নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১৮

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১৮ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১৮

সকাল বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। ঘরের জানালায় ধরা পড়া আলোয় ধুলোমলিন পর্দা আলতো দুলছে হাওয়ার টানে। বাইরের পৃথিবী যেন এক রৌদ্রঝলমলে দৃশ্যপট, অথচ ঘরের ভেতরটা থমথমে, বোবা একটা নিস্তব্ধতা জমে আছে চুপিসারে।

হিয়া এখনো ঘরবন্দি। বিছানায় বসে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে যেন এক জটিল হিসেব মিলাতে ব্যস্ত। চোখের সামনে নয়, মনের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে অস্পষ্ট ছায়ারা। তুহুরার মুখ, প্রকৃতির ডায়রি, মিনু রহমানের কাঁপা কণ্ঠ, আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের বিস্ময়-আতঙ্ক মেশানো অভিব্যক্তি।

দুপুর গড়িয়ে গেছে অনেক আগে, খাবার টেবিলে যাওয়া হয়নি তার, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের প্রতি অভিমানের পাহাড় তুলে বসে আছে সে। ঠিক এমন মুহূর্তেই দরজায় ধীরে টোকা পড়ে।

কান পাতলেই বোঝা যায় কণ্ঠটা আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের। যেন খুব সচেতন, খুব নরম। “হিয়া?”

দরজাটা টেনে রাখা ছিল, সামান্য চাপেই খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে তিনি হিয়ার দিকে তাকান, তার হাতে খাবারের থালা, মুখে একরাশ পরিমিত স্নেহ আর প্রশ্রয়। চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলেন তিনি। “খুব রাগ হয়েছে, না?”

হিয়া কিছু না বলেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, অভিমানী শিশুর মতো। তিনি ধীরে পাশে বসে বলেন,

“রাগ করলে তো চলবে না। অতীত মানেই সব সময় গল্প হয় না, কখনও কখনও তা শুধুই ক্ষত। অতীতের গোপন বাক্স খুললেই যে আলো আসবে, এমনও নয়, অনেক সময় শুধু ধুলো আর বিষাদ আসে। সব জায়গায় কৌতুহল দেখাতে নেই হিয়া।”

হিয়ার ভিতরে কোথাও কিছু গলে যায়। মুখে কোনো কথা না এলেও চোখের ভাষা নরম হয়।

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে হাতে খাবারের থালাটা দিয়ে দেন। এক অদ্ভুত পরিণত, স্নেহময় ভালবাসায় জড়িয়ে পড়ে হিয়া। সে এই মানুষটাকে অসম্ভব ভালোবাসে, তার দাদা ভাই বলতে তার আরেকটা জগত। এই মানুষটার সাথে সে কোনভাবেই রাগ কিংবা অভিমান করে থাকতেই পারে না। হিয়া ভদ্র মেয়ের মত বলে, “টেবিলে গিয়ে খাচ্ছি চলো।”

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ যেন এসব জানতেন। তিনিও হেসে উঠে দাঁড়ান। এরপর হিয়া তার সঙ্গে খাবারের ঘরের দিকে এগোয়। সেখানে বাকিদের মোটামুটি সকলের খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ হিয়ার জন্য এখনো না খেয়ে বসে আছেন। খাবার টেবিলে এখন শুধুমাত্র আলিফ বসে বসে, মাংসের হাড্ডি চাবিয়েই যাচ্ছে। এ বাড়িতে শুধুমাত্র আলিফ’ই খুব ধীরে খাবার খায়। হিয়া আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদও খেতে বসে পড়ে। রাশিদা যত্নে খাবার পরিবেশন করে। সময় সামান্য কাটে।

সব ঠিকঠাক, সব স্বাভাবিক। এমন একটা মুহূর্তে, ঠিক তখন, যখন হিয়া কিছুটা স্থির হয়, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ হালকা হেসে বলেন, “আজই ব্যাগ গুছিয়ে নিস। কাল সকালেই আমরা ফিরছি। অনেক দিন বেড়ানো হয়েছে, এবার ঘরে ফেরা দরকার। তোর বাবা পাগল করে তুলছে।”

হিয়া খেতে গিয়ে থেমে গেল। চলে যাওয়ার কথাটা যেন কার্পেটের নিচে লুকানো ধাতব কাঁটার মতো লাগলো। হিয়ার স্বস্তি খুঁজে পাওয়া মন আবার ধোঁয়াটে হয়ে ওঠে। এটা কি সত্যিই নিয়ম মত বাড়ি ফেরা? নাকি কোনো রহস্যকে চাপা দিয়ে, চুপিচুপি পালিয়ে যাওয়া?

খাবারের শেষ কয়েকটি লোকমা হিয়ার গলায় নামছে না। মনে হচ্ছে, প্রতিটা চামচে অদৃশ্য কিছু ভারী হয়ে আছে। অভিমান, বিস্ময়, আর একরাশ অনিশ্চয়তা। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের বলা ঘরে ফেরা কথাটা তার বুকের ভেতর কেমন করে গুমরে উঠছে। যেন কোনও অনুচ্চারিত সত্য, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, শুধু টের পাওয়া যায় নিঃশ্বাসের ফাঁকে। সে কেন যেতে চাইছে না? এর কারণ কি শুধুমাত্র সদ্য জন্মানো তুহুরাকে নিয়ে তার মনের সংশয়? নাকি প্রকৃতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য এক মায়া যেটা সে ধরতে পারছে না? সেটা কি তূর্য?

খাওয়া শেষ করেই সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ হিয়ার কাঁধে একবার হাত রাখেন, কিন্তু কিছু বলেন না।

হিয়া তার ধীর পায়ে তূর্যের ঘরের দিকে এগোয়। বারান্দা পেরিয়ে, করিডোর ধরে যখন সে ঘরের দরজার কাছে পৌঁছে, একটা অজানা সঙ্কোচ টের পায় বুকের মাঝে। দরজাটা আধখোলা। ভেতরে উঁকি দিয়ে প্রথমে দেখে নেয়। তূর্যর বিছানার পাশে বসে আছেন মিনু রহমান। মুখে ক্লান্তির ছায়া, চোখে একরাশ চিন্তা, কিন্তু তবু স্পষ্ট, মায়ের মতো স্নেহে তূর্যর কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তিনি। তূর্য উঠে আধশোয়া হয়ে বসে আছে। গায়ে এখন আর কম্বল নেই, মুখে আগের মতো মলিন ভাবটাও নেই।

হিয়া ধীরে পা টিপে ঘরে ঢুকে। একটা ভাঙা গলায়, যেন অনেক না বলা কথার আড়ালে লুকানো একটি ছোট্ট প্রশ্ন ছুঁড়ে, “জ্বরটা কেমন এখন?”

তূর্য কিছু বলার আগেই মিনু রহমান উত্তর দেন, “অনেকটাই কমে গেছে। ঘন্টাখানেক হলো জ্বর আসছে না।”

হিয়া শুধু একটা জোর করে হাসি মুখে টেনে নিল। তূর্য চেয়ে রইল হিয়ার মুখে। চুপচাপ। সে কিছু বলে না, কিন্তু হিয়ার মুখের উপরকার ফ্যাকাসে আবরণটা তার চোখ এড়ায় না।

হিয়া আর দেরি করে না। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে, নিজেকে সামলে, শব্দহীন পায়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। করিডোরের বাতাসে তখনও দুপুরের রোদ নেমে আছে, কিন্তু তার গায়ে পড়ছে এক গভীর বিষণ্ন ছায়া।

নিজের ঘরে ঢুকে দরজা হালকা ঠেলে বন্ধ করে দেয় হিয়া। জানালার বাইরে আলো এখনো ঝকঝকে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভরে ওঠে এক নিঃশব্দ অন্ধকারে। সে চিৎকার করে বলতে চায় সে যেতে চায় না। বাড়ি ফিরতে চায় না। তবে এসব কিছুই বলা হয় না, সে শুধু জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে একনজরে। রোদের আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে তার মুখের একপাশ, অথচ তার চোখে একরাশ অন্যমনস্কতা। যেন সে এখানে নয় সে আটকে আছে অন্য কোথাও, কোনো অতল ভাবনার গভীরে।

ঠিক সেই সময় দরজাটা ধীরে খুলে মিম ঘরে ঢোকে। তার মুখে চিরচেনা প্রাণচঞ্চলতা, কিন্তু চোখে যেন আজ একটু বাড়তি কৌতূহল। সে হিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায়। “কালই তো তোরা ফিরছিস। দাদি বললো তূর্য ভাইয়ার জ্বরটা আজ ঠিক হলেই কাল সকালে আমরাও চলে যাবো।”

হিয়া কোনো উত্তর দেয় না। সে যেন এ সব কিছু জানে, সে শুধু চোখ মেলে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, যেন সেখানে কোথাও তার মন আটকে আছে। মিম কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, তারপর ধীরে হিয়ার ঘাড়ে হাত রাখে। “তোর কি মন খারাপ হিয়া?”

হিয়া এবার মুখ ফিরিয়ে চায় না, শুধু শান্ত গলায় বলে, “না ঠিক… আমাকে কেন যেন প্রত্যেকটা ঘটনা খুব বাজে রকম ভাবে আকর্ষিত করে। অন্য মানুষের জীবনে যা ঘটে, আমার মনে হয়, সেসব যেন আমারই কাহিনী। মনে হয় আমি যেন সেসব বেঁধে ফেলছি নিজের ভিতর। এটা কি কোনো সমস্যা?”

মিম একচোট হাসে, কাঁধটা আলতো করে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলে, “এটা কোনো সমস্যা না রে হিয়া। তুই একটু বেশি সেনসিটিভ, এই জন্যই এমন হয়। তোর ভেতরের মানুষটা খুব গভীর, সবকিছু তুই তোর নিজের মতো করে খুব বেশি করে অনুভব করিস। এটাই তো তোর সৌন্দর্য।”

হিয়া চুপ করে থাকে। মিমের কথাগুলো তার মন ছুঁয়ে যায়, কিন্তু সে তা মুখে প্রকাশ করে না। শুধু নিঃশব্দে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। রোদটা তখন একটু কমে এসেছে, ছায়া একটু বেশি। ঠিক হিয়ার মনের মতো। তবুও, মিমের কথায় একটা উষ্ণতা জমে, অজান্তেই। এক ধরনের আশ্রয়, যা হয়তো সে নিজেও খুঁজে পাচ্ছিল না এতক্ষণ ধরে।

দুপুরের রোদ ঝিমিয়ে তখন জানালার ফাঁক গলে ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে, নিঃশব্দ অথচ দৃঢ়। বিকেল ছুঁয়েছে সময়। মিম চলে গেছে কিছুক্ষণ হলো। হিয়া তখনো চুপচাপ বসে, জানালার ধারে, সেই পুরোনো কাঠের চেয়ারটায়‌। যেটার চিড় ধরেছে নিচের পায়ায়, কিন্তু এখনও দিব্যি দোল খায়।

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে ওঠে একবার। পর্দায় ভেসে ওঠে পরিচিত নাম, তূর্য ভাই।

বার্তাটি খোলামাত্র চোখ আটকে যায় প্রথম বাক্যেই। “তুই ঠিক আছিস হিয়া?”

সাথে সাথে আরেকটা মেসেজ, “এইসব ঘটনা নিয়ে পড়ে থাকিস না, এসব অনেক আগের কাহিনী। খুঁড়ে খুঁড়ে আর কি বা পাবি? কিচ্ছু না…। আমরা সবাই খালি হাতে ফিরবো।”

আবার আরেকটা মেসেজ, “দেখ, প্রকৃতিকে খুঁজতে বের হয়েছিলাম, অথচ প্রকৃতিই নেই কোথাও। চরিত্রগুলো যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। সময় বুড়ো হয়ে গেছে হিয়া। মুখগুলো ঝাপসা, স্মৃতিগুলো কুয়াশার মতো। যদি এগুলো পঞ্চাশ বছর আগের না হতো... তাহলে হয়তো একটা রাস্তা খোলা থাকত।”

হিয়া গভীরভাবে পড়ে বার্তাগুলো। চুপচাপ। তার ঠোঁটের কোণে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস যেন থমকে যায়। কেবল একফোঁটা অনুভূতির ঢেউ এসে ভিজিয়ে দেয় বুকের ভেতরের নির্জনতা।

সে ধীরে ধীরে টাইপ করে, তার গলায় যেন একটা নরম অথচ রিক্ত সুর, “আমরা কি তাহলে খুব দেরি করে ফেলেছি, তূর্য ভাই?

এত দেরি করে ফেলেছি যে, এখন গল্পের শেষ পৃষ্ঠাটাও হলুদ হয়ে গেছে। চরিত্রগুলো কোথাও নেই, কেবল আমরা রয়ে গেছি, পাতার ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা বিস্ময়ের মতো।

তবু জানো, আমার মনে হয়, কিছু কিছু গল্প শেষ হওয়ার জন্য নয়, অপেক্ষা করার জন্য তৈরি হয়। ঠিক যেন কেউ এসে আবার খুলে পড়বে… ধুলো ঝেড়ে, নিঃশব্দে সব বের করে আনবে।”

নির্বাক স্ক্রিনে তূর্যের নামটা নিঃশব্দে জ্বলতে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর নিভে যায়। আর কোনো উত্তর আসে না। হিয়া ফোনটা নিচে নামিয়ে রাখে। মুহূর্তখানেক চুপ করে বসে থাকে, যেন নিজের ভেতরেও কিছু খুঁজে বেড়ায়। তারপর নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়, খোলা জানালায় একবার তাকিয়ে দেখে রোদটা আর আগের মতো তীব্র নয়। একধরনের সোনালি ক্লান্তি ছড়িয়ে আছে দিগন্তজুড়ে।

সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় ছাদে। বিকেলের প্রথম প্রহর। ছাদে উঠতেই চোখে পড়ে, প্যাঁচানো বটগাছটার ছায়া মেঝেতে একধরনের নিস্তব্ধ পুঁতির মালার মতো কিছু বই গুলো ছড়িয়ে বসে আছেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ।

তাকে ঠিক যেমনটা হিয়া জানে, তেমন করেই বসে আছেন ছাদের এক কোণে, চাদর পাতা মাটিতে, হাতে খোলা একটা বই। হিয়া জানে বইটাকে ‘নি:সঙ্গতার একশো বছর’ প্রকৃতির দেয়া উপহার। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখে চশমা, ভ্রু-জোড়া একটু কুঁচকে আছে মনোযোগে। তার চারপাশে ছড়ানো অল্প বাতাস আর পাতা ওল্টানোর শব্দে একধরনের ধ্যানমগ্নতা তৈরি হয়েছে।

হিয়া ধীরে ধীরে গিয়ে তার পাশে বসে। কিছুক্ষণ কোনো কথা হয় না। দুজনেই শুধু বাতাসে মিশে থাকা গন্ধটা অনুভব করে। একটা পুরনো বইয়ের, আরেকটা অনুচ্চারিত ব্যথার।

তারপর হিয়া নিচু স্বরে বলে, "এই বইটা পড়তে পড়তে আপনার কখনো বিরক্ত আসে না?”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হাসেন, “এখন পর্যন্ত তো আসেনি, মনে হয় না এ জন্মে আর বিরক্তি আসবে। তবে, কখন কি হয় বলা যায় না, মানুষের মন তো!”

হিয়া মৃদু হাসলো, তারপর বললো, “একটা প্রশ্ন করি?”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ নিরব চোখে তাকিয়ে বলেন, “বল কি জানতে চাস।”

হিয়া ধীর কন্ঠে বললো, “বড় দাদা, সময়ের সাথে গল্প হারিয়ে যায় তাই না? ‌ যা কিছু হারায়, সময় বাড়লে আর তা কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না এমনটা কেন?"

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ চশমাটা খুলে চোখে একটু হাত দিয়ে ক্লান্তি সরিয়ে বলেন, "চরিত্র তো হারায় না, ওরা লুকিয়ে থাকে। ঠিক যেমন তুমি লুকিয়ে আছো তোমার নিজের গল্পে।"

হিয়া হেসে ফেলে। হালকা, ম্লান হাসি। তারপর বলে, "আমার কেন জানি মনে হয়। আমরা সবাই যেন কেবল দেরি করতেই জানি। কোনো গল্প ঠিক সময়ে খোলা হয় না, সঠিক সময় গল্প গুলো খোলা হলে কি অসাধারণ সমাধান বেরিয়ে যেত তাই না!"

তিনি চোখ তুলে তাকান, স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে বলেন, "এসব ভুল। তুমি যতই চেষ্টা করো, কোন গল্পের খোলাসা ততদিন হবে না যতদিনে ওই গল্প নিজেকে তুলে ধরতে না চায়। এই দেখো যুগের পর যুগ আমি প্রকৃতিকে খুঁজছি, পেয়েছি?

হিয়া, গল্পগুলো তৈরি হয় অপেক্ষার জন্য, সঠিক সময়ের জন্য।"

হিয়ার চোখ জলে ভরে যায় না, তবু ভেতরে কোথাও যেন কিছু গলে পড়ে। সে চুপ করে বসে থাকে আকাশের দিকে তাকিয়ে, ঠিক সেই চরিত্রগুলোর মতো, যাদের অস্তিত্ব কেউ টের পায় না, অথচ তারাই গল্পটাকে আসল অর্থ দেয়।

হিয়া এবার জিজ্ঞেস করে, "তুহুরা কেমন ছিল দাদাভাই? আপনার কোন গল্পে কখনো তো তুহুরার কোন বর্ণনা ছিল না!”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ প্রশ্নটা শুনে চুপ করে যান কিছুক্ষণ। চোখ সরিয়ে নেন হিয়ার দিক থেকে, দূরের আকাশের দিকে তাকান। বাতাসের ভেতর হঠাৎ যেন কিছু ভারী হয়ে ওঠে। হিয়াও চুপ। অপেক্ষা করে, ধৈর্যের নিঃশ্বাসে।

অবশেষে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ নরম গলায় বলেন, "তুহুরা…..! তুহুরা খুব মিষ্টি ছিল। খুব নরম, খুব চঞ্চল একটা মেয়ে। তবে আমাদের তেমন সখ্যতা ছিল না। আমি ওকে সবসময় মিনুর মতোই দেখতাম। তবে ও আমায় ভারি লজ্জা পেত। তুহুরা আমার মায়ের খুব নেওটে ছিল।"

হিয়া মন দিয়ে শুনছে। তার চোখে একরাশ কৌতূহল আর কেমন যেন একটা অদৃশ্য বেদনা। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ একটু থামলেন। তিনি স্মৃতির গহীন থেকে হয়তো শব্দ নিয়ে এলেন, এরপর আবার বলতে শুরু করলেন, “মা সব সময় চাইতেন তুহুরাকে আমার সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য। আর ওদিকে রবি তুহুরাকে খুব পছন্দ করতো। তখন আমার জীবনে প্রকৃতি। বাড়িতে খুব ঝামেলা হয়েছিল। পরে আব্বাই রবি আর তুহুরার বিয়ে দেয়। এসব অনেক পুরনো কথা। ঠিক করে মনে নেই, ঘটনা গুলো অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেছে।"

একটা হালকা বাতাস এসে চাদরটা একটু ওড়ায়। হিয়া আস্তে বলে, "দাদা ভাই তাহলে তুহুরাকে ভালবাসত!"

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হালকা হেসে বলেন,

"ভালোবাসা কি সবসময় দাবি করতে হয়, হিয়া? তুহুরা আর রবির কেমিস্ট্রিটা খুব ভালো ছিল। রবি খুব যত্ন নিতো তুহুরার। আমি ছিলাম বেশ বাউন্ডুলে, আর রবি ছিল গোছানো। আমি বন্ধু-বান্ধব, পড়াশোনা, মাঠে-ঘাটে চড়ে বেড়ানো এগুলোই করতাম। রবি ছিল ঘর কুনো, মিনু তুহুরা ওদের সাথে বন্ধুদের মত ছিল।"

হিয়া চুপ করে থাকে। তার বুকের ভেতরে যেন কিছু শব্দ একসাথে কাঁপতে থাকে, অজানা, অপূর্ণ, অথচ সত্যি। হিয়া এবার প্রশ্ন ছোড়ে, "আর তুহুরার মৃত্যু?"

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এবার একটু থেমে বলেন, "একদম হুট করে। বাথরুমে পড়ে গিয়েছিল সাবানে স্লিপ কেটে। তখন আমি কলকাতায়। এসে শুনতে পাই এইসব ঘটনা, আমার ওকে শেষ দেখাও হয়নি….।"

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের আবেগটা স্পষ্ট। হিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "কলকাতায়?"

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মুখে জোর করে হাসি টেনে বলেন, "প্রকৃতিকে খোঁজার পাগলামি তো আর কম করিনি। এই পাগলামি নিয়ে কলকাতা অব্দি ছুটে গিয়েছিলাম ওকে, একটা বার খুঁজে পাওয়ার আশায়। কিন্তু...পাইনি। কলকাতার পাশে একটা শহর আছে বারাসাত, আমার এক বন্ধু সেখানে একটা বাজারে প্রকৃতিকে দেখেছিল। আমায় চিঠি লিখে জানিয়েছিল। ওই এক চিঠির ভিত্তিতে কলকাতা অবধি ছুটে গিয়েছিলাম আমি। তবে পাইনি।"

হিয়া এবার গভীর কৌতুহল নিয়ে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখের দিক তাকিয়ে বলে, "বড় দাদা? যদি প্রকৃতিকে খোঁজার আমরা একবার চেষ্টা করি, তুমি কি রাগ করবে? ধরো তুমি ঠিক যেভাবে যেভাবে খুঁজেছ ঠিক অন্যভাবে আমরা চেষ্টা করলাম!"

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হাসলেন। "করেই দেখতে পারিস। তবে লাভ হবে বলে মনে হয় না!"

হিয়া আব্দুর রুশান মোহাম্মদের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে, প্রশ্ন করল, "তুমি প্রকৃতির গল্প বলার আগে আমাদের অনেক বন্ধুদের গল্প বলতে। তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা, তাদের ডিটেলস আমাকে দিতে পারো? ঠিক তারা যাদের সাথে তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছ। যারা সকলে প্রকৃতিকে চেনে। তোমরা যারা সবাই একই বন্ধু গ্রুপে ছিলে, তাদের।”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হিয়ার প্রশ্নে একটু হেসে মাথা নাড়লেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, "আমার ঘরে একটা ডায়েরি আছে, কাঠের আলমারির মাঝখানে রাখা। সেই ডায়েরিতে কয়েকজন পুরনো বন্ধুর ঠিকানা আছে এখনো। তখনকার দিনে তো মোবাইল ছিল না, ঠিকানার ভরসায়ই খোঁজ রাখা হতো। সেই থেকেই লিখে রাখা। তবে..."

তিনি একটু থেমে, চোখ সরিয়ে নিলেন দূরের আকাশে। "বাকি অনেকেই তো হারিয়ে গেছে, হিয়া। কারো সাথে আর যোগাযোগ নেই। কেউ দেশের বাইরে, কেউ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, কেউ-বা হয়তো আর বেঁচেই নেই। জানিও না তারা ঠিক কোথায় আছে এখন।"

হিয়া নিঃশব্দে শোনে। কেমন একরাশ হাওয়া বয়ে যায় চারদিকে, যেন পুরনো কাগজের পাতার মতো উড়ে যায় হারানো নামগুলো। হিয়ার মনে হয়, এই মানুষটার ভেতরে এক বিশাল আর্কাইভ আছে, যা কেবল সময়ের অপেক্ষায় পড়ে আছে খুলে পড়ার।

হিয়া নিচু স্বরে বলে, "ডায়েরিটা আমি দেখব। যদি কেউ থেকে থাকে, তাদের সাহায্য নিলে হয়তো প্রকৃতির সন্ধান মিলতেও পারে। কে জানে কোন রহস্যের দরজা কার হাতের অপেক্ষায় বসে থাকে।"

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মাথা ঝাঁকান। "হয়তো, হতেও পারে। এত বছর পর প্রকৃতির ডাইরিটা তো তোদের হাতেই সামনে এলো। চেষ্টা করে দেখ।"

এরপর একরাশ নীরবতা নেমে আসে। চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে তারা, যেখানে সূর্যটা ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে।

_____________

চলবে.....🖤