প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ০৮

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ০৮ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৮

মেয়েকে খুব গুরুতর ভঙ্গিতে ডেকে কাছে বসিয়েছেন মালা বেগম। মায়ের এমনতর ডাকে মাহিবাও দ্রুততার সাথে এসেছে। ভ্রু কুঁচকে কতক্ষণ বসে থাকেন মালা বেগম। এমন নীরবতায় অধৈর্য্য মাহিবা কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেই মালা বেগম বলেন,

- ঐ বাড়িতে উল্টাপাল্টা কিছু করছিস না তো?

হতবিহ্বল মাহিবা বলে,

- অ্যা!

- ম্যা ম্যা না করে বল। কোনো খিচুড়ি পাকাচ্ছিস না তো?

- মা! আমাকে তোমার কি মনে হয়?

নিজের সম্পর্কে মায়ের এমন ধারণায় হতাশ মাহিবা। তার আশাহত কণ্ঠের বিপরীতে মালা বেগম তড়িৎ উত্তর দেন,

- আমড়া কাঠের ঢেকি।

মাহিবার হতাশ মন ভেঙে দুভাগ হয়ে যায়। মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নাক টানতে শুরু করে। দুম করে পিঠে মারেন মালা বেগম।

- একদম নাটক করবি না!

নাক টানা থামিয়ে পিঠে হাত ডলতে ডলতে মাহিবা হাহাকার করে বলে,

- আজকে আমাকে দুইবার মেরেছো আম্মু!

- আরো মারবো! যা জিজ্ঞেস করি ঠিকঠাক বল।

- না।

- কি না? বলবি না?

আবার মারার জন্য হাত ওঠাতেই মাহিবা ছিটকে সরে যেয়ে বলে,

- আরে কিছু উল্টাপাল্টা করছি না। তাই না বললাম।

শান্ত হোন মহিলা।

- আচ্ছা। এদিকে আয়।

মেয়েকে কাছে টেনে নেন। মাথায় হাত বুলিয়ে কঠোর স্বর নরম করে বলেন,

- তোকে আরেক বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি মা। সেটা আমাদের জন্যে আরেক বাড়ি হলেও কিন্তু তোর নিজের বাড়ি। ওখানকার মানুষগুলোও তোর নিজের। ওদের আপন মনে করেই সব কাজ করবি। কখনো ননদ শাশুড়িকে বোঝা ভাববি না। তোর বাবাকে, আমাকে শ্বশুর-শাশুড়ি হিসেবে যেমন দেখতে চাস তোর শাশুড়িকে তেমনভাবেই সেবা করবি। মনে রাখবি তোর ব্যবহারে আমাদের শিক্ষা ফুটে ওঠে। মানুষ যেনো বলতে না পারে আমরা তোকে কুশিক্ষা দিয়ে বড় করেছি। জামাইয়ের সাথে সবসময় মিলেমিশে থাকবি। দুটো হাঁড়ি একসাথে থাকলেও শব্দ হয় আর এ তো জলজ্যান্ত মানুষ। মন কষাকষি হবে, ঝগড়া হবে কিন্তু কখনো রাগের বশে কাউকে ছোট করে, অসম্মান করে কিছু বলবি না। মনে থাকবে?

ঘাড় কাত করে এক বাক্যে সম্মতি দেয় মাহিবা। মায়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলে,

- আমার অনেক ভয় লাগে মা। ওখানে সবাই অপরিচিত। কেমন কেমন লাগে..

বুকটা হু হু করে ওঠে মালা বেগমের। হাহাকার চেপে রেখে বলেন,

- ভয় কিসের মা! ভয় নেই। আজকে অপরিচিত কালকে পরিচিত হয়ে যাবে। তোর মা, নানী, দাদী, শাশুড়ি সবাই এই জায়গা পার করে এসেছে। তোকেও পার করতে হবে। ওখানে সব জামাইয়ের নিজের লোক। তাদের যত আপ্যায়ন করবি, নিজের মনে করবি জামাইয়ের মনে তোর জন্যে তত জায়গা তৈরি হবে। পুরুষ মানুষের মনের নরম জায়গা এই পরিবার। তোর দাদীর সাথে আমার কত ঠোকাঠুকি হতো! কিন্তু তোর বাবাকে আমি এসব বলতাম না। সবসময় মায়ের নামে নালিশ করলে আমার সম্পর্কে তার ধারণা বিষিয়ে যেত। যতই হোক মা তো মাই। কিন্তু আমি তো পরের বাড়ির মেয়ে। তখনও জায়গা অতো শক্তপোক্ত হয়নি। এই তোর শাশুড়ি কেমন রে? কথাবার্তা ভালো তো?

উচ্ছল হয়ে পড়ে মাহিবার মন। প্রফুল্ল হেসে বলে,

- একদম! ফার্স্টক্লাস!

মেয়ের হাসিমুখ দেখে স্বস্তি পান মালা বেগম। ফের বলেন,

- যাক ভালো হলেই ভালো। তাও ঝগড়া টগড়া হলেই জামাইয়ের কাছে বলতে যাবি না, তোর দোষ না থাকলেও। সমস্যা বেশি সিরিয়াস হলে তখন বুদ্ধি খাটিয়ে বলবি যেনো এমন মনে না করে যে শাশুড়ির নামে নালিশ করতে গেছিস। বুঝেছিস?

- হুঁ।

- সংসার একটা যুদ্ধক্ষেত্র রে মা! কখনো তুই আঘাত পাবি আবার কখনো কাউকে আঘাত দিবি। এখানে বুদ্ধি আর ধৈর্য্যই আসল তলোয়ার। নিজের অধিকার আদায়ের আগে নিজের দায়িত্ব পূরণ করবি। আল্লাহর কাছে যেনো বলত পারিস তোর কাজ তুই করেছিস। মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকতে হবে। এক গ্লাসের পানি আরেক গ্লাসে ঢাললে কি গ্লাসের আকার পাল্টায় নাকি পানির? পানির। তুই হলি সেই পানি। এই সমাজে মেয়েদের মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব বেশি। ভাগ্য ভালো থাকলে জামাইও মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। মাথার ভিতরে গেঁথে নে মাহিবা, স্বামীর সংসারে স্বামীর সাথে মন না মেলাতে পারলে কিন্তু বাকি সব ফেউ।

মনোযোগের সাথে প্রত্যেকটা কথা শুনতে থাকে মাহিবা। মনে উদ্রেক হওয়া প্রশ্নের উত্তর জানতে বলে,

- কিন্তু স্বামী যদি খারাপ হয়?

মনে মনে আতকে উঠলেও নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে মালা বেগম বলেন,

- আমরা কেউই একশোতে একশো না। ভালো খারাপ সবার ভেতরেই আছে। কিন্তু সমস্যা হলো নিজের খারাপটা কেউ দেখে না। দেখলেও মানতে চায় না। কিন্তু তুই এমন হবি না। যখনই বুঝবি তোর কোনো কাজ খারাপ হয়েছে এক কথায় স্বীকার করবি, গোঁ ধরে থাকবি না। উল্টো দিকের মানুষটার খারাপ গুণের থেকে ভালো গুণের দিকে বেশি মনোযোগ দিবি। যদি বলে ঠিক করা যায় তাহলে বলবি নাহলে কৌশল অবলম্বন করবি, আল্লাহর কাছে দয়া ভিক্ষা চাইবি। আর স্বামী যতো খারাপই হোক ফেরাউন তো আর হবে না! তোর থেকেও কেউ অসুখী ছিলো এই কথা ভেবে ধৈর্য্য ধরবি।

কিছুক্ষণ থেমে নিচু গলায় প্রশ্ন করেন,

- জামাই কেমন রে মা?

প্রশ্নের ভেতরে থাকা ভয়, আতঙ্ক, উত্তেজনা আঁচ করতে পারে মাহিবা। প্রথম রাতের ঘটনায় ধৈর্য্যের প্রলেপ লাগিয়ে মুখে হাসি টেনে বলে,

- একদিনে কি আর অনেক কিছু বোঝা যায়? তাও যতোটুকু বুঝেছি ভালো আলহামদুলিল্লাহ।

মায়ের মন হয়তো কিছু আঁচ করতে পারে। একই প্রশ্ন যখন শাশুড়ির ক্ষেত্রে করা হয়েছিল তখন মেয়ের উচ্ছল চেহারা তিনি খেয়াল করেছেন। কিন্তু জামাইয়ের বেলায় মুখটা এমন করে রেখেছে কেন!

তৎক্ষণাৎ সাহেদ সাহেবের আগমনে আলোচনা থেমে যায়। বাবার নির্দেশে ঘরের দিকে পা বাড়ায় মাহিবা।

আহমাদ সটান হয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। আয়িশাকে না দেখে তাকে খুঁজতে যায়। মাহিদের সাথে টিভি দেখতে দেখতে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। মালা বেগম তাকে নিজের কাছে নিতে চাইলে মাহিবা কোলে করে আয়িশাকে নিজের কাছে রাখার কথা বলে। জোর করেন না মালা বেগম। মেয়েটা নিজের সংসার নিজের মতো বুঝে নিক।

আহমাদের পাশে আয়িশাকে শোয়াতেই হাফ ছাড়ে মাহিবা। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বারকয়েক শ্বাস নেয়। সব কাজ সেড়ে আয়িশাকে জড়িয়ে শুতেই চোখ খোলে আহমাদ। নীল আলোর চোখ ধাঁধানো রূপে পাশের দৃশ্যটা তার কাছে বড়োই মনোরম লাগে।

__________________

একটা বস্তা হাতে মাহিদ ছুটে চলেছে। পেছনেই আরেকটা বস্তা নিয়ে টানাটানি করছে মাহিবা। বাড়ির বাইরে এসে এমন দৃশ্য দেখতে পায় আহমাদ। কাছাকাছি যেয়ে জিজ্ঞেস করে,

- এগুলো কি?

কাল সারাদিন লোকটার সাথে কথা হয়নি। এই মুহূর্তে হাওয়ায় ভাসা স্বরে পেছন ফিরে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,

- বই! আমার বই!

হতবিহ্বল আহমাদ বলে,

- এতো!

- জি।

- আমাকে দিন।

এক বাক্যে বস্তা ছেড়ে দেয় মাহিবা। পরক্ষণে তড়িঘড়ি করে বলে,

- দাঁড়ান দাঁড়ান!

- কি হলো?

বস্তার মুখে আলগা দড়িটা খুলে উপর থেকে একটা ডায়েরি হস্তগত করে মুখটা বেঁধে দেয় মাহিবা।

- এবার চলুন।

মাঝ রাস্তায় দড়ি নিয়ে টানাটানি বিরক্তির উদ্রেক করে আহমাদের মনে। পরক্ষণে কালকের ডায়েরি দেখে হারিয়ে যাওয়া মেজাজ ফিরে আসে। এটা আবার হাতে নেওয়ার কি হলো? সে কি এটা ফেলে দিতো!

- আশ্চর্য!

মেজাজের গরম হাওয়ার তালে বিশাল বস্তা নিয়ে মাহিবাকে পেছনে ফেলে যায় আহমাদ। মাহিদের পাশ কাঁটাতেই ছেলেটা ডেকে ওঠে,

- দুলাভাই!

চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে নেয় আহমাদ। এই মাঝ রাস্তায় কোনোভাবেই মেজাজের বিস্ফোরণ ঘটানো যাবেনা। পেছন ঘুরে তাকাতেই মাহিদের গম্ভীর মুখ নজরে আসে। কাছে এসে ছেলেটা বলে,

- আমার বোনের অনেক খারাপ দিক আছে। আমি জানি। কিন্তু ভালো দিকও যে একদম নেই তা না। আপনি খুঁজলেই মন ভালো করার মতো গুণ ওর মাঝে খুঁজে পাবেন।

থেমে আবার বলে,

- আপনি বড়ো মানুষ। আপনাকে উপদেশ দেওয়া আমার সাজে না। কিন্তু আপনার কাছে আমার অনুরোধ আমার বোনকে অবহেলা করবেন না। প্লিজ!

এই মুহূর্তে মাহিদের মাঝে একজন ভাইকে দেখতে পেলো আহমাদ। কাল সারাদিন যেই মেয়েটার সাথে মারামারি করে বেড়িয়েছে আজ তার হয়েই কারো কাছে অনুরোধ করতে এসেছে। কি আশ্চর্য! তবে ছেলেটার ভাই ভাই ভাব আহমাদের ভালো লাগলো। কোনো শব্দ খরচ না করে এক ফালি হাসি উপহার দিলো মাহিদকে। যেনো আশ্বস্ত করলো। সব মালামাল গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার পর আয়িশার দিকে চেয়ে মাহিদ বললো,

- আমাকে ভুলে যাবেন না যেনো বিয়াইন সাহেবা!

মুখ ভেংচিয়ে অন্যদিক ফেরে আয়িশা।

মাহিবার দিকে ফিরে তার মাথায় হাত রাখে। অপরিপক্ব হাতে স্নেহের পরশ বুলিয়ে বলে,

- যা আপু।

বুকে ব্যাথা নিয়ে মাহিবা শুনতে পায় ভাইয়ের হাজারো না বলা কথা। কিচ্ছু উত্তর দিতে পারে না সে। কিচ্ছু না!

বাবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন চালু হয়। মা বিদায় দিয়েছেন সেই বাড়িতেই।

___________________

বাড়িতে এসে কোনরকমে ফ্রেশ হয়েই সালেহা বেগমের সাথে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসেছে মাহিবা আর আয়িশা। টেবিলের উপরে ফেলে রাখা ডায়েরি বারবার টানছে আহমাদকে। কৌতূহলে তার অবস্থা নাজেহাল। কে এমন ছিলো মাহিবার জীবনে, যার কথা মনে করে সে আজও ডায়েরির পাতা ভেজায়?

ঘরের দরজায় এসে উচ্চকন্ঠে বলে,

- আমি দরজা লাগাচ্ছি। কেউ যেনো এখন আমাকে বিরক্ত না করে!

গল্পে আকস্মিক দাঁড়ি বসে যায়। বিরক্ত মুখে সালেহা বেগম বলেন,

- তুই বল তো! ওর এমন বদ অভ্যাস আছে। বলা কওয়া ছাড়াই ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। আজ তো তাও বলেছে!

পাত্তা দেয় ন মাহিবা। সে এখন গল্পে মজে আছে। বলা বাহুল্য বাড়ির মেহমান সবাই এর মাঝেই বিদায় নিয়েছে।

____________________

ডায়েরি খুলতে যায় আহমাদ। মাঝপথে থেমে যায়। কারো ব্যক্তিগত জিনিস না বলে ধরার মতো মানসিকতা তার নয়। কিন্তু মন তো মানছে না। উথাল পাথাল মনে নিজ যুক্তি সাজায়,

- বাইরের কেউ তো আর না। নিজের বউয়ের জিনিস দেখা নিশ্চয়ই খারাপ কিছু না।

বউ? ভাবনা বেশিদূর গড়াতে না দিয়ে ডায়েরির প্রথম পাতা খোলে। নাম ঠিকানার জায়গায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,

"আমার ডায়েরি ধরেছেন কেনো? রাখুন! রাখুন বলছি!"

ধপ করে বন্ধ করে দেয় আহমাদ। কি ডেঞ্জারাস মেয়েরে বাবা!

- আশ্চর্য! ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠায় কেউ এগুলো লিখে রাখে!

এবার প্রথম পাতা এড়িয়ে ভেতরে ঢোকে। প্রথম পৃষ্ঠার লেখা তাকে নিয়ে যায় অনুভূতির রাজ্যে। বাংলা ইংরেজি মেশানো লেখা পুরো ডায়েরি জুড়ে। প্রত্যেক পৃষ্ঠায় ছাড়া ছাড়া কিছু লেখা। কোথাও আবার এক লাইনেই শেষ।

- I clearly remember the day we met. Do you remember?

- সেই সাদা গোলাপের চারা আমার কাছে আজও আছে কিন্তু নেই সেই উপহারদাতা।

- এই ডায়েরি কার দেওয়া মনে আছে? আমি কিন্তু তার কথা ভেবেই লিখছি। আমার কথা আমি রেখেছি। কিন্তু আমার কাছে করা সেই প্রতিজ্ঞা? সেটা তো হাওয়ায় ভেসে গেলো....

- অবশ্যম্ভাবী বিচ্ছেদের এই গল্পটা এমন হলো কেনো? আমরা তো এমন বিচ্ছেদ চাইনি। এখন আমি কিভাবে বাঁচবো? কিভাবে?

বেশ কয়েক পাতা পর একটা তারিখ দেখতে পায় আহমাদ। লাল কালি দিয়ে বড়ো বড়ো করে লেখা। আজ থেকে দুই বছর আগের, পাঁচ নভেম্বর। ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় তার। আর পড়তে পারে না। সিদ্ধান্ত নেয় মাহিবাকে খোলাখুলি জিজ্ঞেস করার।

চলমান.