নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩১
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩১ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩১
আকাশে এখনো মেঘের দাগ কাটাকুটি খেলছে। কুয়াশার চাদর সরিয়ে হালকা রোদ নামতে শুরু করেছে, তবে হিয়ার কপালে তখনো ঘাম জমছে। মনের রাগ আর কৌতূহলের টানাপোড়েনে তার পা যেন নিজে থেকেই দ্রুত ছুটছে তূর্যর বর্ণনা করা চায়ের টং ঘরের দিকে। বুকের ভেতর একটা অস্থির স্পন্দন। যতই সে পা ফেলে, মনে হয় সময় ধীর হয়ে আসছে, আর একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরে ফিরে আসছে মাথায়, তূর্য ভাই এখানে কেন? এই লোকটা কি বরাবরই এমন অদ্ভুত, হুটহাট মন মর্জি মতো উড়ে বেড়ায়!
হিয়া এগোয়। টং দোকানের পাশে রাখা বেঞ্চিতে বসা মুখটা হিয়ার এক জনম চেনা মুখ। তার হাতে ধরা সিগারেটের ধোঁয়া হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে অহেতুক। পাশে রাখা এক কাপ চা, সামনের চেয়ারে আরেকটা খালি কাপ। তূর্যর চোখে সেই চিরচেনা উদাস ভঙ্গিমা, কিন্তু আজ তাতে হালকা এক ক্লান্তির ছায়া মিশে আছে, ঠিক যেন কোনও দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে জিরোচ্ছে।
হিয়া থমকে দাঁড়ায়। এক মুহূর্ত, দু’জনের চোখে চোখ পড়ে। কোনো কথা হয় না, তবুও যেন পুরো একটা উপন্যাস পড়ে ফেলা যায় সেই চোখের দৃষ্টিতে। তূর্য হালকা হাসে, গলার স্বর খুবই সোজা, কোন রকম ভনিতা ছাড়াই জিজ্ঞেস করে, "চা খাবি?”
হিয়া ধীরে পা ফেলে সামনের চেয়ারে বসে পড়ে। তবে তার চায়ের সম্মতি দেয়ার আগেই আরো এককাপ গরম চা চলে আসে, তূর্য নিজ হাতে চুপচাপ হিয়ার দিকে চায়ের কাপটা এগিয়ে দেয়। হিয়া কাপটা হাতে নিয়ে বলে, "আপনি কি সত্যিই শুধু চা খেতে আপনার শহর ছেড়ে আমার ক্যাম্পাসে এসেছেন?"
তূর্য মৃদু হাসে কিন্তু জবাব দেয় না। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে শুধু বলে, “মনে হচ্ছে তুহুরাকে চিঠি দেয়া সেই শঙ্খের খোঁজ পাওয়া গেছে। তিনি ঢাকায় আছেন এখন। আশা করছি এনিই তিনি।"
হিয়া চা খেতে গিয়ে যেন বেশম বাঁধলো, বড় বড় চোখে তাকিয়ে বললো, "শঙ্খ, কলকাতা থেকে বাংলাদেশে এসেছেন? আপনি তার খোঁজ পেলেন কি করে? তার ঐ চিঠির ঠিকানা থেকে?"
তূর্য একটু সময় নেয়, এরপর বলে, "চিঠির ঠিকানাটা তেমন কাজে লাগেনি। তবে বলতে পারছি না এই শঙ্খই তুহুরার শঙ্খ কিনা। কিন্তু এটা সিওর যে এই শঙ্খ প্রকৃতির বাড়ির লোক।"
হিয়া যেন এবার আরো বেশি চমকালো, তার চোখ মুখে এই চমকপ্রদ ব্যপারটা অদ্ভুত ভাবে প্রকাশ্য। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এসব ঘটছে। এরপর নিজেকে একটু ধাতস্থ করে প্রশ্ন করে, "আপনি প্রকৃতির পরিবারের লোককে কোথায় পেলেন?"
তূর্য হাতের সিগারেটা পায়ে পিসে বলে, "পেয়েছি। তবে এসব বাদদে। কাল শঙ্খনীল সাহেবের সাথে দেখা করতে যেতে হবে।"
হিয়া একনাগাড়ে সিগারেটের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, " আমিও কিন্তু যাবো। নিষেধ করা নিষিদ্ধ বলে দিচ্ছি।" হিয়া থামতে যায়, তাও থামেনা আবার জিজ্ঞেস করে, "বড় দাদাভাই জানেন এসব?"
তূর্য খুব স্বাভাবিক ভাবে বলে, "কিছু জানেন, কিছু জানেন না। তবে জানার ভাগই বেশি।"
হিয়া এবার চুপ করে যায়। অনেক গুলো দিন হেঁটে যেন আজকের দিনে এসে দাঁড়িয়েছে তারা।
হিয়ার চোখ তূর্যর মুখে স্থির থাকে। মুখটা ফ্যাকাসে, চোখের নিচে কালি। ক্লান্তি যেন গায়ে ছায়ার মতো বসে আছে। হঠাৎ করেই হিয়া খুব আস্তে বলে ওঠে, “আপনাকে খুব ক্লান্ত লাগছে। চলুন বাসায় যাই।”
তূর্য হালকা মাথা ঝাঁকায়, বোঝাতে চায় সে ঠিক আছে। এরপর ধীরে জিজ্ঞেস করে, "তোর আর ক্লাস নেই?"
হিয়া কাপটা টং দোকানের টেবিলে রেখে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার শব্দে বলে, “না, আর করবো না। আজকের মতো সব ক্লাস শেষ। আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিই, এটাই যথেষ্ট।”
তূর্য হেসে ফেলে। খুব আস্তে বলে, “এটা কি দায়িত্ববোধ দেখাচ্ছিস?”
হিয়া একটু মুখ ফিরিয়ে বলে, “সে আপনি যা ইচ্ছে ভাবতে পারেন।”
তূর্য মুখে কিছু না বললেও চোখের কোণে যেন হালকা কিছু নড়ে ওঠে। তারপরে একটু খোঁজ নেয়ার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে, “মিম কোথায়?”
হিয়া বলে, “ওর ক্লাস আছে। শেষ করে চলে আসবে। আপনি চলুন।”
তূর্য এবার উঠে দাঁড়ায়। তার সাদা শার্টটা ভাঁজ পড়া, গায়ে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চিরচেনা শক্ত আভাসটা একদম সতেজ। কয়েক কদম চলতেই সে হঠাৎ থেমে যায়। তার চোখ যায় ক্যাম্পাসের গেটের পাশে বসে থাকা এক মধ্যবয়সী মহিলার ওপর। নারীটি ধবধবে সাদা এক ঝাঁক দোলনচাঁপার গুচ্ছ সাজিয়ে বসে আছে।
তূর্য হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই দাঁড়া, আমি দুই মিনিট আসছি।”
হিয়া অবাক হয়ে তাকায়। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তূর্য ধীরে পা বাড়ায় উল্টো দিকে। হিয়া এক ঝাঁক প্রশ্ন নিয়ে শুধু তাকিয়েই থাকে তূর্যর দিকে। তার চুল দমকা বাতাসে উড়ছে, ক্লান্ত চোখ গুলো একটু বেশিই ব্যস্ত দেখায়, সে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যায় ফুলের ছোট্ট দোকানটায়। বেছে বেছে তুলে নেয় তোড়া বাধা দোলনচাপা। সাথে সাথেই টাকা মিটিয়ে আবার সেই একই পথে ফিরে আসে তূর্য। হিয়া বিষ্ময়ে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। তূর্য ফুল হাতে তার সামনে এসে দাঁড়ালেও হিয়ার মুখে কোন শব্দ নেই। সে যেন গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে।
তূর্য হিয়ার এই মুখভঙ্গি দেখে মৃদু হাসে। এরপর কোনো বাড়তি শব্দ ব্যবহার না করে, হিয়ার হাতে দোলনচাঁপার তোড়াটা তুলে দিয়ে ধীর স্বরে বলে, “দেখ, ধীরে ধীরে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর ফুলগুলো বাজারজাত হয়ে যাচ্ছে। অনুভুতির মতো আধুনিকতার ছোঁয়ায় কিছুদিন পর এদেরও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
হিয়ার মুখে কোন শব্দ নেই। না প্রশ্ন, না উত্তর। সে শুধু তাকিয়ে থাকে তূর্যর মুখের দিকে, বার কয়েক তাকায় নিজের হাতে ধরা দোলনচাঁপাগুলোর দিকে। ফুলগুলো যেন কোনো চিরকালীন নরম বার্তা নিয়ে এসেছে, এক রকম উর্দ্ধশ্বাস, ভয় আর অচেনা অনুভূতি জাগিয়ে তুলছে। হিয়া শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু। অনুভূতিরা যেন তাকে বরফের মতো জমিয়ে দিয়েছে। ক্যম্পাসের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুখগুলো তাদের দেখে নিজের মন মতো গল্প ভেবে ছাড়িয়ে চলেছে নিজেদের গতিতে। তবে এতে হিয়া আর তূর্যর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
হিয়ার এমন নির্বাক হতভম্ব মুখটা দেখে তূর্য খানিকটা মুখ টিপে হাসে। কথা না বাড়িয়েই একটু এগিয়ে রিক্সা ঠিক করে, তারা রওনা হয় বাড়ির উদ্দেশ্যে।
রিক্সার চাকা ঘুরছে ঢাকার এলোমেলো ব্যস্ত পথ বেয়ে। দুপাশের দালানগুলো একটু একটু করে পেছনে পড়ে যাচ্ছে, মাথার ওপরের আকাশটা এখনো মেঘলা বেশ। হিয়া আর তূর্য পাশাপাশি। কেউ মুখে কিছু বলছে না, কিন্তু বাতাস যেন কান পাতলে শুনতে পায়, দুজনার নিঃশব্দ কথোপকথন।
তূর্য একটু গলা ঝেড়ে বলে, “হিয়া, সম্পর্কের টানাপোড়নে কখনো আমরা ছিলাম না। আমাদের সম্পর্কের নাম কি তাও জানি না। তবে এটা জানি তুই আমার জীবনে বহুল অর্থ বহনকারী খুব কাছের কেউ। অপ্রকাশিত কাব্য তোর বেলায় মানায়। কিন্তু… প্রকাশিত সমগ্র হয়তো আমাদের যোগাযোগ কেড়ে নেয়। তুই এই শুভ্র ফুলের মতো শুদ্ধ…তাই এই দোলনচাঁপা তোর।”
একটা ঠান্ডা নিরবতা হিয়ার শরীরকে আবার হিম করে তোলে। হিয়া তূর্যর চোখে তাকিয়ে ধীরে বলে ওঠে, “আপনাকে একটা প্রশ্ন করি তূর্য ভাই?”
তূর্য রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে হিয়ার দিকে তাকায়, এক গলা প্রশ্রয় মেশানো স্বরে বলে, “কর।”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলে, “আপনি এসব শক্ত শব্দ কোথা থেকে জোগাড় করেন? এত ভারী সব শব্দ, ভাবনার নিচে পাথর চাপার মতো লাগে। শব্দের এত ভনিতা কেন?”
তূর্য এক মুহূর্ত হিয়ার দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ করে একরাশ হাসি ছড়িয়ে দেয় আকাশে। তার হাসিটা অকস্মাৎ উচ্ছ্বাসে ভরা, রিকশার সামনের গলি পর্যন্ত যেন কাঁপিয়ে তোলে। সে হাসতে হাসতেই বলে, “আমার সহজ শব্দচয়ন এতো কঠিন হয়ে উঠেছে তোর কাছে? তবে তো বলতে হয় তোর সাহিত্যের জ্ঞান সব বৃথা!”
হিয়া বাঁকা চোখে তাকায়, ঠোঁটে হালকা রাগ মেশানো স্বরে বলে, “আপনি বড্ডো অদ্ভুত চরিত্র তূর্য ভাই। ঠিক সমাধান করে ওঠা যায় না।”
তূর্য হালকা হেসে গলাটা একটুখানি নরম করে জিজ্ঞেস করে, "তোর আমাকে এতো সমাধান করতে হবে কেন হিয়া?"
হিয়া এবার আর জবাব দিতে পারে না। তূর্য যেন ইচ্ছে করেই হিয়ার প্রশ্নে লাগাম টানলো।
রিক্সা মোড় ঘোরায়। পথ যায় আরো কিছু। তূর্য এবার দৃঢ় স্বরে বলে, "আমাদের জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই ঘটে। আমরা চাইলেও সেগুলো ফেরাতে পারি না। কিছু সময় হয়তো ফেরাতে চাইও না। আর এই না ফেরাতে চাওয়ার অনুভূতি শব্দে লুকিয়ে প্রকাশ করতে চাওয়ার কামনা থেকেই শক্ত শব্দের প্রয়োগ। যতোটা যা লুকানো যায়।"
হিয়া এবার মৃদু হেসে বলে, “তবে তো আপনার অনুভূতি জানতে, আপনার শক্ত শব্দের গভীর তদন্ত করতে হবে।”
তূর্য উত্তর দেয় না। শুধু হাসে। কিছু কিছু উত্তর না দেওয়াই হয়তো সব থেকে বড় উওর। রিক্সার চাকা পথের সমাপ্তি টেনে দেয় পুরোনো গলির কিনারে। গন্তব্য এসে গেছে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের পুরোনো প্রাসাদসম বাড়ি। পেঁচানো লোহার গেট, উঁচু দেয়ালের গায়ে বেগুনি লতা ঝুলছে। বাগান বিলাসের অভিজাতের মাঝে বেগুনি লতাটা যেন পরগাছা।
হিয়া গেট খুলে আগে ঢোকে, পেছনে তূর্য। তূর্যের বিনা নোটিশে আগমনের ব্যাপারটা আর কেউ না জানলেও আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আগে থেকেই জানতেন। হিয়া আর এ বিষয়ে আশ্চর্য হলো না। সে বাড়িতে ঢুকেই সকলের চোখ লুকিয়ে ফুলগুলো গোপন করে নিজের ঘরে ছুটলো। ঘরে ঢুকে সে দোলনচাপার তোড়াটা বিছানার এক কোণে রাখে, তারপর কিছুক্ষণের জন্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। চুলের ক্লিপটা খুলে ফেলে, ধীরে ধীরে চুল নামিয়ে দেয় কাঁধে। তারপর আয়নার সামনে বসে, নিজের চোখের গভীরতা দেখে। কেমন অচেনা লাগে নিজেকেই। যেন এই চোখের পেছনে আজ কোনও অজানা গল্প জেগে উঠেছে, যার লেখক সে নিজে নয়।
সময় পেরোতে মিম বাড়ি ফেরে। সে বেশ চমকায় তূর্যকে দেখে। কিন্তু তার থেকে বেশি চমকায় হিয়ার এমন থমকে থাকা দেখে। তবে শুভ্র দোলনচাঁপার উপস্থিতি মিমকে যেন চেঁচিয়ে বলে সমগ্র ইতিহাস। কোন বর্তমান বর্ননার প্রয়োজন পড়লো না আর মিমের কাছে। সব অক্ষরে অক্ষরে বুঝে নিঃশব্দ রইলো সে।
মিম ছোট থেকেই পরিচিত তূর্যর ব্যবহারের সাথে, কিন্তু তূর্যের এ রুপ খুব অপরিচিত। মিম জানে, তূর্যের এই রুপের কারন হিয়া, আর এতে কোনো বিতর্ক নেই। তবে এ কোন মায়া..? যা তারাই লুকিয়ে ফিরছে নিজেদের থেকে।
মিম সব বুঝেও যেন সময়ের উপর ছেড়ে দেয়। সে চায় না এই শুভ্র অনুভুতিতে নিজের অযাচিত হস্তক্ষেপ। সে শুধু পূর্নতার দাবিদার হয়ে থেমে থাকে।
সময়ের নিখুঁত হিসেবের মতো এই প্রহরও কাটলো বিনা বাধায়। তবে হিয়ার অবাধ্য মনে যে আগুনের শিখা তূর্য ছড়ালো তার আভাস মিম ছাড়া আর কেউ পেলো না।
বিকেলের শেষ আর সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত্বে আকাশ তার যে মহোনীয় সিঁদুরে মেঘের গল্প শোনায় সেটাকে ভয়ংকর সুন্দর উপাধি দেয়াই যায়। এ বাড়ির দোতলার উওরের ঘরটায় সন্ধ্যে নামে বেশ নাটকীয় রুপ দেখিয়ে। পশ্চিমের খোলা জনালা দিয়ে পরিষ্কার সূর্যাস্ত পরিলক্ষিত হয়।
তবে আজ কোন এক অষ্টাদশীর চাঞ্চল্য এ ঘরে ছড়িয়েছে। নুপুরের রুমঝুম আন্দোলনের সাথে কোন এক মায়াবী হাসি উড়ে বেড়াচ্ছে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ধীরে ধীরে তার চোখ খুললেন। তৃষ্ণার্ত বাধ্যর্ক ছোঁয়া ঝাপসা চোখে শেষ বিকেলের আলো আবছায়ায় নারী অবয়ক স্পষ্ট হল। তিনি সাইড টেবিলের উপর থেকে চশমাটা নিয়ে পরিষ্কার দেখতে চেষ্টা করলেন।
তার চির প্রত্যাশিত সেই নারী মূর্তি। এই আধো আলোতে ধূসর শাড়িতেও তার কাজলে মোড়ানো দুটো চোখ মায়ার নেশাক্ততা ছড়াচ্ছে। তার হাতে রঙ চটা বেশ পুরনো এক বই, কাচের চুড়ির রঙ তেমন পরিষ্কার নয়। অষ্টাদশী একটা পাতা উল্টে তার ঠোঁটে উচ্চারিত করলো,
“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিদর্ভ নগরে এলাম অবশেষে
সেখানে ছিল সে, নাটোরের বনলতা সেন।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসলেন, তার জড়ানো কন্ঠস্বরে আউড়ালেন,
“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য;
তাকে দেখলে মনে হয় যেন
বিপুল শ্রান্তির পরে নেমে এসেছে চাঁদ।”
অষ্টাদশী তার ভুবন মোহিত হাসিতে ঘরটাকে আরো মোহমিত করে তুললো, সে তার মোটা বিনুনি বাম কাঁধ থেকে সরিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো, “তুমি যদি কোন কবি বা উপন্যাসিক হতে, তবে কি তুমিও আমায় নিয়ে লিখতে?”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মলিন হাসলেন, “পৃথিবীর এমন কোন শব্দ আমার জানা নেই যা তোমাকে বর্ননা করার স্পর্ধা দেখাতে পারে, প্রকৃতি।”
এ যেন তার জানা উওর। প্রকৃতি তার ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে শুধু হাসলো। “তোমার যতো সব বাহানা”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হাসেন। এক উবে যাওয়া কপূরের মতো ধিরে ধিরে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখের সামনেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল চাঞ্চল্যের নারী মূর্তিটি।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার অস্পষ্ট কন্ঠে একবার আউড়ে নেন, “ না পাওয়াও একধরনের পাওয়া প্রকৃতি, এই যে আমি তোমাকে পেলাম না, অথচ সারাজীবন পেতে চাইলাম..” আব্দুর রুশান মোহাম্মদ থামেন। বিছানা থেকে উঠে জানালা বরাবর এগিয়ে চলেন দুয়েক কদম। এরপর থমকে বলেন, “প্রেয়সীকে না পাওয়ার আর্তনাদ দুর্ভিক্ষের থেকেও ভয়াবহ।”
এসব নতুন নয়। প্রায় রোজকার কিংবা খুব মাঝে মাঝেই এই অষ্টাদশী আব্দুর রুশান মোহাম্মদের অতীতের দেয়াল ভেঙে বাস্তবতায় হানা দেয় কল্পনা রূপে। আর এই মানুষটা এইটুকুর জন্যেও যেন শত শত অপেক্ষায় থাকেন দিনের পর দিন।
__________
চলবে...... 🥀