নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১০
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১০ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১০
সকালের ভারী পরিবেশটা ধীরে ধীরে হালকা হতে লাগল। কিন্তু হিয়ার মনে যে অস্থিরতা তৈরি হলো তার সমাপ্তি কোথায়? সারাদিন ধরে হিয়া তূর্যকে খুঁজল, বাড়িতে সে নিখোঁজ। মেসেজ পাঠাল, একের পর এক ফোন করল। কিন্তু তূর্য যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, কোনো উত্তর নেই, কোনো সাড়া নেই।
সারা দিন পেরিয়ে রাত নেমে এলো। রাতের খাবারের সময় টেবিলের চারপাশটা নিঃশব্দে পূর্ণ, শুধু চামচের আওয়াজ টুকু ভেসে আসছে। হিয়া চুপচাপ বসে, চোখের কোণ দিয়ে বারবার তাকিয়ে নিচ্ছে। আর ঠিক তখনই দরজার শব্দ, ক্লান্ত পায়ের ধ্বনি, আর ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে তূর্য। তার চুলগুলো এলোমেলো, শার্টের বোতাম খোলা, চোখের নিচে ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট। মনে হচ্ছে যেন সারাটা দিন কোনো অদৃশ্য কিছু খুঁজে বেরিয়েছে।
হিয়া শুধু আড় চোখে তাকিয়ে নিলো কিন্তু সে কিছু বলল না। মিনু রহমান ভ্রু কুঁচকে বললেন, "এই তোমার আসার সময়। সারাটা দিন তোমাকে ফোনে পাওয়া যায় না। ফোনটা কেন রাখো কাছে?”
তূর্য খুব শান্ত। শুধু একটা লোকদেখানো হাসি দিয়ে বললো, “একটু কাজ ছিল দাদি।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ নিচু গলায় বললেন, “তূর্য, খেয়ে নাও। অনেক রাত হয়েছে।”
তূর্য এক মলিন হাসি দিয়ে বলল, “হুম, বসছি। আগে ফ্রেস হয়ে আসি।”
সবাই সম্মতি দিতেই তূর্য চলে গেলো। আর ফিরলো সবার খাবার শেষে। মিনু রহমান খুব যত্নে বেড়ে খাবার পরিবেশন করলেন। আলিফ তখনো খেয়ে চলেছে তূর্যর পাশের চেয়ারে বসে। মিম আর হিয়া শুধু নিরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পাশে। আলিফের খাওয়া শেষ হলেই হিয়া খাওয়ার ঘর থেকে একটু আড়ালে আলিফকে ইশারায় ডেকে নিয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল, “তুই তূর্য ভাইকে একটু ছাদে ডাকতে পারবি? খাওয়া শেষ হলে, একটু গোপনে। বলবি একটু দরকার আছে।”
আলিফ চোখ কচলে, ছোট্ট এক রহস্যময় হাসি ছুঁড়ে রাজি হয়ে গেল। তার চোখেমুখে একরকম শিশুসুলভ কৌতূহল, যেখানে হিয়া আর তূর্যকে নিয়ে হাজারটা উল্টোপাল্টা সন্দেহ উঁকি দেয়, কিন্তু আশ্চর্যভাবে কেউই সেই সন্দেহের জট ছাড়াতে চায় না। হিয়া শুধু মৃদু হেসে উঠল, যেন সে জানে, সব উত্তর একদিন বাতাসের ভেতরেই মিলিয়ে যাবে। আলিফ চলে গেল, ছোট ছোট পায়ে টুপটাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো নিচে।
হিয়া নিঃশব্দে ছাদে উঠে দাঁড়াল, যেন রাতের সঙ্গে সে এক গোপন বোঝাপড়ায় এসেছে। ছাদে তখন শিউলি ফুলের ঘ্রাণ মিশে গেছে হাওয়ায়, বাতাস হালকা শীতল, আকাশ ভরা তারা একেকটা ছোট্ট আশ্বাসের মতো টিমটিম করছে। দূরের শহর আলোয় ঝলমল করছে, কিন্তু ছাদের এই কোণটায় যেন কোনো অন্য জগৎ নিঃশব্দ, কোমল, এবং অসম্ভব সুন্দর। মৃদু বাতাসে হিয়ার চুল উড়ছে ধীরে ধীরে, সে চোখ বন্ধ করে গভীর এক নিঃশ্বাস নিল, যেন বাতাসের গায়ে লেখা কারো অদেখা গল্প পড়ছে।
তূর্য ছাদের দরজায় এসে থমকে গেল। সামনে দাঁড়ানো মেয়েটি যেন রাতের শরীরজুড়ে এক ছায়াগান। হালকা বাতাসে ভেসে ওঠা চুল, রেলিং ধরে থাকা নরম আঙুল, আর চাঁদের আলোয় ধোয়া মুখে এক ধরণের স্থিরতা। তূর্য প্রায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধীর পায়ে এগিয়ে এল, পায়ের ধ্বনি পর্যন্ত বাতাসে নরম হয়ে মিলিয়ে গেল যেন।
হিয়া তখনও পেছন ফিরিয়ে, রেলিংয়ের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। হালকা বাতাসে তার চুলের খেলা দেখে তূর্যের মনে হলো। রাতের সবচেয়ে সুন্দর কবিতার নাম যদি কিছু হয়, সে হয়তো এ মেয়েটির নামেই লেখা।
অবশেষে হিয়া ধীরে ঘুরে তাকাল, ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত।
রাতের আকাশ আর বাতাস তাদের চারপাশে নরম চাদর মেলে রাখল, আর ছাদের নির্জন কোণটায় সেই মুহূর্তটা ঠিক কবিতার মতো ঝুলে রইল।
হিয়া একটু ধীরে, ভীষণ নরম স্বরে বলল, “আমাকে একদিন ঢাকা শহরটা ঘুরিয়ে দেখাবে, তূর্য ভাই?”
তূর্যের চোখে মুহূর্তের জন্য এক ধরনের অবাক ভাব ভেসে উঠল, যেন এমন অনুরোধ শোনার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে এক চুপচাপ হাসি খেলল, মাথা সামান্য নত করে সে সায় দিল, “ঠিক আছে, নিয়ে যাবো।”
হিয়ার চোখে তখন অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা, সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “এই রাতের আকাশটা আমার খুব পছন্দ… কিন্তু জানো, তূর্য ভাই আমার কখনো দেখা হয়নি রাতের শহর।একদিন আমি রাতের ঢাকা শহরটাও দেখতে চাই। এটা বোধহয় সম্ভব না তাই না।”
তূর্য তার দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকল। বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ আরও ভারী হলো, দূরের কুকুরের ডাক যেন আরও দূরে সরে গেল, আর তারা… তারা নিঃশব্দে একে অপরকে ছুঁয়ে রইল।
অবশেষে তূর্য হালকা গলায় বলল, “জানতে চাস না সারাদিন কোথায় ছিলাম?”
হিয়া ঠোঁটের কোণে এক মৃদু হাসি টেনে বলল, “তুমি বললেই শুনবো, তূর্য ভাই।”
তূর্য এক মুহূর্ত চুপ করে রইল, যেন বাতাসের শব্দও শুনতে চাইছে। তারপর নিচু স্বরে বলল, “আমি… প্রকৃতির খোঁজে বেরিয়েছিলাম।”
হিয়া চোখ বড় বড় করে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। তূর্য নিঃশ্বাস ছেড়ে হালকা হাসল, সেই হাসিতে ছিল ক্লান্তি। “তার পরিবার… কে কোথায় আছে এখন, কোনো খবর নেই। ওদের নিউ মার্কেটে যে দোকান ছিল তাও মালিকানা বদলেছে অনেকবার। কোথাও থেকে বর্তমানে কারো উপস্থিত বোঝার উপায় নেই।"
তার কণ্ঠের শেষ শব্দগুলো যেন বাতাসে মিশে গেল। হিয়া চুপচাপ তাকিয়ে রইল তূর্যের দিকে, চোখে এক অজানা কোমলতা। সে কিছু বলল না, শুধু পায়ের পাতা দিয়ে ছাদের ধুলো আঁকতে লাগল, যেন শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি বলছে।
রাতের আকাশ থেকে যেন আরেকটু নেমে এলো তারা, আর শিউলি গাছের মৃদু গন্ধে ভরে উঠল চারপাশ। দুইজনের মাঝের সেই শূন্যতা, হয়তো সেদিন কিছুটা ভরাট হলো, হয়তো শুধু নীরবতা দিয়ে।
কথোপকথন যেন শেষ। শেষের আগেই বোধহয় সমাপ্তি। এক অলিখিত ঘটনার মতো হিয়া ছাদ থেকে নামতে ধীর পা আগালো। যখন হিয়া দু’পা এগিয়ে গেল, হঠাৎ পিছন থেকে ডাক দিল তূর্য, “হিয়া…”
হিয়া চমকে পেছনে তাকাল, চুলের কিছু অংশ মুখের উপর এসে পড়েছে, সে হাত দিয়ে সরিয়ে নিল। তূর্য তখন একটু বেখেয়ালে হেসে বলল, “কাল বিকেলে রেডি থাকিস। তোকে ঘুরতে নিয়ে যাবো।”
হিয়ার চোখে আনন্দের চিলতে রঙ ছড়িয়ে পড়ল, ঠোঁটের কোণে ফুটল এক নরম হাসি, যেন সে ভেতর থেকে উজাড় হয়ে খুশি হয়ে গেছে। কোনো কথা না বলে সে মাথা হেলিয়ে সায় দিল, তারপর হালকা পায়ে ছাদ থেকে নেমে গেল, পায়ের ধ্বনি ধীরে মিলিয়ে গেল নীচের দিকে।
আর ছাদের এক কোণে তূর্য দাঁড়িয়ে রইল, আকাশের তারা গোনার ভান করে, কিন্তু আসলে নিজের ভেতরের অজানা আলো-আঁধারি সামলাতে সামলাতে।
রাতটা ধীরে ধীরে শহরের বুক থেকে পা গুটিয়ে নিল। আকাশের তারারা ক্লান্ত হয়ে একে একে মিলিয়ে গেলো, আর এক মুঠো শিউলির গন্ধ ভেসে আসল হাওয়ার সাথে। ছাদের দেয়ালে বুনো বাতাসের সোঁদা স্পর্শ রয়ে গেল, যেন রাতের সব কথা সেই দেয়াল চুপচাপ শোনে গেছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা এমন, যেন রাতও একটুখানি ঘুমিয়ে নিলো হিয়ার পায়ের শব্দ মিশে যাওয়ার পর।
তারপর ধীরে ধীরে ভোরের আলো চুঁইয়ে নামল আকাশ থেকে। পূব দিকের আকাশ ফিকে লালচে হতে হতে একসময় কমলা ছোঁয়া পেল, পাখিরা ডেকে উঠল একটানা, আর দূরের গলি থেকে ভ্যাপসা শহরের হকারের ডাক ভেসে এল। নতুন দিনের আলো যেন পুরোনো রাতের গল্পগুলোর ওপর সোনা মেখে দিলো, এক নতুন শুরুতে রূপ দিতে।
সকালের নাস্তার টেবিল মানে দিনের শুরুর হাজিরা। সব মানুষ গুলোই একত্রে। সবার উড়ন্ত কথা, হাসি। এর মাঝেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হেসে বললেন, “আজ মাসুম আসছে। এতো দিন ছেলের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল তাই তার খোঁজ নেই। তোমাদের মনে আছে তো মাসুমকে? যার কথা বলেছিলাম।”
হিয়ার চোখে যেন হঠাৎই খুশির ঝিলিক খেলে গেল, মুখে ফুটে উঠল দুষ্টুমে হাসি, যেমন সে নতুন কোনো কাহিনির অপেক্ষায় থাকে। পাশে বসা তূর্যের মুখেও মৃদু আগ্রহের ছাপ, সে যেন সময়ের আড়ালে থাকা সেই মানুষগুলো দেখতে চাইছে, যারা এই কাহিনীর এক একটা চরিত্র।
হিয়া হেসে বললো, "কখন আসবেন তিনি?"
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বললেন, "ফোনে বললো তো বিকালে আসবে।”
হিয়ার মুখে আরও চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে যেন চোখের কোণায় আলো নিয়ে এক লাফে সকালটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলল। তূর্য হিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে ম্লান হাসল। কিছু না বলেই যেন ওর উচ্ছ্বাসে ভাগ বসালো।
রান্নাঘর থেকে শিউলির গন্ধে মিশে আসা মিষ্টি পায়েসের গন্ধ ভেসে এলো, বাগানে কাজের মেয়েটি ফুলগাছগুলোয় পানি দিচ্ছে, আর আকাশটা ধীরে ধীরে পুরোপুরি নীল হয়ে উঠছে। বাড়ির ভেতরেও যেন একরাশ নরম ব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়ল।
দিবা দুপুরের সোনাঝরা আলো আস্তে আস্তে গলে পড়ল বিকেলের কোমল ছায়ায়। বাড়ির বারান্দায় একটা বুনো হাওয়া এসে পর্দাগুলো দোলাতে লাগল, যেন বাতাসও আজ কিছু উত্তেজনার খবর আনছে।
বিকেলের প্রথম প্রহরেই আগমন মাসুমের। এক লম্বা, কৃশকায় মানুষ, বাম পায়ে টান, হাতে ভরসা এক ক্রেসের ওপর, কিন্তু মুখভর্তি অদম্য হাসি। সত্তরের ঘরের বয়স হলেও তাঁর চোখে একরাশ শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। এনাকে যেন সবাই চেনে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বর্ণনায়।
মাসুম এসে সোজা আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরে ঢুকে পড়লেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ভিতরে যেন ফিসফাস গোপন কথোপকথনের সুর ভেসে আসছিল। বাড়ির ভেতরকার পরিবেশটাও হঠাৎ নরম নিস্তব্ধতায় ভরে উঠল, যেন সবাই কান পেতে আছে।
শেষমেশ, ঘন্টা খানেক পর বাড়ির সকল আন্ডাবাচ্চাদের তলব হলো আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরে। হিয়া সবার আগে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এল, পেছনে তূর্য ধীর পায়ে, তারপরে মিম, আলিফ আর পিউ হাসতে হাসতে ছুটে এলো। সবাই আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরে সারি দিয়ে বসল, ছোট-বড় মুখগুলোয় উৎসুক আলো, যেন কেউ কেউ ঠোঁট চেপে হাসি লুকোচ্ছে। এই ব্যক্তিকে না দেখেও যেন এদের বেশ পরিচিত তিনি। তার হাতে দেখা মিললো প্রকৃতির ডায়রিটা। তূর্যর মৃদু হাসলো, মনে মনে বললো, "তাহলে এটাই পর্যবেক্ষণ চলছিল।”
মাসুম একবার চারপাশে সবার দিকে তাকিয়ে নিলেন। তাঁর চোখে তখন যেন অদ্ভুত এক জ্বলে ওঠা আলো, যা কেবল অতীতের রহস্যে ভরা মানুষের চোখেই দেখা যায়।
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “তোমাদের রুশান দাদা আর আমি… জানো, কতখানি খুঁজেছি ওকে? সেই সময় পেপারে বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত দিয়েছিলাম! ‘প্রকৃতিকে খুঁজছি’ সেই খবরে পাড়ার মানুষ পর্যন্ত বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু…”
মাসুম একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “এই ডায়রিটা, কোথায় যে লুকিয়ে ছিল এত বছর…!”
সবাই নীরব। হিয়ার বড় বড় চোখে বিস্ময়, তূর্যের চোখে একরাশ প্রশ্ন। মিম, আলিফ, পিউ পর্যন্ত নিঃশব্দ, যেন গল্পের পরবর্তী বাক্য ধরার জন্য কান পেতে রেখেছে।
মাসুম হালকা কাঁপা হাতে ডায়রিটা উল্টিয়ে দেখালেন, “কিন্তু সবচেয়ে বড় রহস্য, শেষ পৃষ্ঠাটা! সেখানে কী লেখা ছিল? প্রকৃতি কি নিজেই ছিঁড়ে ফেলেছিল, নাকি… সত্যিই ওর ঠিকানা লিখে রেখেছিল, আর সেই পৃষ্ঠা এখানে কারো চোখে পড়ে তাই ওকে নিরুদ্দেশ করতে ছিড়ে ফেলা হয়েছে?”
রুশান চুপ করে বসে ছিলেন এতক্ষণ, এবার চোখ নামিয়ে ফেললেন। সেই নীরবতা ঘরজোড়ায় ছড়িয়ে গেল বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো। কারো মুখে কোনো কথা নেই, শুধু এক অদৃশ্য ধোঁয়াশা যেন বসার ঘরটিকে ঢেকে ফেলল। আর সেই ধোঁয়াশার মধ্যেই প্রকৃতির হারিয়ে যাওয়া গল্পের শেষ অধ্যায় অপেক্ষা করে রইল।
মাসুম যেন এক গল্পের ঝুলি নিয়ে বসেছেন। তাঁর কণ্ঠে সময়ের ভার, কিন্তু চোখেমুখে ছেলেবেলার উচ্ছ্বাস। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা বসে কথা বললেন, এমনভাবে যে সময় যেন ধীরে ধীরে পা ফেলে চলছিল চারপাশে। সবাই মুগ্ধ শ্রোতা, হিয়া বড় বড় চোখ মেলে শুনছে, তূর্য শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ মনোযোগে ধরে রাখছে প্রতিটি শব্দ, আর মিম, আলিফ, পিউ কখনো হাসছে, কখনো চমকে উঠছে, যেন এক অনাবিল বিস্ময়ের ভেতর ডুবে যাচ্ছে সবাই।
মাসুম বললেন, “কেউ কোনোদিন জানতোই না প্রকৃতি ডায়রি লিখতো। আমাদের কাছে তো ওর ডায়রি মানে গানের খাতা। কিন্তু এই ডায়রি… এইটুকু জিনিস, আমাদের অজানার ভেতর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হয়ে রইল!”
তিনি থামলেন। আবার হেসে বললেন, “ আমি আর রুশানই তো বৈশাখি মেলা থেকে খুঁজে খুঁজে একটা ডায়রি নিয়েছিলাম প্রকৃতির জন্য। সেই দিনটা… যেন কালকের মতো মনে আছে! প্রকৃতির চোখে তখন যা আনন্দ দেখেছিলাম, ওটা কোনো শব্দে ধরতে পারব না। তোমাদের দাদু কি যে প্রেমিক পুরুষ ছিল তখন! আমাকে বলে, প্রকৃতির এই খুশি দেখার জন্য সে নাকি ডায়েরির পুরো ফ্যাক্টরি বানিয়ে দেবে।"
শ্রোতামহল চুপ। মাসুমের চোখে এক চকচকে আভা, যেন সেই দিন গুলো সব তার চোখের সামনে দৃশ্যমান। তিনি আবার শুরু করলেন, "যখন ওদের প্রেমটা জানা জানি হয়, আমরা তখন কত রাত, কত দিন ওর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছি… রুশান তো প্রকৃতির জানালার আলো দেখেই সন্তুষ্ট থাকত।”
বাড়ির ঘরজোড়া এক নরম স্মৃতির আলতো স্রোতে ভেসে গেল। বাতাসে মিশে গেল সেসব দিনের গল্পের গন্ধ। হিয়ার মনে হলো, সে যেন ওই সময়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, দেখছে ছেলেমানুষি ভালোবাসা, নির্জন গলির গান, জানালার ধারে বসে থাকা এক মেয়ে, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা অনন্ত অপেক্ষা করা মানুষ।
মাসুম একবার থামলেন, দূরে কোথায় যেন ঘড়ির কাঁটা টিক টিক শব্দ করে উঠল। তারপর হালকা গলায় বললেন, “জানো, আজ এত বছর পরও যখন ওই গলিটা দিয়ে হেঁটে যাই, মনে হয় যেন প্রকৃতি এখনও জানালায় বসে আছে। বয়স হয়ে গেছে তাও স্মৃতিরা বুড়ো হলো না।"
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল, সবাই যেন শ্বাস আটকে রাখল এক মুহূর্ত। সেই নিঃশব্দতার মধ্যেই যেন প্রকৃতির মৃদু হাসি ভেসে এল, সে যে শব্দে চঞ্চল। শুধু সময়ের ওপারে গিয়ে বসে আছে।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ডায়রিটাকে বুকের জড়িয়ে ধরলেন। যেন এটাই তার একমাত্র সঙ্গী। একমাত্র বেঁচে থাকার ইচ্ছে শক্তি।
আরও অনেকক্ষণ গল্পের স্রোতে ভেসে গেল সেই সন্ধ্যা। মাসুমের কণ্ঠে পুরোনো দিনের স্মৃতি, হারানো মানুষের গল্প, আর অজানা আবেগে সবার মন জড়িয়ে রইল। হিয়ার চোখে তখনও ঝিলমিল বিস্ময়, তূর্য কোনো এক নীরব চিন্তায় ডুবে, আর ছোটরা মুগ্ধ হয়ে বসে রইল শেষ পর্যন্ত, যেন একটুও না হারায় কোনো কথা।
শেষমেশ মাসুম বিদায় নিলেন। দরজার দিকে যেতে যেতে পেছন ফিরে একবার হাসলেন, যেন বলে গেলেন, “আবার আসব, গল্প ফুরায়নি।”
দরজার ওপারে মিলিয়ে যাওয়ার পর, ঘরগুলো একে একে নিঃশব্দে ডুবে গেল। হিয়া, তূর্য, মিম, আলিফ, পিউ সবাই যে যার ঘরের দিকে হাঁটল, ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল বাড়ির করিডোরে।
বাড়িতে আবার সেই চিরচেনা নীরবতা নামল, যেন গল্পগুলো বাতাসে ভেসে থেকে রাতকে ছুঁয়ে গেল। আকাশে ধীরে ধীরে রাত গড়িয়ে পড়ল, তারাদের আলোর ফোঁটা ফুটে উঠল একে একে। নিস্তব্ধ বাড়ির ভেতর দিয়ে হাওয়া বয়ে গেল, আর সেই হাওয়ার সঙ্গে মিশে রইল দিনের শেষ হাসি, শেষ কণ্ঠস্বর, আর এক চিলতে অপেক্ষা পরদিনের নতুন গল্পের জন্য।
___________
চলবে.......❤️