নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ২৫
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ২৫ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ২৫
বাইকটা ধীরে ধীরে হিয়ার বাসার কাছাকাছি এসে থামে। পাড়ার অচেনা রাস্তা, হালকা আলো-আঁধারিতে একটা নিরবতা। তূর্য বাইক থেকে নামেনি, শুধু গতি কমিয়ে থামিয়ে একপাশে দাঁড় করিয়েছে। এ যেন স্পষ্ট বার্তা, তার ফিরতেই হবে।
হিয়া ধীরে ধীরে বাইক থেকে নামতে যায়। সেই মুহূর্তেই তূর্যর চোখ যায় হিয়ার পায়ে। সেখান থেকে একটা ঝিনুকের মতো বাজনা শোনা যায়, কোমল এক শব্দ। তূর্য তাকিয়ে দেখে, হিয়ার বাঁ পায়ে একটা ছোট্ট রূপালি নুপুর। সূক্ষ্ম কারুকাজ করা। খুবই সাধারণ, অথচ গভীর মনোযোগ না দিলে চোখে পড়ে না।
এই প্রথম তূর্য লক্ষ্য করল এই অলংকারটা। এটার অস্তিত্ব আগে কখনো তার চোখে পড়েনি। সন্ধ্যার এই উষ্ণ অন্ধকারে রুপোলি রঙ যেন জ্বলে উঠছে।
তূর্য শুধু এক পলক নিঃশব্দ তাকিয়ে দেখে। তার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি খেলে যায়। তূর্য জানে এ রঙ হিয়ার নিজের নয়। সে প্রকৃতির ব্যক্তিত্বকে ব্যক্তিগত ভাবতে শুরু করেছে বহু আগে থেকেই। এটা খুব গ্রহণযোগ্য অভ্যেস না হলেও, একজনের ব্যক্তিত্বকে ধারন করা খারাপ তো নয়!
তূর্যর মুহূর্তেই মনে হয়, সময়টা ফসকে যাচ্ছে। আর তার সামনের নারী তাকে অন্যকেউ ভাবতে শুরু করেছে। সে অন্যকেউ বোধহয় প্রকৃতির রুশান। তূর্যের এই ভাবনার অতলেই হিয়া বিদায় নেয়। সে আর পেছনে ফিরে তাকায় না। ফিরে তাকালেই যেন হিয়ার কদম থমকে যাবে। নিজের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলে সে। নুপুরের টুংটাং শব্দে ছায়া মিলিয়ে যায় গলির গভীরে। তূর্য এক মনে তাকিয়ে থাকে হিয়াকে ছুঁয়ে আসা শেষ হাওয়ার পথে। সময় কাটে অযথাই, তূর্য ধীরে বাইক স্টার্ট করে। বাতাস হালকা ঠান্ডা, কিন্তু বুকের ভেতর কিছু গরম শব্দ রয়ে গেছে অনুচ্চারিত, অস্পষ্ট, কিন্তু অনুভব করা যায়।
তূর্য এক রোখা, গম্ভীর, ছন্নছাড়া হলেও নিজের কথায় একনিষ্ঠ। তার সব থেকে বড় গুন সে সৎ। তার কাছে লুকোচুরির কোন শব্দ নেই। তবে অনুভূতি বহিঃপ্রকাশে তার শব্দ হেঁয়ালি করে বেশ। হিয়ার প্রতি তার স্পষ্ট জবাবে অনুভূতি নেই, থাকা উচিৎ-ও নয়। তবে এই অকারণে সে কেন এসেছে তার শহরে..?
এই উওর তূর্য খুঁজতে চায় না। তূর্য শুধু জানে, হিয়া তার বর্তমান জীবনের এমন এক চরিত্র যে অকারণে, নিজের জায়গা করে নিয়ে বসে আছে।
তূর্যর ভাবনা চলতে থাকে, এগুলো রোজ চলে..। আরো কতো শত বার সে আসতে চেয়েছে হিয়ার শহরে! তবে নিজেই নিজেকে বেঁধেছে অহেতুক। কিন্তু .. আজ কেন..!
তূর্য তার গতিতে শহরের পর শহর পেরিয়ে পৌঁছায় তার গন্তব্যের ব্যস্ত নগরীতে। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু তার চেহারায় কোনো বিরক্তি নেই।
ঘড়িতে তখন সাড়ে নয়টা। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ঠায় দাঁড়িয়ে তূর্যের অপেক্ষায়। তূর্য বাইকটা গেটের পাশে দাঁড় করাতেই দরজা খুলে এগিয়ে আসেন তিনি। তূর্য একদমই আশা করে নি যে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এভাবে তার পথ চেয়ে থাকবেন।
রাতের আলো-আঁধারি চাহনিতে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের মুখ ঝাপসা লাগলেও, তাঁর চেহারার প্রশান্ত দৃঢ়তা ভেদ করে আসে একদম তূর্যর হৃদয়ের গভীরে। তার মুখে সমস্ত রাতের প্রতীক্ষার মানে তৈরি করা।
তূর্য বাইকটা লক করেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বুকে জড়িয়ে পড়ে। তূর্য একদমই এমন নয়। আর না তার সাথে কখনোই এতো গভীর সম্পর্ক আব্দুর রুশান মোহাম্মদের। তবে আজ আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখের অপেক্ষা তূর্যর খুব আপন লাগলো। তাই সে জীবনে প্রথম বার জড়িয়ে নিলো এই মানুষটাকে। যেন ছোট তূর্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার বৃদ্ধ দাদার বুকে।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তূর্যের এমন আচরনে একটু তব্দা খেলেও, তার ভালো লাগলো, এই আপনত্ব। এখানে আর সময় না পেরিয়ে তারা ঘরে প্রবেশ করল।
তূর্য ভেতরে ঢুকতেই তার মনে হয় এ ঘর বুঝি তার অপেক্ষায় ঝিমিয়ে পড়েছিল। রাশিদা দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন, পরনে হালকা নীল শাড়ি, হাতে খালি গ্লাস। তূর্যকে দেখেই মৃদু হেসে বলেন, "এতো দেরি হলো যে বাবা। কখন থেকে খাবার বেড়ে বসে আছি। তোমরা চলে যাওয়ার পর ঘরটা একদম খালি হয়ে গেছে।"
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বলে ওঠেন, " আহা মাত্র এলো। ও ফ্রেশ হয়ে আসুক, তারপর গল্প পাতিস।"
তূর্য কিছু না বলে ঘরের ভিতর চলে যায়। হাত-মুখ ধুয়ে আসে একরাশ ক্লান্তি ঝরিয়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু তাকায় নিজের দিকে, তার প্রতিচ্ছবি একবুক ভাবনা আর একজোড়া চুপচাপ চোখ। প্রতিটা বিষয়ের ভাবনা তাকে বিরক্ত করছে। নিজেকে ধাতস্থ করে তূর্য। এসব ভাবনা পেছনে ফেলে সে, সোজা ছোটে খাবার ঘরে। সেখানে আয়োজন পাকা পোক্ত। তূর্য এই আয়োজন দেখে একটু হকচকিত হয়। তবে কিছু না বলেই চুপচাপ খেতে বসে।
খাবার শেষে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরে তারা বসে একান্তে। তূর্য এবার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। কিছু তো সামনে আনতেই হবে। বেশ অনেক সময় তাদের নানা বিষয়ে কথা হয়। তূর্য এবার একটু থেমে বলে, “আপনাকে একটা বিষয় জানানোর ছিল।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ কিছু প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকেন শুধু। তূর্য বলে, “আপনার দীপ্তি দেবীর কথা মনে আছে। প্রকৃতির একমাত্র ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। প্রকৃতির ডাইরিতে অনেক বার তার উল্লেখ পেয়েছিলাম। বেশ কৌতুহল বসতোই তার খোঁজে নেমে পড়ে ছিলাম। আর সৌভাগ্যবশত তার খোঁজও পেয়েছি। তিনি বর্তমানে চাঁদপুরে থাকেন। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছিলাম। আমি জানি দীপ্তি দেবী কিছুই জানেন না। কিন্তু সব সময় সব জানা বা অজানার মাঝেও এমন কিছু জানা অজানা থেকে যায়, যা হয়তো আমাদের কাজের। আমি ঠিক সেটুকু খুঁজতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে যতটুকু জানতে পারি, তার সবটাই আপনি জানেন বোধহয়, শুধু একটা জিনিস ছাড়া।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকেন তূর্যর দিকে। তূর্য এবার আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনার বাবা আর মেঝ দাদাভাই দুজন মিলে প্রকৃতির সঙ্গে শেষ বার দেখা করেছিলেন। আপনি তখন যুদ্ধে ছিলেন। এটা ঠিক তখনকার ঘটনা যখন দীপ্তি দেবী কলকাতায় চলে যাবেন। প্রকৃতি নিজেই কথাটা দীপ্তি দেবীকে জানিয়েছিলেন যে, আপনার বাবা– আপনার আর প্রকৃতির বিয়েতে সম্পূর্ণ রাজি। এবং আপনি যুদ্ধ থেকে ফিরলেই আপনাদের বিয়ে দেবেন। সাথে একটা শর্তও নাকি দিয়েছিলেন কিন্তু শর্তটা সম্পর্কে দীপ্তি দেবী নিজেও জানেন না। তিনি নাকি অনেকবার প্রকৃতিকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন কিন্তু প্রকৃতি কোনদিনও এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদের মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তার বাবা তাদের বিয়েতে রাজি ছিল এ বিষয়ে তিনি জানতেন না! এমনকি তিনি যুদ্ধ থেকে ফেরার পরও এ বিষয়ে বাড়িতে কোন কথাবার্তা হয়নি। কোনদিন তার ভাই, বোন, মা দাদি কেউ তাকে জানায়নি এ বিষয়ে! আব্দুর রুশান মোহাম্মদ শব্দ হারিয়ে ফেলেন। তূর্য আবার বলতে শুরু করে, “প্রকৃতি বোধহয় একারণেই এ দেশ ছেড়ে না যাওয়ার অনেক জিদ করে ছিল।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এবার মুখ খোলেন, “ওরা সবাই এতো কিছু জানতো, আমি কেন সব জানা থেকে বঞ্চিত!
আর প্রকৃতি তো তার সবকিছু ডাইরিতে উল্লেখ করতো তাহলে…এই দিনের উল্লেখ নেই কেন?”
তূর্য এবার ধীর গলায় বলে, “এটাই তো প্রশ্ন। সব কিছু কেমন গোপন যেন! আর বঞ্চিত শুধু একমাত্র আপনি। আর হয়তো এই দিনের কথা ও ডাইরিতে উল্লেখ ছিল। শেষ ছেঁড়া পৃষ্ঠার সঙ্গে এই দিনটাও হয়তো ছিড়ে গেছে।” তূর্য একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করে, “বড় দাদা, আপনি গতবার বলেছিলেন আপনার এক বন্ধু প্রকৃতিকে কলকাতায় দেখেছিল। এটা কবে? মানে ওর হারিয়ে যাওয়ার কতো বছর পর?”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ একটু সময় নেন, এরপর বলেন, “১৯৭৫ এর দিকে।”
তূর্য একটু ভেবে বলে, “তাহলে যুদ্ধ শেষ হবার ৪ বছর পর! আপনার যে বন্ধু প্রকৃতিকে দেখেছে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে হয়তো নতুন কিছু পাওয়া যেতো।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ চশমাটা খুলে হাতে নেন, এরপর বলেন, “তা আর সম্ভব নয়। গত বছর ছয়েক আগে অরবিন্দ মারা গেছে।”
তূর্য চুপসে যায়। ঠিক তখনই আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখ চিকচিক করে ওঠে, তিনি বলেন, “অরবিন্দ নেই তো কি, মুক্তি এখনো বেঁচে আছে।”
তূর্য ভ্রু কুঁচকে বলে, “মুক্তি কে?”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বলেন, “অরবিন্দের স্ত্রী। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়তো। ওর সাথে কথা বললে, কিছু জানা যেতে পারে।”
তূর্য জিজ্ঞেস করে, “যোগাযোগের কোন মাধ্যম আছে?”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বলেন, “মাসুমের সাথে বরাবরই অরবিন্দুর ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আর জীবিত অবস্থা পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। এখন ওর স্ত্রী মুক্তির সাথে যোগাযোগ আছে কিনা বলতে পারছি না। সকালেই মাসুমকে আসতে বলছি এরপর তিনজন মিলে ব্যবস্থা করা যাবে।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ কথাটা শেষ করতেই ঘরে এক মুহূর্তের নিঃশব্দতা নেমে আসে। নিঃশব্দতা, যার ভেতর কেবল রাতের ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ শোনা যায়। যেন সময় নিজেও নিঃশ্বাস ফেলছে। তূর্য আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়। চেয়ারটা নিঃশব্দে ঠেলেই সে বলে, “আমি এখন ঘরে যাই। কাল অনেক কাজ।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মাথা নোয়ান, চোখে আবার সেই পুরনো ক্লান্তি, কিন্তু ভেতরে আশার ক্ষীণ আলো।
তূর্য ধীরে ধীরে তার ঘরে চলে আসে। ঘরটা যেমন ছিল তেমনই আছে, প্রাচীন কাঠের আলমারি, পুরোনো পুরোনো গন্ধ, আর জানালার পাশে সেই পরিচিত চেয়ার। তারচেয়েও চেনা এক দৃশ্য, জানালার বাইরে শহরের আলো-আঁধারির ছায়া। সে পকেট থেকে ফোনটা হাতে তুলে নেয়, দ্রুত স্ক্রিনে কয়েকটা নম্বর টিপে দেয়।
কল চলে যায়।
ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো গলায় নেহাল বলে, “হ্যালো... তুই পৌঁছেছিস?”
তূর্য গলায় নিঃসঙ্গ একটা সুর টেনে বলে, “হুম। আর তোর কাজের কী খবর?”
নেহাল একটু গা ঝাড়া দিয়ে বলে,
“চলছে ভাই। কয়েকটা নাম আর সরকারি রেকর্ডে অদ্ভুত মিল পেয়েছি। কিন্তু কিছু মিলেও আবার মিলছে না। সময় লাগবে।”
তূর্য কাঁধে ফোন রেখে জানালার পাশ থেকে সিগারেটের প্যাকেট টেনে নেয়। “ঠিক আছে। যা করিস মনোযোগ দিয়ে কর। একটু বেশি গভীরে খোঁজ। আর কাল বিকেলে দেখা করিস।”
নেহাল ওপাশ থেকে বলে, “তুই টেনশন নিস না। একটা কিছু বের হবেই।”
তূর্য আর কথা বাড়ায় না। “ঠিক আছে। কাল কথা হবে,” বলে ফোন কেটে দেয়।
এরপর সিগারেটটা ঠোঁটে রেখে সে চুপচাপ জানালার গ্রিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশে তারার ছায়া নেই, শুধু একটানা আলো-আঁধারির ঢেউ। দূরের একটা কুকুর ডেকে ওঠে, বাতাসে ভেসে আসে নিস্তব্ধতা।
সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ঘরের একপাশে মিলিয়ে যায়, ঠিক যেমন করে পুরোনো স্মৃতি দিনে দিনে নরম হয়ে যায় মনের কোণায়। ঠিক তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, "হিয়া।"
মেসেজ, "পৌঁছেছেন?"
তূর্য মুচকি হেসে, আঙুল চালিয়ে কেবল একটাই শব্দ লেখে, "হুম।"
আর কিছু নয়। তারপর ফোনটা বিছানার পাশে রেখে, জানালার পর্দা টেনে দেয়। ঘরটা হালকা অন্ধকারে ডুবে যায়।
বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে। শরীর অবসন্ন, মাথা ভার। তবু কোথাও যেন মস্তিষ্ক সচল। বাইরে রাত আরও গভীর হয়। শহরের গলির বাতিগুলো কাঁপে হালকা বাতাসে। তূর্যের ঘরে ঘড়ির কাঁটা এগোয় নিঃশব্দে।
সকালটা শহরের মতোই ব্যস্ত, কিন্তু তূর্যের ঘরে এখনো একরকম শান্তির পরত। জানালার পর্দা ভেদ করে হালকা রোদ এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। পাখির ডাক নেই, কেবল বাইরের গাড়ির হর্ন আর নিচে দোকান খোলা চাবির আওয়াজ, এই শহরের চিরচেনা রুটিন।
তূর্য ধীরে ধীরে চোখ মেলে।বিছানায় উঠে বসেই চোখ কচলায়। তারপর এক হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা খুঁজে নেয়। সময় তখন সকাল ৮টা ১৭। ফ্রেশ হয়ে তার ঘর থেকে বেরিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে নিচের দিকে পা বাড়াতেই হাসির উচ্চ শব্দে সে থমকে যায়। খাবার ঘরে কথার শব্দ। তূর্য সোজা দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়, ডাইনিং টেবিলের পাশে বসে আছেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আর একজন বয়স্ক, চমৎকার চেহারার লোক। এনাকে এর আগেও তূর্য দেখেছে। এই লোকই মাসুম সাহেব। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এবং মাসুম দু’জনেই নাস্তার প্লেটে পরোটা, ডিম, কলা আর চা নিয়ে আড্ডায় মেতে আছেন।
তূর্য একটু অবাক হয়ে বলে, “এই সকালেই! বড়দাদা আপনি তো রকেটের থেকেও ফাস্ট। আমি কি আসতে দেরি করে ফেললাম?"
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মুখে চায়ের কাপ তুলে হেসে বলেন, “বয়স বাড়লে ঘুম আর দেরি সহ্য হয় না। মাসুমকেও তাই আর ঘুম আর দেরি সহ্য করতে দিলাম না।”
মাসুম সাহেব হেসে তূর্যের দিকে তাকিয়ে বলেন, "তোমার জন্যই তো অপেক্ষায় ছিলাম। আসো, বসে পড়ো আমাদের সাথে।"
তূর্য ধীরে ধীরে এসে টেবিলের এক পাশে বসে। জমিয়ে তাদের এক রাউন্ড আড্ডা এখানেই সমাপ্ত হয়।
খাওয়া শেষ করে তারা উঠে যায় আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরের দিকে। ঘরের পাশে একটা ছোট টেবিল রাখা। তার পাশেই আরাম কেদারা। দেওয়ালের সাথে মিলিয়ে রাখা একটা দুই সিটের সোফা। ঘরটায় নতুন পুরনো আসবাবপত্র সবই যেন জায়গা করে নিয়েছে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ খাটের কোনটায় হেলান দিয়ে বসেন। তূর্য সোফায় আর মাসুদ সাহেব আরাম কেদারায় বসে পড়েন।
বাইরে তখনো আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি, মায়াবী মিষ্টি রোদটা হালকা ছোঁয়াচ্ছে মাত্র। কিন্তু ঘরের ভেতর আলো ঠিকঠাক।
মাসুম সাহেব টেবিলের কোনায় রাখা আব্দুর রুশান মোহাম্মদের প্রিয় বইটা হাতে নিয়ে বলেন বলেন, "প্রকৃতি নামটার আর সমাধান হলো না, তাই নারে! বুড়ো হয়ে গেছি। সময় কিভাবে কিভাবে চলে যায় একবার ভেবে দেখেছিস, রুশান? এখনো চোখ বন্ধ করলে মনে হয় এই সেদিনের ঘটনা।"
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হাসেন। "জীবনটা শেষ হয়ে গেলো। শুধু শেষ কয়েকটা পাতাই বেঁচে আছে। যেদিন ওগুলো পড়ে যাবে, সোজা চলে যাবো সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে...। শুধু তার আগে এবারের জন্য প্রকৃতির সমাধানটা চাই।"
কথা স্রোত অন্যদিকে বয়ে যাওয়ার আগেই তূর্য বলে, "এত সহজ নাকি সবকিছু। আপনাদের এখনো অনেক জীবন বাকি। বয়স শুধু একটা নম্বর মাত্র।"
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হেসে উঠেন। মাসুম সাহেব এবার চশমা মুছতে মুছতে বলেন, “অরবিন্দের মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিল। ওর মৃত্যুটাই হয়তো বুঝিয়ে দিল বুড়ো হয়ে গেছি, সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর ওর মৃত্যুর পর মুক্তির সঙ্গে যোগাযোগ হয় নি। কিন্তু আমি একটা নম্বর খুঁজে পেয়েছি, পুরনো, কিন্তু চেষ্টা করা যেতেই পারে।”
তূর্য কপালে দু আঙ্গুল দিয়ে বলে, “সেটাই! এখন চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই তো করার নেই আমাদের কাছে।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মৃদু হেসে বলেন, "এত বছর ধরে তো শুধু চেষ্টাই করে যাচ্ছি..।
ঘরটা চুপসে যায় আবার। ঘরের নিস্তব্ধতা ছুঁয়ে যায় তিনজনের দেহ ও মন। হালকা আলো জানালার পর্দা ছুঁয়ে টেবিলের উপর পড়ে আছে।
___________
চলবে......♥️