নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩৯
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩৯ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩৯
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের চোখে আজ বহু বছরের ক্লান্তি, বহু রাতের নিঃশব্দ ভার। তিনি একবার উপস্থিত প্রতিটা মানুষের দিকে তাকান। তারপর এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে মুখ খোলেন। তার গলা যেন কাঁপছে শব্দের ভারে, তাও তিনি বলেন, "সেদিন, আমি ছাদে ছিলাম। সকালের শেষ বেলায় আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম, স্বাত্ত্বকি মিনুকে কিছু একটা দিচ্ছে। তখনো জানতাম না সেটা কি। শুধু দেখেছিলাম, স্বাত্ত্বকির মুখ ছিল খুব গম্ভীর, একটা দৃঢ়তা ছিল চোখে... যেন কারো হাতে ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছে সমস্ত দায়। প্রচন্ড রাগ হয়েছিল আমার। মিনুর বিয়ে হয়ে গেছে, এখন এসব প্রেম পাগলামি মানায় না। আমি রাগে ছুটে নেমে এসেছিলাম নিচে। ভেবেছিলাম মিনুকে খুব বকাঝকা করবো। ওকে জিজ্ঞেস করবো স্বাত্ত্বকি কি দিয়েছে ওকে, আর কেন?
কিন্তু নিচে পৌঁছোনোর মুহূর্তে বাবা মিনুকে ডাকেন। আমি আর কিছু বলার সুযোগ পাইনি। মিনু চলে যায়। আমিও মিনুর ঘরের দরজার দিকে আর এগোই না। ওর ঘরের টেবিলের ওপরই রাখা ছিল একটা খাম, আর একটা ডায়রি। আমি বুঝে নিয়েছিলাম হয়তো স্বাত্ত্বকি মিনুকে নিজেদের কিছু দিয়েছে। এসব বিষয় তখন লজ্জা কর। ছোট বোনের প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে ভেবে আমি ওগুলো দেখেও ছুঁইনি। মিনু যখন বসার ঘরের দিকে যায়, আমি তখনও দাঁড়িয়ে। তখনই দেখি তুহুরা নিঃশব্দে মিনুর ঘরে ঢোকে। কিছুক্ষণ পর ডায়রি আর খাম নিয়ে খুব গোপনে বেরিয়ে যায়। সোজা চলে যায় নিজের ঘরের দিকে।
আমি সেই মুহূর্তে তুহুরাকে থামাতে পারতাম... কিন্তু পারিনি। না জানি কেন, আমি চলে যাই বসার ঘরে, মিনুর পিছু। সেখানে বাবা জানিয়ে দিলেন যে হাসান আসছে মিনুকে নিয়ে যেতে। আজই। আমার রাগ, আমার জিজ্ঞাসা সব তখন যেন আমি গিলে ফেলি। নতুন বিয়ে হয়েছে মিনুর। আজ তার স্বামী তাকে নিয়ে যাবে। এটা ভেবে বাড়িতে আর কোন নতুন ঝামেলা চাইনি আমি। তাই তখন স্বাত্ত্বকির আসার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ লুকিয়ে যাই আমি।"
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ এবার মাথা নিচু করে ফেলেন, নিঃশব্দে। তারপর বলেন, "আমি জানতাম না, তুহুরার হাতে কী গেছে। বাড়িতে এক রকম আয়োজন এর রেশ পড়ে যায়, নতুন জামাই আসছে। এটা ওটা... আর এই আয়োজনের ফাঁকে সবাই যেন তুহুরাকে একেবারে নজর আন্দাজ করে ফেলে। সঠিক কখন থেকে তুহুরা বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়, এই খবর যেন কারো অব্দি পৌঁছায় না।"
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একটু থামেন। মিনু রহমান তখনও কাঁদছেন নিঃশব্দে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ একই পাথরের ন্যায় বসে আছেন। তার যেন আজ কোন কিছুই জানার নেই, শোনার নেই আর বলারও নেই। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। তবে মাসুম একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন আব্দুর রবিউলের দিকে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ থেমে যান একটুক্ষণ। মনে হচ্ছিল তিনি যেন অতীতের এক কালো পৃষ্ঠায় ঢুকে পড়েছেন। তারপর চোখ বন্ধ করে এক লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলেন, “দুপুরের শেষ ভাগে হঠাৎ মা আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। গলার স্বর নিচু, কিন্তু তীব্র আতঙ্কে কাঁপছিল। বললেন, তুহুরাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বারান্দা, ঘর, ছাদ সব খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও নেই। তখন ঘর ভর্তি মেহমান, হাসানের আত্মীয়স্বজন সবাই হাজির। মা বললেন, কাউকে কিছু জানিও না, এই সময়ে একটা মেয়ে নিখোঁজ হওয়া মানেই বিপদ। দেশের অবস্থা তখন খুব খারাপ, রাস্তায় মিছিল, খুন, গুম সবই ঘটছে। দেশের এই অবস্থায় একজন যুবতী মেয়ে দুপুরবেলায় নিখোঁজ হওয়াটাও একটা বিশাল ব্যাপার।
তখন আমি মাকে বলি, চিন্তা করো না। হয়তো কারো বাড়িতে গেছে। আমি খুঁজে দেখছি। সেই সময়ই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়। হাসান মিনুকে নিয়ে চলে যায়।”
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ এবার গলার স্বর নামিয়ে বলেন, “দুপুর পেরিয়ে বিকেল গড়িয়ে যায়। আমি একে একে পাড়ার পরিচিত বাড়ি, খেলার মাঠ, এমনকি তুহুরার ক্লাসমেটদের বাড়িতে পর্যন্ত খবর নিই। কিন্তু কোথাও নেই তুহুরা। প্রচন্ড ভয়ে আমি পাগল প্রায় হয়ে উঠি। একটা মুহূর্তে আমার মাথায় হঠাৎ আসে, সেই ডায়রির কথা, যেটা স্বাত্ত্বকি মিনুকে দিয়েছিল। আমি তো নিজের চোখে তুহুরাকে নিতে দেখেছিলাম। সেইখান থেকেই আমার সন্দেহ জন্মায়। আমি জানতাম প্রকৃতি আপার ভাই স্বাত্ত্বকি। তাই ছুটে যাই উনাদের বাড়ির দিকে। সেখানে তুহুরাকে দেখে রাগে সামলাতে পারিনি। ওখানের পরিবেশ অবস্থা কিছুই যেন আমার চোখে দাগ কাটতে পারেনি। আমি শুধু তুহুরাকে ওদের বাড়ির গেটে পাই। আমি তুহুরার কোন কথা কিছু শুনিনি, বুঝিনি। শুধু রাগে, লজ্জায়, ভয়ে তুহুরার হাত চেপে ধরে জোর জবরদস্তি করে বাড়িতে নিয়ে আসি।’”
ঘরের মধ্যে তখন পিন পড়লেও শোনা যায়। বাতাস ভার হয়ে এসেছে, শব্দ নিঃশেষ। সবাই বসে, নিঃশ্বাস আটকে। স্বাত্ত্বকি চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন। তার ঠোঁটের কোণে কোনো অভিমান নেই, বরং একরকম দীর্ঘশ্বাসের শান্তি। তূর্য দাঁড়িয়ে, কাঁধ শক্ত। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ থেমে যান কিছুক্ষণের জন্য। যেন নিজেরই বর্ণনা তাকে নিজেই গিলে ফেলেছে। তারপর ধীরে, খুব ধীরে বলেন, “তুহুরা আমাকে বলতে চেয়েছিল, ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি সুযোগ দিইনি। শুধু হাত ধরে একরকম জোরে টেনে আনছিলাম, যেন ওর কোন কথা শোনার দরকার নেই। যেন আমি যা জানি, সেটাই যথেষ্ট। অথচ আমি জানতামই না কিছুই।
বাড়িতে তখন সবাই বসে ছিল বসার ঘরে– বাবা, মা, দাদি সবাই। কারো মুখেই হাসি নেই, আতঙ্ক ঝুলে আছে সবার চোখে। আমি তুহুরাকে নিয়ে ঘরে ঢুকেই বললাম, “‘নিয়ে এসেছি আপনাদের আদরের দুলালীকে। এবার থেকে এটাকেও দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করুন। তুহুরা কোথায় ছিল জানেন? স্বাত্ত্বকিদের বাড়িতে। আমি ওকে সেখান থেকেই ধরে আনছি।’
আমার কণ্ঠ ছিল দৃঢ়, আক্রমণাত্মক, যেন আমি কোনও অন্যায়কে চেপে ধরে আনছি, আমিই এক নায়ক।”
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের গলা কাঁপে এবার। তিনি নিজেই যেন সেই দৃশ্য মনে করে শিউরে ওঠেন। এরপর বলেন, “আব্বা একেবারে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছিলেন। তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে তুহুরাকে প্রশ্ন করেন, ‘রবি যা বলছে তা কি সত্যি তুহুরা? কি করতে গিয়েছিলি তুই ও বাড়িতে?’ তাঁর কণ্ঠে ছিল অবিশ্বাসের ছাপ, আর সঙ্গে একটা ক্ষীণ অপমান যা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, এই প্রশ্ন তুহুরাকে নয়, আসলে আমাকে উদ্দেশ্য করেই করা।
তুহুরা তখন দাঁড়িয়ে ছিল আমার একটু পেছনে। আমি ওকে সামনে ঠেলে দিয়ে বলি, ‘বলো, কী কাজে গিয়েছিলে ও বাড়িতে? কী দরকার ছিল?’
আমার কথা কাঁটার মতো ছুঁয়ে গিয়েছিল ওকে, বুঝেছিলাম। কিন্তু তুহুরার মুখে তখন কোনো ভয় ছিল না। কোনো গুমোট চাপা কণ্ঠ না, বরং এক অবিশ্বাস্য শান্তি ছিল ওর গলায়। যেন বহুদিনের ভার সে নামাতে চলেছে। সে যেন এক মহা পূর্ণ করে এসেছে। তারপর তুহুরা ধীরে ধীরে মুখ খোলে।”
ঘরে তখন নিঃশব্দের ছায়া ঘন হয়ে উঠেছে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের কণ্ঠ থেমে যাওয়ার পর যেন কয়েক মুহূর্ত সবাই থমকে যায়। আজকের এই একই বসার ঘর যেন সময়ের পালাক্রমে পিছিয়ে যায় আরো পঞ্চাশ বছর পেছনে। প্রতিটি মানুষের সামনে যেন স্পষ্ট সেই দৃশ্য।
তুহুরা সে সময় দাঁড়িয়ে ছিল জমানো স্মৃতির মতো নিস্তব্ধ, অথচ ভিতরে এক ঝড় বছরের পর বছর জমে থাকা কথা, অন্ধকারে চাপা পড়ে যাওয়া সত্য, আজ সকলের চোখে দৃশ্যমান। তুহুরা ধীরে চোখ তুলে তাকায় পরিবারের সবার দিকে। আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদের মা কপালে হাত দিয়ে বসে আছেন। যিনি এক কট্টরপন্থি মানুষ। আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদের সহধর্মিণী চোখে আঁচল চেপে ধরেছেন। যেন এক কঠোর কষ্ট লুকাতে চাইছেন। যুবক আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চুপ করে মাথা নিচু করে বসে আছেন শুধু।
তুহুরা সকলের মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণ করে একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়। তার গলায় কাঁপন নেই, বরং একরকম অদ্ভুত স্বচ্ছতা, সে বললো, “আজ সকালে আমি কেবল দেখেছিলাম বারান্দা থেকে যে, একটা ছেলে মিনুর হাতে কিছু একটা তুলে দিয়ে চলে যাচ্ছে। ছেলেটার মুখ ছিল স্পষ্ট না। আর না তার অভয়কে কোন পরিচিত মুখ মনে হচ্ছিল। তখন আমি কিছুই ভাবিনি... স্রেফ কৌতূহল হয়েছিল যে কে এই ছেলে, কি এমন দিল মিনুকে? আর সন্দেহ হচ্ছিল হয়তো এটাই সেই ছেলেটা যার সাথে মিনুর সম্পর্ক রয়েছে। মিনু এখন বিবাহিত। আমি চাই না ও কোন পাপের পথে পা বাড়াক। তাই ছুটে যাই ওর ঘরে ওর সঙ্গে পরিষ্কার ভাবে কথা বলার জন্য। কিন্তু আমি যাওয়ার পথেই আপনি মিনুকে ডাক দেন। আমি শুধু দেখি মিনু ওর নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে। মিনু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই আমি মিনুর ঘরে ঢুকি। তখন ওর টেবিলে পড়ে ছিল একটা ডায়রি আর একটা খাম। বেশ কৌতুহল জাগে আমার, এ কারণেই এগিয়ে যাই। আমি ডায়রিটার প্রথম পাতায় চোখ রাখতেই দেখি স্পষ্ট লেখা ‘প্রকৃতি সাহা'।"
তুহুরার চোখে একটু জল চিকচিক করে উঠল। সে বললো, “ আমি একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাই। প্রকৃতি কে সেটা তো আর চিনতে কারো বাকি নেই বাড়িতে। এই মানুষটাকে বর্ননার জন্য তো তার নামটাই যথেষ্ট। আমার কৌতুহল চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাই আমি ডায়রিটা নিয়ে চুপিসারে আমার ঘরে চলে যাই। আমি একবার জানতে চেয়েছিলাম, কি আছে এই মেয়ের মধ্যে, যার জন্য রুশান ভাইয়ের এত পাগলামি, এতো প্রেম, এতো লড়াই। আর এটাও মস্তিষ্কে আসছিল না যে, এই প্রকৃতির ডাইরি কি করে মিনুর কাছে একটা ছেলে এসে দিয়ে যায়। আমি ডায়রিটা খুলে এদিক ওদিক ভালো দেখি। শুধু চোখ বুলাই মাত্র। তখনো তেমন কিছু বোঝার মতো নয়। কিন্তু শেষ পাতায়…”
তার গলা একটু কেঁপে ওঠে, সে থামে। তারপর কাঁপা ঠোঁটে আবার বলে, “শেষ পাতায় ছিল প্রকৃতির লেখা আত্মহত্যার বিবরণ। যন্ত্রণা। আর তারিখটা আজকের।"
ঘর নিঃশব্দে থেমে যায়। ঘরের অনেকেই অনেক কিছু বলতে চায় তবে সবাই জমে গেছে যেন। শুধু তুহুরা থেমে যায় না। সে বললো, “আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমরা তো বরাবরই শুধু রুশান ভাইয়ের পাগলামিটা দেখেছি। অপর পাশে যে তার থেকেও বড় পাগল বসে আছে, সে খোঁজ কে রেখেছে! আমি শুধু এই নারী মূর্তিটাকে একবার দেখার জন্য ছুটে গিয়েছিলাম। আমি একটা বার তার মুখটা দেখতে চাইছিলাম। এক দিনের মাঝে একটা সমগ্র পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল! প্রকৃতির মৃত্যু সহ্য না করতে পেরে ওর বাবাও শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছে। মৃত্যু কি এতো সহজ?”
তুহুরা থামলো। চোখের জল শাড়ির আঁচলে মুছে নিজেকে সামান্য ধাতস্থ করে বললো, “এরপর যা হয়েছে, সেটা রবি ভাই নিজেই বলেছেন। আমি বাড়িতে ফিরতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই রবি ভাই আমাকে জোর জবরদস্তি করে নিয়ে এসেছেন, আমার কোন কথা তিনি শুনেননি। আমি শুধু বলব... আমি কোনও পাপ করিনি। আমি কেবল একজন মেয়ের আর্তি পড়েছিলাম, একজন মানুষের শেষ চিৎকার শুনেছিলাম। আমি যদি না যেতাম, যদি না জানতাম, তাহলে বোধহয় এই পাপটা আমারই থাকত... সবটা না জানা, কিছু না করা এটাই আমার ব্যর্থতা হতো।”
তুহুরার চোখে তখন জল, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা। মুখে কোনও আক্ষেপ নেই, শুধু এক দীর্ঘ বোঝার ভার। ঐ গম্ভীর মহলে আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন, "ডায়রি আর চিঠিটা কোথায়?"
তুহুরা নিচু স্বরে বললো, "আমার ঘরে।"
আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ ভারী আওয়াজে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে বলেন, "ডায়রি আর চিঠিটা নিয়ে এসো এখানে।"
বাবার আদেশ মতো আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ ডায়রি আর চিঠি এনে আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদের হাতে দেন। তিনি এটা চোখ বুলিয়ে দেখেন। শুধু চোখ বুলানোই নয়, প্রতিটি অক্ষর গভীরভাবে পড়েন। বিশেষ করে শেষ পাতা আর চিঠিটায় চোখ আটকে থাকে। তার মুখ দেখে অবশ্য বোঝা গেল না তিনি কি অনুভব করলেন। কষ্ট পেলেন নাকি মুক্তি। তবে চিঠিটা হাত বদলে তার স্ত্রী আমিনা বেগমের হাতে পড়তেই তিনি যেন ভেঙে পড়লেন চিঠির গোছানো শব্দচায়নে। ঘরের বাতাস তখন এতটাই ভারী যে, নিঃশ্বাস নিতেও বুক যেন ধীরে ধীরে ফেটে যেতে চাইছিল। সকলের চোখে একধরনের স্তব্ধতা, কানে ভেসে আসছিল শুধু দাদির মৃদু দোয়া জপার ফিসফাস। বেশ লম্বা সময় পর এই থমথমে পরিবেশের মাঝে ডায়রি আর চিঠিটা আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের হাতে এগিয়ে দিয়ে আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ বলেন, “এটা এখনই জ্বালিয়ে দাও। একটা পাতাও যেন অবশিষ্ট না থাকে।”
শব্দটা শুনে যেন বজ্রপাত ঘটে তুহুরার ভেতরে। তার এক চিৎকারে কেঁপে ওঠে পুরো ঘর, "না!"
সেই ঘর যেখানে কেউ উচ্চস্বরে কথাই বলেনি এতক্ষণ, সেখানে হঠাৎ তুহুরার এই কান্না আর কণ্ঠ যেন ঘরের দেয়াল কাঁপিয়ে দেয়। সে দৌড়ে আসে, আব্দুর রবিউলের হাত থেকে ডায়রি টেনে ছিনিয়ে নেয়। তারপর, কোনও সংকোচ ছাড়াই, সে আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদের পায়ে পড়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে বলে, “খালু জান, দয়া করে এটা পোড়াবেন না। আমি হাতজোড় করে বলছি, এটা একটা মানুষের শেষ স্মৃতি। এটা কোনো পাপ নয়, কোনো লজ্জা নয়, এটা শুধু একটা আত্মার শেষ চিৎকার। এটা নিভে যাওয়া একটা মেয়ের আলো, দয়া করে এটাকে নিভিয়ে দেবেন না!”
আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ স্থির, কঠিন। কিন্তু তাঁর চোখেও জল জমেছে কিনা কেউ দেখতে পায় না। তাঁর গলা কঠিন, অথচ ক্লান্ত, তিনি স্পষ্ট স্বরে বলেন, “যে মানুষ মরে গেছে, তার শেষ স্মৃতি থেকে যে মানুষটা এখনও বেঁচে আছে তার বেঁচে থাকাটা বেশি জরুরি। তুই কি জানিস না রুশান কেমন পাগল এই মেয়েটার জন্য? তোর মনে হয়, এই মেয়ের এই শেষ বয়ান শুনলে রুশান সামলাতে পারবে নিজেকে? ওর শরীর মরার আগে আত্মা মরে যাবে।”
তুহুরা তখন আর কিছু বলতে পারে না। শুধু নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। একটু পর থেমে থেমে বলে, “আমি... আমি আমার আল্লাহর কসম দিচ্ছি খালু জান। আমি জীবিত থাকতে এই ঘটনা রুশান ভাই জানা তো দূরে থাক... কোনোদিন এই ডায়রির চেহারাও দেখতে পারবেন না উনি। আমি এটাকে কোনোদিন অমান্য হতে দেব না। দয়া করে এটাকে ধ্বংস করবেন না, এটা একটা প্রমাণ, একটা আত্মার অস্তিত্বের শেষ সাক্ষ্য... আমাকে এটুকু রাখতে দিন... নিজের অন্তরে।”
ঘর তখন নিঃশব্দ। এই প্রথমবার আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ একবার চোখ উঠিয়ে তাকান তুহুরার দিকে। তাঁর মুখের রেখা নরম হয় না, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য দয়া জেগে ওঠে যেন। তিনি কিছু বলেন না, ডায়রির দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তুহুরা ডায়রিটা বুকের ভেতর চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। আলতো বাতাসেও যেন সে কেঁপে উঠে। সেই মুহূর্তে কেউ কিছু বলে না। সময় যেন জমে আছে, নিঃশব্দে। কিন্তু সেই নীরবতাকে ছিঁড়ে ফেলে হঠাৎই আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ এবার উঠে দাঁড়ান। তাঁর চোখে এবার কোনো দ্বিধা নেই, কণ্ঠে কোনও ক্লান্তি নেই শুধু একরকম কঠোর সংকল্প। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন তুহুরার দিকে। তুহুরা কিছু বোঝার আগেই তিনি ডায়রিটা ছিনিয়ে নেন তার বুক থেকে। তারপর ক্ষিপ্র হাতে শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা একটানে ছিঁড়ে ফেলেন। বেরিয়ে আসে কয়েকটা সুতো। ছেঁড়া পৃষ্ঠা হাতে নিয়েও তার চোখে কোন দ্বিধা নেই, তিনি যেন ছিঁড়ে ফেলছেন কোনো অভিশাপ।
তুহুরা নিঃশব্দে কেঁপে ওঠে, কিন্তু প্রতিবাদ করে না। আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ তখন ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ান। চারপাশে সবার তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। হাতে ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো নিয়ে তিনি এগিয়ে যান দেয়ালের পাশে রাখা টেবিলের উপরের দিয়াশ লাইটের দিকে। এক টুকরো আগুনে তিনি নিজ হাতে জ্বালিয়ে দেয় সব। তার নিজ হাতেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় কাগজ গুলো। পাতাগুলোর উপরের কালো লেখা শব্দগুলো ধীরে ধীরে সাদা ছাই হয়ে ওঠে।
ঘরের কারও সাহস হয় না তখন একটাও শব্দ করার। তখনই, পুরো ঘরের দিকে তাকিয়ে, আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, “স্মরণে রেখো, আজকের দিন কোনো দিনই ছিল না। আজকের দিন ক্যালেন্ডারে আসেই নাই। এই বাড়িতে আজ কিছুই ঘটেনি। এই বাড়ির কেউ জানে না কোনো ডায়রি, কোনো চিঠি, কোনো প্রকৃতির কথা।
এ বাড়িতে এই নাম আর কোন দিন উচ্চারিত হবে না। যদি হয়... আমি কাউকে ছাড়ব না।”
তাঁর কণ্ঠ যেন ছায়া ফেলে দেয় সবাইকে ঢেকে। কথা শেষ করে তিনি ধীরে বসে পড়েন আবার নিজের চেয়ারে, মাথা নিচু করে। ঘরজোড়া স্তব্ধতা তখন যেন শূন্যতার স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সবার মাঝখানে। তুহুরা চোখ নামিয়ে রাখে।
বাতাস যেন ধীরে ধীরে ভারহীন হয়ে পড়ে, আগুনের পুড়ে যাওয়া পাতার গন্ধ মিলিয়ে যায় নিঃশব্দের আঁধারে। শুধু একটা অদৃশ্য ছায়া যেন ঘুরে বেড়াতে থাকে সবাইকে ছুঁয়ে একটা হারিয়ে যাওয়া জীবনের, এক অপূর্ণ চিঠির, এক নিষিদ্ধ প্রেমের ছায়া। তুহুরা কিছু বলে না। সে চুপচাপ নিচু হয়ে পড়ে থাকা ছেঁড়া ডায়রিটা কুড়িয়ে নেয়, যেটুকু রয়ে গেছে কয়েকটা পৃষ্ঠা, কিছু স্মৃতি, কিছু নিরব শব্দ। বুকের ভেতর চেপে ধরে রাখে। তার চোখে তখন আর কান্না নেই, আছে এক গভীর নীরব প্রতিজ্ঞা। এই ডায়রির অবশিষ্টটুকু সে যত্ন করে রাখবে। না প্রকাশের জন্য, না প্রতিশোধের জন্য, শুধু এক আত্মাকে মরতে না দেওয়ার দায়ে।
আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ কিছু বলেন না আর। তবে তাঁর মৌনতা যেন অনুমতির শিলমোহর। কেউ আপত্তি তোলে না, কেউ প্রশ্ন করে না। তুহুরা বুঝে যায় ডায়রিটা এখন তার, যদিও তা অসম্পূর্ণ, তবুও এক গভীর সত্যের একমাত্র বেঁচে থাকা খণ্ডচিত্র। এতো বেহিসেবি ভালোও কি কেউ বাসতে পারে… ! তার এক জলজ্যান্ত প্রমান হয়ে তুহুরা চুপসে রইলো।
পৃথিবীতে অনুভব করা প্রতিটি ভালোবাসার বর্ননা হয়তো মানুষ ভেদে বদলায়। ঠিক কয়েক ঘন্টা আগে পর্যন্ত যেই মানবিকে অভিশাপে জড়জড়িত করে রেখেছিল তুহুরা, এখন তার শেষ স্পর্শ বাঁচাতে এতো লড়াই।
_____________
চলবে....... ❤️