প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩১

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩১ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩১

অগোছালোভাবে হেঁটে চলেছে আহমাদ। উদ্দেশ্য যেমন অজানা, গন্তব্যও তেমনি অব্যক্ত। বৃষ্টির বড়ো বড়ো ফোঁটাগুলো মাথায় এসে তার গতিভঙ্গ করছে। বিপরীত প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ তাদের ঝড়ে পড়া থামছে ওখানেই। তবে পথ রোধ অবশ্য হচ্ছে না। মাথার চুল বেয়ে মুখের চামড়ার স্বল্প দূরত্ব পেরিয়ে সমস্ত বদনকে সিক্ত করার কাজে নেমে পড়েছে তারা। অক্লান্ত, অদম্য তাদের গতি।

মাহিবার কথা অনুযায়ী বৃষ্টির পানি আহমাদের উত্তপ্ত মেজাজকে কিছুটা ঠান্ডা করতে পেরেছে বটে। ছেলেটা ভাবতে পারছে। আজ সকাল থেকে নিজের উৎফুল্ল চিত্রের কথা মাথায় আনতে পারছে। ভাবতে ভাবতে দৃশ্যপট যখন মাহিবার সম্মুখে যেয়ে থামে তার চিন্তার গতি রোধ হয়। মেয়েটার নরম চিবুকে শক্ত স্পর্শের কথা স্মরণে আসতেই শ্বাস আটকে আসে, বুক ভারী হয়। চোখ খিচে ভাবতে থাকে কি জঘন্য একটা কাজ সে করেছে। কি জঘন্য! কি কি তখন বলেছে সব তো মনেও করতে পারছে না। নিজের প্রতি অসহ্য রকম বিরক্তি এবং ঘৃণা বোধ করে আহমাদ। মেয়েটা কি বলেছিলো এমন? কিছুই না। তার নীতি বিরোধী কোনো কাজ সে করেনি আর না করেছে আহমাদের। কিন্তু আহমাদ নিজে সীমা ছড়িয়ে গেছে। রাগের বশবর্তী হয়ে বিক্ষিপ্ত মেজাজে এমন কারো উপর চড়াও হয়েছে যার এসবের সাথে সম্পৃক্ততা নেই। বিন্দু মাত্র না। বসের উপরের রাগ, মেয়ে সহকর্মীর উপরের রাগ, সেই সুশ্রী চেহারার মেয়েটার উপরের রাগ সব মিলিয়ে একাকার হয়ে বৃহৎ আকার ধারণ করে এমন জায়গায় তার প্রকাশ ঘটিয়েছে যে জায়গাটা খুব সংরক্ষিত, খুব গুরুত্বপূর্ণ। যার সাথে প্রত্যেকটা কদম ফেলতে হবে খুব ভেবে চিন্তে তার সাথে অসহ্য রকম একটা অন্যায় করে ফেললো সে! কিভাবে!

- বাজান!

মমতা মাখা ডাকে ভাবনায় সুতো ছেড়ে। সংবিৎ ফিরে পেলে দেখতে পায় সে "মায়াবাড়ি"র সামনে চলে এসেছে। তার সামনে আজহার উদ্দিন দাঁড়িয়ে আছেন ছাতা মাথায়। তার অবাক দৃষ্টি আহমাদের দিকেই।

- এমন বৃষ্টিতে ভিজতাসো ক্যান বাজান? জ্বর আসবো। দেখি আইসা পড় আমার ঘরে। আসো।

নীরব আহমাদকে টেনে নিয়ে যান সদর দরজা সংলগ্ন তার ছোট্ট একটা ঘরে। বাইরের দিকের এ ঘরটায় তেমন কোনো কাজ নেই। ক্লান্ত হয়ে গেলে একটু বিশ্রামের ব্যবস্থা।

নিজে টেনেটুনে আহমাদকে নিয়ে বসান একটা টুলে। পাশে নিজে বসে চিন্তিত দৃষ্টি তাক করেন আহমাদের সিক্ত আদলে।

- কি হইসে বাজান?

- বাজান?

আস্তে একটা ধাক্কা দেন আহমাদকে। ছেলেটা এমন স্তব্ধ হয়ে আছে কেনো?

- জী?

- কোনো সমস্যা বাজান? কি হইসে?

- না, তেমন কিছু না চাচা।

- কেমন কিছু হেইডাই কও। তোমার মুখ তো আমার কাছে ভালা ঠ্যাকতাসে না আব্বা!

মলিন হাসে আহমাদ। হাসিটা ঠোঁট ফুঁড়ে বেরও হতে চায় না।

- বউমার লগে ঝগড়া করসো বাজান?

আহমাদের দিকে সরে এসে খুব নিচু কণ্ঠে বলেন আজহার উদ্দিন। যেনো জোরে বললে আশপাশ থেকে কেউ শুনে ফেলবে। অথচ বৃষ্টিমুখর এই পরিবেশে যতদূর চোখ যায় কোনো জনমানুষের দেখা মেলে না।

- কিছুটা।

আহমাদের উত্তরে বিজয়ী হাসেন বৃদ্ধ। যেনো রাজ্য জয় করা রাজা।

- ঠিক ধরসি দেখছো!

পরমুহূর্তেই ভাবুক হয়ে পড়ে লোকটা। পাশে থাকা নিজের গামছা আহমাদের দিকে এগিয়ে দেন। ভেজা মাথা মুছে ফেলার নীরব নির্দেশ। গামছাটা হাতে নিতে গেলে মাহিবার কোমল আদল ভাসে আহমাদের চোখে। অপরাধবোধ তরতর করে বাড়তে চায়।

- তোমার চাচীর সঙ্গে আমার বিয়ার সময় তার বয়স কতো ছিলো জানো? পনেরো। এট্টুখানি একটা মাইয়া! ভাবলেও এখন কেমন লাগে! আহ! সেই দিনগুলি! মনে হয় এইতো সেদিন। আমার লগে কথা কইতে খুব ভয় পাইতো জানো? জানি আমার সামনে থেইকা পলাইতে পারলে বাঁচে।

এক চোট হেসে নেন বৃদ্ধ। যেনো পুরনো দিনগুলো এখনও তার কাছে জীবন্ত, সজীব!

- একবার কি হইলো জানো? বিয়ার বছর খানেকের মাথায়। একদিন রাইতে বাড়িত আইসি, ঐদিন আবার বাড়িত কেউ ছিলো না। আমরা দুইজনেই। তোমার চাচী আমারে ধরলো বাইরে হাঁটতে যাইবো। ধরছে তো ধরছেই। কোনরকম ছাড়াছাড়ি নাই। আমি মাত্র কাম থেইকা আইসি। একটু শুইতে মন চাইতাছিলো। তোমার চাচীর জোরাজুরির কারণে দিলাম এল ধমক। ব্যস! মাইয়া ঠান্ডা। নিজেরে খুব বাহাদুর মনে হইসিলো। বউ হাতে রাখন কি যেনো তেনো ব্যাপার নাকি! আবার একদিন আবদার করছে আলতা দিবো। আমি কইলাম বাড়ি মেন্দী গাছ আছে, মেন্দী বাইট্টা দিতে। দিসিলো নাকি জানিনা তয় আমারে আর কয় নাই। হের পর থেইকা তার আর কুনু শখ আহ্লাদ মিটাইসি বইলা আমার মনে পড়ে না। তোমার চাচীও আর কোনোদিন আমার কাছে আবদার নিয়া আসে নাই। এই রহস্য বুঝলাম অনেক দিন পরে। বড়ো পোলা হওনের বছরের মাথায় বাড়ি বিয়া লাগলো। সব মাইয়ারা আলতা দিতাসে। আমি তোমার চাচীরে কইলাম, "কি গো? আলতা দিবা না?" কেমনে জানি হাসলো। হাইসা কইলো, "আর ইচ্ছা নাই"। আবার একদিন রাইতে কি মনে কইরা আমি কইলাম, "চলো হাইটা আসি" ঠিক ঐদিনের মতোই হাসলো। তারপর কয়, "ঐদিন কি আর আছে? পোলা কার কাছে রাইখা যামু? থাক দরকার নাই"।

বাইরে বৃষ্টি থেমেছে। একটু যেনো কমেছে তেজ। যেনো এতক্ষণ, কারো সাথে কোমর বেঁধে ঝগড়া করছিলো এখন তার শব্দ ভান্ডার ফুরিয়েছে। নীরব হয়ে আসা পরিবেশে আহমাদের মনোযোগ গভীর। প্রত্যেকটা বাক্য সে খুব মন দিয়ে শুনছে। কেনো কে জানে?

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আজহার উদ্দিন বলেন,

- এইরকম সে ক্যান করছে জানো? রাগের লাইগা? না। রাগ সে করে নাই। কিন্তু অভিমান করছে। আমার লগে থাকছে, খাইসে, হাসি তামশা করছে, আমার বাচ্চা পালছে কিন্তু মনের মইদ্যে জানছে এই লোকের কাছে নিজের আবদার কওন যায় না। কি ভয়ঙ্কর কথা! আমার কাছ থেইকা নিজেরে গুছাইয়া ফেলছে। ধমক দিয়া তারে এক্কেরে চুপ করাইয়া ফেলছি। মানুষ এইডারে খুব বাহাদুরি মনে করে বাজান। কিন্তু আমি মনে করি বোকামি। ক্যান কও তো?

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় আহমাদ। সেই প্রশ্ন চোখের বিপরীতে বৃদ্ধ বলেন,

- শখ আহ্লাদ মাইনষের সারা জীবন থাকে না। একসময় দায়িত্বের নিচে চাপা পইড়া যায়। তখন আর মন চায় না নিজের কাজ ফালাইয়া সেগুলি করতে। পোলাপান হওনের পর তোমার চাচী আর কুনুদিন আমার কাছে নিজের জইন্যে কিছু চায় নাই। যা চাইছে সব পোলাপানের জইন্যে। আর কয় নাই চলেন এইডা করি হেইডা করি, কয় নাই চলেন একটু ঘুরতে যাই কি কিছু। এর আরেকটা কারণ, তার মন মইরা গেছিলো। যেই মন দিয়া হেয় চাইতো সেই মনই তো আর ছিলো না। বুজবার পরে আমি মাপ চাইসি। কতো ঘুরসি কিন্তু সেই মজা কি আর পাওন যায়!

জানালা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আহমাদের দিকে তাকান আজহার উদ্দিন। ঘাড়ে হাত রেখে নরম কণ্ঠে বলেন,

- শোনো বাজান! একটা কথা কই। বয়সের থেইকা শিখছি, এতে কুনু ভুল নাই। বাইচা থাকলে কাম কাইজ সারা জীবন করতে পারবা। কাজের মইদ্যেই থাকতে হইবো। কিন্তু এই যে সময় যাইতাসে? এইডা আর ফ্যারত পাইবা না। কতো টাকা আইবো যাইবো! কিন্তু সময়? এইডা আর আইবো না। তুমি বুদ্ধিমান পোলা। তোমারে আমার ভাইঙ্গা বুজান লাগবো না। তয় আমার চোখ দিয়া বুজবার পারছি, মাইয়া মাইনষের রাগ এক কিন্তু অভিমান ভয়ঙ্কর। ভিতরে ভিতরে অভিমানের পাহাড় হইয়া যাইবো কিন্ত তুমি বুজবা না। তোমার লগে হাসবো, খেলবো কিন্তু খোঁজ নিলে জানবা মন মইরা গ্যাসে। মন মরলে হেইডা কি আর মানুষ থাকে?

জমানো কথা উগড়ে দিতে পেরে বৃদ্ধ যেনো হালকা বোধ করছেন। কিছুক্ষণ ভেবে বের করলেন আরো কিছু বাদ গেলো কি না। শেষ মেষ বললেন,

- এখন তোমাগো পোলাপান নাই। দায়িত্ব কম। যখন হইবো তখন তার পিছনে কাম করন লাগব, সময় দেওন লাগবো। এই শখ আহ্লাদ পূরণ করার সময় আর পাইবা না। এক কথা বারবার কইতাসি, রাগ কইরো না বাজান!

আহমাদের হাত ধরে বলেন বৃদ্ধ। হকচকিয়ে যায় আহমাদ।

- না না চাচা! কি বলেন! রাগ করবো কেনো। আপনি বলুন।

- শ্যাষ! আর কি কমু? তুমি যাও দেখি ইফাদের কাছে। অর থেইকা দুইটা কাপড় পড়।

- আচ্ছা।

আজহার উদ্দিনের কথাগুলো মস্তিষ্কে নাড়াচাড়া করতে করতে যায় আহমাদ। অন্যমনস্ক তার ভঙ্গি। যেচে দেওয়া উপদেশের মাঝে লুকিয়ে থাকা গূঢ় রহস্য উদ্ধারের চেষ্টা করে। ইফাদের কক্ষের সামনে গেলে দেখতে পায় ছেলেটা কি যেনো করছে, খুব মনোযোগ দিয়ে।

- আসি?

চমকে তাকায় ইফাদ। এই বৃষ্টির সময়ে, অফিস সময়ে আহমাদ এখানে কেনো? চমকের চোটে উঠেই পড়ে সে। আহমাদের কাছে এসে তার হাত টেনে ভেতরে নিয়ে আসে। বলে,

- কি রে? ঘটনা কি? ভাবি বার কইরা দিসে নাকি তোর বুইড়া বস?

চোখ মুখ কুঁচকে তাকায় আহমাদ।

- বলতেই আসছি। আগে জামা কাপড় কিছু দে। নাইলে আজকে আর বিছানা ছাড়া লাগছে না।

- ওহ্! আয়। দেই।

ভেজা কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় পড়ে ধাতস্থ হয় আহমাদ। স্থির হয়ে বসে অফিসের সব ঘটনা গুছিয়ে বলে। বলা শেষে কিছু শোনার জন্য ইফাদের দিকে তাকালে সে ভাবুক ভঙ্গিতে আঙ্গুলের মাথা দিতে টেবিলে শব্দ তৈরি করে। সুর তুলে বলে,

- আমি ফাইসা গেছি, ফাইসা গেছি মাইনকার চিপায়!

- উফ! ইফাদ। কিছু বল!

- যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে..

- আমি তোর কাছ থেকে হেল্প নিতে আসলাম আর তুই ফাইজলামি করছিস?

আহমাদের কণ্ঠস্বর হতাশ। ইফাদ থেমে বলে,

- বুদ্ধিই তো দেই। তুই শালা এতো বলদ হইলি কবে ক তো? অফিসের সবাই ঘটনা দেখছে। তাইলে তোর উচিৎ ছিলো সবার সাথে কথা বলে ঐ ব্যাটার কাছে একটা একসপ্লেনেশন চাওয়া। তার ব্যাটারি বুইড়া বয়সেও এতো ঘ্যার ঘ্যার করে ক্যান শোনা। না! উনি এক্কেবারে সব গুছায়ে টুছায়ে চলে আসছে।

- তাইতো!

- তাইতো! চোর পালাইলে বুদ্ধি বাড়ে।

- এখন কি যাবো?

- অফিস খোলা থাকলে যাইতে পারিস।

- যাই তাইলে।

- ওকে।

- ইফাদ!

- হুঁ!

ইফাদ ততক্ষণে বইয়ে মুখ ডুবিয়েছে।

- ঘটনা একটা ঘটায় ফেলসি।

- আবার কি?

- তাকা।

- কি?

ইফাদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির বিপরীতে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর থেকে ঘটনা বর্ণনা করে। কথা শেষ হওয়ার আগেই এক শক্তিশালী হাতের ঘুষি পড়ে পেটের কিনারে। ককিয়ে ওঠে আহমাদ।

- আহ!

- উহ আহ করবি না শালা গর্দভ! তোরে তো নারী নির্যাতনের দায়ে জেল জরিমানা করা উচিত! আর উনি বলতেসে "ঘটনা একটা ঘটায় ফেলসি"! বাহ্! সুন্দর!

কাচুমাচু করে আহমাদ বলে,

- এমন করিস না। কি করবো বল না!

- কি আবার করবি? ভাবির কাছে মাফ চা। ফোন লাগা।

- ফোন তো এতক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজছে।

- গুড! ভেরি গুড!

ইফাদ কথা বলছে কম কটমট করছে বেশি। তার দিকে তাকালেও আহমাদ ভয় পাচ্ছে।

লম্বা শ্বাস টেনে ইফাদ বলে,

- এটা মজা না আহমাদ! বিয়ের এক মাসের মাথায় উইদাউট এনি রিজন এই যে একটা মারামারি করে ফেললি, এটার ইফেক্ট কিন্তু খুব ডিপ হইতে পারে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ভাবির কাছে তুই মাফ চাবি। গিফট টিফট কিছুর চিন্তা করতে পারিস। কিন্তু মাফ চাওয়াটা মাস্ট। বুঝতে পারছিস?

মাথা নাড়ায় আহমাদ। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে,

- আমার সাথে অফিসে যাবি?

- কি?

- চল যাই।

ইফাদ ভেবে বলে,

- ভেতরে যাবো না। বাইরে থাকবো। চল যাই!

•• •• ••

ঠিক কতক্ষণ, কতটা সময় মাহিবা ছাদে ছিলো সেটা সে নিজেও জানে না। বৃষ্টি শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ হবে। সেদিকেও খেয়াল নেই মেয়েটার। এক পর্যায়ে ছাদে এসে আয়িশা। এদিক সেদিক খুঁজতে থাকে মাহিবাকে। মেহেগুনী গাছের ডালের পেছনে লুকিয়ে থাকা মাহিবাকে খেয়াল করে তার দিকে আগায়।

- ভাবিমণি?

ধীর কণ্ঠে ধ্যান ভাঙ্গে না মাহিবার।

- এই ভাবিমণি?

- হুঁ!

- তুমি ভিজেছো কেনো?

আয়িশার দিকে তাকালে মাহিবা দেখতে পায় মেয়েটা এখনও স্কুলের পোশাক ছাড়েনি।

- তুমি কখন এসেছো?

- মাত্রই আসলাম। দেখি যে দরজা একদম হা হয়ে আছে। আম্মু তো ঘুমাচ্ছে। তুমি ভিজেছো কেনো? এই বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লাগে জানো না?

মলিন হাসে মাহিবা। অনেকক্ষণ ধরে কান্নাকাটির কারণে তার সমগ্র মুখ লালাভ হয়ে আছে। আঘাতের দাগ আলাদা করে চিহ্নিত করা মুশকিল। আয়িশাকে সাথে নিয়ে ঘরে চলে আসে মেয়েটা। আহমাদ এখনও ফেরেনি। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মাহিবা। গুছিয়ে আসা সম্পর্কটা কেমন এক লহমায় আবার অগোছালো হয় গেলো!

লম্বা গোসল শেষে রান্নার কাজে হাত দেয় মাহিবা। আয়িশার গোসল শেষে তাকে হালকা কিছু খেতে দেয়। শাশুড়ির কক্ষের সামনে যেয়ে দরজায় কড়া নাড়ে।টা

- মা? মা! উঠেছেন?

বেশ কিছুক্ষণ পর ঘুম ঘুম চেহারা নিয়ে বের হন সালেহা বেগম। সোফায় চোখ যেতেই দেখতে পান ছোটো মেয়েটা গুটি গুটি হাতে কি যেনো খাচ্ছে। পোশাক দেখে বুঝতে পারেন মেয়ের গোসল হয়ে গেছে। মনে ভালো লাগার আবেশ ছেয়ে যায়। পুত্রবধূর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার দিকে তাকালেই আঁতকে ওঠেন।

- এই তোর চোখ মুখ এমন লাল হয়ে আছে কেনো!

- একটু বৃষ্টিতে ভিজেছি মা।

- কি? এই অসময়ের বৃষ্টিতে কি মনে করে ভিজেছিস? মানে যা ইচ্ছে হবে তাই করবি নাকি? নিজের যে শ্বাস কষ্টের সমস্যা আছে সেদিকে একটু চিন্তা করা লাগবে না?

উচ্চ বাক্যের কণ্ঠে ভয় পায় না মাহিবা। না মনে আসে কোনো অশ্রদ্ধা। চোরা হাসি হেসে বলে,

- একটু ভিজেছি মা।

- যা ইচ্ছে করো! আমি কে কিছু বলার?

- রাগ করবেন না মা! আর ভিজবো না ইনশাআল্লহ।

নরম হন সালেহা বেগম।

- ইনহেলারটা সাথে রাখিস।

- আচ্ছা। কি রান্না করবো?

- বৃষ্টির দিন, খিচুড়ি কর। আর আমি দেখি কি তরকারি করা যায়।

- আচ্ছা।

রান্নার মাঝ পর্যায়ে সালেহা বেগমের কাছে আসে সাহেদ সাহেবের কল। কুশল বিনিময় শেষে ভদ্রলোক বলেন,

- আপা! মেয়েটাকে কতোবার ফোন দিলাম পেলামই না। ওর মায়ের শরীরটা কাল রাত থেকে ভালো না। আজ সকালে না পেরে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হয়েছে। স্যালাইন দিয়েছে। এটা শেষ হলে বাসায় নিয়ে যেতে পারবো ইনশাআল্লহ। আলহামদুলিল্লাহ এখন অনেকটা ভালো আছে। কিন্তু ছেলেকে নিয়ে সামাল দিতে আমার কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটু যদি মেয়েটাকে পাঠিয়ে দিতেন..

আঁতকে ওঠেন সালেহা বেগম। হাসপাতালে নিতে হয়েছে! তাহলে কতোটা শরীর খারাপ আল্লাহই জানেন!

- অবশ্যই ভাই। আপনারই তো মেয়ে। এভাবে বলার কি আছে? আমি আহমাদকে ফোন দিয়ে বলছি। ও নিয়ে যাবে।

- ধন্যবাদ আপা। কিন্তু জামাইকে এখন ফোন দেওয়ার দরকার নেই। কাজে আছে, থাকুক। আমি মাহিদকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ও নিয়ে আসবে মাহিবাকে।

- আচ্ছা বেশ। খবর জানাতে ভুলবেন না ভাই! আমরা অপেক্ষায় থাকবো।

- ঠিকাছে আপা।

উৎকণ্ঠা চেপে মাহিবার কাছে যান সালেহা বেগম।

- মাহিবা।

- জী মা!

চাল ধুয়ে পেছনে তাকায় মাহিবা।

- তোর মায়ের শরীরটা একটু খারাপ। মাহিদ আসছে। তুই ওর সাথে যা।

ভয় পেয়ে যায় মাহিবা। দুঃখ মাখা মুখে আতঙ্ক ছেয়ে যায়। সেটা পরোখ করে সালেহা বেগম বলেন,

- ভয় পাস না মা। সিরিয়াস কিছু না। তেমন হলে আমরা যেতাম না বল?

ভরসা পায় মাহিবা। ধুয়ে রাখা চালের দিকে তাকিয়ে বলে,

- কাজটা শেষ করে নিই।

- ওটুকু আমি পারবো। তুই যা, গুছিয়ে নে।

কথাবার্তা শুনে আয়িশা যেতে চাইলেও সালেহা বেগম নিষেধ করেন। অসুস্থ মানুষের কাছে যাচ্ছে। ওখানে ওকে নিয়ে গেলে কাজ বাড়বে। তার চেয়ে থাকুক।

অনেকক্ষণ ইতিউতি করে আহমাদকে ফোন দেয় মাহিবা। বাড়ির বাইরে কোথাও যাচ্ছে। আহমাদকে বলে যাওয়াটা কর্তব্য মনে করে। কিন্তু ছেলেটার ফোন বন্ধ। শাশুড়ির কাছে যেয়ে বলে,

- মা! উনার ফোন তো বন্ধ।

- কে? আহমাদ? থাক। তুই যা। ওকে আমি বলবো। এ কি শখে পড়ে যাচ্ছে নাকি? যা যা! তুই যা!

বিদায় নিয়ে চলে যায় মাহিবা। যাওয়ার সময় কাতর চোখে দেখে যায় আহমাদের রেখে যাওয়া বাইক।

•• •• ••

অফিসে ঢোকে আহমাদ। সকলেই কাজে ব্যস্ত। নিজ ডেস্কে যেয়ে বসলে তাকে খেয়াল করেন পাশের সহকর্মী।

- ইয়াসির সাহেব! আপনি কোথায় চলে গেছিলেন? কতো ডাকলাম। বসও একবার আপনার খোঁজ করছিলো।

সেসব কথায় ধ্যান দেয় না আহমাদ। গুরুতর কণ্ঠে বলে,

- আমরা সবাই সকালে সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছি। আমি কেনো প্রজেক্টের কাজটা পেলাম না এমনকি আমার ফাইলটা পর্যন্ত বস দেখলেন না সেটা পরিষ্কার। আমাদের উচিত না বসের কাছে এ সম্পর্কে কথা তোলা?

চকচক করে ওঠে সহকর্মীর মুখ। তিনি বলেন,

- আমিও তো এটাই বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি তো না শুনেই চলে গেলেন।

- সবাইকেই তো একটু জানাতে হবে।

- চলুন মির্জা সাহেবের ওখানে যেয়ে বলি। তাহলে একটু গোপনে বলা যাবে।

- চলুন।

কথা বার্তা শেষ হল কেউ হৈ হৈ করে ওঠে, কেউ প্রতিবাদ করা ঠিক হবে বলে জানায়। কেউ চুপ করে থাকে। ভয় পেলেও এই স্পস্থ অন্যায় মেনে নেওয়ার কথা বলে না

আহমাদ সামনে থেকে সকলকে নিয়ে বসের কেবিনে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে। সরাসরি কথা শুরু করে।

- স্যার! আপনি বয়সে, সম্মানে, পদমর্যাদায় আমাদের চেয়ে অনেক উপরে। আপনার প্রতি বিশ্বাস রেখেই আমরা সবাই প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছি। কিন্তু আজ সকালে আমার তৈরি করা ফাইল চেক না করেই আপনার মত দিয়ে দেওয়া এবং সেই মেয়েটার সাথেই গতকাল রাতের একটা ফুটেজ আমাদের সামনে এসেছে। আমরা আপনার থেকেই শুনতে চাই।

ফুটেজ কথাটা শুনে লোকটা কি একটু চমকালো? বোধহয়। ভয়ে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিলো। আচ্ছা কীসের ভয়? নিজের অস্বস্তিকর ঢেকে রেখে হুংকার দিয়ে বললেন,

- আমার অফিসে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে! কার এতো সাহস আমি কি করছি না করছি সেটা চেক করে!

হৈ চৈ করা দলটা চুপ হয়ে যায়। আহমাদ বলে,

- আমরা ইচ্ছে কেউ দেখিনি স্যার। আমার একটা জিনিস কাল রেখে গিয়েছিলাম। সেটা খোঁজার জন্যই ফুটেজ চেক করা। তবে চেক না করলে আপনার কাজটাও আমাদের চোখের সামনে আসতো না।

ঘৃণা চেপে রাখা সম্ভব হয় না আহমাদের পক্ষে। শেষ বাক্যে কিছুটা হলেও সেটা প্রকাশ পায়।

- ওহ তাই! এখন আপনি আমাকে জাজ করবেন? দুই টাকার কর্মচারী এখন আমাকে ঠিক ভুল শেখাবে?

সেই সহকর্মী পেছন থেকে বলে,

- স্যার! অফিসটা আমাদের কাজের জায়গা। এখানে যদি আপনি এমন কাজ করেন তাহলে সেটা আমরা কিভাবে মেনে নিতে পারি?

ভয় কিংবা অস্বস্তির রেখা পেরিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুভূতি তখন অহংকারের দুনিয়ায় ভাসছে। টেবিলে হাত দিয়ে জোরে শব্দ করে উঠে দাঁড়ান। গর্জন করে বলেন,

- মি.? হোয়াটএভার! মেয়েকে দামী স্কুলে পড়াতে হলে অবশ্যই মোটা টাকা দরকার। সেটা কে দিচ্ছে? আমি। তাই আমার বিরুদ্ধে কিছু বলার আগে একশোবার ভেবে নেবেন।

- আর এই যে আপনারা কান খুলে শুনে নিন! এটা আমার অফিস। আমি যা খুশি তাই করতে পারি। কারো পছন্দ করে থাকবেন না হলে চলে যাবেন। কাউকে আমি আটকে রাখিনি।

- এন্ড ইউ! মি. ইয়াসির! অফিসটা আপনার শ্বশুর বাড়ি না, যে যখন খুশি আসবেন আর ইচ্ছে হলে চলে যাবেন। প্রতিবাদ করতে এসেছেন? কার বিরুদ্ধে? আমার? গুড! আপনার সাহসের জন্য একটা পুরস্কার অবশ্যই দরকার। জাস্ট আ মিনিট!

মুহুর্তের মাঝে আহমাদ তার হাতে পায় রেজিগনেশন লেটার।

- আপনাকে এই অফিস থেকে বের করে দেওয়া হলো। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?

পরপর গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,

- লিভ!

নাটকীয় সকল কাজের পর কেউ আর টু শব্দ করার সাহস পায় না। চাকরির মায়া ছাড়তে না পেরে অন্যায়কে মেনে নিয়েই চলে যান সকলে।

এক টুকরো কাগজ হাতে বেরিয়ে যায় আহমাদ। সহকর্মীর চোখে দেখা যায় অপরাধ বোধ। অপক্ষায় থাকা ইফাদের কাছে যেয়ে বলে,

- ওরা আমাকে বের করে দিয়েছে ইফাদ!

চলমান.