নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩৪
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩৪ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩৪
তূর্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার দৃষ্টিতে একধরনের দন্দ্ব, যেন শত প্রশ্ন জমে আছে বুকের ভেতর, কিন্তু কোনটা আগে করবে তা নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না। প্রতিটি প্রশ্ন যেন একেকটি গিঁট, যার সুতোগুলো জড়িয়ে গেছে আবেগ, ইতিহাস আর অজানা ব্যথার মাঝে।
তার ঠোঁট নড়ে ওঠে। কিন্তু শব্দ আসে না। হিয়া চুপচাপ বসে। তার দুই হাতের আঙুল নিজে আঙুলের ভাঁজে জড়িয়ে ধরা, চোখ চঞ্চল সারা কক্ষজুড়ে। তার কাছে এই পুরো পরিস্থিতিটা এখনো স্বপ্নের মতো, অবিশ্বাস্য। এতদিন যাকে তারা কেবল এক চিঠির পাতায় আবিষ্কার করেছে, যার নাম শুধুই একটা কাহিনির অব্যক্ত চরিত্র ছিল, যাকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত সবাই, সেই মানুষটা এখন সামনেই বসে আছে, রক্ত-মাংসের বাস্তবতায়।
প্রকৃতির ভাই স্বাত্ত্বকি, এই মানুষটিই? সে যেন সব সত্যতা নিয়েই পালিয়ে ছিল যুগের পর যুগ।
স্বাত্ত্বকি সাহেব ধীরে, গভীর চোখে তাকান তূর্যর দিকে। তারপর হালকা গলার স্বরে জিজ্ঞেস করেন, “রুশান ভাই কেমন আছেন? শেষবার... কবে যে দেখেছি তা মনেও নেই।”
তূর্য মাথা নাড়িয়ে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল, “ভালো আছেন। উনি যদি জানতেন শঙ্খ'ই আসলে স্বাত্ত্বকি তাহলে অবশ্যই আজ আসতেন। আপনাকে খুঁজতে মানুষটা অনেক কষ্ট করেছেন।”
স্বাত্ত্বকি হেসে ফেলেন, কপালের ভাঁজটা যেন এক মুহূর্তে অতীতে ফিরে যায়। তারপর হঠাৎ মুখ খুলে বলেন, “আর মিনু? সেও তো নিশ্চয়ই এখন বুড়ি হয়ে গেছে। দিন তো আর কম পেরোয়নি...।”
তূর্য এবার একটু হেসে ফেলে। মিনু রহমান আর স্বাত্ত্বকির বাল্যপ্রেমের কাহিনী তো আর তাদের অগোচরে নেই। সময় ফুরিয়েও যেন কোথাও ঝুলে আছে এখনো। তূর্য নিজের ফোনে মিনু রহমানের সাথে তার তোলা একটা ছবি স্বাত্ত্বকির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "বয়স তো সংখ্যা মাত্র। দাদী আমার এখনো সুন্দরী।"
তিনি চোখ মেলে তাকান ছবিটার দিকে। এক অযাচিত সুখ যেন তার চোখের কোনে খেলে যাচ্ছে। হিয়া এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে তার চোখের ঐ জ্বলে ওঠা আভার দিকে। আসলেই কি মানুষ তার প্রথম প্রেম কোনোদিনও ভোলে না? এই প্রশ্ন হিয়ার মস্তিষ্কে এসে ছোঁয়।
এক পলকহীন নজরে মিনু রহমানের ছবিখানা দেখতে থাকেন স্বাত্ত্বকি। সামান্য সময় পেরিয়ে ফোনটা তূর্যকে ফিরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ নীরবতা। বাতাসে ভেসে বেড়ায় এসেনশিয়াল অয়েলের খুব দূর্বল সুবাস। অফিসঘরের অতিরিক্ত পরিপাটি নিরবতা যেন সেই অতীতের স্মৃতিকে আরও গাঢ় করে তোলে।
তূর্য এবার ভেতর থেকে একটু সামলে, সরাসরি প্রশ্ন করে, “আপনার বোন… প্রকৃতি এখন কোথায় আছেন? বিশেষ করে তাকে খোঁজারই এতো আয়োজন।”
এই প্রশ্নটা যেন পুরো ঘরটার চৌম্বকতা বদলে দেয়। স্বাত্ত্বকি তূর্যর করা এই প্রশ্নটা যেন ঠিক পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারেন না। তার চোখে মুখে ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত প্রশ্ন। তার কণ্ঠে এক ধরনের ধীরে আসা বিভ্রান্তি, যার শিকড় অনেক গভীরে গিয়ে ঠেকে। মস্তিষ্ক থেকে সে প্রশ্ন কণ্ঠস্বর আসে, "ঠিক বুঝতে পারলাম না। বড়দি’ভাইকে কেন খুঁজছো? মানে কি কারনে?”
তূর্য এবার গলা একটু সরল রাখলেও শব্দ স্পষ্ট হয়। সে ধীরে বলল, “প্রকৃতিকে রুশান খুঁজছেন। যুদ্ধ থেকে ফেরার পর থেকে এতো গুলো বছর ধরে তিনি পাগলের মতো করে খুঁজেছেন আপনার বোনকে।”
এই কথা শোনামাত্রই স্বাত্ত্বকির চোখ যেন আরও স্থির হয়ে যায়। তার সমস্ত অভ্যস্ত গাম্ভীর্যের আড়ালে যেন দোলা দিয়ে ওঠে হালকা এক কাঁপন। তিনি নিজেই নিজের সোজা হয়ে বসে থাকা ভঙ্গিটা একটু এলোমেলো করেন, হাতের আঙুল একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন। নিজেকেই যেন বলে ওঠেন, “রুশান ভাই… খুঁজছেন?”
তিনি যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না কিছুই। এক গভীর সংসয় তাকে জাপটে ধরে, তিনি একটু সময় নিয়ে বলেন, “কিন্তু... কীসের জন্য খুঁজছেন? আমি তো নিজের হাতে বড়দি’ভাইয়ের ডায়েরি আর সেই চিঠি দিয়ে এসেছিলাম মিনুর হাতে। সেই চিঠিতে তো পরিষ্কার লেখা ছিল, প্রকৃতি কোথায়, কেন? এমনকি… তুহুরা আপার সাথেও তো বড়দি’ভাইয়ের ডায়রির সূত্রেই আমার পরিচয়। সবাই সবটা জানার পরেও খোঁজেন?”
তূর্য এবার গলার স্বর একটু নিচু করে, কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বলে ওঠে, “হ্যাঁ, খোঁজেন। আপনি সে দিন ডায়রিটা দাদিকে দিয়ে এলেও সেই ডায়রিটার সন্ধান বড় দাদা পেয়েছেন এই মাস দুয়েক আগে। দাদির থেকে নাকি তখন ডায়রিটা হারিয়ে যায়। তাই আর তিনি এ বিষয়ে কিছুই বড় দাদাকে জানিয়ে ছিলেন না। হঠাৎ এতো বছর পর চিলেকোঠা থেকে ডায়রিটা আবিষ্কার হয়, তবে শেষের গুটি কয়েক পাতা নিখোঁজ। কেউ ইচ্ছে করে ছিড়ে নিয়েছে। তাই ডায়রির শেষটা পরিষ্কার নয়।"
হিয়া এবার ধীরে তার চোখ তুলে তাকায় স্বাত্ত্বকির দিকে। চেয়ার থেকে সামান্য এগিয়ে এসে সে যেন একটা নীরব প্রশ্ন করতে চায়, যা উচ্চারিত হয় না, কিন্তু বাতাসে অনুরণনের মতো ঝুলে থাকে। স্বাত্ত্বকি যেন কোন ভাবেই বিষয়টা বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিছু একটা ভেবে তিনি বলেন, "ঠিক আছে, ডায়রিটা হারিয়ে গিয়েছিল মেনে নিলাম। তবে আমার জানামতে রুশান ভাইয়ের বাড়ির সবাই তো কমবেশি জানতো যে বড়দি’ভাইয়ের কি হয়েছে, কোথায় তিনি। একবারও কেউ রুশান ভাইকে বলেনি ব্যাপারটা! এটা কি আদৌও মেনে নেয়ার মতো!"
তূর্য অবাক হয় না। সে জানে, ও বাড়িতে সবাই রহস্য নিয়ে খেলতেই পারদর্শী। তূর্য খুব ধীরে বলে, "আরো অনেক কিছুই মেনে নেয়ার মতো নয়। বড় দাদা তার সমগ্র জীবন শুধু প্রকৃতির অপেক্ষায় কাটিয়েছেন। এখনো বিয়ে অব্দি করেননি তিনি।"
স্বাত্ত্বকির কণ্ঠ থেকে শব্দ হারিয়ে যায়। তিনি যেন চরম এক ধাক্কা খেলেন। সব যেন তার ধারণার বাইরের এক অন্য জগতের তথ্য সে জানতে পারছেন। সব অপ্রত্যাশিত। তিনি নিজের মস্তিষ্কের তোলপাড় সংযত করতে জিজ্ঞেস করেন, "আমাকে কি একটু বিস্তারিত বলতে পারবে ঘটনাটা? আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি না। সব কেমন প্যাঁচ লেগে যাচ্ছে।"
তূর্য একটু সংকিত হয় স্বাত্ত্বকির এমন কৌতহলি উত্তেজিত মুখ দেখে। সে ধীরে বলতে শুরু করে, "আপনাকে তবে মুক্তিযুদ্ধে শেষ থেকে বলি, যতোটা আমরা জানি আরকি।"
হিয়া শুধু শুনছে আর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। তার আজ যেন কোন শাব্দিক দায়িত্ব নেই। সকল শ্রোতা মহল প্রস্তুত শুনতে। তূর্য বলতে শুরু করে, "বড় দাদা যখন যুদ্ধ থেকে ফেরেন তখন থেকেই তিনি পাগলের মতো প্রকৃতিকে খুঁজছিলেন। বন্ধু বান্ধব সব জায়গায় খোঁজ করেও কোন লাভ হয় নি। পরে ১৯৭৫ এর দিকে উনার এক বন্ধু প্রকৃতিকে কলকাতায় দেখেছিলেন, বড়দাদাও তাকে খুঁজতে কলকাতা অব্দি গিয়েছিলেন। তবে লাভ হয়নি, খুঁজে পাননি তিনি। শুধু জেনে ছিলেন প্রকৃতি বিবাহিত। এরপর আর কোনো খোঁজ নেই। তিনি আপনাদের পরিবারের প্রতিটা সদস্যকে খোঁজার খুব কষ্ট করেছেন। তবে ফল সব শূন্য। এরপর এই দু'মাস আগে চিলেকোঠায় পাওয়া যায় প্রকৃতির বিদ্ধস্ত ডায়রিটা। ওটা পাবার পরে অবশ্য আমার দাদি সব স্বীকার করেন। তার আগে বড়দাদা জানতেনই না আপনার আর দাদির সম্পর্ক, কিংবা তার বিয়ে আমার দাদার সাথে কিভাবে হয়। আপনি ডায়েরিটা কিভাবে দিয়ে গিয়েছিলেন, এসব আর কি। সে যাই হোক। এই ডায়রি পাওয়া গেলেও ডায়রির শেষ পাতা গুলো পাওয়া যায়নি। ওগুলো কেউ ছিঁড়ে নিয়ে নিয়েছে। আসলে ওই ছেড়া পাতার কৌতুহল থেকেই আমাদের এই প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়ার মিশনে নামা।"
তূর্য এক নাগাড়ে গড়গড় করে বলে চললো এসব। শ্রোতামহল শুধু শুনলো। হিয়া প্রকৃতির বিবাহিত হওয়ার কথাটা কোনভাবেই হজম করে উঠতে পারলো না। এসব সে নতুন শুনছে। স্বাত্ত্বকির মুখের রঙ উড়ে গেল। এমনটা যেন তার
ধারনাতেও ছিল না। সবটা যেন গোলক ধাঁধায় পরিণত হয়েছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "তবে কি এই এতো বড় ভুলের দায়ভার আমার!"
তূর্য কিছু বলে না। এই মুহূর্তে চুপ থাকাই যেন সময়ের চাহিদা। স্বাত্ত্বকি হঠাৎ করেই যেন একটু ছায়ার মতো হয়ে যান। তূর্য হিয়ার দিকে একবার তাকায়। হিয়ার চোখে এক বিদ্ধস্তি তোলপাড়। সে সব এড়িয়ে তূর্য ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, "এটাই প্রকৃতিকে খুঁজে পাবার শেষ চেষ্টা আমাদের। সবটাই আপনার কাছে এখন পরিষ্কার হবার কথা।”
স্বাত্ত্বকি যেন চেয়ারে বসে থাকলেও ধীরে ধীরে অতীতের এক অদৃশ্য টানেল দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছেন… কবে থেকে? ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। গলার স্বর একদম নিচু হয়ে আসে, যেন মনের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস পেরিয়ে প্রশ্ন ফোটে ঠোঁটে, “সবার কথা বাদ, তুহুরা আপাও কি কিছু বলেননি? এতকিছুর পরেও?”
তার কণ্ঠে হতাশা, বিস্ময় আর কষ্টের এক অভূতপূর্ব মিশ্রণ। যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না তুহুরার মতো একজন মানুষ এত বড় সত্য চাপা রেখে যেতে পেরেছেন।
তূর্য চোখ নামিয়ে একটুখানি থামে। তারপর নরম গলায় বলে, “উনি বলেননি। হয়তো বলার মতো তেমন সুযোগ পাননি। কারণ উনার মৃত্যুটা… খুব হঠাৎ। শুনেছি, তুহুরা ১৯৭৫ সালের দিকে মারা যান। বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন, স্লিপ কেটে মাথায় আঘাত। হাসপাতালে নেয়ার আগেই… সব শেষ।”
এই কথাটা শুনে স্বাত্ত্বকির মুখ মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে যায়। সমস্ত মুখাবয়বে নেমে আসে গভীর ছায়া। চোখের দৃষ্টি যেন একদম ফাঁকা, শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন নিজেকে অনুপস্থিত করে। স্বাত্ত্বকির গলা যেন জড়িয়ে যায়, তার ঠোঁট কাঁপে, শব্দ ভেঙে পড়ে যায়, “তিনিও এভাবে মরে গেলেন? এতো আগে!”
তার চোখে জল আসে না, কিন্তু ভিতরটা যেন চূর্ণ হয়ে পড়ছে, শব্দহীন ভাবে। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর স্বাত্ত্বকি একবার নিজের আঙুলের ফাঁকে মাথা ঠেকিয়ে বলেন, "সব এতো গোলমেলে হবার ছিল না!"
তার কণ্ঠে তখন আক্ষেপের ঢেউ, যার প্রতিটি বর্ণে একটা অপরাধবোধ চেপে বসেছে। যেন এই ভুলটা এত বছর ধরে ঝুলে ছিল বাতাসে, কেবল এখন তার কাঁধে নেমে এসে বসেছে।
হিয়া এবার ধীরে বলে ওঠে, “এখানে সব কিছুই অদ্ভুত। যেন নিয়তি নিয়মের বিরুদ্ধে চলেছে।...প্রকৃতি এখন কোথায় থাকেন?”
স্বাত্ত্বকি সাহেব চোখ বন্ধ করে ফেলেন এক মুহূর্তের জন্য। ভিতরটা যেন বেজে ওঠে পুরোনো রেললাইনের মত যেখানে প্রতিটি স্টেশন একেকটা ভুল বোঝাবুঝি। তিনি ধীরে বলেন, “বড়দি’ভাই তার ডায়রিতে সবটা লিখেছিলেন। কেউ ইচ্ছে করেই চায়নি এই ডায়রির সত্য বের হোক। হয়তো বড়দি’ভাইয়ের অস্তিত্ব মেটানোর চেষ্টা ছিল।”
এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি সোজা হয়ে বসেন। আর তার ভিতরে কোথাও, ধীরে, এক নতুন দ্বার খুলে যায়। হয়তো, প্রকৃতির দিগন্ত এখনো অদৃশ্য নয়। তার মুখে দৃঢ়তা আসে, কিন্তু চোখে থাকে ব্যথার রেখা, "একটা মৃত মানুষকে নিয়ে কতো টানা হ্যাঁচড়া...!
তোমাদের এই প্রকৃতিকে খোঁজার শেষ চেষ্টা ব্যর্থ। তিনি আর এই পৃথিবীতে নেই।"
এই নেই শব্দ শুনতেই তূর্য আর হিয়া যেন থমকে যায়। ঘরটা তখন নিঃশব্দে ঢাকা পড়ে থাকে। স্বাত্ত্বকির বলা সেই এক লাইন, “তিনি আর এই পৃথিবীতে নেই। ”
এই বাক্যটি যেন ধাক্কা দেয় দু’জনেরই ভিতরটায়। তবে তারা এর থেকে বেশি কি আশা করছিল? বয়সের সংখ্যাও তো কম নয়!
হিয়া বসেই থাকে, তার ঠোঁট কাঁপে কিন্তু কোন শব্দ জন্মায় না। চোখ দুটি থমকে থাকে এক স্থির বিষণ্নতায়। তূর্য যেন নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পায়। সমস্ত শরীর দিয়ে যে অব্যক্ত শূন্যতা বইছে, তা যেন বুকের ভেতর থেকে গুমরে উঠতে চায়। একটা মুহূর্ত শুধু নিস্তব্ধতা, তারপর... স্বাত্ত্বকি ধীরে, যেন নিজের ভাঙা শব্দগুলো জড়িয়ে নিয়ে বলেন, “আমি কখনো ভাবতেও পারিনি যে, বড়দি’ভাইয়ের ডায়রিটা রুশান ভাইয়ের হাতে পৌঁছাবে না। এটা... এই একটা জিনিস... ওনার জীবনের শেষ চাওয়া ছিল।”
তার কণ্ঠের কম্পন ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, “ওই ডায়রিটা পৌঁছানোর গুরু দায়িত্বটা ওনিই আমাকে দিয়েছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে…"
একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে, যেন নিজেকে ধরে রাখতে চান স্বাত্ত্বকি। কিন্তু পারেন না। তার গলা ভারী হয়ে যায়, চোখ দুটো জলে না ভিজলেও জ্বালা করে। তিনি বলেন, "নিজের জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে, আজ নিজেকে ব্যর্থ, অসম্পূর্ণ, একটা অপরাধী মনে হচ্ছে। আমি পারিনি।”
এইবার তার ভঙ্গি একেবারে ভেঙে যায়। দু’হাতের তালুতে মুখ রেখে যেন এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে আড়াল করতে চান। এক অতল থেকে উঠে আসা অপরাধবোধ আর দুঃখ মিশে যায় বাতাসে। তূর্য তখন মাথা নিচু করে থাকে। তার মনে হয়, এই মানুষটাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা এই মুহূর্তে কারো জানা নেই। তবু হঠাৎই স্বাত্ত্বকি নিজেকে গুছিয়ে নেন। তারপর সামনের টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসে এক চুমুক নিয়ে বলেন, “তোমরা এসেছো প্রকৃতিকে খুঁজতে, তাই না? তোমরা তো অনেকটা জেনেই এসেছো। তবে শেষটা জানা জরুরী। যতটুকু তোমাদের জানার বাইরে আর কি!”
স্বাত্ত্বকির চোখদুটো যেন অতীতের কোনো গহীন জানালায় স্থির হয়ে থাকে। মুখে এক অনুচ্চারিত ভার, কণ্ঠে এক নিঃশব্দ হাহাকার। এক নিঃশ্বাসে চোখ বন্ধ করে, অতীতটাকে যেন আরেকবার স্পর্শ করেন। তারপর, ধীরে বলতে শুরু করেন, তার কথাগুলো যেন আসছে না মুখ থেকে, উঠে আসছে হৃদয়ের এক পুরনো গহ্বর থেকে, “সালটা ছিল ১৯৭১ এর শেষ দিক। আকাশজুড়ে তখন যুদ্ধের ধোঁয়া। আমরা বাড়িতে সবাই জানতাম যে বড়দি’ভাই মানে প্রকৃতি আর রুশান ভাই… ওদের সম্পর্কের বিষয়ে। এটা তো আর বাকি পাঁচটা কাহিনির মতো ছিল না। জ্যাঠা মশাই মানে প্রকৃতির বাবা, সবকিছু জেনে চাচ্ছিলেন যতো দ্রুত সম্ভব বড়দি’ভাইয়ের বিয়েটা হয়ে যাক, কিন্তু সাহা বাড়ির বিয়ে মানেই তখন গোত্র-আচার নিয়ে বেজায় নিয়ম।”
স্বাত্ত্বকি থামেন, হালকা হাসেন, যেন চোখের সামনে দিন গুলো পরিষ্কার। তিনি বলেন, “এই নিয়ে তখন আটকে ছিল বিয়েটা। জ্যাঠা মশাই সুযোগ খুঁজছিলেন কবে পরিস্থিতি একটু শান্ত হবে, কবে সাহস করে সিদ্ধান্তটা নেবেন। এর মধ্যেই একদিন হুট করে আমার বাবা ঘোষণা দিলেন, তিনি যুদ্ধে যাচ্ছেন। কারো সঙ্গে পরামর্শ করলেন না, কারো অনুমতির প্রয়োজনও বোধ করলেন না। বাবা বরাবরই এমন ছিলেন, যা চাইতেন, সেটাই করতেন। বাড়ির সকলে বাঁধা দিল, কেউ যেতে দিতে চাইছিল না। আমি তখন খুব ছোট, মাকে হারিয়েছি বহু আগে… আমার বাবাই আমার পৃথিবী ছিল। কিন্তু তাতেও কেউ তাকে আটকাতে পারল না। গোপনে একরাতে বাড়ি ছেড়ে দিলেন। রেখে গেলেন শুধু একটা চিঠি।”
স্বাত্ত্বকি আবারো একটু থামেন। হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া যন্ত্রণাটা যেন তার চোখে সরে আসে। তারপর ধীরে বলতে থাকেন, “দেশের অবস্থা তখন ভয়ানক। রাস্তায় রাস্তায় আতঙ্ক। তার উপরে তখন হিন্দু পরিবারের এ দেশের টিকে থাকাটা তখন খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার মাঝে যদি সে পরিবারের একজন মুক্তিযুদ্ধে চলে যায় তবে পুরো পরিবারের উপর নজর পড়ে যায়। এসব থেকে বাঁচতেই সিদ্ধান্ত হয়, সবাই মিলে কলকাতায় চলে যাওয়া হবে নিরাপদে। এই সিদ্ধান্তে বাড়িতে রীতিমতো বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। কিন্তু বড়দি’ভাই কিছুতেই যেতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, ‘আমি কোথাও যাব না।' সবার অতিরিক্ত জোরাজুরি আর গৃহবন্দি জীবন থেকে বড়দি'ভাই বোধহয় মুক্তি চাইছিলেন। তাই সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেখা করতে গিয়েছিলেন রুশান ভাইয়ের সাথে। তবে তিনি যুদ্ধে যাবেন শুনে ফেরত এসেছিলেন। তখনই ঘটে বিপর্যয়টা। ফেরার পথে ওনাকে ধরে ফেলে জ্যাঠা মশাই আর দাদারা, মানে প্রকৃতি দিদির বড় দু’ভাই। কেউ কিছু শুনতেই চায়নি। তারা ভেবেছিল, উনি পালিয়ে যাচ্ছিলেন…। এরপর আর কিছু বলার সুযোগ দেননি তাঁকে।
বড়দি'ভাইকে আবারো গৃহবন্দি করে ফেলা হলো। আমি দেখেছিলাম, বড়দি'ভাইয়ের চোখে তখন কেমন এক নীরব আগুন ছিল। বেদনার নয়, একটা প্রতিজ্ঞার। এরপরও কলকাতায় যাবার আয়োজন চলতে থাকলো। অবশ্য আমি নিজেও যেতে চাইনি। আমার বাবা এই দেশের হয়ে যুদ্ধ করছে, আমি কেন পালিয়ে যাব!
আমিও বড়দি'ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালাম। যেন এক চুপচাপ জোট গড়ে উঠলো আমাদের। জ্যাঠা মশাই বুঝতে পারলেন, আমাদের ঠেকানো যাবে না। তাই পরিবারের সবাইকে পাঠিয়ে দিলেন কলকাতার উদ্দেশ্যে।
আমার যদি ক্ষমতা থাকতো আমি তাহলে আমি সব ঠিক করে ফেলতাম। বড়দি’ভাই কেও পরিবারের সবার সাথে কলকাতায় পাঠিয়ে দিতাম। তবে হয়তো সবকিছু অন্যরকম হতো…”
তূর্য আর হিয়া নিঃশব্দে বসে শুনছে শুধু। প্রত্যেকটা শব্দ যেন একটা নতুন ইতিহাসের জানালা খুলে দিচ্ছে। স্বাত্ত্বকি আবার বলেন, “তখন সেজ পিসিমা এলেন। তাঁর স্বামী ছিলেন তৎকালীন সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তারা থাকতেন শাপলা চত্বরে, নিজেদের কোয়ার্টারে। পিসিমা এসে বাড়ির এরকম অবস্থা দেখে বড়দি'ভাইকে তার সঙ্গে নিয়ে গেলেন। জ্যাঠা মশাইও তেমন আপত্তি করেননি, হয়তো ভেবেছিলেন, বড়দি'ভাইকে নিরাপদে রাখা যাবে তাতে। আর আমি… আমি থেকে গেলাম জ্যাঠা মশাইয়ের সঙ্গেই আমাদের বাড়িতে।”
তার কণ্ঠ ক্রমে নিচু হয়, কিন্তু গভীরতায় ডুবে যায়। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস তার বুক থেকে উঠে আসে।
____________
চলবে...... 🌸