নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩৬
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩৬ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩৬
স্বাত্ত্বকি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেন, তারপর বলেন, "কিছু কিছু ঘটনায় মাঝে মাঝে আচমকা কিছু চরিত্র প্রবেশ করে না? যাদের অস্তিত্ব কোথাও থাকে না, কিন্তু তারা নিজের স্ব-ইচ্ছায় ঘটনার একটা চরিত্র হয়ে ওঠে। তুহুরা আপার এ ঘটনায় প্রবেশটাও ঠিক তেমনি।
আমি ডায়রিটা মিনুর কাছে দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। তখন বোধহয় দুপুর এগারোটা কি বারোটা! রাস্তাঘাটে, শহরে, দেশে পুরোপুরি যুদ্ধের একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি। কেউ ঘর থেকে বের হয় না। এখানে আক্রমণ ওখানে আক্রমণ আর ঢাকার অবস্থা তো মৃত শহর। জ্যাঠামশাই খুব ভেঙে পড়েছিলেন। তিন তিনটে মৃত্যু মেনে নেয়া কি এতোই সহজ!
পিসেমশাইয়ের কিছু কোয়ালিগ এসেছিলেন। তাদের জন্য শেষকৃত্য সহজ হয়েছিল। এই সময়ে আরেকজন এসেছিলেন। কালো বোরকায় মুড়ে, তুহুরা আপা। আমি ঐদিনই উনাকে প্রথম দেখেছিলাম। কি মায়া ভরা মুখটা! অন্যের মেয়ের মৃত্যুতে কেউ এতো কাঁদতে পারে, সেটা ওদিন প্রথম জেনেছি।… সেদিন আমি মিনুর কাছে যে চিঠি আর বড়দি’ভাইয়ের ডায়েরিটা দিয়ে এসেছিলাম, সেটাই তুহুরা আপা পড়েছিলেন। হয়তো শেষ ডায়রির পৃষ্ঠাগুলোতে কিংবা সেই চিঠিতে বড়দি’ভাই পরিষ্কারভাবে তার আত্মহনের ব্যাপারে বিস্তারিত বলেছিলেন। সেটা পড়েই তুহুরা আপা এসেছিলেন। অনেক সামলেছেন তিনি এসেই। একজন অপরিচিত মানুষ কয়েক মুহূর্তে কি করে এতোটা আপন হয়ে উঠতে পারে, তার এক জলজ্যান্ত প্রমান তুহুরা আপা ছিলেন।"
স্বাত্ত্বকি থামেন। সময়টাকে একটু পরিষ্কার মনে করে নেন হয়তো। ঘরের বাতাস যেন জমে যায় এক অদ্ভুত শীতলতায়। এরপর তিনি বলেন, "পিসি আর পিসেমশাই কে শ্মশানে পাঠানো হলেও বড়দি’ভাইয়ের শেষ ইচ্ছে রাখতে আমাদের পুরোনো বাড়ির উঠোনে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। সেখানে বড়দি'ভাইয়ের ইচ্ছে রাখতেই কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগানো হয়, সেটা অবশ্য অনেক পরে…।"
আবার বিরতি টেনে বলতে শুরু করেন, "বড়দি’ভাইকে সমাধিস্থ করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জ্যাঠা মশাই প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। হার্ট অ্যাটাক, তাৎক্ষণিক মৃত্যু। কোন এক বদনজর বোধহয় বাড়িটাকে শ্মশান ঘাট বানিয়ে দিল। আমি একা ছোট মানুষ। কি করে কি সামলাই! জ্যাঠা মশাইয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে করতে বিকেল গড়ায়। আমি তখন ভঙ্গুর, নিঃস্ব। কলকাতায় বাড়ির মানুষকে খবর দেয়ার মতোও অর্থ নেই আমার কাছে। আর না দেশের এমন পরিস্থিতি যে অর্থ যোগার করবো।
ঠিক তখনই… জানি না তুহুরা আপা কি বুঝলেন! ঐ একদিনের সামান্য পরিচয়ে নিজের কানের সোনার ঝুমকো আমার হাতে দিয়ে বললেন, 'এটা রেখে দাও। তোমার প্রয়োজন হবে।' আমি নিতে চাইনি, জোর করে দিয়েছেন। যাবার আগে বলেছিলেন, 'কলকাতায় চলে যাও। গিয়েই আমাকে চিঠি দিও। তোমার তুহুরা আপা আছেন।'
আমি শুধু নির্বাক উনার চোখে তাকিয়ে ছিলাম। একটা মানুষ এমন হয়!
তিনি চলে যাবেন ওই মুহুর্তে রবিভাই কিভাবে যেন এসে পড়েন। হয়তো অনেক সময় খুঁজছিলেন, হুট করেই পেয়ে যান। সেই সকাল থেকেই তো তুহুরা আপা আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। কাউকে না জানিয়ে। আর দেশের যে পরিস্থিতি তাতে যে কেউ চিন্তা করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। রবি ভাই খুব রাগারাগি করে নিয়ে যান তুহুরা আপাকে।”
তূর্য আর হিয়া কিছু বলতে পারে না। স্বাত্ত্বকির দিকে শুধু তাকিয়ে থাকে আরো কিছু জানার আগ্রহ নিয়ে। স্বাত্ত্বকির গলা এবার আর শব্দ নয়, যেন নিঃশ্বাসে গড়ে তোলা এক দীর্ঘ আত্মকথার ঢেউ। তাঁর কণ্ঠে তখন অতীতের জমানো পাথরের মতো ভার, চোখে কুয়াশার মতো আবছা বিস্মৃতি আর তার মধ্যেই জ্বলজ্বলে কিছু স্মৃতি, যেগুলো নিভেও নেভে না। তিনি ধীরে বলেন, “তারপর, আমি আর কোনোদিন তুহুরা আপাকে দেখতে পাইনি। এই জীবনেও না…
তাঁর দেয়া সেই একজোড়া ঝুমকা…তা বিক্রি করেই আমি কলকাতায় যাবার ট্রেনের ভাড়া জোগাড় করি। একেবারে কলকাতা পৌঁছাই, জ্যাঠামশাইয়ের এক পুরোনো বন্ধুর সহায়তায়।
তারপর দিন কাটে বইয়ের পাতা আর যুদ্ধশেষের বিষাদে। কিন্তু প্রায় দিন, তুহুরা আপার সাথে চিঠিতে কথা হতো।”
স্বাত্ত্বকি থামেন, চোখ বুজে ফেলেন এক মুহূর্তের জন্য। এরপর আবার বলেন, “বেশ অনেক দিনই চিঠিতে কথোপকথন হয়েছিল আমাদের। সেই চিঠিগুলোর মাধ্যমেই জানতে পারি… তুহুরা আপা রুশান ভাইকে পছন্দ করতেন। তবে একেবারে দমে গিয়েছিলেন। হয়তো তুহুরা আপা নিজেও বড়দি’ভাইয়ের মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেননি। প্রকৃতি আর রুশান যে দুজন দুজনের জন্য পাগল ছিল এখানে তো কারোই কোনো সন্দেহ নেই।
সে যাক… এর কিছু দিন পরেই তুহুরা আপা হুট করে রবি ভাইকে বিয়ে করে নেন। আমার কাছে অস্বাভাবিক লেগেছিল, তাও আমি তুহুরা আপার সিদ্ধান্তে কোন প্রশ্ন তুলিনি। তবে হ্যাঁ, তিনি একবারের জন্যও কখনো বলেননি যে, তিনি বড়দি'ভাইয়ের মৃত্যু সম্পর্কে রুশান ভাইকে কিছুই জানাননি। আর না কোনদিন রুশান ভাইয়ের এসব পাগলামি চিঠিতে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তিনি খুব উদাস শব্দ লিখতেন চিঠিতে, মনে হতো উনার কথা বলার মানুষের খুব অভাব।"
তিনি থামেন। তার চোখে স্পষ্ট এক নিঃশেষ আলোড়নের ধ্বংসাবশেষ। তাঁর কণ্ঠে তখনও বয়ে চলে থেমে যাওয়া নদীর মতো শ্রুতি, যেখানে কেবল অতীতের ঢেউ এসে হঠাৎ থেমে দাঁড়ায় এক দগ্ধ বালুকায়। তিনি মুখ তুলে আরও একবার বলেন, “তুহুরা আপা তেমন সুখে ছিলেন না… আমার বিশ্বাস, তিনি ছিলেন না। রবি ভাই খুব রগচটা ছিলেন, জেদি, নিজের কথা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। তুহুরা আপা আমাকে কখনো বিস্তারিত বলেননি, তবে চিঠিগুলোর শব্দে, ছাঁকে, একটা চাপা যন্ত্রণা টের পেতাম। আমার মনে হতো, উনি অনেক কিছু লিখতে চাইতেন… কিন্তু লিখতেন না। হয়তো তিনি নিজের ভাঙাচোরা জীবন কোনো গল্পে মেশাতে চাইতেন না। তবুও… সেই নীরবতায় আমি অনেক কথা পড়ে ফেলতাম।
এরপর কয়েকটি চিঠি আসে… তারপর হঠাৎ একদিন, সব থেমে যায়। তুহুরা আপা আর কোনো চিঠি লেখেননি। আমার পাঠানো প্রতিটি চিঠি নিরুত্তর। যেন এক নিষ্ঠুর দেওয়ালের গায়ে বারবার ধাক্কা খাচ্ছে হৃদয়। একেবারে আচমকা ইতিনি চিঠির জবাব দেওয়া বন্ধ করে দেন। আর চিঠির নিজের শঙ্খ সম্মোধন এর কারণ, স্বাত্ত্বকি কি নামে রবি ভাই থেকে শুরু করে ওবাড়ির সব মানুষই আমাকে চিনত। আমি চাইতাম না তারা কোনদিনও এটা জানতে পারুক যে, ও বাড়ির কারো সাথে আমার যোগাযোগ আছে। আমার সাথে যোগাযোগটা ওবাড়ির মানুষরা এত ভালোভাবে নেবেন না এটাই তো স্বাভাবিক।”
স্বাত্ত্বকির চোখ দুটো এখন ঝলমলে নয়, কেবল শুষ্ক নদীর পাড়ে জমে থাকে ধূসরতার মতো। তূর্য ও হিয়া যেন কোনো বয়সে নেই, কোনো সময়ে নেই। তারা শুধু সেই গোপন অতীতের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকে।
স্বাত্ত্বকি একটু নিরবতা পালন করে বলেন, “এই তো শেষ, … আর কিছুই বলার বাকি নেই।”
স্বাত্ত্বকির গলা ফেটে আসে, কিন্তু তবুও তাঁর কণ্ঠে এক নিঃশেষ শান্তি। ঘরের বাতাস যেন স্থির, শব্দহীন। হিয়া মাথা নিচু করে বসে থাকে,
তূর্য দৃষ্টিহীনভাবে তাকিয়ে থাকে দূরে কোথাও, যেন কিছু খুঁজে ফেরে এখনো।
হঠাৎ… তূর্যের মনে পড়ে তুহুরার গয়নার বাক্সের কথা। তার চোখ আচমকা বড় হয়ে ওঠে। সে বলে ওঠে ধীরে, " একটা কথা… তুহুরার পুরনো বাক্সে… আমরা একটা পায়েল পেয়েছিলাম…
বড়দাদা বলছিলেন ওটা প্রকৃতির ছিল। তাহলে সেটা কি করে তুহুরার কাছে পৌছালো?"
স্বাত্ত্বকি মুখ তুলেই থেমে যান এরপর বলেন, “সবটা বলা হলেও, কিছু না কিছু একটা না ছুটেই যায়…! মৃত্যুর সময় ঐ পায়েলটা বড়দি’ভাইয়ের পায়ে ছিল। শেষকাজের সময় সবই তো খুলে রাখা হয়েছিল। তখন তুহুরা আপা খুব আবদার করে পায়েল আর বড়দি'ভাইয়ের হাতের কাঁচের এক মুট চুড়ি চেয়েছিলেন। আমি আর মানা করি নি। কোন ভাবনাও মস্তিষ্কে আসেনি। ওগুলোই হয়তো যত্নে রেখেছিলেন তিনি।”
তূর্য ও হিয়া তখন কিছুই আর বলতে পারে না। তাদের চোখে জল নেই, কিন্তু হৃদয়ের ভিতর থমকে থাকে এক অজানা স্পন্দন। এতদিন যা তারা খুঁজছিল উত্তর, ইতিহাস, ভালোবাসা, মৃত্যু সব যেন একত্রে এসে একটিই বাক্যে দাঁড়িয়ে যায়,
“সব শেষ। যা জানার, তা জানা হয়ে গেছে।”
ঘরের কোণে যেন সময় দাঁড়িয়ে থাকে। ঘড়ির কাঁটা আর এগোয় না। একটি মৃত পায়েলের মতো স্মৃতি পড়ে থাকে তাদের মাঝখানে, নিঃশব্দ, নিস্তব্ধ, অমলিন।
ঘরজুড়ে তখন নিঃসাড় এক স্তব্ধতা, যেন কেউ শব্দ করলেই অতীত ভেঙে পড়বে। হিয়ার চোখে স্থির জল, তূর্যের চাহনিতে প্রশান্ত এক বিস্ময়। আর স্বাত্ত্বকি বসে আছেন যেন এক স্মৃতিশ্রান্ত সাধুর মতো, যার গল্প শেষ, কিন্তু যার নীরবতাই আরেকটি ইতিহাসের জন্ম দিতে পারে।
একটু পরে, খুব ধীরে স্বাত্ত্বকি মুখ তোলেন, কণ্ঠে কোমলতা, কিন্তু চোখে তীক্ষ্ণ এক প্রশ্নচিহ্ন, “তুমি আমাকে… খুঁজে পেলে কিভাবে, তূর্য? আমাকে পাওয়া সহজ তো নয়…! আমি তো নিজেকেই ভুলে গেছি বহুদিন।”
তূর্য তখন এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত চমক, যেন বহুদিন গোপনে পুষে রাখা রহস্য এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। সে বললো, “নিউ মার্কেটে আপনার জ্যাঠামশাইয়ের যে শাড়ির দোকানটা ছিল, সেটা থেকেই প্রথম সূত্র মেলে। যিনি সেই দোকান বিক্রি করেছিলেন, তাঁর নাম ছিল প্রদীপ সাহা। পৌত্রিক সম্পত্তি হওয়ায় দোকানের মালিক দু'জন ছিলেন, শিবনাথ সাহা এবং দেবনাথ সাহা। দলিল অনুসারে প্রদীপ সাহা ছিলেন শিবনাথ সাহার ছেলে। কিন্তু দোকানটা যখন বিক্রি হয়, সেই কাগজপত্রে আরো দু'জনের নাম ছিল শঙ্খনীল সাহা এবং সুদীপ সাহা। আর সকলের ঠিকানাই কলকাতা। তবে সৌভাগ্যবশত আপনার স্বাক্ষর ছিল। আর ঠিক তখনই মনে হলো, এই নামটা… যেন একবার কোথাও পড়েছি, শুনেছি। এরপর মাথায় এলো তুহুরাকে দেয়া আপনার চিঠিতে যে নামটা ছিল সেটাও শঙ্খ। দুটো জায়গার হাতের লেখায়ও বেশ মিল লাগে আমার। তাই আমি আপনার লেখা আর দলিলের সই মেলাতে দেই। তথ্য যাচাই করার জন্য একজন প্রফেশনাল অনুসন্ধানকারী নিই।
সেই মানুষটিই নিশ্চিত করেন শঙ্খনীল সাহার সাথে চিঠির শঙ্খের লেখার ৯৮ ভাগ মিল।
এছাড়া দলিলে আপনার নামের উপস্থিতি নিশ্চিত করছিল, আপনি প্রকৃতির পরিবারের কেউ হবেন। কিন্তু তখনও ধারণা করতে পারিনি, আপনিই স্বাত্ত্বকি…।
আর এভাবেই আপনার ঠিকানা খুঁজে বের করা। অবশ্য দুই ভাবে খোঁজ চালিয়েছিলাম। চিঠিতে তুহুরাকে আপনি যে ঠিকানাটা উল্লেখ করেছিলেন সেটা আপনাদের পুরনো বাড়ি ছিল। আমি সেখানেও চিঠি পাঠিয়েছিলাম, প্রথমে তো কোন জবাব আসেনি কিন্তু এরপর সেখান থেকে একজন চিঠির জবাব লেখেন। তিনিই জানান যে এই বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগে। সব কিছু মিলিয়ে বলতে পারেন অনেক খুঁজে খুঁজে আপনার ঠিকানা পাওয়া গেছে।”
স্বাত্ত্বকির চোখ কুঁচকে যায়। তিনি তূর্যের এই গভীর বিচক্ষণতায় বেশ পুলকিত হন। তূর্যের বলার ধরণ, বিশ্লেষণের গভীরতা যেন তাঁকে অভিভূত করে। তাঁর চোখে উঠে আসে স্বীকৃতির উষ্ণ আলো, ঠিক সেই আলোর মতো, যা দীর্ঘ অন্ধকারের পরে দেখা যায়।
এতক্ষণ নিঃশব্দ শ্রোতা হয়ে বসে থাকা হিয়া একটু নড়ে বসে। তাঁর চোখে দেখা যায় কুণ্ঠিত দ্বিধা, কিন্তু কণ্ঠে ধীরে ভেসে আসে এক প্রশ্ন, “আপনি বললেন প্রকৃতির মৃত্যু ’৭১-এর শেষদিকে। কিন্তু… একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঘুরছে।
বড়দাদার বন্ধুদের ভাষ্যমতে তারা ৭৫-এ কলকাতায় প্রকৃতিকে দেখেছেন… তাও বিবাহিত। এটা কিভাবে?”
হিয়ার প্রশ্নে আবার যেন সব রহস্য ঘুরতে থাকে কক্ষের চারপাশে। স্বাত্ত্বকির চোখে একটা গভীর ভাবনা উঁকি দেয়। তাঁর গলায় খুব শান্ত ধীর সুর, তিনি বলেন, “আমি বলতে পারছি না ঠিক। তবে এই ঘটনার দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে।
প্রথমত, রুশান ভাইয়ের বন্ধুরা হয়তো চাইতেন, রুশান ভাই স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসুক। তাই বড়দি'ভাইকে বিবাহিত বলে রুশান ভাইয়ের মন সরাতে চেয়েছেন। বড়দি'ভাইকে প্রতারক প্রমাণ করে এরকম জিদ জাগিয়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা বোধহয়। এসবে অবশ্য রুশান ভাইয়ের জন্য এক ধরণের বৈধ মুক্তি হলেও হতে পারতো। যা দিয়ে তাঁকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যেত।
তবে কেউ হয়তো বুঝতে পারে নি, তার পাগলামির গভীরতা সকলের ভাবনার উর্ধ্বে।”
স্বাত্ত্বকি বলাটা শেষ হলেই আনমনের সামান্য হাসলেন। কিছু একটা ভাবলেন কোথায় এরপর আবার বললেন, “আর দ্বিতীয়টা…
হয়তো তাঁরা যাকে দেখেছেন, সে ছোটদি’ভাই। প্রকৃতি দিদির ছোট বোন প্রাচী। একেবারে বড়দি'এভাইয়ের কার্বন কপি ছিলেন প্রাচি।
চোখের রেখা, ঠোঁটের বাঁক, হাঁটার ধরন– সব যেন বড়দি'ভাইয়ের। অনেকেই, এমনকি পরিচিত আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত প্রাচিকে দেখে হতবাক হয়ে যেতেন।
আর বড়দি’ভাই যখন মারা গেলেন, দেশের অবস্থা এমন ছিল যে, সবকিছু সবাইকে জানানো যায়নি। তাছাড়া নতুন দেশে, নতুন ঠিকানায় অনেকের কাছে নতুন পরিচয় তৈরি হয়েছিল। এমনও হয়েছে, কেউ কেউ এসে প্রাচীকে দেখে প্রকৃতি ভেবে ফিরে গেছেন… আর আমরাও তাদের কাছে প্রকাশ করতে চাইনি বড়দি’ভাইয়ের মৃত্যুর ব্যাপারটা। আসলে এতো গুলো মৃত্যু যে, বলার মতো মানসিক শক্তি কারও ছিল না।”
স্বাত্ত্বকির গলায় তখন নিঃসৃত হয় এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। তূর্য কিছু একটা ভাবতে ভাবতে নিচু গলায় বলে, “তাহলে ৭৫-এর নারীমূর্তি প্রাচি হতে পারেন?”
স্বাত্ত্বকি একটুখানি হাসেন। সে হাসি দুঃখে নরম, স্মৃতিতে পাথর। “হ্যাঁ… হতে পারেন, খুব ভালোভাবেই। আর ছোটদি'ভাইয়ের বিয়ে ৭২- এর দিকেই হয়ে গিয়েছিল।”
কথাগুলোর পর, ঘরটা আবার নিঃশব্দে ঢেকে যায়। হিয়ার মনে আর প্রশ্ন আর থাকে না। তূর্যও জানে, এখন আর কিছুই খুঁজে ফেরার নেই। তাদের সামনে ইতিহাসের দরজা খুলে গেছে। সব রহস্য উন্মোচিত। তবে কিছু রহস্য কি গোপন থাকাই বেশি সুন্দর নয় কি..!
এবার যেন তাদের চরম পরীক্ষা। এই জঘন্য, নির্মম সত্য তারা কি করে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সামনে আনবেন? আদ্রৌ কি এতো সাহস আছে তাদের?
সময় একটুখানি থেমে আবার ধীরে চলতে শুরু করে। তূর্য, হিয়া আর স্বাত্ত্বকি তিনজন যেন তিন প্রজন্মের প্রতিনিধি, একটিমাত্র গল্পের তিনটি ভিন্ন অধ্যায়। স্বাত্ত্বকি হঠাৎ মৃদু হেসে বলেন,
“তোমাদের মতো দু’জনকে পেয়ে… জানো, অনেকদিন পর মনে হলো আমি কারও কাছে নিজেকে খুলে বলতে পেরেছি। আর কিছু না হোক, একটা বোঝা যেন বুক থেকে নামল। হালকা লাগছে। তোমাদের দুজনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
তারপর ধীরে টেবিলের সাইড থেকে একটা নোটবুক বের করেন। সেটার একটা পাতায় নম্বর আর ঠিকানা লিখে তূর্যের হাতে এগিয়ে দিয়ে বলেন, “এই আমার কলকাতার নম্বর। নিচেরটা বাংলাদেশের আর এখানে আমার বর্তমান ঠিকানা লেখা। তুমি যদি কখনো চাও… যোগাযোগ রেখো। আর যদি পারো, রুশান ভাইয়ের সঙ্গে একবার… একটাবারের জন্য শুধু দেখা করিয়ে দিও।”
স্বাত্ত্বকির গলায় আবার একটা নরম কাঁপুনি। সেই কাঁপুনি স্মৃতির, অথবা অপ্রকাশ কষ্টের। তূর্য তখন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর যেন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে বলে, “আপনি আজকাল কবে ফ্রি আছেন? আসুন সময় করে। সবাই মিলে বসা যাবে। বাসায় একটা ছোট ডিনারের আয়োজন করি। আশা করছি সেখানে সবাই থাকবে।
ছোট দাদা এসেছেন, অর্থাৎ আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ। আর নিয়তিতে থাকলে, মিনু রহমানের সঙ্গেও আপনার দেখা হবে।”
স্বাত্ত্বকির চোখে তখন ভোরের আলোর মতো আশ্চর্য বিস্ময়। মুখে ফুটে ওঠে এক অপ্রত্যাশিত হাসি, অন্তর্গত আনন্দের, আবার খানিকটা আশঙ্কার। তবু তিনি মাথা নোয়ান সম্মতির ইশারায়। তিনি বলেন, “অবশ্যই আসবো আমি। কতো যুগ কেটে গেছে পুরানো ঢাকায় পা রাখি না!”
তাঁর কন্ঠস্বর সূর্যাস্তের রঙের মতো কোমল হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা তখন শহরের শরীরে নেমে এসেছে এক নিঃশব্দ ও বিষণ্ণ কুয়াশার মতো। স্বাত্ত্বকির অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে তূর্য আর হিয়া। ঘড়িতে সময় তখন রাত ঠিক আটটা। রাস্তায় আলো জ্বলে উঠলেও তাতে কোনো উজ্জ্বলতা নেই, যেন শহরের প্রতিটি বাতি আজ চোখ নামিয়ে নিঃশব্দে প্রহর গুনছে কারও স্মরণে। তূর্য আর হিয়া পাশাপাশি হাঁটে, কিন্তু কথাহীন। মাঝে মাঝে দুই পায়ের ছায়া মিলে গিয়ে আবার আলাদা হয়ে যায়। এগুলো যেন তাদের মনে আসা বিস্ময় আর বিষাদের তরঙ্গ।
হিয়ার চোখদুটো ভারী, কিন্তু কাঁদছে না। তার ভেতরের কষ্টটা কেমন নিঃশব্দ হয়ে ঠাঁই নিয়েছে ঠোঁটের কোনায়, আর আঙুলের ফাঁকে। প্রকৃতির সেই অসমাপ্ত গল্প, অশ্রুত কান্না, আর অসমাপ্ত বেঁচে থাকা– সব যেন হিয়ার বুকের মধ্যে পাথরের মতো জমে বসে আছে।
তূর্য হিয়ার দিকে তাকায় মাঝে মাঝে। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দ পায় না। সে জানে, এই মুহূর্তে কোনো কথাই যথেষ্ট নয়। সে বুঝতে পারে হিয়ার মনে ঠিক কীভাবে প্রকৃতির মৃত্যুটা একটা নিঃসহায় অসম্মতির মতো ধাক্কা দিচ্ছে। একটা অসময়ে, অপ্রস্তুত বিদায়… যেটা কারো প্রাপ্য নয়।
______________
চলবে..... 🦋