প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২৫
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২৫ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২৫
বুকটা ধ্বক করে উঠলো। শান্ত হৃদয়ের চঞ্চল গতির প্রভাব গিয়ে পড়লো কণ্ঠনালীর উপর। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে মাহিবা জিজ্ঞেস করলো,
- কেনো? কি হয়েছে?
- শিহাব ফোন দিয়েছিলো। এক্ষুনি যেতে বললো।
- কারো কিছু হয়েছে?
- বলতে পারছি না। ও বিস্তারিত কিছু বলেনি। তুমি এখানেই থাকো। আমি আর ইফাদ যাচ্ছি।
আহমাদ চলে যায়। দরজার কাছের ঐ জায়গাটায় যেয়ে দাঁড়ায় মাহিবা। আহমাদ চলে গেলেও তার দৃষ্টি নড়ে না। অটল হয়ে দুয়া করতে থাকে, "সবার ভালো হোক, কারো কোনো ক্ষতি না হোক।"
প্রায় ঘন্টা দুই পরে আহমাদ এবং ইফাদের আগমন ঘটে। অজানা আশঙ্কে মায়াবাড়ির প্রত্যেকটা কোন যেনো আতঙ্কিত ছিলো। সেই অদৃশ্য আতঙ্কের ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে মিহি গলার সুতনু চিৎকারে মেতে ওঠে পুরো মায়াবাড়ি। নতুন কারো আগমনী বার্তা বয়ে আনে। নাজমা বেগম চমকে ওঠেন। সাথের ছোট্ট মেয়েগুলো দৌড়ে মাঠে চলে গেছে। বয়সে তুলনামূলক বড়ো মেয়েগুলো উকি দিয়ে দেখে ছুটে এসে জানায়,
- ভাইয়ারা একটা বাবু নিয়ে এসেছে!
এগিয়ে যান নাজমা বেগম। এ এখানকার রোজকার চিত্র। কিন্তু বাচ্চাটা কতটুকু হবে? কিন্তু মাহিবা উত্তেজিত। কি হচ্ছে? কিভাবে হচ্ছে? কতো প্রশ্ন তার!
মাঠের দিকে আগাতেই আরো কিছু দৃশ্য চোখে ভাসে।
- উজবুক! এমন করে কেউ বাচ্চা কোলে নেয়!
কটমট করছে ইফাদের দৃষ্টি। বিব্রতবোধ করে আহমাদ। আত্মপক্ষ সমর্থনে বলে,
- আমি এর আগে কয়টা বাচ্চা পালছি যে জানবো? আশ্চর্য তো!
- ক্যান তোর বো/মা হা-ম/লা রে পালিস নাই? নাহ্! আমার বউমার কপাল খারাপ! একটা আমড়া কাঠের বাপ পাবে। আহারে! বেচারা! ওহ্ সরি! বেচারি!
- নে তুই নে!
সদ্য নিয়ে আসা বাচ্চাটাকে ইফাদের কোলে দিয়ে দেয় আহমাদ।
- কি গো বাবারা? ঘটনা কি?
ইফাদ বলে,
- ঘটনা আর কি চাচী! বাচ্চা পাইসি, নিয়া আইসি!
- আহা! পাইলা কই? আর বাচ্চা তো দেখি বেশি ছুডু! দেও দেখি আমার কোলে!
ছোট্ট তোয়ালে মোড়ানো প্রাণটাকে কোলে নেন নাজমা বেগম। বাচ্চাটা এসে থেকে কেঁদে যাচ্ছে। ছেলে দুটো সুন্দর করে কোলে তো নেয়ই নি তার উপর আবার হাতাহাতি করছে।
- অ মানিক! অর বয়স কয়দিন? আমার তো মনে হয় দুই দিনও হয় নাই!
হতাশ শ্বাস ছাড়ে আহমাদ। ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করে,
- শিহাবের হাসপাতালে গতকাল একটা ডেলিভারি হয়েছে চাচী। এই বাচ্চা গতকাল সকালে হয়েছে। সেই হিসেবে দেখতে গেলে দুই দিন এখনও হয় নি।
- তয় বাপ মায় কো?
- মগের মুল্লুকে।
- আহ ইফাদ! চাচী শিহাব বললো কালকে ঐ ছেলে মেয়ে দুইটা একাই এসেছিলো। আমাদের থেকে নাকি অনেক ছোটো। আর কোনো অভিভাবক নাই। আবার পরিচয় দেওয়ার সময়ও নাকি কেমন সন্দেহজনক আচরণ করেছে। তারপর ডেলিভারি হয়ে গেলে ওই ছেলেকে আর দেখা যায় নি, মেয়েটা একাই ছিলো। আজকে দুপুর থেকে সেও লাপাত্তা।
নাজমা বেগম বুকের সাথে জড়িয়ে নেন ছোট্ট প্রাণটা। কি নিয়তি নিয়েই না বাচ্চাটা এসেছে! কে জানে ছেলে মেয়ে দুটো ওকে রেখে ওভাবে পালালো কেনো!
- আমি যাই। ওরে কি করন যায় দেখি।
সায় জানিয়ে ইফাদের অফিস কক্ষে যায় দুজন। আহমাদ ইফাদকে জিজ্ঞেস করে,
- পুলিশের সাথে কথা হইসে?
- শিহাব বলছে। আর ঐ লোক তো পরিচিত। আহনাফের সময় থেকে চিনে।
- তখন বোধহয় আহনাফের বয়স এক বছর হবে না?
- আরে না! আট মাস ছিলো!
- ওহ!
- আচ্ছা এমন বাচ্চা রেখে মানুষ পালায় কেমনে ভাই?
- কি জানি!
- মানুষের জীবন! কেউ বাচ্চা না হইলে বউ ছাইড়া দেয়। আবার কেউ বাচ্চার ভয়ে পালায় বেড়ায়। সেলুকাস!
নীরবতা ছেয়ে যায় পুরো কক্ষ জুড়ে। আগমনী ভবিষ্যৎ থেকে বর্তমান নিয়ে সকলের চিন্তা বেশি।
• • •
নবজাতকের পরিচর্যা করছেন নাজমা বেগম। মাহিবা উৎসুক চোখে সেটা দেখে চলেছে। নাজমা বেগম যেখানে যান সে ও পিছু পিছু যায়। পেছন থেকে, সামনে থেকে দেখতে থাকে বাচ্চাটাকে। এমন ঘটনা তার জীবনে নতুন কি না!
- আম্মা! ছেলে নাকি মেয়ে?
- মাইয়া।
- ওও! আম্মা! আমি একটু কোলে নেই?
- নিবা? দাঁড়াও! গায়ে কিসু দিয়া দেই।
খুব সাবধানে নরম দেহটাকে দুহাতে জড়িয়ে বুকে নেয় মাহিবা। বিস্মিত নয়নে দেখতে থাকে এক বাচ্চাকে, সদ্যই যার বাবা-মা তাকে ছেড়ে পলায়ন করেছে। হঠাৎ চোখ যায় ডান চোখের কোণায়। সামান্য ছোট্ট একটা লাল চিহ্ন। কেমন গোল আকৃতি! অপলক সেদিকে চেয়ে থাকে মাহিবা। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেয় সেই অংশটুকু। বুকের মাঝে কি যেনো কামড়ে ওঠে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। পথ পাড়ি দিয়ে সেই অশ্রু জায়গা নেয় নবজাতকের গালে। নাজমা বেগম হকচকিয়ে ওঠেন।
- অ বউ! কি হইসে? কান্দো ক্যান মা?
ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে মাহিবা। ভয় পেয়ে আহমাদকে ডেকে পাঠান মহিলা। খবর শুনে তড়িৎ ছুটে আসে আহমাদ। ইফাদ আসতে চাইলে তাকে নিবৃত করে। ঘরে ঢুকে মাহিবার শিয়রে যেয়ে বসে।
- কি হয়েছে মাহিবা?
- দে...দেখুন!
কণ্ঠ অস্পষ্ট, রুদ্ধ। পেছন থেকে নবজাতকসহ মাহিবাকে আগলে নেয় আহমাদ। মাহিবার বাহুতে ভরসাপূর্ণ স্পর্শ দিয়ে নরম গলায় বলে,
- আস্তে! আস্তে! শান্ত হও। কাঁদলে আবার শ্বাসকষ্ট হবে!
নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে মাহিবা। কান্নার রেশ থেকেই যায়। ধরা গলায় বলে,
- দেখুন ওর চোখের পাশে কেমন একটা জন্মদাগ?
- কই? হ্যাঁ! এইতো।
- জানেন ইশিকার একদম এরকম একটা জন্মদাগ ছিলো। এই ডান চোখের কোণাতেই!
- তাই!
- হ্যাঁ! আপনারা ওর নাম রেখেছেন?
- না। এখনও রাখা হয় নি।
- আমি রাখি?
- রাখবে? কি রাখবে?
- ইশিকা!
থমকে যায় আহমাদ। মৃত বান্ধবীর প্রতি ভালোবাসার গভীরতা তাকে থমকে যেতে বাধ্য করে। মেয়েটার ভালোবাসার গভীরতা যতো সে বুঝতে পারছে ততো যেনো নিজেকে বড়ো তুচ্ছ রূপে আবিষ্কার করছে। মাহিবাকে মাঝে রেখে তার হাতের উপর দিয়েই বাচ্চাটাকে স্নেহের স্পর্শ দেয়। মিহি কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
- ইশিকা!
তার অবাক, বিস্মিত অবস্থা বোঝাতে না পারলেও বুঝিয়ে দেয় তার সম্মতি। মাহিবার চেহারায় খুশির ঝিলিক ওঠে। এই যে তার ইশিকা, তার কোলে! চোখের কোণে জন্মদাগটা দেখে যেনো মাহিবার চকচকে চোখ ব্যঙ্গ করে বলে,
- কি রে ইশিকা? কি চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়েছিলি? আন্টি এমন মাইর মারলো একেবারে পার্মানেন্ট দাগ হয়ে গেলো! আহারে!
নাজমা বেগম ঘর ভর্তি মেয়ে নিয়ে চোখ জুড়িয়ে সে দৃশ্য দেখেন। তার মানিক আর মানিকের বউ! এমন দৃশ্য তো সারাদিন দেখলেও মনে ভরে না!
•• •• ••
অনেক কষ্ট মাহিবাকে নিয়ে এসেছে আহমাদ। মেয়েটা ইশিকাকে রেখে আসতেই চাইছিলো না। আশ্বাস দিয়েছে খুব শীঘ্রই আবার নিয়ে যাবে। তবেই শান্ত হয়ে বাড়ির পথ ধরেছে মেয়েটা।
বাড়ি ফিরেই শাশুড়ি ও আয়িশার কাছে ঘটনার বর্ণনা করে মাহিবা। সালেহা বেগমের দৃষ্টি মাহিবার হাতের চুড়িতে। এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করেন,
- এই চুড়ি কোত্থেকে পেলি মাহিবা?
কথার মাঝে থেমে যায় মাহিবা। হাতের দিকে তাকিয়ে হাসে। বলে,
- আম্মা দিয়েছে।
জিজ্ঞাসু চোখে তাকান সালেহা বেগম। জিভে কামড় দিয়ে মাহিবা আবার বলে,
- ঐ বাড়ির নাজমা চাচী আছে না? উনি দিয়েছে। খুব করে ধরলো। তাই নিয়েছি। আবার বললো উনার নাকি খুব ইচ্ছা উনার মানিকের বউএর মুখ থেকে আম্মা ডাক শোনে। তাই বলেছি। আপনি রাগ করেছেন মা?
- না মা! রাগ করবো কেনো? খুশি হয়েছি। নাজমাটা বড়ো আদর করে আমার ছেলেটাকে। নিজের ছেলের কাছে ঠাই পেলো না। ঐ কষ্ট যদি আমার ছেলে, ছেলে বউকে দিয়ে কমে তাতে ক্ষতি কি?
মাহিবার থুতনি ধরে আদর করেন সালেহা বেগম। গর্বে তার বুকটা ফুলে ফুলে উঠছে। চুড়ি দুটো বহু পুরাতন। জায়গায় জায়গায় কেমন কালো হয়ে গেছে। সোনার পরিমাণ কতোটুকু থাকতে পারে তিনি জানেন। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে যে মেয়েটা একজন মায়ের মনের খুশিকে সম্মান দিয়েছে এতে যেনো নিজেকে তার ধন্য মনে হয়। এমন মেয়ে শাশুড়ি হতে পেরে যেনো নিজেকে বড়ো স্বার্থক লাগে।
ঘরে গেলে সেই অলঙ্কার দৃষ্টি কাড়ে আহমাদেরও। ও দুটো তার ঢের চেনা আছে। অবাক নেত্রে সামনের মেয়েটাকে পরোখ করে আহমাদ। ঘটনা বুঝতে তার সময় লাগে না এক মিনিটও। মেয়েটা তার সম্মান কোথায় নিয়ে ঠেকিয়েছে সে জানে? উহু! সে তো নির্বিকার!
কাজ নিয়ে বসতে চাইলে মাহিবা বাঁধ সাধে।
- কতো রাত হয়ে গেছে! এখন আর বসতে হবে না। সকালে করবেন। শুয়ে পড়ুন।
- এখন না করলে তো এগিয়ে রাখতে পারবো না। আর সকালে অতটুকু সময়ে হয়ও না।
- কাল নাহয় একটু আগে উঠলেন। সকালে কাজের গতি ভালো থাকে। ফ্রেশ মাথায় কাজ ভালো হবে। ঘুমান তো! আমি ওযু করে আসি।
- তারাতারি ডেকে দেওয়ার দায়িত্ব তাহলে আপনার রইলো কিন্তু!
- আচ্ছা।
বিছানায় যেতেই আয়িশা দরজায় কড়া নাড়ে।
- দাদাভাই! আসি?
- আয়!
- দাদাভাই! পাঁচটা টাকা দাও! তাহলে একশো টাকা হয়ে যাবে।
ঢুকতে ঢুকতে বলে আয়িশা।
- কি করবি টাকা দিয়ে?
- কালকে মসজিদে দিবো।
- ওটা কি? দেখি।
হাতের বক্সটা ভাইয়ের কাছে দেয় আয়িশা। বক্সটা নেড়েচেড়ে দেখে আহমাদ।
- এখানে বাবা লেখা কেনো?
- এটা বাবার জন্য তাই।
- মানে?
মাহিবা যেমন যেমন বলেছিলো তেমন তেমন আহমাদকে বলে আয়িশা।
সব কথা শুনে আহমাদের মনে হয় জীবিত বাবার জন্য কিছু করতে পারলেও মৃত বাবার জন্য সে কিছু করতে পারেনি। কিচ্ছু না! বক্স থেকে টাকাগুলো নিজের কাছে নিয়ে সে বলে,
- আমি দিয়ে দিবো মসজিদে। হবে?
- আচ্ছা। মনে করে দিও কিন্তু?
- হুঁ।
- যাই আমি।
ওযু করে বের হতেই মাহিবার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আহমাদ।
- আয়িশাকে এসব কি শিখিয়েছেন?
- কি শিখিয়েছি?
প্রশ্নের ধরণে একটু ভয় পায় মাহিবা।
- বাবার জন্য ও টাকা গুছিয়েছে।
- ওহ্! এই ব্যাপার! তাই কি হয়েছে?
- আমাকে শেখাননি কেনো?
- হ্যাঁ?
- আমি কি আপনার শত্রু?
- কি বলেন এসব!
- আশ্চর্য! যা ভালো কাজ সব আপনারা করবেন নাকি?
ধুপ করে শুয়ে পড়ে আহমাদ। বোকা বনে যায় মাহিবা। হলো কি লোকটার?
লাইট অফ করে বিছানায় আসে মাহিবা। আহমাদের পিঠে হাত রেখে বলে,
- এবার থেকে সব শেখাবো। প্রমিস!
- মনে থাকে যেনো!
- থাকবে ইনশাআল্লহ।
- সকালে ঠিক সময়মত আমাকে ডাকতে না পারলে আপনার খবর খারাপ আছে।
- আচ্ছা! সেই খারাপ খবর সকাল আটটায় পাঠ করবেন। আজকের মতো এখানেই বিদায়।
হালকা হাসির শব্দ পাওয়া যায়। নিস্তব্ধ রাতের নির্জন প্রহরে নৈঃশব্দের অলি গলিতে সেই হাসি দামামা বাজিয়ে চলে।
চলমান.