প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩৬

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩৬ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩৬

সন্ধ্যা পেরিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। বইয়ের পাতাগুলো একের পর এক জায়গা পাল্টাচ্ছে। অনড় হাতদুটো তাদের স্থির থাকতে দিচ্ছে না। বর্ষ পরিবর্তনের পরীক্ষার বেশিদিন বাকি নেই। অর্থ সংক্রান্ত কিছু কাজও বাকি আছে। কিন্তু সেগুলো বলার মতো কোনো উপায় পাচ্ছে না মাহিবা। বিয়ের পর থেকে এই ছোট্ট সময়ে তার সকল আর্থিক দায়িত্ব আহমাদ পালন করে এসেছে। সরাসরি না বললেও মাহিবা বুঝেছে বাবার থেকে কোনো রকম সাহায্য নেওয়ার ব্যাপারে আহমাদ বেজায় নারাজী মনোভাব। টাকা পয়সা সম্পর্কিত দিকগুলো সে এতো সুন্দর ভাবে সম্পন্ন করে আসছিলো যে মাহিবাকে কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি। অন্যরকম কোনো চিন্তাকেও মাথায় জায়গা দিতে হয়নি। তবে তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার আগে কিছু তো একটা করা চাই! এই মুহূর্তে এসে বাবার কাছে কিছু বলতে লজ্জা লাগছে বটে। স্বামীর অক্ষমতার সময় বাবার দ্বারে চাইতে সংকোচ বোধ করছে মাহিবা। এই বাড়িতে আরো দুজন তো পড়াশোনা করছে। তাদেরও তো একটা ব্যবস্থা হবে। তাহলে? তাকে আর আলাদা করে নিজের জন্য কিছু ভাবতে হবে না। অন্তত বাবার কাছে স্বামীর দুঃসহ অবস্থায় আলোকপাত করতে সে পারবে না। আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির জন্য এটা নিশ্চয়ই সুখকর হবে না?

কিন্তু মানুষটা কই? সেই যে আযানের আগ মুহূর্তে বেতার মাধ্যমে একটু ক্ষুদ্র বার্তা আদান প্রদান হলো তারপর থেকে তো লোকটার আর কোনো খোঁজ নেই! মানুষটা খুব অস্থির হয়ে আছে। শান্তিতে বসছে না দু দণ্ড। সবটাই বোঝে মাহিবা। তবে শান্ত লোকটার এমন অশান্ত অবস্থা তার মনগ্রামে কালবৈশাখীর উৎপাত ঘটাচ্ছে। খাওয়ার সময় তার অন্যমনস্ক ভঙ্গি পীড়া দিচ্ছে মেয়েটার অন্তঃকরণে। মনের সুক্ষ্ম গলিতেও জোর আওয়াজে মাইকিং হয়, "মানুষটা যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক।"

দুয়ায় মগ্ন মনটা এক চঞ্চল কণ্ঠে বিচ্ছিন্ন হয়,

- ভাবিমণি!

চিন্তার ছাপকে দূরে সরিয়ে মেয়েটা উচ্ছলতার আল্পনা আঁকে আদল জুড়ে।

- বলো আয়িশু!

- জানো আজকে কি হয়েছে?

- না তো! তুমি জানাও কি হয়েছে!

বিনা আমন্ত্রণেই মাহিবার কোলে জায়গা করে নেয় আয়িশা। অলিখিতভাবে জায়গাটা সে নিজের নামে লিপিবদ্ধ করে নিয়েছে। তাই সংকোচ করার কোনো কারণ নেই!

- একটা আন্টিকে দেখলাম বাবু খেয়ে ফেলেছে!

বিস্মিত মুখে বলা কথাটা বুঝতে পারে না মাহিবা।

- মানে?

- আন্টির পেট এত্তো বড়ো হয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, "তোমার পেটের ভিতর কি?" বলে, "আমার বাবু।" বলো তো ভাবিমণি! নিজের বাবু কেউ খেয়ে ফেলে? আন্টিটা পাগল!

ঠোঁট ফুঁড়ে বের হওয়া হাসির শব্দ আঘাত করে প্রত্যেক দেওয়ালে দেওয়ালে। সেই শব্দে ঘরে উকি দেয় আফিয়া।

- আমাকে রেখে দেখি ভালোই আড্ডা চলছে! আসবো নাকি?

- আরে আসো না আফি!

ঘরে ঢোকে আফিয়া। প্রশ্ন রাখতে ভোলে না।

- কি নিয়ে এতো হাসাহাসি হচ্ছে?

পূর্বোক্ত কথার পুনরাবৃত্তি করে আয়িশা। প্রশ্নের গম্ভীরতায় তার মুখটা একটু ভারী হয়েছে বটে। মেয়েটার মাথায় হালকা ধাক্কা দিয়ে আফিয়া বলে,

- সারা দুনিয়ার মানুষের চিন্তা আপনাকে করা লাগবে না আপা!

মুখ কালো করে বসে থাকে আয়িশা। এরা ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। একজন মানুষ একটা বাবু খেয়ে ফেলেছে। এ কি যেনো তেনো কথা!

সেই সুখময় মুহূর্তে উত্তাল তরঙ্গের ঢেউয়ের মতো ঘরে প্রবেশ করেন সালেহা বেগম। কোনো রকম সতর্ক সংকেত ছাড়াই দুর্ঘটনার বার্তা দেন।

- আহমাদ.. আমার আহমাদ এক্সিডেন্ট করেছে!

•• •• ••

চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে ইফাদ। নিজ হাতের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয় ছেলেটা। এই কম্পন থামবে কখন? ঢোক গিলে গলা ভেজানোর ব্যর্থ প্রয়াস করে। কাঁপা কাঁপি আজ সীমা ছাড়িয়েছে। প্রাণ প্রিয় বন্ধুর র'ক্তাক্ত দেহ যখন থেকে এই দুহাতে আগলে নিয়েছে তখন থেকে হাত দুটোর অস্বাভাবিক কম্পন তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। ফের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। খুব ক্লান্ত লাগছে। খুব বেশি...

প্রাত্যহিক রুটিন সম্পন্ন করার মাঝে সন্ধ্যার ফোন কল তাকে সারা বছরের নিয়ম ভঙ্গ করতে বাধ্য করেছে। চেনা নাম্বার থেকে অচেনা কণ্ঠস্বর যখন ভয়াবহ এক দুসংবাদ প্রেরণ করে তখন কি সে ভেবেছিলো একটু আগে দেখা করা শক্ত পোক্ত ছেলেটার দেহ কোনো ভারী যানের ধাক্কায় মাটিতে লুটিয়ে ছটফট করছে? অস্থির আকুল আঁখিদ্বয় নিভু নিভু করছে চেতনা হারানোর শঙ্কায়? উহু ভাবেনি তো! উদ্দিষ্ট স্থানে কিভাবে সে পৌঁছেছে জানেনা। তবে যখন শত লোকের ভিড়ের মাঝে বন্ধুকে র•ক্ত নদী বানাতে দেখলো তখন বুঝি তার হারিয়ে যাওয়া হুশ ফিরলো। যুঝতে থাকা একটা মানুষকে কেন্দ্র করে করা হাজার কথার তুবড়ি ছুটিয়েছিল তাদের সে জিজ্ঞেস করেনি, "কান্ড জ্ঞানহীনের মতো একটা মানুষকে এভাবে ফেলে রাখতে পারলেন আপনারা? একটা ফোন দিয়েই দায়িত্ব মিটে গেলো? নিজের ভাই থাকলে পারতেন তাকে এভাবে ফেলে রাখতে?" কিচ্ছু বলতে ইচ্ছে করেনি ওদের। তবে যখন হাজার দিনের চেনা বন্ধুর লাল রঙা দেহ যখন নিজ দেহে জড়িয়ে নিলো তখন তার ধৈর্য্যের শক্ত প্রাচীর ভেঙে গেলো। ডুকরে কেঁদে উঠলো ছেলেটা। কতো প্রলাপ বকলো!

- এই বেয়াদব! এই! একদম ঢং করবি না! যতো অশান্তি আমার সাথে করবি তুই না? তোর বিয়ে করা বউএর সাথে রং ঢং করবি যা!

- ভালোই বুদ্ধি পাইছিস! চাকরি বাকরি হারায়ে এখন হাসপাতালের হাওয়া খাবে উনি! তোরে কিভাবে টাইট দিতে হয় সে আমি ভালোই জানি।

হাজার কথার মালা সুতো ছিঁড়ল হাসপাতালে যেয়ে। ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে যখন ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিলো, সে স্থির থাকতে পারেনি। নিজ পোশাকের দিকে তাকিয়ে তার ইচ্ছে করছিলো হাউমাউ করে কাঁদে! কিন্তু কাঁদতে পারেনি। চোখ লাল করে দাঁড়িয়ে থাকলো। উহ! গলাটা এতো ব্যাথা করছে কেনো!

ফর্ম পূরণ করার সময় মনে হলো বাড়িতে খবর দেওয়া হয়নি। তড়িৎ ফোন দিলো সালেহা বেগমের কাছে।

- ভাইয়া?

চোখ খুলে ছোট্ট আয়িশাকে দেখতে পায় ইফাদ। আহমাদের ছোট্ট বেলার আদল যেনো নিয়ে ঘুরছে মেয়েটা। কিভাবে তাকিয়ে থাকে ইফাদ!

- এগুলো দাদাভাইয়ের র•ক্ত?

পরনের পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে শুধায় আয়িশা। মেয়েটার গলা ঠিক থাকলেও চোখটা টলমল। কেনো কে জানে!

আয়িশাকে দেখে উঠে দাঁড়ায় ইফাদ। ভগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করতে চায়, "বাকিরা কই?" কিন্তু কি আশ্চর্য! গলা দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছে না! নিজ অঙ্গের এমন বেঈমানী ছিলো অপ্রত্যাশিত। তবুও সে জোর খাটায়। গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,

- আন্টি কই?

- ঐ যে! আসছে।

ইশারাকৃত দিকে চোখ গেলে ইফাদের বিষন্ন চোখে ধরা পড়ে তিন নারী মূর্তি। বিদ্ধস্ত জন তার অতি নিকটে এসে জিজ্ঞেস করে,

- আমার ছেলেটা কই ইফাদ?

ইফাদের পোশাকের দিকে নজর গেলে কান্নায় গতি বাড়ে, স্বর অবরুদ্ধ হয়।

- ইমারজেন্সিতে ভর্তি করেছে। ডাক্তার দেখছেন। এখনও কিছু বলেননি।

আরো কিছু প্রশ্ন কারো থেকে বোধ হয় সে আশা করেছিলো। দৃষ্টি ঘোরালেও কাঙ্ক্ষিত মানবীর থেকে কোনো প্রশ্ন আসে না। তবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে ইফাদ। এমন লালাভ আঁখি জোড়া কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ভাবনা ভঙ্গ হয় ডাক্তারের কণ্ঠে। ইফাদ এগিয়ে যায়।

- কি অবস্থা স্যার?

- অবস্থা ক্রিটিকাল। পায়ের আঘাত অনেক গভীর। ডান হাঁটুর কাছে ধাক্কাটা বেশি লেগেছে।ইমিডিয়েট সার্জারি করতে হবে। আপনারা প্রস্তুতি নিন। তাহলে আজকে রাতেই সার্জারি করে ফেলা যাবে। রিসিপশনে যান। ওখানে সব ডিটেইলস বলে দেবে।

- ওর সাথে কি দেখা করা যাবে?

- জ্ঞান নেই। আপাতত আসার সম্ভাবনাও নেই। অপারেশন হলে আজ রাতে জ্ঞান আসবে না। আর যদি না হয় তাহলে আর ঘণ্টা দুয়েক পড়ে দেখা করতে পারবেন বলে আশা করি।

ডাক্তারের প্রস্থানের সাথে সাথেই ধপ করে কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ হয়। সবাই তাকালে দেখতে পায় সালেহা বেগম জ্ঞানহীন অবস্থায় মাহিবার বাহুতে। তাকে ধরতে যেয়েই মেয়েটা পড়ে গেছে। দিশেহারা বোধ করে ইফাদ। সালেহা বেগম সাথে এই মুহূর্তে কথা বলা দরকার। কিন্তু কিভাবে? খালি বেঞ্চের উপরে তাকে আধশোয়া করে মাথাটা কোলে নিয়ে বসে মাহিবা। আফিয়াকে নির্দেশ করে বলে,

- পানি আনো আফি।

অশ্রু চোখে চমকে ওঠে মেয়েটা। এমন কঠিন কণ্ঠস্বর! মাহিবার এমন আচরণ, এমন স্বর সে কোনদিন শোনেনি। নরম মেয়েটার এরূপ কঠোর আচরণ অস্বাভাবিক লাগলেও রা করে না সে। চলে যায় নির্দেশ পালনে।

- ভাবিমণি! আম্মুর কি হলো?

- জ্ঞান হারিয়েছে। পানি দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা কোরো না।

ইতস্তত করে মাহিবার কাছে আসে ইফাদ। মেয়েটার এমন রূপ সে আশা করেনি।

- ভাবি!

- রিসিপশনে খবর নিন ভাইয়া। টাকার চিন্তা করবেন না। তেমন হলে আজ রাতেই অপারেশনের কথা বলে দিন।

- টাকা আমার হাতে কিছু আছে। কিন্তু সেটুকুতে হবে কি না বুঝতে পারছি না। আচ্ছা আপনারা টেনশন করবেন না। আমি দেখি কি বলে ওরা।

প্রস্থান নেয় ইফাদ। স্বচ্ছ কাঁচবদ্ধ কক্ষের দিকে তাকায় মাহিবা। মস্তিষ্কের কঠোর নিষেধ সত্ত্বেও চোখ ঝরিয়ে দেয় এক ফোঁটা অশ্রু। নিজের বোঝাটুকু তো তার কমলো!

চলমান.