প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২১
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২১ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২১
তিন জন নিয়ে বাইক চালানো আহমাদের বরাবরই অপছন্দ। তবে আজ যখন মাহিবা আফিয়াকে নিয়ে একসাথে যাওয়ার কথা বললো আহমাদ একটা টু শব্দও করলো না। নিজে হেলমেট না নিয়ে মাহিবা যখন সেটা আফিয়াকে পড়িয়ে দিলো, বাইকের আয়নায় তাকিয়ে সেটা অপলক দেখলো আহমাদ। পৃথিবীটা তার কাছে হুট অনেক সুন্দর লাগলো, অনেক সুন্দর!
•• •• ••
কলেজ গণ্ডিতে পা রেখে বন্ধু বৃত্তের খোঁজে নির্দিষ্ট জায়গায় তাকায় আফিয়া। আজ তার চোখ ভীষণ সূক্ষ্ম, ভীষণ তীক্ষ্ণ। পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষের একটা ছোট্ট পদক্ষেপও তার চোখ এড়িয়ে যেতে পারছে না। বিশাল বট গাছের চারপাশটা গোল করে শান বাঁধানো। সেখানে বসে আছে কয়েকটা মেয়ের একটা দল। তার থেকে কিছু দূরেই ছেলেদের একটা দল দাঁড়িয়ে। আফিয়া যেতেই মেয়েদের দলটা হৈ হৈ করে উঠলো। কতদিনের না বলা কথা উগলে দিচ্ছে যেনো। কিন্তু তাদের দেখা হয়েছে একটা দিনও পার হয়নি। তবুও কি টান! কি উচ্ছ্বাস! আফিয়া সবাইকে দেখছে। পরোখ করছে সকলের মনোভাব। কোনার দিকে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখতেই আফিয়া আবিষ্কার করে মেয়েটার বসার ভঙ্গি আলাদা। যেনো খুব চেষ্টায় আছে কাউকে আকর্ষণ করার। তার ঠিক পেছনে তাকিয়েই দেখতে পায় ছেলেদের দলের দুজন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি! সেই সি এন জিওয়ালার, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে থাকা সেই ছেলেটার দৃষ্টি! দুটো বছর ধরে পরিচিত মেয়েটার অপরিচিত মনোভাব সম্পর্কে জানতে পেরে থমকে যায় মেয়েটা। ওরও কি একই মনোভাব? হেনার মতো? পাশ থেকে একজন ধাক্কা দেয়। পলক ঝাপটে নিজেকে সামলে নেয় আফিয়া। ক্লাস শুরুর সময় হতেই শ্রেণীকক্ষের দিকে আগায় সবাই। সবাইকে আগে যেতে দিয়ে পেছনে হাঁটে আফিয়া। পাশাপাশি চলতে থাকা দু দলকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। হুট করে বোরখা পড়া একটা মেয়ের জুতায় কিছু বাঁধতেই নিচু হয় মেয়েটা। ঠিক করতে থাকে নিজের জুতা। পেছনে থাকা পর্যবেক্ষক আফিয়া খেয়াল করে মেয়েটার উবু হয়ে থাকা শক্ত করে ফিতা বাঁধা কোমড়ে কারো দৃষ্টি, বিশ্রী সে দৃষ্টি! মস্তিষ্কের এক অংশ বিনা আদেশেই প্রত্যেকটা ঘটনা টুকে নেয়, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে! প্রথম ক্লাস শেষ হতেই মেয়েদের দলটা কমনরুমে যায়। এক ঘণ্টার বিরতিতে বেশ একটু গল্প করে নেওয়া যাবে! কমনরুমের আয়নার সামনে যেয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে একটা মেয়ে। বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
- এই! আমাকে দেখতে কেমন লাগে রে?
- দারুউউন!
সমস্বরে বলে ওঠে দুজন।
পড়নে থাকা ক্রসবেলট খুলে গোল করে গলায় বাঁধে। সেটাও মন মতো না হলে ছুঁড়ে ফেলে এক পাশে। ছেড়ে রাখা সুন্দর চুলগুলো সামনে এনে এক পাশে রেখে বলে,
- এবার?
- ওহোওওওও!
উদ্বেলিত ধ্বনি আফিয়ার কানে আসে। সে টানটান হয়ে থাকা কপাল আর পলকহীন চোখ নিয়ে মেয়েটার সৌন্দর্য্যের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা দেখে। মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষ গুলো নিয়ে যায় হেনার কথার মাঝে, মাহিবার লজ্জার মাঝে। আচ্ছা কোনটা বেশি সুন্দর?
ভাবনা রাজ্যে বিচরণ শেষ হলে আফিয়া শুনতে পায় মেয়েটার আফসোস বাণী। তার পছন্দ করা ছেলেটা কেনো তাকে পছন্দ করে না সেই কারণ গবেষণায় লেগে পড়ে সকলের সাথে। তার সৌন্দর্য্য প্রকাশে কোথায় খুঁত থেকে গেলো এই কারণ উদঘাটনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মেয়েদের দলটা। আফিয়া চুপ থাকে। না কথা বলে আর না কোনো মনোযোগ দেয়। উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে জানালা দিয়ে বাইরের জারুল গাছটায়। দুটো পাখি পাশাপশি বসে আছে। একটা পাখি তার ডানা মেলে দিয়ে রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচানোর প্রয়াস চালাচ্ছে তার সঙ্গীকে।আচ্ছা, এই যে ডানা মেলে দিলো এটাকে কি বলে? আবরণ? সুরক্ষার আবরণ?
ছুটির ঘন্টা বেজে উঠতেই একটা ছেলে এসে তাদের বেঞ্চের কাছে দাঁড়ায়। সকলে সহাস্যে তাকে স্বাগতম জানায়। অন্যদিন হলে আফিয়াও স্বাগতম জানতো। কিন্তু আজ সে সবকিছুর গূঢ় রহস্য উদঘাটনে ব্যস্ত। ছেলেটা উপকারী হিসেবে তাদের মাঝে পরিচিত। দরকারী যেই নোট মেয়েদের কাছে খুঁজলেও পাওয়া যায় না, এই ছেলেটা স্বেচ্ছায় এসে সেগুলো দিয়ে যায়। এই নিঃস্বার্থ উপকারের গভীরে যেতে চায় আফিয়া। তাকে গভীরে নিয়ে যেতে সাহায্য করে সেই ছেলের চোখজোড়া। সেই চোখের ছুটোছুটি স্থির হচ্ছে না ক্ষণিকের জন্যও। আফিয়া সেই দৃষ্টির সাথে তাল মেলাতে গেলে অবাক হয়, বিস্মিত হয়, ঘৃণা বোধ করে। ঘৃণা লাগে ঐ চোখের প্রতি, ঘৃণা লাগে নিজের বেকুব মনের প্রতি।
•• •• ••
একই কাজ দেওয়া হয়েছে দুজনকে। যার কাজ বেশি ভালো হবে পরবর্তী সুযোগ সুবিধা সে পাবে। এসবই আহমাদের জানা। তার সাথে আর যে একজনকে এই কাজ দেওয়া হয়েছে সেই মেয়েটাকে ইদানিং ঊর্ধ্বতনের সাথে খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। কলিগেরা অনেক কিছু বললেও গা করে না আহমাদ। বসের সাথে মেয়েটার কাজ থাকতেই পারে। এতে এতো নেতিবাচক চিন্তার কি আছে? নিজ মনে নিজের কাজ করতে থাকে ছেলেটা।
•• •• ••
কোনদিকে না তাকিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যায় আফিয়া। কাঁধ থেকে ব্যাগ ফেলে দিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। মাথার এক টুকরো আবরণ হাতে নেয়। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে ওই ছোট্ট সাদা কাপড়টার দিকে। অন্তর্ভেদী চাহনি দিয়ে যেনো সাদা ওড়নাটার গায়ে লেগে থাকা অদৃশ্য দাগগুলো দেখতে চায়। একপাশে সেটা ছুড়ে ফেলে ঝরঝরিয়ে পড়তে থাকা পানির নিচে বসে পড়ে। চোখের অবিশ্রান্ত ধারা ঠান্ডা জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। আচ্ছা এই পানিগুলো কি মুছে দিতে পারবে এতদিনের এত দাগ? নিষ্কলুষ করতে পারবে তাকে?
গোসলের পর থেকেই বিছানায় বসে থাকে আফিয়া। না ঘর থেকে বের হয় আর না কারো সাথে কথা বলে। ভাবতে থাকে। ভাবতেই থাকে...
মাহিবা এসে পর্দা সরিয়ে উকি দেয়। আজ অনুমতি নেয় না। নিজ উদ্যোগে ভেতরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দেয়। বন্ধ চোখে হেলান দিয়ে থাকা মেয়েটার শিয়রে যেয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। ডানা মেলে দিতে চায় সেই পাখিটার মতো। আফিয়া চোখ খুলে তাকায় না। নির্জীবের মতো পড়ে থাকে।
- আফি!
আদুরে ডাকে নড়েচড়ে ওঠে আফিয়া।
- তাকাও আফি!
- ওরা এভাবে দেখে কেনো ভাবি?
গলার স্বরে যেনো কোনো অনুভূতি নেই। মাহিবা কিছু বলার আগেই আবার বলে,
- ওরা এভাবে দেখাতে চায় কেনো?
এলোমেলো কথাগুলো বুঝতে সময় লাগে না মাহিবার। আফিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মেয়েটা। খুব নরম স্বরে, ধীরে বলে,
- নারীকে আল্লাহ সৌন্দর্য্য দিয়ে তৈরি করেছেন। তাই সে তার সৌন্দর্য্য দেখাতে, প্রদর্শন করতে ভালোবাসে। আর পুরুষ ভালোবাসে প্রদর্শিত সেই সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। তাই আল্লাহ একটা সীমা বেঁধে দিয়েছেন। কোথায় কোথায় নারী তার সৌন্দর্য্য প্রদর্শন করতে পারবে আর কাদের সৌন্দর্য্য পুরুষ অবলোকন করতে পারবে। সবটাই বলে দেওয়া আছে। কিন্তু আমরা সেই নিয়মে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি না। আমরা মেয়েরা ভাবি এতে যেনো আমাকে আবদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে, যেনো নিজেকে বন্দী করে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু আদতেও এটা বন্দীত্বের শৃঙ্খল নয়, এটা নিরাপত্তার আবরণ।
থামে মাহিবা। সে প্রস্তুতি নিয়েই ছিলো। আজ যে মেয়েটা এমন বিদ্ধস্ত হয়ে বাড়ি ফিরবে যেনো সে এটা জানতো। মাথা থেকে হাত পিঠে নিয়ে যেয়ে মাহিবা বলে,
- একটা জিনিস খেয়াল করেছো আফি? আল্লাহ আমাদের এমন জায়গাতেই নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন যে জায়গা থেকে বিপদ আসার সম্ভাবনা আছে।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় আফিয়া।
- আচ্ছা আমরা তো প্রায় প্রতিদিনই শুনি ডাস্টবিনে নবজাতক পাওয়া গেছে, হাসপাতালে কোনো শিশুকে ফেলে পালিয়ে গেছে। এখন বলো তো, এই যে বাচ্চা জন্ম নিলো এর প্রথম স্টেজ কি ছিলো?
- কি?
- দৃষ্টি আর সৌন্দর্য্য! নারীর সৌন্দর্য্য প্রদর্শন আর পুরুষের দৃষ্টি দিয়ে সেটা উপভোগ করা। সব দৃষ্টি থেকেই কিন্তু এমন গুনাহ হয় না কিন্তু এমন গুনাহর ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ সবসময় দৃষ্টিই থাকে। বুঝতে পারছো?
মাথা খাটায় আফিয়া। তাইতো! নারী যদি নিজের সৌন্দর্য্যকে লুকিয়ে রাখতো আর পুরুষ যদি তার দৃষ্টি নিচু রাখতো তাহলে কি এমন হতো? উহু! নিজ মন থেকে জবাব আসে।
আফিয়ার নীরবতার বিপরীতে মাহিবা বলে,
- এজন্যেই আল্লাহ পুরুষকে দেখতে আর নারীকে দেখাতে নিষেধ করেছেন। এটা কি অযৌক্তিক বলো?
আফিয়া তখনও মাহিবার বুকে। নিজের অজান্তেই মেয়েটা কখন স্বল্প পরিচিত একটা মেয়ের বুকে জায়গা করে নিয়েছে সে কি জানে?
আলোচনা চলতে থাকে। এক পক্ষের অদম্য কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করে আরেক পক্ষ।
সালেহা বেগম মাহিবাকে ডাকতে আসেন। বিকেলে কিছু প্রতিবেশী আসতে চেয়েছে নতুন বউ দেখতে। মেয়েটাকে বলে রাখতে হবে তো! মানসিক প্রস্তুতির একটা বিষয় আছে না!
মাহিবার ঘরে তাকে না পেয়ে আফিয়ার ঘরে উকি দেন। দরজা ঠেলে দিতেই থমকে যান সালেহ বেগম। এই দৃশ্য তো অবচেতনেও তিনি ভাবতে পারেন নি! মাহিবার বুকে তখনও আফিয়ার স্থান। হুট করে তার মনে হয় এমন দৃশ্য ধারণ করা তার অবশ্য কর্তব্য। আয়িশাকে ডাক দেন। মেয়েটা মায়ের মোবাইল নিয়ে এসে অভূতপূর্ব সে দৃশ্য সংরক্ষণ করে রাখে। তবে মন মনে একটু রাগ করতে ভোলে না। আফিয়া তার জায়গা নিয়ে নিলো কেনো?
চলমান.