প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩৪
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩৪ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩৪
- কিছু তো খাওনি শুনলাম। খেতে হবে। ওষুধ খাওয়া লাগবে।
- না না! কিছু খাওয়া লাগবে না। এই জ্বর এমনিই সেড়ে যাবে।
- আমি জানি কি হবে না হবে। আমাকে শেখাতে হবে না।
গম্ভীর কণ্ঠে বিপরীতে মিনমিন করে মাহিবা বলে,
- শেখার কোনো বয়স নেই। এখনও আপনি শিখতে পারবেন।
আহমাদ চোখ রাঙিয়ে তাকালে চুপ করে মাহিবা।
- চুপ করে বসে থাকো। আমি খাবার নিয়ে আসি।
তাড়াহুড়া করে উঠে মাহিবা বলে,
- না না! আমি যাচ্ছি। আপনি বসুন।
- আচ্ছা! এভাবে বাইরে যাবে? যাও!
পরনে থাকা শার্টের রদিকে তাকিয়ে মাহিবা বলে,
- পাল্টে যাচ্ছি।
- ততক্ষণে আমি খাবার নিয়ে চলে আসতে পারবো। আমি গেলে কি হবে? কোনো গুপ্ত রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে নাকি?
- কি যে বলেন!
- তাহলে থাকো। আমি যাই।
দরজা পার হতে হতে বলে,
- শার্ট পাল্টাতে হবে না। থাকুক। সুন্দর লাগছে।
হাসে মহিবা। আহমাদ কিছুটা গম্ভীর। মন খুলে প্রশংসা করা তার ধাতে নেই। কিন্তু সময়ে অসময়ে এই লোকটা মন খুলে কথা বলে। নিজেকে প্রকাশ করে। তখন মাহিবার কি যে ভালো লাগে! এই যে একটু আগেই তো বলছিলো। নিজের অতীত জীবনের ঘটনা জানালো। ক্ষমা চাইলো, নিজেকে প্রকাশ করলো। মাহিবা চায় আহমাদ নিজেকে তার কাছে মেলে ধরুক বইয়ের পাতার মতো। কিন্তু ছেলেটা সবসময় এমন করে না। এই যে তার প্রশংসা করলো এটা একটু সুন্দর করে বলা যেতো না? যেতো। কিন্তু আহমাদ এভাবে বলেই অভ্যস্ত। নিজের মনেই ভাবলো মাহিবা, লোকটা যেভাবে অভ্যস্ত তাকে সেভাবেই নিজেকে প্রকাশ করতে দেওয়া উচিত। জোর করলে হয়তো ভিন্নতা আসবে কিন্তু সেখানে কৃত্রিমতা চলে আসত পারে। থাক, দরকার কি? এই তো আছে বেশ!
শ্বশুর শাশুড়ি ঘুমিয়ে গেছে। মাহিদ তার ঘরে। নিশ্চিন্তে খাবার নিয়ে নেয় আহমাদ। ফিরতি পথ ধরতেই সম্মুখে আসে মাহিদের হাসি মুখ। ছেলেটা দুপাটি দাঁত বের করে হাসছে। এমন হাসি মানেই আহমাদের জন্য সাত নম্বর সতর্ক সংকেত। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। বিপদ অতি নিকটে।
- হাতে কি দুলাভাই?
- ভাত।
- আপনি কষ্ট করে নিতে গেলেন কেনো? আম্মু ঘুমাচ্ছে তো কি হয়েছে? আমাকে বললে আমিই আপনাকে জামাই আদর করতে পারতাম!
- এটা মাহির জন্য।
- ওওও আচ্ছা! মাহিইইইর জন্য? ভালো ভালো!
বিব্রত হয় আহমাদ। ছেলেটার শিরায় শিরায় দুষ্টুমি। একটা সুযোগ ছাড়ে না আহমাদকে জ্বালাতন করার।
- আচ্ছা যাই।
- দুলাভাই!
- বলো।
- মাহিইইই আপুর জন্য চকলেট এনেছেন? আমাকে দেবেন না?
এদিক সেদিক তাকায় আহমাদ। ছেলেটার সামনে নাম বলেও বিপদে পড়েছে।
- আমি যাই হ্যাঁ? ও বসে আছে।
- আচ্ছা দুলাভাই। যান। কাল চকলেট খাবো ঠিকাছে?
দ্রুত জায়গা ছাড়ে আহমাদ। এই ছেলের আশেপাশে থাকা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা।
আহমাদকে এভাবে ঘরে ঢুকতে দেখে মাহিবা জিজ্ঞেস করে,
- কি হয়েছে?
রেষপূর্ণ চাহনি দিয়ে আহমাদ বলে,
- তোমার ভাই আস্ত একটা ফাজিল!
- কেনো? কি করেছে ও?
- কি করেনি তাই বলো!
এক এক করে সব ঘটনা বললো আহমাদ। হাসতে থাকে মাহিবা। ভাইয়ের দুষ্টুমি সম্পর্কে তার ধারণা আছে। তবে ছেলেটা যে আহমাদের সাথেও একই কাজ শুরু করেছে সেটা তো ঠিক পায়নি!
- হাসবে না একদম।
- হাসি আসলে কি করবো?
- কিছু করতে হবে না। ভাত খাও।
হাত ধুয়ে এসে প্লেট হাতে নিয়ে মাহিবা বলে,
- আপনারও তো খাওয়া হয়নি। আসেন একসাথেই খাই।
- তুমি জানলে কিভাবে?
- এভাবেই।
- আমার ভালো লাগছে না তুমি খাও।
- অল্প একটু খান। আমি খাইয়ে দেই। খাবেন?
কোনো উত্তর না দিয়ে কাছে এসে বসে আহমাদ। এক হাতেই আহার সাড়ে দম্পতি।
•• •• ••
শীত আসতে চলেছে। তাকে স্বাগত জানাতে সেজে উঠেছে পুরো প্রকৃতি। আবহাওয়া জানাচ্ছে সংকেত, দরজায় কড়া নাড়ছে শীত। সেই সংকেতের প্রকাশ হিসেবে আগে ভাগে ছুটি নিচ্ছে সূর্য। দায়িত্বের সময় ছোট করে অন্ধকারের স্থায়ীত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যা নেমে আসার আগ মুহূর্তের আকাশটা মাহিবার খুব পছন্দ। কেমন যেনো একটা আবেশ মিশে থাকে। স্বচ্ছ গোধূলী আকাশটার দিকে তাকালে মন কেমন করে ওঠে। হুট করে কোনো পুরনো দিনের স্মৃতি মনে পড়ে। সেদিনও ছিলো এরকম আকাশ। একদম এরকম..
আহমাদের হাত ধরে ফুটপাতে হাঁটছে মাহিবা। সময়টা তার কাছে খুবই দামী লাগছে। দামী বলাও ঠিক হবে না। কোনো দামের বিনিময়েই এই সময়টুকু কিনে নেওয়া সম্ভব না। মনের গহীন থেকে এই মুহূর্তকে অনুভব করছে সে। দূর ভবিষ্যতে যখন কঠিন সময় আসবে তখন এই সময়টুকুর কথা মনে করবে। যখন আহমাদের উপর কোনো কারণে রাগ হবে তখন আজকের এই বিকেলটার কথা স্মরণ করে রাগ কমাবে। যে লোকটা হাতে হাত রেখে অজানায় পাড়ি দিতে পারে তার সাথে নিশ্চয়ই বেশিক্ষণ রেগে থাকা যায় না?
হুট করে থেমে পড়ে সে। সামনেই একটা মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা তার কলেজের বান্ধবী। হাতে টান পড়ায় পিছু ফিরে তাকায় আহমাদ।
- কি হলো?
- ঐ যে আমার বান্ধবী! দাঁড়ান দেখা করে আসি।
মেয়েটা একাই দাঁড়িয়ে ছিলো। আহমাদ সাথে গেলেও কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়ায়। দুই বান্ধবীর আলাপের সময় সে থাকলে নিশ্চয়ই মন খুলে কথা বলতে পারবে না?
পিঠের উপর হঠাৎ থাবা পড়ায় চমকে যায় মেয়েটা। যদিও সেটা আঘাত পাওয়ার মতো ছিলো না কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত ছিলো বটে। পিছু ফিরে থাবার মালিককে দেখতেই চমক ভুলে বিস্মিত হয়ে পড়ে সে।
- বাহ! বাহ! মানুষ আজকাল আর খবর রাখছে কই? আমিই খুঁজে মরি!
- মাহিবা! মাহিবা কেমন আছিস তুই?
- আহা! এখন আর মাহিবা মাহিবা করা লাগবে না। ঢং! মেসেজের পর মেসেজ দেই, উনার রিপ্লাই দেওয়ার সময় নাই। ফোন তো বহুত দূরের কথা।
- আরে ব্যস্ত থাকি রে খুব! এই যে দেখছিস না? দম নেওয়ারই সময় পাই না।
কোলের বাচ্চাটাকে ইশারা করলে তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে মাহিবা জিজ্ঞেস করে,
- তোর কোম্পানির প্রোডাক্ট?
- ধুর! তোর যতো আজেবাজে কথা! আমার ছেলেকে তোর প্রোডাক্ট মনে হচ্ছে!
- আমি তো ধুরই হবো। ভালো মানুষ তো তুমি। ছেলে পেটে আসলো, বড়ো হয়ে বাইরে বের হয়ে গেলো, বের হয়ে ওয়া ওয়া করছে আর এখন তুমি বলছো "আমার ছেলে"। ভালো! খুব ভালো! তা যাই হোক সিল মেরে নিয়ে ঘুরছিস যে দেখেই চেনা যাবে। তোর মুখের যেখানে তিল ওরও সেখানে তিল। যাক কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার কই?
- মাহিবা! তোর কথা আর পাল্টালো না!
- পাল্টাবেও না। কই সে?
- ঐ যে! কার সাথে যেনো কথা বলছে।
নির্দেশিত দিকে তাকিয়ে মাহিবা দেখে আহমাদ কারো সাথে গল্পে মেতেছে। বেশ হাসিখুশি লাগছে দেখতে। তার মানে ওটাই বান্ধবীর বর?
সকলেই পরিচিত হয়। একদিন আনুষ্ঠানিক দেখা সাক্ষাতের কথা নিয়ে যে যার গন্তব্যের দিকে ফেরে।
আহমাদ বেশ উদাস। কথা নেই মুখে। কেহ্যাল করে মাহিবা।
- আপনার কি হয়েছে?
ধরে রাখা হাত ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে মেয়েটা। আহমাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
- টেনশন হচ্ছে মাহি। চাকরির বাজার যেই কঠিন! অনেক কষ্ট এই চাকরিটা পেয়েছিলাম। এখন কিভাবে কি করবো বুঝতে পারছি না।
বুঝতে মাহিবাও পারছে না। কিন্তু টেনশন করলে তো কোনো সমাধান বের হবে না।
- আপনি কারো সাথে পরামর্শ করুন।
- কাকে বলবো? কাউকেই বলিনি এখনও। ইফাদ জানে আর তুমি। কাউকে বলার সাহস হচ্ছে না।
যুক্তিপূর্ণ কথা। মাহিবা বেশ ভাবুক হয়। কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে বলে,
- এখন আপনার অভিভাবক হিসেবে আছে মা, চাচ্চু আর শ্বশুর-শাশুড়ি, ঐদিকে খালামণিরাও আছে। আমার মনে হয় আপনার সকলের সাথে একবার কথা বলা উচিত। তারা অভিজ্ঞ মানুষ। নিশ্চয়ই কোনো বুদ্ধি দিতে পারবেন ইনশাআল্লহ। আর ইফাদ ভাইকেও বলুন খোঁজ খবর নিতে। আল্লহ সহায় হবেন।
- হুঁ!
প্রকৃত পক্ষে চাকরি হারানোর খবরটা তার কাউকে জানাতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু কিছু তো করতেই হবে।
ভাবতে থাকে আহমাদ। ভাবনার এখন অনেক সময়। কি করা যায়? কিভাবে করলে সবটা আবার ঠিক হবে?
চলমান.