নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ২৩

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ২৩ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ২৩

ঠিক সেদিন যেদিন তিনি প্রথম আবিষ্কার করলেন তুহুরার চোখে এক অবাধ্য জ্বলে উঠা প্রেম। ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সেই শেষ দিন। এলাকার মাঠটা যেন মেলার মাঠে পরিণত হয়েছিল। গ্যালারির ধারে দাঁড়িয়ে উৎসুক জনতা, মাঠজুড়ে উত্তেজনা। তার ভেতরেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ছুটছিলেন শেষ ওভারে ম্যাচ বাঁচাতে। কিন্তু ঠিক তখনই এক হঠাৎ পতন। পায়ের নিচে মাটি সরে গিয়েছিল যেন। ধ্বস্ত হয়ে পড়ে যান। গোড়ালিতে তীব্র যন্ত্রণার কাতরে উঠেন।

রাতে বাড়িতে ফিরে সেই ব্যথা যেন গলা টিপে ধরল তাকে। সঙ্গে ভয়ানক জ্বর। ঘামছিলেন অঝোরে, জ্বর যেন বেপরোয়ার মত উঠছিল আর নামছিল। ব্যথাটা যেন হাড়ের ভেতর গেঁথে বসেছিল। তাঁর মা সারা রাত তার পাশে বসে ছিলেন, ঘনঘন পানি খাওয়াচ্ছিলেন, কপালে চেপে ধরেছিলেন ভেজা গামছা।

আর সেই সময়টায়, আবছা আলোয়, আরেকজন ছায়ার মতো উপস্থিত ছিল, তুহুরা। সে আস্তে করে দরজা খুলে ঢুকেছিল, যেন ভেঙে না ফেলে ঘরের নীরবতা। ঠান্ডা জলের পাতিলে কাপড় ভিজিয়ে এনে ছেলেমানুষের মতো নিষ্ঠা নিয়ে রুশানের কপালে চেপে দিচ্ছিল। এই জেগে থাকা তার স্বভাবের মধ্যেই পড়ে।

কিন্তু…

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ চোখ আধা খোলা অবস্থায় যখন তুহুরার চোখের দিকে তাকিয়ে পড়েন, সেই চোখের ভেতরে যা দেখেছিলেন, তা কোনো সাধারণ মনোভাব ছিল না। সে চোখে ছিল অগাধ এক প্রেমের আকুতি, নিঃশব্দ এক স্বীকারোক্তি। যেন সে বলছে, "এ যন্ত্রণা আমার।"

সেই অনুভবটা সেদিন আব্দুর রুশান মোহাম্মদের অবচেতনে ধাক্কা মেরেছিলেন। হয়তো তিনি ভয় পেয়েছিলেন, নয়তো নিজেকে স্বীকার করাতে চাননি এই সব সত্যি। কিংবা তুহুরাকে দেখেও দেখতে চাননি। কিন্তু এরপর থেকে তিনি লক্ষ্য করতেন। একটু বেশিই লক্ষ্য করতেন তুহুরাকে। এটা কি আসলেও একতরফা ভালোবাসা, নাকি তার শুধু মাত্র তার সন্দেহ সেটা জানার এক লড়াই।

তুহুরার কিশোরী মন ততদিনে রুশানের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। সেই গাঢ় রঙ তার আচরণে, চোখে, কথায় প্রকাশ্য। সে প্রতিদিন লম্বা চুলের পাশে গুঁজে রাখত গন্ধরাজ ফুল। চিকন গড়নের সে মেয়েটি যেন নিজের সমস্ত কল্পনায় একটাই নাম উচ্চারণ করতো, রুশান।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ অবচেতনে একটু হেসে ফেলেন, যেন একটু ধরা পড়ে যাওয়া ছেলেমানুষি হাসি। তিনি কি জানতেন না, তুহুরার রোজ রোজ সেই গন্ধরাজ ফুল খোঁপায় দেয়ার মানে? জানতেন। জানতেন ভালো করেই, তবুও কখনো বলেননি কিছু।

সেই মেয়েটাকে, সেই ভালোবাসাকে, সেই চোখের গভীরতাকে… তিনি শুধু দেখেছেন। তবে কখনো স্বীকার করেননি। দেখতে চাননি। এড়িয়ে গেছেন, বারবার। চোখের সামনে থেকেও যেন দৃষ্টির আড়ালে রেখেছেন তুহুরাকে।

তবুও তুহুরার ভালোবাসা প্রতিদিন একটু করে বেড়েছে। নিরব, নিঃশব্দ, অবহেলিত এক আগুনের মতো। আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ছিলেন সেই আগুনের অনিচ্ছাকৃত সাক্ষী। তিনি জানতেন, তবুও জানতেন না বলেই থেকেছেন।

তবু, তুহুরা… সে ভালোবেসে গিয়েছে। এমনকি যখন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তাকে অবহেলা করেছেন, অগ্রাহ্য করেছেন তাও সে ভালোবেসে গিয়েছে। তুহুরা ছিলেন সেই মানুষটি, যিনি সবটুকু মন দিয়ে ভালোবাসতেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে… কিন্তু জীবন তুহুরাকে এক গৌণ জায়গায় বসিয়েছিল। সে প্রধান চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু একজন ছিলেন, যিনি তুহুরাকে দেখতেন অন্য চোখে।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান সেই টেবিলটার দিকে। উপরে রাখা কাঠের বাক্সটার ঢাকনায় ধুলোর আস্তরণ, কিন্তু তাতে এখনও স্পষ্ট আঁকা সময়ের রেখা। তিনি ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে একবার হাত বোলান তার উপর, যেন অতীতের কোমল স্মৃতিগুলো হাত বুলিয়ে অনুভব করতে চান।

তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের মুখ।

তুহুরার চোখে যে প্রেম, যে অমোখ দৃষ্টি, তিনি সেদিন নিজের জন্য দেখেছিলেন। সেই একই মুগ্ধতা, সেই একই আদরের কোমলতা তিনি আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের চোখে দেখেছিলেন তুহুরার জন্য। রবিউলের চোখে কোনো লুকোচুরি ছিল না, কোনো দ্বিধা ছিল না। সে ভালোবেসেছিল সোজাসুজি। নিঃশর্ত, অন্ধ, অথচ যত্নে মোড়া এক ভালোবাসা।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মনে করেন সেই দিনের কথা…। তুহুরার খুব শখ ছিল একটা কাঠের গয়নার বাক্সের। সে চাইতো জমিদার গিন্নিদের মতো তারও একটা গয়নার বাক্স থাকবে।

সেই শখটা এতটাই গভীর ছিল যে বহুবার তার নিজের কানেও এসেছে, যদিও তিনি কখনো কিছু বলেননি। কিন্তু আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ সারা ঢাকা শহর খুঁজে ফেলেছিল। নতুন বাজার থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি অলিগলি পর্যন্ত, কিন্তু কোথাও কাঠের গয়নার বাক্স খুঁজে পায়নি। তখন সে নিজেই হাতে তুলে নেয় কাঠ, হাতুড়ি, পেরেক। অনেক কষ্টে রাত জেগে বানিয়ে এনেছিল সেই কাঠের গয়নার বাক্স। কাঠ রঙে মাখানো, তার উপর ছোট ছোট খোদাই, ভিতরে নরম কাপড় বিছানো।

তুহুরা ছিলেন তার উপেক্ষিত ভালোবাসার অধিকারিণী, আর রবিউল ছিলেন সেই ভালোবাসার যত্ন নেওয়া একজন প্রকৃত প্রেমিক।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ চোখ বন্ধ করে আবার হাত রাখেন সেই বাক্সের উপর। যেন নিজের মধ্যেই স্বীকার করেন,

"ভালোবাসা আমি পেয়েছিলাম, কিন্তু যত্ন… যত্ন দিয়েছিল রবি। শেষ বেলায় তো সেই পেলো তুহুরাকে। তবে তুহুরা সুখ পেল কি!"

চোখের কোণে একটা হালকা কাঁপুনি। তিনি জানেন, তুহুরা শুধু ভালোবাসেনি, তার মন প্রতিদিন একটু করে রবিউলকেও গ্রহণ করেছিল, শ্রদ্ধা করেছিল, আর শেষে এক নিঃশব্দ ভালোবাসায় তাকে আশ্রয় করেছিল।

কিন্তু এরপর কি?

তুহুরার মৃত্যুটা কি সত্যিই এতটাই স্বাভাবিক ছিল?

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বারান্দায় এসে দাঁড়ান। সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে পাশের গাছের পাতাগুলো দুলে ওঠে হালকা হাওয়ায়। কিন্তু তার ভিতরে যেন চলছিল ঝড়। তিনি মনে মনে গুনে দেখেন, তুহুরার মৃত্যুর পর মাত্র ছ’মাস। মাত্র ছ’মাস! তার ভেতরেই, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ ঘরে নতুন বউ নিয়ে এসেছে। এ তো সেই প্রেমিক রবি নয়! না, সে তো এমন ছেলে না।

রবি যার কাছে তুহুরা মানে সব কিছু, এমনকি তার ছোট ছোট বিষণ্নতাকেও বুঝে ফেলতো চুপচাপ… সে কি করে!

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আবারো চেয়ারে বসে পড়েন। কপাল কুঁচকে আসে। এই ছেলেটাকে তো তিনি চোখের সামনে বড় হতে দেখেছেন। একদম ছোট থেকে। তুহুরাকে ভালোবেসে যেভাবে সে নিবেদন করেছিল, তাতে কোনো বানানো আবেগ ছিল না।

তাহলে…..? তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়, তুহুরার মৃত্যু কি স্বাভাবিক ছিল?

বাথরুমে স্লিপ করে পড়ে মাথায় আঘাত। ডাক্তার বলেছিল, হেমারেজ। মৃত্যুর সার্টিফিকেটে লেখা ছিল “Accidental Injury Leading to Cerebral Hemorrhage.” সবাই মেনে নিল।

আর সবচেয়ে বেশি আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে কুঁচকে দেয়, রবিকে তিনি দেখেছেন তুহুরার মৃত্যুর পরে। প্রথম কিছুদিন সে যেন একদম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। চোখের নিচে কালি, মুখে কথা নেই। এমনকি নামাজের পরেও হাত তুলে কিছু চাইত না। চুপ করে বসে থাকতো মসজিদের এক কোণে। তিনি ভাবতেন, এই ছেলেটা হয়তো ভেঙে গেছে, ভাবেই গুমরে মরে যাবে।

কিন্তু তারপর…

হুট করেই রবিউলের বিয়ে ঠিক হয়। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের এটা মেনে নিতে পৃথিবীর কোনো ব্যাখ্যাই যেন যথেষ্ট হয় নি।

তিনি জানেন, মা-বাবার চাপ ছিল রবির উপরে। কিন্তু, এই রবি তো কখনো চাপ মানা ছেলে ছিল না! সে তো তুহুরার জন্য লড়তে পারতো, সবকিছুর বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়াতে পারতো।

তাহলে কেন?

রুশান একবার তাকান সেই কাঠের বাক্সটার দিকে। আসল সত্যটা এখনও অন্ধকারেই ঢাকা।

কিন্তু রুশানের বুকের ভিতর একটা টান বাড়তেই থাকে। যেন কেমন জানি একটা অসঙ্গতির গন্ধ। যেন কেউ কিচ্ছু লুকাচ্ছে। প্রকৃতির ঘোরে তিনি এতো আবদ্ধ ছিলেন যেন বাকি সব তার কাছে ঠুনকো হয়ে উঠেছিল।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। তাঁর শরীরের সমস্ত ক্লান্তি এক মুহূর্তে যেন ঠেলে উঠে আসে চোখের কোণে। তবুও, তাঁর পা এগিয়ে যায় চিলেকোঠার দিকে। এবার হয়তো তাকেই খুঁড়ে বের করতে হবে সেই সত্যটা, যা এতদিন অজানা থেকে গেছে।

চিলেকোঠা, যেখানে তুহুরার শেষ চিহ্নগুলো পড়ে আছে। এখানেই কাঠের বাক্সটা ছিল। তার প্রিয় শাড়ি, একজোড়া কাঁচের চুড়ি, সুঁই-সুতোর বাক্স, বইয়ের ভেতরে রাখা শুকিয়ে যাওয়া ফুল… সব কিছু।

কিন্তু কেন এত অবহেলায়?

সে তো এ বাড়ির মেয়ের মত ছিল। তুহুরা শুধু রবির স্ত্রী ছিল না, সে ছিল এই বাড়ির নিঃশব্দ চঞ্চল প্রাণ।

তবু, এখন? কেন সব জিনিসগুলো এমনভাবে ধুলোয় ঢাকা?

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ভেতরে যেন কেঁপে ওঠে কিছু। এটা অবহেলা না… এটা যেন চেষ্টা করে ভুলে যাওয়া। অথবা চেষ্টা করে গোপন রাখা।

হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে, তুহুরার মৃত্যুর পর প্রথম কয়েকদিন পরিবারের কেউ চিলেকোঠায় যেত না। বাড়ির কাজের মেয়েটাও চলে গিয়েছিল তুহুরার মৃত্যুর তিন দিন পর, অকারণে।

তখনই তো প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল। কিন্তু আব্দুর রুশান মোহাম্মদ নিজেই তো চুপ ছিলেন। কেন?

হয়তো তিনি দেখতে চাননি। কারণ দেখতে গেলে সব কিছু বদলে যেত। তখন রবিউলকে দোষী ভাবতে হতো, পরিবারকে প্রশ্ন করতে হতো, নিজেকেও দোষী ভাবতে হতো। তিনি কেন আগেভাগেই কিছু বুঝতে পারলেন না!

তুহুরা কি কিছু বলার চেষ্টা করেনি? অনেক রাত করে ছাদের কোনায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতো, কোনো কোনো দিন চুপচাপ থাকত কথা বলতো না, রান্নায় লবণের অভাব হতো, আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ভাবতেন, এই বুঝি বিষণ্নতা। কিন্তু তা কি কেবল বিষণ্নতা ছিল?

হয়তো নয়।

চিলেকোঠার পুরনো খাঁচার পাশে রাখা ছিল একটা কাঠের ট্রাংক। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ সেটা টেনে সামনে আনেন। ট্রাংকের তালা নেই। খুলতেই কেমন একটা পুরনো, ছাপা শব্দ বেরিয়ে আসে।

ভিতরে কিছু পুরনো কাগজপত্র, কিছু চিঠি… আর নিচে, একগুচ্ছ ছবি। তুহুরা আর রবিউলের, কিছু হাসিমুখ, কিছু ক্লান্ত। কিন্তু একটা ছবিতে তুহুরার চোখে ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা, যে শূন্যতা আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আগে কখনো লক্ষ করেননি।

হয়তো তিনি চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। হয়তো সবাই ফিরিয়ে নিয়েছিল। তাহলে কি… তুহুরাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল?

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এবার ধির পায়ে নিজের ঘরে ফিরে আসেন। বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর সেখানেই আটকানো। প্রকৃতির পায়েল তুহুরার বাক্সে কি করে এলো? ডায়রি যেভাবে স্বাত্তকি দিয়ে গিয়েছিল, সে অবশ্যই পায়েল দিয়ে যাবে না। প্রকৃতির ডায়রি এতো অযত্নে তাহলে পায়েলের কেন এতো যত্ন?

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের আঙুল ঠান্ডা হয়ে আসে পায়েলের স্পর্শে। ছোট্ট রুপার তৈরি সেই পায়েলটা কেমন যেন নীরব অভিসপ্ত কিছু হয়ে পড়ে আছে বাক্সের কোণে। তুহুরার নয়, বরং… প্রকৃতির।

তাহলে? তাহলে প্রকৃতির জিনিস এখানে এল কীভাবে? আর যদি এসে থাকে, তাহলে কে এনেছে? কবে এনেছে?

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের মাথার ভেতর এখন অজস্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি ধীরে ধীরে আবার বসে পড়েন। এবার তাঁর চোখ যায় তার বিছানার কোনে রাখা প্রকৃতির ডায়রিটার দিকে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ধীরে ধীরে ডায়রিটার পেছনের পাতাগুলোর দিকে উল্টে যান। এরপর ডায়রিটা বুকে টেনে নেন।

___________

চলবে....🖤