নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১৭

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১৭ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১৭

হিয়ার চোখ এবার ধীরে ধীরে ফ্রেমের পাশের আরেকটা ছবিতে যায়। তারপর আবার আরেকটাতে। মুখগুলো একটার সঙ্গে আরেকটার কিছুটা মিল খুঁজে পায় যেন সে। মুখ গুলো যেন তার দেখা পরিণত কিছু মুখের সাথে মিল। তবু কোনো পরিষ্কার সূত্র মেলে না। একবার তার মস্তিষ্কে আসে এই ছবিটা হতেই পারে তার দাদির ছবি। সে তো তার দাদির যুবতি বয়সের কোন ছবি দেখেই নি কোনদিন। তাদের বাড়িতে যেসব ছবি আছে সেগুলো তো সব তার দাদির মধ্যবয়স্ক অবস্থার, সেখানে কি আর চেহারা বোঝা যায়!

মাথার ভেতরে প্রশ্ন জমতে থাকে ঘন মেঘের মতো। হিয়া ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসে চেয়ারে, তূর্যের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। হিয়া তূর্যর মুখে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে, “যে কোন রহস্য উন্মোচনের জন্য আপনাকে প্রয়োজন তূর্য ভাই।”

হিয়ার চোখে ঐ একা মেয়েটার ছবিটার প্রতিচ্ছবি যেন বসে গেছে। অজান্তেই এক অচেনা টান অনুভব করছে সে। এটা হয়তো গভীর কৌতুহল। সে আর থাকতে পারে না। সে আবার উঠে এগিয়ে যায়। ফ্রেমটা সাবধানে দেয়াল থেকে নামিয়ে, কাপড় দিয়ে ধুলো মুছে নেয়। এই একটা ছবি নিয়ে ভাবনার জগৎ বাড়ানোর কোন মানেই হয় না। তার দাদির ছবি হলেও জানতে তো আর বাধা নেই! আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে দেখালেই সব পরিচয় মিলবে। হিয়া চলে যায় নিচতলায় বসার ঘরে, যেখানে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ আর মিনু রহমান বসে চা খাচ্ছিলেন। হিয়ার হাতে ধরা ফ্রেমটা তারা দেখে একটু চমকে ওঠেন। হিয়া ধীরে গিয়ে ফ্রেমটা তুলে ধরে আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে প্রশ্ন করে, “বড় দাদা, এই ছবিটা কার? এটা কি আমার দাদি?”

ছবিটা দেখে মুহূর্তেই মিনু রহমানের মুখটা যেন পড়ে গেল। মুখে একটা স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে যাবার মতো করে আঁকড়ে ধরলেন তিনি। গলাটা শুকিয়ে এসেছে বোধহয়, মিনু রহমানের কণ্ঠটা কাঁপে‌ তা-ও গলা একটু সামলে বললেন, “এই… এই ছবি কোথায় পেলি?”

হিয়া শান্ত ভঙ্গিতে বলে, “তূর্য ভাইয়ের জ্বর হয়েছে শুনে দেখতে গিয়েছিলাম। উনার ঘরের দক্ষিণ দেয়ালে টানানো ছিল ছবিটা।”

মিনু রহমান এবার পুরোপুরি ঘাবড়ে যান। তার মুখে আতঙ্কের রেখা। একটা ফিসফিসানি যেন, নিজের সাথেই কথা বলছেন, “কিন্তু আমি তো এই ছবিগুলো নিজের হাতে ফেলে দিয়েছিলাম… অনেক আগেই…!”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ পাশে বসেই হালকা বিরক্তিতে বলে ওঠেন, “আহ্, হয়েছে কি তাতে? আমি-ই বলেছিলাম রাশিদাকে ছবিগুলো গুছিয়ে রাখতে। একটা স্মৃতি তো শেষ করে ফেলার মতো নয়। তোর অত ভাবনার দরকার নেই মিনু।”

হিয়ার চোখ চলে যায় মিনু রহমানের মুখে পরিবর্তনের দিকে। তাঁর চোখে যেন বহু বছর পুরোনো কোন অস্থিরতা জমে উঠছে। হিয়া থমকে দাঁড়ায়। ছবিটা তার হাতে। কাঁচের ভিতর থেকে সেই অমলিন হাসির মেয়েটা যেন তাকিয়ে আছে তার দিকেই, নীরব, কিন্তু গভীর এক অর্থবহন করে।

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ এবার ভালো করে তাকান ছবিটার দিকে। তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ে, একটা শক্ত হয়ে আশা স্বরে বলেন, “এটা তুহুরা,” গলা খানিকটা আরো গম্ভীর হয়ে আসে তাঁর, “আমাদের খালাতো বোন। এ বাড়িতেই থাকতো একসময়।”

তারপর এক মুহূর্ত চুপ থেকে যেন কিছু একটা গিলে ফেলেন ভিতরে ভিতরে। চোখ সরিয়ে নিয়ে বিরক্তি মেশানো কড়া গলায় বলেন, “যেখান থেকে ছবিটা এনেছিস, সেখানেই রেখে আয়। দিনকে দিন তোর এইসব পুরোনো জিনিস ঘাঁটাঘাঁটির নেশা খুব বেড়ে যাচ্ছে। পড়াশোনায় মন দে হিয়া। সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। এসব খুঁজে পাস করা যাবে না।”

হিয়া বেশ থমকে যায়। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ হিয়াকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। এমন উচ্চস্বরে তার সঙ্গে এই অব্দি কোনদিনও আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ কথা বলেননি। তার গলায় যে ধমক ছিল, তা কেবল পড়াশোনার জন্য নয়। মনে হচ্ছিল, আর কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই হয়তো এমন কিছু বেরিয়ে পড়বে, যা কারও জানার কথা নয়।

ঘরের বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসে। চারদিকে নেমে আসে একটা নিস্তব্ধতা। যেন কারও না-বলা গল্প, চাপা পড়া কান্না, কিংবা বহুদিন আগের অনুতাপ… দেয়ালের পুরোনো চুনকাম ফুঁড়ে উঠে আসতে চাইছে।

হিয়া ছবিটা হাতে শক্ত করে ধরে নীরবে ফিরে আসে তূর্যর ঘরের দিকে। ওর চোখের দৃষ্টি ভারী, মুখে কোনো শব্দ নেই, অথচ মনটা বিক্ষিপ্ত। চিন্তা, প্রশ্ন, আর অব্যক্ত ক্ষোভে ভরা। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেই দেখে, তূর্য জেগে উঠেছে। মাথায় ভেজা তোয়ালে আর পাশেই বসে আছে পিউ, আলিফ আর মিম।

হিয়াকে দেখে প্রথমে কেউ কিছু বলে না, তবে চোখে পড়ে ওর মুখের গম্ভীরতা, সেই হালকা ভেঙে পড়া ভাব। আলিফ চোখ ছোট করে তাকায়, “কি হয়েছে আপু? এত মন খারাপ কেন?”

পিউও কপাল কুঁচকে ফেলে, “কেউ কিছু বলেছে তোমায়?”

মিম আস্তে উঠে এসে পাশে দাঁড়ায়,‌ “তুই ঠিক আছিস তো?”

তূর্য বালিশে হেলান দিয়ে বসে শুধু চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে হিয়ার দিঙ্গকে, তার চোখে একরাশ উদ্বেগ। সেও অনুভব করছে কিছু একটা ঘটেছে।

হিয়া কিছুক্ষণ কিছু বলে না। সে হাতের ফ্রেমটা আস্তে করে টেবিলের কোণে রেখে দেয়। মুখে কোনো উত্তর নেই, কিন্তু চোখে যেন অনেকগুলো কথা আটকে আছে। তার নীরবতা চারপাশে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে দেয়। যেন কেউ পুরনো কোনো পাতার ধুলো ঝেড়ে তুলে ফেলেছে। যার শব্দ এখনো সবাইকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।

হিয়া চুপচাপ টেবিলের কোণ থেকে ছবিটা তুলে নিয়ে সবার সামনে ধরে দেখায়। সবাই প্রথমে নীরব, এরপর একে একে এগিয়ে আসে।

পিউ চোখ বড় বড় করে তাকায়, "এইটা কার ছবি? দেখতে একদম সিনেমার মতো লাগছে!"

আলিফ ছবিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, "মনে হচ্ছে অনেক আগের ছবি… সাদা-কালো ভাবটাই বলছে কত পুরনো!"

মিম চোখ দুটো একটু ছোট করে ছবির দিকে তাকায়, "এ আবার কে? দাদি তো না। আবার প্রকৃতির মতোও তো লাগছে না!"

হিয়া একটু থেমে, আস্তে বলে, "এটা তুহুরা। এই ঘরের দেয়ালে টাঙানো ছিল। আজ সকালে তূর্য ভাইয়ের জ্বর দেখতে এসে চোখে পড়েছে। নিচে নিয়ে গিয়েছিলাম ছবিটা দাদাকে দেখাতে যে ছবিটা আসলে কার। তবে সবাই যে ভয়ংকর রিঅ্যাক্ট করলো, তাতেই হয়ে গেছে!

পিউ সন্দেহের নজরে জিজ্ঞেস করলো, “ভয়ংকর রিয়েক্ট করেছে মানে?”

হিয়া মাথা নিচু করে বললো, “দাদাভাই এমন ভাবে ধমকে উঠলো যেন এটা নিষিদ্ধ ছবি।”

আলিফ তাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “সে সব পরে শুনছি। আগে বলো এই তুহুরা আবার কে? এমন কোন নাম তো আগে শুনিনি!”

হিয়া এবার বললো, “এটা দাদা ভাইদের খালাতো বোন। তবে কেন জানি মনে হয়েছে তারা এটাকে লুকাতে চাচ্ছে। মনে হচ্ছে এর পিছেও আছে কোনো রহস্য।"

মিম হঠাৎ মুখে হাত রেখে বলে ওঠে, "এটা বাড়ি না-কি একটা রহস্যের পুতুল ঘর! একটার রহস্য ফুরোতে না ফুরোতেই আরেকটা চরিত্র এসে হাজির, তুহুরা! প্রকৃতির যেমন শেষ নেই, এই বাড়ির রহস্যও তেমন!"

সবাই একটু হেসে ওঠে। হালকা, মিষ্টি একটা হাসি। তবুও ছবির মেয়েটা যেন ঘরের বাতাসে এক চুপচাপ ছায়া ফেলে যায়।

তূর্যও ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলতে চায়, আবার যেন থেমে যায়। হিয়ার চোখে তখন একটাই প্রশ্ন ভেসে ওঠে, “তাহলে তুহুরা কে? খুব সাধারণ কোনো চরিত্র নাকি, দাদাভাইয়ের হঠাৎ মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার মতো কোন বিশেষ চরিত্র!”

হিয়া নিচে ঘটা সমগ্র ঘটনা অক্ষরে অক্ষরে বর্ননা সহ ব্যাখ্যা করে বলে সবাইকে। সবাই যেন চুপসে যায়। সেই ছবিটা একপাশে রাখা, কিন্তু কারো চোখ সরে না সেখান থেকে।

সবাই চুপচাপ। পিউ মৃদু স্বরে বলে, “দাদাভাই কেন এমন করলেন? ওনাকে তো এমনটা খুব একটা করতে দেখি না। আর তুমি তো উনার সব থেকে আদুরে.. তাও এতো রুক্ষতা!”

মিম বলে, “যেভাবে রেগে উঠলেন তাতে মনে হচ্ছে, তুহুরা নামটার ভেতরে কিছু তো আছে... আর দাদি কেন ঘাবড়ে গেলেন এমন কী আছে? এতো বছরে দাদি তো উনার জীবনের অনেক গল্প বলেছেন, কোই তুহুরা নাম তো কগনো শুনি নি। তূর্য ভাই তুমি শুনেছো?”

তূর্য একটু উঠে বসলেও চুপ। হিয়ার মুখে আর কোনো কথা নেই, তবে চোখের ভিতর শুধু প্রশ্ন আর ধোঁয়াশা।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের দরজায় টুক করে একটা শব্দ হয়। মাথা উঁচিয়ে সবাই তাকায়, দরজায় দাঁড়িয়ে মিনু রহমান। চোখে মুখে একরাশ স্মিত হাসি, যেন কিছুই হয়নি এতক্ষণ। ঘরে ঢুকেই বলতে শুরু করলেন, “জানতাম! ঠিক জানতাম। তোরা এখন তুহুরাকে নিয়েই আলোচনা সভা বসাবি।” মিনু রহমান এমন ভঙ্গিতে বললেন যেন সে-ই এই আলোচনার প্রধান অতিথি।

এক হাতে আঁচল সামলে, খুব স্বাভাবিকভাবে এসে বসলেন তিনি সবার মাঝে। চোখে মুখে এমন এক পরিপক্ব মায়া, যেন এই ঘরটা, এই ছবি, এই ইতিহাস সবই তার খুব চেনা।‌ মিনু রহমান ছবিটা হাতে নেন, একবার হাত বুলিয়ে নেন। “তুহুরা। আমার শৈশব কেটেছে তুহুরার সাথে।”

সবাই চুপ। নিঃশব্দের গাঢ় ছায়া ঘনিয়ে আসে ঘরে। হিয়া, মিম, পিউ, আলিফ এমনকি তূর্যও চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে মিনু রহমানের দিকে।

সবার চোখে এবার আর শুধুই কৌতূহল নয়,

একটা দীর্ঘ, অনাবিষ্কৃত গল্প শোনার জন্য যেন তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে ওরা।

___________

চলবে..........🖤