্ছে না।
- কিন্তু আপনাকে দেখে তো বাচ্চা বাচ্চা লাগছে।
এতক্ষণে মাহিবা বুঝতে পারে জিজ্ঞাসার কারণ।উত্তর দেয়,
-আমার হাইট কম। আরো ফ্রক পড়ে আছি তাই এমন লাগছে। খারাপ লাগছে দেখতে? এটা পাল্টে ফেলবো?
স্বস্তির শ্বাস নেয় আহমাদ। মনে মনে স্বীকার করে মেয়েটাকে দেখতে সুন্দর লাগছে। নিজের স্বীকারোক্তিতে নিজেই বিস্মিত হয়। ঘন্টা খানেক আগে খ্যাত লাগা মেয়েটাকে নাকি এখন তার কাছে সুন্দর লাগছে! অবিশ্বাস্য! ভাবনা ভেঙে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
-না চেঞ্জ করতে হবে না। আপনার যেটা পড়ে সুবিধা সেটাই পড়বেন।
প্রশ্ন পর্ব শেষ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয় আহমাদ। তৎক্ষণাৎ মাহিবা বলে ওঠে,
- একটু দাঁড়ান।
মাহিবার কথায় তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় আহমাদ। মাহিবা জিজ্ঞেস করে,
-আপনি কি এখনই ঘুমিয়ে পড়বেন?
-হ্যাঁ। কেনো?
-আসলে একটু কাজ ছিলো।
এখন আবার মেয়েটা কি কাজ করতে চায়। ভ্রু কুঁচকে আহমাদ জিজ্ঞেস করে,
- কি কাজ?
ইতস্তত করে মাহিবা বলে,
-আজকে যেহেতু আমাদের বিয়ের প্রথম রাত তাই এই রাতে দুইটা কাজ আছে।একটা দুয়া পড়তে হবে আপনাকে আমার মাথায় হাত দিয়ে আর দুই রাকাআত নফল নামাজ পড়তে হবে। এগুলো জরুরি নয় তবে পড়লে বরকতের আশা করা যায়।
এটুকু বলে চোখ তুলে আহমাদের দিকে তাকায় মেয়েটা। লোকটার ভাব ভঙ্গি বুঝতে চেষ্টা করে মাহিবা। আহমাদকে ভাবতে দেখে আবার বলে,
-যেহেতু আপনি বিয়েটা মেনে নিয়েছেন তাহলে আমরা এই সম্পর্কে বরকতের আশা করতেই পারি। একটু পড়বেন প্লিজ? বেশি সময় লাগবে না? দশ মিনিট হলেই হবে ইনশাআল্লাহ।
মাহিবার অনুরোধে গলে গেলেও ভাবে সেটা প্রকাশ করে না আহমাদ। কিন্তু একটু বিব্রতও হয়। কারণ দুয়াটা তার জানা নেই। আহমাদের মনের কথা হয়তো বুঝতে পারলো মাহিবা। চট করে উঠে নিজের হাত ব্যাগ থেকে ফোন বের করে একটা দুয়ার অ্যাপ চালু করে। ফোনটা আহমাদের সামনে ধরে বলে,
-এইযে এটা। আমার কপালের চুলের অংশে হাত দিয়ে পড়ুন।
খানিক চমকায় আহমাদ। মেয়েটা ওর মনের কথা বুঝলো কি করে! ফোন হাতে নিয়ে একবার দুয়ার দিকে দেখে মাহিবার দিকে তাকায়। দেখে সে হিজাবের মাথার দিক খানিকটা ঢিলা করে চুল বের করে রেখেছে। প্রথম কোনো নারীকে ইচ্ছাকৃত স্পর্শ দিতে গিয়ে বেশ অস্বস্তি হয় আহমাদের। নিজেকে সামলে মাহিবার কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে দুয়াটা পড়ে।
অপরদিকে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত পুরুষের প্রথম স্পর্শ অনুভব করে মাহিবা।চোখ বন্ধ করে অনুভব করে তার স্বামী নামক মানুষটির পবিত্র ছোঁয়া। যার জন্য একুশটা বসন্ত হেফাজতে রেখেছে নিজেকে।
দুয়া পড়া শেষ হলে আহমাদ জিজ্ঞেস করে,
-এবার?
বিদ্যুৎ গতিতে চোখ খোলে মাহিবা। উত্তর দেয়,
-এবার দুই রাকাআত নফল নামাজ পড়লেই হবে।
এই পর্যায়ে আহমাদ জিজ্ঞেস করে,
-এগুলো কোত্থেকে শিখেছেন আপনি?
-বই পড়ে জেনেছি। বিভিন্ন হাদীস থেকে।
-ওহ আচ্ছা। আসুন।
জামায়াতে নামাজ আদায়ের জন্য দাড়ায় দুজনে। আহমাদ সামনে তার পেছনে মাহিবা। তাকবীর দেওয়ার আগ মুহূর্তে মাহিবা বলে উঠে,
-এক মিনিট।
আহমাদ ঘুরে তাকায়। জিজ্ঞেস করতে চায়,
-কী হলো?
কিন্তু তার আগেই নিজের পায়ের কাছে মাহিবাকে বসতে দেখে এবং তার পায়ে হাত দিতে দেখে চমকে যায় আহমাদ। দ্রুত সরে যায়। জিজ্ঞেস করে,
-কি করছেন কি?
নিচে থেকেই মুখ উচু করে মাহিবা বলে,
-আপনার ট্রাউজারটা একটু গুটিয়ে দেই। টাখনু ঢেকে যাচ্ছে।
এভাবে মাহিবাকে কথা বলতে দেখে সত্যিই আহমাদের কাছে ওকে বাচ্চা মনে হচ্ছে।নিয়মিত নামাজ পড়ায় বিষয়টা জানে আহমাদ। টাখনু ঢেকে থাকলে নামাজ হয় না। উত্তরে বলে,
-আমি ঠিক করছি আপনি উঠুন।
বলতে বলতেই মাহিবা আহমাদের ট্রাউজার গুটিয়ে দেয় সাথে বলতে থাকে,
-আমি যথাযথ চেষ্টা করবো আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার। তবে বন্ধুত্ব কখন করেইছেন আপনার একটু আধটু কাজ আমাকে করতে দিয়েন। আমার ভালো লাগবে।
মাহিবার কথা কাজ দুটোই ভালো লাগলো আহমাদের কাছে। কাজে মনে হলো মেয়েটা তাকে সম্মানের আসনে বসিয়েছে। কথায় মনে হলো মেয়েটা তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছে।নিজের প্রতি এমন সম্মান পেয়ে বেশ আনন্দিত হলো আহমাদ। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই খেলে গেলো সূক্ষ্ম হাসির রেখা।
পুরুষ মানুষ নিজ স্ত্রীর কাছ থেকে সম্মান আশা করে। বাইরে যেমনই হোক না কেনো। তার আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক না কেনো তার ঘরের রাণী, তার সন্তান সন্ততির থেকে সে সম্মান আশা করে। এটা তাদের প্রকৃতিগত স্বভাব। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ভাব এতে নেই। তাই আহমাদের কাছেও বিষয়টা ভালো লাগলো। সে কি বুঝতে পারলো তার হৃদকুঠির শক্ত প্রাচীর ডিঙিয়ে মেয়েটা নিজের জায়গা করে নিচ্ছে?
রবের শুকরিয়ায় লুটিয়ে পড়লো দুই মানব-মানবী। সিজদায় লুটিয়ে ব্যক্ত করলো নিজেদের চাওয়া। অতঃপর অবশ্য কর্তব্য হিসেবে গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। উদ্দেশ্য এক সুখনিদ্রা উদযাপন।
ক্লান্তিকর দিনশেষে আহমাদ ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালেও তন্দ্রা নামে না মাহিবার চোখে। বাইরে থেকে নিজেকে শান্ত রাখার প্রয়াস চালালেও ভেতরে ভেতরে মনটা বেশ ভয়ে আছে। লোকটা এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত জানিয়েছে ওকে। সেও সায় জানিয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে। কিন্তু এখন যে চিন্তারা ঘিরে ধরছে তাকে! অথৈ সাগরে নিজেকে কুলহারা মনে হয় মাহিবার। দাম্পত্য জীবনে নিশ্চয়ই স্বামী স্ত্রীর মাঝে একটা সুন্দর সম্পর্কের প্রয়োজন? কিন্তু আহমাদ তাকে যেসব কথা বলেছে সেই কথার রেশ ধরে তার সাথে কতটা সুন্দর সম্পর্ক সে তৈরি করতে পারবে সেটা নিয়ে সে যথেষ্ট চিন্তিত। একটা সম্পর্ক কি একজনের চেষ্টায় টিকিয়ে রাখা সম্ভব? কিভাবে কি হবে ভাবতে ভাবতে নিজেকে দিশেহারা লাগে মাহিবার। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চায়। নিজেই যেনো নিজেকে বোঝায়,
- আল্লাহ আমাকে এই সম্পর্ক পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। বাকি জীবন পাড়ি দিতেও উনিই সাহায্য করবে। আমার টেনশন করে কাজ নেই।
চোখ বন্ধ করে আবেদন করে,
- আমাকে সাহায্য কোরো আল্লাহ। প্লিজ!
একজন পুরুষের উপস্থিতিতে স্বস্তি পায় না মাহিবা। চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে ফের পাশে শুয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকায়। কি নির্বিকার ভাবে ঘুমিয়ে আছে! পাশে যে জলজ্যান্ত একটা মেয়ে শুয়ে আছে এতে যেনো তার কোনো হেলদোল নেই! হুট করেই বাবা মায়ের কথা স্মরণে আসে মাহিবার। দুঃখরা কড়া নাড়ে হৃদকপাটে। ছোটো ভাইটার কথা মনে হতেই চোখ টলমল হয়ে ওঠে। বুকে দগদগে ঘা হয়ে যাওয়া এই কষ্টগুলো কবে একটু কমবে?
চলমান.