নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৪১

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৪১ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪১

মাসুম সাহেব দাঁড়িয়ে ছিলেন চুপচাপ। তাঁর চোখে লেলিহান আগুন, সেই আগুনে পুড়ছে শুধু আজকের এইদিন নয়, বহু বছরের দহন। এক মুহূর্তও আর দেরি না করে তিনি পেছন ফিরেই পা বাড়ান আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরের দিকে। কারো মুখের দিকে আর তাকান না, কারো অভিব্যক্তির প্রয়োজন হয় না তাঁর কাছে।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরের দরজায় পৌঁছে তিনি একটুখানি থামেন, তারপর ধীরে খুলে ফেলেন দরজা। দরজার শব্দে কেউ ভেতর থেকে কিছু বলে না। মাসুম সাহেব ভিতরে ঢুকে যান। ঘরের ভেতরে আলো নরম, নিঃশব্দ। নিঃশব্দে একটা ডায়রি বুকে জড়িয়ে আরাম কেদারায় বসে আছেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। মাসুম সাহেব ধীরে কাছে যান। কোনও ডাক নেই, কোনও নির্দেশ নেই, শুধু কিছুক্ষণ পাশে বসে থাকেন। হয়তো দুটো শব্দ বলেন, বা কিছুই বলেন না। কাঁধে হাত রাখেন একসময়, এক নিঃশব্দ সমর্থনের মতো, যেন শত গর্জনের মাঝেও একজন অন্ততঃ আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে বোঝেন। তারপর কোনও শব্দ না করেই উঠে দাঁড়ান মাসুম সাহেব। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান ঠিক যেমন নীরবে এসেছিলেন। কারো দিকে আর তাকান না, কারো মুখে আর কোনও কথা রাখেন না। দরজার কাছে এসে একবার পেছনে তাকান। তিনি নিজেও যেন ঘৃণা করেন এই বাড়িটাকে, এই ইতিহাসকে, এই অন্ধকারকে। সবকিছুকে একরকম ধিক্কার জানিয়ে তিনি ধীরে পা বাড়ান নিজের বাড়ির দিকে। তাঁর গায়ে জড়ানো সেই শতরঞ্জির চাদর যেন আরও ভারী হয়ে পড়েছে আজ।

স্বাত্ত্বকি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। উনার চোখে জল নেই, কিন্তু দৃষ্টি যেন কুয়াশায় মোড়া। সে কারো সাথে বিদায়ের ভানটুকুও করে না। তূর্যর সাথে সামান্য কথা বলে। তবে তূর্যকে কোন ভাবেই তাকে আটকানোর উপায়ান্তর না দিয়ে সোজা চলে যান। সবাই যেন গুটিয়ে যায়। বাড়িটা একেবারে নিথর হয়ে পড়ে থাকে। এতগুলো মানুষ অথচ কোথাও কেউ নেই যেন। ডাইনিং টেবিল ভর্তি খাবার, সেগুলোর সুগন্ধও যেন লজ্জায় গুটিয়ে গেছে। আজ যেন কারো ক্ষুধাও আর জাগে না।

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলে, অথচ সময় যেন এগোচ্ছে না একচুলও। বাড়ির প্রতিটা দেয়ালে আজ এক অন্যরকম নিস্তব্ধতা জমে উঠেছে যেটা শব্দের নয়, অনুভবের। কিছু বলা হয়নি, কিছু ঠিক হয়নি, কিন্তু সবাই জানে, সবটা বদলে গেছে চিরতরে….। রাতটা এভাবেই গড়িয়ে যায় ঘুমহীন, নিঃশব্দ, ব্যর্থ কিছু স্মৃতি আর জমে থাকা অপরাধবোধের ভারে। কারো কক্ষে আলো জ্বলে থাকে নিভু নিভু করে, আবার কারো কারো ঘরে আলো জ্বলে না।

অন্ধকার কাটিয়ে সকাল এসে যায় ঠিকই, তবে কোনো স্বস্তি নিয়ে নয়, এক জঘন্যতম সকাল হয়ে। আলো গুলোও বিষণ্ন হয়ে জানালার ফাঁক গলে ঢুকছে, পাখিরা ডাকেনি আজ, বাতাসেও অদ্ভুত এক শূন্যতা। যেন গোটা প্রকৃতি নিজেই প্রস্তুত ছিল এই ভয়ানক খবরে কান দেওয়ার জন্য।

সকালের ভোর ফোটার প্রথম মুহুর্তে রাশিদা এসে থেমে যায় হিয়াদের করিডোরে। তিনি বারবার আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে ডেকে যাচ্ছেন, তবে কোনো সাড়া নেই।তিনি আজ ফজরের সময়ও উঠেননি।... রাশিদাই এ বাড়িতে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সম সময়ে জেগে ওঠেন। তবে আজ কোনো শব্দ নেই ঘরের ভেতর থেকে। দরজাটা বন্ধ। প্রথমে স্বাভাবিক ভাবলেও, সময় পেরোলেই থমকে যায় রাশিদা। বুঝতে পারেন, কিছু একটা অস্বাভাবিক। সাথে সাথেই তিনি দৌড়ে যান, ডাকেন আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে, মিনু রহমান আর তূর্যকেও। সবাই ছুটে আসে দোতলায় আব্দুর রুশান মোহাম্মদের কক্ষে। সব শেষে রাশিদা ডাকতে আসেন মিম আর হিয়াকে। তারাও শোনা মাত্রই ছুটে যায়।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরের দরজা অনেক ধাক্কাধাক্কির পর এক রকম ভেঙেই খোলা হয়। ভেতরে ঢুকে সবাই যেন মুহূর্তেই একসাথে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলে। ঘরের বাতাসটা ভারী, অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। একটা ছোট টেবিলের পাশে আরাম কেদারায় বসে আছেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। ঘুমোচ্ছেন বেঘোরে, অন্ততঃ দেখলে তাই মনে হয় প্রথমে। মাথা একটু হেলে, মুখটা শান্ত, খুব শান্ত। যেন বহুদিন পর একটা গভীর, স্বস্তির ঘুমে আছেন তিনি। কিন্তু এই স্নিগ্ধ ঘুমের কারনেই মিনিটের মধ্যে সকলের বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। তিনি তার হাত দুটোয় আলগাভাবে ধরে রেখেছেন প্রকৃতির সেই ডায়রি। চোখ বন্ধ, ঠোঁট থেমে গেছে চিরতরে। তাঁর নিঃশ্বাস নেই। ধড়ফড় নেই। শুধু এক নিঃশেষ দেহ।

মিনু রহমান চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন, “না... না বড়ভাই…!”

তূর্য পেছনে সরে যায়, ঠান্ডা হয়ে যায় হাত-পা। হিয়া এগিয়ে গিয়ে কাঁপা হাতে খোঁজ নেয় শ্বাস-প্রশ্বাসের, হাতের স্পন্দনের, কিন্তু কোথাও কিছু নেই। ডাক্তারের জন্য লোক পাঠানো হয়। কিন্তু চিকিৎসক এসে শুধু মাথা নিচু করে বলেন, “উনি অনেক আগেই… চলে গেছেন।”

ঘরটা আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন অনেক কষ্টের পর কিছুতে মুক্তি পেয়েছেন। আর কারো কণ্ঠস্বর ওঠে না। কেউ কিছু বলতে পারে না। সব কিছু থেমে গেছে একেবারে। বাতাসও যেন স্তব্ধ হয়ে আছে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের নিঃশ্বাসহীন শরীরের পাশে। তিনি চিরতরে চলে গেছেন এমন এক শান্তিতে যেন তার বিদায়ে কারো কিছু বলার সাহস নেই, শুধু বুকের ভেতরে জমে ওঠা হাজারটা কান্না, যেগুলোর শব্দ নেই, ভাষা নেই।

হিয়া আস্তে ধীরে নিজের শরীরের সব ভার ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ে মাটিতে। তার শরীরটা গুটিয়ে আসে, চোখে জল বাঁধন ছাড়া হয়ে পড়ে। তার বুক যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। তারই তো রহস্য ভাঙার আগ্রহ সব থেকে বেশি ছিল। কেন ছিল? সে যেন এই মৃত্যুর দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে বসে আছে। মিম নিজেও স্তব্ধ। আলিফ সামলে উঠতে পারছে না নিজেকেই। তূর্য এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকে, পাথরের মতো। মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখে একরকম অনুতাপের দাবানল। সে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করছে বারবার কেন এমন হলো?

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বাচ্চাদের কাছে একটা বন্ধু সুলভ মানুষ ছিলেন। এরা নিজের আপন দাদা দাদিদের থেকেও এনাকে বেশি ভালোবাসতেন।

মিনু রহমান বাচ্চাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেন তার ভাইয়ের নিঃসাড় শরীর। তার কান্না কাঁপিয়ে দেয় বাতাসকে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, স্থবির। তাঁর চোখে জল নেই, মুখে কিছু নেই, কেবল এক নিঃশব্দ হতবাকতা। তিনি যেন এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না কোন কিছুই। বিশ্বাস করতে পারছেন না এই ঘৃণিত বাস্তবতাকে।

খবর পেয়ে সাথে সাথেই মাসুম সাহেব ছুটে আসেন। তিনি তার প্রাণ প্রিয় বন্ধুর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াতেই স্থির হয়ে যায়। ধীর পায়ে এগোন, এক মুহূর্ত তার বন্ধুর নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে, হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। চোখের জল আর মুখের ব্যথা একসাথে বেরিয়ে আসে। তার কণ্ঠস্বর ভেঙে যায়। তিনি তার বন্ধুকে এইভাবে চলে যেতে দিতে একেবারেই প্রস্তুত নন। বারবার ফিরে পাবার আহাজারি করতে থাকেন। তবে সময় তো ফুরিয়েছে।

একে একে ছুটে আসেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী। কারও চোখে জল, কারও মুখে স্তব্ধতা। স্বাত্ত্বকিও আসে এই অপ্রত্যাশিত যাত্রায়। তার চোখে কেবল জমা থাকে অসীম আফসোস। যে একাই শুধু প্রত্যক্ষ দর্শি দুটো আলাদা যুগে বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রেমিক যুগলের শেষ যাত্রার।

সময় যেন স্থির হয়ে যায়। সূর্য ওঠে, আবার নামে, দিনের আলো ফিকে হয়, দাফন শেষ হয়। বাড়ির আলো যেন চিরতরে নিভে যায়। বাড়িটা যেন মরে গেছে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সাথে। বাড়ির বাতাসটা কেমন ভারী হয়ে ওঠে, হাহাকারে ভরে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের দাফনের পর থেকেই চারদিক নিস্তব্ধ। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার মধ্যেও সবচেয়ে বেশি শব্দ করছে তার অনুপস্থিতি।

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ তীব্র শারীরিক অসুস্থতায় ভেঙে পড়েন। হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে যাওয়া শরীর তাকে নিয়ে যায় হাসপাতালের বিছানায়। বার্ধক্য তো কবেই তার শরীরে বসতি গড়ে তুলেছিল, কিন্তু বড় ভাইয়ের এই মৃত্যুর বোঝা তাকে যেন আরেকবার বুড়ো করে দেয় মুহূর্তে। হাসপাতালের সাদা চাদরের ভাঁজে ভাঁজে তিনি যেন বারবার নিজেকেই হারিয়ে ফেলেন। কান্নায় গুমড়ে উঠেন।

এ বাড়িতে দুঃখ কাউকেই কম বসবর্তি করে নি। হিয়া এই দুঃখের সীমানায় ছায়া হয়ে গেছে। তাকে দেখা যায়, শোনা যায় না। কথার উত্তর নেই, চোখে কোনো দৃষ্টি নেই। তার এই নীরবতা আরও ভয়ানক, কারণ এতে কান্না নেই, শুধু শুন্যতা। মিম, পিউ, এমনকি হিয়ার মা কেউই আর তাকে ছুঁতে পারে না। সে যেন এমন এক কূপের ভিতরে নেমে গেছে, যেখানে আলো পৌঁছায় না, যেখানে নিজের নামেও তার আর অধিকার নেই।

সন্ধ্যা নামলেই বাড়িতে লোকজন সামান্য ফাঁকা হয়। তাও কাছের আত্মীয় স্বজনেরা থেকেই যান। হিয়ার মা, চাচি গেছেন হাসপাতালে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের কাছে। মিমের মা, তূর্যর মা সকলেই ব্যস্ত হয়ে আছেন অতিথিদের নিয়ে। এতো ভিড়ে হিয়াকে সামলানোর দায়িত্বে থাকে মিম আর পিউ। হিয়ার মায়ের ভাষ্যে তার মেয়ে এতোটা ভেঙে গেছে যে একা রাখাই যাবে না। মিম আর পিউও বোনের দায়িত্ব পালনে অটুত। তূর্য সবে মাত্র এসেছে হিয়ার শরীরের খোঁজ খবর নিতে। তবে হিয়া কারো কোন কথারই জবাব দেয় না। নিস্তব্ধ পাথর যেন সে। বাতাসে তখন আরশিনগরের গান নেই, গলা টিপে ধরা শোকের মতো নিঃশব্দতা। সেই নিঃশব্দতা ছিঁড়ে দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা পর হিয়ার কন্ঠস্বর শোনা যায়। সে ভাঙা স্বরে বলে, “‘অপেক্ষা’ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ একটা লাইন বলেছিলেন, 'মৃত মানুষের জন্য আমরা অপেক্ষা করি না। আমাদের সমস্ত অপেক্ষা জীবিতদের জন্য।'”

সকলে হিয়ার দিকে তাকায়। হিয়ার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে আসে যেন বাতাসে ভাসছে, সে সামান্য জড়ানো গলায় বলে, “বড়দাদার অপেক্ষা শেষ। তিনি যে অপেক্ষায় ছিলেন এতকাল, সেই অপেক্ষা ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। তাই হয়তো… ফিনিক্স পাখির মতো উড়ে গেলেন তিনি– চুপচাপ, নিঃশব্দে।”

হিয়ার চোখে তখনও জল নেই। তূর্য দাঁড়িয়ে ছিল এক কোণায়, হিয়ার ঠান্ডা কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দগুলো তার বুকের ভেতর দিয়ে তীরের মতো গেঁথে যায়। সে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে হিয়ার মুখের দিকে। সেই মুখে কোনো কান্না নেই, না কোনো অভিযোগ, আছে শুধু ধ্বংসস্তূপের মতো নিঃসাড় এক পাথরভাঙা বিষাদ। হঠাৎ তূর্য টের পায়, সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। সে দ্রুত বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। দরজাটা আস্তে বন্ধ করে দেয় পেছনে। সে সোজা ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়, তার অভ্যেস মতো সিগারেট ধরায়। এটা অবশ্য এই মুহূর্তে তার সব থেকে বেশি প্রয়োজন। সে তাকিয়ে থাকে নির্লিপ্ত আকাশের দিকে, সেখানে কোনও তারা নেই, শুধুই ঘন নীল অন্ধকার। তার কাছে কোন শব্দ নেই, ব্যাখ্যা নেই। কোন রকম কোন প্রকাশ্য অনুভূতি নেই শূন্যতা ছাড়া।

সময় ধীরে ধীরে গড়াতে থাকে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের মিলাদের পরই হিয়ার বাবা-মা তাঁকে তার বাড়িতে নিয়ে যান, যেন জ্যান্ত এক দুঃখমূর্তিকে কিছুটা আড়াল করা যায়। নিজের শহরে ফিরে হিয়া যাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে এই জন্যই এতো আয়োজন। তবে এই আয়োজন আসলেও হিয়াকে একটু প্রশ্রয় দেয়। কিন্তু তার চোখে সেই পুরনো আলো আর ফেরে না। তাকে আর আগের মতো হাসতে দেখা যায় না, সে যেন উপস্থিত থেকেও কোথাও নেই। একটা শূন্যতা তার স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যেই, তার আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের সম্পর্ক যেন দুঃখের ধুলায় চাপা পড়ে যায়। হিয়া কোনো কথাই বলে না তার সঙ্গে, এমনকি চোখেও পড়ে না সে কখনো। হিয়া তাঁকে দায়ী করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, প্রতিক্ষণে। নিজের শরীরে লেপ্টে নিয়েছে এই খুনীর নাতনির পরিচয়। সে চায় না এ পরিচয়, এ কোন কিছু। যদিও এ বিষয়ে সে একবারও অভিযোগ করেনি কিছুই, কিন্তু তার নীরবতাই বলেছে হাজারটা কথা। আর বাড়ির সবাই জানে এ নিরবতা।

মাসখানেক পর আবার ঢাকায় ফিরতে হয় হিয়াকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, পরীক্ষা, রুটিন সব আবারও ডাক দিতে থাকে। তবে এবার সে সাফ জানিয়ে দেয়, সে আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাড়িতে থাকবে না। এ বাড়ি মানেই তো সেই মানুষটার ছায়া, যার অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি উপস্থিত। ও বাড়ির দেয়াল জুড়ে শুধু পাপ আর পাপ। তাই জন্মই পাপের রাজ্যে সে আর কোন পাপ চায় না।

হিয়া বেশ তোড়জোড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিফ্ট করে। হলের ছোট একটা বিছানা, এককোণা জানালা, নিজের মতো নিঃসঙ্গ সময় এটাই তার নতুন ঠিকানা। ভুলেও ফেরে না তার শহরে। মিমও হিয়াকে ছাড়া একা থাকতে চায় না আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাড়িতে। তাই সে-ও হলেই চলে আসে হিয়ার সাথে। একসাথে দুই বোন, একই কক্ষে, যেন একে অন্যকে ধরে রাখে কিছুটা।

দিনগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতার দিকে এগোয়। ক্লাস, ক্যান্টিন, মাথার ওপর দুলে থাকা বিষণ্নতা। সব মিলিয়ে যেন এক প্রলম্বিত প্রলয়-পরবর্তী সময়। তবে হিয়া আর তূর্যের কথাবার্তা স্পষ্টভাবে কমে যায়। তূর্য যেন নিজেকেই দোষী ভাবে, ভাবতে থাকে। এটা কি দোষ, অপরাধবোধ নাকি অনুতাপ। তার ভেতরটা যেন এক ছেঁড়া পাতা হয়ে গেছে। না ফেলা যায়, না পড়া যায়। এভাবেই দিনগুলো চলে যায়… কিন্তু শোক কি কখনো সত্যিই পেরিয়ে যায়? না কি সে কেবল অন্য নামে, অন্য ছায়ায় বসবাস শুরু করে মানুষের মধ্যে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনো বাকি…

শীত তখন কেবলই নামতে শুরু করেছে। বাতাসে একধরনের কাঁপন, যা গায়ে লাগলে মানুষ নিজের ভেতরটা একটু বেশি টের পায়। ঢাকা শহর তার ধোঁয়া-ধুলার মধ্যেও যেন একটু থেমে গেছে, একটা নিঃশব্দ বদলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হিয়ার দিনগুলো কেবল সময় মাপা যন্ত্র হয়ে গেছে। ক্লাস, হল, খাওয়া, ঘুম আর কিছু নেই। সময়ের সাথে জখম ভরে উঠতে শুরু করেছে। তবে সে যেন নিজের ভেতরেই এক দুনিয়া বানিয়ে রেখেছে, যেখানে বাইরের কারো প্রবেশাধিকার নেই। ঠিক তখনই, এক হঠাৎ আসা বিকেলে, তূর্য ফেরে। সে কোনো মেসেজ করে না, কোনো পূর্বাভাসও দেয় না। এটা অবশ্য তার চিরাচরিত স্বভাব। তবে আগের মতো হলে হিয়াকে এসেই জানাতো এক লাইন লেখা কোন বার্তায়। কিন্তু এখন তাদের মধ্যে সেই অবলীলতা নেই। সম্পর্কের টানটা এখন টান নয়, যেন এক নীরব গিরিখাত। তাই তূর্য এবার সরাসরি কল করে। হিয়া বার কয়েক বাজলেই ফোনটা রিসিভ করে। ওপাশ থেকে তূর্যর স্বর ভেসে আসে, পরিচিত অথচ কেমন অচেনা, "বাইরে আসবে? আমি তোমাদের ডিপার্টমেন্টের সামনের টং-এ বসে আছি।" কণ্ঠটা নরম, কিন্তু তাতে একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা। যেন সে জানে, হিয়া আসবে।

হিয়া কিছু বলে না। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা, তারপর হুট করেই ক্লাসের মাঝখান থেকে উঠে পড়ে। কিছু না বলেই সে শুধু বেরিয়ে যায়। চত্বরে তখন হালকা রোদ, পাতায় পাতায় রুপালি আলো। গাছের ছায়া পড়ছে রাস্তায়। হিয়া ধীরে হেঁটে আসে ডিপার্টমেন্টের সামনের দিকে। দূর থেকেই সে দেখে তূর্যকে। ধোঁয়ায় অর্ধেক ঢাকা মুখ, হাতে চা-এর কাপ, মাথায় একটু ঝুঁকে থাকা সেই চিরচেনা ভঙ্গি। তূর্য তাকিয়ে থাকে ওর দিকে, ঠিক আগের মতো। তূর্যের কাছে হিয়ার এই নীলাভ রঙের পোশাকে তাকে আরো মোহনীয় লাগে। তবে তার চোখে কোনো হাসি নেই, কিন্তু চাহনিতে সেই পুরনো প্রশান্তি। হিয়া থেমে যায় একটু দূরে। তূর্য ধীরে এককাপ চা এগিয়ে দিয়ে বলে, "তাড়াতাড়ি শেষ কর। বের হবো আমরা।” হিয়া কিছু বলে না। চুপচাপ পাশে এসে বসে পড়ে।

টিএসসির বাতাসে একধরনের বিষণ্ন নীরবতা মিশে আছে বিকেলের শেষ আলোয়। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়া রোদ যেন হঠাৎই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। মানুষজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে, কেউ বই পড়ছে, কেউ হাসছে, কেউ শুধু চুপ করে বসে। জীবন চলছে নিজের মতো। চা শেষ করে তারা কদম বাড়িয়ে চলে এই নিরব চঞ্চল পথে। বেশ কিছু পথ পেরোতেই তূর্য একটু গলা ঝাড়া দিয়ে বলে, “এই জায়গাটা আমার বরাবরই প্রিয়। এই শান্ততায় আমার মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে।”

হিয়া চুপচাপ শুধু কদম মাপে। কয়েক কদম এগিয়ে নরম গলায় সে জিজ্ঞেস করে, “কবে এসেছেন আপনি?”

তূর্য এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসে, “এই তো, একটু আগেই।”

হিয়া চুপ। তূর্য তাকিয়ে থাকে ওর দিকে, গভীর এক দৃষ্টিতে। তারপর ধীরে বলে, “হিয়া, তোকে কিছু কথা বলার ছিল। জানি না এটা সঠিক সময় কিনা। কিন্তু তুই জানিস তো, সময় আসলে কখনো সঠিক বা বেঠিক হয় না। যা বলতে চাই তা না বলতে পারার ব্যর্থতা তো আসলে নিজেরই। আর আমি ব্যর্থ হতে চাই না।” তার কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু এক ধরনের অমোচনীয় সত্যের মতো কিছু।

তূর্য হিয়ার মুখের দিকে না তাকিয়ে, সামনের ফাঁকা মাঠে তাকিয়ে বলে যায়, “আমি জানি তোর মস্তিষ্ক এখনো মেনে নিতে পারছে না, একটার পর একটা ট্রাজেডি। কিন্তু হিয়া, আমি চাই তুই মানিয়ে চল। জীবনের সব কিছু পূর্ণ হয় না। কিন্তু অপূর্ণতার মধ্যেও কিছু তো পাওয়া যায়। আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারিনা হিয়া। হয়তো শক্ত শব্দ ব্যবহার করে মনের ভাব লুকাতে চাই। তবে আমি আজ প্রকাশ্যে স্পষ্ট করে তোকে বলতে চাই, তুই আমার থেকে যা…।

চল হিয়া, বিয়ে করে ফেলি। অনিশ্চয়তা না হয় আমাদের অভ্যস্ত সঙ্গী হোক। তবে অপ্রাপ্তি না থাক।”

তূর্যর কথায় হিয়া থমকে যায়। এক মুহূর্তের জন্য সে যেন কিছুই বোঝে না। তূর্য হেসে ফেলে, তারপর বলে, “আমি তোকে বলেছিলাম, যেদিন নিজের সব অভিব্যক্তি তোকে বলব, সেদিন তোকে কদম ফুল দেবো। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই শীতে কদম জোগাড় করা যায় নি। ক্যাম্পাসর আনাচে কানাচে পড়ে থাকা গোলাপ আমার পোশায় না।”

তূর্য থেমে যায়। হিয়ার চোখে-মুখে এক ধরনের অস্থিরতা, বিস্ময় আর ঘোর মিশে আছে। এটা দেখে তূর্য আবার গলাটা নরম করে বলে, “হিয়া, এটা কোন জোর জবরদস্তি নয়। আমি শুধু তোকে আমার মনের কথা বললাম। তুই রিজেক্ট করেই দিতে পারিস অনায়াসে। আর আমি যদি তোর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দিই, জানি সোজা রিজেক্ট হবে। সদ্য অনার্স পড়ুয়া, এক বেকার ছেলের সাথে কে তার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইবে? তবে একটা কথা জেনে রাখ আমি কোনো হালেই ব্যর্থতা মেনে নিতে প্রস্তুত নই। আমি লড়ব।”

এইবার হিয়া মুখ তোলে। তার চোখে জল নেই, তবে চোখগুলো জলজলে। সে ধীরে বলে,

“তূর্য ভাই... আমি জানি না আমার কী বলা উচিত। আপনি আসলে জানেন বলেই এসেছেন বোধহয়। আপনাকে আমি কখনো না বলতে পারবো না। আমি জানি না, আমার ভাগ্যে সৌভাগ্য আছে নাকি দূর্ভাগ্য। তবে যদি আপনি আমার ভাগ্য হন... আমি চাই সবটা হোক নিয়ম মাফিক। অনিয়মে নয়।”

তূর্য থেমে হিয়ার মুখের দিকে তাকায়। সন্ধ্যার আলোরা ঢলে পড়ছে ওদের দু’জনের গায়ে। তূর্য ধীরে হিয়ার দিকে একটু এগিয়ে এসে, অনেকটা নিজের কথার সত্যতা যাচাই করতে গিয়েই জিজ্ঞেস করে, “তুই সিওর, হিয়া? মানে... তুই বুঝছিস তো আমি কী বলছি? নিয়ম মানে কিন্তু খেলাচ্ছলে নয়। নিয়ম মানে সম্মন্ধ পাঠানো। বাড়িতে কথা বলা। আর একবার এই নিয়মে ঢুকলে, পেছনে ফিরতে নেই। আর মনে রাখিস নিয়মে সব যেন বরবাদ না হয়ে পড়ে, এই ভয়টা থেকেই কিন্তু সবাই অনিয়মের আশ্রয় নেয়।”

হিয়া সমান্য হাসে, সে বলে, "আমি বিশ্বাস করি অনিয়মে সফলতার থেকে নিয়মে বিগড়ানো অনেক ভালো। যদি চেষ্টাই না করা হয়, সেখানে ফলাফলের আশা কি করে করা যায়?"

তূর্য এবার আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। সে বুঝে যায়, হিয়ার এই স্পষ্ট শব্দচয়ন কোনও প্রত্যাখ্যান নয়। এটা এক প্রকার স্বীকৃতি। হিয়া এবার ধীরে জিজ্ঞেস করে, "আপনার বয়সের ছেলেরা সাধারণত প্রেম নিবেদন করে আপনার এই ব্যতিক্রম হওয়ার পিছে কোনো বিশেষ কারণ আছে?"

তূর্য হাসে। সে ধীরে বলে, "বেশ মজবুত কারণ আছে।" কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই তূর্যর ফোনে একটা কল আসে। তোর ফোনটা আসছি করে মিনিট দুয়েক কথা বলতে বলতেই, হিয়াকে একটু অপেক্ষা করতে বলে উঠে চলা যায়। সমান্য দূরে গিয়ে কোন ব্যক্তির হাত থেকে একটা প্যাকেট নিয়েই হিয়ার কাছে ফেরত আসে। হিয়া প্রশ্ন করতে চায় এ প্যাকেট সম্পর্কে। তবে তার আগেই তূর্য প্যাকেটের আবরন খুলে এক গুচ্ছ সূর্যমুখী বের করে হিয়ার হাতে ধরিয়ে দেয়। হিয়া চুপচাপ সূর্যমুখীর গুচ্ছ হাতে জড়িয়ে নেয়। তূর্য এবার মৃদু হেসে বলে, "বাঙালিদের টাইম সেন্স বরাবরই খারাপ। ফুলগুলো ডেলিভারি হওয়ার কথা ছিল আরো ঘন্টাখানেক আগে। তবে কি! চুরি হয়ে যাওয়ার পরে পুলিশ পৌঁছানোর মতো ঘটনা এখানেও। কদমের দায় সূর্যমুখী দিয়ে মেটানোর চেষ্টা আরকি।”

হিয়া পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে তূর্যর চোখের দিকে। সূর্যমুখীর পাঁপড়িগুলো যেন সন্ধ্যার আলোয় সোনালি ছায়া ফেলে হিয়ার গালে। বাতাস নরম হয়ে আসে, আর হিয়ার চোখে উঠে আসে এক অভ্যন্তরীণ প্রশান্তির ছায়া। সে সূর্যমুখীর গুচ্ছ বুকের কাছে টেনে নিয়ে ধীরে, এক চেনা অথচ অনুচ্চ স্বরে বলে ওঠে, “আপনি এক অদ্ভুত চরিত্র, জানেন? এই পৃথিবীর যত ফুল আছে, সব ফুলের সঙ্গে কি আমাকে পরিচয় করিয়ে ছাড়বেন? নাকি বোঝাতে চাইছেন এই পৃথিবীতে আমার অপরিচিত অনেক সুন্দর ফুল আছে?”

তূর্য একবার চোখ নামিয়ে হাসে। সে হিয়ার চোখের দিকে চেয়ে বলে, “আসলে তোর স্নিগ্ধতার পাশে টিকে থাকার মতো ফুল খুঁজে পাই না, হিয়া। তাই এক্সপেরিমেন্ট চলছে, কোনটা তোর সঙ্গে মানায়। এই যেমন আজ মনে হলো সূর্যমুখীটা তোকে ছুঁলেই হাসবে।”

তূর্যের কথায় হিয়া একেবারে শান্ত হয়ে যায়। সে কিছুই বলে না। ঠিক সেই মুহূর্তেই, তূর্যর গলা কিছুটা নিচু হয়ে আসে। সে বলে, “হিয়া, আমি তোকে কিছু মুহূর্তের জন্য চাই না। আমি তোকে একেবারে চাই, নিজের করে চাই। যতটা স্থায়ীভাবে পাওয়া যায়। আমি চাই না আরেকটা অসমাপ্ত গল্প জমে উঠুক পৃথিবীর পাতায়। তুই আমার সেই পূর্ণতা, যাকে পেতে সব লড়াই করতে আমি প্রস্তুত।”

হিয়া একেবারে জমে যায়। কিছুই বলতে পারে না। তার ঠোঁট একটু কেঁপে ওঠে, কিন্তু কোনো শব্দ ফোটে না।

তূর্য এবার ধীরে দাঁড়ায়। ব্যাগটা তুলে নেয়। হিয়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে, “আজকে আমি ঢাকায় থাকব না। আমি রাজশাহীর দিকে রওনা হচ্ছি। বাবা-মায়ের সাথে কথা বলা জরুরি। সব খুলে বলব। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব... আমি চাই তোর বাসায় সম্বন্ধ পাঠাতে। এবার আর দেরি নয়, হিয়া। এবার আর অনিশ্চয়তা নয়।”

হিয়া তাকিয়ে থাকে তূর্যের চলে যাওয়া পথের দিকে। সূর্যমুখীগুলো বুকের কাছে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে। তাঁর চোখের ভেতরে তখন একটি মাত্র নাম জ্বলজ্বল করে, তূর্য।

_____________

চলবে..... 💔