নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ০২

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ০২ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ২

বহমান সময় যেনো এক পাগল ঘোড়া, ছুটছে তো ছুটেই চলছে। পিছু ফিরে তাকায় না, থেমে দাঁড়ানোর অবকাশ নেই তার। তার দৌড়ের গতি বোঝার আগেই জীবনের পাতায় জমে ওঠে অসংখ্য স্মৃতি, কিছু অপূর্ণতা, আর কিছু অব্যক্ত অনুভব।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হিয়াদের এখান থেকে বেড়িয়ে গেছেন তা-ও বছর পার হয়েছে। অথচ তার অস্তিত্ব যেন তিনি পরিপূর্ণভাবে রেখে যেতে সক্ষম।

পিউ তার এসএসসি পরীক্ষার পার্ট চুকিয়েই ঢাকাতে বড় দাদার বাড়িতে যাবে বলে প্রায় অন্যেশন করেই নিয়েছিল, তবে হিয়ার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছিল বলে মায়া হলো। তাই অপেক্ষা করছিল।

এবার হিয়ার ও বেশ ছাড়া হাত-পা, পরীক্ষা শেষ হয়েছে ঠিক এক সপ্তাহ হলো। প্রথম দুইদিন ঘুম, পরের তিনদিন আত্মীয়স্বজন আর পঞ্চম দিনে তাদের ঢাকা যাওয়ার জোরদার আন্দোলন।

তাদের দুজনের যৌথ পরিকল্পনা, জোড়াতালি যুক্ত আবেগ, আর বারবারের পিছুটান সব মিলে যেন এক মিষ্টি ষড়যন্ত্রের জন্ম নেয়। তাদের দুজনের মধ্যে তখন এক অদ্ভুত সখ্যতা, যেন এক রকমের চক্রান্ত, যা তাদের বাবা-মাকে ঠেকাতে পারবে না। তবে হিয়ার বাবার অফিসের কাজে চাপে ছুটির নাম গন্ধ নেই।

আর কি!

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকেই আসতে হলো নাতনিদের এই আন্দোলন বন্ধের উদ্দেশ্যে। তবে এবারের যাত্রার বিষয় একটু জমজমাট। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের একমাত্র ছোট বোন মিনু রহমানও ভাইদের সাথে দেখা করতে তার বাবার বাড়ি আসছেন তার নাতি নাতনিদের নিয়ে। এই পারিবারিক গেট টুগেদার ব্যপারটা হিয়া বেশ পছন্দ করে। কেমন একটা হইহই রইরই ব্যপার হয়। তবে তার এবারের মিশন ভিন্ন। হিয়া প্রকৃতির সম্পর্কে আরো জানতে চায়। ও দেখতে চায় সেই সব গুলো জায়গা সেখানে মিশে আছে প্রকৃতি আর রুশান। ও সেই ৫০/৫২ বছর আগের সেই প্রেমি যুগলের অনুভব নিতে চায়।

এখানে পিউয়ের ইন্টারেস্ট ও কম না। তবে তার ইন্টারেস্ট একটা প্রশ্নে আটকানো। প্রকৃতি কোথায়? সে একবার হলেও দেখতে চায় বার্ধক্য তার সৌন্দর্য নিয়ে ঠিক কতটুকু খেলেছে।

সকাল ৮:৫০ এর ট্রেন ঢাকায় থামলো সকাল সাড়ে ১১ এর ঘরে। জামজটের শহড় হলেও হিয়ার বেশ পছন্দ এই পুরোনো ঢাকার আভিজাত্যের বিষয়টা।

ধোঁয়াটে কুয়াশাহীন আকাশ আর ব্যস্ত জনজীবনের কোলাহলের মাঝখানে যেন ট্রেনটা একটু ক্লান্ত, একটু স্থির। ঢাকা, এই শহর যেমন গলার চেপে বসা জ্যামে নাকাল করে, তেমনি কিছু কিছু জায়গায় অদ্ভুত এক মোহে জড়িয়ে রাখে। হিয়ার কাছে তার সবচেয়ে প্রিয় দিক, পুরান ঢাকার সে আভিজাত্য যার প্রতিটি ইট যেন একটা করে গল্প, একটা করে প্রাচীন কান্না অথবা না বলা প্রেমের কবিতা। বেশ মায়াবী। একটা পুরনো উপন্যাসের গন্ধ খুঁজে পায় ও এখানে।

আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাড়িটা ওর আরো বেশি প্রিয়।

এই বাড়ির বয়স অনুমান করা কঠিন নয়। হয়তো এক শতাব্দী ছুঁয়ে গেছে। দেশভাগের ঠিক পরবর্তী কালে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাবা গড়ে তুলেছিলেন এই বিশাল বাড়ি। সময়ের ধাক্কায় বাড়ির গায়ে লেগেছে কিছু ক্ষত, আবার ছুঁয়ে গেছে কিছু মেরামতির হাত। দোতলার কিছু ঘর বছর কয়েক আগে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু মূল কাঠামো আজও একই, অটুট, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন যোদ্ধার মতো।

এ ইটের গায়ে লেপ্টে আছে সময়ের গন্ধ। করিডোরে পায়ের শব্দ পড়লে মনে হয় যেন দূর অতীতের কেউ হাঁটছে, ছাদের কার্নিশে ধুলোমাখা সোনালি বিকেল জমে আছে এখনও। এই পুরনো রাজ্য এখনো নিস্তব্ধ নয়, বরং তার ভেতরে এক অদ্ভুত নীরব ব্যস্ততা লুকানো। এই ব্যস্ত নগরীর এই ছোট্ট রাজ্য যে ব্যস্ত নয় তেমন না। তবে এই পুরোনো আভিজাত্য এবার হিয়াকে ফেরাচ্ছে বেশ কয়েক যুগ আগের অনুভুতিতে।

বাড়িটিতে দীর্ঘদিন একাই থাকতেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। জীবনটা গুছিয়ে নিয়েছেন নিঃশব্দে, আপন গতিতে। তবে গত সাত-আট বছর ধরে তার জীবনে যোগ হয়েছে নতুন সঙ্গী রাশিদা ও তার স্বামী আলী। তাঁরা শুধু গৃহস্থালির কাজই সামলান না, বরং এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি রুটিনে তাদের যত্নের ছোঁয়া লেগে আছে।

আরেকটি পরিচিত মুখ, যিনি মাঝে মাঝেই এসে ভরিয়ে তোলেন এই নিঃসঙ্গ রাজ প্রাসাদটিকে, তিনি হলেন মিনু রহমান। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের একমাত্র ছোট বোন। রাজশাহীতে তার বাড়ি, যেখানে এক বৃহৎ পরিবার নিয়ে তার দিন চলে দুই ছেলে, নাতি-নাতনিতে মুখরিত সেই সংসার।

তবু মিনু রহমানের মন যেন বারবার ফিরে আসে ভাইয়ের কাছে। হয়তো পুরনো স্মৃতির টানে, হয়তো ভাইয়ের কোলাহলহীন জীবনের পাশে কিছু আলো রাখতে। তাই বছরের বড় একটা সময় তিনি এখানেই কাটিয়ে দেন এই লাল ইটের বাড়ির ছায়ায়, যেখানে পাখির ডাকে এখনো শোনা যায় অতীতের গান।

সকাল গড়িয়ে যখন ঘড়ির কাঁটা বারো ছুঁয়েছে, তখনই হিয়ারা পৌঁছাল ঢাকার সেই চেনা ঠিকানায়। রোদ যেন তখনো সকালের রেশ টেনে নিয়ে হাঁটছিল ছাদে ছাদে, আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদের পুরোনো বাড়ির ইটের গায়ে পড়া আলো যেন হিয়াদের আগমনের উষ্ণ অভ্যর্থনা দিচ্ছিল।

বাড়ির বাতাসে জমে থাকা পুরোনো গল্পগুলো যেন তখনই খানিক নড়ে উঠল। কিন্তু দিনটা তো আরও রঙিন হবার ছিল।

বিকেল গড়িয়ে সাড়ে চারটার সময়, ঘরে এলেন মিনু রহমান। তার সঙ্গে ঢুকে পড়ল এক ঝাঁক কোলাহল, প্রাণ, আর ছুটন্ত শৈশব।

তার বড় ছেলের একমাত্র ছেলে তূর্য। যার নামেই যেন একধরনের ছন্দ লুকিয়ে আছে, সে এসেছে গম্ভীর চোখে কিন্তু হাসিমাখা চেহারায়। তূর্য আর হিয়ান এই দুই নাম যেন একটা গল্পের দুই অধ্যায়। বয়সে সমান, আর বন্ধুত্বে যেন কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক নিখুঁত জুটি। ছোটবেলা থেকেই যাদের সম্পর্ক ছিল রোদ-ছায়ার মতো। হঠাৎ হাসি, হঠাৎ ঝগড়া কিন্তু দূরত্ব কখনোই জমতে পারেনি। ভাগ্য এমনই খেলেছে যে, একই বিশ্ববিদ্যালয় তাদের গন্তব্য হলেও পড়াশোনার জগতটা ঠিক ভিন্ন ভিন্ন তবু গন্তব্যপথে ছায়াসঙ্গী।

মিনু রহমানের সঙ্গে ছিল আরও দুটি প্রাণবন্ত মুখ ছোট ছেলের দুই সন্তান, মিম আর আলিফ। আলিফ আর পিউ একই বয়সের, তবে পিউ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে পড়াশোনায়। কিন্তু বয়স তো কেবল সংখ্যা, তাদের কথার টানাপোড়েন যেন একেকটা ফুটন্ত ডায়লগ, যেমনটা দেখা যায় পুরনো নাটকের দৃশ্যে।

আর মিম? সে যেন হিয়ার প্রতিবিম্ব! বয়সে কাছাকাছি, মনেও সুরের মিল। দুজনের মধ্যে ভাবটা এমন যেন আলাদা করা যায় না একসঙ্গে গল্প, একসঙ্গে হাসি, আর চুপচাপ কিছু না বলেও অনেক কিছু বলা যায় তাদের এমনই বোঝাপড়া।

বাড়ির প্রতিটি ঘরে তখন ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের নতুন দোলা। পুরনো দেয়ালের ফাঁকে নতুন হাসির রং, করিডোরে অজস্র পায়ের শব্দ, উঠোনে ছড়িয়ে পড়া চিৎকার, ঠাট্টা আর চায়ের কাপে কাপের টুংটাং। শুধু মানুষ নয়, এই বাড়ির প্রতিটি আসবাব, প্রতিটি জানালা, এমনকি দীর্ঘদিনের নিরব টেবিলপাখাটাও যেন আজ একটু প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

পারিবারিক ঘটনা এখানে বেশ সোজাসাপটা। মিনু রহমানের সাথে প্রতি বছর হিয়াদের দেখা হলেও আলিফ আর তূর্যের সাথে শেষ দেখা প্রায় বছর তিন আগে। তবে এই বাড়ির ছেলেমেয়ে সব গুলো টম এন্ড জেরি কার্টুনের মানুষ ভার্সন। এখন না হয় বয়স বেড়েছে। তবে এদের কারো সাথেই কারো তেমন চুলটানা টানি ছাড়া সম্পর্ক নেই। কিন্তু এবার সময়ের দূরত্ব বেশ বেড়েছে। সে সব অতীত হয়েছে।

হিয়া এ বাড়িতে যে ঘরটা পেয়েছে সেটা একসময় আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাবা মায়ের ঘর ছিল। প্রতিবার এসে দোতলার দক্ষিণের এই ঘরটাই হিয়া দখল করে নেয়। যেন বহু বছর ধরে এই ঘরের একচেটিয়া অধিকার হিয়ারই।

ঘরটার কাঠের জানালাগুলো এখনো সেই পুরোনো ঢঙে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এক ধরনের নীরব স্মৃতি পাহারা দেয়। হিয়ার এই পুরোনো গন্ধ, পুরোনো আসবাবপত্র কাঠের সেকেলে জানালা সব বেশ আপন লাগে। কাঠের সেকেলে আলমারি, পুরোনো ফুলপ্যাটার্নের বিছানা, আর মেঝেতে হালকা চুনকালির ছোপ সবকিছু মিলিয়ে এই ঘরে ঢুকলেই হিয়ার মনে হয়, সে যেন একটা ইতিহাসের ভেতর ঢুকে পড়েছে।

দক্ষিণের জানালাটা বরাবরই হিয়ার প্রিয়। ও জানালা দিয়ে চোখ ফেললেই দূরে দেখা যায় একটা খোলা খেলার মাঠ দুপুরবেলা মাঠজোড়া ছেলেমেয়ের হাঁকডাক, বলের ধাক্কাধাক্কি, আর বাতাসে উড়ে যাওয়া হাসি যেন জানালা পেরিয়ে সোজা হিয়ার মনে ঢুকে পড়ে। এই দৃশ্যটা ওর কাছে শুধু একটা মাঠ না। এ যেন জীবনের অবাধ গতি, ফিরে আসা সেই ছোটবেলার দৌড়।

ঘড়িতে সময় কতো তা ঠিক নেই। তবে সন্ধ্যা নেমেছে ধরণীতে। হিয়া জানালায় দাঁড়িয়ে আলোছায়ার সন্ধ্যে দেখছে। একই ঘরের এক কোনায় আরাম কেদারায় বসে পিউ লিস্ট করছে সে এবার এখানে এসে ঠিক কি কি করবে। মাত্র সাত দিনের যাত্রা, এ যাত্রায় কিছু যেন মিস না হয় সেই চিন্তা সব তার। অন্যদিকে মীম ব্যস্ত তার মুঠো ফোনে নিজের স্থির চিত্র টুকতে।

হিয়া সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে হাসলো। হিয়া ভাবছে, একই বাড়িতে বসবাস করা কিংবা একই ঘরে আবদ্ধ মানুষ গুলো কতোটাই না আলাদা হয় একে অপরের থেকে।

তিনবছর আগে যখন তাদের দেখা হয়েছিল তখন বোধহয় তূর্য ইন্টার-মিডিয়েট পরীক্ষার্থী। হিয়া আর মীম নবম শ্রেণীতে উঠেছিল বোধহয়। বয়সের থেকে কতো বাচ্চা ছিল তারা এটা ভেবে আবার হাসলো হিয়া।

তূর্য বরাবরই বদমেজাজি। কি এক দর্শিপনার দায়ে তূর্য খুব বকেছিল হিয়া আর মীমকে। দুজনের মাথায়ও কি যে, শয়তানি উঁকি দিলো কে জানে! তূর্যের সারা প্রাকটিক্যাল খাতার চেহারা বিগড়ে দিয়েছিল রাগে। তূর্য ও রাগে সবার সামনে কান মুলেছিল দুজনের।

বেচারার রাত জেগে আবার সব শেষ করতে হয়েছিল।

হিয়ার অবশ্য এই সবার সামনে কানমোলার মতো অপমানের রাগ বেশ কয়েকদিন জীবন্ত ছিল। তবে এখন সেটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিয়ার মনে প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা সময়ের সাথে রাগ কি জড়তা হয়ে যায়?

সেই সময়ের পর অবশ্য আর দেখা হয়নি তাদের। এই সোস্যাল মিডিয়ার যুগেও তাদের দেখা হয়নি এটা বেশ অবাক করার বিষয় লাগলো হিয়ার মনে।

হিয়ার মনে এ প্রশ্ন আসা অস্বাভাবিক নয়। আজ যখন মিনু রহমান এসেছেন তখন সবার সাথেই খুব সুন্দর সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও কোন এক জড়তা, লজ্জা তূর্যের সাথে হিয়ার কথা বাড়ানো তো দূরে থাক, শুরুই করতে দেয়নি।

আর তূর্য!

সে বরাবরই শান্ত।

তূর্য বরাবরই চারিত্রিক ভাবে বেশ একগুঁয়ে ছেলে। তেমন কথাবার্তা কিংবা সহজে মিলে যেতে পারে না সব পরিবেশে। তার ভেতরে যেন একটা নীরব পাহারার প্রহরী আছে, যা তাকে সবকিছুর থেকে খানিক দূরে রাখে। তবু এই নীরবতা, এই স্বরহীন একগুঁয়েমিই যেন এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি করে চারপাশে। কে যেন বলেছিল, সবচেয়ে কম বলা মানুষগুলোর চোখেই সবচেয়ে বেশি গল্প থাকে।

আজকের লম্বা জার্নি সকলকেই ক্লান্ত করে ছেড়েছে। এ বাড়ির প্রতিটি মানুষ রাত গভীর হবার আগেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে।

এ বাড়ির সকালটা বেশ আকর্ষণীয় লাগলো হিয়ার। কে বলেছে ঢাকায় পাখি নেই? এই যে এতো কিচিরমিচির কুচকাওয়াজ করছে পাখিরা! এদের কি সে পকেটে করে বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে? চোখ খুলতে ঘাবড়ে গেল হিয়া, আলিফ খুব গভীর ভাবেই হিয়ার মুখ পর্যবেক্ষণ করছিল অনেক সময় ধরে। হিয়ার এভাবে চোখ খোলায় আলিফ ও একটু ছিটকে দাঁড়ালো। হিয়া কোন মতে চোখের ঝাপসা ভাব কাটিয়ে উঠে বসলো। আলিফ একটু বোকা হেসে বললো, “তোমাকে এই নিয়ে ছয় নম্বর বার ডাকতে এলাম হিয়া আপি। তোমার তো উঠার নাম নেই!”

হিয়া নিজের এলোমেলো চুল হাত খোঁপা করতে করতে বললো, “তা বলে এভাবে কি গবেষণা করছিলি?”

আলিফ একটু হুংকার ছেড়ে হাসলো, “আমি এসে দেখি তুমি মিটিমিটি করে হাসছো। তাই আমি ভাবলাম তুমি বোধহয় স্বপ্ন দেখে হাসছো। এই কারণেই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তোমার মুখটা পড়ার চেষ্টা করছিলাম, যে ঠিক কি স্বপ্ন দেখছো।”

হিয়া বিছানা থেকে নেমে বললো, “তোর শুধু দর্শিপনা তাই না? ভালো হয়ে যা। ভালো হতে টাকা-পয়সা কিছু লাগেনা বিশ্বাস কর।”

আলিফ আবারো হেসে বললো, “বিশ্বাস করো হিয়া আপি। ভালো হতে টাকা পয়সা লাগলে আমি সত্যি ভালো হয়ে যেতাম। টাকা লস দিয়ে তো আর কেউ খারাপ থাকতে পারে না।”

আলিফ ছোট থেকেই বেশ দুষ্টু। ওর সাথে পারতে পিউয়ের মতো ত্যাড়াবেকা জবাব দেয়া প্রয়োজন। তবে হিয়ার মাঝে এই গুনের খুব অভাব। তাই আর হিয়া কথা বাড়ালো না।

সকাল কখন যে দুপুর ছুঁয়েছে, কেউ বুঝতেই পারেনি। ঘড়ির কাঁটা ঠেকেছে ঠিক তিনটায়। পিউয়ের অব্যর্থ জোরাজুরিতে আজকের গন্তব্য আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বিশ্ববিদ্যালয়।

শহরের আকাশটা সকাল থেকে সাঁঝ রঙা মন মতো একটানা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি যেন স্মৃতির পাতায় কালি ছুঁড়ছিল। তবে বিকেলের প্রথম প্রহরে এসে সে বৃষ্টিও যেন ক্লান্ত হয়ে থেমেছে।

এক ঝাঁক নতুন আগন্তুক, কৌতূহলী চোখ আর অচেনা চঞ্চলতার ভিড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টা আজও তরতাজা, প্রাণবন্ত। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে সবাই হিয়া, পিউ, তূর্য, আলিফ আর মিম যেন ক্যাম্পাসের ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে। চারপাশে যেন প্রতিটি ধুলোর কণায়, প্রতিটি বেঞ্চের গায়ে, প্রতিটি খোলা জানালায় লুকিয়ে আছে জীবনের নিঃশব্দ স্পন্দন।

বড় বড় অশ্বত্থ আর বটগাছের নিচে দল বেঁধে আড্ডায় মেতে থাকা কিছু তরুণ-তরুণী কেউ হয়তো সদ্য শেষ হওয়া পরীক্ষার হালকা নিঃশ্বাস ফেলছে, কেউ বা নতুন স্বপ্নের নকশা আঁকছে। দূরের এক বেঞ্চিতে বসে থাকা একজোড়া কপোত-কপোতীর প্রাণখোলা হাসি যেন ক্যাম্পাসে বসন্তের হাওয়া নিয়ে এসেছে। আর একটু দূরে, পাখির পালকের মতো হালকা শাড়িতে এক তরুণী আর তার পাশে পাঞ্জাবিপরা যুবক হয়তো সদ্য প্রেমের সূচনা তাদের, চোখে স্পষ্ট সেই আলো।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার জীবনের অমূল্য কয়েক বছর কাটানো এই জায়গাটার প্রতিটি ইট-পাথরের গল্প তুলে ধরলেন।

ক্যান্টিনের সামনে তখন গমগমে ভিড়। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর গরম সিঙ্গারার ঘ্রাণ বাতাসে মিশে এক অন্যরকম ঘোর তৈরি করেছে।

পিউ তখন আব্দুর রুশান মোহাম্মদের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু একটা নিয়ে মজার গল্প বলছিল, হয়তো পুরনো কোনো কাহিনি টেনে এনে হেসে ফেলতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু হিয়ার মন পড়ে ছিল অন্য কোথাও।

রোদে ভেজা ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাসটা যেন এক বিশাল ক্যানভাস—যেখানে অচেনা মুখগুলোর প্রাণবন্ত হাসি রঙ তুলির ছোঁয়ায় আঁকা স্বপ্নের রেখা। বাতাসে ভেসে আসা কাঁচা ঘাসের কোমল গন্ধে হিয়ার মনটা ভরে উঠলো এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এবার ইশারা করলেন, "চল, লাইব্রেরিটা দেখাই।”

লাইব্রেরির ভারী দরজাটা পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই এক নিঃসঙ্গ নীরবতা হিয়াকে ঘিরে ধরলো—ঠিক যেন শব্দহীন এক আবরণ। কাঠের পুরনো টেবিল, একটির পায়া হেলে পড়া চেয়ার, দেয়ালের গায়ে উঠে আসা সময়ের দাগ, আর সারি সারি বইয়ের আলমারি—সব মিলিয়ে যেন একটা নিঃশব্দ ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে সামনে। জানালার ফাঁক গলে বিকেলের নরম আলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল ধুলোমাখা বইয়ের খোলা পৃষ্ঠাগুলো যেন কেউ চুপিচুপি গল্প বলছে, শুধু শোনার অপেক্ষা। এই আলো, এই গন্ধ, এই শূন্যতার মাঝেও যে কী ভীষণ রকম প্রাণ আছে হিয়া হঠাৎই টের পেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সে যেন সময়ের সীমানা অতিক্রম করে অন্য কোনো জগতে ঢুকে পড়েছে। এখানে একটা অন্য গন্ধ আছে।

হিয়ার মনে হলো সে হয়তো ৫০ বছর আগেও এখানেই ছিল, বর্তমান তার গন্তব্যও এখানেই ছিল।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এসে দাঁড়াল ক্যাম্পাসের একেবারে শেষ প্রান্তে। বিকেলের ম্লান আলোটা যেন তার মুখে এক ধরনের শান্ত, নরম আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল একটা নীরব সম্মতির মতো, যেন সময় নিজেই তার দিকে তাকিয়ে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পেছনে হিয়া আর পিউ তখনও বিস্ময়ভরা চোখে ক্যাম্পাসটা দেখছিল প্রতিটি কোণা যেন তাদের কাছে এক একটি নতুন গল্পের দিগন্ত। মীম মোবাইলের ফ্রেমে ধরার চেষ্টা করছে এই ক্ষণিকের সৌন্দর্য। তূর্য, বরাবরের মতোই নির্জন, কিছুটা দূরে হেঁটে চলেছে নিজের গন্তব্যহীন পথ ধরে।

গভীর এক নিশ্বাস ফেললেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। কণ্ঠে তার একটা পরিণত মৃদুতা,

“চলো, এবার বের হই… সময় তো আর আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না।”

গেট পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি ইট, প্রতিটি ছায়া যেন তাকে কোনো অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রেখেছে। যে বাঁধন ছিন্ন হয় না, শুধু গভীর হয় দিন দিন।

দরজার মূল ফটকে পৌঁছানোর আগেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদ থেমে গেলেন একটা পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছের সামনে। গাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে আগের মতো না, বরং আরও গম্ভীর, আরও সংবেদী হয়ে যেন বছরের পর বছর তার মনের কথাগুলো জমিয়ে রেখেছে। হাওয়ায় দুলে ওঠা গাঢ় লাল ফুলগুলো যেন নিঃশব্দে কোনো না বলা কবিতা আওড়াচ্ছে, আর পাতার ফাঁক গলে রোদের সোনালি রেখাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে মাটিকে ঠিক যেমন করে ছুঁয়ে যায় একটা পুরনো স্মৃতি হঠাৎ ফিরে এসে।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন গাছটার দিকে। এক হাতে গুঁড়িটা ছুঁয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। যেন বছর তিনেক, দশ কিংবা তিরিশ সব বছর মিলেমিশে গেছে এই একটুখানি ছোঁয়ার মধ্যে। তার ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক ধরণের ম্লান হাসি, যে হাসি বোঝে ফিরে পাওয়ার নয়, বরং রেখে আসার গভীরতা।

নিচু হয়ে মাটি থেকে তুললেন এক ঝরা কৃষ্ণচূড়া ফুল। হাতের তালুতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর সেই নরম পাপড়ির স্পর্শের মধ্যে যেন খুঁজে পেলেন অতীতের কিছু অনুচ্চারিত অনুভব। ধীরে ধীরে হাতের তালুর মধ্যে নরম পাপড়িগুলোকে অনুভব করলেন। এরপর তিনি বললেন, "এটাই সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটা। সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু কিছু কিছু অনুভূতি কখনো বদলায় না। এই গাছটা যেমন তখনো এখানে ছিল, এখনো আছে। তেমনই কিছু স্মৃতি, কিছু অপেক্ষা, কিছু হারানো থেকে যায়… ঠিক আগের মতো।”

উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ব্যথাতুর অনুভূতির আভাস পেলো। তবে কারো কাছে কোন শব্দ নেই।

এই ব্যস্ত ক্যম্পাসটার মাঝেও একফালি নিরবতা বয়ে চললো। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ধীরে ধীরে হাতের কৃষ্ণচূড়া ফুলটা মাটিতে রেখে দিলেন। হিয়া ভাবলো, হয়তো তিনি আরেকবার প্রকৃতিকে উপহার দিলেন। নিঃশব্দে, নিঃশর্তে।

বাড়ি ফেরার পথে আকাশ আবার কালো হয়ে এল। সারাদিনের গুমোট ভাবটা যেন হঠাৎ করেই এক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি গড়িয়ে পড়তে না পড়তেই একধারে আবার ঝেঁপে এল ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, একেবারে সারাটা শহর ধুয়ে দিতে এল যেন!

রাস্তার বাতিগুলো ঝাপসা হয়ে গেল বৃষ্টির পর্দায়। হিয়া তার এই ঝাপসাটে চোখেই পর্যবেক্ষণ করলো, পিচঢালা পথের ওপরে জমে থাকা ছোট ছোট পানির ফোঁটা, স্ট্রিটলাইটের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে, ফুটপাতে ছুটোছুটি করা মানুষজন, ভিজে চুলে এলোমেলো একপাল তরুণের প্রাণোচ্ছল হাসি, কোনো এক দোকানের শ্যামল ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া দুই পথশিশু।

হিয়া শত বারণ শর্তেও ভিজলো। এই ঝিরি বৃষ্টি অবশ্য ভেজাতে আসে না, শুধু তার শুষ্ক অনুভূতি ছোঁয়াতে আসে। বৃষ্টি মাথায় বাড়ি ফিরলো সবাই।

হিয়ার মনে হলো, জীবন আসলে ঠিক এই শহরের মতো কখনো ঝলমলে রোদ, কখনো নিস্তব্ধ সন্ধ্যা, আবার কখনো হঠাৎ আসা হিংস্র এক বৃষ্টি। কিন্তু সবকিছুর মাঝেই কোথাও না কোথাও সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে, এক ধরনের শুদ্ধতা, এক ধরনের আবেগ, যা হয়তো বোঝা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।

বাইরে এখনো বৃষ্টি ঝরছে, ছাদ থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ার শব্দ একাধারে চলছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ আর কেমন একটা রহস্যময় নীরবতা ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা বাড়িটায়, যেন পুরো বাড়িটা একটা গভীর রহস্যপুরী। হিয়া চাদর মুড়ি দিয়ে আধো ঘুমে, চোখ দুটো বুজে এলেও মাথার ভেতর তখনো দিনের সব ঘুরপাক খাচ্ছে তার। এমন সময় হঠাৎ পিউয়ের কণ্ঠ শোনা গেল, "আরে! এটা কী?"

তারপরই আলিফের উত্তেজিত গলা, "দেখতে দে! প্রথমে আমিই দেখব!"

পিউ চেঁচিয়ে বললো, "না, আমিই আগে পেয়েছি, আমিই আগে পড়ব!"

আলিফ ও খেপে উঠলো, "আরে ধুর! এই আলমারিটা তো আমি খুঁজছিলাম, আর তুই এসে ফালতু নাক গলাচ্ছিস!"

পিউ আর আলিফের এই ঠেলাঠেলি, কাড়াকাড়ি, তর্কবিতর্ক এতটাই বাড়তে লাগল যে, হিয়া বিরক্ত হয়ে চাদর সরিয়ে উঠে বসল। আধো-অন্ধকার ঘরের ভেতর ওদের ছায়া জোড়া একে অপরকে ধাক্কাধাক্কি করছে।

হিয়া ধীর গলায় বলল, "এই তোরা আবার কী শুরু করলি?"

পিউ রাগী মুখে বলল, "দেখ না আপি, দোতলার চিলে কোঠায় পুরোনো আলমারিটা খুঁজতে গিয়ে আমরা একটা অদ্ভুত জিনিস পেয়েছি!"

"কী জিনিস?" হিয়া ভ্রু কুঁচকালো।

আলিফের হাতের নিচে চাপা দেওয়া কালো মলাটের একটা পুরোনো ডায়েরি দেখিয়ে বলল, "এই ডায়েরিটা! অনেক পুরোনো, হয়তো বহু বছর আগে কেউ লিখেছে!"

হিয়া আগ্রহ নিয়ে ডায়েরিটার দিকে তাকালো। কালচে হয়ে যাওয়া মলাটে ধুলো জমে আছে, কোণাগুলো ছিঁড়ে গেছে। কোনো নাম নেই, শুধু মলাটের ওপর হালকা খোদাই করা কিছু অক্ষর, যা অনেক পুরোনো হওয়ায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।

হিয়া একটু কৌতুহল নিয়ে বললো, "কার এটা? তোরা কোথায় পেলি?

পিউ কাঁধ ঝাঁকালো, "জানি না, আমরা তো বড় দাদার যুবক বয়সের কোন ছবি আছে কিনা এগুলো খুঁজতে গিয়েছিলাম। কিন্তু একটা পুরনো ভাঙা আলমিরা আছে না, ওর ড্রয়ারে ছিল এটা।"

হিয়া শুধু চুপচাপ ডায়রিটাকে দূর থেকে দেখতে লাগলো। পিউ তখনি বলে উঠলো ,"যা-ই হোক, আমি প্রথমে পড়ব!"

আবারো আলিফ চেঁচিয়ে উঠে বললো, "না, আমিই আগে পড়ব!"

হিয়ার মাথার ভেতর তখনো আধো ঘুমের ঝিমুনি। দুইজনের তর্ক সহ্য করতে না পেরে ও ধপ করে বিছানা থেকে নামল, একঝটকায় ডায়েরিটা ওদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল।

এরপর তেজি গলায় বললো, "বাপরে! শান্তি নেই! আগে কে পড়বে সেটা পরে দেখা যাবে, আপাতত এটা আমার কাছে থাকবে!"

এই বলে হিয়া ওদের রুম থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। হিয়ার কথার প্রতিউত্তরে কোনো কথা বলার সুযোগ ওদেরকে দিল না।

হিয়া ঘরের সব বাতিগুলো জ্বেলে জানালার এক কোণে এসে দাঁড়াল। দক্ষিণের জানালাটা খোলা, বাইরে তখনও টিপটিপে বৃষ্টি। চারদিকে একরকম নিঃসঙ্গ প্রশান্তি। হালকা বাতাসে জানালার পর্দা নরমভাবে দুলছে, আর দূরের মাঠটা কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়ে গেছে।

কোলে তুলে নিল। এতদিন পরেও সেই মলাটে যেন একটা অদ্ভুত উষ্ণতা আছে, যেন দীর্ঘ অপেক্ষার পর ডায়েরিটা নিজের গল্প শোনাতে প্রস্তুত। ধুলোয় ঢাকা মলাটে আলতো করে হাত বুলিয়ে সে ঝেড়ে ফেলল, মলাট উল্টে ভেতরের প্রথম পাতার ওপরে হালকা হাতের লেখায় লেখা,

"নাম: প্রকৃতি সাহা

যোগাযোগ: শ্যামা প্রসাদ রায় লেন, লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা।

বিঃদ্রঃ যদি কেউ এই দিনপঞ্জিখানা পাইয়া থাকেন, অনুগ্রহপূর্বক খুলিবেন না। ইহা যোগাযোগ করার ঠিকানায় পৌছাইয়া দিলে অত্যন্ত উপকৃত হবো।"

হিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। প্রকৃতি! এটা কিভাবে সম্ভব?

হাত কাঁপতে কাঁপতে ও পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। ডায়রির পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে তার হাত কাঁপছে। কেবল উত্তেজনায় নয়, এক অজানা আশঙ্কায়। প্রতিটি পাতায় একরকম জীবন, আবেগ, আর সময়ের গন্ধ। সূক্ষ্ম হাতের লেখা, কোথাও কোথাও একটু কাত হয়ে গেছে, যেন লেখার সময় লেখকের হাত কেঁপেছিল। কোথাও কালির দাগ ছড়িয়ে পড়েছে।

ডায়রিটাতে ১৯৬৮ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে লেখা শুরু করা হয়েছে।

তবে হঠাৎ করেই সবকিছু থমকে যায়।

শেষের দিকে আসতেই ডায়েরিটা যেন নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।

শেষ পাতার পর দেখা যায় কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। বড়ই নিষ্ঠুর ভাবে তাড়াহুড়ো করে, যেন কিছু ঢেকে ফেলার চেষ্টা, অথবা কিছু মুছে ফেলার। ছেঁড়া অংশে সুতোগুলো ঢিলা হয়ে গেছে, পাতার খণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে যেন ভাঙা কোনো স্মৃতির টুকরো। কাগজের কানায় এখনও জেগে আছে ছেঁড়ার দাগ, ঠিক যেন কারো তীব্র আবেগে ছিন্ন হওয়া কোনো বন্ধন।

হিয়ার চোখের সামনে যেন সময় থমকে গেল। হিয়ার মস্তিষ্ক আর সঙ্গ দিচ্ছে না তার। প্রশ্ন অনেক গুলো তবে কোন উত্তর তাঁর জানা নেই।

প্রকৃতির ডায়রি এ বাড়িতে কি করছে?

এবাড়িতে থাকলেও এতো অযত্নে চিলেকোঠার ঘরে কি করছে?

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরে এতো বড় বইয়ের আলমারিতে কি এই ডায়রি রাখার যায়গা হয় নি? নাকি উনি জানেনই না এই ডায়রির কথা?

এমন আরো হাজারো প্রশ্ন হিয়াকে বিরক্ত করতে লাগলো।

হিয়া চুপচাপ বসে রইলো ডায়রিটাকে শক্ত করে চেপে ধরে। হিয়ার ছোট্ট মস্তিষ্কে কোনো ঘটনার খলসে হচ্ছে না।

হিয়া ডায়েরির মলাটে আঙুল বুলিয়ে নিয়ে গভীর শ্বাস ফেলল। যেন কত যুগের ধুলো জমেছে এর গায়ে, যেন কত কথা লুকিয়ে আছে পাতার ভাঁজে। বাইরে বৃষ্টি এখনো পড়ছে, জানালার কাচে মিহি ফোঁটাগুলো গলে গলে নামে। মাঠের কোনের কৃষ্ণচূড়া গাছটা নীরব দাঁড়িয়ে, লাল রঙের শিহরণ মাটিতে ছড়িয়ে।

হালকা কাঁপা হাতে প্রথম পাতা ছেড়ে পরের পাতা খুলল হিয়া। এটা একটা সাধারণ দিনপঞ্জি । খুব সাধারণ । একটা চঞ্চল অষ্টাদশী মেয়ের জীবনের একাংশ। তার হাসি কান্না, সব লেপ্টে আছে প্রতি পৃষ্ঠায়। হিয়া পাতার পর পাতা উল্টে যাচ্ছে আর চোখের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে প্রকৃতি নামের মরিচিকার সত্যতা।

আকাশ পাতাল সব ছন্নছাড়া বাক্যের সীমানা পেড়িয়ে হিয়ার নজর আটকালো ‘রামু’ নামের একটা শব্দে। এতো মাস পেরিয়ে প্রথম এই শব্দটা প্রকৃতি তার দিনলিপিতে যুক্ত করলো। হিয়া আব্দুল রুশান মোহাম্মদের মুখে তার নামের সস্মোধনে রামু উচ্চারণ শুনেছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত জানে না।

হিয়া গুটি কয়েক পুরোনো অক্ষরে মনোযোগী হল। ১৯৬৮ এর জুনের ৬ তারিখ। প্রকৃতি একটা সাধারণ হ্যাবলাকান্ত ছেলের বর্ননা দিয়েছে। যে তার দিকে অনাবিল সুখ নিয়ে আসহায়ের মতো দেখতে থাকে।

হিয়া একটু নড়ে চড়ে বসলো। কয়েক পাতা আবার উল্টালো। রামু নামের আড়ষ্টতা হিয়াকে ও জাপটে ধরলো। প্রকৃতি তার এক অন্য অনুভূতি এখানে আবদ্ধ রেখেছে। যে হ্যাবলাকান্ত ছেলের বোকার মতো চাহনি দিয়ে এই গল্প শুরু হয়েছিল তা যেন মাস ঘুরতেই ভালোলাগায় পরিনত হলো।

প্রকৃতি লিখেছে- “রামু বেশ ভালো মানুষ। একটু বোকাসোকা। তবে আজ ওকে সূর্যের হাসি ক্লিনিকের সামনে দেখলাম। ওর বন্ধুরা মিলে রক্তদান করতে গিয়েছিল। দেখে যে কি ভালো লাগলো।

দিপ্তী অকারনেই রামুর উপড় চটে থাকে। রামুকে আজ অন্যরকম লাগলো চোখে।”

হিয়া স্মিত হাসলো। প্রকৃতির অনুভুতি যেন হিয়ার মাঝে জমে বসেছে। পাতার পর পাতা শেষ হলো প্রকৃতির অনুভুতি আরো দৃঢ় হতে লাগলো। প্রকৃতি নিজের মনের প্রতিটা শুদ্ধ অনুভুতি এতো পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বর্ননা করেছে যেন হিয়া প্রকৃতি হয়ে উঠছে।

রুশান প্রকৃতির মনে যে ভালোলাগা বীজ বুনেছিল তা যেন চারাগাছ হবার আশায়।

প্রকৃতি লিখেছে- “রামু ভিতুর ডিম। মাঝে মাঝে মন চায় এই ভিতুর ডিমকে ভাজি করে ডাল দিয়ে ভাতের সাথে মেখে খেয়ে নেই। তুই মাসের পর মাস একটা মেয়েকে দেখবি কিন্তু কিছুই বলবি না মনের কথা? অন্ততঃ বন্ধুত্ব তো নিজে থেকে করতে আসবি!

এখন আমাকেই আগাতে হবে যা দেখছি।”

হিয়া আরেকটু নড়েচড়ে বসলো। এ কথা হিয়া রুশান মুহাম্মদের কাছে শুনেছিল যে পড়া বোঝার বাহানায় প্রকৃতি রুশান মোহাম্মদের কাছে গিয়েছিল। তবে এখানে প্রকৃতি সেই একই ঘটনা তারিখ সময় দিয়ে নিজের তরফ থেকে রেখেছে। কিন্তু এই ঘটনার পেছনের রহস্য তো একেবারেই আলাদা!

হিয়া মিষ্টি হাসল। এই জন্যই হয়তো মানুষ বলে- ‘প্রতিটি ঘটনার দুটো দিক থাকে।’

প্রকৃতি লিখেছে - “দুনিয়ার সব গর্দভ গুলো কিভাবে ভালো ফলাফল করে? আমার মাথায় একটু কিছু আছে বলেই হয়তো পড়াশোনা ঠিক ঢুকতে চায় না মাথায়।

আজকে ক্যাম্পাসে সম্পূর্ণ মাথা খাটিয়ে এগিয়েছি। ঐ গর্দভের থেকে পড়া বোঝার নামে কথা তো এগিয়েছি।

ছি ছি কি লজ্জা জনক বিষয়। এখন কি করার। মন আটকেছে তো এক বোকা হ্যাবলাকান্তের উপর।”

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। হিয়ার কাছে এসব হিসেব নেই। সে পড়েই চলেছে পাতার পর পাতা। এ যেনো সেই একই দৃশ্য যা আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তাদের দেখিয়েছিল, এবার সে দেখছে প্রকৃতির চোখে।

একটা পাতার ভাঁজে হিয়ার চুল উড়ে এসে পড়ে, জানালার ওপার থেকে হালকা বাতাস ঢুকছে, বাইরের বৃষ্টি এখনও ঝরছে মৃদু সুরে। হিয়া থেমে যায় না, থেমে যেতে পারে না। সময় এখানে নিছক ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়। এ যেন কোনো অনুভবের দীর্ঘ সূত্র, যা কালের অতল থেকে উঠে এসেছে ঠিক এখনকার জন্য।

বন্ধুত্ব গড়াতে লাগলো। বছর ৬৮ পেরিয়ে ৬৯ এ ঠেকলো। জানুয়ারির ৩ তারিখে হিয়া থেমে গেলো। প্রকৃতি লিখেছে - “এক অদ্ভুত বিষণ্নতা আমাকে গ্রাস করছে। আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আজ যখন অফিস রুমে বার্ষিক বেতন পরিশোধ করতে গিয়েছিলাম। তখন নিজের স্বাক্ষরের সময় নজর আটকেছে সব থেকে ভয়ংকর এক দৃশ্য পটে।

রামুর সম্পূর্ন নাম। আমি তো কখনোই এই দিকে নজর দেই নি! রামুর নাম আব্দুর রুশান মোহাম্মদ।

এটি তো মুসলিম প্রধান দেশ অবশ্যই এখানে শতভাগ মুসলিম থাকবে। তাহলে কি?

আমার বুকে এই যন্ত্রনা কেন?

আমি কি আশা করেছিলাম রামু হিন্দু?

ওকে সবাই রামু কাকা বলে মজা নেয় এটাতো কারোই অজানা নয়। তবে আমি কেন কোন দিন ওর পরিচয়ে গুরুত্ব দেই নি?

আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। আমি কাউকে বলতে পারছি না আর না বোঝাতে পারছি এ কিসের অস্থিরতা।”

হিয়া থমকালো। তাহলে প্রকৃতি আগে থেকেই জানতো আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মুসলিম ছিলেন?

হিয়ার জমাট বাঁধা কৌতুহল থামাতে দিলো না ওকে। পাতার পর পাতা প্রকৃতি লিখেছে তার অসহায়ত্ব। পাঁচ দিন নিজের সাথে লড়ায় চালিয়েছে শুধু এই প্রশ্নে যে, -কেন এই লড়াই?

উওর যখন পায়নি তখনই গৃহবন্দি জীবন ছেড়ে ছুটে গেছে ক্যাম্পাসে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে সে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছে- “আর কতো মুখ লুকিয়ে? আমার কাছে কিছুই করার নেই। সব সিদ্ধান্ত এবার ঠাকুর নেবেন। আমি শুধু এই স্রোতে গা ভাসাবো। নিজের সাথে মিথ্যে বলে কোন মহাপুরুষ করে জিতেছে?

অনেক হয়েছে এই লড়াই। এবার আর পারা যাচ্ছে না।”

হিয়া প্রকৃতির দৃঢ়তা কয়েকবার আউড়ালো। এই অনুভূতি কি নিছক পছন্দ। না না.. এ ভালোবাসা।

হিয়া আরো মনোযোগী হলো প্রকৃতির শাব্দিক অনুভূতিতে। কি সহজে প্রকৃতি সব গোপন করে গেলো রুশান মোহাম্মদের থেকে। পৃষ্ঠার রঙ বদলালো, গল্পে সুর এলো, বন্ধুত্ব তীক্ষ্ণ হলো। হিয়া প্রকৃতির অনুভুতিতে হাসছে আবার কাঁদছে।

এ কি খুব সাধারণ বিষয়? না অবশ্যই।

হিয়া দৃষ্টি গেঁথে রাখে সেই পাতায় যেখানে প্রকৃতি স্বীকার করে গেছে এক নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষার কথা—এক দমকা হাওয়ার মতো ভালোবাসা, যা লুকিয়ে থেকেও স্পষ্ট, অলৌকিকভাবে নিঃশব্দ।

ডায়রির প্রতি পাতায় প্রকৃতি যেন খুব যত্ন করে তার বাড়তে থাকা অনুভূতিগুলোকে সাজিয়েছে একেকটা শব্দ যেন রঙতুলির আঁচড়, একেকটা বাক্য যেন আত্মার স্বীকারোক্তি। এই ভালোবাসা কোনো প্রাপ্তির নয়, এটি এক অন্তর্নিহিত আবেগ, যা বলার নয়, শুধু বয়ে চলার।

হিয়া অমায়িক হাসলো। পৃষ্ঠা বদলালো,‌‌ প্রকৃতি তার আধ ভাঙ্গা শব্দে কি অমায়িক ফুটিয়ে তুলতে এক প্রেমিক পুরুষ রুশানকে। ডায়রির প্রতি পাতায় প্রকৃতি তার বাড়তে থাকা অনুভুতিকে কি যত্নে তুলেছে!

হিয়া চোখ বন্ধ করে প্রকৃতিকে কল্পনায় সাজিয়ে নিলো।

চলবে..........❤️