প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১১

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১১ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১১

মাহিবার অসুস্থতার কথা শুনে আর কথা বাড়ায় না আফিয়া। শ্বাসকষ্টের সমস্যা তার এক বান্ধবীর আছে। এ সময় একটা মানুষের অবস্থা কেমন হতে পারে সে এটা সামনাসামনি দেখেছে। তাই আর মাহিবাকে কোনো কথা শোনায় না। কিন্তু মনের এক ক্ষুদ্র কোণে পছন্দের ফুলদানি ভেঙে যাওয়ার একটা কষ্ট থেকে যায়। এটা খেয়াল করে মাহিবা। আয়িশার মতো আফিয়ার সাথে সেরকম কথা না হলেও মেয়েটার মনের সূক্ষ্ম কষ্ট ফুটে ওঠা চেহারাটা দেখে ব্যাপারটা বুঝে ফেলে। সালেহা বেগম বেজায় চটে আছেন! আফিয়া তখন কিভাবে এতটা নিচু ব্যবহার করলো মাহিবার সাথে! মেয়েটার সামনে মুখ দেখাতেও লজ্জা লাগছে। এই শিক্ষা দিয়েছেন নিজের সন্তানদের! অগোছালো একটা পরিবেশের দায়িত্ব নিজ হাতে নিয়ে নেয় মাহিবা। নিজ দায়িত্বে সকলকে দুপুরের খাবার পরিবেশন করে। আহমাদ আসে তারও বেশ পরে। মাহিবা তখনও খাবার টেবিলে বসে। আহমাদ আসতেই খাওয়ার কথা বললে জানায় সে খেয়ে এসেছে। এরপর যখন মাহিবা খেতে বসে অবাক হয় আহমাদ। মেয়েটা কি তার অপেক্ষায় বসে ছিল? ইশ! একবার ফোন করে জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিলো! তক্ষুনি খেয়াল হয় মাহিবার ফোন নাম্বার তার কাছে নেই। অনুমতি সাপেক্ষে তার ফোন নিয়ে সেখান থেকে নিজ নাম্বারে ফোন দেয় আহমাদ। নিজের ফোনে অতি যত্নের সাথে নাম্বারটা সেভ করে। সব যত্ন কি আর চর্ম চক্ষুতে ধরা পড়ে!

দুপুরের আলস্যে ঘেরা পরিবেশে যখন আহমাদ ভাতঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন মাহিবা এসে বসে তার পাশে। মেয়েটাকে দেখে আবার চোখ বন্ধ করে আহমাদ। দুহাতের আঙ্গুল নাড়াচাড়া করতে করতে বেশ খানিকক্ষণ ভাবনায় মশগুল থাকে মাহিবা। ধ্যান ভাঙ্গে এক শীতল কণ্ঠে।

- আপনার শরীর এখন কেমন?

চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা মানুষটার পানে চায় মাহিবা। বেশ নরম কণ্ঠে উত্তর দেয়,

- ভালো, আলহামদুলিল্লাহ।

এরপর আবার সব নিশ্চুপ। সেই নীরবতার দেয়াল টপকে মাহিবা বলে,

- একটা কথা বলি?

চোখ খোলেনা আহমাদ। আরাম লাগছে।

- বলুন।

- আয়িশুর কাছে শুনলাম কাছেই নাকি কোথায় মেলা হচ্ছে? আজকে বিকালে ওদের দুজনকে একটু ঘুরিয়ে আনতে পারবেন?

বেশ স্বাভাবিক আবেদন। কিন্তু তৎক্ষণাৎ চোখ খুলতে বাধ্য হলো আহমাদ। তার কাছে আবদারটা স্বাভাবিক লাগেনি। বিয়ের দুদিন পরে কোনো মেয়ে তার ননদদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে! অস্বাভাবিক বটে!

- কি বললেন?

বিস্ময়ের রেশ আহমাদের স্বরে।

- আফিয়ার মনটা একটু খারাপ। ছোটো মানুষ! মেলায় গেলে ভালো লাগবে না বলুন?

পুরো ঘটনা না বলেও যেনো পরামর্শ চায় মাহিবা।

- মন খারাপ কেনো?

আহমাদের সন্দেহী কণ্ঠের বিপরীতে মিথ্যা সাজায় না মাহিবা।

- আজকে ফুলদানিটা ভেঙ্গে গেলো না? ওইটা ওর অনেক পছন্দের ছিলো। তাই...

- আপনাকে কিছু বলেছে?

- না তেমন কিছু না।

কেমন কিছু এটা আর আহমাদ শোনে না। তার এই বোনকে ভালোই চেনা আছে। কিছু বলাটাই এই মেয়ের জন্য স্বাভাবিক ছিলো। বলেনি তাতে অবশ্য ভালো হয়েছে। চোখ বন্ধ করতে করতে বলে,

- আযানের পর গুছিয়ে থাকবেন। তাড়াতাড়ি গেলে মাগরিবের আগে চলে আসতে পারবো।

কথা শুধরে দিতে মাহিবা বলে,

- আমি যাবো না তো!

- কেনো আপনি কি বুড়ি!

মিনমিন করে মাহিবা বলে,

- ওখানে অনেক মানুষ...

- তাহলে কাউকে যেতে হবে না।

- এই না না! যাবো আমি।

- গুড। ঘুমাবেন না, বসে থাকুন। একটু পর আমাকে ডাকবেন।

মুখ বাঁকায় মাহিবা। নিজে আরামের ঘুম ঘুমাবে আর ওকে বলছে ঘুমাবেন না! হুহ! শখ কতো! শুতে যেতেই মনে হয় তার বস্তা ভরা বই সাজানো হয়নি। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে বস্তার কাছে যায়। আহমাদের টেবিল আর বুকশেলফ দেখে ভাবে এখানে বইগুলো আটবে তো? বই গোছানোর কাজ শেষ হতে হতেই আযানের সময় হয়ে যায়। আহমাদকে ডেকে আয়িশা আর আফিয়াকে বলতে যায়। আয়িশা এক পায়ে রাজি হলেও আফিয়া বেশ ভেবে চিন্তে যাওয়ার সম্মতি দিয়েছে। সকলকে নিয়ে মেলার পথে রওনা হলে সে দৃশ্য দেখে চোখ জুড়ান সালেহা বেগম। মাহিবার বুদ্ধি আর চৌকসে খুশি হন। পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে মেয়েটার কি কসরত!

. . . . .

মেলার পরিবেশ সদা সরগরম। একপাশে নাগরদোলার হৈ চৈ আরেক পাশে সারি সারি দোকানের সমাহার। আয়িশা নাগরদোলায় উঠতে ভয় পায়। তাই ভাবির হাত ধরেই হেঁটে চলেছে বাধ্য মেয়ের মতো। আফিয়া খুঁজছে কোন দোকানে পছন্দের জিনিস পাওয়া যায়। এর মাঝে আহমাদ চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে রাখছে। হরেক রকমের মানুষের আগমন ঘটে মেলায়। সুযোগ সন্ধানী কেউ যেনো তার পরিবারের দিকে ঘেঁষতে না পারে সেদিকে তার সজাগ দৃষ্টি। তার ডানপাশে হাত ধরে আছে আফিয়া আর বামপাশে হাঁটছে মাহিবা। তার হাত ধরে রয়েছে আয়িশা। কি মনে করে আয়িশাকে আহমাদের পাশে দেয় মাহিবা। সেটা খেয়াল করতেই মাহিবার বাহু ধরে তাকে এবং আয়িশা দুজনকেই নিজের সামনে দাঁড় করায়। পেছন থেকে কোনো অযাচিত আচরণের সম্মুখীন যেনো হতে না হয়, তাই এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। অধিকারপূর্ণ এই আচরন ভালো লাগার আবহে নিয়ে যায় মাহিবাকে। নিজের ঘর হলে বেশ খানিকটা কেঁদে নিতে পারতো মেয়েটা। উহ! সে তো ছিচকাদুনে হয়ে যাচ্ছে!

একটা চুড়ির দোকানের সামনে দাঁড়ায় মাহিবা। তাকে দেখে বাকিরাও দাঁড়ায়। চিকচিক করতে থাকা এক মুঠো কালো কাঁচের চুড়ি চোখে লাগে মাহিবার। সেটা নিতে গেলে আফিয়া হাত দেয় ঐ চুড়িতে। মেয়েটা অবশ্যি দেখেনি মাহিবাও যে ওটা নিতে যাচ্ছিলো। তবে কোনো বাক বিতন্ডা ছাড়া নিজ পছন্দ ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা চোখ এড়ায় না আহমাদের। নিজ উদ্যোগে দোকানির কাছে যায়,

- চাচা এই ডিজাইনের চুড়ি আর নেই!

- না। এই ডিজাইন শ্যাষ।

অবাক মাহিবার দৃষ্টি এড়িয়ে চুড়ির সমাহারে চোখ বুলায় আহমাদ। এক মুঠো সবুজ চুড়ি হাতে নিয়ে আহমাদ বলে,

- এটা নিবেন? ভালো লাগছে।

পলক ঝাঁপটায় মাহিবা। এখন কোনো মতেই এদের পড়তে দেওয়া যাবে না। এতো সুখ সুখ লাগছে কেনো! কোনোমতে মাথা নাড়ায়। কিন্তু সেই ক্ষণে আফিয়া বলে,

- নাহ্! এ চুড়ি আমার হাতে ভালো লাগছে না।

বলেই রেখে দেয় সেই কালো চুড়িগুলো। নিজ হাতের সবুজ চুড়ি সন্তর্পণে রেখে দেয় আহমাদ। মাহিবা তো তার পছন্দের চুড়ি পেয়েই গেলো! কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা সবুজ চুড়ির মুঠো নিয়ে বলে,

- আমি এগুলোই নিবো।

আহমাদের চমকে যাওয়া দৃষ্টি এড়িয়ে নিজ উদ্যোগে আফিয়া ও আয়িশার জন্য চুড়ি বাছাই করে। আফিয়ার মনের কোণে সূক্ষ্ম ভালো লাগা সৃষ্টি হয়। নাহ্! মেয়েটা অতোটাও খারাপ না!

ঘুরতে ঘুরতে একটা চাদরের দোকানে যায় সকলে। বিভিন্ন রঙের বিছানার চাদর দিয়ে সাজানো সমগ্র দোকান। একটা গোলাপী চাদরে হাত রাখতেই দোকানদার বলে,

- খুব ভালো জিনিস আপা! অনেক টেকসই মাল! এই চাদর যে এই পর্যন্ত কতোগুলান বিক্রি হইলো গুইনা শ্যাষ করা যাইবো না।

না থামা সেই কথার বাণে নিজেকে জর্জরিত না করে একটা জাম রঙা চাদরে হাত দিতেই লোকটা বলে,

- এইটার কথা আর কি কমু আপা! এতো বিক্রি হইসে যে এইটাই লাস্ট পিস। মেলার আরো কতদিন বাকি! কিন্তু চাদর শ্যাষ হইয়া যাইতাছে।

না পেরে এবার আয়িশা বলে ওঠে,

- সবই যখন শেষ হয়ে যাচ্ছে তাহলে আপনার দোকান ফাঁকা হয় না কেনো? পুরো দোকানই তো ভরা!

মুখ চেপে ধরে আফিয়া। এই মেয়ের মুখ দিয়ে কখন নে কি বের হয়। তবে মিটিমিটি হাসি ছেয়ে যায় আহমাদের আদলে। তার এই ছোটো বোনটা ভারী দুষ্টু!

বিব্রত হাসে দোকানদার। এসব প্রশ্নের উত্তর কি দেওয়া যায় নাকি!

- এটার দাম কতো ভাই?

- পঁয়ত্রিশশো টাকা দাম আপা। কিন্তু আপনের জন্যে তিন হাজার রাখা যাবে।

মাহিবা বেশ চমকে গেলো। এই চাদরের দাম কোনোদিন নয়শো টাকার বেশি না। তার আশেপাশে কোনো দাম শোনার আশা করেছিল। কিন্তু এই লোক একেবারে তিন হাজারে চলে গেছে। একবার ভাবলো জিজ্ঞেস করে, "ক্যান ভাই? আমার জন্যে কম ক্যান? আমি আপনার কোন মার পেটের বইন লাগি?" কিন্তু পরক্ষণে রণে ভঙ্গ দিয়ে ফিরতি পথে হাঁটে। পেছন থেকে দোকানদার ডাকলেও আর তাকায় না। আশেপাশে একটা দাম বললেও না দর কষাকষি করা যায়! কিন্তু এমন দামে সে কি বলবে?

আয়িশা বলে,

- ভাবিমণি ওইটা নিবা না?

মুখ ঝামটা দিয়ে মাহিবা বলে,

- তিন বেলা খাবে ঝাটার বাড়ি! ও জিনিস এতো দাম দিয়ে কিনে কি করবো!

হাসির রোল পড়ে যায় সকলের মাঝে। বাদ যায় না আফিয়াও। মেয়েটা বেশ মজার মানুষ তো!

শাড়ির দোকানের সামনে গেলে আয়িশা আবদার করে চুড়ির সাথে মিলিয়ে শাড়ি কেনার জন্য। কিন্তু মাহিবা বলে,

- এসব শাড়ির রং একবার ধুলেই ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তাই না আফিয়া?

আফিয়ার দিকে সম্মতির দৃষ্টিতে চাইতেই মাথা নাড়ায় আফিয়া। একবার টুকটুকে লাল রঙের একটা শাড়ি মেলা থেকে কিনে কি ফাসাটাই না ফেসেছিলো! একবার ধুয়েই সে রং এক্কেবারে গোলাপী হয়ে গেলো।

- আমরা আরেক সময় কোনো ভালো দোকান থেকে শাড়ি কিনবো। ঠিকাছে সোনা?

মায়াময় কথায় হলে যায় আয়িশা। ভাবিমণিটা এতো মায়া মায়া কেন?

আহমাদ দেখতে থাকে এক হাতে পরিস্থিতি সামলে নিতে থাকা মেয়েটাকে। আফিয়ার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টাটা চোখ এড়ায় না তার। ভালো লাগা খেলে যায় মন জমিনে। মেয়েটার মন মানসিকতা ভালো।

আফিয়ার উদ্দেশ্যে মাহিবা বলে,

- আফিয়া! এখানে সুন্দর সুন্দর মাটির ফুলদানি পাওয়া যায়। তুমি কি একটা নিবে?

পলকবিহীন মেয়েটার দিকে চেয়ে থাকে আফিয়া। অন্য কেউ হলে দুপুরের ব্যবহারের পরে তার সাথে কথা বলত না নিশ্চয়ই? কিন্তু মাহিবার ব্যবহার তার শক্ত মনে কোমল আঘাত হানে।

বেশ বেছে বেছে একটা ফুলদানি কেনে আফিয়া। মাহিবা দাম দিতে চাইলে আহমাদ বলে,

- নিজে থেকে কাউকে কিছু দিলে দিবেন। কিন্তু আমি যখন সাথে থাকবো সেই দায়িত্বটা আমার হবে। এটুকু সামর্থ্য আমার আছে।

প্রত্যেক পদে পদে লোকটার আত্মসম্মানের পরিচয় পায় মেয়েটা। অভিভূত হয়। দোয়া করে। পরিচিত কাউকে দেখে সেদিকে পা বাড়ায় আহমাদ। মেয়ে তিনজনকে রেখে যায় কম কোলাহলপূর্ণ এক জায়গায়।

আফিয়ার মাথার আবরণ তার দেহের ভাঁজ ঢেকে রাখতে পারেনি। সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটার ফুটন্ত দেহের সৌন্দর্য যেনো গোলাপের পাপড়ির ন্যায় মেলে ধরছে নিজেকে। সেই ফুলের সুবাস আচ্ছন্ন করছে মৌমাছিদের।

কয়েক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের দলটা মাহিবার চোখ এড়িয়ে যায়নি। মেয়ে দুটোকে দেখে দেখে রাখছে সে। কিন্তু তার সতর্কতা ছেলেগুলোর মুখের লাগাম টানতে পারেনি।

- উহুম! চোখই সরে না রে!

- পরে না চোখের পলক! ও সুন্দরী!

- খালাম্মা আপনার মাইয়ারে একটু দিবেন?

- মামা! এইডারে তো দেখি এক্কেরে মাইপ্যা মাইপ্যা বানাইসে রে! আহা!

সব কথা না শুনলেও ফিরতি পথ ধরতে শেষ কথাটা কানে যায় আহমাদের। চোয়াল শক্ত করে ছেলেগুলোর দিকে তাকাতেই হুড়মুড়িয়ে পালায় কলেজ পড়ুয়া ছেলেদের দলটা। আয়িশা না বুঝলেও মাহিবার কান ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। আফিয়া নির্বিকার। পথ চলতে গেলে এমন কতো কথা শুনতে হয়! এদের গুনলে চলবে কেনো!

চলমান.